একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির দিকে আলোকপাত করলে ক্ষমতার সংজ্ঞাকে মনে হয় এক পরিবর্তনশীল চলক। একটা সময়ে যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের অনুঘটক ছিল তেল, গ্যাস ও পারমাণবিক সক্ষমতা, বর্তমানে সেই জায়গায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। স্মার্টফোন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো থেকে বায়ুশক্তি প্রযুক্তি, আবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে এসব উপাদান অপরিহার্য। ফলে এগুলোর উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এখন কেবল বাণিজ্যিক বিষয়ে আবদ্ধ না থেকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
চীনের বিরল মৃত্তিকা মৌল খাতে প্রাধান্য ও দেশটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের উদ্বেগ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। অতএব, খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কৌশলগত ক্ষমতায় রূপ নেয়, তা বিশ্লেষণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি কূটনৈতিক পর্যালোচনা।
আর ঠিক এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চলে আসে, বিরল এই খনিজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? বস্তুত, রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস বা বিরল মৃত্তিকা মৌল বলতে ১৭টি মৌলকে বোঝায়। নামের মাঝে ‘বিরল’ শব্দ থাকার অর্থ এই নয় যে সব মৌলই প্রকৃতিতে দুষ্প্রাপ্য। বরং অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলন, পৃথকীকরণ ও বিশুদ্ধ করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। এদের বিশেষ চৌম্বকীয়, আলোকীয় ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রযুক্তিতে অপরিহার্য করে তুলেছে।
উদাহরণ হিসেবে নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়ামের কথা বলা যায়। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে এই মৌল দুটি ব্যবহৃত হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর ও বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনে এসব চুম্বকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়াম উচ্চ তাপমাত্রায় চুম্বকের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ইট্রিয়াম ব্যবহৃত হয় বিমান ইঞ্জিনের বিশেষ আবরণ ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে। অর্থাৎ এসব উপাদানের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব খনি কিংবা ধাতু শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে গাড়ি, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পেও।
এবার আসি সরবরাহব্যবস্থায় চীনের প্রাধান্যের প্রশ্নে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক পরিশোধিত উৎপাদনের প্রায় ৯১ শতাংশ ছিল চীনের দখলে। একই সময়ে এসব মৌল থেকে তৈরি স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনেও দেশটির অংশ ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ চীনের প্রভাব কেবল খনিজ উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে চূড়ান্ত শিল্পপণ্য উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত।
এখানে লক্ষণীয়, খনিজের মজুত থাকা আর সেই খনিজকে শিল্পে ব্যবহারযোগ্য উপাদানে রূপান্তর করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। কোনো দেশের মাটিতে বিরল খনিজের মজুত থাকলেও উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল হলে সেখানে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে তোলা কঠিন। চীন দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, বৃহৎ শিল্পভিত্তি ও সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে এই সুবিধা অর্জন করেছে।
এবার আসা যাক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সাতটি বিরল মৃত্তিকা মৌল ও সংশ্লিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। একই বছরের অক্টোবরে দেশটি আরও বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। তবে এপ্রিলের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং অক্টোবরে ঘোষিত বিস্তৃত ব্যবস্থাগুলোকে আলাদা করে দেখা জরুরি। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরে ঘোষিত কয়েকটি ব্যবস্থা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে ঘোষিত বিধিনিষেধ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও স্থগিত ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
রপ্তানি লাইসেন্স, অনুমোদন ও সরবরাহের শর্তের মাধ্যমে কোনো দেশ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের প্রবাহে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজস্ব উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় লিপ্ত, অপরদিকে বেইজিংও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে। বস্তুত, এই টানাপোড়েনেই প্রমাণিত হয়, আধুনিক কূটনীতিতে সরবরাহের নিশ্চয়তা ও বাজারে প্রবেশাধিকার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রসঙ্গত, এখানে জাপানের উদ্বেগ ও বিকল্প সরবরাহের অনুসন্ধানের কথা উঠে আসে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে জাপানে ইট্রিয়ামের সরবরাহ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। বিকল্প উৎস বা পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে আগামী কয়েক মাসে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। ইট্রিয়াম বিমান ইঞ্জিনের বিশেষ আবরণ ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা শিক্ষা দেয়, বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই কেবল মজুত গড়ে তোলা নয়, সরবরাহের উৎস বহুমুখী করাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রও এই বাস্তবতা মোকাবেলায় তৎপর হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের রচেস্টারে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য চীনের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তবে নতুন কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ থেকেই দ্রুত চীনের সমপর্যায়ের সক্ষমতা অর্জিত হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য সময় প্রয়োজন।
এবার আলোচনার ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন আসে, চীনের এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কৌশল থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা কী? বাংলাদেশ বর্তমানে বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক উৎপাদনের অন্যতম শক্তি নয়। তথাপি, এই প্রতিযোগিতার অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে দেশটি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। ইলেকট্রনিকস, যোগাযোগপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ভবিষ্যতের শিল্পায়নের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বাংলাদেশের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববাজারে সংকট সৃষ্টি হলে আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশের প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিনির্ভরতা বিশ্লেষণ করে বিকল্প সরবরাহকারী চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক শিল্পসহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা জরুরি। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাস্তবভিত্তিক কূটনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা।
পরিশেষে, বিরল খনিজের রাজনীতি দেখাচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার লড়াই কেবল সীমান্ত, সামরিক ঘাঁটি বা জ্বালানি সম্পদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত নয়। শিল্পপ্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য উপাদানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণও রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চীনের প্রাধান্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা এবং জাপানের উদ্বেগ বিশ্ব অর্থনীতির এক মৌলিক দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ গুটিকয়েক রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে তা বাণিজ্যিক ঝুঁকির পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপের উৎসও হতে পারে।
কিন্তু এর সমাধান কি কেবল একটি দেশের আধিপত্যের বদলে অন্য দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা? না, এখানে প্রয়োজন বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা, পরিবেশসম্মত উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তির বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। বিরল খনিজের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব যদি এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে বর্তমানের অস্থির প্রতিযোগিতাকে আরও স্থিতিশীল ও ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির দিকে আলোকপাত করলে ক্ষমতার সংজ্ঞাকে মনে হয় এক পরিবর্তনশীল চলক। একটা সময়ে যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের অনুঘটক ছিল তেল, গ্যাস ও পারমাণবিক সক্ষমতা, বর্তমানে সেই জায়গায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। স্মার্টফোন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো থেকে বায়ুশক্তি প্রযুক্তি, আবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে এসব উপাদান অপরিহার্য। ফলে এগুলোর উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এখন কেবল বাণিজ্যিক বিষয়ে আবদ্ধ না থেকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। চীনের বিরল মৃত্তিকা মৌল খাতে প্রাধান্য ও দেশটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের উদ্বেগ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। অতএব, খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কৌশলগত ক্ষমতায় রূপ নেয়, তা বিশ্লেষণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি কূটনৈতিক পর্যালোচনা। আর ঠিক এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চলে আসে, বিরল এই খনিজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? বস্তুত, রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস বা বিরল মৃত্তিকা মৌল বলতে ১৭টি মৌলকে বোঝায়। নামের মাঝে ‘বিরল’ শব্দ থাকার অর্থ এই নয় যে সব মৌলই প্রকৃতিতে দুষ্প্রাপ্য। বরং অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলন, পৃথকীকরণ ও বিশুদ্ধ করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। এদের বিশেষ চৌম্বকীয়, আলোকীয় ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রযুক্তিতে অপরিহার্য করে তুলেছে। উদাহরণ হিসেবে নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়ামের কথা বলা যায়। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে এই মৌল দুটি ব্যবহৃত হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর ও বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনে এসব চুম্বকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়াম উচ্চ তাপমাত্রায় চুম্বকের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ইট্রিয়াম ব্যবহৃত হয় বিমান ইঞ্জিনের বিশেষ আবরণ ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে। অর্থাৎ এসব উপাদানের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব খনি কিংবা ধাতু শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে গাড়ি, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পেও। এবার আসি সরবরাহব্যবস্থায় চীনের প্রাধান্যের প্রশ্নে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক পরিশোধিত উৎপাদনের প্রায় ৯১ শতাংশ ছিল চীনের দখলে। একই সময়ে এসব মৌল থেকে তৈরি স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনেও দেশটির অংশ ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ চীনের প্রভাব কেবল খনিজ উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে চূড়ান্ত শিল্পপণ্য উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে লক্ষণীয়, খনিজের মজুত থাকা আর সেই খনিজকে শিল্পে ব্যবহারযোগ্য উপাদানে রূপান্তর করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। কোনো দেশের মাটিতে বিরল খনিজের মজুত থাকলেও উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল হলে সেখানে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে তোলা কঠিন। চীন দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, বৃহৎ শিল্পভিত্তি ও সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে এই সুবিধা অর্জন করেছে। এবার আসা যাক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সাতটি বিরল মৃত্তিকা মৌল ও সংশ্লিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। একই বছরের অক্টোবরে দেশটি আরও বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। তবে এপ্রিলের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং অক্টোবরে ঘোষিত বিস্তৃত ব্যবস্থাগুলোকে আলাদা করে দেখা জরুরি। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরে ঘোষিত কয়েকটি ব্যবস্থা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে ঘোষিত বিধিনিষেধ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও স্থগিত ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রপ্তানি লাইসেন্স, অনুমোদন ও সরবরাহের শর্তের মাধ্যমে কোনো দেশ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের প্রবাহে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজস্ব উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় লিপ্ত, অপরদিকে বেইজিংও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে। বস্তুত, এই টানাপোড়েনেই প্রমাণিত হয়, আধুনিক কূটনীতিতে সরবরাহের নিশ্চয়তা ও বাজারে প্রবেশাধিকার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রসঙ্গত, এখানে জাপানের উদ্বেগ ও বিকল্প সরবরাহের অনুসন্ধানের কথা উঠে আসে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে জাপানে ইট্রিয়ামের সরবরাহ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। বিকল্প উৎস বা পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে আগামী কয়েক মাসে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। ইট্রিয়াম বিমান ইঞ্জিনের বিশেষ আবরণ ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা শিক্ষা দেয়, বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই কেবল মজুত গড়ে তোলা নয়, সরবরাহের উৎস বহুমুখী করাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। যুক্তরাষ্ট্রও এই বাস্তবতা মোকাবেলায় তৎপর হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের রচেস্টারে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য চীনের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তবে নতুন কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ থেকেই দ্রুত চীনের সমপর্যায়ের সক্ষমতা অর্জিত হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য সময় প্রয়োজন। এবার আলোচনার ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন আসে, চীনের এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কৌশল থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা কী? বাংলাদেশ বর্তমানে বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক উৎপাদনের অন্যতম শক্তি নয়। তথাপি, এই প্রতিযোগিতার অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে দেশটি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। ইলেকট্রনিকস, যোগাযোগপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ভবিষ্যতের শিল্পায়নের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বাংলাদেশের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে সংকট সৃষ্টি হলে আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশের প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিনির্ভরতা বিশ্লেষণ করে বিকল্প সরবরাহকারী চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক শিল্পসহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা জরুরি। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাস্তবভিত্তিক কূটনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা। পরিশেষে, বিরল খনিজের রাজনীতি দেখাচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার লড়াই কেবল সীমান্ত, সামরিক ঘাঁটি বা জ্বালানি সম্পদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত নয়। শিল্পপ্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য উপাদানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণও রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চীনের প্রাধান্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা এবং জাপানের উদ্বেগ বিশ্ব অর্থনীতির এক মৌলিক দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ গুটিকয়েক রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে তা বাণিজ্যিক ঝুঁকির পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপের উৎসও হতে পারে। কিন্তু এর সমাধান কি কেবল একটি দেশের আধিপত্যের বদলে অন্য দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা? না, এখানে প্রয়োজন বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা, পরিবেশসম্মত উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তির বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। বিরল খনিজের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব যদি এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে বর্তমানের অস্থির প্রতিযোগিতাকে আরও স্থিতিশীল ও ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। এটি শুধু খবর পৌঁছে দেয়ার মাধ্যম নয়, বরং সমাজের চোখ, কান ও বিবেক। সাংবাদিকরা হচ্ছেন সেই সাহসী সৈনিক, যাঁরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাধরদের অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রকাশ করেন, জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকরা নানা ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা কেবল তাঁদের পেশাগত জীবনের জন্য নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের জন্যও এক ভয়াবহ হুমকি। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যেসব ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি, তাতে দেখা যাচ্ছে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হুমকি, মিথ্যা মামলা, অফিসে হামলা, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, স্থানীয় বা উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরাও আজ নিরাপদ নন। কোনো অসঙ্গতি তুলে ধরলেই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি হয়রানি শুরু হয় অথবা সামাজিকভাবে অপমানিত হতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেন। এ ধরনের নির্যাতন সাংবাদিকদের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। ফলে তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতে পারেন না এবং অনেক সময় স্ব-সেন্সরশিপ বা আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হন। এভাবে একপর্যায়ে একটি সমাজে কৃত্রিম নীরবতা সৃষ্টি হয়—যেখানে সত্য চাপা পড়ে যায়, মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা জায়গা করে নেয়। জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারায় এবং গণতন্ত্র তার স্বাভাবিক গতি হারায়। সাংবাদিক নির্যাতনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ১. ক্ষমতার অপব্যবহার : অনেক সময় রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণ করতে চান, কারণ সত্য প্রকাশ তাঁদের স্বার্থে আঘাত হানে। ২. দুর্নীতি রক্ষার প্রবণতা : প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক দুর্নীতির খবর প্রকাশ ঠেকাতে যারা দায়ী, তারাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে বা ভয় দেখায়। ৩. আইনের দুর্বল প্রয়োগ : দেশে সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য যথাযথ আইন না থাকায় বা আইনের প্রয়োগ না হওয়ায় অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় না। ফলে তারা বারবার একই অপরাধ করার সাহস পায়। ৪. সাংবাদিকদের বিভক্তি ও দুর্বল সংগঠন : অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ নয়, ফলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না। এ সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের কিছু বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। ১. সাংবাদিকদের জন্য কঠোর আইনি সুরক্ষা : সাংবাদিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি স্বাধীন ও কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। ২. দ্রুত বিচার ও শাস্তির নিশ্চয়তা : সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা কমিটি গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ৩. সরকারি ও সামাজিক সমর্থন : সাংবাদিকদের কাজকে সম্মান জানিয়ে সরকার ও সমাজের সর্বস্তরে তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। ৪. সাংবাদিক সংগঠনের শক্তিশালী ভূমিকা : জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর হতে হবে। তারা যেন প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনায় সজাগ থেকে প্রতিবাদ এবং আইনি সহায়তা দিতে পারে। ৫. সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা : স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা স্তরে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে—সাংবাদিকতা কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন তাঁদের নিরাপত্তা আমাদের সবার স্বার্থে। সাংবাদিকেরা শুধু পেশাজীবী নন, তাঁরা আমাদের সমাজের দর্পণ। তাঁদের কণ্ঠ রুদ্ধ মানেই সমাজে অন্ধকার নেমে আসা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা মানে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। আর সত্যের পরাজয় মানেই গণতন্ত্রের পরাজয়। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় আজই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের।
প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশে যদি স্পষ্টভাবে লেখা থাকে ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ বা ‘অতিরিক্ত চর্বি’—তাহলে একজন ভোক্তা পণ্য কেনার আগে কয়েক সেকেন্ডেই তাঁর পুষ্টিগত ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। এ ধারণা থেকেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর আলোচনা চলছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৬ সালের খসড়া প্রবিধানকে ঘিরে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। গত ২৬ জানুয়ারি বিএফএসএ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। এতে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ/সোডিয়াম ও সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে তা সহজে বোঝানোর জন্য সতর্কতামূলক চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। অংশীজনদের মতামত দেওয়ার শেষ সময় ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি। এরপরই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খসড়াটির পরবর্তী যাত্রাপথ। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, মতামত গ্রহণের পর খসড়াটি নিয়ে আরও কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজ হয়েছে। মার্চে খসড়াটির সমন্বিত বা ‘হারমোনাইজকৃত’ সংস্করণ নিয়ে কাজের তথ্য পাওয়া যায়। বিএফএসএ সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েবের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ৩০ জুন খসড়াটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর এর গতিপথ কতদূর এগিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কোন পর্যায়ে কী মতামত দেওয়া হয়েছে, কোন কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা এতে যুক্ত হয়েছে, অংশীজনদের আপত্তি ও প্রস্তাবের কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং খসড়ার কোন কোন ধারা পরিবর্তিত হয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে পূর্ণাঙ্গভাবে নেই। আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আবারও বলা হয়েছে, এফওপিএলের খসড়া তখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ বছরের শুরুতে আলোচনা শুরু হয়ে, মতামত গ্রহণ, সমন্বিত খসড়া তৈরি এবং মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরও প্রবিধানটি গেজেট আকারে চূড়ান্ত হয়নি। অথচ বিএফএসএর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক এফওপিএল দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এর উত্তর খুঁজতে অন্তত চারটি নথি পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ২৬ জানুয়ারির মূল খসড়া, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া অংশীজনদের মতামত, মার্চের সমন্বিত খসড়া এবং ৩০ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সংস্করণ। এসব নথি তুলনা করলে বোঝা যেতে পারে, মতামত গ্রহণের পর খসড়ায় কী পরিবর্তন এসেছে এবং কোন প্রস্তাবগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে আছে। এ ছাড়া বিএফএসএর কারিগরি কমিটির আলোচনায় শিল্পখাতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত আপত্তি, দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছামূলক বাস্তবায়নের প্রস্তাব, ছোট প্যাকেটের জন্য ছাড় এবং ডব্লিউটিও-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো খসড়ার পরবর্তী সংস্করণে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নথিপত্র ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এফওপিএলের প্রয়োজনীয়তা অবশ্য শুধু একটি প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশের অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। হৃদ্রোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে। দেশের খাদ্যবাজারেও প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপস্থিতি বাড়ছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ৯৭৪ জন অংশগ্রহণকারীর ৯৭ শতাংশ আগের সপ্তাহে অন্তত একটি প্রক্রিয়াজাত বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেছিলেন। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি খাদ্যপণ্যের ৬৩ শতাংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সোডিয়াম বেঞ্চমার্কের তুলনায় বেশি সোডিয়াম পাওয়া যায়। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে লেবেলে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষিত সোডিয়ামের মাত্রার অসঙ্গতিও পাওয়া গেছে। এই বাস্তবতায় ভোক্তার জন্য সহজবোধ্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক পণ্যে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য থাকলেও তা প্যাকেটের পেছনে, ছোট অক্ষরে অথবা সংখ্যাভিত্তিকভাবে দেওয়া হয়। ফলে একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে। এখানেই এফওপিএল ও জিডিএ—অর্থাৎ নির্দেশিকা দৈনিক পরিমাণ—পদ্ধতির পার্থক্য। জিডিএ ব্যবস্থায় ভোক্তাকে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ দৈনিক প্রয়োজনের সঙ্গে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অন্যদিকে সামনের সতর্কতামূলক চিহ্ন তুলনামূলকভাবে সরল। একটি স্পষ্ট প্রতীক দেখেই বোঝা যায় কোনো পুষ্টি উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় রয়েছে কি না। বিশেষ করে, সীমিত পুষ্টিজ্ঞানসম্পন্ন ভোক্তাদের জন্য এই সরলতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে শিল্পখাতের উদ্বেগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থা চালু করতে প্যাকেটের নকশা পরিবর্তন, নতুন মোড়ক তৈরি, পুরোনো প্যাকেটের মজুত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে জিডিএ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা এবং বাধ্যতামূলক করার আগে দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছামূলক পর্যায়ের প্রস্তাব এসেছে। সংশ্লিষ্ট আলোচনায় অন্তত পাঁচ বছর স্বেচ্ছামূলকভাবে ব্যবস্থা চালুর দাবিও উঠে এসেছে। এই পাঁচ বছরের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাস্তবায়নের জন্য যৌক্তিক প্রস্তুতির সময় কতটা প্রয়োজন, আর কতটা সময় নীতির বাধ্যতামূলক প্রয়োগ পিছিয়ে দিতে পারে। শিল্পের বাস্তব ব্যয় ও সক্ষমতার বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন; তবে একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যও যেন দুর্বল না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ছোট প্যাকেটকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। পণ্যের আকার ছোট হলেও অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বির স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে যায় না। তাই কোনো ছাড়ের প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ভোক্তার সুরক্ষা এবং বাস্তব বাজারপরিস্থিতি একসঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ডব্লিউটিও নোটিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গতিও অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বাস্তব কারিগরি বা আইনি ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রক্রিয়া যেন জনস্বাস্থ্য নীতি চূড়ান্ত করার অনির্দিষ্ট বিলম্বের কারণ না হয়, সেটিও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এফওপিএল কোনো খাদ্যপণ্য নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য ভোক্তাকে সহজবোধ্য তথ্য দেওয়া, যাতে তিনি পণ্য কেনার আগে নিজের জন্য সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই এটি ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বাস্থ্য দুইয়ের সঙ্গেই সম্পর্কিত। এখন প্রয়োজন বিতর্ককে ‘শিল্প বনাম জনস্বাস্থ্য’ এই সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিএফএসএ থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ফাইলে কী মতামত দেওয়া হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো সংস্থা কী বলেছে, শিল্পসংগঠনগুলোর লিখিত প্রস্তাবের কোন অংশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে কোন সংস্করণটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হবে। বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা যখন বাড়ছে এবং প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহারও বিস্তৃত হচ্ছে, তখন প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগত তথ্য সহজবোধ্য করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে শিল্পের যৌক্তিক বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত উদ্বেগও শুনতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা। কোনো পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা কোনো একক প্রশাসনিক জটিলতা যেন নীতির গতিপথ এককভাবে নির্ধারণ না করে, এটাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য। প্যাকেটের সামনে একটি কালো অষ্টভুজ হয়তো দেখতে ছোট একটি চিহ্ন। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন ভোক্তা কী কিনবেন, কী খাবেন এবং নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন সেই বড় প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, সেই সতর্কবার্তা শেষ পর্যন্ত প্যাকেটের সামনে জায়গা পায়, নাকি নীতিনির্ধারণের ফাইলেই আটকে থাকে। almamunrabbi21@gmail.com