Breaking news
সাহিত্যকথন কবিতা গল্প

গল্প

ভালোবাসার পরিণতি মৃত্যু

মেয়েটির নাম ছিল মায়া। সর্বদা হাসিখুশি, সুন্দর মনের একটি মেয়ে। বয়স সবে আঠারোতে পড়েছে। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে। নতুন জীবন, নতুন অভিজ্ঞতা। মেয়েটির নাম যেমন ছিল মায়া, সে দেখতেও ছিল মায়াবতী। শ্যামলা মেয়েরা যে মায়াবতী হয়, সেটা মায়াকে দেখলেই বোঝা যেত।   মায়াবতী পড়াশোনায় তেমন ভালো না হলেও রান্না, হাতের কাজে ছিল পারদর্শী। কী সুন্দর সুন্দর কাঁথা সেলাই করত! তার কাজে এলাকায় সবাই মুগ্ধ ছিল। তার পড়াশোনায় সাহায্য করত তার বন্ধুর বড় ভাই। সে পড়াশোনার জন্য মাঝে মাঝে তার বন্ধুর বাসায় যেত। তার বন্ধুর ভাইয়ের নাম ছিল আরশ। আরশ পড়াশোনাতে অনেক ভালো ছিল। তার গ্রামে সে-ই ছিল একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ছাত্র। সে ছুটিতে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিনামূল্যে পড়াত।   আরশ যখন মায়াকে অঙ্ক করাত, মায়া একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকত। কিন্তু আরশ কখনো কিছু বলত না। সবাই মায়ার সাথে মজা করত আরশকে নিয়ে। কিন্তু আরশ ছিল গম্ভীর, চুপচাপ। হঠাৎ একদিন মায়ার বিয়ে ঠিক হলো। মায়া তার মনের কথা আরশকে বলতে পারল না। বুকভরা কষ্ট নিয়ে সে বিয়েতে রাজি হলো। কিন্তু আরশও হয়তো মায়াকে পছন্দ করত। সে মায়াকে ফোন দিয়ে বলল, “তোর জন্য একটা শাড়ি আনছি।” তারপর কী হলো, তা কেউ জানে না।   বিয়ের দিন বর এল। পুরো বাড়ি ফুল আর লাইট দিয়ে সাজানো। আত্মীয়স্বজনে বাড়ি গম গম করছে। কিন্তু পুরো বাড়িতে খুঁজেও মায়াকে পাওয়া গেল না। টেবিলের ওপর একটা চিঠি। তাতে লেখা, ‘বাবা আমাকে মাফ করে দিয়ো’। কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা।   বাবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। তখনই মনে পড়ল তাঁর ছোট মেয়ে নীরার কথা। নীরাকে তিনি বললেন, “একমাত্র তুমিই পারো আমাকে সম্মানহানির হাত থেকে রক্ষা করতে।”   নীরা বুঝে উঠতে পারছিল না তার কী করা উচিত। শেষ পর্যন্ত নিজের সাথে যুদ্ধ করে নীরা বিয়েতে রাজি হলো। সুন্দরভাবে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। এদিকে তিন দিন হয়ে গেল মায়ার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। কোথায় আছে, কার‌ সাথে আছে কেউ জানে না। পঞ্চম দিন বিকেলে মায়াকে দেখা গেল আরশের সাথে। আরশ মায়াকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেছে তার বউ করে। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল।   আরশের প্রতি সবাই খারাপ ধারণা পোষণ করল। তার মতো ভদ্র, শিক্ষিত‌ ছেলে এমন কাজ করবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। মায়াকে আরশের বাড়িতে কেউ মেনে নিল না। আরশের মা কান্না শুরু করলেন। তাঁর মেধাবী, শিক্ষিত ছেলের সাথে মায়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তাঁর আশা ছিল তাঁর ছেলের বউ হবে সুন্দরী, সুহাসিনী, উচ্চ শিক্ষিত।   আরশের সামনে বিসিএস ও অন্যান্য চাকরির পরীক্ষা ছিল। তাই সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মায়াকে বাড়িতে রেখে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল, “সাবধানে থেকো, একটু কষ্ট করে মানিয়ে নিয়ো।খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে নিয়ে যাব।” ছলছল চোখে মায়া আরশকে বিদায় দিল। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মায়ার শাশুড়ি, ননদ তাকে দুচোখে দেখতে পারত না। মায়াকে অনেক মানসিক নির্যাতন করত। কিন্তু মায়া সব সহ্য করত। আরশকে কিছুই বুঝতে দিত না সেসব।   আরশ প্রতিদিনই মায়াকে ফোন দিত। বলত, “আর কিছুদিন অপেক্ষা করো।” দিন দিন তাদের নির্যাতনের পরিমাণ বাড়তে লাগল। এদিকে মায়ার বাড়ির লোকও মায়ার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি। মায়া নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারত না। নীরবে সব সহ্য করত। দিন দিন তার ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়ে গেল। দেখতে দেখতে তিন মাস হয়ে গেল।   তখন শীতের সময়। একদিন ভোরে পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মায়ার ঝুলন্ত লাশ‌‌ পাওয়া গেল। তার শ্বশুরবাড়ির সবাই মেকি কান্না শুরু করল। বাড়িতে পুলিশ এল। কিন্তু পুরো বাড়ির কোথাও আরশকে দেখা গেল না। তবে সেদিন বাড়িতে একটা চিঠি এসেছিল। আরশ বিসিএস প্রসাশন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার আর চাকরি করা হলো না। পুলিশ অনেক খোঁজাখুঁজির পরে আরশকে পায়নি।   মায়ার মরদেহ পুলিশ নিয়ে গেল, ময়নাতদন্ত হলো। প্রমাণিত হলো, মায়া আত্মহত্যা করেনি। মায়াকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু মায়ার খুনি হয়তো আজও মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।   ওই ঘটনার পর মায়ার শ্বশুর, শাশুড়ি আর ননদকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়। কিন্তু আরশকে কখনো আর দেখা যায়নি। তবে লোকমুখে শোনা যায়, মায়ার খুনের আগের দিন রাতে আরশকে গ্রামে দেখে কিছু মানুষ...

মেহেজাবিন হক কনা মেহেজাবিন হক কনা অক্টোবর ২৩, ২০২৬ 0
রাফিয়া জান্নাত

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২৩তম আবেদন আর ১১তম ভাইভা শেষে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে জজকোর্টে ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদের চাকরিটা হলো। অনেকেই হয়তো বলবে পিয়নের চাকরি! কেউ নাক সিঁটকাবে, কেউ করুণা দেখাবে। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেয়া একটি ছেলের কাছে এই চাকরিটাই যেন সোনার হরিণ।   কোর্টে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে। কেউ ন্যায়বিচারের আশায়, কেউ মুক্তির আশায়, কেউ শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে আইনজীবীর ফি দিতে। দুঃখ দেখতে দেখতে এখন অভ্যস্ত।   একদিন দুপুরে আদালতের বারান্দার বাইরের বেঞ্চে বসে থাকা দুজন মানুষের দিকে চোখ গেল। দুজনই নিশ্চুপ। মুখে ক্লান্তি, চোখে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অপেক্ষা। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। কথা বলতে বলতেই জানলাম, একজন রাফিয়া জান্নাতের ভাই, আরেকজন তার ছোট ছেলে। ছেলেটির বয়স মাত্র আট বছর।   রাফিয়া জান্নাত বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তার পর থেকেই তিনি একা, অসহায়, মানুষের অবহেলা আর সমাজের বিদ্রূপ বয়ে বেড়াতেন। পাঁচ মাস আগে খবর আসে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথাই লেখা হয়। দাফন-কাফন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু চার দিন পর একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসে।   ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে বাজারের নির্জন কোণে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এস আলম রাফিয়ার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছেন। এরপর তাঁকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে সাজিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়।   রাফিয়ার ভাই মামলা করেন। মাসের পর মাস আদালত, থানা, আইনজীবী, সাক্ষী—এক অনন্ত দৌড়ঝাঁপ পেরিয়ে অবশেষে শুনানির দিন আসে। কিন্তু আদালতে বলা হলো, ভিডিওটি নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথাই রয়েছে। এস আলম নির্দোষ প্রমাণিত হলেন।   সেদিন আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে রাফিয়ার ভাই শুধু একবার বলেছিলেন, ‘গরিবের সত্যের কোনো সাক্ষী থাকে না’। তাঁর কণ্ঠে রাগ ছিল না। ছিল শুধু ভাঙা মানুষের ক্লান্তি। সেই দীর্ঘশ্বাসটা সারা দিন কানে বাজছিল।   দুদিন পর শুনলাম, টানা আদালতের দৌড়ঝাঁপে অসুস্থ হয়ে এস আলম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্যালাইন চলছে। পরদিন সকালেই আরেকটি খবর ছড়িয়ে পড়ল। এস আলম মারা গেছেন। কেউ বলল, হৃদরোগে। কেউ বলল অতিরিক্ত মানসিক চাপ। আবার কেউ ফিসফিস করে বলল, আল্লাহর বিচার।   কে জানত, সেই রাতেই মুখে মাস্ক পরা এক যুবক এস আলমের কেবিনে ঢুকে স্যালাইনের নলে কী যেন পুশ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ছটফট করতে করতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। যুবকটি দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তাকে যে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে—সকালে জজকোর্টে ডিউটি আছে। সে যে সামান্য এক অফিস সহায়ক!  

সৈয়দ রুহুল আমিন মাহফুজ সৈয়দ রুহুল আমিন মাহফুজ অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0
বিশ্বাসের নৌকা

নিরুবালা সেদিন বর্ষার রাতে জিজ্ঞেস করছিল, “এই ভর রাইত্তে কই যাও, মাঝি?” মাঝিও মেঘের মতো গুম কণ্ঠে জবাব দেয়, “আকাশের অবস্থা ভালা না। নদীতে জোয়ার আইছে। ঘাটে নৌকা বাইন্ধা ঘরে থাহন যায় না। নৌকাডা শক্ত কইরা গাছের লগে বাইন্ধা আহি।” “মাত্রই তো আইলা বাইরে থাইক্কা, না গেলেই ভালো অয়।” “নাহ, নৌকাডা গেলে খামু কী? যাইতেই অইব!”   বের হয়ে কিছুদূর গিয়ে মাঝি আবার ফিরে আসে দরজার কাছে। একটু থমকে জিজ্ঞাস করে— নিরু কি দুয়ারে? নিরুবালা উত্তর দেয় না, ইস্পাত কঠিন কণ্ঠস্বরে ভয় নিয়ে বলে— সাবধানে যাইয়ো মাঝি। ছাতা নিয়া যাও। বৃষ্টিতে ভিজলে শইলে জ্বর আইব।   মাঝি ঘাটে আর যায় না। উঠানেই ভিজে ভিজে ভাবতে থাকে কী করবে। অঝোর বৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ভিজে বেখায়ালির মতো আবার ফিরে এসে সে নিরুর ঘরে টোকা দেয়— কী রে নিরু, দরজা খোলস না ক্যান? শইল আমার ভিইজা জল পড়তাছে।   নিরুবালা নিজের শাড়ির আঁচল দিয়া মাঝির মাথা মুছে। এদিকে নিরুর শরীরও ভেজা। কীভাবে ভিজল সেটা নিয়ে ভাবনা এলেও পরক্ষণেই মাঝি সব ভুলে যায়। নিরুবালার শরীরের সুবাস তার নাকে এসে লাগে। বাইরের ঝড়-ঝঞ্ঝা, নৌকা সবকিছু বেমালুম ভুলে যায়। নদীর জোয়ারের চেয়ে শরীরের জোয়ার বেশি হলে তখন আর ঝড়-বৃষ্টি চোখে লাগে না। মাঝি তার শক্ত সুঠাম শরীর বের করে বিছানায় যায়। নিরু তার উন্মুক্ত বক্ষ মেলে ধরে, জল গড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর পথেঘাটে। অসাদৃশ্যতায় লুটিয়ে যায় দুই মানব-মানবী!   এরপর যেনো মাঝির চোখে হলুদ ফুলের বাগান ভাসতে থাকে। নৌকার কথা বেমালুম ভুলে ঠাণ্ঠা ঠাণ্ঠা আবহাওয়ায় নিরুকে আরও জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। ভোরবেলা মাঝি ঘাটে গিয়ে দেখে, নৌকা স্রোতের টানে ভেসে গেছে। ঘরে ফিরলে নিরুবালা চালাকি চোখে মুচকি হেসে জিগ্যেস করে— কী গো মাঝি, নৌকা বান্ধা শেষ হইল তোমার? মাঝি পাহাড়সমান বিষণ্নতা মুখে নিয়ে ঝাড়ি দেয়— না রে, জোয়ারে ভাইসা গ্যালো গা নৌকাটা! কাইলকা তুই বাধা না দিলে ঠিকই বাইন্দা আইতাম। এহন নৌকা ছাড়া করুমডা কী, খামু কী? মুখ ঝামটা মেরে নিরুবালা বলে— নদীর জোয়ার নাকি শইল্যের জোয়ার? মাঝি তখন আরও চোখ গরম কইরা বলে— "শইল্যের জোয়ারে কি নৌকা ভাসে? নাহ, শইল্যের জোয়ারে নৌকা ডুবে।   মাঝি ঘরের মেঝেতে রাখা খাবারের থালায় লাথি দিয়ে বলে— এই চিনলি আমারে? বিশ্বাস নাই? নিরুবালা অভিমান করে। স্বল্পস্বরে জবাব দেয়— হু!   মাঝি রাগ নিয়ে গজর গজর করতে করতে ঘরের পেছনে গিয়ে দেখে, গাছের সাথে শক্ত করে বাঁধা আছে তার নৌকা। কে বাঁধল সেটা মাথায় আসার আগেই মাঝি খুশিতে চিল্লায়ে ওঠে— নিরু, নিরু রে... নৌকা আছে। নৌকা ভাইসা যায় নাই।   নিরুবালা অস্পষ্ট স্বরে জবাব দেয়, কিন্তু মাঝি ততক্ষণে কাছে চলে আসতেই শুনতে পায়— শখের নৌকা ভাসে নাই, ভাইসা গ্যাছে বিশ্বাসের নৌকা।   মাঝি কিছু একটা আঁচ করে ফেলে। শুধরায়— নৌকা কি রাইতে তুই বান্দন দিছস?   নিরু শুনতে পায় না মাঝির কথা। ভেজা চোখে ফুঁপিয়ে উঠে— মাঝি, আমারে তুমি ভালোবাসো না, নাহ?  

সাকিবুল এজাজ সাকিবুল এজাজ অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 2
ধোঁয়া, বই এবং বিদ্রোহ

রাত আড়াইটার ঢাকা শহর। খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে এখনো কিছু চায়ের দোকান খোলা। শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে, তখন আরমানের দিন যেন সবে শুরু হয়।   এক হাতে গরম চায়ের কাপ, অন্য হাতে আধপোড়া সিগারেট। ধোঁয়ার সরু রেখা উঠে গিয়ে মিশে যাচ্ছে শহরের ধূসর আকাশে। তার সামনে খোলা একটি ‘বই দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’। বইয়ের পাতায় পাতায় ফ্রান্তজ ফ্যাননের ভাষা, আরমানের চোখে যেন আগুন ধরিয়ে দেয়। পাশে ব্যাগে আরও কয়েকটি বই ‘হোয়াই নেশনস ফেইল’, ‘প্রিজন নোটবুকস’, ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’, ‘ইম্যাজিনড কমিউনিটিজ’ এবং ‘নাইনটিন এইটি-ফোর’।   বইগুলো সে সাজিয়ে রাখে না। বইগুলো তার কাছে আসবাব নয়; অস্ত্র।   টুইটারে তার পরিচিতি আছে। অনুসারীর সংখ্যা খুব বেশি না, কিন্তু তার পোস্টগুলো মাঝেমধ্যে হাজার হাজার মানুষের টাইমলাইনে ঘুরে বেড়ায়। কখনো সে রাষ্ট্র নিয়ে লেখে, কখনো ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে, কখনো নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে। তার ভাষা ধারালো, কিন্তু সস্তা উত্তেজনাময় নয়।   ফেসবুকে সে দীর্ঘ স্ট্যাটাস লেখে। পাঁচ শ শব্দের পোস্ট দিয়ে শুরু করে কখনো কখনো তিন হাজার শব্দে শেষ করে। বন্ধুরা মজা করে বলে, “তুই স্ট্যাটাস লিখিস নাকি ছোটখাটো ম্যানিফেস্টো?” সে শুধু হেসে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু মানুষ আরমানকে যতটা কঠিন ভাবে, সে পুরোপুরি ততটা নয়।   রাতের নির্জনতায় হেডফোনে কখনো বাজে পিংক ফ্লয়েডের উইশ ইউ ওয়্যার হিয়ার, কখনো লিওনার্ড কোহেনের ফেমাস ব্লু রেইনকোট, কখনো মহীনের ঘোড়াগুলির পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে আবার কখনো অঞ্জন দত্তের বেলা বোস।   তার এই প্লেলিস্টের কথা খুব কম মানুষ জানে।   রাজনৈতিক বিতর্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো ছেলেটা কখনো কখনো শহরের আলো নিভে যাওয়ার পর পুরোনো গান শুনতে শুনতে জানালার পাশে বসে থাকে। সেখানে কোনো বিপ্লব নেই, কোনো স্লোগান নেই; শুধু মানুষের ভেতরের নিঃশব্দ একাকিত্ব আছে।   একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটি বিক্ষোভে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যেতে লাগল। চারদিকে দৌড়ঝাঁপ, স্লোগান, আতঙ্ক। সেই সময় আরমান দেখল প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেছে। ছেলেটির চশমা ভেঙে গেছে, হাঁটুতে রক্ত।   যারা সবচেয়ে বেশি বিপ্লবের কথা বলছিল, তাদের অনেকেই তখন নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে। আরমান দৌড়ে গেল। স্লোগান থামিয়ে, বক্তৃতা থামিয়ে, রাজনৈতিক তর্ক থামিয়ে সে ছেলেটিকে কাঁধে তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এল।   সেদিন রাতে টুইটারে সে কোনো ছবি পোস্ট করেনি। কোনো স্ট্যাটাসও লেখেনি। শুধু নিজের ডায়েরিতে একটি লাইন লিখেছিল, ‘রাজনীতি যদি মানুষের জন্য না হয়, তবে তা কেবল ক্ষমতার আরেকটি অলংকার’।   ভোরের দিকে আবার একটি সিগারেট ধরাল সে। শহর তখন নতুন দিনের জন্য জেগে উঠছে। আরমান জানে, তার সব মত সঠিক নয়। তার সব স্বপ্নও পূরণ হবে না। তবুও সে বই পড়বে, প্রশ্ন করবে, ভুল করবে, আবার শিখবে। কারণ সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীকে বদলে দেয়ার আগে পৃথিবীকে বুঝতে হয়। আর পৃথিবীকে বোঝার জন্য কখনো কখনো একটি বই, একটি রাত, একটি সিগারেটের ধোঁয়া, আর কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নই যথেষ্ট।  

নাকিবুর রহমান সরকার নাকিবুর রহমান সরকার অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0
পরি

সারা দেশে তীব্র দাবদাহ চলছে। অফিস শেষ করে শোভন বাসায় রওনা দিয়েছে। সারা দিনের কর্মক্লান্ত শরীর। তার ওপর রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেল। শোভনের বাসার সামনের গলিটাতে প্রায়শই একটা গা ছমছমে ভাব থাকে।   বাস থেকে নেমে শোভন তার বাসায় যাওয়ার গলি ধরে হাঁটতে শুরু করে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর তার মনে হলো, তার পাশে পাশে কে একজন হাঁটছে। আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ দেখে শোভন একটু থমকে দাঁড়ায়। চাঁদের আলোয় লোডশেডিংয়ে থাকা অন্ধকার পথটাও আজ খুব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আশপাশে কোনো হাসনাহেনা ফুলের গাছ নেই, তবুও কোথা থেকে যেন প্রচণ্ড সুঘ্রাণ তার নাকে ভেসে আসছে!   বাসায় ঢুকে শোভন গরমে অস্থির হয়ে যায়। এমনিতেই প্রচণ্ড গরম, তার ওপর আবার লোডশেডিং। কী দুর্বিষহ জীবন! সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে শোভন বাথরুমে গিয়ে গোসল করতে শুরু করে। প্রতিদিন ট্যাংকির পানি খুব গরম থাকে, কিন্তু আজ গোসল করতে গিয়ে শোভন একটু অবাক হয়ে যায়। হিমশীতল জল বের হচ্ছে পানির কল থেকে।   শোভন ব্যাচেলর। একাই একটা ছোট্ট দুই রুমের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। তাই কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে পারছে না আসলে ঘটনা কী? ঠান্ডা পানি পেয়ে প্রাণভরে গোসল সেরে নেয় শোভন। গোসল শেষ করে তার বেডরুমে প্রবেশ করতেই আবারও সেই মিষ্টি হাসনাহেনা ফুলের সুঘ্রাণ। সমস্ত ঘরটা ফুলের সুঘ্রাণে ভরে আছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, লোডশেডিং হওয়ার পরও ঘরে একটুও গরম নেই। একটা মৃদু শীতল বাতাস যেন বয়ে যাচ্ছে ঘরময়। হঠাৎ শোভন কিছু একটা দেখতে পেল তার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের ওপরে। যেন ধবধবে সাদা পোশাকে আবৃত অপরূপা কোনো নারী! শোভন তার মোবাইলে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে ঘরময় খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। আর থাকবেই-বা কেমন করে, সে তো একাই থাকে এ বাড়িতে।   কর্মক্লান্ত দিন শেষে শোভন তার ঘরে শীতল অনুভূতি পেয়ে খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে। রাতে সে স্বপ্নে একটি অপরূপা সুন্দরী নারীর সাথে অজানা এক কল্পরাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। নদী, পাহাড়, নীল আকাশ, সাদা মেঘ, মেঘের পরে মেঘ, ফুলের বিস্তীর্ণ বাগান, পাখির কলতান, হরেক রকম ফলের বাগান — এসব দেখতে দেখতে অপরূপা সেই নারীর সাথে তার খুব ভাব হয়ে যায়। অপরূপা সেই মেয়েটির পিঠে সাদা ধবধবে দুটো পাখা। হঠাৎ ঘড়ির অ্যালার্ম বেজে ওঠে। শোভনের ঘুম ভেঙে যায়।   কাচের জানালা ভেদ করে সকালের মিষ্টি সোনারোদ এসেছে তার ঘরে। হঠাৎ শোভনের চোখ পড়ে যায় তার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের ওপর। মৃদু পায়ে সে এগিয়ে যায় ড্রেসিং টেবিলের দিকে। ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখে দুটো সাদা ধবধবে পালক। গত রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে শোভনের। মনে পড়ে অফিস থেকে ফিরে বাসায় তার সাথে ঘটে যাওয়া সব অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কথা। অফিসে গিয়ে শোভন তার কলিগদের বিষয়টা শেয়ার করে। সবাই বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দেয়।   সেদিন থেকে প্রতিরাতে শোভনের সাথে একই রকম ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিরাতে তার ঘরে পরি আসে। একটা সময় শোভনকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না...    

রবিউল করিম পলাশ রবিউল করিম পলাশ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
সম্পর্ক

প্যারিসের এই চিলেকোঠায় বসে স্যেন নদীর দিকে তাকালে আমার পদ্মার কথা মনে পড়ে। দুটোই নদী, দুটোই বয়ে যায়, কেবল একজন বয়ে নিয়ে যায় আলো, আরেকজন বয়ে নিয়ে যায় স্মৃতি।   আমার বয়স এখন একাত্তর। নাম সুলেমান। সাঁ দেনির এই আট বাই দশ ঘরে আমি একা থাকি বাইশ বছর। আমার স্ত্রী মারা গেছে পাঁচ বছর হলো। দেশে আমার একটাই সম্পর্ক পড়ে আছে—আমার ছেলে ইমরান। সে এখন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়।   ইমরান আমাকে প্রতি শুক্রবার ফোন করে। ঘড়ি ধরে ঠিক সাত মিনিট।  বাবা ভালো আছ? আছি। ওষুধ খাচ্ছ? খাচ্ছি। ঠিক আছে, রাখি।   সাত মিনিটের সম্পর্ক। না কম, না বেশি।   গত মাসে ইমরান ফোন করে বলল, “বাবা, আমাদের কুষ্টিয়ার বাড়িটা বিক্রি করে দিচ্ছি। ওখানে ডেভেলপার অ্যাপার্টমেন্ট করবে। তোমার আপত্তি আছে?” আমি কিছু বলতে পারিনি। ওই বাড়ির উঠোনে আমার বাবা আমাকে কোরআন পড়া শিখিয়েছিলেন। ওই ঘরের দরজায় আমার মা তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকতেন। আমি বললাম, যা ভালো বুঝিস কর।   ফোনটা রেখে আমি অনেকক্ষণ আমার বাবার রেখে যাওয়া জায়নামাজটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জায়নামাজটা ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু বাবার কপালের দাগটা এখনো লেগে আছে।   আমি বুঝতে পারলাম, আমরা সম্পর্ককে বাড়ি ভেবেছি। ইট, কাঠ, দলিল। ভেবেছি বাড়ি থাকলেই সম্পর্ক থাকবে। আসলে সম্পর্ক বাড়িতে থাকে না, সম্পর্ক থাকে মানুষের ভেতরে যে শূন্যস্থানটা তৈরি হয়, সেখানে।   আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমি এক দিনও তার কবর জিয়ারত করতে যাইনি। ভেবেছি, কবরে কী আছে? কিন্তু আজ বুঝি, বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা কবরে যায়নি, সম্পর্কটা রয়ে গেছে এই জায়নামাজে। যতবার আমি এটাতে সিজদা দিই, বাবা একবার করে বেঁচে ওঠেন।   সেদিন রাতে আমি ইমরানকে ফোন করলাম। শুক্রবার নয়, মঙ্গলবার। ওপাশে উদ্বিগ্ন গলা। বাবা, কিছু হয়েছে? আমি বললাম— ইমরান, বাড়িটা বিক্রি করিস না। কেন? কারণ ওটা বাড়ি না, ওটা আমাদের সম্পর্কের শেষ চিহ্ন। ওটা বিক্রি হয়ে গেলে তুই আর আমি শুধু বাবা-ছেলে থাকব, কিন্তু আমাদের যে একটা উঠোন ছিল, যেখানে তুই প্রথম হাঁটতে শিখেছিলি, সেটা থাকবে না।   ওপাশে নীরবতা। তারপর ইমরান বলল— বাবা, তোমার মনে আছে, আমি যখন ছোট, তুমি আমাকে কাঁধে নিয়ে বাজারে যেতে? আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। এই কথাটা সে বিশ বছর পর বলল। মনে আছে। আমি ভেবেছি তুমি ভুলে গেছ। কারণ তুমি তো কখনো বলো না।   আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম— আমরা বাঙালি বাবারা ভালোবাসতে জানি, বলতে জানি না রে। আমরা ভাবি, টাকা পাঠালেই ভালোবাসা বোঝা যায়। ছেলে বিদেশে থাকলে মেয়ের বিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ। আমরা বুঝি না, সম্পর্ক টাকায় বাঁচে না, সম্পর্ক বাঁচে 'মনে আছে' এই দুটো শব্দে।   সাত মিনিটের ফোনটা সেদিন চল্লিশ মিনিট হলো। ইমরান বলল— বাবা, বাড়িটা থাকবে। আমি সামনের মাসে প্যারিস আসছি। তোমার ওই চিলেকোঠাটা একবার দেখতে চাই, যেখানে বসে তুমি পদ্মাকে দেখো।   ফোন রেখে আমি জানালাটা খুলে দিলাম। প্যারিসের ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। স্যেন নদীর ওপর দিয়ে হাওয়া আসছে। আমার মনে হলো, এই হাওয়াটা একদিন পদ্মার ওপর দিয়েও বয়ে যাবে।   সম্পর্ক আসলে কিছুই না, শুধু একটা সুতো। দেখা যায় না, কিন্তু ছিঁড়ে গেলে পুরো জীবনটাই খুলে যায়।  

জন এ্যাডওয়ার্ড কর্মকার জন এ্যাডওয়ার্ড কর্মকার অক্টোবর ২১, ২০২৬ 0
আরেকটু ডোপামিনের আশায়

বেলকনিতে বসে গল্পের বই পড়ছিলাম। হঠাৎ রাস্তার দিকে চোখ পড়তেই একটি ঘটনা চোখে পড়ল।কয়েকজন লোক একটা মেয়েকে জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার বিষয়টা একটু সন্দেহজনক মনে হলো। তাই আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বের হয়ে তাদের পিছু নিলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখি তারা মেয়েটিকে একটি বাড়িতে নিয়ে গেল। আমিও গেলাম লুকিয়ে লুকিয়ে। এরপর দেখলাম তারা মেয়েটিকে বারান্দায় বেঁধে রেখে রুমে চলে গেল। মেয়েটি একটু অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। মেয়েটি বলছিল, “আমার খিদে লেগেছে।” আরও অস্পষ্টভাবে শুনতে পেলাম, “আমাকে মরফিন দাও।”   আমি দৌড়ে গেলাম মাঠের দিকে। গিয়ে দেখি হাবলু আর বাবলু মাঠে বসে আছে। চিৎকার করে ডাক দিতেই হাবলু বলল— কী হয়েছে নিলু? এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? বাবলু পানি এনে বলল— এটা খা আগে। তারপর শান্ত হয়ে বলিস কী হয়েছে?   আমি পানি খেয়ে কিছুক্ষণ শ্বাস নেয়ার পর পুরো ঘটনা খুলে বললাম। ওরা শুনে একটু অবাক হলো। ওদেরও মেয়েটিকে দেখার খুব ইন্টারেস্ট জাগল। ওদের নিয়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি, মেয়েটি এখনো বাঁধা আছে। বাড়িতে লোকজনের সাড়াশব্দ নেই। আমরা তিনজন বাড়িতে প্রবেশ করেই দেখি, মেয়েটি আমাদের দিকে পেত্নীর মতো তাকিয়ে আছে। আমরা মেয়েটির শরীরে বাঁধা রশিগুলো খুলে দিলাম। বাড়ির লোকজন শব্দ পেয়ে ছুটে এল। তারা দৌড়ে এসে মেয়েটিকে ধরার চেষ্টা করে। আর আমরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। যখন দেখলাম যে মেয়েটি বেসিনে রাখা টুথপেস্ট, নেইল কাটার, টুথব্রাশ খাওয়ার জন্য মুখে ঢুকাছিল। কিন্তু লোকগুলো দেখা মাত্রই মেয়েটির হাত থেকে সেগুলো জোরজবস্তি করে কেড়ে নেয়। তারা মেয়েটিকে অনেক শক্ত করে ধরে রাখে। আমরা কিছু বলার আগেই একজন বয়স্ক মহিলা এসে বললেন— তোমরা কারা? এখানে কী করছ? হাবলু বলল— আমরা কে তা জেনে আপনাদের লাভ নেই। আগে বলেন আপনারা মেয়েটিকে জোরজবরদস্তি করে কেন বেঁধে রেখেছেন? আমরা মেয়েটির অভিভাবক। আমরা আমাদের মেয়েকে কী করব না করব, এটা আমাদের ব্যাপার। তোমরা কে? আমি বিস্মিত হয়ে বরলাম— আপনারা অভিভাবক! হ্যাঁ। কী হয়েছে মেয়েটির? সে এমন অখাদ্য বস্তু কেন গিলতে যাচ্ছিল? মরফিন-ডোপামিনের জন্য। মরফিন তো মাদকজাতীয় দ্রব্য! হ্যাঁ। আন্টি, আমরা তো আপনাদের কোনো কথায় বুঝতে পারলাম না। সবকিছু খুলে বলেন।   ধমক দিয়ে একজন বাবার বয়সী লোক বলে উঠলেন— এই বাচ্চারা, এখানে কী করতে এসেছ? চুরি করতে এসেছ নিশ্চয়! বিল্লু এই বিল্লু পুলিশকে ফোন কর। আমরা কিছু বুঝতে না পেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারা আমাদের বাইরে যেতে দিল না। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে হাজির হলো।   পুলিশ এসে বলল— কী হয়েছে? এই যে এই বাচ্চাগুলো চুরি করতে এসেছিল। এদের ধরে নিয়ে যান। না না স্যার। আমরা চুরি করতে আসিনি। দেখতে তো ভদ্রঘরের সন্তানের মতো, কিন্তু স্বভাবে চোর চোর ভাব কেন? আমরা চোর নই। একজন দারোগা বললেন— স্যার, আমার মনে হয় এদের আরও অনেক বড় গ্যাং আছে। এদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। একদম ঠিক। ধরো ওদের। নিয়ে চলো থানায়।   হাবলু আর বাবলু ভয় পেয়ে গেলেও আমার ভয় লাগছিল না। আমি জানতাম, আমরা কিছু করিনি। অতএব, ওরা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। তাই আমি কোনো সংকোচবোধ না করেই চলে গেলাম।   থানায় আসার পর অফিসার বললেন— তোমাদের নাম কী? আমাদের সবার নাম বললাম। তোমরা কোন ক্লাসে পড়ো? ক্লাস টেনে। তোমাদের বাসা কোথায়? রোজ গার্ডেন। তোমাদের মাঠে গিয়ে এখন খেলার বয়স। তোমরা চুরি করো কেন? আমরা চুরি করি না। কারণ আমরা চোর নই। তাহলে ওই বাড়িতে কেন গিয়েছিলে? মেয়েটিকে বাঁচাতে। মানে? স্যার, আমি সব খুলে বলছি। শোনেন... সব শোনার পর তিনি বললেন— আচ্ছা, তাহলে এই কাহিনি! তোমরা কি জানো ওই মেয়েটি মাদকের প্রতি এডিকটেড? না স্যার জানি না। কিছুদিন আগে মেয়েটিকে আমরা বড় নদীর ব্রিজ থেকে মাতাল অবস্থায় উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসি। পরে মেয়েটির ফ্যামিলি এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। পরদিন কিছু কাগজপত্র জমা দেয়ার জন্য ফোন করলে জানতে পারি যে, মেয়েটির অবস্থা খুব সিরিয়াস। সে এখন হসপিটালে।   আমরা হসপিটালে গেলে তার অভিভাবক জানায় যে, মেয়েটিকে তারা মাদকদ্রব্য থেকে দূরে রাখার জন্য বন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু মেয়েটি অখাদ্য সব বস্তু অর্থাৎ নেইল কাটার, টুথপেস্ট ইত্যাদি গিলে ফেলে। এডিকশন লেভেল কী পর্যায়ে গেলে মানুষ এমন সব জিনিস গিলতে পারে! কী ভাবছ? এসব উল্টাপাল্টা জিনিস খাওয়ার এডিকশন! মোটেও না। সার্জারি করার সময় ব্যথা উপশমের জন্য যে মরফিন ড্র্যাগ দেয়া হয়, সেটার স্বাদ আরেকবার পেতে টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, নেইল কাটারের মতো অখাদ্য বস্তু গিলতে শুরু করে মেয়েটি। যেন তাকে আরেকবার হসপিটালে গিয়ে সার্জারি করার সময়ে মরফিন ড্র্যাগ দেয়া হয়। জাস্ট আরেকটু মরফিনের আসায় আরেকটু ডোপামিনের আশায়। কী জীবনে সাথে মিলে যায়! রিলস, স্ক্রলিং, ধূমপান, মাস্টারবেশন, পর্নগ্রাফি...   এসব শোনার পর আমার ইন্দ্রিয় শক্তির এডিকশনের প্রতি জঘন্যতম ঘৃণা জমে গেল। আমি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলাম না। পুলিশ অফিসার বললেন— তোমরা ছোট আছ। এখন থেকে সাবধান হয়ে যাও। আর মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলো। তোমরা প্রতিরোধী হলে তোমাদের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল।  

শারমিন আক্তার শিমু শারমিন আক্তার শিমু অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
শান্তি দেবীর পুকুর

কে যেন একদিন বলেছিল, “একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যা, জীবন সেট। তারপর মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াবি।” মানুষটার নাম মনে নেই। থাকলে আজ তাকে ছোটখাটো একটা অভিযোগপত্র পাঠাতাম। পাখির মতো ওড়ার কথা ছিল, অথচ আমি আছি হলের একঘেয়ে খাবার, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার এক বিশাল খাঁচায়। তার ওপর হাতখরচ চালাতে এক ছাত্রকে পড়াতে যাওয়া। এখানে নিজের জন্য একটু সময় বের করা মানে রীতিমতো বিলাসিতা, আর সে বিলাসিতার সামর্থ্য আমার নেই।   একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটল আজ। রুমমেট হৃদয় আর সামির দুজনই বাইরে, জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে, আর আমি একা। ওরা এত বকবক করে, যেন কথা বলার বিনিময়ে বেতন পায়। অনেক দিন পর এলোমেলো পড়ার টেবিল গোছাতে গিয়ে চোখ আটকে গেল কয়েকটা বইয়ে। স্কুলবন্ধু রেজার দেওয়া উপহার, কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ আর ও. হেনরির ‘দ্য ফোর মিলিয়ন’।   রেজা বইপোকা, আর আমি বইয়ের সঙ্গে ভদ্র দূরত্ব বজায় রাখা মানুষ। ‘মেটামরফোসিস’ আজও ঠিকমতো খোলা হয়নি, তবে ‘দ্য ফোর মিলিয়ন’-এর গল্পগুলো এখনো মনে আছে। বইগুলো যত্ন করে সাজালাম, যেন সাজালেই পড়া হয়ে যায়। তারপর ডায়েরি নিয়ে বসলাম। মোবাইলে হালকা ভলিউমে ছেড়ে দিলাম পিংক ফ্লয়েডের ‘উইশ ইউ ওয়্যার হিয়ার’। বাইরে নামল ঝুম বৃষ্টি।   আমি লিখতে ভালোবাসি। কী লিখব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল ছোটবেলার সেই পুকুরের কথা। শান্তি দেবীর পুকুর। ঠিক করে ফেলেছি, তাই দেরি না করে কলম ধরলাম। ফিরে গেলাম বহু বছর আগের সেই দিনগুলোতে। আমাদের খেলার মাঠ থেকে হাঁটাপথে দু-তিন মিনিট। রাস্তার ধারে সিমেন্ট-ইটে বাঁধানো পাড়, কাচের মতো পরিষ্কার পানি। এক পাশে জঙ্গল, শেষ মাথায় শান্তি দেবীদের বাড়ি আর সিঁড়ি দেওয়া ঘাট। আর ছিল এক ঝাঁকড়া পেয়ারা গাছ, যার ডাল ঝুঁকে থাকত পুকুরের দিকে। মাসি, মানে শান্তি দেবী, আইন করে দিয়েছিলেন, “পুকুরের দিকে ঝুলে থাকা পেয়ারা তোদের। দেয়াল টপকে ভেতরেরগুলোতে হাত দিবি না।” আইনটা পরিষ্কার, আর আমরা ছিলাম আইনের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল নাগরিক।   আমি একমাত্র ছেলে, তাই আদরও বেশি, দুশ্চিন্তাও বেশি। পুকুর গভীর বলে মা সারাক্ষণ ভয়ে থাকতেন। গোসলে দেরি হলেই অফিসে আব্বুর কাছে ফোন চলে যেত। আব্বু রাগী মানুষ। সন্ধ্যায় বাসায় বসত বিচারসভা, দ্রুত, কঠোর, আর রায় সব সময় একই। কতবার যে মার খেয়েছি, তার হিসাব নেই। অপরাধ একটাই, আর তার পুনরাবৃত্তি ঘটত আমার নিজের স্বেচ্ছায়। স্কুল ছুটি হতো সাড়ে বারোটায়। বাসায় এসে ড্রেস খুলেই দৌড়, সোজা মাঠে। ফুটবল ছিল আমাদের নেশা। কাদা মেখে খেলা শেষে শরীর পরিষ্কারের জন্য ছুটতাম পুকুরে। ঝাঁপাঝাঁপি, চিৎকার, আর পুরো রাস্তা ভিজে যেত।   পাড়ের জঙ্গলে ছিল এক পুরোনো নিমগাছ। আমাদের বন্ধু সাগর খাটো, মাথাটা বড়, গলা ফাটা মাইকের মতো। কিন্তু নিমগাছের মাথায় উঠলেই সে হয়ে যেত পর্দার নায়ক। লাফ দেয়ার মুহূর্তে চিৎকার করত, ‘মাচো ম্যান!’ আমরা হাসতে হাসতে এত পানি খেয়েছি যে তার হিসাব নেই। বর্ষার দিনে খেলার মজা ছিল আলাদা। কাদায় মাখামাখি, বৃষ্টির পানি বরফের মতো ঠান্ডা। আর বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল খেলতাম। ঠান্ডায় হাতের তালু আর পায়ের পাতা কুঁচকে যেত বুড়ো মানুষের চামড়ার মতো। আর এ রকম অবস্থায় পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দেয়ার মজাই আলাদা।   পুকুরের পানিতে নামলেই অন্য রকম এক প্রশান্তি ঘিরে ধরত। মনে হতো, এর চেয়ে সুখের জায়গা আর নেই। আসলে ওটা বৃষ্টির পানির চেয়ে একটু উষ্ণ হওয়ায় এমন লাগত। তবে এই স্বর্গসুখ বিনা মূল্যে মিলত না। চড়া দামও দিতে হতো। সন্ধ্যায় গলাব্যথা, তারপর কাশি, তারপর হাড়-কাঁপানো জ্বর। এমনও হয়েছে, কখনো কখনো দশ-বারো জন একসঙ্গে জ্বরে পড়তাম। তখন মাঠ ফাঁকা, ফুটবল নেই, আর শান্তি দেবীর পেয়ারাগাছও একটু বিশ্রাম পেত।   কয়েক দিন পর সবাই ফিরতাম সুস্থ হয়ে। যেন কিছুই হয়নি। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের পথগুলোও আলাদা হতে শুরু করল। কেউ রোজগারের তাগিদে কাজে নামল, কেউ পাড়ি জমাল অন্য শহরে, আর কেউ ডুবে গেল নিজের জীবনের ব্যস্ততায়। দশ-বারোজনের সেই দলটা থেকে একসময় ছাত্র রয়ে গেলাম মাত্র তিন-চারজন। তাও থাকি ভিন্ন ভিন্ন শহরে। আর কেউ ডাক দিত না, “চল মাঠে যাই।” কেউ জিজ্ঞেস করত না, “আজ পুকুরে নামবি?” কখন যে এই ডাক বন্ধ হয়ে গেল, টেরও পাইনি।   লেখালেখি বন্ধ করে লক্ষ করলাম, বৃষ্টি থেমেছে। সন্ধ্যায় মায়ের ফোন এল, দাদার শরীর খারাপ। রাতেই বাড়ি ফিরলাম। ডাক্তার বললেন, বয়সের সমস্যা, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। স্বস্তি পেলাম। পরদিন বিকেলে বন্ধুদের আড্ডায় বললাম, আগামীকাল শুক্রবার, চল সবাই পুকুরে গোসল করব। আর না করলে বলে দে আমাকে কালকেই বাস ধরে ফিরে যেতে হবে। আমার পরীক্ষা সামনে।   আমার কথা শুনে নাঈমের মুখটা হঠাৎ কেমন মলিন হয়ে গেল লক্ষ করলাম। সেখানে একটু গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “তুই জানিস না? জানবি কীভাবে, তুই তো এখানে থাকিস না।” তারপর নাঈমের মুখে একে একে সব শুনলাম। শান্তি দেবীরা পুরোনো বাড়ি বিক্রি করে অন্য পাড়ায় চলে গেছেন। নতুন মালিক পেয়ারা পাড়তে গেলে ছোটদের গালি দেন, ডাল কেটে ফেলেছেন, আর সেই সুন্দর ঘাটে ফেলছেন বাড়ির ময়লা। যেন কেউ পুকুরে গোসল করতে না পারে। আশপাশের কিছু মানুষও তাঁর দেখাদেখি ময়লা ফেলতে শুরু করেছে।   পানিতে এখন দুর্গন্ধ। তারপর সিফাত বিষণ্নতার সাথে বলল, “জানিস দোস্ত, পুকুরটা এক বড় ব্যবসায়ী কিনেছে। ভরাট করছে। উঁচু দালান হবে।” ট্রাকে ট্রাকে বালি আসছে। আমি এসব শুনে কোনো উত্তর দিলাম না। হাতে ধরা চায়ের কাপটা হঠাৎ অনেক ভারী মনে হলো, টেবিলে নামিয়ে রাখলাম। কথাগুলো শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মুখ দিয়ে কিছুই বেরোল না। শেষ পর্যন্ত আর কথাও বাড়ালাম না। আড্ডা শেষ করে চুপচাপ বাসায় ফিরে এলাম। রাতে খাবার শেষ করে বিছানায় শুয়ে বারবার মনে হচ্ছে, একবার গিয়ে দেখে আসি, শেষবারের মতো। কিন্তু সাহস হলো না। আমার মনে যে পুকুরটা আছে, সেটার স্বচ্ছ পানি, সিঁড়ি দেওয়া সুন্দর ঘাট, বড় নিমগাছ আর ঝুঁকে থাকা পেয়ারার ডাল।   ময়লা আর বালির ওপর দাঁড়িয়ে সেই শৈশবের পুরোনো স্মৃতি আমি নষ্ট করতে চাই না। কিছু জিনিস হয়তো না দেখাই ভালো। শান্তি দেবীর পুকুর হয়তো আর নেই। কিন্তু আমার স্মৃতিতে সে এখনো আগের মতোই আছে। বিকেলের খেলা শেষ করে ধুলোমাখা মাঠ পেছনে ফেলে একদল ছেলে ছুটছে পুকুরের দিকে। তাদের হইচইয়ের মধ্যে থেকে ভেসে আসছে সেই চেনা ডাক, “চল, পুকুরে যাই!” গতকালই তো শান্তি দেবীর পুকুর নিয়ে লিখতে বসেছিলাম। লিখছিলাম আমাদের শৈশবের গল্প। অথচ আজ বন্ধুদের মুখে শুনতে হলো দুঃসংবাদ। এসব ভাবতে ভাবতে রাত অনেক হয়ে গেল। ঘুমাতে হবে। সকালে বাস ধরে আবার ফিরতে হবে জীবনের চেনা ব্যস্ততায়।   এসব নিয়ে মন খারাপ করার সময় হয়তো হবে না, কারণ অপেক্ষা করছে অনেক দায়িত্ব, সামনে পরীক্ষা। তবু সেই ব্যস্ততার ভিড়েও মনের কোথাও রয়ে যাবে শান্তি দেবীর পুকুরপাড়ে কাটানো শৈশবের দিনগুলো। নিজেকে শুভরাত্রি জানিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।  

সাদমান সাকিব সাদমান সাকিব অক্টোবর ২০, ২০২৬ 0
ফেরা

দিনটা শুরু হয়েছিল সূর্যের মিষ্টি রোদ দিয়ে। হালকা বাতাস, পাখিদের ডাক, প্রকৃতির ছোঁয়া—সব মিলিয়ে সুন্দর একটি পরিবেশ। প্রতিদিনের মতোই একটি মেয়ে সেজেগুজে বের হয়েছিল। কাজলবিহীন চোখ, আর চোখের পাশে একটি তিল—সেই তিলটাই তার অহংকার।   সারা দিনের ব্যস্ততার মাঝে আজকের দিনটা একটু অন্য রকম। কারণ, আজ সে একটা ফোন কলের অপেক্ষায় ছিল।ফোনটা আসবে সেই মানুষটার, যার জন্য সে এক কঠিন পরিস্থিতি একা লড়াই করে জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছিল। যে নতুন অধ্যায়ের নাম সে দিয়েছিল—অপেক্ষা।   ভালোবাসা প্রমাণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে অপেক্ষা। একটি ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য যুগ যুগ অপেক্ষা করা যায়—এটা বইতেই মানায়। কিন্তু আসল জীবনে সেটা সব প্রেমিকা পারে না। আর যারা পারে, তারাই ইতিহাস হয়ে যায়। এ গল্পে যে মেয়েটি অপেক্ষায় আছে, সে ইতিহাসের অপেক্ষায় নেই। সে ইতিহাস হতে চায় না। সে শুধু তার পূর্ণতাকে চায়। আর সেই পূর্ণতার জন্যই সে অপেক্ষা করে।    মেয়েটি অফিস যাচ্ছিল। প্রতিদিনের মতো লোকাল বাসে উঠল, জানালার পাশে একটা সিটও পেয়ে গেল। মেয়েটির পছন্দের গান ছিল, ‘আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি...’। গানটা সে সব সময় শুনত। বাসে বসে সেদিনও শুনছিল।শুনতে শুনতে তার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল। যে দিনগুলো সে পার করে আজকের এই দিনটার অপেক্ষা করছে। এই ফোন কলটার অপেক্ষা করছে।   সেই দিনটা ছিল এ রকম... আর পাঁচটা প্রেমকাহিনির মতোই আমার গল্পটাও। হঠাৎ করেই বাসা থেকে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলল। কেউ আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করল না, আমি বিয়ে করতে চাই কি চাই না। আমার কোনো কথাই কেউ শুনল না। তবে একটা বিষয় আলাদা ছিল। আলাদা ছিল কারণ, আমার মানুষটা আমাকে বিয়েটা করে নিতে বলেছিল।   সে তখন বেকার ছিল। তাই আমার পরিবারের সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহসটা তার ছিল না। আমাকে নিয়ে যাবে, এই কথাটা বলার সাহসটাও ছিল না। একসমুদ্র কষ্ট বুকে নিয়ে সে আমাকে বলেছিল, “বিয়েটা করে নাও।” কিন্তু আমার পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না।   আমার অনেক অভিমান হয়েছিল। কারণ তার কী আছে, কী নেই, সেটা জেনে তো আমি তার হাতটা ধরিনি। আমি হাত ধরেছি, মানে হাত ধরে থাকব। তার হাত শূন্য হোক বা ভরা, সেটা আমার কাছে কিছু যায় আসে না। হাত ধরেছি মানে, শেষ পর্যন্ত ধরে থাকব—সেটা যেমনই হোক।   সেই রাতটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের রাত ছিল। আমি সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার একটা অভ্যাস আছে—আমি রাগ করলে, কষ্ট পেলে খেতে পারি না। সেদিন রাতেও আমি খাইনি। আমি একটু কান্না করলেই আমার চোখ খুব ফুলে যায়। কিন্তু সেদিন চোখ ফেটে কান্না আসা সত্ত্বেও আমি কান্না করিনি। কারণ, পরদিন ছেলেপক্ষ আসবে।   আমি জানতাম না, আমি আর ফিরে আসতে পারবো কি না। তার পরদিন একটা গোল্ড আর গোলাপি রঙের শাড়ি, গয়না বের করা হলো। বের করে আমার সামনে রেখে বলল, “পছন্দ হয়েছে? না অন্যটা দেব?” আমি কিচ্ছু বলিনি। একটু হেসে মুখটা নিচু করে ফেললাম। তারা হয়তো এটাই ভেবেছিল, আমার পছন্দ হয়েছে। আমি খুশি। কিন্তু আমার ভেতরে কী চলছে, সেটা আমি ছাড়া কেউ জানে না।   সেদিন তার সাথে আমার আর কোনো কথা হয়নি। আমি যোগাযোগও করিনি। করতে চাইওনি। কারণ, আমার একটাই অভিমান তার সাথে—তাকে আমি আমার এই দিনে পাশে পাইনি।   আয়োজনটা বাসায় করা হয়নি। রেস্টুরেন্টে করা হয়েছিল। একটা রেস্টুরেন্ট বুক করা হলো। আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন গেল। ওনারা এলো। আমাকে যখন গাড়িতে তোলা হয়, আমি গাড়িতে উঠে বসে আল্লাহকে উদ্দেশ করে বললাম, হে আল্লাহ, সবকিছু তোমার হাতে। তুমি যদি না চাও তাহলে কখনোই কোনো কিছু হওয়া সম্ভব না। আবার তুমি যদি চাও, তুমি তো তাকদিরও পরিবর্তন করতে পারো।   এতটুকুই বলেছি শুধু। আমি আর কিচ্ছু ভাবিনি। ক হবে, না হবে—কিচ্ছু না। তার পরের প্রতিটি ঘটনা আমার একপলকে যেন শেষ হলো। আমি হয়তো সবকিছু ঝাপসা দেখছিলাম। কী হচ্ছে, না হচ্ছে—কিচ্ছু আমার খেয়াল নেই।   আমাকে ছেলের সাথে আলাদা কথা বলার জন্য বলা হলো। আমি বলতে চাইনি। কিন্তু ছেলে আগ্রহ করেছিল, তাই আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হলো। আমি যখন যাচ্ছি, তখনো আমার মনে হয়নি আমি ওনাকে কী বলব। আমার কোনো কথাই গোছানো ছিল না। আমি শুধু ওনাকে গিয়ে বলে দিয়েছি, আমি এই বিয়েতে রাজি না। উনি আর একটা কথাও আমাকে বলেননি। উনি শুধু বললেন, "ঠিক আছে।"   তারপর সবকিছু নরমাল ছিল। উনি ওনার পরিবারকে কিছু বুঝতে দেননি। আমাদের পরিবারকেও কিছু বুঝতে দেননি। তারপর আমরা চলে এলাম। তারপর কীভাবে সে ম্যানেজ করল, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি জানতেও চাইনি। আমি শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম—আমি ফিরেছি। আমি ফিরতে পেরেছি। আমি সেই মানুষটার জন্যই ফিরেছি, যে আমার হাত ছাড়তে রাজি হয়ে গিয়েছিল।   তারপর সে একদিন দেখা করতে চাইল। কিন্তু আমি জানি না দেখা করে কী হবে। সব কি আগের মতো হবে? সব কি ঠিক হয়ে যাবে? নাকি আমি তাকে ঠিক করে নেব? কিচ্ছু জানি না।   মনে অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে গিয়েছিলাম দেখা করতে। আমার ভেতরে তখনো সেই অভিমানটা ছিল। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, সে কি এখনো আমার হাতটা ধরতে চায়? সেদিন তার চোখে আমি আমার জন্য পানি দেখেছিলাম, যেটা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।   একটা পুরুষের চোখ দিয়ে সহজে পানি পড়ে না, এটা আমি জানি। আর যদি পড়ে, সেটা অনেক আঘাতের পরই পড়ে। সে অনেক চেষ্টা করেছে আমার থেকে পানিটা আড়াল করতে, কিন্তু পারেনি। এটা দেখার পর আমি আর কিছুই জিজ্ঞেস করিনি। ভাবিওনি, তার হাত আবার ধরতে হবে কি হবে না। আমি শুধু জানি, আমি যার জন্য ফিরেছি, তার কাছেই আমাকে থাকতে হবে—যেকোনো মূল্যে।   তারপর সেই গানটাও শেষ হয়ে গেল, ‘আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি.. ‘। আমি আমার অফিসেও পৌঁছে গেলাম। কিন্তু মনটা তখনো ওখানেই পড়ে আছে। বাসে, কানে হেডফোন, আর ওই গানটা—সবকিছু যেন এখনো কানে বাজছে।   আমি অপেক্ষা করছিলাম। শুধু একটা ফোন কলের অপেক্ষায়। আজকে তার স্বপ্নের চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। তার স্বপ্ন পূরণের চাকরি। গতকাল রাতে সে আমাকে বলেছিল, “যদি চাকরিটা পাই, তাহলে তোমাকে ওই গানটা গেয়ে বলব, “চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ, এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না...”   ওই গানটা গেয়েই সে আমাকে জানাবে বলেছিল। আমি আজ অনেক খুশি ছিলাম। সকাল থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম, যেন সে চাকরিটা পেয়ে যায়। যেন আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ হয়। আমি এখনো সেই ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করছি...   ফোনটা বেজে উঠলেই যেন আমার সব অপেক্ষার অবসান হবে। তারপর দুপুরের দিকে হঠাৎ সে আমাকে ফোন দিল। কলটা পেয়েই আমি ছুটে গেলাম ফোনটা ধরতে। ফোনটা ধরে সে আমার নাম ধরে ডাকল, আর তারপর চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, সে চাকরিটা পেয়ে গেছে।   সেদিন আমরা দুজন জীবনের সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলাম। আমার মনের মধ্যে আলাদা একটা সাহস চলে এলো। মনে হলো, এবার আর কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। আমাদের স্বপ্নগুলো এবার সত্যি হবে। তবে তার চাকরিটা এমন ছিল, যে আমরা চাইলেও এখন বিয়ে করতে পারব না। কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিছু বছর। এই বছরগুলো যেন আমার কাছে একেকটা পাহাড় মনে হচ্ছে।   আমি তো আমার সবকিছুর সাথে যুদ্ধ করে ফিরে এসেছিলাম তার কাছে। এবার তার পালা। দেখা যাক, সে ফেরে নাকি...

সৈয়দা ইশিকা সৈয়দা ইশিকা অক্টোবর ২০, ২০২৬ 0
কে তুমি

মনের আঙিনায়, চোখের জানালায় কে যেন প্রতিদিন উঁকি মারে। নিঃশব্দে এসে হৃদয়ে ঢেউ তোলে, এলোমেলো করে দেয় ভাবনার জগৎ। তার কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই—তবু সে ভীষণ চেনা।   একদিন সাহস করে বললাম, কে তুমি? বলো না, তুমি কি আমার প্রিয়তমা? ওপাশ থেকে ভেসে এলো মিষ্টি হাসি, “যাকে এতদিন ধরে খুঁজছ, সে তো তোমার হৃদয়েই লুকিয়ে আছে!” আমি অবাক হয়ে আয়নায় তাকালাম। ঠোঁটে হাসি, চোখে বিস্ময়। তবে কি সে আমার কল্পনার রানি, নাকি সত্যিই আসবে কোনো এক বসন্তের বিকেলে?   উত্তরটা আজও অজানা, শুধু অপেক্ষা রয়ে গেল...    

রাশেদ শ্রাবণ রাশেদ শ্রাবণ অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0
ভালোবাসা চোখের ছিল

খুব ছটফট করছে শাহানা। খুব বিরক্তিভাব ফুটে ওঠে নিজের ওপর। ঘেন্না লাগে। এমন কেন হলো? আমার জীবনটা তো অন্য রকম ভালো হতে পারত! আর পাঁচটা ভালো মেয়ের সংসারের মতো। মন দিয়ে সংসার করার মানসিকতায় চতুর্থ বিয়ে করেছে আশিককে। ভেবেছে খুব ভালো ছেলে। কপালে আর ভালো কিছু জুটল না। নানা রকম আগডুম বাগডুম ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ফোন এল শাহানার মোবাইলে। হ্যালো... কী করছ? কিছু না। কাজ না থাকলে আমার কাপড়গুলো তো ধুয়ে ফেলতে পারো।  কুসুম গরম পানিতে পাউডার দিয়ে ভিজিয়ে রেখেছি। ওহ। আর কিছু বলবা? আগামীকাল ঢাকার বাইরে যাব অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে। রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে। বাড়ি ফিরে যাবে। ওহ আচ্ছা। আর কিছু বলবা? না। তাড়াতাড়ি কাপড়গুলো ধুয়ে মেলে দাও। শুকাতেও তো সময় লাগবে। আচ্ছা। বলেই লাইনটা কেটে দেয় শাহানা। দুজনের মধ্যে মনের মিল না থাকলেও বিয়ের ব্যাপারে দারুণ মিল ছিল!   দুজনই বিয়েতে হ্যাট্রিক করার পর চতুর্থ বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। দেখতে দেখতে তিন বছর ছুঁইছুঁই। মনের মিল না থাকায় সন্তান নিতেও ভয় পাচ্ছে শাহানা। ওর প্রথম ঘরে রয়েছে একটা মেয়ে। ডিভোর্সের পর আরও দুটি বিয়ে করেছে। কিন্তু ছয় মাসের বেশি টেকেনি সংসার। ছেলে পালিয়ে গেছে অন্য কোনো মেয়ের হাত ধরে।    এবার কপালে জুটলো আশিক। তাও ছাড় ছাড় ভাব।   ওদিকে আশিকের প্রথম ঘরে রয়েছে একটি ছেলে। তারপর আরও দুটি মেয়েকে বিয়ে করলেও পালিয়েছে নয় মাসের মাথায়। পালাবেই না কেন? একটা করে বিয়ে করে ঘরে তোলে মেয়ে। শুরু হয় পরকিয়া। জানাজানি হলে মেয়ে পালায়। ঘরে তোলে প্রেমিকাকে। শুরু হলো সংসার।   শাহানা টিকটক করত ফেসবুকে। প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যায়। ইনবক্সে শুরু হয় প্রেম। পরকিয়ার জোয়ারে ভেসে যায় শাহানা-আশিক। ঘরে থাকলে বাথরুমে গিয়ে ফিসফাস করে কথা বলে। তৃতীয় বউ বাথরুমের কাছে গিয়ে আড়ি পেতে শোনে কার সাথে কী কথা বলছে আশিক। একসময় ওঠে তুমুল ঝড়। সেই ঝড়ে দুজন দুদিকে ভেসে যায়।    কিছুদিন বাদেই বউ হয়ে উঠে আসে শাহানা। সময়ের ফেরে কত কিছু বদলে যায়। দিন হয়ে যায় রাত। রাত গড়িয়ে দিন। তবু কোনো পরিবর্তন আসেনি আশিকের ভেতর। কিছুদিন সংসার করার পর শুরু হয় খুনসুটি। একটু আধটু ঝগড়া।   আজ ঝগড়া রূপ নিলো কালবোশেখি ঝড়ে। ঘরের ভেতর হাতাহাতি, মারামারি। শাহানার অভিযোগ আমি থাকতে অন্য কোনো মেয়ের সাথে পরকিয়া করবি কেন? আমার ভেতর কী নেই যে সেটা ওই মেয়ের মধ্যে আছে!   আশপাশের লোকজন ছুটে এসে থামাল ঝড়। ঘরের ভেতর যত রকম ফার্নিচার আছে সব শাহানার। আশিকের কিছুই নেই। এর আগে তিনবার ফার্নিচার রেখেই রাগ করে বোনের বাসায় গিয়ে ওঠে। মাথা ঠান্ডা হলে ফিরে আসে ঘরে। কদিন ঠিকঠাক মতো সংসার করে দুজনই।   এবার রাগ পানি হওয়ার আগেই সব মালামাল নিয়ে রেডি। দুপুর বারোটা সাড়ে বারোটায় পিকআপ এসে হাজির। ড্রাইভার একে একে সব মালামাল উঠিয়ে চারপাশ থেকে শক্তপোক্ত রশি দিয়ে বেঁধে ফেলল। শাহানা উঠতেই গাড়ি ছুটে চলল বোনের বাসার উদ্দেশে।   কদিন বাদে অধিক ভাড়া বাসা ছেড়ে দিয়ে ব্যাচেলর বাসায় গিয়ে উঠল। এখন ফেসবুক পেজে নানা রকম টিকটক ভিডিও ছেড়ে দিয়ে আকুতি মিনতি জানায় আশিক। তবে শাহানার জন্য নয়। পঞ্চম প্রেমিকার জন্য। যার কারণে শাহানাকে ছেড়ে দিতে তার এতটুকু বুক কাঁপেনি। ভালোবাসাও উছলে ওঠেনি। বুঝতে পেরে ওই মেয়েও কেটে পড়ার ধান্ধা শুরু করেছে।   শাহানা এখন স্বাধীন। ওর টগবগে মন এখন আর কারো জন্য কাঁদে না। অফিসে যখন ছুটি হয়, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার ঘরে ছুঁইছুঁই করে। বেরিয়ে এসে নীল আকাশের দিকে তাকায়। রাতের শরতের আকাশ খুব সুন্দর ভালো লাগা দেয়। মন ভরে শ্বাস নেয় ও।   আচমকা গান বেজে ওঠে মোবাইলে। তাকিয়ে দেখে চমকে যায়। এতদিন পর আশিকের ফোন।   ফোন বাজতে থাকে। ও ফোন ধরে না। এগিয়ে যায় সামনে। ছিমছাম সাদামাটা পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে। একটা কফির দোকান পেয়ে বসে পড়ে ভেতরে। একজন তরুণ কাছে আসতেই কফির অর্ডার দেয়।    অফিসের চাকরিটা  নিয়েছে টাইম পাসের জন্য। হাসপাতালের ডাক্তারের সহকারী আর নার্সের চাকরি পেয়েও করেনি। ওর পছন্দ নয়।   কিছুক্ষণ বাদে কফি এলো। ভাবতে ভাবতে কফির কাপে চুমুক দিতেই ফোন বেজে উঠল। শাহানা কেটে দিল। আবারও কেটে দিল। শেষবার কাটতে গিয়ে ভাবল, এবার ধরে দেখি। নাম্বারটা চেনা চেনা লাগছে। হ্যালো... যাক বাবা। এতদিন পর আমার ফোনটা ধরলা। খুব খুশি হলাম। ভাই আপনি? হুম। কেন অন্য কেউ ভেবেছ? না, মানে। নাম্বারটা সেভ ছিল। আশিক হয়তো ডিলিট করে দিয়েছে। আমি খেয়াল করিনি।   এই বাসা থেকে তুমি চলে যাওয়ার পর খুব মিস করি তোমাকে। ভালো লাগা, ভালোবাসার মতো মেয়ে তুমি। আপাদমস্তক তোমাকে দেখতে খুব ভালো লাগে। তো এখন কী করছ তুমি? শাহেদ জানতে চায়। অফিসে টাইম পাস করি।  শাহেদের কথার জবাব দেয়। কারো চক্করে পড়নি তো? তুমি আমার কাছে চলে আসো। আমি তোমাকে আশিকের মতো অবহেলা করব না। না ভাই। আর কত বিয়ে করব? কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করো। এক বছর। টিকে গেলে আজীবন মেয়াদে আমরা দুজন কাটিয়ে দেব সংসারে। না। বলেই চুপ হয়ে যায় শাহানা। ওর অশান্ত টগবগে মন সায় দেয় না। হয়তো আবার বিচ্ছেদ হাতছানি দিয়ে ডাকবে।  তোমাকে আগেও বলেছি। আবার বললাম। মতিগতি ফিরলে ফোন দিয়ে জানাও। তুমি জেনেশুনে আমাকে বিয়ে করতে চাও কেন? এবার আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলো শাহানা। একই ছাদের নিচে হয়তো আমরা বসবাস করিনি এটা ঠিক, তবে একই ঘরের ছাদের নিচে হয়তো ছিলাম না। কিন্তু পাশাপাশি রুমে থেকে তোমার ঘ্রাণ নিয়েছি সব সময়। তুমি জানতেও পারোনি। বুঝলাম। শাহানার ছোট উত্তর। ভালোবাসা চোখের ছিল। আমার মনের ফুসফুস, হৃদয়, মনের ভেতর ভালোবাসা সচল রাখার জন্য তোমাকে খুব প্রয়োজন। থাক। এখন তুমি বুঝবে না। এখন আর কিছু বলব না। তুমি রাত বারোটার পর ভিডিও কল দিয়ো। কথা হবে, চোখের দেখাও হবে। আমার হৃদয়ের ভেতর ভালোবাসার ভেন্টিলেটর সচল রাখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে? তুমি আসবে তো? হড়বড় করে অনেকগুলো কথা বলে থেমে যায়।   দেখা যাক বলেই কফির কাপে শেষ চুমুক বসায় শাহানা। ফোন কেটে যেতেই উঠে গিয়ে বিল মিটিয়ে বড় সড়কের ওপর পা রাখে। রাত দশটার ঘরে ঘড়ির কাটা ছুঁইছুঁই করছে। এত শত না ভেবেই বাড়ির উদ্দেশে পা বাড়ায় ও।  

শফিকুল আলম টিটন শফিকুল আলম টিটন অক্টোবর ১৮, ২০২৬ 0
বা‌জি‌য়ে দেখা

শালবন গ্রামে থাকত এক অদ্ভুত মহিলা। নাম তার মর্জিনা বেগম। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, সে নিজেকে খুব ভালোবাসত কিন্তু মুখে স্বীকার করত না। আর দ্বিতীয় বড় গুণ ছিল—সে বিশ্বাস করত, পৃথিবীর সবাই তাকে কম ভালোবাসে। তাই সে মানুষকে পরীক্ষা করত।   মর্জিনা প্রতিদিন সকালবেলা ‌সে স্বামীকে বলত— তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো? স্বামী বলত— অবশ্যই ভালোবাসি। মর্জিনা চোখ কুঁচকে বলত— প্রমাণ দাও। কীভাবে? আজ তুমি নিজে থেকে আমাকে চা বানিয়ে দেবে। স্বামী চা বানিয়ে আনত। মর্জিনা এক চুমুক দিয়ে বলত— চিনি কম। স্বামী দৌড়ে গিয়ে চিনি দিত। এবার বেশি। আবার কমাত। শেষে মর্জিনা বলত— দেখলে? তুমি আমাকে বোঝোই না! স্বামী ভাবত, ভালোবাসার পরীক্ষায় ফেল করলাম।   আসল পরীক্ষা তখনো বাকি। একদিন মর্জিনা তার স্বামীকে নিয়ে গ্রামের হাটে গেল। হাটে এক কুমোরের দোকানে সুন্দর একটা মাটির হাঁড়ি দেখে বলল— এই হাঁড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে। স্বামী বলল— তাহলে কিনে নাও। মর্জিনা সঙ্গে সঙ্গে হাঁড়িটা হাতে তুলে নিল। তারপর শুরু হলো পরীক্ষা। টং! আঙুল দিয়ে হাঁড়ির গায়ে টোকা দিল। শব্দ ভালো না। আরেকটা হাঁড়ি তুলল। টং! টং! এটার শব্দও সন্দেহজনক। দোকানি বলল— আপা, হাঁড়ি ভালো। রান্না করলে বুঝবেন। মর্জিনা বলল— আমি না বুঝলে হাঁড়ি ভালো কীভাবে হবে? এরপর সে তৃতীয় হাঁড়ি তুলল। টং! এটা ভালো। স্বামী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু মর্জিনা হাঁড়িটা নামিয়ে আবার প্রথম হাঁড়িটা তুলল। টং! তারপর দ্বিতীয়টা। টং! তারপর তৃতীয়টা। টং! এভাবে একে একে প্রায় বিশটা হাঁড়ি বাজিয়ে দেখল। দোকানি তখন চুপ। স্বামীও চুপ। মর্জিনা এবার বলল— এই হাঁড়িটা নেব। স্বামী খুশি হয়ে টাকা বের করতেই মর্জিনা হাঁড়িটা আবার উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল— এক মিনিট। সে হাঁড়ির তলা দেখল। তারপর মুখের ভেতর তাকাল। তারপর আবার গায়ে টোকা দিল। টং! এবার একটু জোরে। ঠাস! হাঁড়িটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। দোকানি হতভম্ব! স্বামীও হতভম্ব!   মর্জিনা ভাঙা হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলল— দেখলে? স্বামী বলল— কী? আমি হাঁড়িটা কিনতে চেয়েছিলাম। তুমি আমাকে ঠিকমতো সাহায্য করোনি। স্বামী বলল— আমি তো বলেছিলাম ভালো! মর্জিনা গম্ভীর হয়ে বলল— তুমি শুধু ‘ভালো’ বলেছ। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে হাঁড়িটা আমার হাত থেকে নিয়ে নিজে পরীক্ষা করতে। স্বামী বলল— তুমি তো নিজেই বলেছিলে, তুমি হাঁড়ি বুঝতে পারো! মর্জিনা একটু ভেবে বলল— তাহলে তুমি আমার কথা শুনলে কেন? স্বামী এবার নীরব। দোকানি মুখ নিচু করে হাসি চাপতে লাগল। মর্জিনা সেটা দেখে বলল— আপনি হাসছেন কেন? দোকানি বলল— না আপা, হাঁড়ির দুঃখে হাসছি। মর্জিনা বলল— মিথ্যা! আপনিও আমাকে পরীক্ষা করছেন! সেদিন মর্জিনা হাঁড়ি না কিনেই বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফেরার পথে স্বামী সাহস করে বলল— তুমি আসলে কী চাও? মর্জিনা বলল— আমি শুধু চাই, মানুষ আমাকে বুঝুক। স্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— তোমাকে বোঝা কঠিন। মর্জিনা সঙ্গে সঙ্গে রেগে গেল— এই তো! তুমি আমাকে কঠিন বললে! অর্থাৎ তুমি আমাকে ভালোই বাসো না! স্বামী আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল— হে আল্লাহ, এই পরীক্ষার সিলেবাসটা একটু প্রকাশ করুন! মর্জিনা বলল— কী বললে? স্বামী মুচকি হেসে বলল— বললাম, তোমাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে চাই। মর্জিনা একটু নরম হলো। তারপর বলল— আচ্ছা। কাল তোমাকে আরেকটা পরীক্ষা দেব। স্বামী ভয়ে বলল— কী পরীক্ষা? মর্জিনা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল— কাল বাজারে গিয়ে তোমার নিজের হাতে একটা মাটির হাঁড়ি কিনবে। কেন? কারণ আমি দেখতে চাই—তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো, তা বুঝিয়ে আমার জন্য হাঁড়ি কিনতে পারো কি না। স্বামী বুঝল, পরীক্ষা শেষ হয়নি। পরীক্ষাই তার জীবন।  

না‌হিদা আক্তার না‌হিদা আক্তার অক্টোবর ১৩, ২০২৬ 0
দৃষ্টির ওপারে

ভেজা ঘাসগুলোকে সে আলতো হাতে ছুঁয়ে দেখে। সবুজ ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো তার কাছে ভীষণ পরিচিত। হিমশীতল স্নিগ্ধ বাতাস তার হৃদয়কে আলিঙ্গন করে। একটি ছোট্ট পাখি কোত্থেকে উড়ে এসে ঘাসের ওপর বসল, নিরা তা বুঝতে পারে। সে পাখির সাথে কথা বলতে চাইল।  ইতোমধ্যে পাখিটি অপর প্রান্তে চলে গেছে। নিরার মনে হয়, পাখিরা কি দিগন্তের পথে ছুটে চলে? তারা তা ছুঁয়ে দেখে নিশ্চয়ই!   তার আরও মনে হয়, আচ্ছা আকাশ কতটা নীল, কেমন তার রূপ? ভোরের শিউলিরা কেন ঝরে পড়ে? শীতের নিষ্প্রাণ ডালে সবুজ পাতার আগমন কি ঘটেছে?    নিরার গৃহের কোল ঘেঁষে মৃত্তিকা ভেদ করে গজিয়ে উঠেছে একটি কৃষ্ণচূড়া। গাছটির শেকড় সীমানা ভেদ করে বহুদূর অবধি ছড়িয়ে পড়েছে। দৃষ্টিহীন নিরার পৃথিবীতে গাছটি যেন এক নির্বাক বন্ধু, যার পাতার দোলায় সে খুঁজে পাই একটুকরো স্বপ্নোজ্জ্বল আলোর ঠিকানা।   নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়াটিকে সে স্পর্শ করে বলে, আজও কি তুমি ফুলে ফুলে ভরে আছ? একদিন সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মা, লাল রংটা কেমন? লাল মানে... আগুনের মতো। তাহলে কৃষ্ণচূড়া নিশ্চয়ই আগুনের মতোই সুন্দর। মৃদু অনিলে কয়েকটি পুষ্প তার মাথার ওপর ঝরে পড়ে। সে একটি পুষ্প হাতে তুলে নাকের কাছে ধরে। কৃষ্ণচূড়ার গন্ধ এতটা তীব্র নয়। তার কাছে গন্ধ মানে এই জগতের অদেখাকে দেখা।   এ জগতের সুপ্ত আভা তার কাছে কখনো ধরা দেয়নি, সূর্যাস্ত কেমন, নীলাভ অন্তরীক্ষে শুভ্র মেঘেদের ছুটে চলা কেমন, কৃষ্ণচূড়া কতটা লাল—এসবই তার কাছে শোনা গল্প। প্রতিদিন পাখির মধুময় কূজন তাকে জাগিয়ে তোলে। নিরেলা দুপুরের সুপ্ত মাটির গন্ধ সে অনুভব করে, যে মাটির গন্ধে নেই বিষাদের ছায়া। পশ্চিম গগনে রক্তিম আভা নিভে গেলে সন্ধ্যা যেন নিঃশব্দ পায়ের মায়াবী চাদর বিছিয়ে দেয় পথে-প্রান্তরে।   সে জানে সন্ধ্যা নামে, যখন পাখিদের কলতান, তাদের ডানার মৃদু শব্দগুচ্ছ নীল অন্তরীক্ষে বেজে ওঠে। নিরার মাঝে মাঝে পাখি হতে ইচ্ছে করে। এই মায়াময় পৃথিবীকে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। কী যেন একটা অদৃশ্য বাধা তাকে তা করতে দেয় না।   সে তার আঁখিতে এই রহস্যময় পৃথিবীকে ছুঁতে পারেনি কখনো, তবুও এই অপূর্ণতার অনুতাপ তাকে বিচলিত করতে পারে না। তার কাছে এ পৃথিবীর গভীরতম সত্যগুলো উপলব্ধ হয়ে গেছে অচিরেই। যার ছায়া তাকে তার নিশ্চুপ প্রাণকে এক নব্যরূপে সজ্জিত করে তোলে। যেখানে সে রাখেনি কোনো সংশয়। তার কাছে এ জগতের সবকিছুই অচেনা, তবুও চেনা বহুকিছু।  

মোছা: বৈশাখী খাতুন মোছা: বৈশাখী খাতুন অক্টোবর ১৩, ২০২৬ 1
বিচার

এশা যখন রক্তমাখা কাপড়ে বাড়ির উঠোনে ঢুকল, তখন বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসছে। মা চুলায় ভাত বসিয়েছিলেন। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে হাত থেকে হাঁড়ি পড়ে গেল। তিনি বললেন, “কী রে এশা! তোর কী হয়েছে? কে মারল? কথা বল!”   এশা ঠোঁট নড়াল, কিন্তু শব্দ হলো না। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কেউ পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। সে কী করে বলবে—মানুষের বেশে এক হিংস্র জানোয়ার তার সবটুকু ভেঙে দিয়েছে? মায়ের চোখের দিকে তাকাতেই লজ্জা, ভয়, অপমান সব মিলিয়ে তার ভেতরটা ছিঁড়ে যেতে লাগল। চোখ বেয়ে নেমে এল জল। শুধু জল। কথা বল রে মা… আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।   ঠিক তখনই উঠোনে ঢুকল রওনক। হাঁপাচ্ছে, কিন্তু চোখে ভয় নেই—দম্ভ আছে। “চেঁচামেচি কইরেন না,” সে বলল। “আপনার মেয়ের যা হওয়ার, আমি করছি। বেশি কথা বাইরে গেলে, বিচার-টিচার চাইতে গেলে—দুইজনরে মাটির নিচে পাঠাইয়া দেব।”   হুমকিটা এমন স্বাভাবিকভাবে বলল, যেন এটা তার জন্মগত অধিকার। সে চলে গেলে উঠোনে নেমে এলো মৃত্যু-নীরবতা।   রওনক আব্বাস আলীর ছেলে। ইউনিয়নের বড় নেতা। জমি, ব্যবসা, মানুষ—সব তার মুঠোয়। তার বিরুদ্ধে কেউ কখনো দাঁড়ায়নি। দাঁড়ানোর সাহসও করে না।   রাতিকা বেগম মাটিতে বসে পড়লেন। মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। কিন্তু সেই মাথা যেন অনেক দূরে, অনেক অচেনা।   এশার বাবা মারা গেছেন বহু বছর আগে। তখন থেকে ইটভাটার আগুন, ধোঁয়া আর ঘামের ভেতর দিয়েই রাতিকা বেগম বেঁচে আছেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন—মেয়ে লেখাপড়া শিখবে, বড় হবে, এই দারিদ্র্য ভাঙবে। অন্যদিকে এশা স্বপ্ন দেখত—মায়ের কষ্ট একদিন শেষ করবে।   দশম শ্রেণিতে প্রথম রোল করার দিন সে দৌড়ে এসে বলেছিল, “মা, বড় স্যার আসবে! আমাদের ছবি পত্রিকায় উঠবে!” রাতিকা বেগম সেই স্বপ্ন বুকের মধ্যে তাবিজের মতো বেঁধে রেখেছিলেন। কিন্তু স্বপ্ন খুব ভঙুর!   পরদিন বিকেলে তিনি যখন শরীর খারাপ নিয়ে একটু আগে বাড়ি ফিরলেন, তখন দেখলেন উঠোনে অচেনা ভিড়। মানুষের চোখে কৌতূহল, কারও কারও মুখে চাপা কথা। বুক ধড়ফড় করতে লাগল। ভিড় সরাতেই চোখে পড়ল—আমগাছের ডালে দুলছে একটা দেহ।   মায়ের চোখ কখনো ভুল করে না। তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন—“এশা!”   পৃথিবীটা থেমে গেল। পুলিশ এলো। নিয়ম, প্রক্রিয়া, কাগজ। পোস্টমর্টেম হবে।   রাতিকা বেগম হাত জোড় করলেন, “স্যার, আমার মেয়ে অপমান সইতে পারে নাই। রওনক ওরে শেষ করে দিয়েছে। আমি বিচার চাই। আল্লাহর দোহাই লাগে, বিচার করেন।”   কেউ তাঁর চোখের দিকে তাকাল না। পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠানো হলো, রিপোর্ট এলো। আত্মহত্যা না। গলা টিপে হত্যা। তারপর ঝুলিয়ে রাখা।   কথাটা শুনেই রাতিকা বেগম ধপ করে পড়ে গেলেন। তাঁর বুক এত শোক নিতে পারল না। সবাই বলল—স্ট্রোক।   জনতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আব্বাস আলী হেসে উঠল। একটা দীর্ঘ, নিশ্চিন্ত, বিজয়ী হাসি। “বিচার চাইবে কে এখন?” সে বলল। “সাক্ষী কোথায়? অভিযোগ করবে কে?”   সবাই মাথা নিচু করে রইল। কেউ সামনে এগোল না। সন্ধ্যা নামল। আমগাছটা নীরব দাঁড়িয়ে রইল। মাটির নিচে পাশাপাশি শুয়ে থাকল মা আর মেয়ে।   আর বাতাসে ভাসতে থাকল একটাই প্রশ্ন—যেখানে বিচার চাইবার মানুষ বেঁচে থাকে না, সেখানে বিচার হয় কীভাবে?  

মোঃ মুকুল মিয়া মোঃ মুকুল মিয়া অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0
কাদামাটি

গ্রামে এক বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। ছেলের বিয়ে। বিয়ে উপলক্ষে বাড়িকে যেমন সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল, ঠিক তেমনি সুন্দর দুধে আলতা গায়ের বরণ লাস্যময়ী এক বউ এনেছে। বাড়ির সবার নতুন বউকে নিয়ে মাতামাতি। শুধু কি বাড়ির লোক, আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকেই নতুন বউ দেখার জন্য এসেছে।   বউয়ের রূপ লাবণ্য নিয়ে তাদের প্রশংসার কোনো কমতি নেই। বাংলাদেশের চিরাচরিত সমাজব্যবস্থায় নতুন বউ নিয়ে মাতামাতি সব সময়ই হয়। নতুন বউয়ের জন্য নতুন পোশাক, নতুন জিনিসপত্র, এককথায় তার জন্য সবই স্পেশাল। সকাল বেলা নতুন বউকে নদীর ঘাট থেকে পানি আনতে বলা হয়েছে। দেয়া হয়েছে বাহারি রঙে রাঙানো মাটির কলস।   গ্রামের ছোট মাঠ পেরিয়ে ইছামতি নদী। নতুন বউ, দুধে আলতা গায়ের বরণ, মেহেদি রাঙা হাত, আলতা মাখা পা, তার রূপে প্রকৃতিও যেন নতুন সাজে সেজেছে। নদীর ঘাট থেকে নতুন বউ যখন কলসে পানি ভরছিল, তখন নদীর পানি ও নদীর মাটি যেন নতুন বউয়ের ছোয়ায় নিজেদের ধন্য মনে করে। একসময় ঘাটের কাদামাটি আফসোসের সুরে বলে, “হায় রে মাটির কলস। তুমিও মাটি আমিও মাটি, অথচ তোমার কী কপাল আর আমারই-বা কী কপাল! তখন মাটির কলস বলে— কপালের আবার কী দেখলে তুমি? কপাল নয়? তুমিও মাটি আমিও মাটি। অথচ তুমি আজ নতুন বউয়ের কোলে, আর আমি তার পায়ের তলে। ঠিকই বলেছ। আমার এটা কপাল। তবে এই কপাল এমনি হয়নি। এই কপালের গল্প যদি তুমি শোনো, তাহলে আর আফসোস করবে না। কী এমন গল্প, বলো দেখি! তুমি কি এমন কর্ম করেছ, যার জন্য আজ নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পারলে। তাহলে শোনো, আমিও একদিন তোমার মতোই নদীর ঘাটে পড়ে ছিলাম। কত লোক আসছে, পায়ে মাড়াইছে। আবার দুষ্টু ছেলেরা মনে চাইলে খাবলা দিয়ে উঠিয়ে ছুড়ে মারছে অন্যের দিকে। দুঃখ ও কষ্টের কোনো শেষ ছিল না। তো তুমি কী এমন কর্ম করলে যে সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে একেবারে নতুন বউয়ের কোলে উঠে গেলে! হ্যাঁ, সেই কথা বলছি শোনো। একদিন কুমারবাড়ির এক লোক এসে নদীর পাড় থেকে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল। নিয়ে চৈত্র মাসের রোদে ফেলে রাখল বেশ কিছুদিন। সূর্যের তাপে পুড়ে গায়ের রং সাদা হয়ে যায়। হঠাৎ একদিন কুমার বেটা একটা হামার নিয়ে এসে সেটা দিয়ে পেটাতে শুরু করে। হামারের আঘাতে শক্ত মাটি আমি পাউডারের মতো গুঁড়ো হয়ে যাই। তারপর তাতে পানি দিয়ে আটার খামিরের মতো করে মেশায়। মিশ্রণটা যখন অনেকটা নরম ও স্বচ্ছ হয়, তখন আমাকে মেশিনে দেয়া হয়। মেশিনের চাপ ও কুমারনীর হাতের কারুকাজে আমি একটা কলসের রূপ পাই। এ তো একটু কাজ, কয়টা হামারের আঘাত, এরপর একটু রোদের তাপ আর মেশিনের চাপ, তারপর নতুন বউয়ের কোল। না ভাই, আরও আছে, একটু ভালো করে শোনো। এরপর আমাকে আবার রোদে শুকাতে দেয়া হয়। রোদের তাপে পুড়ে আবার সাদা হয়ে গেলাম। তারপর একদিন কুমার বেটা এসে সেখান থেকে নিয়ে আগুনে পোড়াতে দিল। আগুনে পুড়তে পুড়তে প্রথমে কালো, এরপর কালো থেকে লাল হলাম। লাল হওয়ার পর আগুন নেভানো হলো। আগুন নেভালে যখন ঠান্ডা হলাম, তখন কুমার বেটি এসে থাপড়ে থাপড়ে দেখে কোথাও ভাঙা না ফাটা আছে কি না। এ দফায় আমার সাথে থাকা অনেক কলস রোদ ও আগুনের তাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে বা ফেটে গেছে। তাদের ফেলে দেয়া হলো। আমি এ দফায় টিকে যাওয়ায় আমাকে রেখে দিল। কোনো এক হাটবারে কুমার বেটা আমাদের হাটে নিয়ে গেল বিক্রি করার জন্য। হাটে গিয়ে পড়লাম আরেক বিপত্তিতে। কত লোক হাটে আসে হাঁড়ি-পাতিল কেনার জন্য! কেউ কেনে কেউ কেনে না। তবে যারাই আসে, থাপ্পড় মারে। থাপড়ে থাপড়ে দেখে কোথাও ফাটা আছে কি না। এখান থেকেও অনেককে ফেলে দেয়া হলো ভেঙে বা ফেটে যাওয়ার কারণে। আমি এ দফায়ও বেঁচে গেলাম।  আজ আমি যে নতুন বউয়ের কোলে, এরই কোনো এক আত্মীয় আমাকে কিনে আনে। বাড়ি এনে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে নতুন বউয়ের কোলে তুলে দেয়। আর হাজারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাজারও যাচাই-বাছাইয়ের পর আমি নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পেরেছি।   কলসের কথা শুনে ঘাটের কাদা বলে— আমি ভুল ভেবেছিলাম। তুমি তোমার কর্মগুণেই নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পেরেছ। তোমার জন্য শুভকামনা।    আসলে আমরা প্রত্যেকেই কাদামাটির শরীর নিয়ে পৃথিবীতে আসি। হাজারও প্রতিকূলতা, হাজারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাজারও যাচাই-বাছাইয়ের পর যারা টিকে থাকে, তারাই সমাজের মাঝে আত্মমর্যাদা, সম্মান ও সমৃদ্ধি নিয়ে জীবন যাপন করতে পারি। আর যারা জীবনযুদ্ধে, বিভিন্ন প্রতিকূলতা, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তারা ভাঙা কলসের মতো অন্ধকারের মাঝে হারিয়ে যায়। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত, জীবনের শুরুর সময়টা, ছাত্রজীবন বা যৌবনকালটা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেকে পরিবার, সমাজ ও দেশকে সুন্দরভাবে গড়তে অবদান রাখা।

মোঃ স্বাধীন মোঃ স্বাধীন অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0
কালকে বলব

তৃপ্তি আর তামান্না একই স্কুলে পড়ে। তারা খুব ভালো বন্ধু। প্রতিদিন একসঙ্গে স্কুলে যায়। একদিন স্কুল ছুটির পর তৃপ্তি গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিল। তামান্না হেঁটে যাচ্ছিল। গাড়ি ছাড়ার সময় তামান্না দৌড়ে এসে বলল— তৃপ্তি, তোকে একটা কথা বলার ছিল। গাড়ি চলতে শুরু করল। তৃপ্তি জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল— কালকে বলিস। কালকে মন দিয়ে শুনব। কিন্তু সেই ‘কাল’ আর এল না।   সেদিন রাতেই এক দুর্ঘটনায় তামান্না মারা গেল।   কয়েক দিন পর সকালে তৃপ্তি প্রাইভেটে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলো। রাস্তার মোড়ে হঠাৎ সে তামান্নাকে দেখতে পেল। তৃপ্তি অবাক হয়ে বলল— তামান্না, তুই! তামান্না মৃদু হেসে বলল— চল, নদীর পাড় দিয়ে হাঁটি। তোকে একটা কথা বলব।   তৃপ্তি বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। নদীর পাড়ে পৌঁছাতেই চারপাশ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক তখনই দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল। তৃপ্তি তাকিয়ে দেখল, তামান্নার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।   তামান্না তার হাত ধরে বলল— আমি তোকে নিতে এসেছিলাম...   তৃপ্তি ভয়ে হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইল। কিন্তু তামান্না তার হাত ছেড়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল— তোকে নিয়ে যেতে পারলাম না।   পরমুহূর্তেই তামান্না অদৃশ্য হয়ে গেল। তৃপ্তি একা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে রইল।   তারপর থেকে প্রতিদিন আজানের সময় তৃপ্তির মনে হতো, কেউ যেন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে— কালকে বলব...  

তাহমিনা আক্তার তৃপ্তি তাহমিনা আক্তার তৃপ্তি অক্টোবর ৮, ২০২৬ 0
দহন

প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে বিনীতা ওর বারান্দায় দাঁড়ায়। এটা বলা যায় রোজকার রুটিন। বারান্দার শুভ্র বেলি, রঙ্গন, রক্তজবা আর নানা রকম ফুল দেখে কিছুটা ক্লান্তি কাটে।   বিনীতা ভুলে যেতে চায় কিছু মুহূর্ত আগে ফেলে আসা হাসপাতালের বেডে বৃদ্ধের আর্তনাদ, শিশুর কান্নার শব্দে বুকে কাঁটা দেয়া ব্যথার অনুভূতি। বিনীতা একজন চিকিৎসক ও নিউরো সার্জন। তার এসব ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই, বিনীতা সেটা সে জানে। তবু সামনে অজানা আরও বড় ক্ষত সামলানোর জন্য প্রস্তুত হয়। কে জানে! কোনো দুর্বিষহ ভোর কি আবার আসবে সাড়ে চার বছর আগের মতো?   সাড়ে চার বছর আগে সেদিন ভোরে ঘুম ভেঙে কফি হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফুলেদের সঙ্গে নীরবতায় গল্প চলছিল ওর। হাসপাতালে ডিউটিও ছিল দুপুর বারোটায়। হঠাৎ নার্সের ফোন কল, “ম্যাম, খুব ইমারজেন্সি ওটি করতে হবে। একটা পেশেন্ট এক্ষুনি এলো, খুব ক্রিটিকাল।”   আধা কাপ কফি ফেলে ছুটল বিনীতা। হসপিটালে পৌঁছাতেই সিস্টার বলল, “ম্যাম, আশফাক স্যারের (সিনিয়র সার্জন) সঙ্গে কথা বলে ওটি রেডি করা আছে। রাতে ঘুমের ঘোরে বেড থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। অতিরিক্ত হওয়ায় রক্ত জমাট বেঁধে গেছে।”   বিনীতা কোনো কথা না বলে গ্লাভস পরে পেশেন্টের দিকে তাকাতেই যেন ওর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হলো। এটা তামিম! বিনীতার হাজবেন্ড। দুই বছর আগে ছিনতাইকারীর হাতে খুন হয়েছিল। বিনীতা তখন দেশের বাইরে ট্রেনিংয়ে। নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে হারানোর পর অমানিশায় তলিয়ে যাওয়ার মতো বিনীতা শুধু নির্বাক কাটিয়েছে বেশ কিছুদিন। ট্রেনিং শেষ না করে ফিরে এসে গ্রামে গিয়ে শুধু কবরটা দেখতে পেয়েছিল। মা-বাবার কাছে ফিরে যায় বিনীতা। পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে কাজে ফিরতে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর। মানুষকে সেবা দেয়ার ব্রত নিয়ে এসেছে এ পেশায়। কত শোক, কত কান্না রোজ দেখেছে। ফিরতে হবে তো!   কিন্তু এটা তো সম্ভব নয়! তামিম কী করে এখানে? চেহারায় মিল ভাবার সুযোগ নেই। তামিমের বাম কানের পাশে গালে ছোট্ট কাটার দাগটা দেখে বিনীতার বুকে শেল বিঁধছে। সত্যিটা তো জানতেই হবে। ফাইল ঘাঁটে বিনীতা। তামিমের ফাইলে ওর স্ত্রীর নাম লেখা শীলা আদনান। হ্যাঁ, তামিমের পুরো নাম তামিম আদনান। কিন্তু এখন এটা ভাবলে চলবে না। আগে অপারেশন করতে হবে। বিনীতা এই মুহূর্তের জন্য শুধু তামিমের চিকিৎসক। আর কেউ নয়। অপারেশন শেষ করে শীলার সঙ্গে কথা বলে বিনীতা। নিউজ পেপারের সূত্র দিয়ে বলে, “ইনি তো মারা গিয়েছে শুনেছিলাম। কিন্তু কীভাবে...”   শীলা আমতা আমতা করতেই বিনীতা মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে, “প্রথমে এই হাসপাতালেই আনা হয়েছিল যতটা জানি।” এটুকু মিথ্যে দরকার ছিল সত্যিটা জানতে। কারণ, ছিনতাইয়ের ঘটনার কিছুদিন আগে থেকে ওদের মধ্যে ঝামেলা চলছিল। তামিম বলত, “আমরা টক্সিক হয়ে যাচ্ছি। এভাবে সম্পর্ক চলতে পারে না। তামিমের বাড়ির সবাইও বিনীতার বিপক্ষে ছিল। কিন্তু বিনীতার কাছে কোনো কথাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। তামিম উদাসীন ছিল, তবে সম্পর্ক ভেঙে দেয়ার মতো তো নয়।   বিনীতার ঘোর ভাঙিয়ে শীলা বলল, “তামিমের আগের স্ত্রীকে ওর পছন্দ ছিল না। তামিম যেহেতু একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ছিল। এর মধ্যে আমার সঙ্গে সম্পর্ক হয় একটা রিসার্চ করতে গিয়ে। এ কথা তামিম ওর স্ত্রীকে বলতে পারছিল না। তাই ছিনতাইয়ের নাটক সাজায়, নিজেই পেটে ছুরি মারার মতো রিস্ক নেয়। তবে কাছের একটা হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে দুদিন পরই ছাড়া পেয়ে যায়। কিন্তু তার স্ত্রীকে জানাতে বলে, ও মারা গেছে। ওর স্ত্রী তখন দেশের বাইরে ট্রেনিংয়ে। আমি তামিমকে বলেছিলাম, সত্যিটা বলতে। কিন্তু ও বলত, বিনীতা এভাবে আমাকে কখনোই ছাড়বে না। ও আমার প্রতি অবসেসড। আর আমি তোমার প্রতি এতটা অবসেসড যে আমি তোমাকে ছাড়তে পারব না।”    বিনীতা একটু চমকে বলল, “আপনি ওনার স্ত্রীকে চিনতেন না। হ্যাঁ, ডাকনাম জানি, দেখিনি কখনো। তামিম দেখতে চাইত না। ফাইলে তামিমের ডক্টর হিসেবে বিনীতার সার্টিফিকেটের নাম ড. রেহনুমা। তাই শীলা চিনতে পারেনি। বাড়ির লোকের মধ্যে তামিমের বড় ভাই-ভাবিকে পরে দেখলেও পুরো সময়টা মাস্ক ও বড় চশমা থাকায় কয়েক সেকেন্ডে কেউ বিনীতাকে চিনতে পারেনি। তা ছাড়া ওর পোস্টিং এখানে, সেটাও তারা জানত না।”    বিনীতা শীলাকে বলল, “ইন্টারনাল ব্লিডিং বেশি হওয়ায় পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিক্যাল। অপারেশন ভালোভাবে হলেও ঝুঁকি কাটেনি। আমি দেখে আসছি।”   তামিমের মুখের দিকে তাকায় বিনীতা। অবসেশনটা ন্যানো সেকেন্ডে ঘৃণায় মোড় নিয়েছে ততক্ষণে। অক্সিজেন মাস্কটা কুমায় যাওয়ার আগ অবধি খোলা রেখে আবার লাগিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় বিনীতা। ও জানে, এই কুমা থেকে আর কেউ ফেরে না।   ইতোমধ্যে ডক্টর আশফাক চলে আসেন। আইসিইউতে রোগীর আপডেট জানিয়ে তাঁকে রেফার করে বাসায় যায় বিনীতা। বাসায় নামতেই ড. আশফাকের কল। পেশেন্ট তো কলাপ্স করেছে বিনীতা! তুমি তো বললে ঠিক আছে। বিনীতা একটু অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “স্যার আউট অব ড্যাঞ্জার ছিল না। আমার শরীর খারাপ লাগছিল আর আপনিও চলে এসেছেন। তাই আমি বাসায় এলাম। এখন কী অবস্থা?”   ডক্টর আশফাক বললেন, “ক্লিনিক্যালি ডেড!”   ঘোর কাটে বিনীতার। ভালোবাসার মৃত্যু ঘটানোর জন্য, নিজের মৃত্যুর ঘৃণ্য গল্প সাজানো মানুষকে সত্যিকার মৃত্যুর স্বাদ দেয়া নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই ওর। হসপিটালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আরেকটি ফোন, “ম্যাম ইমারজেন্সি!” হাসপাতালে গিয়ে দেখে শীলা, স্পাইনাল কর্ডে ব্যথা অর্থাৎ মেরুদণ্ডে টান লেগে সেন্স কাজ করছে না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কেবিনে শীলাকে দেখতে আসে বিনীতা। ডক্টরের সঙ্গে কথা বলবে বলে নিজের মাকে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যেতে বলে শীলা।   বিনীতা বসলে শীলা বলে, “আমার কতটুকু দোষ ছিল জানি না। কিছু তো ছিলই। তাই তামিম মরে পার পেলেও আমি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাইনি। তবে পারফেক্ট ক্রাইম হয় না বলেই এত বছর পর আমি কেনই-বা সেদিন আপনার আর তামিমের একটা ছবি ঘরে পেলাম! ও তো সব স্মৃতি মুছে ফেলেছিল। ম্যাম, আমি আপনার মতো ডাক্তার নই। অভিনব কায়দায় খুনটা করতে পারব না।” বিনীতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই টেবিলে রাখা ছুরিটা নিয়ে ওর পেটে কয়েক ঘা বসিয়ে দিল শীলা। ওর চিৎকারে ছুটে এলো সবাই। খুন করায় অপারদর্শী হলে এলোপাথাড়ি আঘাত করে মানুষ। যাতে মৃত্যুর আশঙ্কা শতভাগ থাকে। শীলাও সেটিই করেছিল।   পুলিশকে বেগ পেতে হয়নি। স্বেচ্ছায় হাতকড়া পড়ে শীলা। পুলিশের প্রশ্নের জবাবে শীলা শুধু এটুকু বলেছিল, “আইনের মাধ্যমে এগোতে চাইলে কোনো তথ্যপ্রমাণ খুঁজে পেতেন কি?” হয়তো পেতেন। কিন্তু ম্যাম যেভাবে তামিমের মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলেন, আমাকেও সেটিই করতে হতো। তবে আমার ফাঁসি না হলে তো...”   শেষ শব্দ বলার আগেই একটা খিঁচুনি দিয়ে তাকিয়ে রইল শীলা। নার্স পালস চেক করে চোখটা বন্ধ করে দিল।

এমি জান্নাত এমি জান্নাত অক্টোবর ৮, ২০২৬ 0
অমল বড়ুয়া

পকেটে ঠিক তেত্রিশ টাকা নিয়ে সন্ধ্যায় বের হয়েছিল বিশ্বজিৎ। যাত্রা শুরুর জায়গা থেকে ডান দিকে সোজা মাত্র বারো মিনিটের পথ। হেঁটে গেলেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বারো মিনিটের সেই ছোট্ট পায়ের ব্যায়ামটা এড়িয়ে গেল সে। বক্কর মামার টংয়ের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত নাকের মতো দেখতে নীল রঙের টেম্পোগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল বিশ্বজিৎ।   গাড়ি আসার অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই গাড়িতে থাকা খালি জায়গাগুলো দ্রুত ভরে যাচ্ছিল। অবশ্য কিছুদিন আগেই ডাক্তার মাইনাস ওয়ানের চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন ডাক্তারকে মনে মনে গালি দিয়ে চলে এসেছিল বিশ্বজিৎ। এখন অবশ্য সেই গালির জন্য মনে মনে ক্ষমা চাইছে। চশমাটা থাকলে সন্ধ্যার এই ব্যস্ত রাস্তায় দূর থেকেই গাড়ির খালি জায়গাটা ঠাহর করে চটজলদি উঠে বসতে পারত সে।   বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অবশেষে একটি গাড়িতে জায়গা পেল বিশ্বজিৎ। ভিড় এতটাই বেশি যে, মানুষ গাড়ি থেকে নামার জন্য যে স্লেপে দাঁড়ায়, সেখানেও কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বজিৎ লক্ষ করল, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের মধ্যে একজন রুচিসম্পন্ন মধ্যবয়সী ভদ্রলোকও দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের বসার জায়গাটা একপ্রকার জোর করেই ভদ্রলোককে দিয়ে দিল বিশ্বজিৎ।   গাড়ি চলতে শুরু করল। ভদ্রলোক বিশ্বজিৎ সম্পর্কে নানা কিছু জানতে চাইলেন। বিশ্বজিৎও লোকটি যা যা জানতে চাইলেন, শুধু সেসব প্রশ্নের উত্তরই দিতে লাগল। নিজ থেকে একটি প্রশ্নও করল না। কারণ, তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।   গাড়িভাড়া আট টাকা। আসা-যাওয়ায় মোট ষোলো টাকা। পকেটে আছে তেত্রিশ। তাহলে বাকি থাকে সতেরো টাকা। কিন্তু চা-সিগারেটের জন্য তো আরও পাঁচ টাকা চাই। এই পাঁচ টাকার লোভে টংয়ের দোকানদার কি তাকে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি বিরক্তি ভরা মুখ নিয়ে অপরিচিত কাউকে পাঁচ টাকা বাকি দেবে? ভাবনার মাঝেই অদ্ভুত নাকওয়ালা গাড়ির চালক চিৎকার করে উঠল, “লালখান আছেন নাকি কেউ?” বিশ্বজিৎও চিৎকার করে বলল, “মামা, আছি!”   গাড়ি থামতেই বিশ্বজিৎ নেমে ভাড়া দেয়ার জন্য দশ টাকার নোট হাতে নিল। ঠিক তখনই গাড়ির ভেতর থেকে ভেসে এলো এক মধুর কণ্ঠ, “বিশ্বজিৎ, তুমি যাও। তোমার ভাড়াটা আমি দিয়ে দিব।”   এত মধুর বাক্য সে আগে কখনো শুনেছে কি না, সেই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারল না বিশ্বজিৎ।গাড়ি ছেড়ে দেয়ার ঠিক আগমুহূর্তে প্রথমবারের মতো নিজ থেকেই একটি প্রশ্ন করল সে, “আংকেল, আপনার নাম?” ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন, “অমল। অমল বড়ুয়া।”

বিজয় কুমার সুশীল বিজয় কুমার সুশীল অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
মুখগুলো

সন্ধ্যা ছয়টার ডাক্তার এখনো আসেনি। ঘড়িতে সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। হাসপাতালের করিডরে বসে আছি চেম্বারের ঠিক পাশে। সামনে লম্বা বেঞ্চ। বেঞ্চভরতি মুখ। প্রতিটি মুখ একটা গল্প। কেউ পড়ছে না, তবু পড়া যায়। বাম দিকে বৃদ্ধ লোকটা। হাতে পুরোনো একটা পলিথিন। ভেতরে রিপোর্ট। চোখ দুটো ফোলা। রাত জেগেছে বোধহয়। ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড় হয়েছে কি না, সেই হিসাব কষছে মনে মনে। ডাক্তার যখন বলবে ‘তিন লাখ লাগবে’, তখন মুখটা কেমন হবে, আমি আগেই দেখে নিচ্ছি। ডান দিকে একটা মেয়ে। বয়স কুড়ি হবে। কোলে ছয় মাসের শিশু। শিশুটা কাঁদছে না, চুপ। চুপ করে থাকাটাই ভয়ের। মেয়েটা বারবার ওড়নার আঁচলে মিশুর কপাল মুছছে। ঘাম নাকি জ্বর, বোঝা যায় না। মাঝখানে একটা লোক। হাতে মোবাইল। বারবার কাউকে ফোন দিচ্ছে, “ভাই, দুই হাজার ম্যানেজ করতে পারবা? ডাক্তার বলছে আজকের ভেতর জমা দিতে হবে।” ফোনের ওপাশে কী উত্তর আসে জানি না। লোকটার মুখটা আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে। আমি মানুষের মুখ পড়ি। এটাই আমার অভ্যাস। হাসপাতালে এলে বোঝা যায়, কষ্টের হাজার রকম রং আছে। সাদা বেডশিটের নিচে লুকানো থাকে লাল রক্ত, কালো দেনা, ধূসর অপেক্ষা। হঠাৎ করিডরে একটা নড়াচড়া। ডাক্তার এসেছেন। সাদা অ্যাপ্রোন, মুখে ক্লান্তি। রোগীর ঢল তাঁকে গিলে নেয়। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। আমার পালা আসবে। আমাকে বসিয়ে রেখে আমার স্বামী গেছে ওষুধ কিনতে। আমি মোবাইলের নোটপ্যাড খুলি। লিখতে চাই, কিন্তু চোখ আটকে যায় সামনের দৃশ্যে। হঠাৎ একটা আর্তনাদ। গগন বিদারি। ‘ও আমার সোনা! কথা ক সোনা! চোখ মেলা তাকা!’ হাসপাতালের ফ্লোর, দেয়াল, বাতাস, সব কেঁপে ওঠে। একজন মা। কোলে দুই-আড়াই বছরের শিশু। নিথর। চোখ বোজা। গায়ে লাল লাল গুটি। হামের গুটি। মায়ের চুল এলোমেলো, জামা ভেজা ঘামে। পাশে সম্ভবত বাবা। চোখ শুকনা। বাবারা কেঁদে ফেলতে পারে না, তাই তাদের কষ্টটাই সবচেয়ে ভারী হয়। মা বুক চাপড়াচ্ছে, ‘ও আমার জাদু, চোখ খোল বাবা। একবার মা বল। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শুধু তুই কথা ক।’ চারপাশে জমে যায় মানুষ। কেউ সান্ত্বনা দেয়, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয় কষ্টে।। সান্ত্বনার ভাষা ফুরিয়ে গেছে। আমি উঠে যাই। শুনি। কয়দিন ধরে জ্বর। সারা শরীর গোটায় ভরে গেছে। গ্রামের হাসপাতালে নিয়ে গেছে। বলেছে, ‘হাম’ হয়েছে, ওষুধ নাই। রেফার করে দিয়েছে শহরে। শহরের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। অক্সিজেন নাই, বেড নাই, ডাক্তার নাই, টিকা নাই — এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে মা-বাবার পা ক্ষয়ে গেছে। শেষে এই হাসপাতালে। ডাক্তার এসে নেড়ে দেখলেন। স্টেথোস্কোপ রাখলেন। মাথা নাড়লেন, “সরি। অনেক দেরি হয়ে গেছে, মৃত।” মা আবার চিৎকার করে ওঠে, “দেরি? কার দেরি? আমার পোলা তিন দিন ধইরা জ্বরে পুড়তেছে! তোমরা কী করছ? তিন দিন ধইরা এ হাসপাতাল, সে হাসপাতাল করতেছি। আজ কন সরি। বড় বড় হাসপাতাল সাজাইছেন, টিকা নাই, ওষুধ নাই? ও আল্লাহ আমার জাদুরে ফিরাইয়া দাও।” মায়ের কান্না কলিজা কামড়ে ধরছে। কেউ উত্তর দেয় না। আমি ফিরে আসি আমার বেঞ্চে। হাত কাঁপে। মোবাইলটা পড়ে যেতে নেয়। মনে পড়ে কাগজের খবর। সরকারি হিসাবেই ৪০০ শিশু মারা গেছে হামের টিকার অভাবে। ৪০০। সংখ্যাটা শুনতে ছোট লাগে, কিন্তু একটা মা যখন ‘ও আমার সোনা, জাদু বলে বুক চাপড়ায়’, তখন বোঝা যায়, ৪০০ মানে ৪০০টি করিডর, ৪০০টি আর্তনাদ, ৪০০টি মৃত ঘর। আরও শিশু মৃত্যুর পথে। আমার সামনের বেঞ্চে বসা বৃদ্ধ লোকটা এখনো পলিথিন চেপে ধরে আছে। তার ছেলের অপারেশন হবে। তিন লাখ টাকা। টাকা জোগাড় না হলে তার ছেলেও হয়তো এই করিডরেই নিথর হয়ে যাবে। ডান দিকের মেয়েটার শিশু সন্তানটি এখনো চুপ। মেয়েটা ফিসফিস করে দোয়া পড়ছে। মাঝের লোকটা ফোন কেটে দিয়েছে। মুখে হাসির মতো কিছু একটা টানছে। হয়তো ধার পেয়েছে। আমি বুঝি, হাসপাতাল শুধু রোগ সারায় না। এখানে মানুষের মুখ, মন প্রকাশ হয়ে যায়। অপারেশনের ভয়ে কাঁপা বাবা। ওষুধের টাকার অভাবে কুঁকড়ে যাওয়া মা। টিকার অভাবে মরে যাওয়া শিশু। দুঃখ-কষ্টের ব্যথায় নীল মা, বাবার ক্লান্ত মুখ। আর আমি, যে শুধু দেখছি, লিখছি অথচ কিছুই করতে পারছি না। ডাক্তার ডাকেন আমার নাম ধরে। আমি উঠি। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকাই। মা এখনো শিশুটাকে বুকে চেপে ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। বাবা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। আত্মীয়রা মাথা নিচু করে আছে। করিডরের বাতাস ভারী। অক্সিজেনের চেয়েও ভারী মানুষের নিশ্বাস। আমি চেম্বারে ঢুকি। ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন, কী সমস্যা? আমি বলতে পারি না। গলা আটকে আসে। আমার কেন আসা আমি ভুলে যাই। এই মুহূর্তে আমার সমস্যা তো আমার শরীরে না। আমার সমস্যা এই করিডরে। এই মুখগুলোতে। আমি শুধু বলি, ডাক্তার, মানুষ বাঁচান। ডাক্তার চশমা ঠিক করেন। ক্লান্ত হাসি দেন, “চেষ্টা করছি। আপনিও দোয়া করেন। মালিক আল্লাহ, আমরা নিমিত্ত মাত্র।” বাইরে বেরিয়ে দেখি, মা এখনো বসে আছে। শিশুটার ঠান্ডা হাত ধরে। আমি আর লিখতে পারি না। শুধু মনে মনে বলি, হে সিস্টেম, একটা টিকা কি খুব দামি ছিল? একটা শিশুর জীবনের চেয়েও? ৪০০/৫০০/১০০০ টিকার দামের চেয়ে?কোটি  কোটি টাকা নাকি একটা জীবন? সবকিছু ‘নিমিত্ত’ বললেই শেষ হয়ে যায়! ‘সিস্টেম’-এর কোনো দায় নেই? এই অকালে ঝরে যাওয়া শিশুরাই তো ছিল ভবিষ্যৎ। সিস্টেমের বলি এই শিশুরাই ছিল আগামী। এদের হাত ধরেই তো আগামী বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখত। হায় সিস্টেম!  

নাজরিন আরা নাজরিন আরা অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
শাওনের ডাক

অনেকক্ষণ উবু হয়ে আছে সে। একটানে দশ-বারো আঁটি বিছুন পোঁতা হয়ে গেল। মাজা টনটন করছে, একটু আরাম না দিলেই নয়। উঠে দাঁড়াল। বাম হাতের মুঠোয় ধরা বিছুনগুলো থপ্পাক করে ফেলে দিল কাদান ভুঁইয়ে। খানিকটা ঘোলা জল চলকে এসে আছড়ে পড়ল শাড়িতে।   জল-কাদার সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক। ভোরবেলায় বীজতলায় হাঁটু মুড়ে বসে কোমর থেকে নিচের অংশ ভিজিয়েছে। মাথায় বিছুন বয়ে আনতে গিয়ে জল চুঁইয়ে পড়ে শরীর বেয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এখন নাহয় আরেকটু জল লাগল। কী আসে যায় তাতে! হাত দুটো ঊর্ধ্বমুখে প্রসারিত করে দিয়ে শরীরটাকে টানটান করে ধরে রাখল কয়েক মুহূর্তের জন্য। দুই হাতের আঙুল পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে কোমরটাকে বারকয়েক ডানে-বামে মোচড় দিয়ে নিল। তারপর বেলগোড়ার মাঠের দিকে তাকাল গভীর অভীলিপ্সা নিয়ে “এত বেলা হলো এ্যাখুনো ক্যানি এ্যাসে না উ?”   শাওন মাস শেষ হতে আর দিন কতক বাকি। খরিফ মরশুমের ধান পোঁতার কাজ এখনই শেষ করতে না পারলে নামলা হয়ে যাবে, ফলন ভালো হবে না। হাত-পা ধুয়ে  মাঠে নেমে পড়েছে চাষিরা। বেশির ভাগ জমিতে মুনিসেরা উবু হয়ে ধান পুঁতছে। কেউ কেউ বীজতলায় হাঁটু মুড়ে বসে বিছুন মারছে। বেশ কিছুটা দূরে একজন হোল্যা জমিতে চাষ দিচ্ছে। এক ঝাঁক সাদা বক পোকামাকড় খুটে খেতে খেতে তাকে অনুসরণ করে চলেছে মহা উল্লাসে।   মাঠখাটা মেয়ে সে। টাকার বিনিময়ে শ্রম বিক্রি করা তার পেশা। বাবা দিবাকর মালও ছিল একই পেশার মানুষ। ধান কাটার মরশুমে ধান, কচুর সময় কচু কুড়াতে সে বাবার সঙ্গে মাঠে যেত ছোটবেলায়। বাকি দিনগুলো তার কাটত ছাগল চরিয়ে। সঙ্গে নিয়ে যেত একটি প্যাছা। ছাগলগুলোকে মাঠে ছেড়ে দিয়ে ঘুরে ঘুরে গোবর কুড়িয়ে প্যাছা ভরত। গোবর ছেনে ঘঁসি দিত মা। শুকনো ঘঁসির কিছুটা বাড়িতে ব্যবহারের জন্য রেখে বাকিটা বেচে দেয়া হতো। সপ্তাহে এক-দেড় শ টাকা উপরি রোজগার অভাবের সংসারে যথেষ্ট না হলেও ভালো ঠেকা দিত। নুন তেল হলুদ কেনার জন্য বাবার কাছে পয়সা চাইতে হতো না মাকে।   বাবার ছিল হাঁপানি রোগ, টান উঠলে গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করত। সেই টানই একদিন মানুষটাকে টেনে নিয়ে গেল শ্মশানে। সেটাও ছিল শাওনের এক বর্ষণমুখর রাত। শ্বাসকষ্টে কাহিল হয়ে পাঁচ দিন আগেই বিছানা নিয়েছিল। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছাল সন্ধ্যাবেলায়। মাঝরাতে একেবারে স্থির হয়ে গেল। সে তখন দশ-বারো বছরের কিশোরী।   বাবা খুব ভালোবাসত। লেবেনচুস খাস্তা গজা, কাজ সেরে বাড়ি ফিরে কিছু না কিছু তুলে দিত মেয়ের হাতে। একদিন এনেছিল ডালপুরি আর মতিচুরের নাড়ু। মায়ের সেকি রাগ, “এক মুষ্ঠি পায়সা দিং ক্যানি ইয়্যা কিনতে য্যালা? হাঁড়িতে এক ছটাক চাল ন্যাই। পয়সা কটা থাকলে দুসের চাল কিনতে পারথাম আমি।” “তুমি শুধু শুধু রাগ করছ জবার মা। আমি পয়সা দিং কিছু কিনিনি, খান সাহেব দিয়্যাছে।”    ধান কাটার মরশুমে কিছু মানুষ নানা রকম মুখরোচক খাবার মাঠে মাঠে ঘুরে বিক্রি করে। তাদের বলা হয় গোস্তি। গেরস্তরা তাদের কাছ থেকে পছন্দের খাবার কিনে নিয়ে যায় পরিবারের জন্য। কোনো কোনো গেরস্ত মরশুমে অন্তত এক দিন মুনিসপাটকে কিনে খাওয়ায়। সেদিন খান সাহেব কেনাকাটা করে সবাইকে ভাগ করে দিয়েছিলেন। দিবাকর তার ভাগেরটুকু না খেয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছিল।   মা ওসব শুনতে চাইল না। ঝাঁঝিয়ে উঠে বকবক করতে থাকল, “ধক ন্যাই শখ খুব! একদিন কাজ কোরি দশ দিন হাঁপর টানে। তার আবার রোজ রোজ ম্যায়াকে ভালোমুন্দ খাওয়ানো চায়। কী কোরি সংসার চলছে খোঁজ লিয়্যাছো কুনুদিন?”   বাবা নেই তিন-চার বছর কিন্তু তার স্নেহ ছায়া ঘিরে রেখেছে তাকে। বিপদে আপদে সে যেন অনুভব করে বাবা মাথায় হাত দিয়ে বলছে, “ভয় কী রে মা, আমি তো আছি।” “এ্যাই জবা, আগুন আছে তোর কাছে?” মাজা সাট করতে দাঁড়িয়ে কখন স্মৃতির গহিনে ডুব দিয়েছে খেয়াল ছিল না তার। পুরুষ কণ্ঠে ডাক শুনে সংবিৎ ফিরে পেল। মোনিহার পাড়ার অনাদি গায়ে উঠে পড়েছে প্রায়। চকিতে দুপা পিছিয়ে দাঁড়াল সে, “কী চ্যাহিল্যা, আগুন?” “হ! আছে তো দে ক্যানে। কখুন থ্যাকি বিড়ি টানিয়েনি, দম খরাঁই উঠ্যাছে।” অনাদি তার হাতের বন্দি দেখিয়ে আরও বলল, “শ্লা বন্দিটো কখুন জলে পোরি লিভ্যাঁই যেলছে।”   মাঠে অনেকে কাজ করছে, পুরুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের কাছে আগুন চাইতে না গিয়ে তার কাছে কেন? সচকিত হয়ে উঠল জবা। ডানে বামে ঘাড় ঘোরাল, মাঠে লোকজনের অভাব না থাকলেও কাছাকাছি কেউ নেই। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার। কঠিন স্বরে বলল, “আমার কাছে আগুন থাকবে ক্যানি, আমি বিড়ি খ্যায়ে নাকি?” “তোদের জাতের ম্যালা ম্যায়্যা খায় তো।” “যে খায় তাহার কাছে যাও। আমার কাছে আগুন ন্যাই।” “ন্যাই তো ন্যাই “ হাসল অনাদি। জবার দিকে এগিয়ে গেল দুকদম। তারপর বলল, “তোকে না মাইরি আজ খুব মিষ্টি লাগছে দেখতে।” “অ! মিষ্টি খ্যাবার শখ হইছে তুমার? দাঁড়াও খাওয়্যাছি।” বিছুন তোলা দাউলিখানা আলের মাথায় রাখা ছিল। দ্রুত তুলে নিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, “নামানিওলা তুমি ইখ্যান থ্যাকি য্যাবা না চিল্লিং লোক ডাকব?”   অনাদি আর কিছু বলার সাহস পেল না। অনুচ্চ স্বরে বিড়বিড় করতে করতে পালিয়ে গেল। অনাদিরা এমনই হয়, ভাবে মাঠখাটা মেয়েরা সস্তা। চাইলেই তাদের...   সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার, গোসা করে আছে যেন। থেকে থেকে আটা চালার মতো ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে, বলা যায় না মুষলধারে নেমে পড়ে কখন। সময় নষ্ট করতে চাইল না জবা। ধান পুঁততে শুরু করল।   আগরডাঙ্গার হাজি নুহুউল্লার অনেক জমিজমা। মাসের প্রথম দিকে দশজন মুনিস নিয়ে পোঁতা শুরু করেছিলেন তিনি। পনেরো কাঠার এই জমিটা বাদে সব পোঁতা হয়ে গেছে। অল্প জায়গা, বেশি মুনিস দরকার নেই। হাজি দুজনকে রাখতে চাইলে সিসাম বলে, “আমরা থাকব।”   সিমাম গ্রামেরই ছেলে। তার সঙ্গে জবার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সেই থেকে তারা একসঙ্গে মাঠে যায়, কাজ করে। আজ সকালেও বেলগোড়ার মাঠে বীজতলায় গিয়েছে দুজন। আঁটি বিশেক বিছুন জবাকে দিয়ে পাঠিয়ে সে থেকে গেছে বীজতলায়। বাকি বিছুন নিয়ে আসার কথা তার।   বাতাসের জোর বাড়তে বাড়তে ঝড়ের আকার নিয়েছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও বেশ ভারী, চড়বড় করে পিঠে আছড়ে পড়ছে। কাজ ছেড়ে আলের ওপর উঠে এল জবা। মাথাল মাথায় দিয়ে বসতে গিয়ে খেয়াল করল বিছুনের বোঝা মাথায় নিয়ে হনহন করে হেঁটে আসছে সিমাম। জবার রাগ হলো, কিছুটা অভিমানও। মনে মনে বলল, “আয় মিনস্যা মজা চাখ্যাছি তোকে।”   এমন সময় আকাশের বুকে একফালি আলোক রেখা খেলে গেল, পরক্ষণে কান ফাটানো বিকট আওয়াজ, চড়াম! গুর-গুর-র-র…   সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ছেয়ে গেল। সিমাম ক্রমশ ঊর্ধ্বাকাশে উঠে যাচ্ছে কুণ্ডলীতে ভর করে। হাত বাড়াল জবা, নাগাল পেল না। ধীরে ধীরে সে লীন হয়ে গেল অনন্ত আকাশের উত্তাল বক্ষে।  

মুহাম্মদ সেলিম রেজা মুহাম্মদ সেলিম রেজা অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
অপরূপা ও বৃষ্টিভেজা বিকেল

অপরূপার বৃষ্টি ভীষণ পছন্দ! সবুজ গাছপালা, পাখির কিচিরমিচির আর নিস্তব্ধ প্রকৃতি—এসব যেন তার অস্থির মনকে প্রশান্ত করে তোলে। এক বিকেলে সে একা হাঁটছে। চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ, ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নড়াচড়া আর পাখির সুরেলা ডাক যেন এক স্বপ্নের জগৎ তৈরি করেছে।   আজ আকাশের মন ভালো নেই। চারপাশে কালো মেঘ ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সামলে রাখতে না পারলে আকাশ কেঁদে ফেলবে। কিন্তু অপরূপার মন খুব খুশি, কারণ এমন আবহাওয়া তার খুব প্রিয়।   হঠাৎ করে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নামল বৃষ্টি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার সমস্ত মন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে থেমে দাঁড়িয়ে গেল। কোথায় যেন হারিয়ে গেল তার চিন্তা। কিছু ভাবার চেষ্টা করেও পারল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে একা। নীরব। আর সেই নীরবতার মাঝেই তার শরীরের প্রতিটি কোণ বৃষ্টিতে ভিজে গেল।   একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। চারদিকে নেমে এল প্রশান্ত এক নীরবতা। ভেজা চুল, চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজল, বৃষ্টিভেজা গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে পরিবেশটা এক গভীর আবেশ তৈরি করল। ঠান্ডা বাতাসে গা শিউরে উঠল অপরূপার। তবুও সে নড়ল না। এই মুহূর্তটা যেন কেবল তার একার। কোনো ব্যস্ততা নেই, কোনো কোলাহল নেই—শুধু সে আর প্রকৃতি।   বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ে যে শব্দ তুলেছিল, তা যেন গিয়ে ঠেকেছে তার হৃদয়ের গভীরতম কোণে। সেই অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।   হঠাৎ দূরে এক পাখির ডাক তাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে সে। প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে যেন ফেলে আসছে তার অস্থিরতা, ক্লান্তি আর না-বলা কথাগুলো।   আজ বৃষ্টির সঙ্গে কেবল শরীরই নয়, মনটাও ভিজেছে। ভিজে গিয়ে ধুয়ে গেছে সব মলিনতা। আজ অপরূপা যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছে নতুনভাবে। তার ঠোঁটে এক অম্লান হাসি। চোখে তৃপ্তির ছায়া। বাতাসে ভেসে বেড়ায় অপরূপার শান্ত, স্থির মন।   তাকে দেখে মনে হয়, সে আজ সত্যিই মুক্ত।  

নাফিসা আঞ্জুম ফারিহা নাফিসা আঞ্জুম ফারিহা অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
অচেনা শহর

ফেনীর চেনা রাস্তা, পরিচিত মানুষ আর মাকে ছেড়ে একদিন চলে এলাম নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শহরটা আমার কাছে একদম অচেনা ছিল। বাস থেকে নামার পর চারপাশে এত মানুষ, এত শব্দ—তবুও কেন জানি নিজেকে খুব একা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এ শহরে আমাকে চেনে এমন একজন মানুষও নেই।   বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা বারবার বলেছিল, “নিজের খেয়াল রাখিস।” তখন কথাটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর বুঝলাম, মায়ের সেই কথার ভেতর কতটা চিন্তা লুকিয়ে ছিল।   এখন থাকি একটা মেসে। এখানে মা নেই, পরিবারের কেউ নেই—আছে শুধু আমি আর আমার ছোট্ট একটা ঘর। এখানে অসুস্থ হলে নিজেকেই ওষুধ খুঁজতে হয়, মন খারাপ হলে নিজেকেই সামলাতে হয়, কোথাও যেতে হলে নিজেকেই পথ চিনতে হয়। কেউ আর জিজ্ঞেস করে না, “খেয়েছিস?”   তবুও ধীরে ধীরে এই অচেনা শহরটাকেই চিনতে শুরু করলাম। নতুন রাস্তা, নতুন মানুষ, নতুন জীবন—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখলাম।   ফেনী আমার ঘর, আর নোয়াখালী আমাকে বড় হয়ে ওঠার গল্পটা শেখাচ্ছে। শুধু সন্ধ্যা নামলে মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, মানুষ হয়তো স্বপ্নের জন্য ঘর ছাড়ে, কিন্তু ঘরকে কখনো মন থেকে ছাড়তে পারে না।

তাহামিনা আক্তার সুমাইয়া তাহামিনা আক্তার সুমাইয়া অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
আত্মার শনাক্তকরণ

  এই যে লোকটা মাত্র গাড়িতে করে সামনে দিয়ে গেল, সে আমার আব্বা। এই লোকটা আমার কোনো এক বান্ধবীর মোবাইল নম্বর খুঁজছে। কেন? ভার্সিটিতে আমার বিষয় খোঁজ নেয়ার জন্য। শেষ কবে আমার যোগাযোগ হয়েছিল বান্ধবীদের সাথে আর শেষ কবে ক্লাসে গিয়েছি, তা জানার জন্য। আমার হোস্টেলে খবর নিয়েছে গত তিন দিন আগে আমি বের হয়েছিলাম শুনেছে। আর তেমন কিছু কেউ জানেনা, হোস্টেলে কে কার খোঁজ রাখে তেমন?   আব্বা যাচ্ছে এখন বাড়িতে মাকে জানাতে। আমার নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে বেশ মরা মরা অবস্থা সবার, আজ খোঁজ পাওয়া গেছে। আব্বাকে জানিয়েছে থানা থেকে আমার লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। শরীরের দাগের সংখ্যা অনেক, তবে হাতে গালে নখের দাগ দেখে বোঝা যাচ্ছে নিজেকে এভাবে আঘাত করার বিষয়টা নতুন কিছু নয়। তবে যে সাহসের ভীষণ প্রয়োজন ছিল, তা বেশ ভালো রকম জুগিয়েছি।   এসব স্বীকারোক্তি পাশে দাঁড়ানো কালো কোর্ট পরা লোকটার। আর এই যে এদিকে নীল রঙের শার্ট পরা ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারায় ছেলেটা, ওর নাম পুণ্য। জি হ্যাঁ, এভাবেই বসে আছে গত চার ঘণ্টা। ভাবছেন কাঁদছে না কেন? ও কাঁদবে কেন? ওর তো কাঁধ থেকে বিশাল এক বোঝা হালকা হয়ে গেল, তবে তার ভেতরে কী চলছে, তা সে ভালো জানে। না, চিন্তার কিছু নেই। তার সাথে আমার শেষ কথা হয়নি। তাই তার দায়ভার নেই এতে। আমাদের বিচ্ছেদের তিন মাস হয়ে গেছে প্রায়।   পুণ্য এসেছিল শনাক্তকরণের জন্য। ওর থেকে ভালো আর কে চিনবে আমাকে? তাকে ডাকা হয়েছিল ঠিক এমন না। পরিবারের পক্ষ থেকে সে নিজেই এসেছে। শনাক্তের কাজ শেষ। প্রায় দেড় ঘণ্টা থেকে তাকে যেতে বলা হচ্ছে মর্গ থেকে। কেন যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে!   বাড়িতে তিন দিন পর শোক বসেছে। দূর থেকে অদ্রি আর কায়াকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কেবল। মিকো সেই প্রাচীরের দেয়ালটায় শুয়ে আকাশ দেখছে, আর মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে মিউ মিউ করছে। ওর গলার আওয়াজ বরাবরই ধীরে। আর জেফি কোন গাছের ডালে উঠে আছে কে জানে!   এই ভেবে সামান্য খুশি হচ্ছি অন্তত ওরা দুজন আমাকে দেখতে পারছে। ওদের আদর করতে পারছি।    

মায়মুনাহ্ জামান চৌধুরী মায়মুনাহ্ জামান চৌধুরী অক্টোবর ৩, ২০২৬ 3
রং

হেমন্তের এ শহরটা খুব অচেনা। কত্ত রকম রঙের বাহার—আসমানে, দেয়ালে দেয়ালে, রিকশার ডালায়। রাঙানো এক বিশাল ক্যানভাস যেন।   আমাদেরও দেয়াল আছে—জীবনের। যে দেয়াল রাঙানোর চেষ্টায় সকাল-সন্ধ্যা মেকি প্রতিযোগিতায় নামি আমরা। কে কতটা সুন্দর করে সাজাবে জীবন, কে কতটা রঙিন দেখাবে নিজেকে—সে কী ব্যস্ততা! সবাই খুশি! ফেসবুকের পাতায় কলামে কলামে। অথচ পেছনে পড়ে থাকে ঘামে ভেজা টাউন সার্ভিস, সত্তর টাকা কেজি মিনিকেট চাল, তেলাপিয়ার ঝোল। মধ্যবিত্ত গল্প শেষ!   ছাতিমের ডালে সন্ধ্যা নামে এই শহরে। আবছায়ায় ক্লান্তির ভারে মানুষেরা এলিয়ে দেয় ভাঙা শরীর, মিলিয়ে যায় গাঢ় ঘুমের ঘোরে। সারা দিনের রং, সাজ, অভিনয় ধীরে ধীরে মুছে যায়। রং থেকে যায় শুধু দেয়ালে; জীবনের ভেতর জমে থাকে কালো—একরাশ ক্লান্তি আর হতাশা। নিজেদের দেয়াল রাঙাতে রাঙাতে কখন যে নিজেদেরই হারিয়ে ফেলি, টেরও পাই না।   তবু শেষরাত্তিরে কেউ একজন আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে—পেতেছি সমুদ্রে শয্যা, শিশিরে ভয় কীসের?   আবারও বেঁচে উঠি আমরা। রোদ যে উঠে গেছে জানালায়। নতুন দিনের ঘামে ভেজা গল্প। আবারও নিজেদের জানাই সাধুবাদ।   হেমন্তের শহর সব দেখে যায়, নিশ্বাস ফেলে শুধু গোনে নিশ্চুপ উনিশ-বিশের আলাপন!  

রাফিন মাহফুজ রাফিন মাহফুজ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
শরৎ আর আমি

শরৎ এলেই আমার ভেতরটা কেমন যেন বদলে যায়। নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর নদীর ধারে দুলতে থাকা কাশফুল—সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত নীরবতা। চারপাশ এত সুন্দর, অথচ কোথাও একটা অকারণ শূন্যতা লেগে থাকে।   আজ বিকেলে একা কাশবনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাতাসে কাশফুলগুলো দুলছিল, আর আমি চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম তাদের দিকে। ভাবছিলাম, শরৎ কতটা অদ্ভুত!   সে আসে কোনো শব্দ না করে, অথচ পুরোনো কত কথা মনে করিয়ে দেয়। হারিয়ে যাওয়া মানুষ, অসমাপ্ত গল্প, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত—সবকিছু যেন হঠাৎ করে ফিরে আসে।   একটা কাশফুল হাতে নিয়ে মনে হলো, আমিও বুঝি এই কাশফুলের মতো। বাইরে থেকে সাদা, শান্ত, সুন্দর, কিন্তু একটু বাতাস এলেই ভেতরের সব কথা দুলে ওঠে।   সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। আকাশে তখন শেষ বিকেলের আলো। আমি হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে পড়ে রইল কাশবন, সামনে অচেনা পথ। হয়তো জীবনও এমনই—কিছু ঋতু আসে, কিছু স্মৃতি রেখে চলে যায়। আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকি, পরের শরতের অপেক্ষায়।   শরৎ আসে প্রতিবছর। শুধু শরতের সেই ‘আমি’টা আর ফিরে আসি না।  

মো. নাহিদ ইসলাম মো. নাহিদ ইসলাম অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
শেষ পৃষ্ঠার মানুষ

রাত তখন প্রায় দুটো। শহরের সব জানালা একে একে অন্ধকার হয়ে গেছে। শুধু পুরোনো কাঠের টেবিলের ওপর জ্বলছিল একটি হলুদ বাতি। বাতির নিচে বসে একজন মানুষ—কলম হাতে, সামনে সাদা কাগজ। তার নাম মতিন।   সে কবিতা লেখে, গল্প লেখে, কখনো উপন্যাসের পাতা ভরায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তার নিজের জীবনটাই যেন কোনো দিন লেখা হয়ে ওঠেনি।   সেদিনও সে লিখতে বসে প্রথম লাইনটি লিখল, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় গল্পটি সে নিজেই জানে না।’ তারপর থেমে গেল। হঠাৎ দরজায় টোকা। কে? বাইরে থেকে কোনো উত্তর এল না। দরজা খুলে মতিন দেখল, একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে পুরোনো পাঞ্জাবি, হাতে একটি ছেঁড়া খাতা। বৃদ্ধ বললেন— বাবা, তুমি কি গল্প লেখো? হ্যাঁ। তাহলে আমার গল্পটা লিখবে? মতিন একটু অবাক হয়ে বলল— আপনার গল্প কী? বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন— সেটাই তো জানি না। সারা জীবন অন্যের গল্প শুনেছি, নিজের গল্পটা কখনো কেউ শোনেনি। মতিন তাকে ভেতরে বসাল। বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন— ছোটবেলায় বাবা বলেছিলেন, মানুষ হবি। যৌবনে মা বলেছিলেন, সংসার করবি। সংসার করে স্ত্রী বলল, সন্তান মানুষ করো। সন্তান বড় হয়ে বলল, বাবা, তুমি একটু বিশ্রাম নাও। আমি বিশ্রাম নিলাম। তারপর একদিন দেখলাম, সবাই ব্যস্ত, শুধু আমি অবসর।   মতিনের কলম থেমে গেল। বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন— জানো বাবা, জীবনে অনেক বাড়ি বানিয়েছি, কিন্তু নিজের জন্য একটা ঘর বানাতে পারিনি। মতিন ধীরে বলল— আপনার সন্তানরা কোথায়? বৃদ্ধ হাসলেন— সবাই আছে। শুধু সময় নেই। কথাটা বলে বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। মতিন বলল— আপনার নামটা তো জানলাম না! বৃদ্ধ দরজার কাছে গিয়ে বললেন— নাম লিখে কী হবে বাবা? গল্পটা লিখো। হয়তো কেউ নিজের বাবাকে চিনে ফেলবে।   দরজা বন্ধ হলো। মতিন আবার টেবিলে এসে বসল। ভোর হলো। পাখিরা ডাকল। শহর জেগে উঠল। কিন্তু মতিনের ঘরে কোনো বৃদ্ধ ছিল না।   চেয়ারটি খালি। শুধু টেবিলের ওপর পড়ে আছে সেই ছেঁড়া খাতাটি। মতিন খাতাটি খুলে দেখল—প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা মাত্র একটি বাক্য, ‘যে মানুষ সারা জীবন অন্যের জন্য বেঁচে থাকে, তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টি কেউ লিখে না।’   মতিনের চোখ ভিজে উঠল। সে নিজের গল্পের শেষ লাইনটি লিখল, ‘কিছু মানুষ গল্পের চরিত্র হয়ে জন্মায় না; তারা অন্যের জীবনের গল্প লিখতে লিখতেই একদিন নিজের গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় এসে দাঁড়ায়।’

মোঃ ওয়ালিউল্লাহ মোঃ ওয়ালিউল্লাহ অক্টোবর ১, ২০২৬ 0
ছায়াবাজি

মধ্যরাত। বাইরে প্রচণ্ড ঝড় বইছে। মুষলধারে বৃষ্টি আর বজ্রপাতের বিকট শব্দে চারদিক প্রকম্পিত। জানালার কাচ দমকা হাওয়ায় দুলছে। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে। গাছের ডালপালা ঝড়ে উপড়ে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।   বিদ্যুৎ নেই। গোটা বাড়ি অন্ধকারে ঢেকে আছে। রেবেকা তার শয়নকক্ষে একলা শুয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। বিছানার পাশে একটা টেবিল। সেখানে রাখা মোমবাতির আলো নিবু নিবু করে জ্বলছে। ঘরজুড়ে আলো-ছায়া খেলা করছে।   রেবেকা চুপচাপ শুয়ে আছে। চোখ দুটো অন্ধকারে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ তার দৃষ্টি দেয়ালের দিকে আটকে যায়। সেখানে একটি হাতের ছায়া! বড়, ভয়ংকর একটা হাত। দেয়ালে লম্বা ছায়া হয়ে ফুটে উঠেছে। মুহূর্তেই তার শরীর শিউরে ওঠে। আতঙ্কে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হাতটি যেন ধীরে ধীরে নড়ছে—তার দিকে এগিয়ে আসছে।   রেবেকা চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। হাত দুটো আঁকড়ে ধরে কম্বলের নিচে লুকিয়ে ফেলে। আর মুহূর্তেই হাতের ছায়াটি উধাও! সে আবার সাহস করে হাত বের করে। ছায়াটি আবার দেয়ালে ভেসে ওঠে।   তার দেহে বিদ্যুৎ খেলে যায়। মাথার মধ্যে ভয় গেঁথে বসে, এটা কি আমার হাতেরই ছায়া? আস্তে আস্তে তার উপলব্ধি হয়—হ্যাঁ, এটা তার হাতের প্রতিচ্ছায়া মাত্র। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে শান্ত হতে চায়। কিন্তু তখনই নতুন কিছু চোখে পড়ে। দেয়ালে শুধু তার হাতের ছায়া নয়, আরেকটি ছায়াও রয়েছে! রেবেকার শরীরে যেন দমবন্ধ হয়ে আসে। সে ধীরে ধীরে বিছানার এক পাশে সরে আসে।   মোমবাতির আলো দপদপ করে নিভে যায়। অন্ধকার আরও ঘনিয়ে আসে। সে তখন বুঝতে পারে, সে একা নয়। ঘরের কোণ থেকে খুব ধীরে একটা শব্দ আসে, যেন কেউ নিঃশব্দে নড়ছে। তার দৃষ্টি জানালার দিকে যায়। জানালার পর্দা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে, অথচ বাতাস বন্ধ। জানালার ভেতরে ঢুকতে পারে না। তার পা ঠান্ডা হয়ে আসে। কানের কাছে যেন এক অদৃশ্য শ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পায়।   তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে। সে আস্তে করে বিছানা থেকে নামতে চায়, কিন্তু তখনই পায়ের নিচে কিছুর স্পর্শ অনুভব করে—ভেজা কাদার মতো ঠান্ডা কিছু। সে দ্রুত মোমবাতি জ্বালায়। আলোয় যা দেখে, তাতে তার দেহ অবশ হয়ে যায়—মেঝেতে কাদামাটির ছাপ। কেউ একজন এই ঘরে এসেছে!   রেবেকা ছুটে দরজার দিকে যায়, কিন্তু দরজার ছিটকিনি খুলতে গিয়েই থমকে দাঁড়ায়। দরজার নিচ দিয়ে আস্তে আস্তে একটা হাত ভেতরে ঢুকে পড়ছে। তার চিৎকার বেরিয়ে আসে, কিন্তু ঝড়ের শব্দে তা হারিয়ে যায়। সে মরিয়া হয়ে জানালার দিকে ছুটে যায়, কিন্তু জানালার পর্দা সরাতেই দেখে, সামনে এক জোড়া অন্ধকার চোখ তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।   সে এক লাফে পিছিয়ে পড়ে। পেছনে হাওয়ার মতো কিছু একটা নড়ল। কেউ ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। রেবেকা শেষ শক্তি দিয়ে ঘরের লাইটের সুইচ টিপে দেয়। আলো জ্বলে ওঠে।   ঘরের এক কোণে একজন দাঁড়িয়ে আছে। ভেজা কাপড়, মাটিতে কাদা লেগে আছে। মুখটা অর্ধেক কাপড়ে ঢাকা। হাতে কিছু একটা চকচক করছে—একটা ছুরি। সে অনেকক্ষণ ধরেই ঘরের ভেতরে ছিল।   রেবেকা দৌড়ে দরজার দিকে যেতে চায়, কিন্তু লোকটা বিদ্যুতের গতিতে তার সামনে চলে আসে। কিন্তু ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে এক প্রতিবেশী ডাক দেয়, “রেবেকা! তুমি ঠিক আছ?”   লোকটা মুহূর্তের মধ্যে ছুটে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে যায়। রেবেকা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। ঝড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে, শরীর কাঁপছে। প্রতিবেশী এগিয়ে আসে, “কী হয়েছে?”   রেবেকা শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। ভেতরে আর কেউ নেই। কিন্তু তার মন বলছে—লোকটা আবার আসবে।  

মইদুল ইসলাম অকিল মইদুল ইসলাম অকিল সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
অপূর্ণ চাওয়া

শেষ বিকেলের আলো জানালার ফাঁক গলে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকছিল। সেই আলো এসে পড়েছিল ইলহানার মুখে। দীর্ঘদিনের এক কঠিন অসুখ তার শরীরকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। চিকিৎসকেরা সময় বেঁধে দিতে পারেননি, কিন্তু ইলহানা বুঝতে পেরেছিল—তার সময় আর বেশি নেই। ‎ ‎ধীরে ধীরে সে আলমারির দরজা খুলল। ভেতর থেকে যত্ন করে বের করল সেই গাঢ় নীল জামদানি শাড়িটি—যেটি একদিন তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি তাকে দিয়েছিল। কতদিন শুধু ছুঁয়ে দেখেছে, অথচ পরা হয়ে ওঠেনি। আজ সে শাড়িটাই পরল। ‎ ‎খোলা চুলগুলো আলতো করে কাঁধে ছড়িয়ে দিল। কোনো বাড়তি সাজ নয়, শুধু একটুখানি শান্ত হাসি। যেন কোনো অষ্টাদশী কিশোরী প্রথমবার শাড়ি পরে আয়নায় নিজেকে দেখছে। এরপর ‎ধীর পায়ে সে তার প্রিয় মানুষের সামনে এসে দাঁড়াল। ‎ ‎জানালার নরম আলোয় ইলহানাকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন। যেন সময় নিজেই থমকে গেছে। ইলহানা তার দিকে এগিয়ে গেল। তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল—সেই দৃষ্টিতে ছিল হাজারও না-বলা কথা, অগণিত অপূর্ণ স্বপ্ন, আর শেষবারের মতো ভালোবাসাকে দেখে নেয়ার আকুলতা। ‎ ‎এক মুহূর্ত পর ইলহানার ঠোঁট কাঁপল, “শুধু...আরেকটু...” ‎‎শব্দটি আর পূর্ণ হলো না। ‎তার চোখের আলো ধীরে ধীরে নিভে এলো। শরীরটা হঠাৎই ভারহীন হয়ে পড়ল। নিঃশব্দে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।   ‎ঘরজুড়ে তখন শুধু জানালার আলো, আর মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা সেই গাঢ় নীল শাড়ির আঁচল—যেন ভালোবাসার শেষ স্মৃতিটুকু আঁকড়ে ধরে সময়ও নীরবে কাঁদছিল।  

মরিয়ম মিথী মরিয়ম মিথী সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
সান্ডার তেল

হাটের ভিড় ঠেলে কলিমুল্লা এদিক-ওদিক দেখছে। মাঝে ঘাড়ে ঝোলানো হাজি গামছা দিয়ে চোখের গোল চশমার গ্লাসটি পরিষ্কার করে দেখছে। কিন্তু খোঁজে পাচ্ছে না। হাটের ভ্রাম্যমাণ পানের খিলি বিক্রেতা কয়েকবার তাকে দেখছে, কিন্তু দু-তিনবার দেখে কিছু মনে করেনি। চতুর্থবার হাটের গলিতে দেখে পানের খিলি বানানো বাদ দিয়ে একরকম পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে বলল, “কাক্কা কী খুঁজেন? সারা হাটে দেখলাম আপনি উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছেন?”   প্রশ্নগুলো শুনে করিমুল্লা ফোঁকলা দাঁত বের করে শুকনো হাসি দিয়ে বলল, “ওই সান্ডার তেল আলা কইগো বাবাজি?” উলটো প্রশ্ন শুনে পানের খিলিওয়ালা বলল, “ও এইটা! আমি তো মনে করলাম সোনা দানা টাকা কিছু হারাইছেন কি না।” কলিমুল্লা আবারও হাসি দিয়ে বলল, “কী কও বাবাজি, থামো আগে। ভিজে পাতি, চম্মন বাহার দিয়ে আগে এক খিলি পান দেও তো।” পানের ফেরিওয়ালা কোনো কথা না বাড়িয়ে পানের খিলি বানাতে লাগল। পান হাতে দেয়ার পর করিমুল্লা পানটি মুখে দিয়ে পিকটা ফেলে বলল, “দেখেছ ওই সান্ডার তেলওয়ালাকে? কদিন ধরে পুবেল বাতাসে মাঞ্জার বেদনা আর পায়ে টান ধরে। বাবাজি বলো তো দেখছ কি না?” বারবার একই প্রশ্ন শোনার পর পানের টাকা নেয়ার পর যেতে যেতে বলল, “আগের দিন ভুইলা যান কাক্কা, সান্ডার তেল টেলে আর কাম হয় না, ফার্মেসিতে যান বড়ি খান...”   কথা শুনে মুখটা নিচু করল করিমুল্লা। আজকের হাটে নতুন ধান বিক্রি করে মনটা খারাপ। খরচ যা হয়েছে, তার চেয়ে এবার ধান বিক্রি কম হয়েছে। তার মধ্যে ধানের ফড়িয়া দালাল ও ব্যাপারিরা মাপে বেশি তো নেয়, তার ওপর ধলতা, বাজারের খাজনা, তোলা সব মিলিয়ে ১৫ সের কম হলো ২ মণে। হায় রে দুনিয়া, খালি মাইরা নেয়। একা একা কথা বলতে বলতে বাহাজ হুজুরের বইয়ের দোকানে বসে।   হাটের এক কোণে মাটিতে মাদুর পেতে বই বিক্রি করে। করিমুল্লা প্রতি হাটে এখানে আসে, বই মানে কায়দা, সিপারা, পাঞ্জেগানা সুরা, কী করিলে কী হয়, নেয়ামুল কোরআন, সহি নামাজ শিক্ষা, খোয়াবনামা, সোনাভানের পুথি, জঙ্গনামা, সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামান, শিরি ফরহাদ পুথিগুলা বসে বসে চোখ বুলিয়ে হাতটি বাড়িয়ে খোয়াবনামা বইটি নিল। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখে বাহাজ হুজুরকে দাম জিজ্ঞেস করল। দাম সাড়ে তিন টাকা। হাতাকাটা পাঞ্জাবির নিচের পকেট থেকে খুঁজে নিয়ে গুনে টাকা দিয়ে উঠে পড়ে। মাজার ব্যথাটার জন্য ধীরে ধীরে ওঠে।   মাজার ব্যথায় আবার তার চোখ দুটি খু্ঁজতে থাকে সেই সান্ডার তেল। হাটের মানুষজন কমতে শুরু করেছে বাড়ি ফিরতে হবে। তাড়া আছে, কাচের বোতলে কেরোসিন নিতে হবে, তাই হাটে এসে সাহা বাবুর দোকানে রেখে এসেছিল। তার দেড় সের ওজনের বোতলটা অনেক দিনের। কোনো দিন দোকানে বদল হয়নি। অনেকে হাটে বোতল ভাঙে কিন্তু অনেক দিন হয় তার বোতলটা টিকে আছে। সাঁঝবেলা বউ হেরিকেনের চিমনি মুছে পরিষ্কার করে, তাতে ফিতা ভেঙে রাখে। প্রতি হাটে কেরোসিন নিয়ে আসে। সাহার দোকান থেকে কেরোসিন নিয়ে রাস্তার পাশে বসা তামাক পাতা কিনতে হবে। বাড়ির বুড়িটা এখনো পানে মতিহারি তামাক পাতা খায়, তাই প্রতি হাটের দিনে কয়েক পাতা কিনে থাকে। আজও কিনেছে। বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার সময় হাটের শেষ মাথায় নাপিত হাটির পাশে নানান ক্যানভাসে বসে শেষ সময়ে এখানে একটু খোঁজ নেয় করিমুল্লা। যদি মিলে যায় সান্ডার তেল!   এদিক-ওদিক খুঁজে এক জায়গায় ইঁদুর মারার বিষ, মাথার মলম, সাইবালির ফলের সিরাপ খুঁজতে খুঁজতে হাটের শেষ মাথায় গিয়ে বাবর আলীর দেখা পায়। সে সান্ডার তেল বিক্রি করে। ছোট ছোট বোতলে কালো বর্ণের সান্ডার তেল নিয়ে বসে আছে। সাথে বনরুই, শেকড় বাকড়, মৃগনাভিসহ নানান পদের জিনিস। করিমুল্লা প্রশ্ন করে, “অনেক খুঁজে তোমায় পাইলাম, দাও দুই শিশি সান্ডার তেল।” বাবর আলী ছোট দুই বোতল তেল একটি কাগজে বেঁধে দিতে দিতে বলল, “চাচা, দাম কইলে বাইরে গেছে।” শুনে একরকম হকচকিয়ে ওঠে করিমুল্লা, “কে, দাম বাড়াল কে? সান্ডা কি গরু যে তার গোস্ত মানুষে খায়?” বাবর আলী তার চিরচেনা বাবরি দুলিয়ে হাততালি দিয়ে বলল, “শুনেন চাচা, তাহলে একটু পাশে বহেন।” বলেই তার গল্পের ঝুড়ি খুলে দিল, “সান্ডা হইলো মরুভূমির প্রাণী। তারা ঘাস খায়। আগে তাদের ধইরে ধইরে মানুষ নানান ওষুধ ও তেল তৈরি করত। মরুভূমিতে থাকে বলে আগে আরবের গরির মানুষরা সান্ডা খাইত। খাওয়া হারাম না হালাল তাও জানি না। তবে একবার শুনছিলাম, এইটা খাওয়া নাকি মাকরুহ।”   কথা শুনে করিমুল্লা উঠতে চাচ্ছে। এক রকম হাত ধরে জোর করে আবার বসাল বাবর আলী, “আসল কতা হুনেন, তারপর গরির আরবরা যখন এইটা খাইয়া মজা পাইছিল, তখন নজর পড়ল শেখ আর কফিলদের। তারা আবরের ওই গরিব লোক, যারা বেদুইন, তাদের মুখের আহার কাইড়া নিয়া শেখ আর কফিলরা মজা করে খায়। তারা মরুভূমিতে তাঁবু তুলে বালুর ভেতর থেকে রাইতে সান্ডা ধরে খায়। ওই জন্যই দাম বাড়ছে চাচা!”   করিমুল্লা গল্প শুনতে শুনতে একরকম বিরক্ত হয়ে বলে, “কয় ট্যাহা নিবা কও? এতো কথা শুনার সময় কই, হাটবেলা পার করলাম তোমারে খুঁইজ্যা। এখন বাকি সময় গেল গল্প শুইনা।” বাবর আলী বলল, “দুই শিশি বিশ ট্যাহা দেন। দশ ট্যাহার জিনিস বিশ ট্যাহা!”   হাটের শেষ বেলা পশ্চিমের সূর্যটা লাল বর্ণ হয়ে উঠেছে। ভাঙা হাটের মানুষ বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। মানুষের কাতারে হাঁটছে করিমুল্লা। পূর্ব বায়ু বেড়েছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে বাতের ব্যথাগুলো বেড়ে গেছে। তাই মাজা বাঁকিয়ে চলছে। সাঁঝের বেলা শেষ রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে তার বউকে দিয়ে মাজা, পা, ঘাড়ে সান্ডার তেল মালিশ করছে। ঘরের পুবের জানালা খোলা। ঝিরিঝিরি বাতাস আসছে। ঘুমের ঘোরে চলে গেছে করিমুল্লা। মরুভূমির চাঁদনি রাত। মোটা কার্পেট পাড়া তাঁবুতে শুয়ে আছে। কেটলিভরা গাওয়া ঘি, খেজুর, থালাভরা সান্ডার মাংস আর গরম খবুজ রুটি।   আরবীয় পোশাক পরা করিমুল্লা। সান্ডার মাংস আর খবুজ রুটি খেতে খেতে হঠাৎ তাঁবু থেকে একটি সান্ডা শরীরে পড়ে; লাফ দিয়ে চমকে উঠে ঘুম ভেঙে যায়। বুকে হাত দিয়ে দেখে, একটি টিকটিকি তার বুকের ওপর পড়ে আছে। দেখে শরীর শিউরে উঠে। করিমুল্লা তার জরাজীর্ণ ঘরের সিলিংয়ের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। হেরিকেনের আলোটি মিট মিট করে জ্বলছে।  

জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
কুঁড়িতে ঝরা ফুল

বিকেল পাঁচটা বাজলেই পাড়ার মাঠে ছেলেদের চেঁচামেচি শুরু হতো। কিন্তু সুজনের সেদিকে তাকানোর সময় ছিল না। বারো বছরের সুজনের হাতে তখন ফুটবল বা বইয়ের বদলে থাকত পাঁচ কেজির এক ভারী চায়ের কেটলি।   ​বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের তিনটে মুখের অন্ন জোগাতে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তাকে নামতে হয়েছিল মোড়ের চায়ের দোকানে। অথচ সুজনের পড়ার টেবিলে বসে অঙ্কের কোণে কাটাকুটি খেলার বয়স ছিল এটি। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে লেখা মৌলিক অধিকার, শিক্ষা কিংবা আনন্দের কথাগুলো সুজনের চেনা জগৎ থেকে বহু দূরে হারিয়ে গিয়েছিল। শৈশবটা যেন রূপ নেয় এক দীর্ঘমেয়াদি বন্দিদশায়—যেখানে অধিকার মানে বিলাসিতা, আর টিকে থাকাটাই একমাত্র সত্য। ​ বছরের পর বছর কাটে। হাড়ভাঙা খাটুনি আর সমাজের অবজ্ঞা সইতে সইতে সুজনের ভেতরে জন্ম নিতে থাকে এক তীব্র ক্ষোভ ও বিষণ্নতা। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা বা দক্ষতা না থাকায় বড় হয়ে সে কোনো সম্মানজনক চাকরি পেল না। যে বয়সে এক একজন তরুণের রঙিন ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সুজন তখন বেকারত্বের চরম অভিশাপে দিশেহারা।   ​হতাশা আর অভাবের তাড়নায় সুজনের সঙ্গী হয় পাড়ার কিছু বিপথগামী তরুণ। প্রথমে ছোটখাটো ছিনতাই, তারপর আস্তে আস্তে বড় অপরাধের অন্ধকার গলিতে পা বাড়ায় সে। যে হাতে একসময় কলম থাকার কথা ছিল, সেই হাত এখন অভ্যস্ত হয়ে ওঠে অন্যায়ের শেকলে। ​ একদিন রাতে কাজ সেরে ফেরার পথে এক প্রবীণ শিক্ষক সুজনকে দেখে চিনতে পেরে আক্ষেপ করে বললেন, “সুজন, তুই তো অনেক বুদ্ধিমান ছেলে ছিলি! তোর জীবনটা এমন অন্ধকার পথে শেষ হয়ে গেল?” সুজন কেবল মলিন হেসে উত্তর দিয়েছিল, “স্যার, যে ফুল কুঁড়িতেই ঝরে যায়, তা কি আর সুন্দর হয়ে ফোটার সুযোগ পায়? আমাগো শৈশবটাই তো কেউ ফুটতে দিল না, এখন এই ঝরে পড়া পাপড়ি দিয়ে সুবাস পাবেন কই?”

নুসরাত জাহান বুশরা নুসরাত জাহান বুশরা সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
Popular post
ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

নগরীর দেবী

ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। ​তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে ​তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।     

গঙ্গার নৌকায় আমার ভবিষ্যৎ

শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে।   বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল।   গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।   বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’।   বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।”   বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল।   তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।”   বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি...   ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।”   আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম।   হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব।   এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?”   আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।”   চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।”   এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো।   হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন।   দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম।   সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।   আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে।   এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়।   এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর।   বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।”   বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম।   হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।  

Top week

সাহিত্য

বুঝে উঠতে পারি না

অক্টোবর ২৩, ২০২৬ 0