Breaking news
সাহিত্যকথন কবিতা গল্প

সাহিত্যকথন

অ্যান কারসন, ছবি : দ্য ইকোনমিস্টের সৌজন্যে
২০২৬ নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের সাহিত্য : পুরাণ, আকাঙ্ক্ষা, ভাষা ও অর্থের অন্তর্গত যাত্রা

অ্যান কারসনকে শুধু কবি বললে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি অংশই ধরা পড়ে। তিনি একই সঙ্গে কবি, অনুবাদক, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের গবেষক, প্রাবন্ধিক এবং পরীক্ষামূলক লেখক। তাঁর সাহিত্য এমন এক সীমানাহীন পরিসর তৈরি করে যেখানে কবিতা, গদ্য, পুরাণ, দর্শন, অনুবাদ, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং একাডেমিক গবেষণা পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে কারসনের রচনাকে বুঝতে হলে কেবল ‘তিনি কী বলতে চেয়েছেন’ এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হয় তিনি কীভাবে অর্থ তৈরি করেন, কীভাবে অর্থকে ভেঙে দেন এবং কীভাবে পাঠককে অর্থের নির্মাণপ্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে যান।   ৮ অক্টোবর ২০২৬-এ সুইডিশ একাডেমি তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার ঘোষণা করে। পুরস্কারের সরকারি ব্যাখ্যায় তাঁর ‘সাহসী ও অভিনব সাহিত্যকর্মের’ কথা বলা হয়েছে—যে সৃষ্টিকর্ম ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে এক সৃজনশীল ও খেলাচ্ছলে সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ নির্মাণ করেছে।   কারসনের সাহিত্যজগতের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা—দূরত্ব। মানুষ যা চায়, তার সঙ্গে মানুষের একটি দূরত্ব থাকে; যে মানুষকে আমরা ভালোবাসি, সে সম্পূর্ণভাবে আমাদের অধিকারভুক্ত নয়; যে অতীতকে আমরা বুঝতে চাই, তা আমাদের কাছে কেবল ভগ্নাংশের মাধ্যমে উপস্থিত; আর যে শব্দের অর্থ আমরা ধরতে চাই, সেই অর্থও প্রসঙ্গ বদলালে পরিবর্তিত হয়। এই দূরত্বই কারসনের সাহিত্যকে চালিত করে।   ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ : আকাঙ্ক্ষার ভেতরে দূরত্ব কারসনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’-এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার প্রশ্ন। কিন্তু এটি প্রচলিত প্রেমের কবিতা নয়; বরং প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, বিশেষত স্যাফো এবং অন্যান্য ধ্রুপদি লেখার আলোকে আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি নিয়ে একটি গভীর অনুসন্ধান।   কারসনের একটি মৌলিক উপলব্ধি হলো, আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ উপস্থিতির মধ্যে জন্মায় না; আকাঙ্ক্ষার জন্য প্রয়োজন দূরত্ব। আমি যে মানুষটিকে চাই, সে আমার থেকে পৃথক। এই পৃথকতাই আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। যদি প্রিয় মানুষটি সম্পূর্ণভাবে আমার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, তাহলে আকাঙ্ক্ষার সেই টান আর থাকে না।   এ ধারণা কেবল প্রেমের ক্ষেত্রে নয়, ভাষা ও অর্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি শব্দ তার অর্থের সঙ্গে কখনো সম্পূর্ণ এক হয়ে যায় না। শব্দ ও অর্থের মধ্যে একটি ব্যবধান থাকে। পাঠক সেই ব্যবধান অতিক্রম করতে চান, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করতে পারেন না। এখানেই কারসনের সাহিত্য ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিক হয়ে ওঠে। প্রেমে যেমন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় দূরত্ব থেকে, ভাষাতেও অর্থের অনুসন্ধান তৈরি হয় শব্দ ও অর্থের মধ্যবর্তী দূরত্ব থেকে।   ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ : পুরাণের পুনর্জন্ম ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ কারসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। প্রাচীন গ্রিক কবি স্তেসিকোরাসের গেরিয়ন-পুরাণকে তিনি আধুনিক সময়ে পুনর্লিখেছেন। এখানে গেরিয়ন আর শুধু পুরাণের দানব নয়। সে একজন তরুণ, একজন প্রেমিক, একজন শিল্পীসুলভ মানুষ—যে নিজের শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও পরিচয়ের সঙ্গে লড়াই করে।   কারসনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টিশীল কৌশল হলো তিনি পুরাণকে পুনর্নির্মাণ করেন, কিন্তু পুরাণের মূল কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করেন না। ফলে পুরোনো ও নতুন দুটি পাঠ একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে। এখানে আন্তঃপাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এক অর্থে নিজের পরিচয় আবিষ্কারের কাহিনি; অন্য অর্থে এটি অন্যের চোখে নিজের পরিচয় কীভাবে নির্মিত হয়, তার কাহিনি।   ‘দ্য গ্লাস এসে’ : ব্যক্তিগত শোক ও সাহিত্যপাঠ ‘দ্য গ্লাস এসে’-তে কারসনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং এমিলি ব্রন্টির ‘ওয়াদারিং হাইটস’ একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে। এখানে একটি অসাধারণ সাহিত্যিক প্রক্রিয়া কাজ করে। একজন নারী নিজের ব্যর্থ প্রেমের দিকে তাকাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি ব্রন্টির উপন্যাস পড়ছেন। ফলে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সাহিত্যের অভিজ্ঞতা আলাদা থাকে না। তিনি যেন অন্য একটি বইয়ের ভেতর নিজের জীবনকে দেখতে পান। এখানে সাহিত্য হয়ে ওঠে একধরনের আয়না। কিন্তু আয়নাটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি দেয় না। বরং প্রতিফলনের সঙ্গে পরিবর্তনও ঘটে। ব্রন্টির চরিত্রদের প্রেমকে পড়তে পড়তে কারসনের বক্তা নিজের প্রেমকে নতুনভাবে বুঝতে শেখেন। এ কারণে ‘দ্য গ্লাস এসে’ শুধু বিচ্ছেদের কবিতা নয়। এটি প্রশ্ন করে, আমরা কি নিজের অভিজ্ঞতাকে সরাসরি জানতে পারি, নাকি অন্যের ভাষার মধ্য দিয়ে নিজেদের চিনতে হয়? প্রশ্নটি কারসনের সমগ্র সাহিত্যেই ফিরে আসে।   ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ : বিবাহ, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয় ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’-এ বিবাহ ও বিচ্ছেদকে কারসন একটি জটিল ভাষিক ও নৈতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখান। এখানে স্বামী শুধু একজন ব্যক্তি নয়; সে বক্তার আত্মপরিচয়েরও একটি অংশ। ফলে সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যায় না—একটি পরিচয়ও ভেঙে যায়।   এ গ্রন্থের আকারও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি একই সঙ্গে কবিতা, প্রবন্ধ, কাহিনি এবং নৃত্যের কাঠামো ব্যবহার করে। অর্থাৎ বিষয়বস্তুর বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে রচনার রূপের বিচ্ছিন্নতাও যুক্ত। এখানে কারসন দেখান যে ভাঙা সম্পর্ককে সব সময় একটি সরল, ধারাবাহিক কাহিনি দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। স্মৃতি যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে ফিরে আসে, তাঁর লেখার রূপও তেমন লাফিয়ে ওঠে।   ‘ডিক্রিয়েশন’ : ‘আমি’-কে ভেঙে দেয়া ‘ডিক্রিয়েশন’ কারসনের সবচেয়ে দার্শনিক গ্রন্থগুলোর একটি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘আমি’। সাধারণ আত্মজীবনী বলে, ‘আমি কে?’   কারসন তাঁর বিপরীতে প্রশ্ন করেন, ‘আমি-কে কি ভেঙে দেওয়া সম্ভব?’ এখানে সিমোন ভেইলের চিন্তার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিসত্তা সবকিছুকে নিজের চারপাশে সংগঠিত করতে চায়। কিন্তু অন্য মানুষকে সত্যিই উপলব্ধি করতে হলে কখনো কখনো নিজের কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে সরে যেতে হয়।   কারসনের ‘ডিক্রিয়েশন’ তাই আত্মবিলোপের সরল ধারণা নয়। এটি বরং আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক ও নান্দনিক অবস্থান। এ কারণেই তাঁর লেখায় ‘আমি’ কখনো স্থির নয়। ‘আমি’— একবার প্রেমিক একবার পাঠক একবার অনুবাদক একবার শোকাহত ব্যক্তি আবার একবার কেবল একটি কণ্ঠ।   ‘নক্স’ : স্মৃতির ভগ্নাংশ   ‘নক্স’ সম্ভবত কারসনের স্মৃতি ও শোকের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশগুরোর একটি। ভাইয়ের মৃত্যু তাঁকে এ কাজের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এখানে শোককে সরাসরি ধারাবাহিক গল্প হিসেবে বলা হয় না। বরং থাকে—ছবি, নোট, অনুবাদ, খণ্ডিত বাক্য, স্মৃতি, নীরবতা। এই ভাঙা কাঠামোটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শোক নিজেই ভাঙা।   মৃত মানুষকে আমরা একটি সম্পূর্ণ গল্পের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারি না। আমাদের কাছে থাকে তাঁর কিছু ছবি, কিছু কথা, কিছু স্মৃতি, কিছু অনুপস্থিতি। অতএব ‘নক্স’-এর রূপ ও বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শোকের ভাষা খণ্ডিত—তাই শোকের বইও খণ্ডিত। কারসন এখানে দেখিয়ে দেন যে সাহিত্য শুধু বিষয়কে প্রকাশ করে না; কখনা কখনো বিষয়ের প্রকৃতি নিজেই সাহিত্যিক রূপকে নির্ধারণ করে।   ‘ফ্লোট’ : বইয়ের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে ‘ফ্লোট’-এ কারসন বইকে একটি সরল, ধারাবাহিক বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেন না। বহু পৃথক ছোট রচনা একত্র হয়ে একটি গ্রন্থ তৈরি করে। এখানে পাঠের নির্দিষ্ট পথ নেই। ফলে পাঠককে লেখক সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেন না। পাঠক নিজেই একটি পথ তৈরি করেন। এটি আধুনিক পাঠতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যায়—পাঠের অর্থ শুধু লেখকের ইচ্ছায় নির্ধারিত হয় না; পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণেও অর্থ তৈরি হয়। কারসনের বই তাই শুধু পড়ার বস্তু নয়; পাঠকের জন্য একটি অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র।   অনুবাদ : পুরনো ভাষার মধ্যে নতুন জীবন কারসনের সাহিত্য বোঝার জন্য তাঁর অনুবাদকে আলাদা করে দেখা যায় না। তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি ও নাট্যকারদের অনুবাদ করেছেন। কিন্তু তাঁর অনুবাদ নিছক শব্দের প্রতিস্থাপন নয়। একটি প্রাচীন শব্দের সঙ্গে তার সময়, সংস্কৃতি এবং আবেগ জড়িয়ে থাকে। সেই শব্দকে আধুনিক ভাষায় আনলে শুধু ভাষা বদলায় না—তার সাংস্কৃতিক অবস্থানও বদলে যায়। তাই অনুবাদ একটি পুনর্সৃষ্টি। এ কারণে কারসনের কাছে অনুবাদক ও কবির কাজের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দুজনই অন্য একটি ভাষা বা পাঠের সঙ্গে সংলাপ করেন।   রূপ ও অর্থ : কারসনের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা কারসনের সাহিত্য নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। রূপ কি অর্থের বাহন, নাকি রূপ নিজেই অর্থ তৈরি করে? কারসনের রচনায় দ্বিতীয় উত্তরটি বেশি কার্যকর। খণ্ডিত বাক্য কেবল খণ্ডিত বাক্য নয়—তা ভাঙনের অনুভূতি তৈরি করে। শূন্যস্থান কেবল ফাঁকা জায়গা নয়—তা অনুপস্থিতিকে দৃশ্যমান করে। অনুবাদ কেবল ভাষান্তর নয়—তা দুই সময়ের দূরত্বকে প্রকাশ করে। পুরাণের পুনর্লিখন কেবল পুরোনো গল্পের নতুন সংস্করণ নয়—তা অতীত ও বর্তমানের সম্পর্ককে প্রশ্ন করে। অতএব কারসনের কাছে রূপ ও অর্থকে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায় না। রূপ অর্থকে ধারণ করে না শুধু; রূপ অর্থের জন্ম দেয়। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়—অর্থ কখনো সম্পূর্ণ স্থির নয়। পরিচয় কখনো সম্পূর্ণ একক নয়। স্মৃতি কখনো সম্পূর্ণ নয়। অনুবাদ কখনো সম্পূর্ণ সমাপ্ত নয়। আর সাহিত্যও কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়। এ কারণেই অ্যান কারসনের সাহিত্যকে শুধু কবিতা হিসেবে পড়লে তার একটি অংশ বোঝা যায়। তাঁকে পড়তে হয় একই সঙ্গে কবি, অনুবাদক, ধ্রুপদি গবেষক, দার্শনিক চিন্তক এবং পরীক্ষামূলক লেখক হিসেবে।   কারসনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—তিনি আমাদের কোনো একটি অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন না। বরং তিনি আমাদের এমন একটি অবস্থায় নিয়ে যান, যেখানে আমরা নিজেরাই প্রশ্ন করতে বাধ্য হই : একটি শব্দের অর্থ কোথায় শেষ হয়? একটি স্মৃতি কোথায় শুরু হয়? একটি পুরাণ কখন বর্তমান হয়ে ওঠে? আর একটি ‘আমি’ কতটা সত্যিই ‘আমি’?   এ প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। আর সম্ভবত সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই অ্যান কারসনের সাহিত্যের সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য নিহিত।  

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী অক্টোবর ১৩, ২০২৬ 0
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উপমহাদেশের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার : ইতিহাস, যুক্তিবোধ ও মূল্যায়নের দায়

ইদানীং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সরগরম রাজনৈতিক পাড়া থেকে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, যা কেবল একজন সাহিত্যিকের মূল্যায়নের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। কারণ, এ ধরনের আলোচনা, বিশ্লেষণ ও বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ইতিহাসবোধ, ধর্মীয় আবেগ, জাতীয়তাবাদ ও সমকালীন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক কিছুই। তাই বিষয়টিকে নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের জায়গা থেকে দেখাটা সঠিক নয় বলেই মনে করি। এমন বিষয়গুলোর গভীরে পৌঁছাতে গেলে প্রয়োজন ইতিহাসের প্রামাণ্য পাঠ, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং ভিন্নমতকে বোঝার মানসিকতা। আমার কাছে এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, আমরা সাহিত্যিককে তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের আলোকে বিচার করতে চাই, নাকি পূর্বনির্ধারিত পরিচয়ের ছাঁচে ফেলে তাঁর মূল্যায়ন করতে আগ্রহী? নিজেদের অবস্থান থেকে প্রথম এই জায়গায় চিন্তা স্পষ্ট করা জরুরি। আমি সাহিত্যপ্রেমী। তাই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনেরই অনুরাগী। কারণ, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ যদি সূর্য হিসেবে আবির্ভূত হন, নজরুল তাঁর সমার্থক প্রভাকর। এঁদের সৃষ্টি ব্যতিরেকে বাংলা সাহিত্যচর্চা অসম্পূর্ণ, অর্থহীন। তবে সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের ব্যাপ্তি এ দুই কবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপমহাদেশের অসংখ্য কবি, লেখক ও সাহিত্যিকের সৃষ্টি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যবিচরণের কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি হয় না। সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল তাঁদের সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে দুই বাংলাকে একসূত্রে গেঁথেছেন। তাঁদের সৃষ্টির আবেদন ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে স্পর্শ করেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই অভিন্ন উত্তরাধিকারকে কেবল ধর্মীয় কিংবা জাতীয় পরিচয়ের নিরিখে বিচার করলে তার ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য সংকুচিত করা হয়। সাহিত্য মানুষকে নিয়ে কথা বলে। আর মানুষের বিচরণ বহুমাত্রিক ধারায়। একই মানুষ সময়ের আবর্তে নানান ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাই তাঁর কাজ বা মানসিকতার মূল্যায়ন করতে সেই সময়কার প্রেক্ষাপট বিবেচনা ও অনুসন্ধান জরুরি। আর এখানেই গবেষণাকাজের প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়। মানুষের আবেগ, অনুরাগ, বিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সাহিত্যিকও তাঁর সময়, সমাজ ও পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নন। তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিতে সময়ের প্রভাব থাকবে, ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটবে, এমনকি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পাবে। অতএব, কোনো সাহিত্যিককে প্রশ্নাতীত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি তাঁর জীবনের একটি বিসংবাদিত দিকের ভিত্তিতে সমগ্র সাহিত্যকর্ম বাতিল করে দেওয়াও ন্যায়সংগত নয়। হোক রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা অন্য কেউ, কারও সৃষ্টিকেই কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের বলয়ে বন্দী করে পর্যালোচনা করাটা আমার বিবেচনায় যুক্তিনির্ভর সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চার পরিপন্থী। কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য বা ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবশ্যই যায়। কিন্তু তার উত্তর খুঁজতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি, প্রচলিত জনশ্রুতি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল প্রচারিত কোনো দাবিকে যাচাই ছাড়াই ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা অনুচিত। রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কি না, সম্প্রতি সেই পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর বাসসের এক প্রতিবেদনে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানের বরাতে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর আগেও ২০১৮ সালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ ধরনের দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এ থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কোনো দাবি বারবার উচ্চারিত হলেই তা ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত হয় না। মূল দলিল, সমকালীন সংবাদপত্র, চিঠিপত্র, নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও ঘটনার প্রেক্ষাপট যাচাই করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। একই দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ উপমহাদেশের সব সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইতিহাসের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, প্রমাণই হওয়া উচিত মূল্যায়নের ভিত্তি। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ আর কবি রবীন্দ্রনাথ এক নয়। একইভাবে পৃথিবীর কোনো সাহিত্যিকই তাঁর কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে এক সুতোয় গাঁথতে পারেননি। কেননা, তা মানববৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। তাঁদের ব্যক্তিজীবন, সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক চিন্তা ও সাহিত্যকর্মের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও আছে। সাহিত্যিকদের জীবন ও সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান জরুরি, তবে কোনো একটি পরিচয় দিয়ে তাঁদের সমগ্র সত্তাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, সমাজভাবনা ও জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সমালোচনামূলক পাঠের সাথে নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শোষণবিরোধী অবস্থানের গভীর বিশ্লেষণ যেমন প্রয়োজন; একইভাবে উপমহাদেশের অন্যান্য সাহিত্যিকের চিন্তা, সৃষ্টি ও ব্যক্তিজীবনের জটিলতা নিয়েও গবেষণা আবশ্যক। আমরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ অনেক সাহিত্যিকের সাহিত্য ধারণ করেছি সেই সময় থেকে, যখন সাহিত্য বুঝতে শিখেছি। তাঁদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান ও অন্যান্য সৃষ্টি আমাদের সাংস্কৃতিক বোধের অংশ হয়ে উঠেছে বহু আগেই। তাঁদের সাহিত্যকে ভালোবাসার অর্থ, তাঁদের প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। আবার তাঁদের কোনো বক্তব্যের সমালোচনা করার অর্থও তাঁদের সৃষ্টির সামগ্রিক মূল্য অস্বীকার করা নয়। সাহিত্যপাঠের সৌন্দর্য এখানেই, পাঠক সৃষ্টির সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করবেন, প্রশ্ন করবেন, দ্বিমত পোষণ করবেন এবং নিজের উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করবেন। রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন জাতীয়তাবাদের ছিলেন বলে তাঁর সাহিত্য বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ হতে পারবে না, এমন যুক্তি অগ্রহণযোগ্য। আবার তাঁর সাহিত্যকে গ্রহণ করা মানেই নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়। কোনো সাহিত্যিক পরিচয়কে একটি গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করা হলো তাঁর সৃষ্টির বহুমাত্রিকতাকে অস্বীকার করা। সাহিত্যিক উত্তরাধিকার কোনো একক পরিচয়ের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। পাঠকসমাজের পাঠ, অনুরাগ ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা ক্রমাগত নতুন অর্থ লাভ করে। বাংলার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কেরও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এশিয়ান স্টাডিজে প্রকাশিত গবেষণায় পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচারে বিধিনিষেধ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশের পরিচয় নির্মাণে রবীন্দ্রসংগীতের ভূমিকা বিশ্লেষিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ অনুচ্ছেদেও ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম দশ চরণকে জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরে। তবে তাঁর সাহিত্যকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, তাঁর জীবন ও চিন্তার সমালোচনা করা যাবে না। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝেই তাঁর অবদান ও সীমাবদ্ধতা বিচার করা প্রয়োজন। বর্তমান বিতর্কে তাই দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। একটি হলো সাহিত্যিকের চিন্তা ও কর্মের সমালোচনা, অন্যটি হলো তাঁকে ঘিরে বিদ্বেষমূলক মনোভাব তৈরি করা। প্রথমটি সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ। তবে দ্বিতীয়টি ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিকে সংকীর্ণ করতে পারে। কোনো বক্তব্যের বিরোধিতা করতে তার বিপরীতে তথ্য ও যুক্তি হাজির করা প্রয়োজন। যা নতুন গবেষণার ভিত্তিতে পুরোনো ধারণা সংশোধন করতে সক্ষম। কিন্তু প্রতিকৃতি বিকৃত করা কিংবা পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো কোনো ঐতিহাসিক প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। আমার উদ্দেশ্য বিভেদ তৈরি করা নয়। সচেতনতা সৃষ্টি করা। রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা হোক, অন্যদেরও হোক। আর এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ জন্মের আগে আমরা অবিভক্ত ভারত থেকে পাকিস্তান আমল পার করে এই পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি। সুতরাং, আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আবহে মিশ্র ঐতিহ্য থাকবে, এটাই শাশ্বত। আমাদের ভূখণ্ডে কেবল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল নন, বরং উপমহাদেশের বর্ণিল সাহিত্যাঙ্গনের বহু কবি, লেখক ও সাহিত্যিকের কর্মকাণ্ড জড়িয়ে আছে, যা আমাদের প্রভাবিত করছে। এই প্রভাবের অর্থ যদি আমাদের একপাক্ষিক করে তোলে তবে তা হতাশাজনক। বরং এমন নানান চিন্তা-চেতনার আলোকপাতে সেকাল থেকে একালের পর্যায়ক্রমিক গবেষণা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা এক উদার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অংশ হতে পারি, যা জাতিগতভাবে আমাদের সমৃদ্ধ করবে। ভুললে চলবে না, সাহিত্য মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে, বিচ্ছিন্ন নয়। তাই প্রত্যেক সৃজনশীল মানুষের চিন্তার তুলনামূলক পাঠ হোক, তাঁদের সাহিত্য ও ব্যক্তিজীবনের জটিলতা নিয়ে গবেষণা হোক। কিন্তু আলোচনা যেন পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাস থেকে সুবিধামতো তথ্য বেছে নেয়ার অনুশীলনে পরিণত না হয়। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে নয়, মুক্ত ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার মধ্য দিয়েই আমাদের সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে। মুদ্রার যেমন দুটি পিঠ থাকে, ইতিহাসেও তেমনি আলো ও অন্ধকারের অধ্যায় রয়েছে। কেবল একটি দিকের ওপর আলোকপাত করে সমগ্র ইতিহাসের উপসংহার টানা অসম্ভব। ইতিবাচক দিকের স্বীকৃতির পাশাপাশি সমালোচনাও হোক, তবে তা হতে হবে তথ্যনির্ভর, প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিসংগত। ইতিহাসকে বুঝতে হলে তার বহুমাত্রিকতা স্বীকার করতে হবে, প্রমাণের মুখোমুখি হতে হবে এবং প্রয়োজনে নিজের পূর্বধারণাকেও প্রশ্ন করার মানসিকতা রাখতে হবে। কাউকে ছোট করে ইতিহাস বদলানো যায় না। ইতিহাসকে বুঝতে হলে আবেগের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক সততা প্রয়োজন। ব্যক্তি-অনুরাগ কিংবা ব্যক্তি-বিদ্বেষ কোনোটিই যেন প্রমাণের জায়গা দখল না করে। সাহিত্যিককে দেবতা বানানো যেমন সাহিত্যচর্চা নয়, তেমনি তাঁকে শত্রু বানানোও ইতিহাসচর্চা নয়। পরিশেষে বলব, সুন্দরের চর্চা হোক, সত্য উন্মোচিত হোক সুন্দরভাবে। বিভেদ নয়, সচেতনতা। বিদ্বেষ নয়, যুক্তি। অন্ধ অনুরাগ কিংবা অন্ধ বিরোধিতা নয়, ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ পাঠ হোক আমাদের প্রত্যাশা।  

সোনিয়া তাসনিম সোনিয়া তাসনিম অক্টোবর ১৪, ২০২৬ 0
সিগমুন্ড ফ্রয়েডের চিন্তাজগৎ : স্বপ্নই কি অচেতন মনের ভাষা

 আপনি কি কখনো এমন স্বপ্ন দেখেছেন—পরীক্ষা দিচ্ছেন, প্রাণপনে চেষ্টা করেও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না, সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিংবা কোথাও পৌঁছাতে দৌড় দেয়ার চেষ্টা করছেন, অথচ পা এগোচ্ছে না। আবার কখনো হঠাৎ পড়ে যাওয়ার অনুভূতিতে ঘুম ভেঙে যায়? এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রায় সবার কাছেই পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো কি নিছক কাকতালীয়? নাকি মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো বার্তা? ঠিক একই প্রশ্ন প্রায় শত বছর আগেও ভাবিয়েছিল এক মহান মনস্তাত্ত্বিককে।   মানুষ জেগে থাকে বাস্তবে। ঘুমের মধ্যে প্রবেশ করে নিজের অচেনা জগতে। এই অদ্ভুত জগতের অর্থ খুঁজে বের করতে যিনি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে মানুষের মনের গভীরে চিন্তার আলো ফেলেন, তিনি অস্ট্রিয়ান নিউরোলজিস্ট, আধুনিক মনঃসমীক্ষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯)। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো মানুষের মনের অচেতন স্তর (Unconscious)-এর ধারণা। ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মন কেবল সচেতন চিন্তায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর নিচে রয়েছে এক বিশাল অচেতন স্তর, যেখানে জমা থাকে চাপা আকাঙ্ক্ষা (Suppressed Desire), ভয়, অপরাধবোধ ও শৈশবের স্মৃতি, যা মানুষের ব্যক্তিত্বে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফ্রয়েড এই মানসিক কাঠামোকে ব্যাখ্যা করেন তিনটি স্তরে— সচেতন মন (Conscious Mind) : এটি হলো মনের সেই স্তর, যা দিয়ে আমরা এই মুহূর্তে ভাবি, দেখি ও সিদ্ধান্ত নিই। আপনি এখন এই লেখাটি পড়ছেন, তা বোঝার কাজ করছে সচেতন মন।   অবচেতন মন (Preconscious Mind) : মনের এই স্তরটি হলো স্মৃতি বা তথ্যের ভাণ্ডার। যেসব তথ্য এখন মনে নেই কিন্তু প্রয়োজন হলে সহজেই মনে করা যায়। যেমন : আপনার ফোন নম্বর কিংবা ছোটবেলার কোনো ঘটনা, যা একটু চিন্তা করলেই আপনি সহজেই মনে করতে পারেন।   অচেতন মন (Unconscious Mind) : অচেতন স্তরটি হলো মনের সবচেয়ে গভীর স্তর। এখানে থাকে চাপা আকাঙ্ক্ষা, ভয়, ট্রমা ও আবেগ। এগুলো আমরা সচেতন মনে ভাবতে চাই না কিংবা সামাজিক অথবা নৈতিক কারণে চেপে রাখি বা ভুলে থাকতে চাই। চেপে রাখতে রাখতে এগুলো একটা সময় মনের অচেতন স্তরে এসে জমা হয়। ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্ন কিংবা রেগে অথবা ভুল করে কোনো কথা বলা বা মনের অজান্তেই বিভিন্ন আচরণের মাধ্যমে এই অচেতন মনে চেপে থাকা অনুভূতিগুলো প্রতীকীভাবে প্রকাশ পায়।   স্বপ্ন, অচেতন মন এবং চাপা আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতির মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে ফ্রয়েড মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেন। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত The Interpretation of Dreams গ্রন্থে ফ্রয়েড জোর দিয়ে বলেন, স্বপ্ন এলোমেলো কিংবা অর্থহীন নয়। তাঁর মতে, স্বপ্ন হলো অচেতন মনের এমন এক ভাষা, যা নিজেকে প্রতীক আর রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করে। দিনের বেলায় সামাজিক নিয়ম, নৈতিকতা কিংবা ভয় মানুষের অনেক ইচ্ছা ও অনুভূতিকে দমন করে রাখে। কিন্তু ঘুমের সময়ে সচেতন মন যখন শিথিল হয়ে পড়ে, তখন সেই চাপা ইচ্ছা ও অনুভূতিগুলো স্বপ্নের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়। ফ্রয়েড স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করেন মূলত দুই স্তরে— ম্যানিফেস্ট কনটেন্ট : স্বপ্নে যা সরাসরি দেখা হয়। ল্যাটেন্ট কনটেন্ট : স্বপ্নের আড়ালে থাকা গোপন অর্থ।   ফ্রয়েড আরও বলেন, অচেতন মনে চেপে থাকা ইচ্ছা ও অনুভূতিগুলো সরাসরি প্রকাশ হয় না। তাই স্বপ্নে ঘটে ডিসপ্লেসমেন্ট (এক অনুভূতি অন্য কিছুর ওপর চাপানো) এবং কনডেনসেশন (একাধিক ভাব এক প্রতীকে মিলিয়ে যাওয়া)। ফলে স্বপ্ন অনেক সময় অস্পষ্ট, অদ্ভুত বা অযৌক্তিক মনে হয়। যেমন : স্বপ্নে পরীক্ষার হলে বসে প্রশ্ন ভুলে যাওয়া মানে কেবল ভুলে যাওয়া নয়, বরং বাস্তব জীবনের চাপ, ব্যর্থতার ভয় বা আত্মবিশ্বাসের সংকটের প্রতীক হতে পারে। আবার দৌড়েও এগোতে না পারা নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতির প্রতিফলন হতে পারে। এ কারণেই ফ্রয়েডের কাছে স্বপ্ন বর্তমান মানসিক অবস্থার আয়না। মানুষ জেগে থাকা অবস্থায় যা অস্বীকার করে, স্বপ্নের ভেতর সেটিই প্রতীকীরূপে ফিরে আসে, এমনটাই ছিল ফ্রয়েডের দৃঢ় বিশ্বাস।   স্বপ্ন বিশ্লেষণ থেকেই সিগমুন্ড ফ্রয়েড ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন তাঁর বিখ্যাত চিকিৎসা পদ্ধতি—মনঃসমীক্ষণ (Psychoanalysis)। এ পদ্ধতির মূল ধারণা ছিল, মানুষের মানসিক সমস্যার শেকড় মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে। তাই চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি বা অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের বদলে ফ্রয়েড গুরুত্ব দেন রোগীর সাথে মুক্ত আলোচনার (Free Association) ওপর। রোগীকে উৎসাহ দেয়া হতো তার স্বপ্ন, অবচেতন চিন্তা, ভয়, কল্পনা ও শৈশবের অভিজ্ঞতা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতে।   ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন, অচেতন মনের চাপা অনুভূতিগুলো যখন ভাষায় রূপান্তর হয়, তখনই মানসিক যন্ত্রণার তীব্রতা হ্রাস পায়। এ প্রক্রিয়াকে তিনি বলেন ক্যাথারসিস (Cathersis) বা আবেগের মুক্তি। রোগী যখন নিজের অজানা ভয় ও স্মৃতির মুখোমুখি হয়, তখনই আরোগ্যের পথ খুলে যায়।   মুক্ত আলোচনার ওপর নির্ভরশীল এ চিকিৎসা পদ্ধতিই পরবর্তী সময়ে পরিচিত হয় ‘টকিং কিউর’ (Talking Cure) নামে। আধুনিক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে রোগী ও থেরাপিস্টের মুক্ত আলোচনা বা অবাধ ভাবানুষঙ্গ, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং অচেতন চিন্তার বিশ্লেষণ চিকিৎসার কেন্দ্রীয় উপাদান।   ফ্রয়েডের চিন্তাজগৎ শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাহিত্য, শিল্প, চলচ্চিত্র ও দর্শন; সব জায়গাতেই তাঁর প্রভাব স্পষ্ট। একজন লেখক যখন চরিত্রের অজানা ভয় তুলে ধরেন কিংবা একজন পরিচালক যখন একটি স্বপ্নকে গল্পের কেন্দ্র করেন, সেখানেও ফ্রয়েডের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়।   স্বপ্ন, আলোচনা আর নীরবতার ভেতর দিয়ে মানুষের মনের যে জটিল পথচলা, সিগমুন্ড ফ্রয়েড সেই পথে প্রথম আলো জ্বালিয়েছিলেন। তাঁর তত্ত্ব হয়তো সময়ের সঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়েছে, বদলেছে ব্যাখ্যার ভাষা; তবু মানুষের আচরণ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও চাপা অনুভূতির দিকে তাকানোর যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও অমূল্য। স্বপ্নকে তিনি মানসিক অবস্থার আয়না হিসেবে দেখতে শিখিয়েছেন। তাই ফ্রয়েডকে বোঝা মানে কেবল একজন মনস্তাত্ত্বিককে জানা নয় বরং নিজের অচেনা মনোজগতের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। আর এই আত্মঅনুসন্ধানের যাত্রায়, স্বপ্ন থেকে অচেতন পর্যন্ত, ফ্রয়েড এখনো আমাদের সহযাত্রী।  

ইশতিয়াক ফরাজী ইশতিয়াক ফরাজী অক্টোবর ১৪, ২০২৬ 0
একবিংশ শতাব্দীর প্রুফ্রক

‘The Love Song of J. Alfred Prufrock’ টি এস ইলিয়ট রচিত একটি জনপ্রিয় কবিতা। কবিতায় কবি আধুনিক সমাজকে চিত্রিত করেছেন বিভিন্ন চিত্রকল্প ব্যবহার করে এবং দেখিয়েছেন মানুষের আশপাশের পরিবেশ কীভাবে তাদের প্রভাবিত করে। এ কবিতায় প্রুফ্রক চরিত্রকে ব্যবহার করে কবি দেখিয়েছেন, সমাজ কীভাবে মানুষের আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, যা বর্তমান যুবসমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।   প্রুফ্রক ভয় পায় তার নিজের সিদ্ধান্ত সবাইকে বলতে; সে ভাবে মানুষ তাকে বিচার করবে। কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিক সমাজে বাস করেও প্রুফ্রক নিজের মধ্যে একাকিত্ব অনুভব করে এবং সমাজের মানুষের আচার-আচরণ কীভাবে তাকে তুচ্ছ অনুভব করায়।   ঠিক তেমনি আমাদের সমাজের যুবকেরা হতাশায় নিমজ্জিত। তারা তাদের ভাবনা সমাজের কাছে উপস্থাপন করার আগে মনে করে, সমাজ তাদের ভুল বুঝবে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষের নিখুঁত জীবনযাপন তাদের তুচ্ছ অনুভব করায়। তারা নিজের জীবনের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের জীবনের তুলনা করে। সমাজের ভয়ে তারা অনেক সময় মুখ বুজে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত ফলোয়ার থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের মধ্যে একাকিত্ব অনুভব করে। ভুল করার ভয়ে তারা নতুন কিছু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে না, এমনকি নিজে কী চায় সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে পায় না। এসব ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা ঠিকই আছে; তবে সমাজ কোনো এক পর্যায়ে এই সকল দ্বিধা আরও তীব্র করে তোলে।   মানুষের আচার-আচরণ অনেকাংশেই সমাজ দ্বারা প্রভাবিত। সমাজে মানুষ নিজের ভুলের থেকে অন্যের ভুল ধরায় বেশি ব্যস্ত। ফলে যুবকেরা যখন নিজে কিছু চেষ্টা করে এবং ভুল করে, তারা নিজেদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অথচ যে সমাজের কাজ ছিল তাদের উৎসাহিত করা, তারা তাদের ভুল ধরে এবং মনোবল নষ্ট করে। ভুল ধরা খারাপ কিছু নয়; বরং ভুল ধরে তাদের সব পরিশ্রমকে তুচ্ছ এবং তাদের অযোগ্য ঘোষণা করাই একটি অপরাধ।   একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়, তখন সমাজের নানান কটু কথার শিকার তাকে হতে হয়। এর ফলে ক্রমেই তারা নিজেদের আত্মবিশ্বাস হারায় এবং ভাবে, পৃথিবীতে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। এই বিচারপ্রবণ সমাজ থেকে তারা বহুদূর চলে যেতে চায়। যেমন প্রুফ্রক নিজেকে সমুদ্রের জগতে কল্পনা করেছিল, যেখানে সে বাস্তব সমাজের বিচার ও প্রত্যাশা থেকে দূরে থাকতে পারে। নিজের জীবনের নায়ক হতে গিয়ে তারা সমাজের মানুষের চোখে গ্রহণযোগ্য একটি চরিত্র হতে চায়। ফলে বাস্তব জগৎ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন অনুভব করে।   ক্রমাগত তুলনা, প্রত্যাশা ও প্রতিযোগিতার ফলে সমাজে যেন প্রুফ্রক-সুলভ আত্মসংশয়ের বিস্তার না ঘটে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। কোনো ভুলের জন্য একটি মানুষের সব পরিশ্রমকে মূল্যহীন করা যাবে না; বরং একে অপরের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তবেই যুবকেরা নিজেদের বারবার প্রশ্ন করবে না— Do I dare Disturb the universe?   তারা নিজেদের ভুল, ভয়, অসম্পূর্ণতা নিয়েও বলবে— Yes, I dare.    

তামিম নূরানী প্রেমা তামিম নূরানী প্রেমা অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0
ভোরবেলার মায়াবিনী

নিদ্রাহীন রাতের ভার মাঝে মাঝেই আমাকে ভোরের নিঃশব্দ আহ্বানে টেনে নেয় লেকের পাড়ে। রাত জাগা ছিল আমার অবসর। তবু ভোরের নির্মল হাওয়া, গুরুজনদের বাচ্য, হাজার টাকার দাওয়া! লেকের ধারে নিঃশব্দ হেঁটে চলা, সেও তো আমার প্রাপ্য।   তন্দ্রা পেরিয়েও প্রত্যুষের শান্তি আমি কি একটু নিতে পারি না? উত্তর পেয়েছি, পারি। তাই চরণ ফেলি লেকের উদ্দেশে। আর সে, তাকে প্রথম দেখি এক ভোরে।   লেকের পাশে নির্জন রাস্তায় ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছিল। চোখে ঘুমের চিহ্ন ছিল না, আমার মতোই। তবে সে নিশাচর নয়। মনে হচ্ছিল না, সে নিয়মিত জাগরণে অভ্যস্ত একজন। তার চোখে আমি যা দেখছিলাম, তা ভয়, আকুতি, অভিজ্ঞতা।   আমি সচরাচর অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কথা বলি, বেশিই বলি। তবে যদি বন্ধুত্ব জন্ম নেয়, এটিই ব্যতিক্রম। কিন্তু নারীদের বেলায় সে ব্যতিক্রমও ব্যতিক্রমী, সামান্য বন্ধুত্বে যেটি সম্ভব নয়।   সেদিন কেন জানি মনে হয়েছিল, কিছু ভেঙেছে নিজের মাথার ওপর। নিদ্রাহীনতায় নয়, বোধে। তাই অজান্তেই কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রোজ হাঁটেন? সে মাথা নাড়াল। হ্যাঁ কি না, বুঝে উঠতে পারিনি। আমি যে সত্যিই বুঝিনি, সেটা সে বুঝতে পেরেছিল। একরাশ নীরবতা তার মুখাবয়বে। নীরবতা চিরে হঠাৎ বেরিয়ে এল একটি বাক্য, “ওরা আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল।”   সকালবেলার ধোঁয়াটে আলো আর নিঃশব্দ হাওয়ার ভেতর একটি মলিন মুখ উচ্চারণ করল এক অতলস্পর্শী বাক্য, যা মুহূর্তে নাড়িয়ে দিল আমার ভেতর। তখনই বুঝলাম, সে কেবল আর পাঁচজনের মতো নয়, সত্যিই অনন্য।   আমি কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। বললাম, কীসের থামিয়ে দেয়া? কে থামিয়ে দিল? কীভাবে থামিয়ে দিল? সে বলল, “অনিচ্ছাতে।”   আমি আইন পড়ি। তাই ‘অনিচ্ছা’ শব্দটি অন্তত বোধ হয় কিছুটা ভিন্নভাবে বুঝি। আইনের পরিভাষা নয়, বরং আমার ফিলোসফি এটিই বলে, যেখানে ইচ্ছা থাকে বাদিনীর, সেখানে অনিচ্ছা জন্ম দেয় প্রতিরোধের, প্রতিকারের দাবিতে।   যার চোখে আমি দেখছিলাম একরাশ ঘন অন্ধকার। যেন সে নিজের শরীর ছেড়ে বহুদূরের কোনো শূন্যতায় বাস করে। সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত সকালে এখানে! রাতের অন্ধকারের ভাব কাটেনি ঠিকমতো। আপনার ভয় করে না?   সে মাটির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “ভয় নয়। আমার মনে হচ্ছে, আমি লজ্জা নিয়ে জন্মাইনি। তবু এই সমাজ আমাকে লজ্জা শিখিয়েছে, স্বাভাবিকভাবে নয়, ভিন্নতায়। আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।   কিছু বলার ছিল না, কিছু বোঝার ভাষা ছিল না। কিন্তু আমার চোখ যে তাকে সাহস দিচ্ছিল, সেটি সে বুঝেছে। সে বলতে থাকে, “কাল রাত নামছিল। আমি ফিরছিলাম। তিনজন... পরিচিত মুখ, চেনা হাসি, বিকৃত রসনা। তারপরের অংশ মনে রাখতে চাই না। আর তারা বলেছিল, কাউকে বলবি না। কেউ বিশ্বাস করবে না তোকে।”   আমি বুঝেছিলাম, সে শিকার হয়েছে। জানোয়াররা শিকার করে বেঁচে থাকার জন্য, আর মানুষ নামের জানোয়াররা শিকার করে কাউকে ভেঙে দেয়ার জন্য। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মায়াবিনী। অথচ সমাজের চোখে সে এখন আর ‘মানুষ’ নেই। শোনা মাত্র হয়ে যাবে এটি একটা ঘটনা, একটা খবর, একটা গল্প। সেই গল্পে আসবে মেয়েটির দোষ।   সে লজ্জা শেখেনি। ছেলেদের স্পৃহা কি স্বাভাবিক নয়? এই তো নিয়ম। যখন মেয়েটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল, চোখে, মুখে, মনে, ঠিক তখনই কয়েকজন ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে তাদের কৌতূহল, কথায় দায়িত্বের ছায়া, অথচ ভেতরে অন্য কিছু। এই জায়গায় কী করছেন? ওনাকে চিনেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?   প্রথমে মনে হলো, ওরা বুঝি সাহায্য করতে এসেছে। কিন্তু না। সাহায্যের আড়ালে ছিল স্পষ্ট এক হিসাব। তাদের চোখ বলছিল, “এই মেয়ের মুখ মলিনতার ভারে আচ্ছন্ন। ভালো সুযোগ। এখন কিছু দিলে আমরা পাই, নাহয় কিছু বানিয়ে বলি, ভয় দেখাই।”   এমনই হয় আজকাল। একটা মেয়ের মলিনতা শুকায়নি, আর কিছু মুখ হাসি লুকিয়ে ভাবছে, কীভাবে মুনাফা করা যায়?   কেউ মুনাফা তো চায়, কিন্তু শরীরের মুনাফা কোন হিসাব? যেটিও হয় মাঝেমধ্যে। আবার কেউ শুধু ক্ষমতার অনুভূতি নিয়ে বাঁচে, এমন অনুভূতি যে, পুরো আলোকশূন্য। এ এক অদ্ভুত সময়ের মুখোমুখি আমরা। যেখানে যুবসমাজের বড় একটি অংশ ক্ষমতা বলতে বোঝে ভয়কে পুঁজি করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। পাশে কেউ দুর্বল থাকলে হয়ে ওঠে ঠিক সুযোগের সমানুপাতিক সমীকরণ। আর কোনো মেয়ে একা থাকলে তাদের মানসিকতায় হঠাৎ বদল ঘটে। ভদ্র মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে হিংস্র চোখ, বিকৃত হাসি, আর বিকল বিবেক।   এ কেমন ক্ষমতা? যা সৃষ্টির নয়, বরং চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়ার। যা বাঁচাতে নয়, শাসাতে চায়। যেখানে প্রভাব মানেই আরেকজনকে ভয় পাইয়ে রাখা। সে ভালো হোক, মন্দ হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। দরকার কেবল একপাক্ষিক শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি।   এই প্রজন্মের একাংশ যেন ভুলে যেতে বসেছে, মানুষের মাঝে শ্রদ্ধা জন্মায় সমবেদনায়, শোষণে নয়। তবু তারা চায়, তাদের কালোতে অন্যরা অন্ধ থাকুক, আলোতে নয়। এই ছেলেরাই একসময় রূপ নেয় সম্মতিহীনতার শিকারি হিসেবে।   শুরুটা হয় নীরব চাহনিতে, অনুমতির অনুপস্থিতি উপেক্ষা করে এগিয়ে যায় স্পর্শে। তারপর ধীরে ধীরে তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে অসম্মতির খেলায়। কখনো মুখোশ পরে আসে সহানুভূতির নামে। আসে ‘ভ্রাতৃত্ব’ হয়ে, তার পরই খোঁজে ফাঁকফোকর, একটি মুহূর্ত, যেখানে মেয়ে একা, প্রতিবাদ দুর্বল, অথবা সমাজ নীরব।   এই আলোকবর্জিত প্রাণীরা দূর কোনো অরণ্যের নেকড়ে নয়। তারা আমাদের চেনা ভিড়েই মিশে থাকে। মানুষের আড়ালে, চায়ের কাপে কিংবা ঠোঁট ছোঁয়ায়।   এসব ভাবছি, আর মেয়েটির মুখের দিকে তাকাচ্ছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ আমার মনের সঙ্গে কথা বলছে। যেন বলছে, সে বিচার চায় না, সে বদল চায়। কামনার দস্যুদের শাস্তি হোক, হোক আইনরক্ষার কঠোর প্রয়োগ। তবু তা যথেষ্ট নয়, যদি এই সমাজের মনোবৃত্তিই অপরিবর্তিত থাকে।   তার চোখে আমি খুঁজে পাইনি প্রতিশোধের আগুন। বরং ছিল এক ক্লান্ত যন্ত্রণার রেশ। যা আত্মচিৎকার করে বলছে, ‘বিচার নয়, আগে বদলাও মানুষগুলোকে। কারণ ধ্বংসের আগেও জন্ম নেয় অপচেতনা।’   আমি বুঝলাম, এই অপরাধের গোড়ায় কেবল একেকজন ধর্ষক নয়, আছে একটি প্রজন্ম, যা শেখেনি সম্মতি, শিখেছে শুধু দখল। যাদের নৈতিকতা তৈরি হয়ে ওঠেনি ভালোবাসায়, বরং গেঁথে গেছে ক্ষমতার বিকৃত বোধে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, বিচার আদালতের বিষয়। কিন্তু পরিবর্তন? তা আমাদের ঘরে। যার জন্ম রক্তে, শিক্ষায়, নৈতিকতায়।  

আশিক বিল্লাহ আশিক বিল্লাহ অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0
সন্ধ্যার প্রান্তর

সন্ধ্যা নামছে চারদিকে। আঁধারির ছড়াছড়ি চোখে পড়ছে। সূর্য আর ওই দূর আকাশে দৃশ্যমান নেই। অনেক আগেই অস্তমিত হয়ে গেছে। রেখে গেছে তার স্মৃতিগাঁথা কিছু কিরণ চন্দ্র ও তারকারাজি। আসলে একটি রাত শুরু হয় কেবল আলো নেভানোর জন্য নয়, বরং আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখের কথা বলতে, জরাজীর্ণ অবস্থা আর দুর্দিনের কথা মনে করিয়ে দিতে।   আমি একলা মনে বসে আছি। ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়া কিছুই আর কানে বাজছে না। হঠাৎ হারিয়ে গেলাম অজানা এক প্রান্তরে। নিজেকে আবিষ্কার করলাম বালুকাময় এক মরু প্রান্তরে। কিন্তু সবকিছুই যে অপরিচিত। এখানকার কেউই , কোন আগন্তুক আমাকে চেনে না। আমি অনারবি, আমার কথাও বোঝে না। বিশাল জটিলতায় পড়ে গেলাম।যদি ওরা লুটেরা হয় আর আমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দেয় তখন?    শুনেছি, মরু অঞ্চলে দস্যুদের আনাগোনা অনেক। ওদের বোঝা মুশকিল। কারণ, আগন্তুক আর দস্যু সবাইকে এক মনে হয়। পোশাকে, সুরতে। এদিকে আমার সাথেও এমন কেউ নেই যে আমার সাহস জোগাবে কিংবা তাদের কথা বুঝবে।   দীর্ঘ সময় একই স্থানে। অপরিচিত, ভয় ভয় লাগছে। হঠাৎ তাদের কেউ আমার অবস্থা লক্ষ্য করল। আমি কিছুটা নার্ভাস। আতঙ্কিত। কিছুটা চিন্তিত।   সে আমাকে তার ভাষায় বলতে লাগল অনেক কিছু। আমি তাকিয়ে আছি। বোঝার চেষ্টা করছি। ধরতে পারছি আবার দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছি। তবে কিছুটা বুঝতে পারলাম, তাদের কাফেলার পরিচয় দিচ্ছে। তারা কোনো মরুদস্যু নয়। তারা সবাই ব্যবসায়ী। এটা বাণিজ্যিক কাফেলা।   আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিছুটা স্বস্তিবোধ করছি এখন। তবে অজানা আর অপরিচিতির ভয় এখনো কাটেনি। রাত গভীর হচ্ছে, তাদের আয়োজনও ভারী হচ্ছে। খাওয়াদাওয়া, অমোঘ ফুর্তি। আদিকালের রীতি বৈচিত্র্য। বড়লোকের ব্যাপারস্যাপার।   আমি এখন নীরবে কিছুটা দূরে এক শামিয়ানায় বসে আছি। ভাবছি, দেখছি। ভালোও লাগছে, আবার ভয়ও করছে। হঠাৎ একজন সান্ত্রী আমাকে দস্তরখানে দাওয়াতের বার্তা নিয়ে এলো। বেশ খিদে পেয়েছে, তাই না করলাম না। তবে আমি জড়োসড়ো হয়ে আছি। ওরা অপরিচিত। আমি অনারবি।   দস্তরখান বেশ সাজানো হয়েছে। বণিকরা খাওয়া শুরু করেছে। পানিও সাথে আছে! আমাকে দেখে তারা হয়তো সম্ভাষণ জানাল। আমি মাথা দিয়ে সায় দিলাম। আরও কিছু আমাকে বলছিল, তবে আমি তখন নিরুত্তর। হয়তো বুঝতে পারছে আমি যে অনারবি, তবে কোনো বেদুইন না। তাই আর কথা বাড়াল না। তাদের মতো করে খাওয়াদাওয়া শেষ করল। আমিও এই ফাঁকে কিছু মুখে দিয়ে পেটের খিদে মিটিয়ে নিলাম।   রাত গভীর হচ্ছে। যাত্রা শুরু করবে এখন। বাইরে চন্দ্রালোকিত পুরো মরু প্রান্তর। সবকিছু গোছানো হচ্ছে। আমিও কাফেলার সাথে প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম। আবার শুরু হলো মরু প্রান্তরে অজানা সফর। আমি জানি না কোথায় যাব।তবে যোজন যোজন দূরত্ব পাড়ি দিচ্ছি এটুকু বুঝতে পারছি। আমার গন্তব্য অজানা, তবে ওই বণিক দলের গন্তব্য তো কোনো এক বাণিজ্যিক শহর। তো আমি কেন তাদের সাথে! এরপর কী করব। কী হবে?   যাকগে ওই সব পরে চিন্তা করব। এখন তো কিছুটা নিশ্চিন্ত। ভয় কিছুটা কেটেও গেছে। তারা আমার সাথে কোনো সন্দেহপূর্ণ ব্যবহার তো করেনি। কিছুটা হলেও সমাদর করেছে। অতিথিপরায়ণও বটে।   হঠাৎ কীসের আওয়াজে ঘোর কেটে গেল। সংবিৎ ফিরে পেলাম। তবে ভালো লেগেছে। আদি যুগের কল্পনায়। মেহমান হতে পেরেছি। বণিকদের আতিথেয়তা পেয়েছি। মরুদস্যুর ভয়ও উবে গেছে। যাবেই তো, এখন যে আমি মরু প্রান্তরে না। নিজ গৃহে বসে আছি।    

আমিনুর রহমান পাশা আমিনুর রহমান পাশা অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0
একটি অভিযোগপত্র

আমি ছোটবেলায় একটা গল্প শুনতাম, মহাভারতের গল্প। দ্রৌপদীর অক্ষয় পাত্রের গল্প। যত মানুষই আসুক, যত ক্ষুধার্তই হোক, সেই পাত্র থেকে অন্ন ফুরিয়ে যেত না। তখন মনে হতো, কী আশ্চর্য এক কাহিনি! পরে বড় হয়ে বুঝলাম, আসল আশ্চর্য পাত্রে ছিল না। আশ্চর্য ছিল সেই সমাজে, যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ানোকে অলৌকিকতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। কারণ মানুষ খুব আগেই বুঝেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর যন্ত্রণা মৃত্যু নয়, ক্ষুধা। কিন্তু আজকের সমাজে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা সেই প্রাচীন শিক্ষাটুকু হারিয়ে ফেলেছি।   আমরা ক্ষুধাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখেছি। রাস্তার পাশে একটি শিশু না খেয়ে বসে আছে, এটি আর আমাদের বিস্মিত করে না। একজন বৃদ্ধ মানুষ ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছে, এটি আর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না। দিনমজুরের সন্তান স্কুলে না গিয়ে হোটেলে থালা ধুচ্ছে, এটিও আমাদের কাছে এখন সাধারণ দৃশ্য। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা এসবকে সমস্যা হিসেবেও দেখি না। আমরা মনে করি এটাই বাস্তবতা। এটাই নিয়তি। আমার প্রশ্ন হলো, নিয়তি কার?   যে শিশুটি জন্মের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, তার? যে বৃদ্ধ মানুষটি সারা জীবন শ্রম দিয়েছে, তার? নাকি সেই সমাজের, যে সমাজ সম্পদের পাহাড় গড়তে গড়তে মানুষের মৌলিক অধিকারকে বিসর্জন দিয়েছে?   আমরা প্রায়ই ব্যক্তির ব্যর্থতার গল্প শুনি। বলা হয়, মানুষ পরিশ্রম করলে সফল হবেই। কিন্তু আমরা খুব কমই শুনি কাঠামোগত বৈষম্যের গল্প। আমরা শুনি না সেই শিশুটির কথা, যে জন্মের প্রথম দিন থেকেই অন্য একটি শিশুর চেয়ে কয়েক হাজার ধাপ পিছিয়ে জন্মায়। একটি শিশুর জন্য জন্মদিনে বই, কম্পিউটার, ব্যক্তিগত শিক্ষক অপেক্ষা করে। আরেকজনের জন্য অপেক্ষা করে অপুষ্টি, অশিক্ষা আর অনিশ্চয়তা। তারপর একদিন আমরা দুজনকে একই দৌড়ের মাঠে দাঁড় করিয়ে বলি, যার যোগ্যতা বেশি সে জিতবে। এই ভণ্ডামিকে আমরা মেধার প্রতিযোগিতা বলি।   ধর্মগ্রন্থে বারবার দানের কথা বলা হয়েছে। অন্নদানকে শ্রেষ্ঠ দান বলা হয়েছে। উপনিষদে ‘অন্নং ব্রহ্ম’ অর্থাৎ অন্নই ব্রহ্ম বলা হয়েছে। বহু শাস্ত্রে ক্ষুধার্তকে অন্ন না দেয়াকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ প্রাচীন মানুষ জানত, ক্ষুধার সামনে ধর্ম, দর্শন, নীতি, আদর্শ সবকিছুই দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে যত দূরে সরে গেছি, ধর্মের প্রদর্শনী থেকে ঠিক ততটা দূরে যাইনি। মন্দিরে সোনার ঘণ্টা ঝুলছে, কিন্তু মন্দিরের বাইরের মানুষটি না খেয়ে আছে। পুজোর সময় আমরা বিশাল আয়োজন করি, কিন্তু আশপাশের ক্ষুধাকে দেখতে পাই না। আমরা পুণ্যের হিসাব রাখি, কিন্তু মানুষের হিসাব রাখি না।   সমাজের সবচেয়ে বড় পাপ হয়তো চুরি নয়, ডাকাতি নয়, এমনকি দুর্নীতিও নয়। সমাজের সবচেয়ে বড় পাপ হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের মর্যাদা আর ক্ষুধার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়। যেখানে একজন মা নিজের সন্তানকে না খাইয়ে ঘুম পাড়ায়। যেখানে একজন বাবা সারা দিন শ্রম দিয়েও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারে না। তখন ক্ষুধার্ত মানুষটি শুধু খাবার হারায় না। সে ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্ন হারায়, আত্মসম্মান হারায়, ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস হারায়। আর যে সমাজ মানুষের কাছ থেকে এই জিনিসগুলো কেড়ে নেয়, সে সমাজ যত উন্নয়নের গল্পই বলুক, তার সভ্যতার দাবি সব সময়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।    ইতিহাসে অনেক পাপের বিচার হয়েছে। অনেক অত্যাচারীর নাম লেখা আছে কালো অক্ষরে। কিন্তু আমার মনে হয়, ভবিষ্যতের ইতিহাস যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তাহলে সে আমাদেরও একদিন প্রশ্ন করবে, যখন খাদ্যের অপচয় পাহাড়ের মতো জমছিল, তখন কেন মানুষ ক্ষুধায় ঘুমাত? আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হয়তো আমরা বুঝব, ক্ষুধার্ত মানুষের খালি থালা তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতীক ছিল না। সেটি ছিল পুরো সমাজের বিবেকের বিরুদ্ধে দাখিল করা একটি নীরব অভিযোগপত্র।  

প্রসেনজিত হালদার প্রসেনজিত হালদার অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0
জাপানি সাহিত্যের ইতিহাস

সূর্যদয়ের দেশ ও নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলে খ্যাত জাপানের রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে জাপানি জীবনধারা আকৃষ্ট করে আসছে বিশ্ববাসীকে। একটা জাতির সংস্কৃতি ও মানসের গভীরে যেতে হলে আগে জানতে হবে তার সাহিত্যভাণ্ডার সম্পর্কে; জাপানি সাহিত্যের উৎপত্তি ও বিকাশ বেশ চমকপ্রদ। সেই প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমানে পদার্পণের ইতিহাস চলুন জেনে নেয়া যাক।   জাপানি সাহিত্যের শুরুটা ছিল চৈনিক ভাষা ও সংস্কৃতি দ্বারা ব্যাপক প্রভাবিত, নিজস্ব লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত মৌখিকভাবেই টিকে ছিল তাদের সাহিত্যচর্চা। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় লিপিবদ্ধ জাপানি সাহিত্যের। সেগুলো লেখা হয়েছিল চৈনিক লিপি ব্যবহার করে। ‘কোজিকি’ (৭১২) ও ‘নিহন শোকি’ (৭২০): তৎকালীন শাসকদের নির্দেশে বিভিন্ন দাপ্তরিক তথ্য, লোককাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও দেব-দেবীর কাহিনি সেগুলোতে বর্ণিত হয়।   এ যুগ জাপানি ভাষা ও সাহিত্যের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ; জাপানি হরফ ‘কানা’ উদ্ভাবিত হয় এ যুগেই। নিজস্ব ভাষায় তারা আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহিত্যচর্চা করার সক্ষমতা লাভ করে। কিয়োটোর দরবার ধীরে ধীরে পরিণত হতে থাকে শিল্প ও সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে। নারীরা তখন খুব একটা স্বাধীন ছিলেন না; পর্দার আড়ালেই তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করতে হতো। নারীদের চৈনিক ভাষা শেখার ওপরও ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। তাই তারা ‘কানা’ ব্যবহার করে রচনা করতে শুরু করেন একের পর এক কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। ‘মুরাসাকি শিকিবু’ লিখেছিলেন বিশ্বের প্রথম উপন্যাস ‘গেঞ্জি মনোগাতারি’। এ ছাড়া ‘সেই শোনাগন’ রচনা করেন ‘মাকুরা নো শোশি’। এ যুগেই প্রচলন ঘটে দিনলিপির; নারীরাই মূলত সাহিত্যচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন হেইয়ান যুগে।   মধ্যযুগীয় জাপান যুদ্ধ আর বিদ্রোহে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার আর সামুরাই শ্রেণির উত্থান জাতীয় থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বলা বাহুল্য, সাহিত্যেও তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। এ যুগের লেখকগণ ধর্মচিন্তা, মানবজীবনের স্বল্পতা, সরলতা আর আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বহু সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন। মধ্যযুগের সবচেয়ে আলোচিত সাহিত্যকর্ম হলো ‘হেইকি মনোগাতারি’, ১২ শতকে তাইরা এবং মিনামতো গোত্রের মধ্যে সংঘটিত ‘গেম্পেই যুদ্ধ’ এই দীর্ঘ কবিতা সংকলনের মুখ্য বিষয়। শোবোগেঞ্জো এই যুগে লিখিত প্রথম বৌদ্ধ ধর্মসংক্রান্ত গ্রন্থ।   ‘রেঙ্গা’ নামক নতুন একধরনের কবিতারূপ প্রকাশ পায় এই যুগে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো সংযুক্ত স্তবক। একাধিক কবি ঐক্যবদ্ধভাবে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেন; প্রথম কবি ৫-৭-৫ অক্ষরের একটি স্তবক লেখেন, দ্বিতীয় কবি ৭-৭ অক্ষরের আরেকটি স্তবক সেটিতে যুক্ত করেন। এভাবেই পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে রচিত হয় একটি দীর্ঘ কবিতা। ‘নোহ নাট্য’ নামক সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের সমন্বয়ে একধরনের থিয়েটারও খুব জনপ্রিয়তা পায় মধ্যযুগে। সর্বোপরি জাপানিরা উৎসাহিত হয়ে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করে এ সময়ে।   শেকিগাহার যুদ্ধে জয়ী হয়ে তকুগাওয়া লিয়াশু, জাপান সম্রাট গো-ইয়োজেই-এর কাছ থেকে গ্রহণ করেন ‘শোগান’ পদবি, আর এভাবেই সূচনা হয় এঁদো যুগের।  জাপান দীর্ঘকাল পর শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে পায় এঁদো যুগে। বর্তমান টোকিও শহরের পূর্বনাম ছিল এঁদো। মানুষজন শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয় এবং সাহিত্য পৌঁছে যেতে থাকে সর্বসাধারণের হাতে। শিক্ষিত সমাজে পুরোদমে সাহিত্যসংক্রান্ত চিন্তাধারা বিকশিত হতে থাকে। ‘হাইকু’ একধরনের ছন্দহীন ক্ষুদ্র কাব্যরূপ, মোট তিনটি চরণে ১৭টি অক্ষরের সমন্বয়ে যা রচনা করা হয় (৫-৭-৫ অক্ষর বিন্যাসে)। মাতসুয়ো বাশো হাইকুকে সংস্কার করে আধুনিক রূপ দান করেন। তাঁর কবিতায় গভীর আবেগ ও অনুভূতি খুব সরলভাবে প্রকাশ পায়। এ যুগের রচনা বেশ প্রাণবন্ত এবং রসাত্মক। বিখ্যাত রচনার মধ্যে আছে কো শোকু ইচিদাই অতোকো, কো শোকু গেনিন অন্না, অকু নো হসোমিচি ইত্যাদি।   জাপানে মেইজি সংস্কারকালকে আধুনিক যুগের গোড়াপত্তন হিসেবে গণ্য করা ‌হয়। সম্রাট মেইজির নামে নামকরণ করা হয় সেই যুগকে। জাপানি সাহিত্য তত দিনের সীমান্ত পেরিয়ে আমদানি করেছিল নতুন নতুন উপাদান। বিশেষ করে পশ্চিমা সাহিত্যের ছোঁয়ায় নতুন করে উজ্জীবিত হয় জাপানি সাহিত্য। ইউরোপীয় নানান ধ্যান-ধারণা ও মতবাদ প্রকাশ পেতে থাকে সেই যুগের লেখকদের কলমে। কবিতা যে রকম নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছিল, তেমনি গদ্য সাহিত্যেও এসেছিল লক্ষণীয় পরিবর্তন। ১৯২০–৩০-এর দশকে প্রলেতারিয়েত সাহিত্য আন্দোলন গতি লাভ করে। তাকেজি কোবায়াশি ও ইউরিকো মিয়ামতো শ্রমিক শ্রেণি ও নারীদের নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছিলেন। বিশেষ করে এই যুগে নাতসুমে সসেকি আধুনিক জাপানি গদ্যের প্রচলন ঘটান। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে কোকোরো, বতচান, আই অ্যাম আ ক্যাট ইত্যাদি। এ ছাড়া মোরি ওগাই, আকুতাগাওয়া রিউনোসুকে প্রমুখ এই যুগে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেন।   যুদ্ধোত্তর জাপানি সাহিত্য পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে যেতে শুরু করল। বহু রথী-মহারথী লেখকগণ আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করলেন। কবিতা বা পদ্যকে ছাড়িয়ে গদ্য তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে এই যুগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গভীরভাবে জাপানি জনজীবনের ছাপ রেখে গিয়েছিল; পৃথিবীর ইতিহাসে সেবারই প্রথম পারমাণবিক হামলা হয়েছিল কোনো দেশে। অগণিত লাশ আর ক্ষতবিক্ষত মানস নিয়ে যখন কলম ধরা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সব ক্ষত উঠে আসে লেখার মাধ্যমে।   ওসামু দাজাই, কেনজাবুরো ওয়ে, ইউকিও মিশিমা, হারুকি মুরাকামি—তাঁদের রচনায় বহুবার এসব দুঃস্বপ্নের স্মৃতিচারণা করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনজন জাপানি নাগরিক সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, কেনজাবুরো ওয়ে ও কাজুয়ো ইশিগুরো। নোবেল পাওয়ার যোগ্য অনেক লেখক এখনো সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত আছেন, তার মধ্যে হারুকি মুরাকামির নাম বহুল চর্চিত।   বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে জাপানি সাহিত্যের বহুল আলোচিত সংযোজন হলো মাঙ্গা। পশ্চিমা কমিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সাদা-কালো একধরনের স্বতন্ত্র কমিক হলো মাঙ্গা—জাপানি প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কাছে যা সোনার খনি। পশ্চিমা কমিক থেকে ভিন্ন এই সাহিত্যরূপ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয়। কোনো কোনো মাঙ্গা ১০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে; ওয়ান পিস নামক একটি মাঙ্গা আজ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি কপি বিক্রি হয়েছে সারা বিশ্বে। অনেক সাহিত্যবিশারদ মাঙ্গাকে সাহিত্যের অংশ হিসেবেও গ্রহণ করেছেন।   উপসংহারে এটুকু বলা যায়, জাপানি সাহিত্যের ইতিহাস সত্যিই চমকপ্রদ। সেই প্রাচীন আমল থেকে বর্তমান যুগ, অনেক চড়াই-উতরাই পার করে টিকে আছে স্বগৌরবে। সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে সীমাবদ্ধ নয়; সকল সাহিত্যপ্রেমীর কাছে তা একান্তই আপন ও নিজস্ব। আজ সারা বিশ্বে জাপানি সাহিত্যের লাখ লাখ অনুরাগী রয়েছেন, তাঁদের মাধ্যমে চর্চিত, আলোচিত এবং প্রশংসিত হচ্ছে নিত্যদিন। এই সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার টিকে থাকুক সহস্র বছর, পৃথিবী আলোকিত হোক জ্ঞানের আলোয়।  

মোহাম্মদ মিনহাজ মোহাম্মদ মিনহাজ অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0
ছবি : কাঙ্গাল প্রেসের জীর্ণ কুটির
উনিশ শতকের তিন বাতিঘর

উনিশ শতকের বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু অঞ্চলটি ছিল এক অনন্য জ্ঞানপীঠ। এ বাংলায়, বিশেষত কুষ্টিয়া অঞ্চলের হতদরিদ্র কৃষককুলের ওপর ইংরেজ এবং এ-দেশীয় অত্যাচারী জমিদারদের অত্যাচারের খড়্গ যখন নেমে এসেছিল, সেই দুঃসময়ে আমৃত্যু প্রতিবাদী সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার মানবিক তাড়নায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কৃষকদের পাশে। মফসসল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও পূর্ব বাংলার প্রথম পত্রিকা ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র জনক হিতকরী পত্রিকার সম্পাদক আজ প্রায় পৌনে ২০০ বছর পরও মানুষের মনে জাগ্রত হয়ে আছেন।   একদিকে কাঙাল হরিনাথের আপসহীন গ্রামীণ সাংবাদিকতা, অন্যদিকে মহাত্মা লালন শাহের জাতহীন মরমিয়া সুর এবং মীর মশাররফ হোসেনের ক্ষুরধার সাহিত্যিক লেখনী—এই তিন বাতিঘরের মেলবন্ধন তৎকালীন ঔপনিবেশিক শোষণ ও জমিদারতান্ত্রিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনজনের পথ আলাদা মনে হলেও অন্তরের অন্দরমহলে তাঁদের সম্পর্কটি ছিল এক আত্মিক ও ঐতিহাসিক সখ্যের পরম দলিল। তবে ইতিহাসের পাতায় এই তিন মনীষী আজ যে গৌরবের আসনে ভূষিত, তাঁদের ব্যক্তিজীবনের উপাখ্যান ছিল চরম কষ্ট, ক্লেশ আর নির্মম অগ্নিপরীক্ষায় জর্জরিত। দুঃখের অতল সাগর পাড়ি দিয়েই তাঁরা একেকজন বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন।   ১৮৩৩ সালে জন্ম নেয়া কাঙাল হরিনাথ ছিলেন লালনের চেয়ে বয়সে ছোট। অত্যন্ত শিশুবয়সেই মা-বাবাকে হারিয়ে সম্পূর্ণ এতিম হওয়া হরিনাথের শৈশব কেটেছে অনাহারে-অর্ধাহারে। ক্ষুধা মেটাতে অনেক সময় মানুষের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা ‘পান্তা ভাত, জামিরের (লেবু) পাতা আর লবণ’ খেয়ে তাঁকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও সহপাঠীদের বই আর ব্রাহ্মসমাজের ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা পড়ে নিজে নিজে চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। জীবিকার তাগিদে দৈনিক মাত্র দুই পয়সা মাইনেতে কাপড়ের দোকানে শিশুশ্রমিকের কাজও করতে হয়েছে তাঁকে। ঠিক একইভাবে মহাত্মা লালন শাহের জীবনও ছিল এক চরম ট্র্যাজেডি। তীর্থভ্রমণে গিয়ে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে যখন তিনি  মৃতপ্রায়, তখন তাঁকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মুসলমান পরিবারে আশ্রয় পাওয়ায় তৎকালীন হিন্দু সমাজ তাঁকে আর গ্রহণ করেনি। সমাজচ্যুত, কুলহীন ও জাতহীন হওয়ার সেই তীব্র মনঃকষ্ট ও একাকিত্বকেই লালন রূপান্তর করেছিলেন তাঁর জাত-পাতহীন পরম মরমিয়া দর্শনে।   অন্যদিকে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিলেও ‘বিষাদসিন্ধু’র রচেরিতা মীর মশাররফ হোসেনের জীবনের শেষভাগ কেটেছে তীব্র পারিবারিক অশান্তি, মামলা-মোকদ্দমা আর চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে।   ক্লেশ জড়ানো জীবনের এই অভিন্ন সুর এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই লালন ও কাঙালকে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ করেছিল। লালন মাঝেমধ্যে কুমারখালীতে কাঙাল-কুটিরে আসতেন, আর কাঙালও দলবল নিয়ে যেতেন ছেঁউড়িয়ায়। শিষ্যদের দল বেঁধে আসতে দেখে লালন তখন গ্রামীণ বাৎসল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠতেন, “ওরে আমার পুনা (পোনা) মাছের ঝাঁক এসেছে।” এই লড়াইয়ে হরিনাথ একা ছিলেন না; জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী যখনই হরিনাথকে আক্রমণ করতে উদ্যত হতো, মহাত্মা লালন শাহ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে তাঁর সুরক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। এই ঐতিহাসিক বলয়ের সখ্যের প্রমাণ ছড়িয়ে ছিল শিলাইদহের পদ্মাবক্ষেও।   প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ‘লালন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ১৮৮৯ সালের ৫ মে শিলাইদহের বোটে দামি চেয়ারে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের যে ঐতিহাসিক রেখাচিত্র বা স্কেচ এঁকেছিলেন, তা-ই আজ লালনের একমাত্র প্রামাণ্য অবয়ব। যেখানে দেখা যায় বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া  লাঠি হাতে এক লালনকে। অথচ এই আসল ছবিটির কথা দীর্ঘদিন কেউ জানতে না পারায় ১৯১৬ সালে নন্দলাল বসুর আঁকা একটি কাল্পনিক প্রতিকৃতিই দীর্ঘদিন ধরে লালন শাহের চেহারা হিসেবে সব বইয়ে ছাপা হয়ে আসছিল। লালনের এই মরমিয়া দর্শন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এতটাই মজিয়েছিল যে, তিনি লালনের ‘অচিন পাখি’ গানের অন্তর্নিহিত ভাবকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন এবং ১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন মহাসভায় প্রদত্ত তাঁর ‘The Philosophy of Our People’ শীর্ষক ঐতিহাসিক অভিভাষণে তা উদ্ধৃত করে এক আধ্যাত্মিকতার পরম ছোঁয়া বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন।   কুমারখালীতে কাঙাল হরিনাথের নিজের হাতে গড়া পূর্ব বাংলার প্রথম মুদ্রণালয় ‘এমএন প্রেস’ ছিল এই মনীষীদের মূল মিলনমেলা। কুমারখালীতে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করতে আসা পণ্ডিত দয়াল শিরোমণির কাছে ব্যাকরণ শেখা হরিনাথ পরবর্তী সময়ে শৈশবে মারা যাওয়া এক প্রিয় বন্ধুর নামে এই প্রেসের নামকরণ করেছিলেন। রাজশাহীর রানি স্বর্ণকুমারীর অর্থ আনুকূল্যে নিলামে ৬০০ টাকায় কেনা লন্ডনের ‘ক্লাইম্যান ডিক্সন কোং’-এর (মডেল ১৭০৬) এই প্রেসের ঘরেই লালন শাহ ও মীর মশাররফ হোসেন একসাথে বসতেন। এই প্রেস থেকেই মীর মশাররফের অমর সৃষ্টি ‘বিষাদসিন্ধু’, কাঙাল হরিনাথের নিজের ‘বিজয় বসন্ত’সহ ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি ফকির লালন শাহর প্রায় ২১টি লালনগীতি বই আকারে প্রথম এই এমএন প্রেস থেকেই আলো দেখেছিল।   লালন শাহের গুরু হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুর গ্রামের পরম দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের জাত-পাতহীন সর্বজনীন মানবধর্মের যে মূল বাণী, ‘মানুষে মানুষে কোনো ভেদ নেই’—তা হরিনাথ ও মশাররফ উভয়ের চেতনাকেই ভীষণভাবে তাড়িত করেছিল। মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং সমকালীন বিভিন্ন তথ্যচিত্র অনুযায়ী, ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া পেশায় পালকি বাহক ও অন্তরাল-নিবাসী মহান সাধক সিরাজ সাঁই-ই ছিলেন লালন-মানস গঠনের মূল আঁতুড়ঘর।   ১৯১০ সালে প্রকাশিত গবেষক বসন্তকুমার পালের ঐতিহাসিক ‘মহাত্মা লালন ফকির’ গ্রন্থে লালনের শিষ্যদের বরাতে সিরাজ সাঁইয়ের দীক্ষাগুরু হওয়ার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা-ই পরবর্তী সময়ে লালন-মানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যৌবনের শুরুতে মুমূর্ষু লালনকে বাঁচিয়ে তুলে তিনি যে অসাম্প্রদায়িক বিশ্বদর্শনের বীজ বুনে দিয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফকেও তাড়িত করে। যার ফলে ১৮৯০ সালে লালন শাহের তিরোধানের মাত্র পনেরো দিন পর, ৩১ অক্টোবর মীর মশাররফ হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ঐতিহাসিক ‘হিতকরী’ পত্রিকায় লালনকে নিয়ে প্রথম প্রামাণ্য জীবনীমূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে মশাররফ হোসেন লিখেছিলেন, “লালন ফকীরের নাম এ অঞ্চলে কাহারও শুনিতে বাকী নাই... ইহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি; আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি।” লালন ও মশাররফের এই প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ আলাপ ও সখ্যের প্রামাণ্য ইতিহাস এবং লালন যে দর্শনকে একতারার সুরে আখড়ায় বেঁধে রেখেছিলেন, কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেন তাঁদের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মাধ্যমে তাকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।   তবে ইতিহাসের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মন বিষণ্নতায় ভরে ওঠে। সম্প্রতি কুমারখালীতে সরকারনির্মিত অত্যাধুনিক ও নান্দনিক ‘কাঙাল হরিনাথ জাদুঘর’ দেখতে গিয়েছিলাম। ২০১৭ সালে চালু হওয়া এই আধুনিক ভবনে সুবিন্যস্ত হস্তলিপি, সরঞ্জাম ও ব্লকের সম্ভার দেখে মন ভরে উঠলেও এক চরম সত্য জানার পর তা বিষাদে রূপ নেয়। জাদুঘরে টিকেট কেটে দর্শনার্থীরা যে মুদ্রণযন্ত্র ও ধাতব অক্ষরের বাক্সটি দেখেন, সেটি আসলে কাঙালের ব্যবহৃত মূল যন্ত্র নয়, তা কেবলই একটি সদৃশ মডেলমাত্র! প্রসঙ্গত লালনের সরাসরি ভাবশিষ্য গগন হরকরা বিশ্বকবির শিলাইদহ পোস্ট অফিসের প্রধান রানার বা হরকরা, যিনি গানের সুরে সুরে চিঠি বিলি করতেন, তাঁর ইতিহাস চাপা পড়ে গেছে শিলাইদহের মাটিতেই।   আসল ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজও পড়ে আছে জাদুঘর থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে কুণ্ডুপাড়ার জরাজীর্ণ, ধ্বংসপ্রায় কাঙাল কুটিরে। সেখানে কাঙাল হরিনাথের চতুর্থ পর্যায়ক্রমের বংশধর শ্রী অশোক মজুমদারের স্ত্রী ষাটোর্ধ্ব গীতারানী মজুমদারের চাবির টানে যখন এমএন প্রেসের স্যাঁতসেঁতে, গুমোট ঘরটি খোলে, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক করুণ দৃশ্য। মেঝেটি অমসৃণ, ওপরের টিনের চালা ফুটো হয়ে ভেঙে পড়ার দশা। অথচ এই ভাঙা ঘরের কোণেই অবহেলায় পড়ে আছে কাঙাল হরিনাথ, লালন শাহ আর মীর মশাররফের স্মৃতিধন্য সেই আসল ঐতিহ্যের মূল ছাপাখানা ও অক্ষরের বাক্স। বংশধরদের কর্মসংস্থান, আবাসন ও সামান্য কিছু দাবিদাওয়া সরকার আমলে না নেয়ায় এই অমূল্য জাতীয় সম্পদ আজও অরক্ষিত ও ধ্বংসের মুখে।   আজকের বৈষয়িক ও কর্পোরেট সাংবাদিকতার যুগে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই তিন বাতিঘরের অবিনাশী সখ্য এবং বর্তমানের এই অদ্ভুত বৈপরীত্য আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সুধীর চক্রবর্তী তাঁর গ্রন্থে আক্ষেপ করেছিলেন যে, আমাদের প্রথাগত ইতিহাস বা সংবাদমাধ্যম বরাবরই এই লৌকিক সাধকদের ব্রাত্য করে রেখেছে। অথচ লালন তাঁর গানে ‘পেঁচোপেঁচি’ বা ‘আলীক কুহকের’ মতো গ্রামীণ অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আজীবন গেয়েছেন, ‘মানুষ হয়ে মানুষ চেনো / মানুষ হয়ে মানুষ মানো’।   বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সাহিত্য কেবল শুষ্ক তথ্যের আদান-প্রদান নয়, তার পেছনে যদি লালন-সিরাজ সাঁইয়ের এই আধ্যাত্মিক সততা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সুফিবাদের অহিংস দর্শন না থাকে, তবে তা সমাজকে প্রকৃত আলো দিতে পারে না। সামান্য দূরত্বের ব্যবধানে নান্দনিক ভবনে নকলের প্রদর্শনী আর ভাঙা ঘরে আসলের অবলুপ্তি—আমাদের জাতীয় উদাসীনতারই এক চরম দলিল। হরিশপুরের ধুলোবালি থেকে কুমারখালীর কাঙাল প্রেস—ইতিহাসের এই তিন বাতিঘরের আসল আলোটুকু বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।  

মাকসুদুল হক মাকসুদুল হক অক্টোবর ৯, ২০২৬ 0
সাহিত্য আছে, কিন্তু মানুষ কতটা আছে

একটি জাতির সাহিত্য তার আত্মার আয়না। সেই আয়নায় শুধু কবিতা, গল্প, উপন্যাস কিংবা নাটকের মুখ দেখা যায় না; দেখা যায় একটি জাতি মানুষকে কতটা ভালোবাসে, দুর্বলকে কতটা সম্মান করে, ভিন্নমতকে কতটা সহ্য করে এবং অন্যের দুঃখে তার হৃদয় কতটা কেঁপে ওঠে। ইংল্যান্ডের সাহিত্য-ঐতিহ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়—শেকসপিয়র মানুষের ক্ষমতা, লোভ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে যে গভীরতায় দেখেছেন, তা আজও মানুষকে নিজের ভেতরের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ডিকেন্স দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে এনেছেন। জর্জ অরওয়েল ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বাধীনতার সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শেলি, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হার্ডি, ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা অসংখ্য ইংরেজ লেখক সাহিত্যকে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় করে রাখেননি; তাঁরা মানুষ, সমাজ ও বিবেকের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ককে গভীর করেছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যও কোনো অংশে দরিদ্র নয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন; নজরুল শিখিয়েছেন সাম্য ও প্রতিবাদ; শরৎচন্দ্র নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন; লালন মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে দেখতে চেয়েছেন; জীবনানন্দ আমাদের প্রকৃতি ও নিঃসঙ্গতার গভীরে নিয়ে গেছেন। আমাদের সাহিত্যে মানবিকতার যে বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।   তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এত সাহিত্য পড়েও আমরা কি সত্যিই আরও মানবিক হয়েছি? আমরা রবীন্দ্রনাথ পড়ি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম কতটা ধারণ করি? নজরুলের সাম্যের কবিতা আবৃত্তি করি, কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে কতটা শিখেছি? শরৎচন্দ্রের অসহায় মানুষের জন্য চোখ ভেজে, কিন্তু বাস্তবের অসহায় মানুষটি যখন আমাদের দরজায় দাঁড়ায়, তখন আমরা কতটা পাশে দাঁড়াই? সমস্যাটি সম্ভবত সাহিত্যের অভাবে নয়; সাহিত্যকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারার মধ্যে। আমাদের দেশে সাহিত্য অনেক সময় পরীক্ষার প্রশ্ন হয়ে ওঠে, চাকরির প্রস্তুতির উপকরণ হয়ে ওঠে, পুরস্কার ও পরিচিতির সিঁড়ি হয়ে ওঠে। আমরা কবিতার ব্যাখ্যা মুখস্থ করি, কিন্তু কবিতার মানবিক শিক্ষা ভুলে যাই। আমরা শেকসপিয়রের নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণ করি, কিন্তু নিজের চরিত্র বিশ্লেষণ করি না। আমরা গল্পের নায়ক-নায়িকার দুঃখে আবেগাপ্লুত হই, অথচ পাশের বাড়ির মানুষের দুঃখ আমাদের বিবেককে সবসময় স্পর্শ করে না। এখানেই হয়তো আমাদের বড় সংকট। একটি সমাজের উন্নতি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা শিক্ষার হার দিয়ে মাপা যায় না। মানুষ কতটা অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, কতটা দুর্বলকে রক্ষা করে, কতটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে এবং কতটা ভিন্ন মানুষকে সহ্য করতে পারে—তার মধ্যেও সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে। ইংল্যান্ডকে মানবিকতার আদর্শ সমাজ হিসেবে দেখারও কারণ নেই। সেখানেও বৈষম্য, অন্যায়, নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক সংকট আছে। কিন্তু দীর্ঘ সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য সেখানে সামাজিক আত্মসমালোচনার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি তৈরি করেছে—সাহিত্য অনেক সময় সমাজের আয়না হওয়ার পাশাপাশি সমাজকে প্রশ্ন করার অস্ত্রও হয়েছে। আমাদেরও সেই আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমাদের সংস্কৃতি মহান’। কিন্তু সংস্কৃতির মহত্ত্ব কেবল অতীতের গৌরবে নয়; তার প্রমাণ বর্তমানের আচরণে। আমরা যদি সাহিত্যসভায় মানবতার কথা বলি, কিন্তু বাস্তবে দুর্বলকে অপমান করি—তাহলে সাহিত্য আমাদের মুখস্থ হয়েছে, হৃদয়ে প্রবেশ করেনি। আমরা যদি সাম্যের কবিতা লিখি, কিন্তু মানুষকে ধর্ম, মত, অর্থ, পেশা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাগ করি—তাহলে আমাদের সাহিত্যচর্চা এখনো অসম্পূর্ণ। আমরা যদি স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি করি, কিন্তু অন্যের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করি—তাহলে আমরা কবিতার শব্দ শিখেছি, তার আত্মা শিখিনি। সাহিত্যের শেষ পরীক্ষা বইয়ের পাতায় নয়—মানুষের আচরণে। একজন মানুষ কত বড় সাহিত্যিক, কত ডিগ্রিধারী, কত বই পড়েছেন—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, তিনি একজন অসহায় মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন; একজন ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কেমন কথা বলেন; ক্ষমতা হাতে পেলে দুর্বল মানুষের প্রতি কেমন ব্যবহার করেন। তাই বাংলাদেশের সাহিত্যকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন বরং সাহিত্যের মানবিক শক্তিকে জীবনের ভেতরে ফিরিয়ে আনা। আমাদের এমন শিক্ষা দরকার, যেখানে রবীন্দ্রনাথ শুধু পরীক্ষার উত্তর নন—মানবতার শিক্ষক। নজরুল শুধু কবিতার কবি নন—সাম্যের কণ্ঠস্বর। শরৎচন্দ্র শুধু উপন্যাসের লেখক নন—বঞ্চিত মানুষের সহযাত্রী। শেকসপিয়ার শুধু নাটকের বিষয় নন—মানুষের অন্তর্জগতের অনুসন্ধানী। আর সাহিত্য শুধু পাঠ্যবই নয়—নিজেকে মানুষ করে তোলার একটি নিরন্তর সাধনা। কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি তখনই ঘটে, যখন তার জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিবেকও বড় হয়, শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সহমর্মিতা বাড়ে এবং সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা গভীর হয়। সাহিত্য আমাদের অনেক কিছু দিতে পারে। কিন্তু সাহিত্য পড়ার পরও যদি মানুষকে ভালোবাসতে না শিখি—তবে প্রশ্নটা সাহিত্যের নয়, আমাদের।  

জুলফিকার আহমেদ জুলফিকার আহমেদ অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0
গগন হরকরা : অখণ্ড নদীয়া থেকে জাতীয় সংগীতের উৎসভূমি

আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। এই বিশেষ দিনে আমাদের ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের শেষলগ্নে, শিলাইদহের পদ্মাপাড়ে। যেখানে ইতিহাসের এক পরম সন্ধিক্ষণে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন দুই ভিন্ন গোলার্ধের মানুষ—একদিকে কলকাতার ধনাঢ্য পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারের অভিজাত ও তরুণ জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর অন্যদিকে লালন সাঁইজির স্বহস্তে দীক্ষিত মুরিদ, নিম্নবর্ণের বোঝা কাঁধে বয়ে বেড়ানো প্রবীণ ডাকপিয়ন তথা পোস্টমাস্টার গগনচন্দ্র দাম, যিনি ইতিহাসে ‘গগন হরকরা’ নামে অমর হয়ে আছেন।   শিলাইদহের পদ্মাপাড়ে তাঁদের সেই প্রথম চাক্ষুষ সাক্ষাৎ ও সুরের আদান-প্রদান কেবল দুটি মানুষের মিলন ছিল নয়; সেটি ছিল বাংলার লোক-দর্শনের কাছে আভিজাত্যের এক পরম আত্মসমর্পণের মনস্তাত্ত্বিক আবহ।   তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে।। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আধ্যাত্মিক ভাবধারার এই কালজয়ী পদটি কেবলই কোনো গান নয়; এটি আসলে অখণ্ড ভারতের নদীয়া জেলার সেই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য দলিল। লালনের দৃষ্টিতে সেই ‘তিন পাগল’—শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, প্রভু নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্য যেভাবে জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে তৎকালীন সমাজ-সংস্কৃতিতে এক অভিনব প্রেমধর্মের জোয়ার এনেছিলেন, নদীয়া জেলার আলো-বাতাসে সেই ধারা যুগ যুগ ধরে প্রবহমান ছিল। আর অখণ্ড নদীয়ার সেই বিপুল শিল্প-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানীদের মূল ‘অভয় আশ্রম’ বা চারণভূমি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন কুষ্টিয়া মহকুমা।   তখন ১৮৮৯ বা ১৮৯০ সাল। জোড়াসাঁকোর চেনা কোলাহল ছেড়ে তরুণ রবীন্দ্রনাথ এসেছেন শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনা করতে। কিন্তু কবির মন তখন জমিদারির খাতায় নয়, মজে আছে পদ্মার উদাস বাতাস আর চরের নির্জনতায়। একদিন শান্ত সন্ধ্যায় পদ্মার বুকে নোঙর করে আছে জমিদারের বিলাসবহুল বোট ‘পদ্মা’। বোটে মোমের আলোয় কবি একা বসে আছেন। ঠিক তখনই ঘাটের কাছাকাছি মেঠোপথ ধরে আসছিলেন শিলাইদহ ডাকঘরের পোস্টমাস্টার গগন হরকরা। কাঁধে তাঁর ডাকের শূন্য থলে, হাতে লণ্ঠন আর বল্লম। কিন্তু সেদিন গগনের পায়ে কোনো তাড়া ছিল না। পদ্মার বুকে পূর্ণিমার চাঁদের আলো আর সাঁইজির মুরিদানা প্রেমের টানে তিনি আপন মনে একতারার তারে আঙুল ছুঁয়ে গেয়ে উঠলেন তাঁর নিজের সদ্য বাঁধা পদ— আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে। হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশে দেশ-বিদেশে আমি দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে।।   পদ্মার শান্ত জলের বুক চিরে সেই মেঠো সুর, সেই অসামান্য মরমী বাণী গিয়ে আঘাত করল জমিদারের বোটের জানালার কাচে। রবীন্দ্রনাথ তখন উপনিষদের অসীম ব্রহ্মের ধারণায় আচ্ছন্ন, কিন্তু গগনের কণ্ঠের এই গান যেন উপনিষদের সেই দূরবর্তী ঈশ্বরকে একনিমেষে রক্ত-মাংসের মানুষের ভেতরের ‘মনের মানুষ’ হিসেবে সামনে এনে দাঁড় করাল। কবি আর স্থির থাকতে পারলেন না। বোটের ডেক থেকে নেমে এসে তিনি ঘাটে দাঁড়ালেন। ডাকলেন কসবা গ্রামের সেই তথাকথিত নিম্নবর্ণের সাধারণ রানারকে।   সেদিনের সেই প্রথম সাক্ষাতের মনস্তাত্ত্বিক আবহটি ছিল অদ্ভুত। রবীন্দ্রনাথ গগনের মুখে গানটি বারবার শুনলেন এবং মুগ্ধ হয়ে নিজের ডায়েরিতে তার বাণী টুকে নিলেন। কলকাতার নাগরিক আভিজাত্য যে সত্যকে খুঁজে পায়নি, কসবা গ্রামের এক ডাকপিয়ন তা কবির মনের গভীরে গেঁথে দিলেন। গগনের এই ‘মনের মানুষ’-এর ধারণাই পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের কাব্যদর্শনে ‘জীবনদেবতা’ ও ‘মানুষের ধর্ম’ হিসেবে পূর্ণতা পায়।   গগনের এই গানের গভীরতা কবিকে কতটা আলোড়িত করেছিল, তা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখে গেছেন। ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ১৩২২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় যখন তাঁর আগ্রহে ‘হারামণি’ নামক লোকসংগীতের বিভাগটি চালু হয়, তখন গগন হরকরার এই গানটি দিয়েই তিনি সেই বিভাগের সূচনা করেছিলেন। গানটির প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “কথা নিতান্ত সহজ, কিন্তু সুরের মূর্চ্ছনায় এর অর্থ অপূর্ব জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।” ধরণির বুকেই নয়, বিশ্বমঞ্চেও কবি গগনকে তুলে ধরেছেন পরম শ্রদ্ধায়। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ‘An Indian Folk Religion’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক আলোচনা সভায় এ গানের স্মৃতিচারণা করে বিশ্বকবি বলেছিলেন, “এই প্রথম বাউলগান, যা আমি মন দিয়ে শুনেছি এবং যার জন্য আমার মন আন্দোলিত হয়েছে।... এই গানটির রচয়িতার নাম ছিল গগন।”   গগন হরকরার নিভৃত জীবন, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং ডাক বিলির এই পেশা রবীন্দ্র-মনস্তত্ত্বকে এতটাই আচ্ছন্ন করেছিল যে, তাঁর বিখ্যাত রূপক নাটক ‘ডাকঘর’ (১৯১২) লেখার পেছনে গগনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বালক অমল, যে বন্দি ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে এবং মুক্তির স্বপ্ন দেখে। সেই জানালার সামনে দিয়ে যখন রাজা বা সরকারের ডাকহরকরা হেঁটে যায়, তখন অমলও স্বপ্ন দেখে একদিন সে রাজার চিঠি বয়ে বেড়ানো এক ‘হরকরা’ বা রানার হবে। গগন যেভাবে চিঠির বোঝা কাঁধে নিয়ে দূর-দূরান্তে ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধানে সুর বেঁধে ঘুরে বেড়াতেন, ‘ডাকঘর’ নাটকের অমলের আকুলতাতেও ঠিক সেই আধ্যাত্মিক মুক্তির বার্তা ধ্বনিত হয়েছে।   আনুমানিক ১৮৪০ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কসবা গ্রামে জন্ম নেন এই মহান লোক-সংগীতশিল্পী ও সুরকার। আধ্যাত্মিক সাধনার জগতে গগন হরকরা ছিলেন স্বয়ং বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের স্বহস্তে দীক্ষিত মুরিদ বা প্রত্যক্ষ শিষ্য। সাঁইজির চরণে বসে পাওয়া জাত-পাতহীন সর্বজনীন মানবধর্মের সেই গভীর আত্মিক দীক্ষাই তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁর একতারার সুরে। লালন শাহের সরাসরি সান্নিধ্য পাওয়ার কারণেই গগনের গানের বাণীতে মরমী দর্শনের এমন কালজয়ী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।   প্রচলিত সাধারণ ইতিহাসে গগনকে মূলত শিলাইদহ ডাকঘরের একজন সাধারণ ‘ডাক হরকরা’ হিসেবেই দেখানো হয়। তবে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র এক নতুন তথ্যের আলো ছড়ায়। গগন হরকরা তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও যোগ্যতার কারণে একপর্যায়ে শিলাইদহের প্রধান ডাকঘরের ‘পোস্টমাস্টার’ বা প্রধান কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক তথ্যটি প্রমাণ করে যে তৎকালীন সরকারি ডাক বিভাগে তাঁর একটি সম্মানজনক সামাজিক অবস্থান ও প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল, যা শিলাইদহের জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর যোগাযোগকে আরও সহজ ও গভীর করেছিল।   শিলাইদহ থেকে ডাকের চিঠি আর কাঁধে ঝোলা নিয়ে কুমারখালীতে আসার পথে গগন হরকরার অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল কুণ্ডুপাড়ার ‘কাঙাল কুটির’, যেখানে বাস করতেন মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। কাঙাল হরিনাথের নিজের হাতে গড়া পূর্ব বাংলার প্রথম গ্রামীণ মুদ্রণালয় ‘এমএন প্রেস’ ছিল তৎকালীন মনীষীদের প্রধান আড্ডাস্থল। ছেঁউড়িয়া থেকে আসা ফকির লালন শাহ আর শিলাইদহ থেকে আসা গগন হরকরা এই কুণ্ডুপাড়ার প্রেস ঘরেই বসতেন। লালন সাঁইজির সাথে গগনের যে আত্মিক টান, তা এই কুণ্ডুপাড়ার মাটিতে বসেই বারবার সুরের আলাপনে মুখর হয়ে উঠত।   গগনের বাউল সুরের ঋণ কবিগুরু কোনো দিন ভোলেননি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে যখন দেশাত্মবোধের জোয়ার জাগানোর প্রয়োজন হয়েছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রাগ-সংগীতের ব্যাকরণ সরিয়ে রেখে গগন হরকরার এই ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানের অবিকল সুরে বেঁধেছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। আজ যা স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম জাতীয় সংগীত। একজন সাধারণ ডাকপিয়ন বা পোস্টমাস্টারের সুরের চাদরে জড়িয়েই তৈরি হয়েছে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতের মূল ভিত্তি।   লালন সাঁইজির ভাবাদর্শের এই মহান সুরকার আনুমানিক ১৯১০ সালের ১২ আগস্ট শিলাইদহের মাটিতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু শিলাইদহের পদ্মাপাড়ের সেই প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যপট আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার কোনো জাত হয় না, কোনো বর্ণ হয় না। অখণ্ড নদীয়া আর কুষ্টিয়ার মাটি এভাবেই জন্ম দিয়েছে সুরের মিলনমেলা, যার চাদরে জড়িয়ে আজও বেঁচে আছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত।   ঐতিহাসিক এই সুরের গৌরব আর মরমী ডাকহরকরাদের স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখতে কুষ্টিয়া পৌরসভার উদ্যোগে একদা শহরের হাউজিং নিশান মোড়ে গড়ে তোলা হয় গগন হরকরার এক দৃষ্টিনন্দন স্মারক ভাস্কর্য। মাথায় পাগড়ি, পরনে ধুতি, এক হাতে আলো ছড়ানো হারিকেন আর অন্য হাতে ঘণ্টার বল্লম নিয়ে মানুষের সুখ-দুঃখের বার্তা ছড়াতে ছুটে চলা সেই প্রতিমূর্তি আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয় এক ফেলে আসা আবেগঘন যুগের কথা।   আজ সেই ভাস্কর্যের দিকে তাকালে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার গ্রাস করে। সময়ের এক নির্মম ও দুঃখজনক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় আমাদের। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কিছু অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী ভাস্কর্যটির হাত থেকে খুলে নিয়ে গেছে পিতলের সেই সুরের আলো ছড়ানো প্রতীকী হারিকেন আর নিরাপত্তার একমাত্র ভরসা ধাতব বল্লমটি। চুরির এ ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা আর পুনরায় স্থাপন করা হয়নি। আজ নিশান মোড়ের সেই গগন হরকরা তাঁর হারিকেন আর বল্লমহীন শূন্য এক হাত বাড়িয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।   যে মানুষের মেঠো সুরের আলো বিশ্বকবির মনে ‘জীবনদেবতা’র জন্ম দিয়েছিল, যাঁর সুরের চাদর জড়িয়ে জন্ম নিল একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত, আজ তাঁরই স্মারকের হাতের আলোটি নিভে গেছে চরম অবহেলায়। কাঙালের এমএন প্রেস কিংবা লালনের আখড়া নিয়ে কিছুটা চর্চা হলেও কসবা গ্রামের এই নিভৃত সাধক আজ যেন নিজের শহরেই ব্রাত্য। বিশ্ব ডাক দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে, নিশান মোড়ের গগনের শূন্য হাতে পুনরায় আলোর লণ্ঠন আর সুরের বল্লম ফিরিয়ে দেয়া কেবল একটি ভাস্কর্যের সংস্কার নয়; বরং আমাদের জাতীয় সত্তা ও শেকড়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক পরম পরীক্ষা।  

মাকসুদুল হক মাকসুদুল হক অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0
লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতি

নদীর বাঁকে, হাওরের জলে, ধানের শীষে, তাঁতের খটখটে শব্দে কিংবা কুমোরের চাকার ঘূর্ণনে—বাংলার মানুষ প্রতিদিন নিজের অজান্তেই রচনা করেছে এক মহাকাব্যিক শিল্পভাষা। সেই ভাষার নাম লোকায়ত সংস্কৃতি। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার বহু আগে মানুষ অনুভূতি প্রকাশের পথ খুঁজেছে প্রকৃতি ও জীবনসংগ্রাম থেকে। ভাটির নদীমাতৃক জীবনের উদাসীনতায় জন্ম নিয়েছে ভাটিয়ালি, উত্তরবঙ্গের গাড়িয়ালের বিরহ ও পথচলার স্পন্দনে সুর পেয়েছে ভাওয়াইয়া, আর ফসলের মাঠে গর্ভবতী মাটির বন্দনায় উচ্চারিত হয়েছে ধামাইল।   বাউলের একতারায় ধরা দিয়েছে দেহ ও আত্মার জটিল দর্শন; মুর্শিদি ও মারফতি গানে মানুষ খুঁজেছে পরমের সন্ধান। এসব সুরের স্রষ্টারা হয়তো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নন্দনতত্ত্ব জানতেন না, কিন্তু জীবনকে অনুভূতির গভীরতায় দেখার যে ক্ষমতা তাঁদের ছিল, তা তত্ত্বের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়।   ​লোকায়ত বাংলার আরেক বিস্ময় তার নাট্যঐতিহ্য। যাত্রার উচ্চকিত সংলাপ, গম্ভীরার তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, আলকাপের কৌতুক কিংবা পালাগানের দীর্ঘ আখ্যান—প্রতিটি ধারাই নিজস্ব প্রথায় সমাজের সঙ্গে মৌলিক সংলাপ তৈরি করেছে। এখানে কোনো বিলাসী মঞ্চ, আধুনিক আলোকসজ্জা বা কৃত্রিম প্রোপসের প্রয়োজন পড়েনি; মানুষের উপস্থিতি, কণ্ঠের জোর, বডি মেকানিকস ও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সংলাপ রচনার ক্ষমতাই নির্মাণ করেছে এই নাট্যপরিসর। ক্ষমতাবানকে বিদ্রূপ করা, সামাজিক অসংগতি উন্মোচন এবং মানুষের কষ্টকে সম্মিলিত শক্তিতে রূপান্তর করার মধ্য দিয়ে লোকনাট্য হয়ে উঠেছে জনজীবনের এক অনানুষ্ঠানিক ও আপসহীন ভাষ্যকার।   ​নকশিকাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ে যে নারী নিজের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের মানচিত্র এঁকেছেন, মাটির পুতুল কিংবা সরাচিত্র গড়তে গড়তে যে কারিগর রূপের নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করেছেন, কিংবা পটচিত্রে কাহিনি বলতে বলতে যে শিল্পী ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন—তাঁদের সৃষ্টিকে নিছক কারুশিল্প বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এসব শিল্পকর্মে ব্যক্তিগত আবেগ ও সমষ্টিগত স্মৃতি এমনভাবে মিশে আছে যে, প্রতিটি বস্তুশিল্পই নিজের সময়ে একেকটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক দলিল।   ​তবে লোকবিশ্বাসের ভেতরে যেমন প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক সংহতি রয়েছে, তেমনি কোথাও কোথাও জমাট বেঁধেছে অন্ধ সংস্কার ও বৈষম্যের চিহ্ন। লোকসংস্কৃতির প্রকৃত অনুধাবন সেখানেই, যেখানে উত্তরাধিকারের প্রতি গভীর মমতা বজায় রেখেও যুক্তি ও মানবিকতার আলোয় তার সুস্থ মূল্যায়ন করা যায়। ​ সময়ের পরিবর্তনে লোকায়ত শিল্পের পরিসর বদলাচ্ছে। গ্রামের মেলা সংকুচিত হচ্ছে, অনেক পালাগানের আসর হারিয়ে যাচ্ছে, আর পারিবারিক সূত্রে শিল্প শেখার ধারাও শিথিল হয়ে পড়ছে। কেবল অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে লোকশিল্প বাঁচানো সম্ভব নয়। লোকশিল্পীর জীবনমান ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সাহায্যে নতুন প্রজন্মের কাছে একে পৌঁছে দেয়া এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাইরে শিল্পের মূল সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন সময়ের দাবি।   ​লোকায়ত বাংলার আসল শক্তি মানুষের অকৃত্রিম সৃজনশীলতায়, প্রতিকূলতার মধ্যেও আনন্দ নির্মাণের ক্ষমতায় এবং নিজের ভাষায় জগৎকে চেনার স্বাধীনতায়। আধুনিকতার সঙ্গে লোকঐতিহ্যের বিরোধ অনিবার্য নয়; প্রয়োজন এমন এক সৃজনশীল সেতু, যেখানে শেকড়ের গভীরতা নতুন প্রকাশের সাহস জোগাবে। বাংলার লোকসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সেখানেই—যেখানে পুরোনো সুর নতুন কণ্ঠে উচ্চারিত হবে, মাটির শিল্প সমকালীন জীবনের ভাষা খুঁজে পাবে, আর সাধারণ মানুষের সৃষ্টিশীলতাই হবে সংস্কৃতির প্রধান পরিচয়।  

‎শাহ্ জাহাঙ্গীর ‎শাহ্ জাহাঙ্গীর অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0
নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ

কখন যে হৃদয়ের নির্জন প্রদেশে প্রেম এসে নিঃশব্দে বসতি গড়েছে, তা টের পাইনি। বহুদিন পর আজ নিজেকে আবার প্রেমিক মনে হচ্ছে, যেন দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পর শুষ্ক মাটিতে প্রথম বৃষ্টির গন্ধ।   এক মায়াবী মুখ, এক অদ্ভুত উপস্থিতি প্রতিদিন আমার ভাবনার অলিন্দে জন্ম নেয়। দিনের বহু প্রহরে আমি তাকে ভাবি না, বরং সে-ই আমাকে ভাবতে বাধ্য করে। ধীরে ধীরে নিজের ভেতর থেকে সরে গিয়ে তার অনুভূতির ভুবনে আশ্রয় নিচ্ছি। তার ইচ্ছেগুলো আমার কাছে পবিত্র, তার হাসি আমার ক্লান্ত জীবনের একমাত্র ব্যাখ্যা।   ভালোবাসা ঘোষণা দিয়ে আসে না; আত্মার গভীরে নিঃশব্দে শেকড় গাঁথে। আজ আমার মন অন্য কারও দখলে। এ দখল পরাজয় নয়, এক মধুর আত্মসমর্পণ। আমি তাকে ভালোবাসি, যেমন নদী ভালোবাসে সাগরকে—হারিয়ে যাওয়াতেই যার পূর্ণতা।    

মোঃ তাসনিমুল হাসান তানিম মোঃ তাসনিমুল হাসান তানিম অক্টোবর ৯, ২০২৬ 0
বিত্তের উপাসনা বনাম চিত্তের আলো

মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় দুটি চালিকাশক্তি সব সময় সমান্তরালভাবে কাজ করেছে। একটি হলো অর্থ বা বস্তুগত ক্ষমতা, অন্যটি হলো জ্ঞান বা মননশীল প্রজ্ঞা। কিন্তু সভ্যতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব সব সময়ই দৃশ্যমান ও তাৎক্ষণিক বৈষয়িক লাভের পেছনে ছুটেছে। ফলে জ্ঞানীর অমূল্য প্রজ্ঞা ও দিকনির্দেশনা যেখানে নির্জনতায় গুমরে মরে, সেখানে ধনীর আঙিনা মুখরিত থাকে চাটুকার, অন্বেষী ও সুবিধাবাদীদের কোলাহলে। টাকাওয়ালা মানুষের কাছে সমাজের এই অন্ধ ভিড় জমানো এবং জ্ঞানী ব্যক্তির একাকিত্ব কেবল সাময়িক কোনো প্রবণতা নয়, এটি একটি ক্ষয়িষ্ণু সমাজের নৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ।   মানুষ স্বভাবতই অভাবী এবং সে সব সময় তার বর্তমান ও ভবিষ্যতের বস্তুগত নিরাপত্তা খোঁজে। টাকা মানুষকে তাৎক্ষণিক জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্য, ক্ষমতা এবং কৃত্রিম সামাজিক মর্যাদা এনে দেয়। এই লোভ ও জাগতিক নিরাপত্তার তাগিদেই মানুষ ধনীর চত্বরে ভিড় জমায়। এই চিরন্তন মানবীয় দুর্বলতা নিয়ে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো  বলেছিলেন, “টাকা মানুষের চরিত্রের আসল রূপ প্রকাশ করে না, বরং মানুষের ভেতরের লোভ আর স্বার্থপরতাকে টেনে বের করে।” ধনীর চারপাশে যে মানুষের ঢল আমরা দেখি, তা মূলত ব্যক্তির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নয়; বরং তার বিত্তের প্রতি স্বার্থান্বেষী মানুষের লোভের নগ্ন প্রতিফলন।   বাঙালি সমাজ, সাহিত্য ও দর্শনে অর্থের চেয়ে বিদ্যা এবং মনের সমৃদ্ধিকে সব সময়ই উচ্চে স্থান দেয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতার এই নির্মম রূপটি আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের কলমেও বারবার ক্ষোভের সাথে উঠে এসেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের এই বাহ্যিক ধন-সম্পদের পেছনে ছোটার অন্ধত্বকে ইঙ্গিত করে তাঁর ‘কণিকা’ কাব্যে লিখেছিলেন : উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে তিনি মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।   রবীন্দ্রনাথ আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, টাকা মানুষকে সাময়িক অহংকার দিতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের আত্মিক শূন্যতা দূর করতে পারে না। তাঁর মতে, “ধনীর ধন তো কেবল একটা বাহ্য বস্তু, তা মানুষের আত্মাকে তৃপ্ত করতে পারে না। মানুষের আসল পরিচয় তার অন্তরের ঐশ্বর্যে।”   একইভাবে সাম্যের কবি ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাজের এই বৈষম্য ও চাটুকারিতার স্বভাবকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তিনি তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন : পূজারী, দুয়ার খোলো ক্ষুধার ঠাকুর দুয়ারে দাঁড়ায়ে পূজার সময় হলো! ...মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,  নহে কিছু মহীয়ান!   নজরুল বুঝিয়েছেন যে, সমাজ ও রাষ্ট্র টাকার মোহে অন্ধ হয়ে জীবন্ত মানুষকে অবহেলা করে, অথচ পাথরের দেবতা বা ধনীর প্রাসাদে গিয়ে ভিড় জমায়। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থে মানুষের এই রূপকে ‘জীবসত্তা’ বনাম ‘মানব সত্তা’র লড়াই হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থচিন্তার নিগড়ে বন্দি মানুষ কেবল টিকে থাকার লড়াই করে, সে প্রকৃত মানুষের মতো বাঁচতে পারে না। শিক্ষার আসল কাজ জ্ঞান পরিবেশন নয়, মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।”   জ্ঞানী ব্যক্তিরা সমাজকে আলোর পথ দেখান, কিন্তু সেই আলো গ্রহণ করার মতো মানসিক প্রস্তুতি বা সক্ষমতা সবার থাকে না। জ্ঞান মানুষকে রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা প্রায়শই তেতো বা কঠিন হয়। অন্যদিকে ধনী বা ক্ষমতাবানের সান্নিধ্য মানুষকে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে চাটুকারিতার সুযোগ দেয়। বিখ্যাত কালজয়ী শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক ফ্রান্সিস বেকন  শিক্ষার উদ্দেশ্য ও মানুষের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “কিছু মানুষ কেবল কৌতূহল মেটাতে জ্ঞান অর্জন করে, কিছু মানুষ সুনাম ও আভিজাত্য দেখানোর জন্য, আবার অনেকে কেবল অর্থ উপার্জনের জীবিকা হিসেবে; কিন্তু খুব কম মানুষই আছে, যারা মানবকল্যাণে প্রজ্ঞার সঠিক ব্যবহার করার জন্য জ্ঞান চর্চা করে।”   এ বিষয়ে বিশ্বখ্যাত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ একটি চমৎকার খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন, “অধিকাংশ মানুষ বছরে দুই বা তিনবারের বেশি চিন্তা করে না; আমি সপ্তাহে একবার বা দুবার চিন্তা করে বিশ্বখ্যাত হয়েছি।” অর্থাৎ চিন্তাশীল বা জ্ঞানী মানুষের সংখ্যা সমাজে সব সময়ই কম। তাই সাধারণ সমাজ জ্ঞানের মূল্য সহজে বুঝতে পারে না এবং জ্ঞানীর সান্নিধ্য এড়িয়ে চলে, কারণ জ্ঞানচর্চায় ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন হয়, যা অলস মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।   ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও চিন্তাবিদ ইমাম আল-গাজ্জালি মানুষের এই প্রবণতাকে আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “মূর্খরা ধন-সম্পদকে সম্মান করে, আর জ্ঞানীরা সম্মান করে গুণ ও চরিত্রকে। সমাজের পতন তখনই ঘটে, যখন মূর্খদের সংখ্যা জ্ঞানীদের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়।” তাঁর এই উক্তি প্রমাণ করে যে, সমাজে যখন নৈতিক মূল্যবোধের পতন ঘটে, তখন মানুষ শুধু বাহ্যিক জাঁকজমক বা টাকার পরিমাপ দিয়ে মানুষের যোগ্যতা বিচার করতে শুরু করে।   তবে ইতিহাসের সত্য এই যে, ধনীর সম্পদ আজ আছে, কাল ফুরিয়ে যেতে পারে। দেউলিয়া ধনীর পাশে পরদিন আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু জ্ঞানীর সম্পদ কখনো ক্ষয় হয় না। এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ পি জে আব্দুল কালাম বলেছিলেন, “জ্ঞান হলো এমন এক সম্পদ, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না, আর এটি বিতরণের মাধ্যমে কেবল বৃদ্ধিই পায়।”   ধনীর প্রভাব তার জীবদ্দশায় বা তার অর্থের স্থায়িত্ব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল, বার্নাড শ, ফ্রান্সিস বেকন বা রবীন্দ্রনাথের মতো জ্ঞানীরা শত শত বছর ধরে মানবজাতিকে পথ দেখাচ্ছেন। মৃত্যুর পরও মানুষ তাঁদের জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচে, অথচ তৎকালীন বহু কোটিপতির নাম আজ ইতিহাসের ধূলিকণায় হারিয়ে গেছে।   টাকাওয়ালা মানুষের কাছে অন্ধের মতো ভিড় জমানো একটি সাময়িক সামাজিক ব্যাধি ও নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। একটি টেকসই, উন্নত ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে অর্থের চেয়ে প্রজ্ঞার গুরুত্ব অনেক বেশি। চাটুকারিতার সংস্কৃতি বর্জন করে যেদিন সমাজ প্রকৃত জ্ঞানীদের মূল্যায়ন করতে শিখবে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ও নীতি নির্ধারণে প্রজ্ঞার জয় হবে, সেদিনই মানবতার প্রকৃত মুক্তি ঘটবে। বিত্তের চেয়ে চিত্তের আলোই মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখে এই সত্যটি যত দ্রুত আমরা সমষ্টিগতভাবে উপলব্ধি করতে পারব, সমাজের পচন তত দ্রুত রোধ করা সম্ভব হবে।    

নাজমা আশেকীন শাওন নাজমা আশেকীন শাওন অক্টোবর ৯, ২০২৬ 0
মহাবিশ্বের ক্যানভাস

অসীম নীল আকাশের নিচে আমাদের এ পৃথিবী যেন এক বিশাল নাট্যমঞ্চের ক্ষুদ্র চরিত্র মাত্র। এই মঞ্চের আসল নায়ক হলো মহাবিশ্ব আর তার কেন্দ্রে যে শক্তির অবিরাম উৎস, সে হলো নক্ষত্রসমূহ। আমাদের সূর্য সেই অসংখ্য নক্ষত্রের মধ্যে একটি সাধারণ সদস্য হলেও তার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমাদের জীবন, সময়, ঋতু এবং অস্তিত্বের প্রতিটি সূক্ষ্ম সুর। সূর্যকে ঘিরে গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু, উল্কা, গ্রহাণু নিয়ে যে জগৎ, তাকেই আমরা সৌরজগৎ বলি।   রাতে যখন আমরা আকাশের দিকে তাকাই, তখন যে অসংখ্য নক্ষত্রের ঝিলিমিলি আলো দেখা যায়, প্রতিটি আসলে সূর্যের মতোই জ্বলন্ত অগ্নিগোলক। কিন্তু তারা এত দূরে থাকে যে তাদের আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে বহু বছর সময় নেয়। এই আলোকে বলা হয় আলোকবর্ষের দূরত্ব। কোনো নক্ষত্রের আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, সেটাই তার দূরত্বের পরিমাপ। এভাবে আমরা বুঝতে পারি যে মহাবিশ্বের বিস্তার কত অসীম!   সূর্যের জন্ম নিয়েও বিজ্ঞানীদের নানা মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে এক বিশাল গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ সংকুচিত হয়ে সূর্যের সৃষ্টি হয়। এই মেঘকে বলা হয় নীহারিকা। সৌরজগতের ৯৯.৮% ভর সূর্য একাই বহন করে। বাকি ০.২% মিলে অন্যান্য গ্রহ। মহাকর্ষ বলের প্রভাবে এই নীহারিকার কেন্দ্র ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়ে উত্তপ্ত হতে থাকে। তাপমাত্রা এত বেড়ে যায় যে সেখানে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হতে শুরু করে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন। এই ফিউশন থেকেই উৎপন্ন হয় বিপুল পরিমাণ শক্তি, যার আলো ও তাপ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।    সূর্যের চারপাশে যে গ্রহগুলো ঘুরছে, তাদের উৎপত্তিও সেই একই নীহারিকা থেকে। সূর্য যখন গঠিত হচ্ছিল, তখন তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্যাস ও ধূলিকণাগুরো ছোট ছোট পিণ্ডে পরিণত হয়। এই পিণ্ডগুলো ক্রমে বড় হয়ে গ্রহে রূপ নেয়। পৃথিবীও সেই প্রক্রিয়ারই একটি ফল। প্রথমে এটি ছিল অগ্নিগোলকের মতো উত্তপ্ত, পরে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে কঠিন পৃষ্ঠ তৈরি হয়। অনেকে বলেন, প্রতিটি নক্ষত্রের বিকাশের বিশেষ অবস্থায় ক্রমশ এমন একটা সময় আসে, যখন সে পাকা শিমুল ফলের মতো ফেটে গিয়ে প্রচণ্ড বেগে চারদিকে পুঞ্জ পুঞ্জ অগ্নিবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। কোনো কোনো নক্ষত্র থেকে হঠাৎ জ্বলন্ত গ্যাস বেরিয়ে আসতেও দেখা যায়। পুরো মহাবিশ্বে তারার সংখ্যা প্রায় এক কোয়াড্রিলিয়ন অর্থাৎ একের পর ২৪টি শূন্য। আমাদের গ্রহের নিকটবর্তী তারা হলো প্রক্সিমা সেন্টারাই (৪.২৫ আলোকবর্ষ) ও আলফা সেন্টারাই (৪.৩৭ আলোকবর্ষ)।   সূর্যের রয়েছে আটটি গ্রহ, আর গ্রহগুলোয় রয়েছে ১৪৬টি চাঁদ। এ ছাড়া আছে একগুচ্ছ ধূমকেতু, গ্রহাণু ও মহাকাশ শিলা, বরফ এবং প্লুটোর মতো বেশ কয়েকটি বামন গ্রহ। আটটি গ্রহ হলো বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন। পৃথিবী বাদে সবই রোমান দেবতা ও দেবীর নামানুসারে রাখা হয়েছে। মানে মিথোলজি আর অ্যাস্ট্রোনমি একে অপরের সাথে দারুণভাবে জড়িত। বুধ গ্রহ সূর্যের সবচেয়ে কাছে অবস্থিত। নেপচুন সবচেয়ে দূরে। সৌরজগতের সব গ্রহ, গ্রহাণু ও ধূমকেতু আমাদের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তারা সূর্যের চারপাশে একটি সমতল বৃত্তে ভ্রমণ করে, যাকে উপবৃত্ত বলা হয়। সূর্যের চারপাশে যেতে পৃথিবীর হিসাবে এক বছর সময় লাগে। বুধ মাত্র ৮৮ দিনের মধ্যে সূর্যের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। সূর্যের চারপাশে একবার ভ্রমণ করতে সবচেয়ে বিখ্যাত বামন গ্রহ প্লুটোর ২৪৮ বছর সময় লাগে।   চাঁদগুলো গ্রহগুলোকে প্রদক্ষিণ করে। এই মুহূর্তে বৃহস্পতি গ্রহের রয়েছে সবচেয়ে বেশি চাঁদ, ৫০টি। বুধ ও শুক্রের কোনো চাঁদ নেই। পৃথিবীর একটি চাঁদ আছে। এটি আমাদের রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। সূর্য অবশ্যই আমাদের দিনের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। এটি চাঁদ, গ্রহ, ধূমকেতু ও গ্রহাণুগুলোকে আলোকিত করে।   গ্রহগুলোর গতির মধ্যে একটি আশ্চর্য নিয়ম লক্ষ করা যায়। তারা সবাই প্রায় একই সমতলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে এবং একই দিকে ঘুরছে। এই নিয়ম থেকে বোঝা যায় যে তাদের উৎপত্তি একত্রে এবং একই উৎস থেকে। সূর্যের মহাকর্ষ বল তাদের বেঁধে রেখেছে, কিন্তু তাদের নিজস্ব গতির জন্যই তারা সূর্যের মধ্যে পড়ে যায় না। এই ভারসাম্যই সৃষ্টি করেছে সৌরজগতের স্থিতি।   সূর্য নিজেও স্থির নয়। সে নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে। সূর্যের এই ঘূর্ণনের সময়কাল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পরিবর্তিত হয়। এর কারণ সূর্য কোনো কঠিন বস্তু নয়, বরং গ্যাসীয়। তাই তার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ঘোরে। সূর্যের পৃষ্ঠে যে কালো দাগ দেখা যায়, সেগুলো আসলে তুলনামূলক ঠান্ডা অঞ্চল। এই দাগগুলোর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে বাড়ে ও কমে, এবং প্রায় ১১ বছরের একটি চক্র অনুসরণ করে। এই সূর্যকলঙ্কের প্রভাব পৃথিবীর ওপরও পড়ে। আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন, এমনকি বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের আচরণেও এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। বিজ্ঞানীরা গাছের বয়স নির্ণয়ের মাধ্যমে অতীতের সূর্যকলঙ্কের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। গাছের গুঁড়ির বৃত্তাকার রেখাগুলোর ঘনত্ব দেখে বোঝা যায় কোন বছরে সূর্যের কার্যকলাপ কেমন ছিল।   মহাবিশ্বের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর প্রসারণ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ নক্ষত্রসমূহ একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এ ধারণার ভিত্তি হলো, গ্যালাক্সিগুলোর আলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে তারা আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্রসারণের ফলে অতীতে নক্ষত্রগুলো আরও কাছাকাছি ছিল বলে অনুমান করা হয়। এই অবস্থায় নক্ষত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের সম্ভাবনা বেশি ছিল। এমন সংঘর্ষ থেকে বিশাল শক্তির বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা নতুন নক্ষত্র বা গ্রহের জন্ম দিতে পারে। আবার কোনো কোনো নক্ষত্র নিজের মধ্যেই বিস্ফোরিত হয়ে সুপারনোভা সৃষ্টি করে। এই বিস্ফোরণে নক্ষত্রের উপাদান ছড়িয়ে পড়ে মহাশূন্যে, যা থেকে নতুন নক্ষত্রমণ্ডলী গড়ে উঠতে পারে।   নক্ষত্রের অভ্যন্তরে যে শক্তির উৎপত্তি, তা এক আশ্চর্য প্রক্রিয়ার ফল। হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে, এবং এ প্রক্রিয়ায় কিছু ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ অনুযায়ী ভর ও শক্তি পরস্পরের রূপান্তরযোগ্য। এই ক্ষুদ্র ভরের পরিবর্তন থেকেই উৎপন্ন হয় বিপুল শক্তি। সূর্য প্রতিনিয়ত তার ভর থেকে শক্তি হারাচ্ছে। তবুও তার ভাণ্ডার এত বিশাল যে আরও কোটি কোটি বছর ধরে সে আলো ও তাপ ছড়াতে পারবে। কিন্তু একসময় তার জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে। তখন সে লাল দানবে পরিণত হবে এবং পরে সংকুচিত হয়ে সাদা বামন নক্ষত্রে রূপ নেবে।   এই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তবুও এই ক্ষুদ্র পৃথিবীতেই জীবনের বিকাশ ঘটেছে, যা আমাদের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর! সূর্যের আলো, তাপ, এবং স্থিতিশীলতা ছাড়া এ জীবন সম্ভব হতো না। তাই সূর্য শুধু একটি নক্ষত্র নয়, আমাদের জীবনের মূল উৎস। মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন এটি একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে, কেউ বলেন এটি চিরকাল প্রসারিত হতে থাকবে। আবার কেউ মনে করেন সৃষ্টি ও ধ্বংস একসঙ্গে চলছে। এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর এখনো অজানা।   বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, মহাবিশ্ব আরও প্রায় ২২ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী ৩০ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত বাঁচার সম্ভাবনার কথা বলেন। তার মানে, মহাবিশ্বের জন্মের পর থেকে ১৩ বিলিয়নের বেশি সময় চলে গেছে এবং আরও ২২ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকলে মহাবিশ্বের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়কালকে বলা যাবে ৩৫ বিলিয়ন বছর।   একটি বিষয় নিশ্চিত, আমরা যতই জানার চেষ্টা করি, মহাবিশ্ব ততই আমাদের সামনে নতুন রহস্য উন্মোচন করে। আমাদের জ্ঞান যত বাড়ে, ততই বুঝতে পারি কত কিছু অজানা রয়ে গেছে। এই অজানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের কৌতূহল, আমাদের অনুসন্ধান, এবং আমাদের অস্তিত্বের গভীর অর্থ। এই বিশাল জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষ তার ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে যে বিশাল সত্যকে ধরার চেষ্টা করছে, সেটাই মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় সাহস। বিজ্ঞান সেই সাহসেরই এক রূপ, যা আমাদের অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যেতে চায়।  

মুমতাহিনা মেহনাজ অনিভা মুমতাহিনা মেহনাজ অনিভা অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
নজরুলের চোখে প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের সমাজ

বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) সবচেয়ে জনপ্রিয়, যশখ্যাতি ও শিল্পনৈপুণ কবি। রবীন্দ্র যুগে রবীন্দ্র বলয় থেকে মুক্ত হয়ে ব্যতিক্রমী ও প্রতিবাদী কবিতা লিখে খুবই অল্প সময়ে নজরুল যশখ্যাতি অর্জন করেন। ব্রিটিশ শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা লেখা হলেও এই কবিতা এবং অন্যান্য কবিতা যুগ যুগান্তরে সমসাময়িক হয়ে থাকবে।   যুগ থেকে যুগান্তর, কাল থেকে কালান্তর নজরুলের কবিতা সমসাময়িক। নজরুল শুধু বিদ্রোহী ছিলেন তেমন নয়, আপাদমস্তক একজন প্রেমিকও ছিলেন। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে যেমন উঠে এসেছে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ, তেমনি ‘দোলনচাঁপা’তে ফুটে উঠেছে রোমান্টিক প্রণয়। এই বিদ্রোহী কবির জীবনেও প্রেম এসেছে এবং রাঙিয়েছে তাঁর ক্ষণিকের জীবন। কিন্তু প্রেমটা রূপ না পেয়ে বিদ্রোহীটায় রূপায়িত হয়েছে কবির জীবনে। নজরুলই একমাত্র কবি, যাঁর কবিতায় প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের দেখা পাওয়া যায়। তাঁর বাস্তব জীবনেও তিনি যে সাম্যের সুর তুলেছিলেন,সেই সাম্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।   ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলই প্রথম কাগজে কলমে লিখে প্রতিবাদ করেন। তাঁর বিদ্রোহী কবিতায় তাদের অবসান চেয়েছেন। চেয়েছেন তাদের ধ্বংস করতে। তাদের আইনের অনিয়ম উশৃঙ্খল তিনি সাইক্লোনের মতো তাণ্ডব চালিয়ে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। হাজার মাইল দূর থেকে ভরা তরি দিয়ে নিয়ে আসা শোষণের অস্ত্র ভরাডুবি করতে চান। তাঁর কবিতায় একদিকে আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো দাও দাও করে জলে উঠে আবার অন্যদিকে ভারতবাসীকে প্রেমের সুধা পান করিয়ে সাম্যের গান শোনান। নজরুল জাতিকে আপন সুরের মূর্ছনায় মুক্তি দিতে চেয়েছেন। তিনি ‘আপনাকে’ ছাড়া কাউকে কুর্নিশও করেন না। জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ও বাঁচাতে শেখালেন, শিখিয়েছেনও। বিদ্রোহী কবিতায় তার মনোভাব এমন— বল বীর— বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর।   তিনি বিনয়কে প্রশ্রয় দিতে চান না। যে বিনয় মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্রে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায় না তাকে তিনি নৃশংস করে দিতে চান। কবির ভাষায়— আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস মহাপ্রলয়ে আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!   তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ কাব্য একদিকে রাজনৈতিক বিদ্রোহী মনোভাব, অন্যদিকে ব্রিটিশদের ভয়ের কারণ। অগ্নিবীণা কাব্যই বাঙালিসহ পুরো ভারতবাসীকে প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। সংগ্রাম ও বিপ্লব ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব নয়, সেটা নজরুল বুঝতে পেরেছেন। সে জন্য তাঁর প্রথম কাব্যও বিপ্লবী। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নজরুল আঙুল তুলে প্রতিবাদ করেছেন। ‘প্রলয়োল্লাস’-এ তিনি বলেন— তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়। তোরা সব জয়ধ্বনি কর!   ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় তিনি বাঙালি নারীর অন্তর্জালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অগ্নিশ্বেতের যশ তুলে দিয়েছেন। তিনি বলেন— রক্তাম্বর পর মা এবার জলে পুড়ে যার শ্বেত বসন। দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন বাজে তরবারি ঝনন-ধন সিঁথির সিঁথু মুছে ফেল মাগো জ্বাল সেথা জ্বাল কা্ল চিতা।   ‘ধূমকেতু’ কবিতায়ও তাঁর বিদ্রোহ মনোভাবকে উপেক্ষিত করতে পারেননি। ‘ধূমকেতু’ কবিতায় যে বিপ্লবী চেতনা নজরুলের, তা স্পষ্ট ভীম ভাসমান মাইনের মতোই।  তিনি বলেন— আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু! এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু সাত-সাতশো নরক জ্বালা জ্বলে মম ললাটে।  মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে।   নজরুলের নাম শুনলেই আমাদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা পোষণ করে তিনি একজন বিদ্রোহী কবি। কিন্তু নজরুল একজন সত্যিকারের প্রেমিক, তা খুবই অল্প চোখে পড়ে। বিদ্রোহের মধ্যেও তিনি প্রেমকে রূপায়িত করেছেন। প্রেম মানুষকে করে মানবিক। প্রেমকে তিনি ভুলে যেতে পারেননি। ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যে তার প্রেমের প্রতিফলন ঘটেছে। আর এই প্রেমের পেছনে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যেই পরিবর্তন হয়েছে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করে বলেন— হে রস শেখর কবি, তব জন্মদিনে আমি কয়ে যাব মোর নবজন্ম-কথা। আনন্দ সুন্দর তব মধুর পরশে অগ্নিগিরি-গিরি মল্লিকার ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে! জুড়ায়েছে সব দাহ জ্বালা।   এ কাব্যে প্রেমের বেদনা, প্রেমকে মহিমান্বিত করা এবং প্রেমের আনন্দ অনুভব করা নিয়ে কবির রোমান্টিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে। বাদল দিনে প্রেমিকাকে বলেন— ব্যাকুল বনরাজি বসিছে ক্ষণে ক্ষণে সজনী! মন আজি গুমরে মনে মনে। বিদরে হিয়া মম  বিদেশে প্রিয়তম এজনু পাখী সম  বরিষা জর-জর।   ‘চৈতী হাওয়া’ কবিতায় কবির প্রেমিকাকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে। এক চৈত্রে প্রেমিকার সাথে হাত ধরে পুকুরঘাটে হেঁটেছেন, পাখির সুর শুনেছেন। কিন্তু পরবর্তী চৈত্রে প্রেমিকার শূন্যতা অনুভব করে কবি বলে— বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুমরে ওঠে মন পেয়েছিলাম এমনি হাওয়ায় তোমার পরশমন।   দিঘির পাড়ে যেমন ফুল ফুটে দিঘিকে সাময়িক সুন্দর করে তোলে, তেমনি কবির জীবনকেও প্রেম এসে রং তুলেছিল। কিন্তু তা ছিল ক্ষণিকের মতো। কবি বলেন— শূন্য ছিল নিতল দিঘির শীতল কালোজল কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল?   নজরুলই প্রথম কবি, যিনি সাম্যের কবিতা লিখে সব ধর্মের ভেদাভেদকে ভুলে মানবতাকে ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। শুধু স্থান দিয়েই ক্লান্ত হননি, বাস্তব জীবনেও তার প্রভাব দেখা যায় নার্গিসের পর প্রমিলাকে বিয়ে করা এবং সন্তানদের নাম রাখা। এমন সাহসী ও মানবতাবাদী কবি বাংলা সাহিত্যে বিরল। ধর্মের নামে এই ভারতবর্ষে তথা বাঙালিদের মধ্যে এক সাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ বোনেন, যার ফলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে দেশান্তর হতে হয়েছে। রাস্তায় মৃত্যুর লাশে ভর্তি ছিল। নজরুলের মনে এসবের দাগ কাটে এবং তিনি সব ধর্মকে না দেখে মানুষের চোখে দেখে সাম্যের গান গেয়েছেন।   ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি বলেন— গাহি সাম্যের গান— যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান।   মানুষ পরিচয়কে তিনি বড় করে দেখেছেন। কেননা মানুষই মানুষকে কাছে টেনে নেয়। কিন্তু ধর্মের নামে অধার্মিকের সাম্প্রদায়িকতা মানুষকে বলি করে। তাই নজরুল তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় বলেন— গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি সবদেশে, সবকালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।   নজরুলের তিনটি কাব্য (অগ্নিবীণা, দোলনচাঁপা ও সাম্যবাদ) বাংলা সাহিত্যে অমর ও শাশ্বত। প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যচর্চা কবিজীবনকে করেছে ভিন্ন মাত্রার ভিন্ন শিল্পী। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব এবং লেটো দলে যোগদান কবির জীবনকে মুক্ত করে তুলেছে। তরুণ বয়সেই নজরুল তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তাঁকে বিদ্রোহ করে তুলেছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের শাসন নজরুলকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। অঞ্চলের প্রভাবও নজরুলের মধ্যে প্রভাবিত করেছে। আসানসোলের চুরুলিয়া অঞ্চল ছিল রুক্ষ এবং কিছুটা ফসলহীনতার। ফলে নজরুলের মনোভাবও সেভাবে গড়ে ওঠে।   আধুনিক সময়ে নজরুলকে নিয়ে এবং তাঁর সাহিত্য নিয়ে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা ফলশ্রুতি নয়। এই কবিকে নিয়ে আরও বিস্তৃত এবং গবেষণা করা উচিত। তাঁর কবিতার ফলে সাহিত্য নতুন ধারার রূপায়ণ হয়েছে। নজরুলের সাম্যের সমাজ ইউরোপীয় ভাবধারার নয়, বরং হাজার বছরের ভারতীয় ভাবধারার সাম্যের সমাজ। এই সাম্য তখন পর্যন্ত ছিল, যখন বিদেশিরা ভারত উপমহাদেশে আসেনি। বাইরে থেকে এসে তারা ভারতীয় সাম্যকে বিনষ্ট করে দিয়েছে। নজরুল সেই সাম্যকে উজ্জীবিত করতে সারা জীবন আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। যতদিন না নজরুলের এই সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে, ততদিন সাম্প্রদায়িকতা আমাদের গ্রাস করবে।   কবিতার শব্দ যেন একেকটা আগুনের গোলা। প্রেমের শব্দগুলো যেন স্বর্গীয় সুখাচ্ছন্দে লেখা। নজরুলকে নিয়ে এই সময়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন।      

শহীদুল ইসলাম শুভ শহীদুল ইসলাম শুভ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
কেতকী কুশারী ডাইসন : দুই ভাষা, দুই ভূগোলের মধ্যে এক সেতুর অবসান

বাংলা সাহিত্য আজ এক গভীর ক্ষতির সম্মুখীন। প্রয়াত হলেন কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, অনুবাদক, গবেষক ও সাহিত্যসমালোচক কেতকী কুশারী ডাইসন (১৯৪০–২০২৬)। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণ শুধু একজন বিশিষ্ট লেখকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক পরিসরের অবসান। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর স্বামী রবার্ট ডাইসন এবং দুই পুত্র ভার্জিল পূজারী ডাইসন ও ইগর নীলাদ্রি ডাইসন তাঁকে রেখে গেছেন।   কেতকী কুশারী ডাইসন ছিলেন এমন এক লেখক, যাঁকে কোনো একটি ভূগোল, ভাষা বা সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি কলকাতায় জন্মেছিলেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গভীরে বেড়ে উঠেছিলেন, পরে অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ব্রিটেনে স্থায়ী হন। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো তাঁকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং প্রবাসের দূরত্ব তাঁর বাংলা-সত্তাকে আরও গভীর, আরও আত্মসচেতন করে তুলেছিল। তাঁর নিজের ভাষায়, তাঁর লেখক-পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দ্বিভাষিকতা ও দ্বিসাংস্কৃতিকতা—বাংলা ও ইংরেজি, ভারত ও ব্রিটেন, দেশ ও প্রবাসের মধ্যে এক সক্রিয় যাতায়াত।    তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা খুব অল্প বয়সেই। ষাটের দশক থেকে তিনি বাংলা সাহিত্যপত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন; দেশ-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ছাত্রজীবন থেকেই সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চায় তাঁর আগ্রহ ছিল। বাংলা কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, ইংরেজি কবিতা, অনুবাদ, গবেষণা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। তাঁর রচনার তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সাহিত্যিক ঘরানার লেখক ছিলেন না; তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বহুমাত্রিক।    কেতকীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দ্বিভাষিক সত্তা। বাংলা ও ইংরেজিকে তিনি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাষা হিসেবে দেখেননি। বরং দুই ভাষাকে তিনি দুটি আলাদা জানালা হিসেবে ব্যবহার করেছেন—যে জানালা দিয়ে একই পৃথিবীকে ভিন্ন ভিন্ন আলোয় দেখা যায়। তাঁর বাংলা যেমন প্রবাসের অভিজ্ঞতা বহন করেছে, তেমনই তাঁর ইংরেজি লেখার মধ্যে ভারতীয়, বিশেষত বাঙালি সাংস্কৃতিক স্মৃতি প্রবলভাবে উপস্থিত থেকেছে। এ কারণেই তাঁকে শুধু ‘প্রবাসী বাঙালি লেখক’ বলা যথেষ্ট নয়। তিনি ছিলেন এক অর্থে দেশান্তরিত হয়েও মাতৃভাষার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করা এক সাহিত্যিক।   তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি কখনো বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। প্রকৃতি, প্রেম, নারী, শরীর, মাতৃত্ব, যুদ্ধ, হিংসা, অভিবাসন, সাংস্কৃতিক পরিচয়—সবই তাঁর কবিতার বিষয় হয়েছে। তাঁর ইংরেজি কবিতা দ জুন মাগ্নিফিসিয়েন্ট এর মতো রচনায় ব্যক্তিগত প্রকৃতিচেতনা হঠাৎ যুদ্ধ ও মানবিক বর্বরতার ভয়াবহতার সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতাকে নিছক আত্মকথন থেকে বৃহত্তর মানবিক বিবেকের কবিতায় পরিণত করেছে।    বাংলা সাহিত্যে তাঁর উপন্যাস ও অন্যান্য গদ্যরচনাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’, ‘নারী’, ‘নগরী’, ‘জল ফুঁড়ে আগুন’, ‘তিসিডোর’, ‘চলন্ত নির্মাণ’, ‘ভাবনার ভাস্কর্য’, ‘শিকড় বাকড়’ প্রভৃতি রচনায় ব্যক্তিমানুষ, সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জটিল সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়েছে। তিসিডোর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—বাংলা সাহিত্য, ইউরোপীয় জীবন এবং স্মৃতির নানা স্তরকে এক বহুস্বরিক কাঠামোয় নিয়ে আসার এক অভিনব প্রয়াস। তাঁর নাটকগুলোও তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্যিক প্রতিভার পরিচায়ক।   তবে কেতকী কুশারী ডাইসনের সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি নিঃসন্দেহে রবীন্দ্র-গবেষণা ও অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা বাংলা ও আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অধ্যায়কে নতুনভাবে উন্মোচিত করেছে।  রবীন্দ্রনাথের শিল্প, বিশেষত তাঁর চিত্রকলা নিয়েও তিনি গভীরভাবে কাজ করেছেন।   রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি ভাষার বৃহত্তর পাঠকমণ্ডলীর কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। তিনি অনুবাদকে কেবল ভাষান্তর হিসেবে দেখেননি; তাঁর কাছে অনুবাদ ছিল সংস্কৃতির মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠার একটি সৃজনশীল কাজ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও অন্যান্য রচনার তাঁর ইংরেজি অনুবাদ বিভিন্ন সংকলন ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে।   কেতকী কুশারী ডাইসনের সাহিত্যচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীবাদ, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতাকে তিনি কেবল নস্টালজিয়ার বিষয় করেননি। বরং প্রশ্ন তুলেছেন—একজন মানুষ যখন এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে যায়, তখন তার পরিচয় কীভাবে বদলায়? মাতৃভাষা কি ভৌগোলিক সীমান্ত পেরিয়ে টিকে থাকতে পারে? নারী কি একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ, দেশ, ভাষা ও ব্যক্তিসত্তার নানা প্রত্যাশা বহন করতে পারে?   এই প্রশ্নগুলোই তাঁকে তাঁর সময়ের অনেক লেখকের থেকে পৃথক করেছে। তাঁর সাহিত্য ছিল পরিচয়ের রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন, কিন্তু কখনো সরল রাজনৈতিক স্লোগানে পর্যবসিত হয়নি।   তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে একধরনের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা ছিল। তিনি প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে সহজে মেনে নিতেন না। বাংলা সাহিত্যকে তিনি ভালোবাসতেন, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের আত্মতুষ্টিকে প্রশ্ন করতেও দ্বিধা করেননি। ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন, কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি দায় কখনো বিসর্জন দেননি। প্রবাসে থেকেও বাংলা পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। ফলে ‘দেশে থাকা’ এবং ‘দেশের বাইরে থাকা’—এই প্রচলিত দ্বৈততাকে তাঁর জীবন ও সাহিত্য অনেকটাই অস্বীকার করেছে।    তাঁর জীবন যেন নিজেই একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রা—কলকাতা থেকে অক্সফোর্ড, বাংলা থেকে ইংরেজি, ভারত থেকে ব্রিটেন, ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে বিশ্ব-ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথ থেকে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, নারী-অভিজ্ঞতা থেকে অভিবাসী-পরিচয়। কিন্তু এসব যাত্রার কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—আমি কে, এবং কোন ভাষায় আমি আমার অস্তিত্বকে সবচেয়ে সত্য করে বলতে পারি? সম্ভবত এখানেই কেতকী কুশারী ডাইসনের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক উত্তরাধিকার।   আজ তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য একজন লেখককে হারাল, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে গেল। প্রবাসী সাহিত্য মানে কেবল দেশকে মনে করা নয়; দ্বিভাষিক সাহিত্য মানে কেবল দুটি ভাষায় লেখা নয়; অনুবাদ মানে কেবল এক ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় বসানো নয়। এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে নতুন পরিচয়, নতুন পাঠ এবং নতুন সাংস্কৃতিক সংলাপ সৃষ্টি করা যায়—কেতকী কুশারী ডাইসনের জীবন ও সাহিত্য তারই প্রমাণ।   তিনি চলে গেলেন, কিন্তু বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক, তা কোনো ভূগোলের সীমান্তে থেমে থাকবে না। তাঁর কবিতা, তাঁর গবেষণা, তাঁর রবীন্দ্রচর্চা, তাঁর অনুবাদ, তাঁর নারীবাদী ও প্রবাসী চেতনা, তাঁর দ্বিভাষিক সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনবে।   কিছু মানুষ মৃত্যুর পর অনুপস্থিত হন; কিছু মানুষ মৃত্যুর পর আরও গভীরভাবে উপস্থিত হয়ে ওঠেন। কেতকী কুশারী ডাইসন সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। বাংলা সাহিত্যের এক বিশ্বনাগরিক কণ্ঠের প্রতি শেষ প্রণাম।

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
হিটলার : ধ্বংস ও সৃষ্টি

মানব ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ব্যক্তিদের একজন হলেন অ্যাডলফ হিটলার, যাঁর নাম লেখা আছে কলঙ্কের কালিতে। হিটলারকে নিষ্ঠুর খলনায়ক হিসেবে চিন্তা করাটা যতটা সহজ, তার চেয়েও কঠিন একজন শিল্পী হিসেবে কল্পনা করা। হ্যাঁ, লাখ মানুষের প্রাণ হননকারী হিটলারের মধ্যেও লুকিয়ে ছিল এক শিল্পীমন। বলাই বাহুল্য যে হিটলার যদি সুযোগ পেতেন তার চরিত্রের এই দিকটি উন্মোচন করার, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ হতো ভিন্ন।   অ্যালুইস হিটলারের তৃতীয় স্ত্রী ক্লারার গর্ভে ১৮৮৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন হিটলার। ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর উগ্র মেজাজ, হরহামেশাই বাকবিতণ্ডায় জড়াতেন বাবার সাথে। অনেক মারও খেতেন বাবার হাতে। অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে জার্মান জাতীয়তাবাদের ভূত ঢুকে গিয়েছিল, যদিও তিনি জন্মসূত্রে অস্ট্রিয়ান; হাবসবার্গ রাজতন্ত্র তখন তাঁর মৃত্যুশয্যায়। তাই তরুণদের মাঝে ওইরূপ মনোভাব খুব একটা বিরল ছিল না।   মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে বড়সড় ধাক্কা খান তিনি। ততদিনে হিটলার সোজা কথায় বখে গিয়েছিলেন। তাই ওই বয়সে বাড়ি ছাড়তে চাইলে তার মা-ও আর বাধা দেননি। স্কুলও ছেড়ে দিলেন তিনি। অবশেষে ১৯০৭ সালে লিন্জ ছেড়ে পাড়ি জমালেন ভিয়েনায়; উদ্দেশ্য চিত্রকলা অধ্যয়ন করবেন। এতিম ভাতা আর মায়ের সাহায্যে আবেদন করলেন ‘Academy of Fine Arts Vienna’-তে, কিন্তু ভাগ্য তার প্রতি ছিল নির্দয়। একবার নয় বরং দুবার প্রত্যাখ্যান করা হয় তাঁকে। তাঁর চিত্রকর্ম দেখে পরিচালক পরামর্শ দিয়েছিলেন হিটলারের উচিত স্থাপত্যবিদ্যায় অধ্যয়ন করা; কিন্তু সেটা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা তাঁর ছিল না। একই বছর মাকে হারিয়ে একদম ছন্নছাড়া হয়ে পড়েন তিনি।   তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন আজকের প্রতিপাদ্য নয়, বরং চলুন ঢুঁ মারা যাক তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্মের দুনিয়ায়। ‘Academy of Fine Arts Vienna’-র পরিচালক কেন হিটলারকে স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার জন্য বলেছিলেন, তা তাঁর চিত্রকর্মের ‘সাবজেক্ট ম্যাটার’-এর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তিনি ভবন, স্থাপত্য আর ল্যান্ডস্কেপ আঁকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বলা হয়, তিনি গ্রেকো-রোমান ক্লাসিজম, ইতালীয় রেনেসান্স এবং নিও-ক্লাসিজম দ্বারা বেশ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। রুডলফ ফন আল্ট যিনি তাঁর ভাবগুরু ছিলেন, তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন।   ১৯১৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে যোগ দেন প্রথম মহাযুদ্ধে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জার্মান ফ্রন্টিয়ারে তিনি, তাঁর কাজ ছিল বার্তা আদান-প্রদান করা। পশ্চিম রণাঙ্গনের ধ্বংসের মধ্যেও খাতা আর পেন্সিল নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটত তাঁর ছবি এঁকে। যুদ্ধ শেষের সাথে সাথে যেন মৃত্যু ঘটল তাঁর শিল্পসত্তার; পুরোদমে নেমে পড়লেন রাজনীতিতে। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে কঠিন অবস্থান, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং সবশেষে ভোটের মাধ্যমে জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়া; এক অবিশ্বাস্য উত্থান পর্ব।   হিটলারের মৃত্যুর পর তাঁর আঁকা বিশাল সংখ্যক ছবি মার্কিন সেনারা জব্দ করে নিয়ে যায় আমেরিকায়। যদিও তা সাধারণ প্রদর্শনের অনুমতি পায় না। বাকি অনেক ছবি ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের সংগ্রহে আছে, যা বিভিন্ন সময়ে নিলামে বিক্রি হয়েছে। ২০১৫ সালে তাঁর আঁকা ১৪টি চিত্রকর্মের একটি সংগ্রহ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। একক সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হওয়া চিত্রকর্মটি হলো ‘Standesamt und Altes Rathaus München’, যার দাম উঠেছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ডলার।   হিটলার শিল্পী হিসেবে বরেণ্য বা উচ্চমার্গীয় ছিলেন কি না তা তর্কের বিষয়, তবে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধের উদ্দেশ্য হরো হিটলারের শিল্পী মনের উদ্ঘাটন করা। শিল্প এমন এক বস্তু, যা সৃষ্টি ও ধ্বংস দুইয়ের মাঝেই বিরাজমান।

মোহাম্মদ মিনহাজ মোহাম্মদ মিনহাজ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
জুতা নিয়ে যত কথা

পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। মানুষ পোশাকের সাথে ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলার জন্য যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়, তা হলো জুতা। জামা-কাপড়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জুতা মানুষকে যেমন ব্যক্তিত্ববান করে, তেমনি করে তোলে আকর্ষণীয়। এমন কোনো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ পাওয়া যাবে না, যে কোট-টাইয়ের সাথে স্যান্ডেল পরে। আবার এমন রুচিহীন কাউকে পাওয়া যাবে না, যে পায়জামা-পাঞ্জাবির সাথে বুট জুতা পরে। বুট জুতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোটা পোশাকের সাথে যতটা মানানসই, পায়জামা-পাঞ্জাবর সাথে ততটাই বেমানান। শেরওয়ানির সাথে এক বিশেষ ধরনের রাজকীয় জুতার আভিজাত্য বরকে মুহূর্তের মধ্যেই রাজপুত্র বানিয়ে ফেলে।   শীতকালে কাপড়ের জুতার কদর বেড়ে যায়। বর্তমানে সচেতন মানুষ হাঁটার জন্য বাহারি রকমের কেডস পরে। জুতা নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনার শেষ নেই। পায়ের সমস্যাজনিত কারণে বাজারে ডক্টর সু নামে বিশেষ একধরনের জুতা পাওয়া যায়। ছোট শিশুরা হাঁটতে শিখলে তাদের পরিয়ে দেয়া হয় বাঁশিওয়ালা জুতা। কোনো কারণে বাঁশি বন্ধ হলে শিশু বন্ধ করে হাঁটা এবং শুরু করে কান্না। আজ থেকে প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে গ্রামের মুরুব্বিরা প্লাস্টিকের একধরনের শু পরতেন, যা নাগরা জুতা নামে পরিচিত ছিল। নাগরা জুতার আধুনিক সংস্করণই মনে হয় লোফার, যা বর্তমানে কচিশীল মানুষের পছন্দের তালিকার শীর্ষে।   শীতকালে নরম তুলাজাতীয় কাপড় দিয়ে একধরনের জুতা বানানো হয়, যা রুমের মধ্যে ব্যবহার করা খুব আরামদায়ক। গ্রামের আধুনিক কৃষক মাঠে কাদায় কাজ করার জন্য হাঁটু পর্যন্ত লম্বা প্লাস্টিকের যে জুতা ব্যবহার করে, তাকে গামবুট বলে। খেলার মাঠে ফুটবলাররা তাঁদের খেলার নৈপুণ্য বৃদ্ধির জন্য বুট পরে খেলেন, যার তলদেশে লোহার স্পাইক থাকে, যা দৌড়ানোর জন্য বিশেষভাবে কাজে লাগে। জুতা পায়ে পরার সামগ্রী হলেও বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারস্বরূপ গোল্ডেন বুট অতিশয় গৌরবের বিষয়। অতীতে মানুষ জুতা পরতই না বললে চলে, আর বর্তমানে মানুষ জুতা খোলে না বললেই চলে। ঘরে-বাইরে এমনকি জুতা পায়ে দিয়েই আধুনিক সভ্য মানুষ বাথরুমে গোসল পর্যন্ত করে। সুতরাং এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, জুতা মানুষের নিত্যসঙ্গী।   নিকট অতীতে গ্রাম্য সালিশে শাস্তিস্বরূপ অপরাধীকে জুতার বাড়ি দেয়া হতো। অপরাধের মাত্রা খুব বেশি হলে তখন অপরাধীর গলায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রামজুড়ে ঘোরানো হতো। এটা অপরাধীর জন্য চরম অবমাননাকর ছিল। গ্রামীণ অপরাধ দমনে সেই সময়কার গ্রাম্য বিচারকরা এই জুতাকেই শাস্তির মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতেন। অনেক ছিঁচকে চোর কিংবা অপরাধী অপরাধ করে ঘটনাস্থলে জুতা ফেলে যেত, যার মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হতো। জুতার মাধ্যমে খারাপ লোককে শায়েস্তা করার দৃষ্টান্ত গ্রামের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব দরবারেও দেখা যায়। জর্জ জুনিয়র বুশের প্রতি প্রচণ্ডভাবে ক্ষিপ্ত এক যুবক তাঁর পায়ের জুতা খুলে বক্তৃতা দানকালে জর্জ বুশের দিকে ছুড়ে মারেন। বিশ্ব মিডিয়ায় বিশ্ব মোড়লকে হেনস্তা করার এমন খবর গুরুত্বের সাথে জায়গা করে নেয়। শুধু তা-ই ন,য় প্রতিবাদের অস্ত্রস্বরূপ সেই জুতা চড়া দামে নিলামে বিক্রি হয়।   এই জুতা শুধু অপরাধী ও অপরাধকর্মের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং আধ্যাত্মিক গুরু, ধর্মীয় পুরোহিত, কামেল পির সাহেবদের জুতার খুবই কদর। ভক্তরা তাঁদের নেতা কিংবা পির সাহেবকে জুতা পরিয়ে দেয়া কিংবা জুতা খুলে দেয়ার সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের বিষয় মনে করে। অনেকে আবার জুতা টেনে বড় নেতাও হয়ে যায়।   পৃথিবীজুড়ে গরুর চামড়ার জুতার খুবই চাহিদা। একসময় আমাদের দেশে এক কেজি গরুর মাংসের মূল্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা ছিল। সেই সময়ে একটি বড় সাইজের গরুর চামড়ার মূল্য ছিল ৩০০০ থেকে ৪০০০ টাকা। এ প্রসঙ্গে আরও বলা যেতে পারে, সেই সময়ে এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। বর্তমানে ছিনতাইকারীরা যেমন রাস্তাঘাটে মহিলাদের গলার চেইন, কানের দুল, ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই করে, সেই সময়ে নিষ্ঠুর কিছু মানুষ শুধু চামড়ার জন্য তাজা গরু ছিলে চামড়া নিয়ে যেত আর চামড়াবিহীন গরু ফেলে যেত।   বর্তমান সময়ে জুতা চুরির ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। বিশেষ করে, জুতাচোররা মসজিদকে তাদের এই অপকর্মের জন্য উপযুক্ত স্থান মনে করে। শহরের ব্যস্ত এলাকার মসজিদগুলোয় জুতা চুরির ঘটনা বেশি ঘটে। এ চুরি ঠেকানোর জন্য মসজিদ কমিটির নানামুখী উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। মসজিদের ভেতরে প্রতিটি কাতারের মাঝে জুতা রাখার বাক্স স্থাপন, মসজিদগুলোতে জুতা সংরক্ষণের জন্য আলাদা কর্নার ও লোক নিয়োজিত রাখা ইত্যাদি। জুতা রেখে টোকেন নিয়ে নামাজিরা মসজিদে প্রবেশ করেন। এ ছাড়া মুসল্লিদের সচেতন করার জন্য নানা রকম স্টিকার লাগানো থাকে। যেমন ‘জুতাচোর হতে সাবধান’, ‘নিজ দায়িত্বে জুতা রাখুন’।   শুধু মসজিদে নয়, বাসাবাড়ি থেকে প্রতিনিয়ত জুতা চুরি হয়। পুরোনো হাঁড়ি, পাতিল, কাপড়, খাতা ও প্লাস্টিকের ভাঙা জিনিস কেনার হকার থাকলেও পুরোনো জুতা কেনার হকার শহর কিংবা গ্রামে দেখা যায় না। তার পরও শহরের ফুটওভার ব্রিজের নিচে বড় বড় রাস্তার পাশে পুরোনো জুতার শত শত দোকান লক্ষ করা যায়। তাহলে এই পুরোনো জুতাগুলো বিক্রেতা কীভাবে এবং কার কাছ থেকে সংগ্রহ করে ব্যবসা করছে, তা সত্যিই চিন্তার বিষয়।   জুতা নিয়ে যেমন অনেক প্রবাদ-প্রবচন আছে, সেই সাথে অনেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্মও আছে। গরু মেরে জুতা দান  প্রবাদটি কে না জানে? নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রবাদটি কমবেশি সবার জানা। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ‘অলুক্ষনে জুতা’ বাংলা সাহিত্যের একটি অসাধারণ গল্প। আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ রম্য কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে অনন্য সম্পদ। এই রম্য কবিতায় জুতা আবিষ্কারের অন্তরালে কবি একটি সমস্যা ও তার সমাধানের বিচিত্র আয়োজন, ছন্দ ও রূপকের যে ব্যবহার করেছেন, তা পাঠকের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে বিশেষভাবে। পাশাপাশি অতি সামান্য বিষয়ও একজন রাজার কৌতূহল ও মন্ত্রিপরিষদের দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে, তা এ কবিতায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রাজ্যের সর্বশক্তি নিয়োগ করেও যখন সমস্যার সমাধানে মন্ত্রীবর্গ ব্যর্থ, তখন এই চরম সংকটে রাজপরিষদের সকলের দুর্ভাবনা দূর করার জন্য সমাজের অস্পৃশ্য চর্মকারের বুদ্ধিমত্তায় জুতা আবিষ্কারের কাব্যিক বর্ণনা ও দার্শনিক সত্য প্রকাশে বিশ্বকবির অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয় মেলে।   বর্তমানে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণ, নির্বিচারে মানুষ হত্যা, বিশেষ করে নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর এমন করুণ দৃশ্য সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। বিবেকবান মানুষের অন্তরে যে কান্নার রোল বাজছে, তা আজ বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সারা পৃথিবীর মুসলমান এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়। মুসলমানদের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাইতুল আকসা মসজিদ পুনরুদ্ধার প্রত্যেক মুসলমানের মনের দাবি। স্বাধীন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের গাজাবাসী আবার তাদের স্বপ্নের আবাসন গড়ে তুলবে এটাই মুসলমানের প্রত্যাশা। এই অন্যায়ের প্রতিবাদস্বরূপ আইনশৃঙ্খলার অবনতি কিংবা হঠকারী কোনো কাজ করা উচিত না। কিন্তু কিছু সুযোগসন্ধানী, লোভী ও মোটা বুদ্ধির মানুষ, যারা প্রতিবাদের নামে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন জুতার দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে, ইসলামি দৃষ্টিতে এটা প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। তাই সকলের উচিত, এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা।  

মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ 0
‎শিল্পের মহাকাব্যিক পুনরাবৃত্তি

শিল্পের সুতোয় বাঁধা অনুভূতির কোনো ক্ষয় নেই। নদী তার জলপ্রবাহ বদলে ফেললেও মোহনার টান যেমন অটুট থাকে, নাট্যমঞ্চের আত্মিক বন্ধনও ঠিক তেমনই চিরন্তন।    ‎দীর্ঘ ২৬টি বছর পেরিয়ে সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণে আবারও মিলিত হলো একদল মানুষ, যাদের একদিন একই মঞ্চ, একই স্বপ্ন আর একই নাট্যসাধনা একসূত্রে বেঁধেছিল।বর্তমানের সঙ্গে অতীতের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধ রচিত হলো সেখানে। ‎ ‎স্মৃতির সূত্র ধরে ফিরে যেতে হয় ২০০০ সালের সেই দিনগুলোতে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমি, ফরিদপুরের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিন মাস মেয়াদি এক নিবিড় প্রযোজনাভিত্তিক নাট্যকর্মশালা।  ‎ ‎সেই নাট্যযজ্ঞের পলিমাটি থেকেই জন্ম নিয়েছিল কালজয়ী প্রযোজনা ‘বাগদী ধীরুয়াল’। নাট্যরচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন ওই কর্মশালার মুখ্য প্রশিক্ষক, বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় ড.আরিফ হায়দার স্যার। তাঁর নির্দেশনায় নব্বই দিনের কায়িক ও আত্মিক সাধনা ফরিদপুরের একদল তরুণ নাট্যপ্রাণ মানুষের ভেতরে যে শিল্পবীজ রোপণ করেছিল, সময়ের ঝড়-ঝাঁপটা কিংবা দূরত্ব—কোনো কিছুই তা নিঃশেষ করতে পারেনি। দুই যুগ পর তারই সবুজ পাতা আবার দৃশ্যমান হলো স্মৃতির আলোয়। ‎ ‘বাগদী ধীরুয়াল’ দলের শেকড়ের কাছে ফেরা, গুরুর পাদপীঠে নাট্যশিষ্যদের বিনম্র প্রত্যাবর্তন। একদিন যাঁর হাত ধরে মঞ্চের ভাষা ও শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা শেখা হয়েছিল, তাঁর সান্নিধ্যে ফিরে এসে প্রত্যেকেই যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া একটি অংশ পুনরুদ্ধার করল। ‎ ‎হয়তো কারও চুলে রুপালি রেখা, কারও মুখে বয়সের ছাপ, কিন্তু মঞ্চের স্মৃতিতে তারা তখনো সেই ২০০০ সালের তরুণেরা—স্বপ্নে উজ্জ্বল, নাটকের নেশায় বিভোর। গুরুর সাথে শিষ্যদের সেই  মিলনমেলায় অলক্ষে থমকে দাঁড়িয়েছিল সময় নিজে; মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসেছিল একটি পুরোনো সকাল, একটি মহড়া, একটি মঞ্চ, কিছু অমলিন মুখ। ‎ ‎সময়ের মহাকাব্যে কিছু অধ্যায় লেখা হয় কালি দিয়ে, আর কিছু লেখা হয় মানুষের হৃদয়ে। এই পুনর্মিলন সেই হৃদয়লিখিত অধ্যায়গুলোরই একটি। বাংলা নাট্যাঙ্গনের ইতিহাসে চিরকাল এক মহাকাব্যিক অধ্যায় হয়ে বেঁচে থাকবে। ‎

‎শাহ্ জাহাঙ্গীর ‎শাহ্ জাহাঙ্গীর সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
শব্দের বাতিঘর ও চিরসবুজ নাবিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

​বাংলা সাহিত্যের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় আকাশে যে কজন নক্ষত্র নিজের আলোয় পুরো একটি যুগকে উদ্ভাসিত করেছেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার ও কলামিস্ট। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন আধুনিক বাঙালির মনন, প্রেম ও আবেগের অবিসংবাদিত রাজপুত্র। বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যিনি ধ্রুপদি আভিজাত্য আর আধুনিক নাগরিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে একই সুতোয় বেঁধেছিলেন অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায়। ৭ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে বাংলা ভাষার এই চিরসবুজ নাবিকের স্মৃতির উদ্দেশে রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।   ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, অবিভক্ত বাংলার মাদারীপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ)। পরবর্তী সময়ে দেশভাগের সময় পরিবারকে নিয়ে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। শৈশব ও কৈশোরের এই স্থানান্তরের বেদনা এবং উত্তর-কলকাতার গলিতে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। সিটি কলেজ থেকে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর শেষ করার পর তিনি সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকেই জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে বেছে নেন। ​ ১৯৫৩ সালে মাত্র কয়েকজন তরুণ কবিবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন কবিতাবিষয়ক পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’। এই পত্রিকা প্রকাশ বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ-উত্তর বাংলা কবিতায় যে আড়ষ্টতা ও জড়তা তৈরি হয়েছিল, ‘কৃত্তিবাস’-এর কবিরা তাকে ভেঙে চুরমার করে দেন। সুনীলের সম্পাদনায় ও নেতৃত্বে বাংলা কবিতা পেল এক নতুন ভাষা, যা ছিল মুখের ভাষার কাছাকাছি, কিন্তু সৃষ্টিতে তীব্র ও ধারালো। ​ ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মূলত কবি। তিনি নিজেও বলতেন, কবিতা তাঁর প্রথম ও প্রধান প্রেম। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘একা এবং কয়েকজন’ (১৯৫৮) প্রকাশিত হওয়ার পরই আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা ও নাগরিক ক্লান্তি, প্রেম ও বিদ্রোহ পাশাপাশি অবস্থান করেছে। ​ তবে সুনীলের কবিপরিচয়ের কথা বলতে গেলে যে নামটি অবধারিতভাবে চলে আসে, তা হলো ‘নীরা’। নীরা কোনো বাস্তব নারী, নাকি কবির কল্পনার এক অধরা প্রতীক—তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাঙালি পাঠকের কাছে নীরা হয়ে উঠেছেন চিরন্তন প্রেম ও সৌন্দর্যের রূপক। “নীরা, তুমি অন্য ঘরে চাবি বন্ধ করে বসে আছো...।” কিংবা, “তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি অন্তত চারশো বছর বেঁচে থাকতে চাই।”   ​এ রকম পঙক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি প্রেমের যে তীব্রতা প্রকাশ করেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মজুড়ে বাঙালির প্রেমের প্রকাশকে প্রভাবিত করেছে। নীরার প্রতি কবির আকুলতা, অধিকারবোধ এবং একই সঙ্গে একধরনের দার্শনিক দূরত্ব সুনীলের কবিতাকে কালজয়ী রূপ দিয়েছে।   ​কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও কথাসাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অবদান বাংলা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। তাঁর ইতিহাসভিত্তিক সামাজিক উপন্যাসগুলো বাংলা কথাসাহিত্যের অমূল্য রত্ন।   ​‘সেই সময়’ : উনিশ শতকের নবজাগরণকালীন কলকাতাকে কেন্দ্র করে রচিত এই মহাকাব্যিক উপন্যাসটি সুনীলকে কথাসাহিত্যিক হিসেবে অমরত্ব এনে দেয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো ঐতিহাসিক চরিত্রদের পাশাপাশি কল্পিত চরিত্র নবকুমারকে ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানা পাঠককে মুগ্ধ করে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।   ‘​প্রথম আলো’ : ‘সেই সময়’-এর পরবর্তী অধ্যায় হিসেবে রচিত এই উপন্যাসে বিশ শতকের সূচনালগ্ন, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, তরুণ রবীন্দ্রনাথের মনন গঠন এবং ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রাথমিক দিনগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে।   ‘​পূর্ব-পশ্চিম’ : দেশভাগ, ১৯৪৭-এর দেশত্যাগ, ওপারে ফেলে আসা স্মৃতি এবং এপারে উদবাস্তু জীবনের যন্ত্রণা ও লড়াইকে ভিত্তি করে রচিত তিন প্রজন্মের এক বিরাট দলিল এই উপন্যাস। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, নকশাল আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—সবই এখানে উঠে এসেছে পরম মমতায়।   ​এ ছাড়া ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র মতো উপন্যাসগুলোতে আধুনিক নাগরিক জীবনের সংকট, বেকারত্ব, হতাশা ও প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা যেভাবে ধরা পড়েছে, তা চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়কেও আকৃষ্ট করেছিল। সত্যজিৎ রায় এ দুটি উপন্যাস নিয়ে বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।   ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক জীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর ছদ্মনাম ‘নীললোহিত’। নীললোহিত কেবল একটি ছদ্মনাম ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র চরিত্র। ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের এক তরুণ, যার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, পকেটে টাকা নেই, কিন্তু বুকভরা আছে জীবনকে ভালোবাসার অসীম রসদ।   ​নীললোহিতের জবানীতে লেখা উপন্যাস ও গল্পগুলোতে রয়েছে এক অদ্ভুত ধরনের মুক্তি ও বাোহেমিয়ান জীবনবোধ। জীবনের ছোট ছোট আনন্দকে খুঁজে নেয়া, ছকবাঁধা সামাজিক নিয়মকে ভেঙে উদার দিগন্তের দিকে হেঁটে যাওয়া—এসবই নীললোহিত পাঠকদের শিখিয়েছে। ‘নীললোহিত’ রূপ ধরে সুনীল তরুণদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে সমস্ত অহংকার ত্যাগ করে মানুষকে ভালোবাসতে হয়। এ ছাড়া ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীলু’ ছদ্মনামেও তিনি অসংখ্য ধারালো নিবন্ধ ও কলাম লিখেছেন।   ​বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের কল্পনার জগৎকে অ্যাডভেঞ্চার আর রহস্যে ভরিয়ে তোলার জন্য সুনীলের অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর সৃষ্ট ‘কাকাবাবু’ (রাজা রায়চৌধুরী) এবং তাঁর ভাইপো ‘সন্তু’ জুটির গল্প শোনেনি বা পড়েনি, এমন বাঙালি বিরল।   ​প্রতিবন্ধকতা যে মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে কিছুই নয়, তার সেরা উদাহরণ কাকাবাবু। একটি পা কৃত্রিম হওয়া সত্ত্বেও ক্রাচ বগলে নিয়ে তিনি ভারতের জঙ্গল থেকে শুরু করে মিসরের পিরামিড কিংবা সবুজ দ্বীপের রহস্য ভেদ করতে ছুটে গিয়েছেন। ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’, ‘মিসর রহস্য’, ‘পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক’, ‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’-এর মতো গল্পগুলো একদিকে যেমন কিশোর মনকে রোমাঞ্চিত করেছে, অন্যদিকে তাদের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করেছে।   ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর ভাষার সাবলীলতা। তিনি কঠিন ও গূঢ় তত্ত্বকে অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করতে পারতেন। তাঁর গদ্যের মধ্যে ছিল কবিতার মতো এক অন্তর্নিহিত ছন্দ। অতিরিক্ত অলংকার ব্যবহার না করেও কীভাবে কেবল শব্দের সঠিক প্রয়োগে একটি দৃশ্য বা আবেগকে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা তাঁর রচনা পড়লে বোঝা যায়।   ​সাহিত্যিক হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন এক অনন্য সংগঠক। দীর্ঘদিন তিনি সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করা, তাঁদের লেখা পড়া এবং বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক দরবারে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।   ​২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু একজন প্রকৃত লেখকের কি সত্যিই কোনো মৃত্যু হয়? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর অজস্র রচনা, কবিতা, উপন্যাস ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বাঙালির জীবনচর্চায় বেঁচে আছেন। ​ আজকের এই যান্ত্রিক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে, যখন মানবিক সম্পর্কগুলো ম্লান হতে বসেছে, তখন সুনীলের কবিতা আমাদের শেখায় একটু থামতে, নতুন করে প্রেমে পড়তে। যখন সমাজ ইতিহাসে শেকড় খোঁজে, তখন তাঁর সেই সময় বা ‘প্রথম আলো’ আমাদের পথ দেখায়। আর যখন মন চায় ক্লান্তি ভুলে দূর দিগন্তে হারিয়ে যেতে, তখন নীললোহিত বা কাকাবাবু আমাদের সঙ্গী হন।   ​হে শব্দের বাতিঘর, আপনার সৃষ্টি আমাদের অনুভূতির জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে, আমাদের কল্পনাকে ডানা দিয়েছে। আপনার জন্মদিনে আমাদের এই একটাই প্রার্থনা—বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, তত দিন আপনি বাঙালির হৃদয়ে চিরসবুজ হয়ে থাকবেন। আপনার স্মৃতির প্রতি জানাই আমাদের অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।     ড. শিবাশিস মুখার্জী অধ্যাপক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬ 0
সুফিবাদ : আত্মশুদ্ধি, মানবপ্রেম ও শান্তির দর্শন

সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানীর সাক্ষাৎকার সাক্ষাৎকার গ্রহণ : তৌসিফ রেজা আশরাফী   তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদ বলতে আমরা মূলত কী বুঝি? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : সুফিবাদ ইসলামের আধ্যাত্মিক ও আত্মশুদ্ধির পথ। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করা। সুফিবাদ শুধু কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং এটি মানুষের চরিত্র ও অন্তরকে পরিবর্তনের একটি সাধনা। তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদের কেন্দ্রে আত্মশুদ্ধির বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তার অন্তরের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। হিংসা, অহংকার, লোভ, বিদ্বেষ ও আত্মম্ভরিতা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এসব প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে তাকওয়া, বিনয়, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর স্মরণকে জীবনের অংশ করে নিতে হয়। একজন মানুষ যখন নিজের নফসকে সংশোধন করতে পারে, তখন তার আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তৌসিফ রেজা আশরাফী : বর্তমান সময়ে যখন সমাজে হিংসা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন সুফিবাদের প্রাসঙ্গিকতা কতটা? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : সুফিবাদের প্রাসঙ্গিকতা আজ অত্যন্ত বেশি। কারণ সুফিবাদ মানুষকে ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমার শিক্ষা দেয়। মানুষ যদি নিজের অন্তরকে সংশোধন করে এবং অন্যের অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করে, তাহলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা তৈরি করাই সুফিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।   তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদ কি শুধু ব্যক্তিগত সাধনার বিষয়, নাকি এর সামাজিক দিকও রয়েছে? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : সুফিবাদ ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতারও শিক্ষা দেয়। একজন সত্যিকারের সাধক শুধু নিজের জন্য চিন্তা করেন না। তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেন, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করেন এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। মানুষের সেবা ও মানবকল্যাণ সুফি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তৌসিফ রেজা আশরাফী : তরুণ প্রজন্মের কাছে সুফিবাদের কী বার্তা রয়েছে? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : তরুণদের প্রথমে নিজেদের চরিত্র গঠন করতে হবে। জ্ঞান অর্জন, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধকে জীবনের ভিত্তি করতে হবে। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি আত্মিক ও নৈতিক উন্নতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণরা যদি নিজেদের মধ্যে সত্য, ন্যায়, বিনয় ও মানবপ্রেম প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে তারাই একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণে নেতৃত্ব দিতে পারবে।   তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যদি এক বাক্যে বলতে হয়, সেটি কী? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথে মানুষের ভালোবাসা ও সেবা করতে হবে। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ, যে হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত শান্তির সন্ধান পায়।   তৌসিফ রেজা আশরাফী : শেষ প্রশ্ন, বর্তমান বিশ্বের অশান্ত পরিবেশে মানুষের জন্য আপনার বার্তা কী? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : মানুষকে আগে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে হবে। অন্যকে পরিবর্তন করার আগে নিজেকে পরিবর্তন করা জরুরি। ঘৃণা দিয়ে ঘৃণা দূর করা যায় না, বরং ভালোবাসা, ন্যায়, ক্ষমা ও সহমর্মিতার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আল্লাহর স্মরণ, আত্মশুদ্ধি এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই হতে পারে একজন মানুষের সুন্দর জীবনের পথ।  

তৌসিফ রেজা আশরাফী তৌসিফ রেজা আশরাফী সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬ 0
ছবি : রাখি বন্ধন
রাখি বন্ধন : সংকীর্ণতা পেরিয়ে সর্বজনীন সামাজিক উৎসব

তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে সূর্য যেমন ধরার করে আলোক-রাখী জড়ায় প্রাতে॥ তোমার আশিস আমার কাজে সফল হবে বিশ্ব-মাঝে জ্বলবে তোমার দীপ্ত শিখা আমার সকল বেদনাতে॥   —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর   রাখি বন্ধন কেবল ভাই-বোনের ভালোবাসার দিন নয়, এটি এখন এক বৃহৎ সামাজিক ও মানবিক উৎসব। এই উৎসবের মূলমন্ত্র হলো ঐক্য, সুরক্ষা ও ভালোবাসা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাখি বন্ধনের রূপ বদলেছে। প্রাচীনকালে এটি মূলত ধর্মীয় ও সুরক্ষার আচার ছিল। আজ এটি সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার দিন।   রাখি শব্দের অর্থ ‘সুরক্ষার বন্ধন’। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, এই উৎসবের শেকড় অনেক গভীরে ছড়িয়ে আছে।  মহাভারতে কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর ঘটনার কথা অনেকেই জানেন। কৃষ্ণের আঙুল কেটে রক্ত পড়ার সময় দ্রৌপদী নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তাঁর হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণ সেই ঋণ রক্ষা করেছিলেন। এ ছাড়া দেবতা ও অসুরের যুদ্ধের সময় ইন্দ্রাণীর হাতে বিষ্ণুর দেয়া সুরক্ষার সুতোর কথাও পুরাণে পাওয়া যায়। মোগল আমলে রানি কর্মাবতী মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে রাখি পাঠিয়ে ভাই হিসেবে ডেকেছিলেন এবং বিপদের দিনে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। হুমায়ুন  সেই সম্মান রেখেছিলেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাখি কোনো নির্দিষ্ট একটি ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল বিপদে পাশে দাঁড়ানোর এবং সম্মান জানানোর একটি মাধ্যম।   শুরুতে রাখি বন্ধন মূলত বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান এবং সনাতন ধর্মের রীতিনীতির মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত শক্তি ছিল সর্বজনীন। যখনই কোনো সমাজ সংকটে পড়েছে, তখন ধর্মের দেয়াল ভেঙে মানুষ এই উৎসবকে আপন করে নিয়েছে। একটি সুতো মানুষের জাত, ধর্ম বা গোত্র দেখে বাঁধা হয় না। এই সর্বজনীন সত্যটি ধীরে ধীরে মানুষের মনে রেখাপাত করতে শুরু করে।   রাখি বন্ধনকে আজকের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের রূপ দেয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।  ব্রিটিশ সরকার যখন বাংলাকে ভাগ করতে চাইল, তখন বাঙালিরা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।  হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চক্রান্ত রুখে দিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধন উৎসবকে হাতিয়ার করেন। তিনি নির্দেশ দেন, সবাই যেন একে অপরের হাতে হলুদ সুতো বেঁধে দেন। এটি ছিল ভাই-বোনের সম্পর্ক ছাড়াও সমাজের সব মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের প্রতীক।  কবিগুরু লিখেছিলেন, “বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল... পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।” এই আন্দোলনের মাধ্যমেই রাখি বন্ধন কেবল ভাই-বোনের ঘরের কোণ থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথে, মানুষের মিছিলে এবং সর্বজনীন সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়।   আজকের দিনে রাখি বন্ধন মানেই জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সুতো বাঁধার এই প্রথা শিখিয়ে দেয় যে আমরা সবাই একে অপরের সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছি। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সব ধর্মের মানুষ আজ এই উৎসবে শামিল হয়। শুধু ভাই-বোন নয়, বন্ধু, শিক্ষক, প্রতিবেশী কিংবা সমাজের যেকোনো চেনা-অচেনা মানুষের হাতে রাখী পরিয়ে ভালোবাসার বার্তা দেয়া হয়।অনেক সময় গাছ বাঁচানোর বার্তা দিতে গাছেও রাখি পরানো হয়। আবার পরিবেশ রক্ষায় বা পথশিশুদের সুরক্ষায় দিনটি পালন করা হয়।   আজকের এই আধুনিক ও যান্ত্রিক যুগে মানুষের মধ্যে দূরত্ব বেড়েই চলেছে। স্বার্থপরতা যখন সমাজকে গ্রাস করছে, ঠিক তখনই রাখি বন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কের উষ্ণতা। রাখি পরানোর অর্থ শুধু ভাই কর্তৃক বোনকে রক্ষা করা নয়, বরং সমাজের প্রত্যেক নারীকে সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া। ব্যস্ততার ফাঁকে এই একটি দিন পুরোনো সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন করে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়ার সুযোগ করে দেয়।  বাজারে এখন নানা ডিজাইনের ডিজিটাল ও আধুনিক রাখি পাওয়া যায়। কেনাকাটা বাড়লেও এর মূল আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই দায়িত্ব।   বর্তমান রাখিতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে সনাতনী ও রাজস্থানি মীনাকারি আর্টের ছোঁয়া, যেখানে সোনা বা রুপার প্রলেপের পাশাপাশি ফুটিয়ে তোলা হয় নিখুঁত ফ্লোরাল মোটিফ। সুতির সুতো, কাঠ, মাটির তৈরি টেরাকোটা ও প্রাকৃতিক রং দিয়ে তৈরি ইকো-ফ্রেন্ডলি রাখি এখন দারুণ জনপ্রিয়। কুন্দন, পলিমার ক্লে, রত্নপাথর, মুক্তা ও চুমকির কারুকাজে রাখিগুলো গয়নার মতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় প্রতীকের পাশাপাশি ইভিল আই, ময়ূরের পাখা কিংবা জ্যামিতিক নকশার সমসাময়িক বিমূর্ত রূপ রাখিতে যোগ করেছে আধুনিকতার আভিজাত্য।   রাখি বন্ধন আজ আর শুধু একটি ধর্মীয় উপাচার বা সংস্কার নয়। এটি প্রেম, প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব ও মানবতার এক চিরন্তন উৎসব। ধর্ম মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু রাখি সেই বিভেদ মুছে দিয়ে মানুষের হাতকে এক করে দেয়। সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে রাখি আজ বিশ্বমানবতার প্রতীক। এই উৎসব আমাদের শেখায়—আমরা একা নই, আমরা সবাই সবার পাশে আছি।

বিধান চন্দ্র সান্যাল বিধান চন্দ্র সান্যাল আগস্ট ২৭, ২০২৬ 0
কবি অরুণ মিত্র
নীরবতার নন্দনতত্ত্ব : অরুণ মিত্রের কাব্যে অস্তিত্ব, ভাষা ও মানবতাবাদ

কবি অরুণ মিত্র  ১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করে ২০০০ সালের ২২ আগস্ট কলকাতায় তাঁর প্রয়াণ পর্যন্ত তিনি শুধু কবিতা লেখেননি; তিনি বাংলা ভাষার সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের, বিশেষত ফরাসি সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গভীর সংলাপ নির্মাণ করেছিলেন। কবি, অনুবাদক, অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন বাংলা সাহিত্যকে একদিকে যেমন দেশীয় আধুনিকতার ভেতরের দিকে নিয়ে গেছে, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক মানবিকতার বিস্তৃত পরিসরের সঙ্গেও যুক্ত করেছে।   তাঁর কাব্যগ্রন্থের দীর্ঘ তালিকা—‘প্রান্তরেখা থেকে উৎসের দিকে’, ‘ঘনিষ্ঠ তাপ’, ‘মঞ্চের বাইরে’, ‘শুধু রাতের শব্দ নয়’, ‘প্রথম পলি শেষ পাথর’, ‘খুঁজতে খুঁজতে এত দূর’, ‘যদিও আগুন ঝড় ধসাভাঙা’, ‘এই অমৃত এই গরল’, ‘অন্ধকার যতক্ষণ জেগে থাকে’, ‘ভাঙনের মাটি’ প্রভৃতি—প্রমাণ করে যে তাঁর কাব্যজীবন কোনো একক মুহূর্তের সৃষ্টিশীল বিস্ফোরণ নয়; এটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে এবং মানুষের সঙ্গে এক অবিচ্ছিন্ন কথোপকথন।   অরুণ মিত্রের কাব্যকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হয় যে তিনি বাংলা কবিতায় একধরনের নীরব বিপ্লবের নাম। এই বিপ্লবের কোনো পতাকা নেই, কোনো উচ্চকণ্ঠ স্লোগান নেই, নেই আত্মপ্রচারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা; অথচ তাঁর দীর্ঘ কাব্যজীবনের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, বাংলা কবিতার আধুনিক মনন, মানবিক বোধ এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্যচেতনার ইতিহাসে তাঁর অবস্থান কত গভীর ও স্থায়ী।   অরুণ মিত্রের কবিতার সবচেয়ে গভীর বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর নীরবতা। কিন্তু এই নীরবতাকে যদি কেবল কম কথা বলার প্রবণতা বলে বুঝি, তবে তাঁর কবিতার প্রকৃত তাৎপর্য অধরা থেকে যাবে। তাঁর নীরবতা আসলে একটি নন্দনতাত্ত্বিক নির্বাচন, একটি নৈতিক অবস্থান এবং একই সঙ্গে একটি দার্শনিক ভঙ্গি। তিনি জানতেন, সব সত্যকে উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না; কিছু সত্য শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহারে বরং ক্ষীণ হয়ে যায়। তাই তাঁর কবিতায় উচ্চারণের পাশাপাশি অনুচ্চারণেরও একটি নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে।   তিনি যা বলেন, তার চেয়েও কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি যা বলেন না। শব্দের মধ্যবর্তী বিরতি, বাক্যের শেষে থেমে যাওয়া, চিত্রকল্পের অসম্পূর্ণতা, অনুভূতির অনির্দিষ্টতা—এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে তাঁর কবিতায় একটি নীরব পরিসর তৈরি হয়। সেই পরিসরেই পাঠকের নিজস্ব অনুভূতি এসে জায়গা করে নেয়।   এখানেই অরুণ মিত্রের কাব্য আধুনিক পাঠতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—পাঠের অর্থ কখনো সম্পূর্ণভাবে লেখকের হাতে আবদ্ধ থাকে না। তাঁর কবিতার নীরব ফাঁকগুলো পাঠককে সক্রিয় করে। পাঠক কেবল কবির বক্তব্য গ্রহণ করে না; বরং সে নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, ইতিহাস এবং অনুভূতি নিয়ে কবিতার ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে কবিতা হয়ে ওঠে একটি উন্মুক্ত অর্থক্ষেত্র।   অরুণ মিত্রের কবিতায় অস্তিত্বের প্রশ্ন কোনো বিমূর্ত দার্শনিক তত্ত্ব হিসেবে আসে না; তা আসে জীবনের খুব কাছ থেকে, মানুষের প্রতিদিনের যাপন থেকে। সে রক্তমাংসের মানুষ, যে সকালে ঘুম থেকে ওঠে, পথ চলে, অপেক্ষা করে, ভালোবাসে, হারায়, স্মরণ করে, ক্লান্ত হয়, ইতিহাসের অভিঘাতে আহত হয় এবং সমস্ত অনিশ্চয়তার মধ্যেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।   এই বেঁচে থাকা তাঁর কাছে নিছক বেঁচে থাকা নয়; এটি একধরনের নৈতিক ও অস্তিত্বগত সিদ্ধান্ত। মানুষ যখন সবকিছু হারিয়েও বেঁচে থাকে, তখন তার সেই বেঁচে থাকাই একটি বক্তব্য হয়ে ওঠে। অরুণ মিত্রের কবিতায় এই বক্তব্য কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়; বরং খুব নিচু স্বরে উচ্চারিত। যেন মানুষ নিজেকেই বলছে—আমি এখনো আছি, এখনো অনুভব করি, এখনো স্মরণ করি, এখনো অন্য মানুষের দিকে তাকাতে পারি।   এ কারণেই তাঁর কবিতায় ‘অস্তিত্ব’ কোনো বিচ্ছিন্ন দার্শনিক ধারণা নয়। অস্তিত্ব তাঁর কবিতায় শরীর, স্মৃতি, সম্পর্ক, ইতিহাস এবং সময়ের মধ্যে বসবাসকারী একটি অভিজ্ঞতা। মানুষ তার শরীর নিয়ে পৃথিবীতে উপস্থিত; তার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্লান্ত হয়, ভালোবাসে, স্পর্শ করে, দূরে সরে যায়, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু শরীরের মধ্যেই স্মৃতি বাস করে এবং স্মৃতির মধ্যেই ব্যক্তি তার নিজের অস্তিত্বকে পুনর্গঠন করে। ফলে অরুণ মিত্রের মানুষকে বোঝার জন্য শুধু ‘আমি কে?’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হয়—‘আমি কোথায়?’, ‘কাদের সঙ্গে?’, ‘কী ইতিহাসের মধ্যে?’, ‘কী স্মৃতি বহন করে?’ এবং ‘এই পৃথিবীর প্রতি আমার দায়িত্ব কী?’   এখানেই তাঁর কাব্যে অস্তিত্ববাদী পাঠের সম্ভাবনা তৈরি হয়। অবশ্যই অরুণ মিত্রকে সরাসরি সার্ত্র, কামু বা হাইডেগারের সমান্তরালে বসানো যাবে না। কামুর অসারতার দর্শনও তাঁর কবিতার ঘোষিত ভিত্তি নয়। কিন্তু মানুষের অনিশ্চয়তা, নিঃসঙ্গতা, স্বাধীনতা, দায়িত্ব, সীমাবদ্ধতা এবং মৃত্যুচেতনার প্রতি তাঁর সংবেদনশীলতা এমন একটি দার্শনিক সংবেদনসমষ্টি তৈরি করে, যার মধ্যে অস্তিত্ববাদী পাঠ অর্থবহ হয়ে ওঠে।   সার্ত্রের কাছে মানুষ তার নিজের নির্বাচন ও দায়িত্বের মাধ্যমে নিজেকে নির্মাণ করে। মানুষ কোনো পূর্বনির্ধারিত সত্তা নিয়ে পৃথিবীতে আসে না; সে তার কাজ, সিদ্ধান্ত এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করে। অরুণ মিত্রের কবিতায় এ ধারণার সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় সাদৃশ্য দেখা যায়, যদিও তা সরাসরি সার্ত্রবাদী নয়।   তাঁর মানুষ পরিস্থিতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক নয়—ইতিহাস, সমাজ, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সম্পর্ক ও স্মৃতি তাকে সীমাবদ্ধ করে। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, কীভাবে অন্যের যন্ত্রণা অনুভব করবে, কীভাবে স্মৃতিকে বহন করবে, কীভাবে ভালোবাসবে—এই নৈতিক ক্ষেত্রটুকু তার নিজের। এই সীমাবদ্ধ স্বাধীনতার মধ্যেই অরুণ মিত্রের মানুষের মর্যাদা।   এখানে স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকীর্ণ অর্থে দেখা উচিত নয়। এটি একটি অন্তর্গত স্বাধীনতা—নিজের মানবিকতা বজায় রাখার স্বাধীনতা। পৃথিবী নিষ্ঠুর হতে পারে, ইতিহাস মানুষের বিরুদ্ধে যেতে পারে, ক্ষমতা মানুষকে পিষে দিতে পারে; কিন্তু অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার ক্ষমতাটি মানুষ নিজের মধ্যে রক্ষা করতে পারে।   অরুণ মিত্রের মানবিকতা সম্ভবত এখানেই সবচেয়ে শক্তিশালী। তিনি এমন এক মানুষকে কল্পনা করেন না যে সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে ফেলেছে; বরং এমন একজন মানুষকে দেখেন, যে প্রতিকূলতার মধ্যেও সম্পূর্ণ নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি।   এ কারণেই তাঁর মানুষের দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মানুষ সর্বশক্তিমান নয়। সে ভয় পায়, কাঁদে, হারায়, একা হয়ে যায়, ভুল করে, কখনো পরাজিত হয়। কিন্তু পরাজয় তার মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেয় না। বরং পরাজয়ের মুহূর্তেই তার মানবিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।   তাঁর নিঃসঙ্গতা কোনো আত্মবিলাপ নয়। এটি এমন এক অন্তরাবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গে মুখোমুখি হয়। আধুনিক নগরসভ্যতার মধ্যে মানুষ ক্রমাগত মানুষের সংস্পর্শে থেকেও একা হয়ে পড়ে—এই আপাতবিরোধ তাঁর কবিতার অন্তর্গত অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।   তাঁর নিঃসঙ্গ মানুষ পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে দেখার জন্য কিছুটা পিছিয়ে দাঁড়ায়। সে পালিয়ে যায় না, বরং দেখে। সে চিৎকার করে না, বরং শোনে। সে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না, বরং প্রশ্নকে বহন করে। এই ‘দাঁড়িয়ে থাকা’ তাঁর কাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রতীক হিসেবে পড়া যায়।   আধুনিক সভ্যতার দ্রুততার বিপরীতে এই দাঁড়িয়ে থাকা নিজেই একধরনের প্রতিরোধ। যে যুগে সবকিছু দ্রুত বিচার করতে হয়, দ্রুত মতামত দিতে হয়, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, সেখানে থেমে দেখা এবং ভাবা একটি গভীর নৈতিক কাজ। অরুণ মিত্রের কবিতার ধীরতা তাই নিষ্ক্রিয়তা নয়; বরং সক্রিয় মননের লক্ষণ।   তাঁর রাজনৈতিক চেতনাও এই নীরবতার মধ্যেই কাজ করে। যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, ঔপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতা, স্বাধীনতার উত্তাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের ওপর ক্ষমতার চাপ—এসব তাঁর সময়ের বাস্তবতা। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিকতা সরল স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর রাজনৈতিক বোধের কেন্দ্র মানুষ। ফলে রাজনীতি তাঁর কবিতায় কোনো বিমূর্ত মতাদর্শের ভাষা নয়; বরং মানুষের জীবনযন্ত্রণার ভাষা।   তাঁর কাব্যভাষার দিকে তাকালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে—স্বচ্ছতার ভেতরে জটিলতা। তাঁর শব্দগুলো অনেক সময় সহজ, পরিচিত ও দৈনন্দিন; কিন্তু তাদের বিন্যাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক একটি গভীর অর্থপরিসর তৈরি করে। একটি শব্দ কেবল অভিধানগত অর্থ বহন করে না; তার সঙ্গে যুক্ত হয় স্মৃতি, ইতিহাস, অনুভূতি, সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।   এই দিকটি ভাষাতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সসুরের ‘সূচক’ ও ‘সূচিত’-এর সম্পর্কের আলোকে ভাবলে দেখা যায় যে অরুণ মিত্রের কবিতায় কোনো শব্দ সম্পূর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট অর্থের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। প্রসঙ্গ পরিবর্তিত হলে শব্দের অর্থক্ষেত্রও পরিবর্তিত হয়।   একটি ‘রাত’ কেবল সময়ের একটি অংশ নয়; তা হতে পারে স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, ইতিহাস, ভয় কিংবা অপেক্ষার প্রতীক। একটি ‘মাটি’ কেবল ভূগোল নয়; তা হতে পারে জন্ম, শ্রম, ক্ষয়, ইতিহাস এবং মানুষের অস্তিত্বের চিহ্ন। অর্থাৎ শব্দ তাঁর কবিতায় সম্পর্কনির্ভর এবং প্রসঙ্গনির্ভর।   এ কারণে তাঁর কবিতাকে একটি অর্থজাল হিসেবেও পড়া যায়। শব্দ একা অর্থ তৈরি করে না; অন্য শব্দের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অর্থের ঘনত্ব বাড়ায়। তাঁর কাব্যভাষায় তাই অর্থক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাটি, আলো, অন্ধকার, রাত, পথ, জল, শরীর, স্মৃতি, তাপ, ভাঙন—এ ধরনের শব্দ একে অপরকে প্রতিধ্বনিত করে একটি বৃহত্তর অর্থজগৎ তৈরি করতে পারে।   তাঁর কবিতার বাক্যবিন্যাসও এই অর্থনির্মাণের অংশ। বিরতি, অসম্পূর্ণতা, বাক্যের দৈর্ঘ্য, পুনরাবৃত্তি এবং চিত্রকল্পের বিন্যাস—সবকিছুই অর্থ তৈরি করে। কবিতায় পঙ্‌ক্তিবিচ্ছেদ কখনো নিছক ছন্দগত নয়; তা ভাবের বিরতি তৈরি করতে পারে। একটি বাক্য যেখানে শেষ হতে পারত, সেখানে থেমে যাওয়া পাঠককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।   এখানে অরুণ মিত্রের কবিতার সঙ্গে আধুনিক পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্বের একটি সম্ভাব্য সংলাপ তৈরি হয়। পাঠক আর নিষ্ক্রিয় ভোক্তা নয়; সে অর্থ-উৎপাদনের অংশীদার। কবিতার যে অংশ অনুচ্চারিত থাকে, পাঠক তার নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে তা পূরণ করে। ফলে একই কবিতা বিভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।   অরুণ মিত্রের প্রেমভাবনাও তাঁর মানবতাবাদী কাব্যচিন্তার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রেমকে কেবল ব্যক্তিগত আবেগের পরিসরে আবদ্ধ করলে তার গভীরতা বোঝা যায় না। তাঁর প্রেমে আকর্ষণ যেমন আছে, তেমনি দূরত্বও আছে; উপস্থিতি যেমন আছে, তেমনি অনুপস্থিতির স্মৃতিও আছে। প্রেম তাঁর কাছে দখল নয়, অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করা।   এই অর্থে তাঁর প্রেমের দর্শন অধিকারবোধের বদলে সহাবস্থানের দর্শন। অন্য মানুষকে নিজের করে নেয়া নয়, অন্য মানুষের স্বাধীন অস্তিত্বকে অনুভব করা—এই মানবিক বোধ প্রেমকে একটি নৈতিক মাত্রা দেয়।   এইখানে তাঁর প্রেমদর্শনের সঙ্গে মার্টিন বুবারের ‘আমি–তুমি’ ধারণার একটি তুলনামূলক সম্পর্ক তৈরি করা যায়। অন্য মানুষকে বস্তু হিসেবে না দেখে ‘তুমি’ হিসেবে দেখা—অর্থাৎ তাকে নিজের প্রয়োজনের বস্তু না বানিয়ে তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে স্বীকার করা—অরুণ মিত্রের মানবিক প্রেমের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। অবশ্যই এটিকে সরাসরি প্রভাব বা দার্শনিক সূত্র হিসেবে দাবি করা যাবে না; বরং তুলনামূলক দার্শনিক পাঠ হিসেবে এটি অর্থবহ।   অরুণ মিত্রের অনুবাদক-সত্তা তাঁর মৌলিক কবিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং বলা যায়, অনুবাদ তাঁর কাব্যিক দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। তিনি ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও অনুবাদক ছিলেন এবং ফরাসি কবিতা ও সাহিত্যের সঙ্গে বাংলার গভীর যোগাযোগ স্থাপনে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।   অনুবাদ তাঁর কাছে নিছক ভাষাগত স্থানান্তর ছিল না। একটি ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় বসিয়ে দিলেই অনুবাদ সম্পূর্ণ হয় না; কবিতার অন্তর্গত ছন্দস্পন্দন, নীরবতা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি, আবেগের তাপমাত্রা এবং দার্শনিক অনুরণনও নতুন ভাষায় পুনর্গঠিত করতে হয়। এই অর্থে অরুণ মিত্রের অনুবাদকে একটি সৃজনশীল পুনর্ভাষ্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।   অরুণ মিত্রের কবিতায় ‘আলো’ ও ‘অন্ধকার’-এর দ্বন্দ্বকে তাই সরল শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্ব হিসেবে পড়া উচিত নয়। তাঁর অন্ধকারের মধ্যে আলো থাকে, আবার আলোর মধ্যেও অন্ধকারের স্মৃতি থাকে। মানুষ সম্পূর্ণ আলোকিত নয়; আবার সম্পূর্ণ অন্ধকারেও নয়। এই মধ্যবর্তী অঞ্চলই তাঁর কবিতার মানবিক ভূগোল।   এই দৃষ্টিতে তাঁর কবিতার ‘ভাঙন’ও গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙন মানে কেবল ধ্বংস নয়; ভাঙনের মধ্যেই নতুন অর্থের জন্ম হতে পারে। মাটি মানে শেকড়; পলি মানে সময়ের সঞ্চয়; পাথর মানে স্থায়িত্ব; ভাঙন মানে ইতিহাসের আঘাত; অন্ধকার মানে অনিশ্চয়তা; আর অমৃত ও গরল একই জীবনের দুই সম্ভাবনা।   আজকের সময়ে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এখানেই সবচেয়ে তীব্র। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন শব্দের অভাব নেই, কিন্তু অর্থের সংকট আছে; যোগাযোগের অভাব নেই, কিন্তু বোঝাপড়ার অভাব আছে; মতামতের অভাব নেই, কিন্তু মননের অবকাশ কমে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্রমাগত তথ্যপ্রবাহ এবং দৃশ্যমানতার সংস্কৃতির মধ্যে অরুণ মিত্রের কবিতা আমাদের ধীর হতে শেখায়।   তাঁর কবিতা যেন আমাদের কানে খুব নিচু স্বরে বলে—প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানানো জরুরি নয়; কখনো কখনো প্রথম কাজ হলো দেখা, তারপর অনুভব করা, তারপর ভাবা।   এই ‘ধীরতা’ আসলে তাঁর কাব্যের একটি নৈতিক শিক্ষা। কারণ, ধীরে দেখা মানে অন্যকে বিচার করার আগে তাকে বোঝার চেষ্টা করা। ধীরে পড়া মানে শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসকে শোনা। ধীরে বাঁচা মানে নিজের অস্তিত্বকে কেবল উৎপাদন ও সাফল্যের মাপকাঠিতে না মাপা।   শেষ পর্যন্ত অরুণ মিত্রের অস্তিত্ববাদী মানবতাবাদের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গভীর বিশ্বাস—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তার সাফল্যের আগে তার দুর্বলতাকে, তার পরিচয়ের আগে তার যন্ত্রণাকে, তার রাজনৈতিক অবস্থানের আগে তার মানবিক অস্তিত্বকে দেখতে হবে। এই দৃষ্টিই তাঁর কবিতাকে শুধু সাহিত্যিক নয়, নৈতিকও করে তোলে।   তাঁর মানুষ কোনো পূর্ণ মানুষ নয়; সে অসম্পূর্ণ। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতাই তার সত্য। সে সব প্রশ্নের উত্তর জানে না; তবু প্রশ্ন করে। সে ভবিষ্যৎ জানে না; তবু অপেক্ষা করে। সে মৃত্যু এড়াতে পারে না; তবু ভালোবাসে। সে ইতিহাসকে থামাতে পারে না; তবু নিজের মানবিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করে। এই অসম্ভবের মধ্যেই তার অস্তিত্বের সৌন্দর্য।   অতএব, অরুণ মিত্রের কাব্যে অস্তিত্ববাদ কোনো ধার করা দর্শন নয়; বরং জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি সম্ভাব্য পাঠ। তাঁর কবিতার মানুষ অস্তিত্বের অর্থ আগে থেকে জানে না; সে বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে অর্থ খুঁজে নেয়। তার কাছে জীবন কোনো সমাধান-করা সমীকরণ নয়; বরং একটি খোলা প্রশ্ন। আর কবিতা সেই প্রশ্নকে মুছে দেয় না, বরং তাকে আরও গভীর করে।   মানুষ বেঁচে থাকে, কারণ তার কাছে সব উত্তর আছে বলে নয়; বরং এখনো কিছু প্রশ্ন করার আছে বলেই। আর অরুণ মিত্রের কবিতা সেই প্রশ্নগুলোকে নীরবে, দীর্ঘদিন, মানুষের ভেতরে জীবিত রাখে।   অরুণ মিত্র সেই জীবন্ত কবিতারই কবি। তাঁর নীরবতা আমাদের সময়ের কোলাহলের বিরুদ্ধে এক গভীর মানবিক প্রতিবাদ; তাঁর সংযম অতিরঞ্জনের বিরুদ্ধে এক নৈতিক অবস্থান; তাঁর মানবতাবাদ মানুষের প্রতি মানুষের শেষ আস্থার প্রকাশ।   তাই তাঁর কবিতা পড়া মানে শুধু একজন কবিকে স্মরণ করা নয়—নিজের ভেতরে এখনো যে মানুষটি বেঁচে আছে, তার সঙ্গে একবার নীরবে দেখা করা। এবং সেই সাক্ষাতের শেষে হয়তো কোনো উচ্চারণ থাকে না। শুধু থাকে— একটি দীর্ঘ নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই কোনো এক অদৃশ্য আলো ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে।

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী আগস্ট ২৪, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল ইসলাম : বহুমুখী প্রতিভার সংযোজন

আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষ আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ও মানবতাবাদী  কবি। গান, কবিতা, গল্প, নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। যেখানে তিনি একাধারে গীতিকার, সংগীত পরিচালক, কাহিনিকার, সুরকার ও নির্মাতা হয়ে কাজ করেছেন। অভিনয় করেছেন দাপটের সঙ্গে।   নজরুলের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম, কবিতা ও গল্প অবলম্বনে পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মিত হয়েছে। তাঁর ‘পদ্মগোখরা’ গল্প অবলম্বনে ‘সুখ দুঃখ’  ও ‘মায়ার বাঁধন’ এবং উপন্যাস অবলম্বনে ‘মেহের নেগার’-এর (২০০৫) মতো চলচ্চিত্র নজরুল স্বভাবে ছিলেন আজীবন অস্থির, চঞ্চল।   বাংলা চলচ্চিত্রে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০ থেকে ২২টি চলচ্চিত্রে সরাসরি সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে কাজ করেন। ম্যাডান থিয়েটার্স ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ‘সুর ভাণ্ডারী’ বা প্রধান সুরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উচ্চাঙ্গ সংগীত, বাউল, ভাটিয়ালিসহ বিভিন্ন লোকসুরকে চলচ্চিত্রের উপযোগী করে সর্বজনীন রূপ দেন। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি আব্বাসউদ্দীন আহমদসহ অন্য বিশিষ্টজনদের নিয়ে ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামক একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে থেমে থাকেননি তিনি। তাই শুধুই অভিনয় আর পরিচালনা নয়, রীতিমতো প্রশিক্ষকের কাজ করতেন নজরুল। সহশিল্পীদের অভিনয় শেখাতেন, গান তুলে দিতেন শিল্পীদের। এমনকি উচ্চারণও ঠিক করে দিতেন। ত্রিশের দশকে নজরুল পার্সি মালিকানাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্সের ‘সুর ভাঙারি’ পদে নিযুক্ত হন। পদটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরে সেই সময়ের নামকরা প্রযোজক পিরোজ ম্যাডান ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।   এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ধ্রুব’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। পুরাণের কাহিনি নিয়ে গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। নজরুল এ ছবির গান লেখেন এবং সংগীত পরিচালনা করেন। তিনি দেবর্ষি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং একটি গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি ‘ধ্রুব’ মুক্তি পায়। ওই চলচ্চিত্রে নিজেকে একেবারে নতুন রূপে উপস্থাপন করেছিলেন। যেমন স্বর্গের সংবাদবাহক ও দেবর্ষি নারদের চরিত্রে সব সময় দেখা যায় জটাধারী, দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ একজনের চেহারা। কিন্তু নারদ নজরুল ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। তাঁর নারদ এক সুদর্শন যুবক। হাসি হাসি মুখ। চুড়ো করে মালা বাঁধা ঝাঁকড়া চুল, ক্লিন শেভড। পরনে সিল্কের লম্বা কুর্তা, গলায় মালা। চলচ্চিত্রের পর্দায় এভাবেই নারদরূপে আবির্ভূত হলেন নজরুল।   নারদ চরিত্রে নজরুলের সাজসজ্জা নিয়ে সে সময় পত্রিকায় সমালোচনা হয়েছিল যথেষ্ট। পাত্তা দেননি নজরুল। নজরুল তাঁর জবাব দেন। তিনি বলেন, “আমি চিরতরুণ ও চিরসুন্দর নারদের রূপই দেয়ার চেষ্টা করেছি।” ম্যাডান থিয়েটার্স বিভিন্নভাবে নজরুলের প্রাপ্য সম্মানী নিয়ে প্রতারণা করায় ১৯৩৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন তিনি। নজরুল নিজে পরিচালনা করেছেন ‘ধূপছায়া’ নামের একটি চলচ্চিত্র। ‘ধূপছায়া’তে দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। ১৯৩১ সালে অমর চৌধুরী পরিচালিত সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাইষষ্ঠী’তে সুরকারের ভূমিকায় কাজ করেন নজরুল। ১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল জে এফ ম্যাডান কোম্পানির সবাক চিত্র ‘জামাইষষ্ঠী’ ক্রাউন সিনেমা হলে মুক্তি পায়। ছবিটির পরিচালনায় ছিলেন অমর চৌধুরী। একই বছর বাংলা সবাক চিত্র ‘জলসা’য় নজরুল নিজের একটি গান গেয়েছিলেন এবং ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় ‘সাপুড়ে’। এর কাহিনিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। পরিচালক দেবকী বসু। বেদে সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক এ সিনেমা দারুণ ব্যবসা সফল হয়েছিল।   বেদেজীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য নজরুল বেশ কিছুদিন বেদে দলের সঙ্গে ছিলেন। ‘সাপুড়া’ নামে সিনেমাটির হিন্দি রিমেকও হয়েছিল। তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন নজরুল। ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল। তিনি এবং পরিচালক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এ ছবির গীতিকার। ‘পাতালপুরী’ সিনেমাটি কয়লাখনির শ্রমিক এবং সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এ ছবির জন্য ‘ঝুমুর’ সুরে গান রচনা করেন নজরুল। তিনি কয়লাখনি অঞ্চল সম্পর্কে জানার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গৃহদাহ’ সিনেমার সুরকার ছিলেন নজরুল। এ ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল। ১৯৩৭ সালে মুক্তি পায় রহস্য কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘গ্রহের ফের’। এ ছবির সংগীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন নজরুল।   ১৯৩৭ সালের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাপতি’। কবি বিদ্যাপতির জীবনীভিত্তিক এ ছবির মূল গল্প ছিল নজরুলের। যদিও চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনায় ছিলেন দেবকী বসু। ছবিটির সুরকার ছিলেন নজরুল ও রাইচাঁদ বড়াল। মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির বিভিন্ন কবিতায় নজরুলের সুরদানের কাজ ছিল অসাধারণ। বাংলা ‘বিদ্যাপতি’র সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দিতে নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’। ১৯৪২ সালে নির্মিত ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। পরে ‘চৌরঙ্গী’ হিন্দিতে নির্মিত হলে সেই ছবির জন্য সাতটি হিন্দি গান লেখেন নজরুল। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলরুবা’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। ১৯৪১-৪২ সালে ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। এ সিনেমার জন্য তিনি ১৫টি গান লেখেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিনেমাটি আর মুক্তি পায়নি।   চলচ্চিত্র ব্যবসায়ও নাম লিখিয়েছিলেন নজরুল। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীর, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ মোদাব্বের, আজিজুল ইসলাম, সারওয়ার হোসেন, আজিজুল হক প্রমুখ। তাঁর অসুস্থতার সময় এবং মৃত্যুর পর অনেক সিনেমায় তাঁর গান ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় তাঁর ও উত্তরাধিকারীদের অনুমতির তোয়াক্কাও করা হয়নি। তবে অধিকাংশ ছবিতেই নজরুলসংগীতের ব্যবহার দর্শকপ্রিয় হয়েছে।   ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা...’ গানটি অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। একইভাবে ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ‘কারার ওই লৌহকপাট...’ গানটির ব্যবহার ছিল অসাধারণ। ‘লায়লা-মজনু’ সিনেমায় ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া, মজনু গো আঁখি খোলো...’ গানটির সার্থক ব্যবহার দর্শকপ্রিয়তা অর্জন  করেছিল। নজরুলের ‘মেহের নেগার’ গল্প অবলম্বনে ২০০৬ সালে একটি সিনেমা নির্মিত হয়। সিনেমাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন মুশফিকুর রহমান ও মৌসুমী। চলচ্চিত্রে প্রধান দুই চরিত্র—কাশ্মীরের তরুণী মেহের নেগারের চরিত্রে মৌসুমী এবং আফগান যুবক ইউসুফের ভূমিকায় ফেরদৌস অভিনয় করেন।   এ সময় আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় নজরুলের গল্প ‘রাক্ষসী’ অবলম্বনে। ‘রাক্ষুসী’ সিনেমার পরিচালক মতিন রহমান। তিনটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন রোজিনা, পূর্ণিমা ও ফেরদৌস। এর আগে নজরুলের গল্প ‘জ্বিনের বাদশাহ’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন বাপ্পারাজ। নজরুলের উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ এবং গল্প ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাঁর দুটি কবিতা ‘লিচু চোর’ এবং ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’ অবলম্বনে শিশুদের জন্য দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে। ‘চৌরঙ্গী’ সিনেমার গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলরুবা’ সিনেমার গীতিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ হিন্দিতে নির্মিত হলে সেই সিনেমার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন নজরুল। ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর বাকরুদ্ধ ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। নজরুলের অসুস্থতার সময় এবং মৃত্যুর পর অনেক সিনেমায় তাঁর গান ব্যবহার করা হয়েছে।   পরবর্তীকালে নজরুলের গল্প ও উপন্যাস নিয়ে প্রচুর টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে আশির দশকে ধারাবাহিক নাটক হয়েছে নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস অবলম্বনে। এতে মেজবউ চরিত্রে অভিনয় করেন রোকেয়া রফিক বেবী। নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থায়নে ১৯৫৬-৫৭ সালে নির্মিত হয় ‘বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম’। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘বিদ্রোহী কবি’। ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’।   বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৮০-৮১ সালে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘কবি নজরুল’। বিবিসি টিভি চ্যানেল ফোর থেকে নির্মিত হয় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’। কানাডার চলচ্চিত্র পরিচালক ফিলিপ স্পারেল নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘নজরুল’। কিংবদন্তি শিল্পী শচীন দেব বর্মণের গাওয়া নজরুলের একটি বিখ্যাত গান, ‘চোখ গেল চোখ গেল/ কেন ডাকিস রে/ চোখ গেল পাখি রে...’। গানটি ১৯৪১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নন্দিন ‘তে সংযোজিত হয়। শচীন দেবের কণ্ঠে ওই সময় নজরুলের আরও একটি কালোত্তীর্ণ গান ‘পদ্মার ঢেউ রে, মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা...’ রেকর্ড করা হয়। তবে গানটি ওই ছবিতে নেয়া হয়নি। ‘চৌরঙ্গী’ ছবির জন্য ‘রুমঝুম ঝুমঝুম/খেজুর পাতার নূপুর বাজায়ে/ কে যায় যায়..’ গানটিও নজরুল লেখেন ও সুরারোপ করেন। এই ছবিতে নজরুল প্রায় আটটি গান লেখেন এবং সংগীত পরিচালনাও করেন। ছবিটি প্রথমে হিন্দিতে নির্মিত হয়। মাস দুয়েকের ব্যবধানে বাংলা ভাষায়ও মুক্তি পায়। ‘গ্রহের ফের’, ‘দিকশূল’ ও ‘অভিনয় নয়’ ছবি তিনটির জন্য যথাক্রমে ছটি, দুটি এবং একটি করে গান রচনা এবং সুরারোপ করেছেন নজরুল। অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের তুলনায় চলচ্চিত্রে নজরুল যেন এক  অগুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভার স্পর্শে চলচ্চিত্রও যে ঋদ্ধ হয়েছে এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।  

এস ডি সুব্রত এস ডি সুব্রত আগস্ট ১৮, ২০২৬ 0
বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর সাহিত্যকীর্তি : এক অন্তহীন চেতনার প্রবহমান ধারা

উনিশ শতকের রেনেসাঁস বা নবজাগরণের আলোয় যখন বাংলা তথা ভারতীয় সমাজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল, ঠিক সেই ক্ষণে আবির্ভূত হয়েছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর লেখনীর জাদুকরি স্পর্শে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কেবল পরাধীনতার গ্লানি ও স্থবিরতা থেকে মুক্তিই পায়নি, বরং লাভ করেছিল এক রমণীয় আধুনিকতা এবং সুদূরপ্রসারী দার্শনিক ভিত্তি।   “যেকালে বঙ্কিমের নবীনা প্রতিভা লক্ষ্মীরূপে সুধাভাণ্ড হস্তে লইয়া বাংলাদেশের সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন, তখনকার প্রাচীন লোকেরা বঙ্কিমের রচনাকে সসম্মান আনন্দের সহিত অভ্যর্থনা করেন নাই।...”  —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) লেখক পরিচয়ের বাইরে একজন দৃঢ়চেতা, বাস্তববাদী ও দায়িত্বশীল মানুষ ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনকালে সরকারি চাকরি করেও তিনি দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখেছিলেন। তাঁর প্রখর মেধা, কর্তব্যপরায়ণতা ও স্পষ্টবাদিতা তাঁকে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।  তিনি দীর্ঘকাল ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টরের কাজ করেছেন। কাজে ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও কড়া। ব্রিটিশ সাহেবদের অন্যায় আচরণ তিনি কখনো মেনে নেননি। নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে আপস করেননি।  তিনি সমাজের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সব সময় সরাসরি কথা বলেছেন।    বঙ্কিমচন্দ্র  শুধু সাহিত্য লেখেননি, দেশের মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছেন। তাঁর ভেতরে কাজ করত এক গভীর জাতীয়তাবাদী চেতনা। সাহিত্য ও ধর্মের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও সমাজ সংস্কার নিয়েও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও আধুনিক চিন্তা। জীবনের শেষভাগে বাঙালি সমাজ তাঁকে ‘ঋষি’ হিসেবে শ্রদ্ধা করতে শুরু করে। তাঁর ব্যক্তিত্বে একধরনের গাম্ভীর্য ও দূরদর্শিতা ছিল।    ১৮৬৫ সালে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে যে নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন, তা কালক্রমে বাঙালির মনন ও চেতনার মণিকোঠায় স্থায়ী আসন অধিকার করে নেয়। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যভাবনা নিছক বিনোদনের খোরাক ছিল না; বরং তা ছিল আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ, সমাজসংস্কার, নীতিবোধ জাগরণ এবং স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক ঋদ্ধ মানসপ্রসূত সাধনা। ইউরোপীয় শিক্ষা ও দর্শনের সঙ্গে প্রাচ্যের সনাতন সংস্কৃতির এক অপূর্ব সেতুবন্ধ ঘটিয়েছিলেন তিনি, যা তাঁর উপন্যাস ও মননশীল প্রবন্ধে রূপ পরিগ্রহ করেছিল এক অসামান্য শিল্পরূপ। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বহুমুখী—ইতিহাসের রোমাঞ্চ থেকে শুরু করে গার্হস্থ্য জীবনের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব, প্রেমের উদাত্ত আকুলতা থেকে জীবনের চরম ট্র্যাজেডি এবং সেখান থেকে ধর্ম ও দর্শনের গম্ভীর তত্ত্বালোচনায় তাঁর পদচারণ ছিল সমান সাবলীল।   বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যভাবনার কেন্দ্রে ছিল ‘সত্য ও ধর্ম’। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সাহিত্যের মূল লক্ষ্য কেবল মনোরঞ্জন নয়, বরং মানুষের চরিত্র গঠন ও শুভবুদ্ধির জাগরণ। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোতে যেমন অতীত গৌরব ও জাতীয় জাগরণের সুর বেজে উঠেছে, তেমনি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে মানবমনের জটিল আবেগ ও পঙ্কিলতার বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের নিসর্গপ্রকৃতির পটভূমিকায় রহস্যময় মানবাত্মার একাকী ক্রন্দন কিংবা ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর মতো উপন্যাসে দাম্পত্য জীবনের ভাঙন, অবৈধ প্রেম ও অনুশোচনার দহন—সবকিছুতেই রয়েছে এক গভীর সাহিত্যরস।   বঙ্কিমচন্দ্র মানুষের অন্তরের গূঢ় প্রবৃত্তিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি জানতেন ভালোবাসা এক অদ্ভুত শক্তি, যা মন জানে, হৃদয় জানে, দেহ জানে কিন্তু ভাষা জানে না। এই না-জানা অনুভূতির নিখুঁত প্রকাশ তাঁর নারী চরিত্রগুলোর মাঝে এক অনন্য মহিমা লাভ করেছে। কপালকুণ্ডলা, সূর্যমুখী, ভ্রমর কিংবা শৈবলিনী—প্রত্যেকেই যেন রক্তমাংসের মানুষ হয়েও কোনো এক চিরন্তন বেদনার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর গদ্যশৈলী ছিল ঝরঝরে, সংস্কৃতগন্ধী অথচ অত্যন্ত গতিশীল ও মার্জিত। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে কঠিন বাংলায় রোমান্টিক কল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার মিশেল ঘটাতে হয়। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি শুধু লেখক তৈরি করেননি, বরং বাঙালি পাঠকের মনে রুচিবোধ ও সাহিত্যচেতনা সৃষ্টি করেছিলেন। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তিনি অনুভব করেছিলেন যে একটি জাতিকে জাগাতে হলে তার নিজস্ব ভাষায় সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই।   তাঁর রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা বিশেষ করে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যে দেশপ্রেমের মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে, তা পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রামে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল। এই উপন্যাসের পাতায় জন্ম নিয়েছিল অমর সুর ও বাণী—‘বন্দে মাতরম্’, যা কালক্রমে ভারতের জাতীয় মন্ত্রে পরিণত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতকে কেবল একটি ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি, তাকে মাতৃরূপে কল্পনা করে দেশমাতৃকার বন্দনা করেছিলেন। তাঁর এই স্বদেশভাবনা বা স্বাদেশ্য চিন্তা কোনো সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক উদাত্ত প্রাণশক্তি।    বিশিষ্ট ও প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের একক পথপ্রদর্শক ও সাহিত্যসম্রাট। রবীন্দ্রনাধ ঠাকুর থেকে শুরু করে শ্রী অরবিন্দ ও আধুনিক সমালোচকেরা তাঁর শিল্পকলা, সমাজচেতনা ও জাতীয়তাবাদী প্রভাবের গভীর মূল্যায়ন করেছেন।  বঙ্কিমচন্দ্রকে বাংলা উপন্যাসের পথপ্রদর্শক ও মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যকে পরের দুয়ার থেকে মুক্ত করে স্বনির্ভর ও স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মতে, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের চরিত্রগুলো জীবন্ত, গতিশীল এবং বাঙালি পাঠকের মানসপটে চিরস্মরণীয়।   শ্রী অরবিন্দ বঙ্কিমচন্দ্রকে শুধু একজন সাহিত্যিক নন, বরং জাতির আত্মাকে জাগিয়ে তোলা এক মহান দ্রষ্টা হিসেবে দেখেছেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর দেশবাসীকে একটি ভাষা, একটি সাহিত্য এবং একটি জাতিসত্তা উপহার দিয়েছেন। ‘আনন্দমঠ’ ও ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রের মধ্য দিয়ে জাতীয় মুক্তির যে বীজ তিনি রোপণ করেছিলেন, তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন অরবিন্দ।    আধুনিক ও প্রগতিশীল সমালোচকদের দৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র রোমান্টিক কল্পনার গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজ সংস্কার, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে উপন্যাসে স্থান দিয়েছেন। কেউ কেউ তাঁর কিছু উপন্যাসে সাম্প্রদায়িক ও হিন্দু পুনরুত্থানবাদী চেতনার অতি-প্রকাশ নিয়েও সমালোচনা করেছেন, যা সমকালীন ও পরবর্তী যুগের ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যিকদের মধ্যে ভিন্ন চিন্তার জন্ম দিয়েছিল।  তাঁর গদ্যশৈলী ও ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদনা বাংলা ভাষা ও মননকে আধুনিক রূপ দানে অনন্য ভূমিকা রেখেছে বলে সমালোচকেরা একমত।   জীবনের অন্তিম পর্বে এসে তিনি ধর্মতত্ত্ব, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও কৃষ্ণচরিত্র নিয়ে গভীর মননশীল গবেষণা করেন। এগুলোর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে কর্মযোগ ও লোকসংগ্রহই মানুষের পরম ধর্ম। সাহিত্যসম্রাট হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের এই সামগ্রিক সৃষ্টি শুধু উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং বিশ শতক এবং তারও পরবর্তী সাহিত্যিকদের মনে জোগাল এক অফুরন্ত প্রেরণা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বহু প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক বঙ্কিমী ভাবনার উত্তরাধিকার বহন করেছেন। মানুষের জীবনের চরম সত্য, ধর্মীয় নিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শিল্পসৌন্দর্যের এক অনুপম সুষমায় বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকীর্তি চিরকালের মতো ধন্য হয়ে আছে।   আধুনিক বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের ভিত্তি স্থাপনকারী, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব বর্তমান যুগেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মননশীল ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও গভীর। তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র জাতীয় চেতনা গঠনে চিরকালীন প্রেরণা জোগালেও তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার কেবল দেশপ্রেমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আমাদের মনন ও সমাজচিন্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।  

বিধান চন্দ্র সান্যাল বিধান চন্দ্র সান্যাল আগস্ট ১৭, ২০২৬ 0
শতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

মহাকালের বহমান স্রোতে শতবর্ষ এক ক্ষুদ্র ক্ষণমাত্র। কোনো কোনো জীবন এই স্বল্প পরিসরেই সময়ের গায়ে এমন এক স্থায়ী স্বাক্ষর এঁকে দিয়ে যায়, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অম্লান থাকে। বাংলা সাহিত্যাকাশে সুকান্ত ভট্টাচার্য তেমনই এক নক্ষত্র। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষের এই মহালগ্নে দাঁড়িয়ে গত এক শতকের বাংলা কাব্যপ্রবাহের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। কী বিপুল দ্রোহ, আর কী গভীর মমতায় তিনি সাজিয়েছিলেন তাঁর পঙক্তিমালা!   ​কল্লোল-উত্তর বাংলা কবিতায় যখন একধরনের নাগরিক ক্লান্তি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতাশা আর নিভৃত ব্যাকুলতার মেলা বসেছিল, ঠিক তখন উল্কাপিণ্ডের মতো সুকান্তের আগমন। তিনি কবিতাকে নন্দনতাত্ত্বিক কারুকাজ বা কল্পনার দূরবর্তী নক্ষত্রলোক থেকে টেনে নামিয়েছেন রাজপথের রূঢ় বাস্তবের মাটিতে।    ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝালসানো রুটি।   চাঁদের মতো সনাতন রূপকও তাঁর হাতে হয়ে ওঠে বুভুক্ষু মানুষের জঠরজ্বালার প্রতীক। ‘রানার'-এর ক্লান্ত পদক্ষেপের আড়ালে তিনি আঁকেন শ্রমজীবী মানুষের অবমূল্যায়িত জীবনের নিখুঁত কোলাজ আর ‘আঠারো বছর বয়স’-এ স্পন্দিত করে তোলেন যৌবনের দুর্জয় আত্মপ্রত্যয়কে।   ​আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, সুকান্ত কি কেবল অতীতের কোনো বিপ্লবী অধ্যায়? উত্তর হলো—না। বিশ্বজুড়ে আজও শোষণ, বৈষম্য আর প্রাচুর্যের পাশে দারিদ্র্যের বৈপরীত্য। আজ যখন নতুন প্রজন্ম এক অবক্ষয়গ্রস্ত জীর্ণ পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দিশা খোঁজে, তখন সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ তাদের চিরন্তন দিশারী হয়ে ওঠে : এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান... চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ  প্রাণপণে পৃথিবীর আবর্জনা পরিষ্কার করে যাব।   ​শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আজ বাংলা কবিতার এই অনন্য অগ্নিপুরুষকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। শতাব্দী পেরিয়েও তাঁর কলম আজও আমাদের প্রাত্যহিক লড়াইয়ের অদম্য অনুপ্রেরণা।     শাহ্ জাহাঙ্গীর  ফরিদপুর। 

‎শাহ্ জাহাঙ্গীর ‎শাহ্ জাহাঙ্গীর আগস্ট ১৫, ২০২৬ 0
যে নেশা আমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনে

মানুষ যখন কোনো কিছুর প্রতি গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তার চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালো-মন্দের বোধ—সবকিছুই ধীরে ধীরে সেই আসক্তির বিষয়টিকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। নিজের বলে যেন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তার ভাবনা, অনুভব, আনন্দ, বিষাদ, অপেক্ষা—সবকিছুর মধ্যেই সেই একটি বিষয় মিশে থাকে। পৃথিবীতে আরও কত কিছু ঘটে যায়, কত মানুষ আসে-যায়, কত সম্পর্ক তৈরি হয়, ভেঙে যায়, তবু তার মন পড়ে থাকে সেই এক জায়গাতেই। সে তখন সেই আসক্তির বিষয়েই এমনভাবে বুঁদ হয়ে থাকে যে, তার নিজের সত্তাটুকুও যেন ধীরে ধীরে সেই আসক্তির মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।   আমাকে কবে যে কবিতা লেখার নেশা এভাবে পেয়ে বসেছিল, মনে নেই। শুধু মনে আছে, একদিন শব্দের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বদলে গেল। আগে শব্দ দিয়ে কিছু বলতে চাইতাম। পরে বুঝলাম, শব্দেরও নিজস্ব জীবন আছে। তারা কখনো আমার কথা বলে, কখনো আমার অজানা কথাগুলো বলে। কখনো এমন কিছু প্রকাশ করে দেয়, যা আমি নিজেই জানতাম না যে আমার ভেতরে এতদিন ধরে বাস করছে। সেখান থেকেই হয়তো শুরু।   তারপর যত এগিয়েছি, ততই দেখেছি, এ পথের কোনো শেষ নেই। একটি কবিতা লিখে মনে হয়েছে, এবার বুঝি একটু কাছে পৌঁছেছি। তারপর সেই কবিতাই আবার আমাকে আরও দূরের কোনো গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গেট  খুলেছি, তার ওপারে আরেক গেট। আরও একটু এগিয়েছি, আরও অচেনা কোনো পৃথিবী সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সৃষ্টির পথ বোধহয় এমনই।   এখানে পৌঁছে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আছে শুধু এগিয়ে যাওয়া। শুরুতে মানুষ ভাবে, সে সৃষ্টি করছে। পরে একদিন তার মনে হয়, আসলে সৃষ্টিই তাকে তৈরি করছে।   একটি কবিতা লিখতে গিয়ে মানুষ শুধু কবিতা লেখে না, নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে দেখা করে। নিজের অহংকারকে চিনতে শেখে। নিজের ভয়কে স্পর্শ করে। নিজের ভালোবাসার গভীরতা মাপে। কখনো নিজের ক্ষতকে নতুন করে আবিষ্কার করে, কখনো এমন আনন্দের সন্ধান পায়, যার কোনো নামই সে আগে জানত না। এ কারণেই হয়তো সত্যিকারের সৃষ্টিশীলতা কখনো নিছক বিনোদন হয়ে থাকে না। এটা মানুষকে বদলে দেয়। তবে সেই বদলে যাওয়ার পথ খুব সহজ নয়।   ভালোবাসতে হয়। হারাতে হয়। প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। ভুল করতে হয়। আবার শুরু করতে হয়। পৃথিবীকে শুধু চোখ দিয়ে দেখলে হয় না, তাকে অনুভব করতে হয়। মানুষের মুখের আড়ালে তার নীরবতাকে শুনতে হয়। একটি গাছের ছায়ায় যেমন ইতিহাস থাকে, তেমনি একজন মানুষের নীরবতার মধ্যেও থাকে অগণিত অপ্রকাশিত গল্প। সেই গল্পগুলো একদিন এসে শব্দের দরজায় কড়া নাড়ে। তখন কবিতা লেখা হয়।   কবিতা হয়তো কোনো উত্তর দেয় না। বরং আরও ভালো প্রশ্ন করতে শেখায়। আর এই শেখাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। কারণ, জীবন আমাদের বারবার বোঝাতে চায়—আমরা যতটা জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি আমরা জানি না। অথচ সেই না-জানার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিস্ময়। যে মানুষ বিস্মিত হতে পারে, সে এখনো বেঁচে আছে। যে মানুষ নতুন কিছু শেখার জন্য নিজের পুরোনো বিশ্বাসকে ভাঙতে পারে, সে এখনো তরুণ। কবিতা আমাকে সেই তরুণ থাকার শিক্ষাই দিয়েছে।   বয়স বাড়তে পারে, কিন্তু বিস্ময় যেন না মরে। ক্লান্তি আসতে পারে, কিন্তু কৌতূহল যেন না মরে। সবকিছু ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছে হতে পারে, কিন্তু সৃষ্টির কাছে ফিরে আসার দরজাটি যেন বন্ধ না হয়। আর কবিতার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে আশ্চর্য জায়গাটা হয়তো এখানেই। কবিতা আমাকে কখনো ছেড়ে যায়নি।   আমি তাকে অবহেলা করেছি, তবু সে অপেক্ষা করেছে। আমি দূরে সরে গেছি, তবু সে কোথাও না কোথাও আমার জন্য একটি শব্দ রেখে দিয়েছে। আমি যখন মানুষের কাছে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরেছি, তখন কবিতা আমাকে কোনো প্রশ্ন না করে জায়গা দিয়েছে। কোনো অভিযোগ নেই। কোনো হিসাব নেই। কোনো শর্ত নেই। আছে শুধু ফিরে আসার একটি দরজা। তাই আজ মনে হয়, কবিতা আমার কোনো অর্জন নয়। বরং কবিতার কাছে আমি নিজেই এক আজীবন শিক্ষার্থী।   আমি যত লিখি, তত বুঝি—আরও কত কিছু শেখার বাকি। যত জানি, ততই নিজের অজ্ঞতার বিস্তার দেখতে পাই। যত গভীরে যাই, তত বুঝি গভীরতার কোনো শেষ নেই। এই উপলব্ধিটাই হয়তো সাধনার প্রথম সত্য। সত্যিকারের সাধনা মানুষকে বড় করে না, বরং তাকে বিনম্র করে। সে শেখায়, আমি এখনো পথে আছি। এখনো শিখছি। এখনো ভুল করছি। এখনো নতুন করে শুরু করতে পারি।   হয়তো একদিন আমার লেখা কেউ পড়বে না। হয়তো আমার কোনো শব্দের কোনো পাঠক থাকবে না। হয়তো আমার লেখা কোনো কবিতাই সময়ের দীর্ঘ নদী পার হয়ে যেতে পারবে না। তবু লিখব। কারণ, সব সৃষ্টি পৃথিবীকে দেখানোর জন্য হয় না। কিছু সৃষ্টি নিজের ভেতরের মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিছু কাজের কোনো বাহ্যিক পুরস্কার নেই, অথচ সেই কাজ না করলে নিজের কাছেই পরাজিত হতে হয়। কবিতা আমার কাছে তেমনই এক প্রয়োজন। তাই এখন আর কবিতাকে নেশা বলতেও ভয় হয়।   নেশা মানুষকে নিজের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়। আর কবিতা আমাকে প্রতিবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। হয়তো এটাই তার সবচেয়ে বড় মায়া। জীবনে অনেক কিছুই একদিন আমাদের ছেড়ে যায়—মানুষ, সম্পর্ক, সময়, যৌবন, অভিমান, প্রিয় জায়গা, প্রিয় মুখ। কিন্তু কিছু কিছু ভালোবাসা আমাদের ছেড়ে যায় না। তারা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়, গভীর হয়, পরিণত হয় এবং একসময় আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে যায়। কবিতা আমার কাছে তেমনই।   তাই যদি কপালে কোনো নিয়তি লেখা থেকেই থাকে, তবে আমি চাই সেখানে এইটুকুই লেখা থাক— আমি আজীবন কবিতার কাছে ফিরে যাব। আজীবন তার ছাত্র হয়ে থাকব। আজীবন তার কাছে একটু একটু করে নিজেকে আবিষ্কার করব।   আর যদি সত্যিই কোনো গোলামি বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে, তবে আমি কবিতারই গোলামি বেছে নেব।কারণ, এমন গোলামি মানুষকে ছোট করে না। বরং নিজের সমস্ত অহংকার থেকে মুক্ত করে দেয়। কবিতার কাছে এমন পরাধীনতাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।

সাঈদুর রহমান লিটন সাঈদুর রহমান লিটন আগস্ট ১৫, ২০২৬ 0
আত্ম অন্বেষণ ও মানবিক অনুভবের চিঠি : ‘শুধু মাধবীর জন্য’

বাংলা সাহিত্যে চিঠি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপ্রকাশেরও একটি অনন্য শিল্পরূপ। ব্যক্তিগত অনুভূতি, স্মৃতি, প্রেম, বেদনা বা জীবনবোধ চিঠির ভাষায় এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা পাঠকের সঙ্গে এক নিবিড় মানসিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মো. আসাদুজ্জামানের ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইটি সমকালীন বাংলা গদ্যে একটি ভিন্নমাত্রার সংযোজন।   মুক্ত গদ্যের এই সংকলনে লেখক ব্যক্তিগত অনুভূতির ভেতর দিয়ে মানবজীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের সূক্ষ্মতা এবং সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। বইটির শিরোনামই পাঠকের কৌতূহল জাগায়। ‘মাধবী’ কে? কোনো বাস্তব মানুষ নাকি একটি প্রতীক? বইয়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়, ‘মাধবী’ কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একধরনের মানসিক আশ্রয়, এমন এক শ্রোতা, যার কাছে মানুষ নিজের অপ্রকাশিত কথাগুলো বলতে চায়। এই প্রতীকী নির্মাণ বইটির নান্দনিকতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রত্যেক পাঠক নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে ‘মাধবী’কে নতুন অর্থে আবিষ্কার করার সুযোগ পান।   ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইটির প্রধান শক্তি এর ভাষা। লেখক অলংকারের ভারে ভাষাকে ক্লান্ত করেননি; বরং সহজ, সংযত ও আন্তরিক বাক্যবিন্যাসে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। কোথাও কোথাও ভাষা কাব্যিক, আবার কোথাও তা নিঃশব্দ স্বীকারোক্তির মতো। এই ভাষাশৈলী পাঠককে দ্রুত আকৃষ্ট করে এবং লেখকের ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে, তরুণ পাঠকদের জন্য ভাষার এই স্বাভাবিকতা বইটিকে সহজপাঠ্য করে তুলেছে। গ্রন্থটির বিষয়বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। ভালোবাসা এখানে কেবল রোমান্টিক আবেগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের প্রতি মমত্ব, দায়িত্ববোধ, সময়ের নির্মমতা, স্মৃতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে লেখকের উপলব্ধিও এতে স্থান পেয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার সংমিশ্রণ বইটির ভাবনার পরিসরকে বিস্তৃত করেছে। লেখক নিজস্ব অনুভূতির বৃত্ত অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক প্রশ্নের দিকেও দৃষ্টি দিয়েছেন।   চিঠির ভঙ্গিতে লেখা হওয়ায় প্রতিটি রচনা যেন পাঠকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় পরিণত হয়েছে। এই অন্তরঙ্গতা বইটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখক কোথাও বক্তা নন, কোথাও শিক্ষকও নন; বরং একজন সহযাত্রী, যিনি জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান। ফলে পাঠকও নিজের জীবনকে লেখার ভেতরে খুঁজে পান। এই সংযোগই বইটির সাহিত্যিক সার্থকতার অন্যতম কারণ। তবে বইটির সীমাবদ্ধতাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। যারা দৃঢ় প্লট, নাটকীয় সংঘাত বা চরিত্রনির্ভর উপন্যাসের প্রত্যাশা নিয়ে বইটি পড়বেন, তাঁরা হয়তো কিছুটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন। এটি মূলত অনুভূতি ও চিন্তার গদ্য; এখানে ঘটনার চেয়ে উপলব্ধির গুরুত্ব বেশি। কিছু লেখায় আবেগের পুনরাবৃত্তিও অনুভূত হতে পারে। তবে মুক্ত গদ্যের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এই পুনরাবৃত্তি লেখকের ভাবনার ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে হয়।   সমকালীন বাংলা সাহিত্যে মুক্ত গদ্যের চর্চা খুব বিস্তৃত নয়। সেই বিবেচনায় ‘শুধু মাধবীর জন্য’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। বইটি পাঠককে কেবল আবেগাপ্লুত করে না; বরং তাকে আত্মসমালোচনা, আত্ম অন্বেষণ এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এর পাঠ এক বসায় শেষ করার নয়; বরং ধীরে ধীরে, বিরতি নিয়ে, প্রতিটি লেখার ভেতরের স্তরগুলো অনুভব করার। সব মিলিয়ে ‘শুধু মাধবীর জন্য’ এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে। সহজ ভাষা, আন্তরিক প্রকাশভঙ্গি এবং চিন্তার গভীরতা বইটিকে পাঠযোগ্য করে তুলেছে। সমকালীন বাংলা গদ্যে এটি এমন একটি সংযোজন, যা পাঠকের কাছে আত্ম অন্বেষণের একটি নীরব আহ্বান হয়ে ওঠে। সাহিত্যপ্রেমী, বিশেষত মুক্ত গদ্য ও জীবনঘনিষ্ঠ রচনার অনুরাগীদের জন্য বইটি নিঃসন্দেহে আগ্রহের বিষয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ গ্রন্থের পাঠ নতুন নতুন ব্যাখ্যার জন্ম দেবে এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়।   ‘শুধু মাধবীর জন্য’ প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। বইটির প্রকাশনা মান পরিচ্ছন্ন ও যত্নশীল। উন্নত কাগজ, সুস্পষ্ট মুদ্রণ, পরিমিত অলংকরণ ও নান্দনিক প্রচ্ছদ গ্রন্থটির সাহিত্যিক আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পাঠের সুবিধা ও নান্দনিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রকাশকের পেশাদারত্ব লক্ষণীয়। ফলে বিষয়বস্তুর পাশাপাশি গ্রন্থটির বাহ্যিক নির্মাণও পাঠকের কাছে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।    

ড. লিপন মুস্তাফিজ ড. লিপন মুস্তাফিজ আগস্ট ১৩, ২০২৬ 0
বার্নট সুগার : অবনী দোশির উপন্যাসের একটি বিশদ সমালোচনা

সমকালীন ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যে যে কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক সাহিত্যমহলে গভীর আলোড়ন তুলেছিল, অবনী দোশির ‘বার্নট সুগার’ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসটি প্রথমে ভারতে ‘গার্ল ইন হোয়াইট কটন’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এটি যুক্তরাজ্যে ‘বার্নট সুগার’ নামে প্রকাশিত হওয়ার পর ২০২০ সালের মর্যাদাপূর্ণ বুকার প্রাইজের চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান লাভ করে।   একই বছর বুকার প্রাইজ অর্জন করে ডাউগ্লাস স্টুর্টের ‘শাগি বেন’, কিন্তু ‘বার্নট সুগার’ তার অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, তীক্ষ্ণ ভাষাশৈলী এবং মা–মেয়ের সম্পর্কের সাহসী ও নির্মোহ উপস্থাপনার জন্য বিশ্বজুড়ে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নেয়। এই উপন্যাসের মাধ্যমে অবনী দোশি সমকালীন ভারতীয় প্রবাসী ইংরেজি কথাসাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর অভিষেক উপন্যাস ‘বার্নট সুগার’ ২০২০ সালের বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করে। তাঁর এই সাফল্য সমকালীন ভারতীয় প্রবাসী ইংরেজি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।   ‘বার্নট সুগার’ মূলত মা–মেয়ের সম্পর্কের গল্প হলেও এর পরিসর অনেক বৃহত্তর। এটি স্মৃতি, পরিচয়, মানসিক আঘাত, মাতৃত্ব, ক্ষমতা, অপরাধবোধ, শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমার অসম্ভবতার এক গভীর সাহিত্যিক অনুসন্ধান। উপন্যাসটি পাঠককে এমন এক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে ভালোবাসা কখনো নিঃশর্ত নয়, পরিবার সব সময় নিরাপদ আশ্রয় নয়, আর মাতৃত্ব কোনো পবিত্র ও প্রশ্নাতীত প্রতিষ্ঠানও নয়।   উপন্যাসের কথক অন্তরা। তার মা তারা একজন স্বাধীনচেতা, বিদ্রোহী এবং প্রচলিত সামাজিক নিয়মের প্রতি উদাসীন নারী। তিনি স্বামীকে ছেড়ে এক আধ্যাত্মিক আশ্রমে আশ্রয় নেন এবং ছোট্ট অন্তরাকে নিয়ে এক অনিশ্চিত জীবনের সূচনা করেন। সেই আশ্রমজীবন, দারিদ্র্য, অবহেলা, অনিরাপত্তা ও মানসিক অস্থিরতা অন্তরার শৈশবকে গভীরভাবে ক্ষত-বিক্ষত করে। বহু বছর পর যখন তাঁরা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি হারাতে শুরু করেন, তখন ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই অন্তরাকেই তাঁর পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে হয়। এখান থেকেই উপন্যাসটি এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন তোলে—যে মা কখনো সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন না, সেই মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কতখানি?   অবনী দোশির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তিনি মা–মেয়ের সম্পর্ককে কোনো আবেগময় আদর্শের মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। ভারতীয় সমাজে মাতৃত্বকে দেবীতুল্য মর্যাদা দেয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু ‘বার্নট সুগার’ সেই ধারণাকে প্রশ্ন করে। তাঁরা নিঃস্বার্থ মা হতে চান না; তিনি নিজের স্বাধীনতা, নিজের শরীর এবং নিজের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন। অন্যদিকে অন্তরা মায়ের প্রতি একই সঙ্গে ভালোবাসা, ঘৃণা, করুণা ও প্রতিশোধস্পৃহা অনুভব করে। এই দ্বৈত অনুভূতির জটিলতাই উপন্যাসটিকে অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দিয়েছে। এখানে ভালোবাসা ও ঘৃণা পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং একই সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য দুই দিক।   উপন্যাসের আরেকটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো স্মৃতি। তাঁরা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে স্মৃতি হারাতে থাকেন। কিন্তু অন্তরা অতীতের প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি অবহেলা এবং প্রতিটি অপমান মনে রাখতে চায়। ফলে স্মৃতি এখানে কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি ক্ষমতার ক্ষেত্র। যে ভুলে যায় সে কি অপরাধ থেকে মুক্তি পায়? আর যে ভুলতে পারে না, সে কি কখনো মুক্ত হতে পারে? অবনী দোশি স্মৃতিকে নির্ভুল সত্য হিসেবে দেখান না; বরং তিনি দেখান যে স্মৃতি নিজেই একটি পুনর্নির্মাণ, যেখানে বাস্তবতা, কল্পনা, অভিমান ও সময় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে স্মৃতি-অধ্যয়নের আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত করে।   নারীবাদী সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রেও ‘বার্নট সুগার’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তারা চরিত্রটি সমাজনির্ধারিত ‘আদর্শ মা’-এর ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। তিনি আত্মত্যাগের প্রতীক নন; তিনি নিজের জীবনকে নিজের শর্তে বাঁচতে চান। ফলে মাতৃত্ব এখানে কোনো সহজাত নারীগুণ নয়, বরং সামাজিক প্রত্যাশা, ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘর্ষের ক্ষেত্র। সিমোন দ্য বোভোয়ার ও অ্যাড্রিয়েন রিচের মাতৃত্ব-সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার সঙ্গে এই উপন্যাসের বহুস্তরীয় সংলাপ লক্ষ করা যায়। একই সঙ্গে জুলিয়া ক্রিস্তেভার মাতৃত্ব-সংক্রান্ত ভাবনাও এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, কারণ উপন্যাসটি মা ও সন্তানের সম্পর্ককে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করে।   মনোবিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘বার্নট সুগার’ একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুস্তরীয় উপন্যাস। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের দমিত স্মৃতির ধারণা অনুযায়ী, শৈশবের মানসিক আঘাত বা ট্রমা কখনো সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না; বরং তা অবচেতনে সঞ্চিত থেকে পরবর্তী জীবনের আচরণ, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অন্তরার ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, মায়ের অবহেলা, অনিশ্চিত শৈশব, নিরাপত্তাহীনতা ও ভালোবাসার অভাব তার ব্যক্তিত্বের গভীরে এমনভাবে প্রোথিত হয়েছে যে, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও সে ওই ট্রমার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তার প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং নিজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি অতীতের সেই ক্ষত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।   জাক লাকাঁর আকাঙ্ক্ষা ও অভাবের তত্ত্ব এই উপন্যাসের পাঠকে আরও গভীর করে। লাকাঁর মতে, মানুষের আকাঙ্ক্ষা কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয় না; বরং তা এক চিরস্থায়ী অভাববোধ থেকে জন্ম নেয়। অন্তরার জীবনেও এই অভাবের কেন্দ্রবিন্দু হলো মাতৃস্নেহ ও স্বীকৃতি। সে একদিকে মায়ের প্রতি গভীর ক্ষোভ পোষণ করে, তাকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়, অন্যদিকে একই মায়ের কাছ থেকেই ভালোবাসা, স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা কামনা করে। এই পরস্পরবিরোধী মানসিক অবস্থানই তাকে ক্রমাগত দ্বিধাগ্রস্ত, অস্থির ও অস্তিত্বগত সংকটে নিমজ্জিত করে।   বস্তু-সম্পর্ক তত্ত্বের আলোকে উপন্যাসটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেলানি ক্লাইন ও ডোনাল্ড উইনিকটের মতো মনোবিশ্লেষকদের মতে, শিশুর প্রথম সম্পর্ক—বিশেষত মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক—পরবর্তী জীবনের সমস্ত আন্তঃ ব্যক্তিক সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণ করে। অন্তরার ক্ষেত্রে সেই প্রাথমিক সম্পর্ক নিরাপদ, স্নেহময় বা স্থিতিশীল ছিল না; বরং ছিল অনিশ্চয়তা, অবহেলা এবং আবেগগত বিচ্ছিন্নতায় পরিপূর্ণ। ফলে সে পরিণত বয়সেও সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সংগ্রাম করে। তার বিবাহিত জীবন, মাতৃত্ব নিয়ে সংশয়, এমনকি নিজের শরীর ও পরিচয় সম্পর্কে তার দ্বিধাও শৈশবের সেই অসম্পূর্ণ সম্পর্কেরই প্রতিফলন।   এ কারণেই ‘বার্নট সুগার’ কেবল একটি মা–মেয়ের সম্পর্কের কাহিনি নয়; এটি ট্রমার উত্তরাধিকার, দমিত স্মৃতির প্রত্যাবর্তন এবং অবচেতনের জটিল কার্যপ্রণালির এক সূক্ষ্ম সাহিত্যিক বিশ্লেষণ। অবনী দোশি দেখিয়েছেন, মানুষ অনেক সময় অতীতকে ভুলে যেতে চাইলেও অবচেতন কখনো তা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হতে দেয় না। বরং সেই দমিত স্মৃতিই বারবার বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে, সম্পর্ককে জটিল করে তোলে এবং ব্যক্তিসত্তাকে বিভক্ত করে। অন্তরার চরিত্র তাই একদিকে ক্ষতবিক্ষত শিশুর, অন্যদিকে স্বীকৃতির জন্য আজীবন সংগ্রামরত এক প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রতীক।   উপন্যাসে শরীর ও যৌনতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্তরার বিবাহিত জীবন, মাতৃত্ব নিয়ে তার সংশয় এবং নিজের শরীর সম্পর্কে তার অস্বস্তি সবই শৈশবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। শরীর এখানে কেবল জৈবিক সত্তা নয়; এটি স্মৃতি, ক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। এ কারণে উপন্যাসটি নারী-অভিজ্ঞতার গভীর ও জটিল রূপ তুলে ধরে।   অবনী দোশির ভাষাশৈলী সংযত, ধারালো ও কাব্যিক। অল্প শব্দে তিনি গভীর মানসিক অস্থিরতা নির্মাণ করেন। প্রথম পুরুষে বর্ণিত হওয়ায় পাঠক সরাসরি অন্তরার চেতনার মধ্যে প্রবেশ করেন। কিন্তু সেই বয়ানও সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে পাঠক বারবার প্রশ্ন করেন—আমরা কি সত্যিই যা পড়ছি, তা-ই সত্য? এই ‘অনির্ভরযোগ্য কথক’-এর কৌশল উপন্যাসটিকে আরও জটিল ও শিল্পসম্মত করে তুলেছে।   উপন্যাসের শিরোনাম ‘বার্নট সুগার’ নিজেই একটি শক্তিশালী প্রতীক। চিনি মিষ্টতার প্রতীক, কিন্তু পুড়ে গেলে সেই মিষ্টতাই তিক্ততায় রূপান্তরিত হয়। মা–মেয়ের সম্পর্কও তেমন—ভালোবাসা আছে, কিন্তু সেই ভালোবাসা ক্ষত, অভিমান এবং অপূর্ণতার আগুনে দগ্ধ হয়ে তিক্ত হয়ে উঠেছে। অতীতের স্মৃতিও পোড়া চিনির মতো—মুছে যায় না, বরং স্থায়ী দাগ রেখে যায়।   উপন্যাসটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আশ্রম-পর্ব আরও বিস্তৃত হতে পারত, কয়েকটি পার্শ্বচরিত্র আরও বিকশিত হতে পারত এবং সমাপ্তি অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তবে এই অসম্পূর্ণতাই লেখিকার শিল্পকৌশলের অংশ। কারণ, বাস্তব জীবনেও সব সম্পর্কের সমাধান হয় না, সব ক্ষত সারে না এবং সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না।   সবশেষে বলা যায়, ‘বার্নট সুগার’ এমন একটি উপন্যাস, যা পাঠকের মানসিক স্বস্তিকে ভেঙে দেয় এবং তাকে সম্পর্ক, স্মৃতি, মাতৃত্ব ও পরিচয় সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এটি কোনো সহজ পারিবারিক কাহিনি নয়; বরং মানুষের অন্তর্জগতের অন্ধকার, দমিত স্মৃতি এবং আবেগের জটিলতার এক অসাধারণ সাহিত্যিক অনুসন্ধান। অবনী দোশি দেখিয়েছেন যে পরিবারের ভেতরে যেমন ভালোবাসা জন্ম নেয়, তেমনি জন্ম নেয় নীরব সহিংসতা, অপরাধবোধ ও অমোচনীয় মানসিক ক্ষত। সাহিত্যিক গুণ, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভাষার অভিনব ব্যবহারের জন্য বার্নট সুগার নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, যা দীর্ঘদিন ধরে গবেষক, সমালোচক ও সাধারণ পাঠকের আলোচনায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।  

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী আগস্ট ১২, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0