একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির দিকে আলোকপাত করলে ক্ষমতার সংজ্ঞাকে মনে হয় এক পরিবর্তনশীল চলক। একটা সময়ে যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের অনুঘটক ছিল তেল, গ্যাস ও পারমাণবিক সক্ষমতা, বর্তমানে সেই জায়গায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। স্মার্টফোন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো থেকে বায়ুশক্তি প্রযুক্তি, আবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে এসব উপাদান অপরিহার্য। ফলে এগুলোর উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এখন কেবল বাণিজ্যিক বিষয়ে আবদ্ধ না থেকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। চীনের বিরল মৃত্তিকা মৌল খাতে প্রাধান্য ও দেশটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের উদ্বেগ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। অতএব, খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কৌশলগত ক্ষমতায় রূপ নেয়, তা বিশ্লেষণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি কূটনৈতিক পর্যালোচনা। আর ঠিক এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চলে আসে, বিরল এই খনিজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? বস্তুত, রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস বা বিরল মৃত্তিকা মৌল বলতে ১৭টি মৌলকে বোঝায়। নামের মাঝে ‘বিরল’ শব্দ থাকার অর্থ এই নয় যে সব মৌলই প্রকৃতিতে দুষ্প্রাপ্য। বরং অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলন, পৃথকীকরণ ও বিশুদ্ধ করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। এদের বিশেষ চৌম্বকীয়, আলোকীয় ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রযুক্তিতে অপরিহার্য করে তুলেছে। উদাহরণ হিসেবে নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়ামের কথা বলা যায়। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে এই মৌল দুটি ব্যবহৃত হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর ও বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনে এসব চুম্বকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়াম উচ্চ তাপমাত্রায় চুম্বকের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ইট্রিয়াম ব্যবহৃত হয় বিমান ইঞ্জিনের বিশেষ আবরণ ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে। অর্থাৎ এসব উপাদানের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব খনি কিংবা ধাতু শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে গাড়ি, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পেও। এবার আসি সরবরাহব্যবস্থায় চীনের প্রাধান্যের প্রশ্নে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক পরিশোধিত উৎপাদনের প্রায় ৯১ শতাংশ ছিল চীনের দখলে। একই সময়ে এসব মৌল থেকে তৈরি স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনেও দেশটির অংশ ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ চীনের প্রভাব কেবল খনিজ উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে চূড়ান্ত শিল্পপণ্য উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে লক্ষণীয়, খনিজের মজুত থাকা আর সেই খনিজকে শিল্পে ব্যবহারযোগ্য উপাদানে রূপান্তর করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। কোনো দেশের মাটিতে বিরল খনিজের মজুত থাকলেও উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল হলে সেখানে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে তোলা কঠিন। চীন দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, বৃহৎ শিল্পভিত্তি ও সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে এই সুবিধা অর্জন করেছে। এবার আসা যাক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সাতটি বিরল মৃত্তিকা মৌল ও সংশ্লিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। একই বছরের অক্টোবরে দেশটি আরও বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। তবে এপ্রিলের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং অক্টোবরে ঘোষিত বিস্তৃত ব্যবস্থাগুলোকে আলাদা করে দেখা জরুরি। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরে ঘোষিত কয়েকটি ব্যবস্থা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে ঘোষিত বিধিনিষেধ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও স্থগিত ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রপ্তানি লাইসেন্স, অনুমোদন ও সরবরাহের শর্তের মাধ্যমে কোনো দেশ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের প্রবাহে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজস্ব উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় লিপ্ত, অপরদিকে বেইজিংও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে। বস্তুত, এই টানাপোড়েনেই প্রমাণিত হয়, আধুনিক কূটনীতিতে সরবরাহের নিশ্চয়তা ও বাজারে প্রবেশাধিকার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রসঙ্গত, এখানে জাপানের উদ্বেগ ও বিকল্প সরবরাহের অনুসন্ধানের কথা উঠে আসে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে জাপানে ইট্রিয়ামের সরবরাহ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। বিকল্প উৎস বা পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে আগামী কয়েক মাসে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। ইট্রিয়াম বিমান ইঞ্জিনের বিশেষ আবরণ ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা শিক্ষা দেয়, বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই কেবল মজুত গড়ে তোলা নয়, সরবরাহের উৎস বহুমুখী করাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। যুক্তরাষ্ট্রও এই বাস্তবতা মোকাবেলায় তৎপর হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের রচেস্টারে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য চীনের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তবে নতুন কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ থেকেই দ্রুত চীনের সমপর্যায়ের সক্ষমতা অর্জিত হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য সময় প্রয়োজন। এবার আলোচনার ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন আসে, চীনের এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কৌশল থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা কী? বাংলাদেশ বর্তমানে বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক উৎপাদনের অন্যতম শক্তি নয়। তথাপি, এই প্রতিযোগিতার অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে দেশটি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। ইলেকট্রনিকস, যোগাযোগপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ভবিষ্যতের শিল্পায়নের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বাংলাদেশের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে সংকট সৃষ্টি হলে আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশের প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিনির্ভরতা বিশ্লেষণ করে বিকল্প সরবরাহকারী চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক শিল্পসহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা জরুরি। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাস্তবভিত্তিক কূটনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা। পরিশেষে, বিরল খনিজের রাজনীতি দেখাচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার লড়াই কেবল সীমান্ত, সামরিক ঘাঁটি বা জ্বালানি সম্পদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত নয়। শিল্পপ্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য উপাদানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণও রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চীনের প্রাধান্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা এবং জাপানের উদ্বেগ বিশ্ব অর্থনীতির এক মৌলিক দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ গুটিকয়েক রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে তা বাণিজ্যিক ঝুঁকির পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপের উৎসও হতে পারে। কিন্তু এর সমাধান কি কেবল একটি দেশের আধিপত্যের বদলে অন্য দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা? না, এখানে প্রয়োজন বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা, পরিবেশসম্মত উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, প্রযুক্তির বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। বিরল খনিজের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব যদি এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে বর্তমানের অস্থির প্রতিযোগিতাকে আরও স্থিতিশীল ও ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
সোনিয়া তাসনিম
অক্টোবর ২৪, ২০২৬
0
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন একটি দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তরুণরাই আগামী বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক। একটি দেশ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সেই দেশের তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যৎকে কীভাবে চিন্তা ও পরিকল্পনা করছে তার ওপরও। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ সমাজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা ও রাষ্ট্রচিন্তা তাই কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয় – এগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বারবার একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, বর্তমানে এবং আগামীতে তরুণরা কেমন বাংলাদেশ চায়? উত্তরটি খুব বেশি জটিল ও কঠিন নয়। বাংলাদেশের তরুণরা এমন এক বাংলাদেশ চায়, যেখানে নাগরিক হওয়ার অর্থ শুধু ভোট দেয়া কিংবা পরিচয় বহন করা নয়, নাগরিক হওয়ার অর্থ হবে মর্যাদা, অধিকার ও সুযোগের নিশ্চয়তা পাওয়া। তারুণ্যের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে থাকা উচিত ন্যায়বিচার। কারণ, একটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় তখনই যখন মানুষ বিশ্বাস করে অন্যায় হলে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে তরুণরা এমন এক আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রত্যাশা করে, যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান। বিচার ও আইনের শাসন হবে স্বচ্ছ, কার্যকর ও নাগরিকবান্ধব। কোনো ব্যক্তি তার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। কোনো সাধারণ নাগরিকও তার দুর্বল অবস্থানের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে না। দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের মেরুদণ্ডকে বিকল করে ফেলে। দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রকে বিকল করার পাশাপাশি জনগণের আস্থাকেও বিকল করে। রাষ্ট্রের একজন তরুণ যখন দেখে যোগ্যতার চেয়ে অযোগ্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং নিয়মের চেয়ে অনিয়ম ও প্রভাব বেশি শক্তিশালী, তখন সেই তরুণের মাঝে রাষ্ট্র সম্পর্কে হতাশা তৈরি হয়। তাই তরুণদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের সব সরকারি-বেসরকারি কাজ হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। তরুণদের কাছে শিক্ষা শুধু একটি সনদ নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে যদি কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ-সুবিধা তৈরি না হয়, তাহলে শিক্ষিত তরুণদের মাঝে হতাশা বাড়ে। আজকের বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষামুখী না রেখে দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করা জরুরি। গবেষণা, ভাষা, যোগাযোগ, উদ্যোক্তা তৈরি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সৃজনশীলতার ওপর গুরত্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাজারকে আরো বৈচিত্র্যময় করতে হবে। শিল্প, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষি, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং নতুন ধরনের পেশা ও কর্মসংস্থানের বিকাশ ঘটাতে হবে। একজন তরুণের রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি গুরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা। একজন ব্যক্তি যে মতের সঙ্গে একমত নয়, সেটি প্রকাশের অধিকার সেই ব্যক্তির রয়েছে – এই সাধারণ গণতান্ত্রিক বোধ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। মতের বিরোধিতা হতে পারে যুক্তি দিয়ে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত আক্রোশে পরিণত না হয়। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে উঠছে। তাদের কাছে ইন্টারনেট শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই ডিজিটাল অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজন ডিজিটাল নাগরিকত্বের সংস্কৃতি। তথ্য যাচাই না করে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিগত আক্রমণ, অনলাইন হয়রানি, কিংবা অপতৎপরতা বিস্তার সমাজের জন্য ক্ষতিকর। একই সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তার সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের তরুণরা বারবার প্রমাণ করেছে যে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এ দেশের তরুণ সমাজ কতটা একতাবদ্ধ। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। বরাবর সব সময়ের জন্য শহর ও গ্রামের সুযোগের পার্থক্য, ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য, নারী ও পুরুষের অসম সুযোগ কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা এসব প্রশ্নও তারুণ্যের রাষ্ট্রচিন্তার অংশ হওয়া প্রয়োজন তরুণদের। তরুণদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশে শুধু জন্ম পরিচয় কোনো নাগরিকের সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করবে না। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে পিছিয়ে পড়বে না। একজন যোগ্য তরুণ কেবল সুযোগের অভাবে প্রতিভা হারাবে না। আজকের তরুণদের রাষ্ট্রচিন্তায় পরিবেশের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, বিভিন্ন ধরনের দূষণ, নগরায়ণের চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। তাই উন্নয়ন বলতে শুধু সড়ক, সেতু বা ভবন নির্মাণকে বোঝালে চলবে না। উন্নয়ন হতে হবে টেকসই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরও করতে হবে–তরুণরা রাষ্ট্রের কাছে যতটা প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব কতটা? একটি ভালো রাষ্ট্র কেবল সরকার তৈরি করে দিতে পারে না। ভালো ও স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র গড়তে তরুণদেরও দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। তরুণদের তাই নিজেদেরও প্রস্তুত করতে হবে। গুজবের পরিবর্তে তথ্য, ঘৃণার পরিবর্তে যুক্তি, সহিংসতার পরিবর্তে সংলাপ এবং সুবিধাবাদের পরিবর্তে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও দুর্নীতিকে প্রত্যাখান করতে হবে। অধিকার দাবি করার পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সম্মান করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো সুযোগ। তরুণরা সুযোগ পেলে কী করতে পারে তার অসংখ্য উদাহরণ আমরা দেখতে পাই শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই সম্ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগে রূপ দেওয়া। তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের কণ্ঠ শুধু জাগ্রত নয়, তাদের সক্ষমতাকেও কাজে লাগাতে হবে। তাই পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান তরুণ সমাজ রাষ্ট্রের বোঝা নয়। তারুণ্য একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে শিক্ষা, দক্ষতা, নৈতিকতা, স্বাধীন চিন্তা ও দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ কেমন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নীতিনির্ধারকদের হাতে নয়। আজকের তরুণদের চিন্তা, কাজ ও দায়িত্ববোধের মধ্যেই আগামী বাংলাদেশের একটি বড় অংশের উত্তর লুকিয়ে আছে।
আবু তাহের মোল্লা রিফাত
অক্টোবর ১৯, ২০২৬
0
মাদ্রাসা শিক্ষা আমাদের সমাজ, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুগ যুগ ধরে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য আলেম, শিক্ষক, ইমাম, খতিব ও সমাজসেবক তৈরি হয়েছেন। তাঁরা ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারের পাশাপাশি মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছেন। দুঃখজনকভাবে সত্যি, কিছু ব্যক্তির বিতর্কিত, অনৈতিক কিংবা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ও আলেম সমাজকে নিয়ে কটূক্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধর্মীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই অনেকে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সব আলেম, সব হুজুর কিংবা পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে একই পাল্লায় মাপছেন। এটি যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি ন্যায়সংগতও নয়। একজন চিকিৎসক অপরাধ করলে আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানকে দোষী বলি না। একজন শিক্ষক অন্যায় করলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে অপরাধী বলি না। একজন ব্যবসায়ী প্রতারণা করলে সব ব্যবসায়ীকে প্রতারক বলা যায় না। তাহলে একজন মাদ্রাসাশিক্ষিত ব্যক্তি বা ধর্মীয় বক্তা অন্যায় করলে তাঁর দায় কেন হাজার হাজার নির্দোষ আলেম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে? অপরাধী যে-ই হোক, তাঁর পরিচয় যা-ই হোক—অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাঁর বিচার হওয়া উচিত। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে কিংবা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে না। একইভাবে, একজনের অপরাধের কারণে পুরো একটি শিক্ষাব্যবস্থা বা জনগোষ্ঠীকে অপমান করাও ন্যায়বিচার হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” (সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৬৪)। এই শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একজনের অন্যায়ের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তবে অভিযোগ ওঠা আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট, ভিডিও কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা অনুচিত। আবার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে দায়মুক্ত রাখাও অন্যায়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং ন্যায়সংগত বিচার। অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মান পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বিচার হোক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, গুজব, আবেগ কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। মাদ্রাসা শুধু ধর্মীয় বিধিবিধান শেখানোর জায়গা নয়। প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি, শিষ্টাচার, আত্মসংযম ও মানবিকতা গড়ে তোলা। কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা, ইসলামের ইতিহাস ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। ইসলামের প্রথম প্রত্যাদেশের সূচনাই হয়েছে জ্ঞানার্জনের আহ্বান দিয়ে, “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা আল-আলাক, আয়াত ১)। জ্ঞানচর্চা ইসলামের মৌলিক শিক্ষারই অংশ। আমাদের সমাজের অসংখ্য মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসায় শিক্ষকরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অনেক আলেম ও শিক্ষক নীরবে ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের অবদান হয়তো প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয় না, কিন্তু সমাজে তাঁদের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এসব অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া মানে অবশ্য মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সবকিছুকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়; বরং ভালো দিকগুলোকে স্বীকার করে দুর্বলতা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই দায়িত্বশীল অবস্থান। কেউ ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নিলে, প্রতারণা করলে, অর্থ আত্মসাৎ করলে, নির্যাতন চালালে কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই কথা বলতে হবে। দাড়ি, টুপি, পাগড়ি কিংবা ধর্মীয় পোশাক কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেয় না। আবার এসব পোশাক পরার কারণে কাউকে সন্দেহভাজন বা অপরাধী ভাবারও কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। মানুষকে পোশাক বা পরিচয় দিয়ে নয়, তার কাজ, আচরণ ও চরিত্র দিয়ে বিচার করা উচিত। ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে অপরাধীকে আড়াল করা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। সত্যিকারের ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার কোথাও সমস্যা থাকলে তা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত। শিক্ষার মান, আধুনিক পাঠ্যক্রম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো বিষয় নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা আর সব মাদ্রাসাকে খারাপ বলা এক বিষয় নয়। কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে ‘সব হুজুর ভণ্ড’ কিংবা ‘সব মাদ্রাসা খারাপ’—এমন মন্তব্য অযৌক্তিক সাধারণীকরণ। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে লাখো মানুষের চরিত্র নির্ধারণ করা যুক্তিবাদী সমাজের পরিচয় হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করার আগে আমাদের ভাবা উচিত, সেই বক্তব্যের কারণে কতজন নির্দোষ মানুষও অপমানিত হতে পারেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে সত্যনিষ্ঠা, দায়িত্বশীল ভাষা এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাও জরুরি। সমালোচনা হোক নির্দিষ্ট কাজ ও সমস্যার, কোনো পুরো শ্রেণিকে হেয় করার জন্য নয়। মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে কথা বলার অর্থ মাদ্রাসার সবকিছুকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করা নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মানুষ সততা, ন্যায়বিচার ও আদর্শের উচ্চতর মান প্রত্যাশা করে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও বেশি। কোথাও অনিয়ম, নির্যাতন, আর্থিক অস্বচ্ছতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে রক্ষা না করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায় সত্য গোপন করা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও দক্ষ হয়ে উঠবে। প্রয়োজনীয় সংস্কারকে ঐতিহ্যের বিরোধিতা হিসেবে না দেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। সমাজে ভালো-মন্দ মানুষ সব পেশা ও শ্রেণিতেই রয়েছে। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—কোনো শ্রেণিই এর ব্যতিক্রম নয়। তাই একজন মানুষের ভুল বা অপরাধ দিয়ে পুরো শ্রেণিকে বিচার করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। একটি গাছে একটি পচা ফল পাওয়া গেলে ফলটি সরিয়ে ফেলতে হয়; তার জন্য পুরো বাগানকে ধ্বংস করা কোনো সমাধান নয়। একইভাবে, কিছু ব্যক্তির অপরাধের কারণে শত শত বছরের ধর্মীয় শিক্ষার ঐতিহ্য, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং লাখো নির্দোষ শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে অপমান করা উচিত নয়। বরং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় এনে সৎ মানুষদের কাজের পরিবেশ ও সম্মান রক্ষা করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। ভণ্ডামির প্রতিবাদ অবশ্যই হোক। ধর্মের নামে প্রতারণার বিরুদ্ধে সমাজ সোচ্চার হোক। অপরাধী হুজুর হোক, শিক্ষক হোক কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের মানুষ—তাঁর বিচার হোক অপরাধের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের নামে মাদ্রাসা শিক্ষা, ইসলামি মূল্যবোধ কিংবা পুরো আলেম সমাজকে কটূক্তি করা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মানের কথা বলে অন্যায়কে আড়াল করাও সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের প্রয়োজন অন্ধ সমর্থন নয়, অন্ধ বিরোধিতাও নয়; প্রয়োজন ন্যায়সংগত, যুক্তিনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হই, কিন্তু নির্দোষের প্রতি ন্যায়বান থাকি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, কিন্তু সামষ্টিক অপমান নয়। ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করি, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করি। কারণ একটি সুস্থ সমাজ বিদ্বেষ ও সামষ্টিক অপমানের ওপর গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে জ্ঞান, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আত্মসমালোচনা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
হাফিজ মাওলানা ফখর উদ্দিন
অক্টোবর ১৯, ২০২৬
0
দেশে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ। তার ওপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিন দেখলে মনে হয় যে তারা নিম্নমানের একটি বস্তির হোটেলে খাবার খাচ্ছে। একে তো খাবারের নিম্নমান, তার ওপর খাবারে পাাওয়া যাচ্ছে পোকা ও মাছি। মাঝেমধ্যে আস্ত তেলাপোকাও রান্না হয়ে চলে আসে শিক্ষার্থীদের খাবারের সাথে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি শিক্ষার্থী সময় পায় গড়ে তিন মাস। হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের স্বপ্নটি পূরণের উদ্দেশ্যে এই তিন মাস সবকিছু উৎসর্গ করে শুধু পড়াশোনায় লেগে থাকে। তারপর একজন শিক্ষার্থী হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিট পায়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় তার জীবনের আরও একটি যুদ্ধ। তখন একজন শিক্ষার্থীর কাছে মনে হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার থেকে সারভাইব করাটা আরও কঠিন। একজন শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে তার মধ্যে একটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল ক্যান্টিনের খাবারের মান ও পরিবেশের সমস্যা। আমরা জানি, আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাবার হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ও ফ্রেশ খাবার শরীর ও মনকে ভালো রাখে। আর শরীর ও মন ভালো থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া যায়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অধিকাংশ সময় বাসি, পচা ও নিম্ন মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় খাবারের মধ্যে তেলাপোকাসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পোকামাকড় পাওয়া যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী এত পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতা করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় পোকামাকড় খাওয়ার জন্য? বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫৩.৮৫% থেকে ৬৩% শিক্ষার্থী নিয়মিত সকালের নাশতা না খেয়ে থাকেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী খাবার খান দুপুরে আর রাতে। কিন্তু এই দুবেলার খাবারও শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পান না। তাহলে একজন শিক্ষার্থীর গবেষণা বা নতুন কিছু আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখার সুযোগ কোথায়? কারণ, তাঁর পেটে তো থাকে সব সময় ক্ষুধা । পেটে ক্ষুধা নিয়ে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে তো একজন শিক্ষার্থী গবেষণার মানসিকতা খুঁজে পান না। তখন একজন শিক্ষার্থী চিন্তা করেন কোনোমতে পড়াশোনাটা শেষ করে দ্রুত চাকরির পেছনে ছুটতে হবে। খাবারের বিষয় নিয়ে হল প্রশাসনের দ্বারস্থ হলে সাধারণত শিক্ষার্থীদের অল্প বাজেটের কথা মেইন ইস্যু হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ হল প্রশাসনগুলোর ভাষ্যমতে, ক্যান্টিনের খাবারের মান খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের অল্প টাকার বাজেটকেই দায়ী করা হয়। তাদের মতে, এই অল্প টাকার বাজেট দিয়ে ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা আরেকটু ভিন্ন। একই টাকার বাজেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনে খাবার না খেয়ে বাইরের সাধারণ হোটেলগুলোতে খাবার খেলে খাবারের কোয়ালিটি বেশ কিছুটা ভালো পাওয়া যায়। তো এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেইম বাজেট দিয়ে বাইরে ভালো খাবার পাওয়া গেলে ক্যান্টিন কেন ভালো খাবার দিতে ব্যর্থ হবে? বিশ্ববিদ্যালয় হল ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে পরিচালিত এক পুষ্টি বিষয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া শিক্ষার্থীর বয়স ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে (২৮০০-৩০০০) কিলোক্যালরি শক্তির প্রয়োজন হয়। কিন্তু হলের ক্যান্টিনে খাবার খাওয়া শিক্ষার্থী দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্র ১৪৪৯ কিলোক্যালরি পাচ্ছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এই চরম পুষ্টি ঘাটতির ফলে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, রক্তশূন্যতা ও মনোযোগহীনতায় ভুগছেন, যা সরাসরি তাঁদের একাডেমিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনী উইলি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনগুলোতে খাবারের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। গবেষক দল ক্যান্টিনের খাবার যেমন (আলুভর্তা ও মুরগির মাংস) পরীক্ষা করে ই. কুলাইসহ ( E.coli) ১৪ ধরনের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিনের কর্মচারীদের ওপর পরিচালিত একটি ‘নলেজ, অ্যাটিটিউড অ্যান্ড প্র্যাকটিস (KAP)’ গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৩১.৫% খাবার পরিবেশনকারী বা বাবুর্চির খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রয়েছে;এবং ২৮.৪% কর্মী রান্না ও পরিবেশনের সময় পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলেন। অধিকাংশ হলের ক্যান্টিনে রান্নার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা স্বাস্থ্যবিধি (গ্লাভস পরা, চুল ঢাকা বা নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়া) সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। তা ছাড়া অনেক ক্যান্টিনে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকে না। অস্বাস্থ্যকর পানি, অপরিচ্ছন্ন হাত এবং বাসি ও পচা খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে প্রাণনাশী ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়, যা শিক্ষার্থীদের টাইফয়েড বা ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়েছেন এমন রেকর্ডও রয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় যেকোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ বা ক্যান্টিনে ভেজাল, বাসি, পচা ও জীবাণুযুক্ত খাবার পরিবেশন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনগুলোতে এই আইনের কার্যকারিতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দেয়ালকে একধরনের শিল্ড বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিয়মিত আইনি মনিটরিং বা মোবাইল কোর্টের অভিযান হলের ভেতরে পৌঁছতে পারে না। ফলে ক্যান্টিন মালিকরা একধরনের অদৃশ্য ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি হলেই একজন প্রভোস্ট এবং একাধিক আবাসিক শিক্ষক থাকেন, যাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ডাইনিং ও ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়মিত তদারকি করা। কিন্তু বাস্তবে এই তদারকি খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা যখন একের পর এক ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করেন, তখনো প্রশাসন কোনো কার্যকর বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেয় না। বরং নামমাত্র একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়, যার রিপোর্ট কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনগুলো বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির দোহাই দিয়ে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতেও অনীহা প্রকাশ করে। অথচ হাজারও শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো বিলাসী প্রকল্পের চেয়ে অগ্রগণ্য, তারা তারা ভুলে যায়। চরম জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি মূলত হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিনগুলোকে এক একটি অস্বাস্থ্যকর খাবারের ভাগাড়ে পরিণত করেছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার বদলে নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনকে বাজি রেখে প্রতিদিন টেবিলে বসতে বাধ্য হচ্ছে।
মোঃ মাফিদুল হাসান
অক্টোবর ১১, ২০২৬
0
বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে অন্যতম। কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুতর, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যা উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের শিশুদের সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একটি মারাত্মকভাবে জলবায়ুঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০ লাখ শিশুর বয়স পাঁচ বছরের কম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়া, বন্যা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যান্য অভিঘাতের শিকার হচ্ছে শিশুরা। এদের মধ্যে অনেক শিশু শহরের বস্তিগুলোতে চলে যাচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। ফলে তারা শোষণমূলক শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং পাচারের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে দুর্যোগপ্রবণ জেলাগুলোতে বসবাস করছে ১ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি শিশু। তারা ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকিতে রয়েছে। নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগের কারণে পরিবারগুলো স্থানান্তরিত হলে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা হারায়। শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১ কোটি ৯৪ লাখ শিশুর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ শিশু নদীভাঙনের এলাকা কিংবা এর কাছাকাছি থাকে। ৪৫ লাখ শিশুর বসবাস উপকূলীয় এলাকায়, সেখানে ঘূর্ণিঝড়ের হুমকিতে থাকতে হয় তাদের। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে যে শুধু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে তাই নয়, এর কারণে উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে। ইউনিসেফ বলছে, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য হুমকি থেকে দরিদ্র মানুষকে বাঁচাতে এরই মধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের হুমকিতে থাকা শিশুদের সুনির্দিষ্ট চাহিদার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। বন্যাপ্রবণ এলাকার স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের ওপর যেন কোনো শোষণ-নিপীড়ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। জলবায়ু দুর্যোগে একটি পরিবারের আয় কমে গেলে কিছু শিশু শ্রমে যুক্ত হতে পারে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশ্বে বাল্যবিবাহপ্রবণ শীর্ষ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। ২০২০ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনমতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে শীর্ষে। ২০১৮ সালে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৫৯ শতাংশ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। একের পর এক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত উপকূলের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা যেন আরও খারাপ হচ্ছে। ফলে অভিভাবকরা কিশোরী মেয়েটাকে আর ঘরে রাখতে চাচ্ছেন না। দ্রুত বিয়ে দেয়াটাই তাঁদের জন্য যেন অনেক বেশি নিরাপদ মনে করছেন। তাই অনেক পরিবার উপকূল ছেড়ে শহরে এসে কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করার ফলে বাল্যবিবাহের শিকার নারীদের জরায়ু সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবার আলাদা করে শিশুর জন্য কখনো ভাবে না। এর মধ্যে নতুন বিপদ মূল্যস্ফীতি। ফলে উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে দারিদ্র্যের সংখ্যা বাড়ছে। উপকূলের বহু দরিদ্র পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ঠাঁই নিচ্ছে শহরের বস্তি, নদীর তীরে বেড়িবাঁধ কিংবা রেললাইনের পাশে। নিজেরাই যেখানে জীবন ও খাদ্যের সংগ্রামে ক্লান্ত, সেখানে শিশুর পুষ্টির চিন্তা তাদের জন্য দুষ্কর। অপুষ্টির প্রধান কারণ দারিদ্র্য। উপকূলবর্তী জেলাসমূহে দারিদ্র্য বেশি, তাই উপকূলের শিশুরা অপুষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেও বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সদ্যপ্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে দেশের হাসপাতালগুলোয় তীব্রতম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা খারাপ হচ্ছে দিন দিন। কাজের ক্ষেত্র যেমন কমে যাচ্ছে, বিপরীতে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। কাজ হারিয়ে অনেক পরিবার চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বহু পরিবার শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। শহরে এসেও উদ্বাস্তু শিশুরা যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়ছে শিশুশ্রম। বাংলাদেশে জলবায়ু চরমতা ও দুর্যোগের কারণে ৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে স্কুল ছুটি দেয়া, ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র বন্যার মতো দুর্যোগ এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত গরম, পানিশূন্যতা এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকির কারণে বিদ্যালয়গুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে স্কুল ভবন পানিতে ডুবে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার কারণে স্বাভাবিক পাঠদান দীর্ঘকাল বন্ধ থাকে। এতে শিশুদের পড়াশোনায় স্থায়ী ছেদ পড়ে এবং তারা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনা ও স্থানান্তরের কারণে উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আয়ের উৎস নষ্ট হয়। ফলে দরিদ্র পরিবারের পক্ষে শিশুদের পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আর শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকে অনেক এলাকা। বিশেষ করে হাওর, উপকূল, পার্বত্য ও নদীভাঙন অঞ্চল। এ চারটি জোনে শিশুরা দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আমাদের শিশুদের কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। যেমন পাহাড়ে আবাসিক স্কুল, হাওরে ভাসমান স্কুল, উপকূলে পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে তারা দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবে এবং তাদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হবে না অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে নবজাতক, সদ্যোজাত ও অল্পবয়সী শিশুদের জন্য। হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতাজনিত ডায়রিয়ার মতো উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে সৃষ্ট অসুস্থতায় এই বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় পরিবেশের তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাদের ছোট শরীর পরিবেশ থেকে দ্রুত তাপ শোষণ করে কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ঘামের মাধ্যমে সেই তাপ সহজে বের করতে পারে না। অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং সূর্যের আলোর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন গ্যাস বৃদ্ধি পায়। এটি শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুদূষণ শিশুদের স্বাস্থ্যে নানা সমস্যা তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে হাঁপানি, অ্যালার্জি, গর্ভকালীন জটিলতা, খাদ্যসংকট, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং বিকাশগত বিলম্ব। ২০২৩ সালের ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে শিশুদের হাঁপানির হার ৪-১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং অ্যালার্জিজনিত কারণে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনও বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে রোগবাহী পোকামাকড়ের বিস্তারও বাড়ছে। ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও জিকার মতো রোগ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বন্যার কারণে ডায়রিয়াজনিত রোগ বাড়ছে, যা ছোট শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। পাশাপাশি বন্যার পর বাড়িতে জমে থাকা আর্দ্রতা থেকে ছত্রাক জন্মায়, যা অ্যালার্জি বাড়াতে পারে। বায়ুদূষণও শিশুদের জন্য বড় হুমকি। এটি বিশ্বব্যাপী নবজাতকের প্রায় ২০ শতাংশ মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট দূষণ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং গাছপালায় পরাগ উৎপাদন বাড়িয়ে অ্যালার্জির প্রবণতা বাড়ায়। তা ছাড়া গরমে ওজোন গ্যাসের মাত্রা বাড়ে, যা শিশুদের হাঁপানির ঝুঁকি বাড়ায়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা অতিরিক্ত গরমের মতো আকস্মিক ও তীব্র দুর্যোগ মানুষের জীবন ও সম্পত্তিতে মারাত্মক আঘাত হানে, যার ফলে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার , তীব্র উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা দেখা দেয়। নদীভাঙন, লোনা পানির আগ্রাসন বা কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার কারণে মানুষের জীবনজীবিকা ব্যাহত হয়, যা তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও মানসিক অবসাদ সৃষ্টি করে। পরিবেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের মাঝে একধরনের নিরাশা ও অতিরিক্ত ভয়ের সৃষ্টি হচ্ছে, যা তাদের মানসিক সুস্থতাকে ব্যাহত করছে। বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উষ্ণতা বৃদ্ধি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আগুনে পুড়ে যাওয়া, দুর্যোগ—এসব ঘটনা মানুষের মধ্যে গভীর মানসিক চাপ ও ট্রমা সৃষ্টি করছে।পরিবেশগত অবনতির দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও অনিশ্চয়তা মানুষের মনোবল ধ্বংস করছে। এই সংকট মোকাবেলায় শুধু পরিবেশগত পদক্ষেপ নয়, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সুরক্ষাও জরুরি হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর বন্যা, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশুর জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিশ্চিতভাবেই শিশুদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বেশি দেরি হওয়ার আগেই শিশুদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরিভাবে কাজ করার এবং তাদের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো প্রশমিত করার জন্য সমন্বিত দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
আল আমিন নাহিদ
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা নিরাপদ, আনন্দময় ও সম্ভাবনাময়। তার হাতে থাকার কথা বই, খেলনা ও স্বপ্ন—শ্রমের বোঝা নয়। বিদ্যালয়ের পথে থাকার কথা তার পা—ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে নয়। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু শিশুর শৈশব এখনো দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও সহিংসতার মতো সংকটে আটকে আছে। এ সংকট কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; দেশের শিশুদের জীবনমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রকাশিত পরিসংখ্যানও তা স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জনশুমারির ভিত্তিতে দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮৭ লাখ—মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো প্রান্তিক সামাজিক উদ্যোগ নয়; এটি দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় দায়িত্ব। শিশুর অধিকার কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের বেঁচে থাকা, বিকাশ, সুরক্ষা ও অংশগ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু আইনে অধিকার স্বীকৃত হওয়া আর বাস্তবে সেই অধিকার ভোগ করতে পারা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রতিটি শিশুর কাছে এই অধিকারগুলো কতটা পৌঁছাচ্ছে? দারিদ্র্য শিশুর জীবনে শুধু অভাব তৈরি করে না; অনেক সময় তার শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের স্বাধীনতাও সংকুচিত করে। পরিবারের আয় কমে গেলে কোনো শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যায়, কেউ দীর্ঘ সময় শ্রম দেয়, আবার কোনো মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে পরিবারের সংকটের সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিবিএস ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক অগ্রগতির পাশাপাশি শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে। ইউনিসেফে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের জরিপের তুলনায় শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ বেড়েছে। এ সংখ্যা কেবল শ্রমে যুক্ত শিশুর হিসাব নয়; এর পেছনে রয়েছে হারানো পড়াশোনা, সীমিত অবসর, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংকুচিত সুযোগ। তাই শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, পরিবারের আয় বৃদ্ধির সুযোগ এবং মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সময়টি তার শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। অথচ বাল্যবিবাহ অনেক মেয়েশিশুকে সেই সময়ের আগেই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দায়িত্বে ঠেলে দেয়। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণেও দীর্ঘমেয়াদি বাধা তৈরি করতে পারে। MICS ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছিল। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। অর্থাৎ কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু প্রায় অর্ধেক তরুণীর বাল্যবিবাহের অভিজ্ঞতা এখনো বাস্তবতার একটি বড় অংশ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু আইন বা সচেতনতামূলক প্রচার যথেষ্ট নয়। মেয়েশিশুর বিদ্যালয়ে থাকা, নিরাপদ পরিবেশ, পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। শিক্ষা শিশুর অধিকার; কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই শিক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। শিশু সেখানে থাকছে কি না, কী শিখছে এবং তার শেখার পরিবেশ কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফের MICS ২০২৫-ভিত্তিক বাংলাদেশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে। একই তথ্যসূত্রে প্রাথমিক স্তরের সমাপনী হার ৮৩.৭ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ৬৯.৩ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৪৩.৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। সব শিশু বিদ্যালয়ে গেলেও প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করছে না, আর শিক্ষার উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর পথে অনেকেই পিছিয়ে পড়ছে। তাই শিক্ষানীতির লক্ষ্য শুধু ভর্তি বাড়ানো নয়; শেখার মান উন্নত করা, ঝরে পড়া কমানো এবং মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করাও হতে হবে। শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব। কিন্তু ঘরকেও সব সময় শিশুর জন্য নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। MICS ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ জরিপের আগের এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৮৮.৮ শতাংশ। হার কিছুটা কমলেও বিপুলসংখ্যক শিশুর জীবনে সহিংস শাসন এখনো উদ্বেগজনক বাস্তবতা। শারীরিক শাস্তি, নির্যাতন, বুলিং ও অনলাইন হয়রানি শিশুর আত্মবিশ্বাস, মানসিক সুস্থতা এবং অন্যের ওপর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনেক শিশু ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশও করতে পারে না। তাই শিশুকে শুধু অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে তার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হবে, গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে এবং অভিযোগের কারণে তাকে দোষারোপ বা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে না। একটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম ধাপগুলোর একটি হলো তার আইনগত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। জন্মনিবন্ধন শুধু একটি সনদ নয়; এটি পরিচয়ের প্রমাণ এবং বিভিন্ন সেবা ও অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। MICS ২০২৫ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫৯.২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন রয়েছে। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর জন্ম এখনো সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। এই ব্যবধান কমাতে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ, সহজলভ্য এবং প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের মতামত শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। বয়স কম বলে কোনো শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্বহীন মনে করা উচিত নয়। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে বয়স ও পরিপক্বতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মতামত প্রকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। শিশু শুধু সুরক্ষার প্রয়োজনীয় একজন মানুষ নয়; সে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও প্রত্যেক নাগরিকের। সরকারকে আইন ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা এবং মানসম্মত জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়কে হতে হবে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। গণমাধ্যমকে শিশুকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তার মর্যাদা, গোপনীয়তা ও সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল জগতেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ইন্টারনেট শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে সাইবার বুলিং, প্রতারণা, হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। তাই শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের শিশুদের বিষয়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যান একদিকে অগ্রগতির চিহ্ন দেখায়, অন্যদিকে স্পষ্ট করে যে কাজ এখনো অনেক বাকি। বাল্যবিবাহের হার কমেছে, কিন্তু এখনো প্রায় অর্ধেক তরুণীর বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। একই সময়ে শিশুশ্রমের হার বেড়েছে এবং ঘরে সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতা এখনো ব্যাপক। এই পরিসংখ্যানগুলোকে কেবল প্রতিবেদনের সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর জীবন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুস্থ, কতটা শিখছে এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে—তাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমাদের প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান, পরিবারের আয়, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে সীমাবদ্ধ হবে না। শিশুর অধিকার রক্ষা কোনো একক প্রকল্পের লক্ষ্য নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত। প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়—একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে রক্ষা করা।
মেহেদী হাসান সায়েম
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
নদী মানে শুধু পানি নয়; নদী মানে জীবন, জীবিকা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য আশীর্বাদ। দেশের বুকজুড়ে সুতোর মতো ছড়িয়ে আছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, ব্রহ্মপুত্রসহ শত সহস্র নদ-নদী। এসব নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনপদ, বিকশিত হয়েছে কৃষি, মৎস্য, নৌযোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অবলম্বন। পৃথিবীর প্রায় সব প্রাচীন সভ্যতাই নদীকেন্দ্রিক। বসতি স্থাপন, কৃষিকাজ, পানীয় জলের সংস্থান এবং যোগাযোগের জন্য মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশেও জনবসতির বিস্তার ঘটেছে মূলত নদীতীরবর্তী এলাকায়। ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরাপদ সুপেয় পানির প্রাপ্যতা বজায় রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নদীর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ সংরক্ষণ অপরিহার্য। আজ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর দিকে তাকালে মনে হয়, তাদের বুকে জমে আছে বহু বছরের নীরব আর্তনাদ। যে নদীগুলো একসময় প্রবল স্রোতে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল, সেগুলোর অনেকই আজ নাব্যতা হারিয়ে সংকুচিত ও প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, জীবিকা, ইতিহাস ও আবেগের প্রতীক তিস্তা নদী আজ সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে উজানের দেশ ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণ, বাঁধ নির্মাণ এবং একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশের তিস্তাসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার কোটি কোটি মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর গতিপথ রোধ করে গড়ে ওঠা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেশের অভ্যন্তরীণ নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, কপোতাক্ষ, চিত্রা, নবগঙ্গা, লবণদহ, হরিধোয়ার মতো ২৯টি নদীকে জৈবিকভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নদী ও শাখানদী মৃত বা শুকিয়ে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হিসেবে নদী দখল করে কলকারখানা ও যত্রতত্র ভবন নির্মাণকে দেখা হয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন নদীবাহিত পলি অপসারণ না হওয়ায় নদীতে চর জেগে উঠছে এবং নদী তার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ হারাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারত আন্তঃসীমান্ত ৫৪টি নদীর মধ্যে ৩৬টিতে ৫৪টি বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, যার ফলে বাংলাদেশ তার ন্যায্য পানির প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়। ভারত বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির চাপ সামলাতে কোনো আলোচনা বা পূর্বসতর্কতা ছাড়াই বাঁধগুলো খুলে দিচ্ছে যে কারণে সিলেট, রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জেলা আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে। আকস্মিক বন্যার ফলে বন্যাকবলিত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে যখন কৃষিজমিতে সেচের পানির চাহিদা সর্বাধিক তখন নদীগুলোর বুকজুড়ে দেখা যায় ধু-ধু বালুচর। একসময়ের খরস্রোতা নদী যেন ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় জলধারায় পরিণত হয়। এই বৈপরীত্য শুধু নদীর নয়; এটি নদীনির্ভর মানুষের জীবনসংগ্রামেরও নির্মম বাস্তবতা। নদী দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, দূষণ, অবৈধ বালু উত্তোলন, খাল ভরাট এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অবহেলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা, শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট, কৃষিতে মরুকরণের প্রবণতা, মৎস্যসম্পদের ক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি এবং সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এসব দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, অপুষ্টি, পানিবাহিত রোগ এবং নারী ও শিশুদের বাড়তি দুর্ভোগ আজ নদীকেন্দ্রিক জনপদের নিত্য বাস্তবতা। এই সংকট থেকে উত্তরণে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে উজান ও ভাটির স্বার্থ সমন্বয় করে সহযোগিতামূলক পানি ব্যবস্থাপনার একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নদীবহুল বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে চীনের নদী প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে নদী রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ, নদী দখল ও দূষণ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, খাল ও নদী পুনঃখনন, নিয়মিত পলি অপসারণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, পর্যটন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। নদীকেন্দ্রিক জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট এবং বর্ষার বন্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি। এ লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ নদী পুনরুদ্ধার ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। কারণ নদী বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, জীবিকা বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে এবং বাঁচবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা কোনো একক অঞ্চলের দাবি নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। নদীগুলো আজও বয়ে চলেছে, কিন্তু তাদের বুকে জমে আছে দীর্ঘদিনের নীরব আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ একদিন ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তিতে রূপ নিক—এই প্রত্যাশাই বাংলাদেশের মানুষের। নদী ফিরে পাক তার স্বাভাবিক গতি, আর নদীর সজীব স্রোতের সঙ্গে ফিরে আসুক মানুষের মুখের হাসি, সমৃদ্ধির স্বপ্ন এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
রাহাদ মাহমুদ
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে যে গুণটি সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেয়, তা হলো মানবতা। মানবতা কেবল দয়া বা সহানুভূতি নয়; বরং এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার সমন্বয়। এই মানবিক মূল্যবোধই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো বর্তমান সময়ে সেই মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর উন্নয়নের দৌড়ে এগিয়ে গেলেও মানবতার জায়গাটি অনেক ক্ষেত্রে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। ফলে মানবতার সংকট আজ সভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার বদলে অনেকেই দাঁড়িয়ে শুধু ভিডিও ধারণ করে। বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। শুধু তা-ই নয়, বড় শহরগুলোতে অভাবী মানুষের প্রতি উদাসীনতা, বৃদ্ধ বা অসহায়দের অবহেলা—এসব ঘটনা মানবতার অবক্ষয়কে প্রকাশ করছে। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত উদাসীনতার পরিচয় দেয় না, বরং আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংকটও প্রমাণ করে। মানবতার সংকটের আরেকটি কারণ হলো সামাজিক বৈষম্য, প্রতিযোগিতা ও স্বার্থপর জীবনযাত্রা। মানুষ এখন নিজের স্বার্থ রক্ষায় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে অন্যের কষ্ট বা দুর্দশার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। বড় শহরের চাকরি প্রতিযোগিতা, ধনী-গরিবের পার্থক্য, ক্ষমতার লোভ—এসব সামাজিক বাস্তবতা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা এবং নৈতিক বোধকে ক্রমেই ক্ষুণ্ন করছে। অর্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকেই মানবিক মূল্যবোধকে তুচ্ছ মনে করছে। ফলে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ—এই তিনটি স্তরে শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ভালো ফলাফল বা চাকরি নিশ্চিত করাকেই লক্ষ্যবস্তু করে ফেলেছে। ফলে শিক্ষিত হওয়া মানেই মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হওয়া নয়। পরিবারেও শিশুদের নৈতিক শিক্ষা কম, আবেগ ও সহমর্মিতা গড়ে তোলার পরিবেশ সীমিত। এই শিক্ষা ও পরিবেশের ঘাটতি সমাজে মানবতার সংকটকে আরও তীব্র করছে। মানবিক অবক্ষয় শুধু ব্যক্তিগত আচরণে নয়; এটি গুরুতর সামাজিক অপরাধের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ধর্ষণ, মাদকাসক্তি, যৌন নিপীড়ন, শিশু শ্রম—এসব কেলেঙ্কারি এবং সামাজিক অনৈতিকতার মূল কারণের মধ্যে অন্যতম হলো মানবিকতার অভাব। ধর্ষণ কখনোই একটি মানবিক মানুষ করতে পারে না; এটি মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ। এ ছাড়া মাদকাসক্ত যুবকের সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরাধ প্রবণতা ও সামাজিক অশান্তির পেছনেও মানবিক সংবেদনশীলতার অভাব দায়ী। মানবতার সংকট মোকাবেলায় সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব অপরিহার্য। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুকাল থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা জরুরি। সমাজে সচেতন উদাহরণ ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ মানবিক আচরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের জন্য মানবতার বিকল্প নেই। মানবতা থাকলে সমাজে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পায়, সহযোগিতা শক্তিশালী হয়, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি কেবল প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়; বরং মানুষের হৃদয়ে মানবতার বিকাশে নিহিত। তাই মানবতার আলোকে জাগ্রত রাখা আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। মানবতা বেঁচে থাকলে তবেই সভ্যতা সত্যিকার অর্থে টিকে থাকবে।
মো. আমিনুর রহমান
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
0
সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এই দিনে আত্মহত্যার মতো বেদনাদায়ক পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য সংগঠনগুলো সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে। চলতি বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য—‘একত্রে আমরা আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারি’ (আমরা পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারি)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় প্রাণ হারান। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ নিজেদের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা আর্থিক শ্রেণির সমস্যা নয়; উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল—সব সমাজেই এই নীরব ব্যাধি চেপে বসেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ছবিটা স্বস্তিদায়ক নয়। তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কেউ হঠাৎ করে আত্মহত্যা করেন না। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি কোনো না কোনোভাবে তাঁর অসহায়ত্ব ও মানসিক কষ্টের ইঙ্গিত দেন। অথচ আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কুসংস্কারের কারণে মানসিক সমস্যাকে এখনো ‘পাগলামি’ বলে ছোট করা হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের কষ্টের কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করার সাহস পান না। বিষণ্ণতা কিংবা মানসিক উদ্বেগকে চিকিৎসাযোগ্য রোগ হিসেবে মেনে না নেয়াটাই এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। আত্মহত্যা রোধে কেবল আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা যথেষ্ট নয়; দরকার পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ বাড়ানো, তরুণদের মানসিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। আসুন, অবহেলা বন্ধ করি, পরিচিত কারোর ব্যবহারে অস্বাভাবিক হতাশা বা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। আপনার একটি সহানুভূতিশীল কান ও সহমর্মিতার হাত হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে একটি অমূল্য প্রাণ।
মো: রনি চৌধুরী
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
প্রতিদিন সকালে আমাদের ঘুম ভাঙে অ্যালার্মের শব্দে নয়, বরং স্মার্টফোনের নীল আলো আর অনবরত ভেসে আসা নোটিফিকেশনের টানে। বিছানা ছাড়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রলে কেটে যায় দিনের প্রথম মূল্যবান আধঘণ্টা। সংবাদের ট্র্যাকিং, সহপাঠী ও বন্ধুদের জীবনযাত্রার ঝলক, লাইক-কমেন্টের ডিজিটাল প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগের প্রতিটি দিন শুরু হয় একধরনের অদৃশ্য ডিজিটাল কোলাহল দিয়ে। কিন্তু এই রঙিন স্ক্রিনের আড়ালে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক মহামারি, যার নাম ‘ডিজিটাল দুশ্চিন্তা’ ও ‘তথ্য-উৎকণ্ঠা’। আজকের তরুণ সমাজ যে যুগে বসবাস করছে, তাকে তথ্যের যুগ বলা হলেও এটি মূলত ’তথ্য-বিস্ফোরণ’ ও ‘অপতথ্যের’ যুগে পরিণত হয়েছে। সংবাদের অবাধ প্রবাহ আমাদের যেমন সচেতন করার কথা ছিল, বাস্তব চিত্র তার ঠিক বিপরীত। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা সত্য তথ্যের চেয়ে চটকদার, উত্তেজক ও ভুয়া খবরকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে ও অনলাইন অঙ্গনে প্রতিদিন আমরা এর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখতে পাই। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বাংলাদেশে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণের ওপর একটি বিস্তৃত মতামত জরিপ পরিচালনা করে। সেই জরিপের ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৬৭ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জন তরুণ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে ‘ভুয়া তথ্য ও গুজবকে’ চিহ্নিত করেছেন। যখন একটি প্রজন্মের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অনলাইনে থাকা অবস্থায় প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তি ও গুজবের কারণে মানসিক চাপে ভোগেন, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি গভীর এক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। তরুণদের তথ্য গ্রহণের অভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এনডিসি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯২ শতাংশ প্রতিদিন গড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এদের মধ্যে ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো তথ্য বা সংবাদের মূল উৎস হিসেবে ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর বেশি ভরসা করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য শেয়ার বা বিশ্বাস করার আগে তা সঠিকভাবে যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেক করে মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ বিশাল একটি অংশ যাচাই ছাড়াই তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে বা সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করছে। তথ্য যাচাই না করার এই অনীহা এবং অতিরঞ্জিত বা অসত্য খবরের মুখোমুখি হওয়া তরুণ মনের ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজশাহী অঞ্চলের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানো ও ভুয়া সংবাদের সম্মুখীন হওয়া তরুণদের প্রায় ৫৭.৮ শতাংশ নানা মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগছে। একটি অমূলক সামাজিক গুজব বা ভুয়ো খবরের কারণে রাতারাতি তৈরি হওয়া সামাজিক আতঙ্ক, রাজনৈতিক অস্থিরতার ভীতি কিংবা সহপাঠীর বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং—সবকিছুই শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতাকে তছনছ করে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এই বয়সটি মূলত ক্যারিয়ারের চিন্তা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা এবং নিজের ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার সময়। কিন্তু প্রতিনিয়ত ভুয়া খবর, অনলাইন ট্রোলিং, তথ্যের বিভ্রান্তি এবং অন্যদের কৃত্রিম সাফল্য দেখে নিজেদের তুলনা করার মানসিকতা তরুণদের মধ্যে তৈরি করছে একধরনের হীনম্মন্যতা ও বিষণ্নতা। অনলাইন অঙ্গনে তথ্য পাওয়ার অধিকার যেমন সবার রয়েছে, তেমনি কোনো তথ্য সত্য নাকি মিথ্যা, তা চেনার ক্ষমতা অর্জন করাও এখন অন্যতম নাগরিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেবল পাঠ্যপুস্তকনির্ভর পড়ালেখার বাইরে গিয়ে ‘ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি’ বা মিডিয়া সাক্ষরতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যের উৎস কীভাবে যাচাই করতে হয়, কোনো সংবাদ সত্য নাকি সাজানো—তা শনাক্ত করার প্রাথমিক জ্ঞান প্রতিটি শিক্ষার্থীর থাকা উচিত। দ্বিতীয়ত, আমাদের ক্যাম্পাসগুলোতে কার্যকর ও প্রবেশযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিষাক্ত প্রভাব থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত রাখতে শারীরিক খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বই পড়ার চর্চা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, তরুণদের নিজেদেরও স্ব-সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা এখন মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যা-কিছু দেখা যায়, তার সবকিছু সত্য নয়—এই বোধ জাগ্রত করতে হবে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের গতি ত্বরান্বিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই গতি যেন আমাদের মানসিক শান্তি ও সামাজিক সংহতিকে পিষে না ফেলে। তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারে আমরা ভেসে যাব নাকি দক্ষতার সাথে সঠিক পথ বেছে নেব—তা নির্ধারণের সময় এখনই। ভুয়া তথ্যের বিষাক্ত প্রভাব মুক্ত করে একটি সুস্থ, সচেতন ও মানসিকভাবে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের তরুণ প্রজন্মের দৃঢ় অঙ্গীকার।
সিফাত আহম্মেদ
অক্টোবর ১৯, ২০২৬
0
গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। এটি শুধু খবর পৌঁছে দেয়ার মাধ্যম নয়, বরং সমাজের চোখ, কান ও বিবেক। সাংবাদিকরা হচ্ছেন সেই সাহসী সৈনিক, যাঁরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাধরদের অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রকাশ করেন, জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকরা নানা ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা কেবল তাঁদের পেশাগত জীবনের জন্য নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের জন্যও এক ভয়াবহ হুমকি। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যেসব ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি, তাতে দেখা যাচ্ছে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হুমকি, মিথ্যা মামলা, অফিসে হামলা, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, স্থানীয় বা উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরাও আজ নিরাপদ নন। কোনো অসঙ্গতি তুলে ধরলেই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি হয়রানি শুরু হয় অথবা সামাজিকভাবে অপমানিত হতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেন। এ ধরনের নির্যাতন সাংবাদিকদের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। ফলে তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতে পারেন না এবং অনেক সময় স্ব-সেন্সরশিপ বা আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হন। এভাবে একপর্যায়ে একটি সমাজে কৃত্রিম নীরবতা সৃষ্টি হয়—যেখানে সত্য চাপা পড়ে যায়, মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা জায়গা করে নেয়। জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারায় এবং গণতন্ত্র তার স্বাভাবিক গতি হারায়। সাংবাদিক নির্যাতনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ১. ক্ষমতার অপব্যবহার : অনেক সময় রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণ করতে চান, কারণ সত্য প্রকাশ তাঁদের স্বার্থে আঘাত হানে। ২. দুর্নীতি রক্ষার প্রবণতা : প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক দুর্নীতির খবর প্রকাশ ঠেকাতে যারা দায়ী, তারাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে বা ভয় দেখায়। ৩. আইনের দুর্বল প্রয়োগ : দেশে সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য যথাযথ আইন না থাকায় বা আইনের প্রয়োগ না হওয়ায় অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় না। ফলে তারা বারবার একই অপরাধ করার সাহস পায়। ৪. সাংবাদিকদের বিভক্তি ও দুর্বল সংগঠন : অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ নয়, ফলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না। এ সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের কিছু বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। ১. সাংবাদিকদের জন্য কঠোর আইনি সুরক্ষা : সাংবাদিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি স্বাধীন ও কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। ২. দ্রুত বিচার ও শাস্তির নিশ্চয়তা : সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা কমিটি গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ৩. সরকারি ও সামাজিক সমর্থন : সাংবাদিকদের কাজকে সম্মান জানিয়ে সরকার ও সমাজের সর্বস্তরে তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। ৪. সাংবাদিক সংগঠনের শক্তিশালী ভূমিকা : জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর হতে হবে। তারা যেন প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনায় সজাগ থেকে প্রতিবাদ এবং আইনি সহায়তা দিতে পারে। ৫. সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা : স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা স্তরে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে—সাংবাদিকতা কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন তাঁদের নিরাপত্তা আমাদের সবার স্বার্থে। সাংবাদিকেরা শুধু পেশাজীবী নন, তাঁরা আমাদের সমাজের দর্পণ। তাঁদের কণ্ঠ রুদ্ধ মানেই সমাজে অন্ধকার নেমে আসা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা মানে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। আর সত্যের পরাজয় মানেই গণতন্ত্রের পরাজয়। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় আজই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের।
আব্দুল্লাহিল শাহীন
অক্টোবর ১৮, ২০২৬
0
একটি কল্যাণমুখী ও উন্নত সমাজ গঠনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ রক্ষা এবং সামাজিক মানবাধিকার নিশ্চিতকরণে অলাভজনক সংস্থা (Non-Profit Organizations) ও ট্রাস্টগুলো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে যেকোনো সামাজিক, দাতব্য বা কল্যাণমূলক উদ্যোগকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে এর আইনি ভিত্তি মজবুত করা আবশ্যক। বাংলাদেশে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গঠনের একাধিক আইনি পথ রয়েছে। উদ্যোক্তা ও উদ্যমী সমাজসেবীদের জন্য এই আইনি প্রক্রিয়া, নিবন্ধন পদ্ধতি এবং পরবর্তী কমপ্লায়েন্স সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে মূলত তিনটি ভিন্ন আইনি কাঠামোর অধীনে অলাভজনক ও সামাজিক সংস্থা গঠন ও পরিচালনা করা হয়ে থাকে। যেমন : ১. যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (RJSC) অধীনে নিবন্ধিত সোসাইটি ও ফাউন্ডেশন : বাংলাদেশে সমাজসেবামূলক ও অলাভজনক সংস্থা গঠনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও আধুনিক মাধ্যম হলো Societies Registration Act, 1860-এর অধীনে নিবন্ধন নেওয়া। গঠন প্রক্রিয়া : ন্যূনতম ৭ জন সাধারণ সদস্য একত্র হয়ে স্মারক (Memorandum of Association) ও নিয়মাবলি (Rules & Regulations) চূড়ান্ত করে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (RJSC) আবেদন করতে পারেন। গতিশীলতা ও সুবিধা : প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, গঠনতন্ত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত থাকলে খুব স্বল্প সময়ে (সঠিকভাবে প্রসেস করলে মাত্র ৫ কর্মদিবসের মধ্যে) এর প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করা সম্ভব। এই নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একটি পৃথক আইনি সত্তা (Legal Entity) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা নিজস্ব নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন, ব্যাংকিং লেনদেন পরিচালনা এবং দেশি-বিদেশি অনুদান গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। ২. রেজিস্ট্রি অফিসের অধীনে নিবন্ধিত ট্রাস্ট (Trust) : কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তি, তহবিল বা অর্থকে স্থায়ীভাবে সামাজিক বা দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে চান, তবে ট্রাস্ট গঠন করা সবচেয়ে উত্তম উপায়। গঠন প্রক্রিয়া : Trust Act, 1882-এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট ট্রাস্ট ডিড (Trust Deed) তৈরি করতে হয়। এই ডিডে ট্রাস্টের লক্ষ্য, মূলধন পরিচালনা, ট্রাস্টি বোর্ডের ক্ষমতা ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। নিবন্ধন : ড্রাফটকৃত ট্রাস্ট ডিডটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে স্থানীয় রেজিস্ট্রেশন আইনের অধীনে নিবন্ধিত করতে হয়। স্থায়ী মেমোরিয়াল ফান্ড, শিক্ষাবৃত্তি বা হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রাস্ট ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। ৩. কোম্পানি আইনের অধীনে অলাভজনক স্মারক (Section 28 Entity) : কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী মুনাফাহীন উদ্দেশ্যে কোম্পানি গঠন করা যায়, যা সাধারণত ‘Section 28 Company’ বা প্রসঙ্গানুসারে লিমিটেড ফাউন্ডেশন নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডাররা কোনো লভ্যাংশ (Dividend) গ্রহণ করতে পারেন না; অর্জিত সমুদয় অর্থ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে পুনর্বিনিয়োগ করতে হয়। যেকোনো ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রারম্ভিকভাবে নিম্নলিখিত নথি ও তথ্যসমূহ প্রস্তুত রাখা আবশ্যক : ১. নাম ছাড়পত্র (Name Clearance) : নির্ধারিত নাম অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে যায় কি না তা যাচাই করে ছাড়পত্র গ্রহণ। ২. গঠনতন্ত্র ও স্মারক : প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্যে, পরিচালনা পর্ষদের গঠন, সাধারণ সভার নিয়মাবলি ও তহবিল ব্যবস্থাপনার স্পষ্ট ধারা সংবলিত আইনি দলিল। ৩. পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও NID/পাসপোর্ট : প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পর্ষদের সকল সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি। ৪. কার্যালয়ের ঠিকানা : প্রতিষ্ঠানের অফিস বা নিবন্ধিত ঠিকানা নিশ্চিতকরণে ভাড়ার চুক্তিপত্র বা ইউটিলিটি বিলের কপি। অনেক উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটি ভুল ধারণা দেখা যায়—প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর মওকুফ হয়ে যায়। বিষয়টি আসলে তা নয়। ট্যাক্স এক্সিম্পশন সনদ : আয়কর আইন অনুযায়ী কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্টকে করমুক্ত সুবিধা পেতে হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) নির্দিষ্ট ধারার অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়কর অব্যাহতি সনদ (Tax Exemption Certificate) লাভ করতে হয়। বার্ষিক ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন : রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পর প্রতিটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য কর শনাক্তকরণ নম্বর (TIN) গ্রহণ এবং প্রতিবছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক আয়ের হিসাব পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (CA) ফার্ম দিয়ে অডিট করানো এবং কমপ্লায়েন্স বজায় রাখা আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ। একটি সমাজসেবামূলক বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে এর প্রাথমিক আইনি দস্তাবেজ বা গঠনতন্ত্র কতটা নিখুঁতভাবে প্রণীত হয়েছে তার ওপর। অস্পষ্ট গঠনতন্ত্র বা ত্রুটিপূর্ণ স্মারকের কারণে পরবর্তী সময়ে পরিচালনাসংক্রান্ত জটিলতা, এনবিআর (NBR) বা অন্যান্য সরকারি দপ্তরের সাথে প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। একজন অভিজ্ঞ কর আইনজীবী ও কোম্পানি আইন উপদেষ্টার সরাসরি পরামর্শ ও সহায়তা গ্রহণ করলে যেমন সময় বাঁচে, তেমনি প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামোর প্রতিটি দিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকিমুক্ত থাকে। প্রফেশনাল লিগ্যাল গাইডলাইনের মাধ্যমে যেকোনো জটিলতা এড়িয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফাউন্ডেশন, সোসাইটি বা ট্রাস্ট রেজিস্ট্রেশনের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণমুখী ভাবনার সঠিক বাস্তবায়নে আইনি নিবন্ধন হলো প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সঠিক নিয়মে গঠিত ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আসুন, আইনি বিধিবিধান মেনে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুসংগঠিত অলাভজনক ক্ষেত্র গড়ে তুলি।
মোঃ রেজাউল করিম
অক্টোবর ১৬, ২০২৬
0
প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশে যদি স্পষ্টভাবে লেখা থাকে ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ বা ‘অতিরিক্ত চর্বি’—তাহলে একজন ভোক্তা পণ্য কেনার আগে কয়েক সেকেন্ডেই তাঁর পুষ্টিগত ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। এ ধারণা থেকেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর আলোচনা চলছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৬ সালের খসড়া প্রবিধানকে ঘিরে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। গত ২৬ জানুয়ারি বিএফএসএ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। এতে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ/সোডিয়াম ও সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে তা সহজে বোঝানোর জন্য সতর্কতামূলক চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। অংশীজনদের মতামত দেওয়ার শেষ সময় ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি। এরপরই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খসড়াটির পরবর্তী যাত্রাপথ। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, মতামত গ্রহণের পর খসড়াটি নিয়ে আরও কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজ হয়েছে। মার্চে খসড়াটির সমন্বিত বা ‘হারমোনাইজকৃত’ সংস্করণ নিয়ে কাজের তথ্য পাওয়া যায়। বিএফএসএ সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েবের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ৩০ জুন খসড়াটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর এর গতিপথ কতদূর এগিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কোন পর্যায়ে কী মতামত দেওয়া হয়েছে, কোন কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা এতে যুক্ত হয়েছে, অংশীজনদের আপত্তি ও প্রস্তাবের কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং খসড়ার কোন কোন ধারা পরিবর্তিত হয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে পূর্ণাঙ্গভাবে নেই। আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আবারও বলা হয়েছে, এফওপিএলের খসড়া তখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ বছরের শুরুতে আলোচনা শুরু হয়ে, মতামত গ্রহণ, সমন্বিত খসড়া তৈরি এবং মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরও প্রবিধানটি গেজেট আকারে চূড়ান্ত হয়নি। অথচ বিএফএসএর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক এফওপিএল দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এর উত্তর খুঁজতে অন্তত চারটি নথি পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ২৬ জানুয়ারির মূল খসড়া, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া অংশীজনদের মতামত, মার্চের সমন্বিত খসড়া এবং ৩০ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সংস্করণ। এসব নথি তুলনা করলে বোঝা যেতে পারে, মতামত গ্রহণের পর খসড়ায় কী পরিবর্তন এসেছে এবং কোন প্রস্তাবগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে আছে। এ ছাড়া বিএফএসএর কারিগরি কমিটির আলোচনায় শিল্পখাতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত আপত্তি, দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছামূলক বাস্তবায়নের প্রস্তাব, ছোট প্যাকেটের জন্য ছাড় এবং ডব্লিউটিও-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো খসড়ার পরবর্তী সংস্করণে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নথিপত্র ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এফওপিএলের প্রয়োজনীয়তা অবশ্য শুধু একটি প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশের অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। হৃদ্রোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে। দেশের খাদ্যবাজারেও প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপস্থিতি বাড়ছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ৯৭৪ জন অংশগ্রহণকারীর ৯৭ শতাংশ আগের সপ্তাহে অন্তত একটি প্রক্রিয়াজাত বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেছিলেন। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি খাদ্যপণ্যের ৬৩ শতাংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সোডিয়াম বেঞ্চমার্কের তুলনায় বেশি সোডিয়াম পাওয়া যায়। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে লেবেলে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষিত সোডিয়ামের মাত্রার অসঙ্গতিও পাওয়া গেছে। এই বাস্তবতায় ভোক্তার জন্য সহজবোধ্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক পণ্যে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য থাকলেও তা প্যাকেটের পেছনে, ছোট অক্ষরে অথবা সংখ্যাভিত্তিকভাবে দেওয়া হয়। ফলে একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে। এখানেই এফওপিএল ও জিডিএ—অর্থাৎ নির্দেশিকা দৈনিক পরিমাণ—পদ্ধতির পার্থক্য। জিডিএ ব্যবস্থায় ভোক্তাকে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ দৈনিক প্রয়োজনের সঙ্গে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অন্যদিকে সামনের সতর্কতামূলক চিহ্ন তুলনামূলকভাবে সরল। একটি স্পষ্ট প্রতীক দেখেই বোঝা যায় কোনো পুষ্টি উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় রয়েছে কি না। বিশেষ করে, সীমিত পুষ্টিজ্ঞানসম্পন্ন ভোক্তাদের জন্য এই সরলতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে শিল্পখাতের উদ্বেগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থা চালু করতে প্যাকেটের নকশা পরিবর্তন, নতুন মোড়ক তৈরি, পুরোনো প্যাকেটের মজুত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে জিডিএ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা এবং বাধ্যতামূলক করার আগে দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছামূলক পর্যায়ের প্রস্তাব এসেছে। সংশ্লিষ্ট আলোচনায় অন্তত পাঁচ বছর স্বেচ্ছামূলকভাবে ব্যবস্থা চালুর দাবিও উঠে এসেছে। এই পাঁচ বছরের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাস্তবায়নের জন্য যৌক্তিক প্রস্তুতির সময় কতটা প্রয়োজন, আর কতটা সময় নীতির বাধ্যতামূলক প্রয়োগ পিছিয়ে দিতে পারে। শিল্পের বাস্তব ব্যয় ও সক্ষমতার বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন; তবে একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যও যেন দুর্বল না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ছোট প্যাকেটকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। পণ্যের আকার ছোট হলেও অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বির স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে যায় না। তাই কোনো ছাড়ের প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ভোক্তার সুরক্ষা এবং বাস্তব বাজারপরিস্থিতি একসঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ডব্লিউটিও নোটিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গতিও অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বাস্তব কারিগরি বা আইনি ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রক্রিয়া যেন জনস্বাস্থ্য নীতি চূড়ান্ত করার অনির্দিষ্ট বিলম্বের কারণ না হয়, সেটিও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এফওপিএল কোনো খাদ্যপণ্য নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য ভোক্তাকে সহজবোধ্য তথ্য দেওয়া, যাতে তিনি পণ্য কেনার আগে নিজের জন্য সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই এটি ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বাস্থ্য দুইয়ের সঙ্গেই সম্পর্কিত। এখন প্রয়োজন বিতর্ককে ‘শিল্প বনাম জনস্বাস্থ্য’ এই সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিএফএসএ থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ফাইলে কী মতামত দেওয়া হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো সংস্থা কী বলেছে, শিল্পসংগঠনগুলোর লিখিত প্রস্তাবের কোন অংশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে কোন সংস্করণটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হবে। বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা যখন বাড়ছে এবং প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহারও বিস্তৃত হচ্ছে, তখন প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগত তথ্য সহজবোধ্য করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে শিল্পের যৌক্তিক বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত উদ্বেগও শুনতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা। কোনো পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা কোনো একক প্রশাসনিক জটিলতা যেন নীতির গতিপথ এককভাবে নির্ধারণ না করে, এটাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য। প্যাকেটের সামনে একটি কালো অষ্টভুজ হয়তো দেখতে ছোট একটি চিহ্ন। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন ভোক্তা কী কিনবেন, কী খাবেন এবং নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন সেই বড় প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, সেই সতর্কবার্তা শেষ পর্যন্ত প্যাকেটের সামনে জায়গা পায়, নাকি নীতিনির্ধারণের ফাইলেই আটকে থাকে। almamunrabbi21@gmail.com
আল মামুন রাব্বি
অক্টোবর ১৪, ২০২৬
0
স্ট্যাটাস কনজামশন বা মর্জাদাভিত্তিক ভোগ কী, তা জানার আগে আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা করে নিই। এখন থেকে বেশ কিছু বছর আগেও আমরা আমাদের ঘরে তিন বেলা খাবারের বাইরে যে খাবার খেতাম, তার অধিকাংশই ছিল বাড়িতে তৈরি পিঠা, মুড়ি, মোয়া, চিড়া, চটপটি এসব। এরপর হাতে এলো পেটিস, ডেনিস, শিঙাড়া, সমুচা, মোগলাই, চকবার, হালিম, ফুচকা, ফালুদা। তারপর এল স্যান্ডউইচ, বার্গার, পিৎজা পেরিয়ে আমরা এখন খাচ্ছি দোসা, বিফ সিজলিং, রেশমি কাবাব, জালি কাবাব, স্যুপ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, অন্থন। খাবারের এই যে আধুনিকায়ন হলো, এই যে বিভিন্ন ভিনদেশি খাবার আমাদের বিশেষ খাবারের তালিকায় উঠে এল, তা কীভাবে হলো? আমার দৃষ্টিতে যে কারণগুলো পড়েছে— ১. আমাদের দেশ থেকে বিত্তবানেরা বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে শুধু হাওয়া নয়, খাওয়ার রুচিরও বদল করে আসেন। ২. রেমিট্যান্স যোদ্ধা যাঁরা প্রবাসে যান, তাঁদের একটি বড় অংশ সেখানকার হোটেল বা রেস্টুরেন্টে কাজ করেন এবং দেশে এসে বিদেশি খাবারগুলোকে দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। ৩. মোগল আমল থেকেই ভোজনরসিকদের চাহিদা বিবেচনায় বাইরের দেশ থেকে পাচক বা রাঁধুনি আমদানি করা হয়। আমাদের দেশে আগত বিদেশিদের খাদ্য সরবরাহের জন্য ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতেও দেশি-বিদেশি রাঁধুনি রাখা হয়। এই যে বিশেষজ্ঞ রাঁধুনি, তাঁদের অস্থায়ী সহকারী যাঁরা থাকেন, তাঁরা চাকরিচ্যুত হলে সাবলম্বী হতেও বিভিন্ন স্থানে নিজ উদ্যোগে বিদেশি খাবারের হোটেল বা রেস্টুরেন্ট শুরু করেন। মূল কথা, এই বিদেশি খাবারগুলো বিভিন্নভাবে বিত্তবানের হাত ধরেই দেশে ঢুকেছে। তারপর বিত্তবানদের হাত থেকে ক্যাসিং ঠিক রেখে ফরেন নাম নিয়ে নিম্নমানের খাবার হয়ে পথেপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। কেন পথেপ্রান্তে? কেন নিম্নমান? নতুন উদ্যোক্তারা অল্প মূলধন নিয়ে বিদেশি খাবারের প্রকৃত মান রেখে খাদ্য উৎপাদন করলেও তারা বিত্তবানদের রুচি মোতাবেক স্থান ম্যানেজ করতে পারে না। আবার স্থান পাওয়া গেলেও ওই পরিমাণে বিত্তবান বা রিচম্যান পাওয়া যায় না। কাজেই টার্গেট যখন রিচফুড বিক্রি করা, তখন রিচম্যান খুঁজে বের করে সেই মোতাবেক রেস্টুরেন্ট স্থাপন করতে হবে। এই রিচফুড প্রোডাকশনের সাথে জড়িত উদ্যোক্তারা রিচফুড বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রচারে নেমে যখন ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা করে, তখন তারাই সমাজের একটি অংশকে রিচ হিসেবে সামনে তুলে নিয়ে আসে। সমাজের এই অংশ রিচ হতে বাধ্য হয়। কীভাবে বাধ্য হয়? গলির মাথায় কফিশপ ও ফাস্টফুডের ভ্যান এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ রিচ ফুড প্রায় গরিবের হাতের নাগালে পৌঁছে গেল। তখন গরিব তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে রিচ হতে চেষ্টা করছে। মূল কথা, বিত্তবানদের বিদেশি রিচ ফুডের ক্যাসিং ঠিক রেখে মানে কমিয়ে এনে গরিবের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে ভ্রাম্যমাণ ফাস্টফুডের দোকান। প্রথম প্রথম সকলে শখে খেতে থাকলেও পরে তা ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ধনী-গরিব সবাই এখন সপ্তাহে একটা দিন ফাস্টফুড না খেলে কেমন যেন জীবনে জোশ আসে না। অর্থাৎ এই ফাস্টফুড খাওয়াটা একটা স্ট্যাটাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিত্তবানরা ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে যাচ্ছেন, মধ্যবিত্তরা শহরের রেস্টুরেন্ট বা ধাবায় গিয়ে বসছেন, গরিবেরা ফাস্টফুড ভ্যান বা গলির মুখের কফিশপে বা হকার্স মার্কেটের ভাবির ভ্যাবাচ্যাকা বা চিকনি-চামেলি বার্গার হাটে গিয়ে বসছেন। মানুষ ফাস্টফুড খাওয়াটাকে একটি সামাজিক মর্যাদার অবস্থায় নিয়ে গেছে। যখন একদিকে মানুষের তিন বেলা খাবারের অভাব থেকে গেছে ঠিক, সেই সময়েই আরেক পাশে এসব ফাস্টফুডের ধাবায় ক্রেতাদের লম্বা সিরিয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে সেল্ফি তুলে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে। সমাজে নিজের মর্যাদা শো (উপস্থাপন) করছে। এই যে নিজের সোশ্যাল স্ট্যাটাস বা সামাজিক মর্যাদা দেখাতে মাঝে মাঝেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন শ্রেণির ফাস্টফুড বা রিচফুড ভোগ করে, এটাই মূলত স্ট্যাটাস কনজামশন। অর্থাৎ নিজ সামর্থ বা সচ্ছলতা প্রকাশে সোশ্যাল স্ট্যাটাস বা সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় বা প্রদর্শনের লক্ষ্যে আমরা যে বিশেষ বিষয়াদি ভোগ করি, সেটাকেই মূলত স্ট্যাটাস কনজামশন বলে। ফাস্টফুড হচ্ছে স্ট্যাটাস কনজামশনের নিম্নতর উদাহরণ। এরপর আছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ, আপডেটেড আইফোন ব্যবহার, রয়্যাল এনফিল্ড বাইক, রোলেক্স ঘড়ি, জেন্টেল পার্ক, রিচম্যান, ইনফিনিটি, ক্যাটস আই ব্র্যান্ডের পোশাক—এ রকম নানাবিধ দামি ব্র্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখা অথবা প্রদর্শন। উপর্যুক্ত জীবনাচার আলোচনায় বোঝা যায় যে, স্ট্যাটাস কনজামশন বা মর্যাদাভিত্তিক ভোগ তখনই হয়, যখন মানুষ কেবল কোনো পণ্যের কার্যকারিতা বা প্রয়োজনীয়তার জন্য তা কেনে না, বরং সমাজে নিজের সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং অবস্থান প্রদর্শন করার জন্য পণ্য ভোগ বা ক্রয় করে। এখন বিষয় হলো, ফাস্টফুড পর্যন্ত স্ট্যাটাস কনজামশনে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষও বিভিন্নভাবে অংশ নিতে পারছে, পোশাকের ক্ষেত্রেও রেপলিকা (কপি) ব্যবহার করে অংশ নিতে পারছে। আইফোন, মোটরবাইক, ল্যাপটপের রেপলিকা (কপি) নেই, নিম্নমান নেই। এই জায়গাতে এসে মানুষে মানুষে বিভেদ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশীর, আত্মীয়ের সাথে আত্মীয়ের, বন্ধুর সাথে বন্ধুর সামাজিক মর্যাদায় ব্যবধান ফুটে উঠছে। যাঁরা বয়স্ক বা বুঝদার, তাঁরা নিজেদের সামলে নিচ্ছেন, ধনীদের অভিশাপ দিয়ে, সকল সচ্ছল মানুষের অর্থকে অবৈধ ও হারাম বিবেচনা করে নিজেদের সামলে নিচ্ছেন। বিপত্তিটি বাধছে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীদের মধ্যে। তারা নিজের অবিভাবকের আর্থিক অবস্থা না বুঝেই বন্ধুর অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজামশনে আকৃষ্ট হচ্ছে; চাহিদাতত্ত্ব অনুযায়ী যা তার চাহিদা হওয়ার কথা নয়, যা তার অভাব হওয়ার কথা নয়, সেই চাহিদা পূরণে তার অবিভাবক ব্যর্থ হচ্ছেন এবং সেই অভাবে তারা কাতর হয়ে নানাবিধ নেতিবাচক কাহিনিতে জড়িয়ে যাচ্ছে; হতাশ হয়ে বন্ধুর অতিরঞ্জিত ব্যয়বহুল জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে, অথবা তার বিলাসদ্রব্য ছিনিয়ে নিতে বন্ধুকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া পরশ্রিকাতরতায় ভুগে নানান অনৈতিক, অসামাজিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যেমন : সন্তান অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে, বন্ধু বন্ধুকে হত্যা করছে, চুরি-ছিনতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে, হতাশায় ভুগে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি বা মনোবল হারাচ্ছে। আমাদের এই উন্নয়নশীল দেশে সবার জীবনে একসাথে উন্নয়ন হয় না। একটি পরিবার থেকে একজনের উন্নয়ন হয়, একটি বংশ থেকে একজনের উন্নয়ন হয়, একটি গ্রাম থেকে একজনের উন্নয়ন হয়। এই একজন একই সাথে পরিবার, বংশ, গ্রামের জন্য যেমন উন্নয়নের উদাহরণ, গর্বের বস্তু, তেমনি তার অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজামশনের কারণে সে সর্বত্র ঈর্ষার পাত্রেও পরিণত হয়। তার প্রতি নজর পড়ে, অধিক দুষ্টদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। একদল যখন এই উদাহরণকে আদর্শ মেনে এগিয়ে যেতে সাহস পায়, তেমনি অন্য একটি দল পরশ্রীকাতরতায় ভুগে তাকে আক্রমণ করে পিছিয়ে দিতে চায়। এটাই চরম সত্য। স্ট্যাটাস কনজামশন থাকবেই। এটা নতুন কিছু নয়, তবে নিজেদের আর্থিক অবস্থা, নিজের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আপনজনের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে তার প্রকাশ হওয়া উচিত। আমার-আপনার স্ট্যাটাস কনজামশন যেন অন্যকে আহত না করে। অন্যের পরশ্রীকাতর স্বভাবকে উস্কে না দেয়। আমাদেরই সচেতন হতে হবে। যার জীবন তার উপার্জিত অর্থে চলছে, আমারটা আমার অর্থে চালাতে হবে। কাজেই অন্যের সোশ্যাল স্ট্যাটাসের সাথে মিল রাখতে গিয়ে যেন অনটনে পড়তে না হয়। এক বেলা ভালো খেয়ে বাকি দুই বেলা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে না হয়। এক জীবনে অনেক ভোগ করার সুযোগ থাকলেও সব ভোগ করা যায় না। এক জীবনে যেটুকু নিজে জোগাড় করতে পারব তাই আমার। অন্যেরটা দেখে অভাববোধ হলেই তা অভাব নয়, সেটা পরশ্রীকাতরতা, যা জীবনের সুখ নষ্টের মূল উপকরণ। আসুন আমরা সচেতন হই, আমরা যেমন পরশ্রীকাতরতায় ভুগব না, তেমনি আমাদের অতিরঞ্জিত মর্যাদাভিত্তিক ভোগ-বিলাসিতা দেখিয়ে অন্যের পরশ্রীকাতর স্বভাবকে উস্কে দেব না, আমরা অন্যের রোষের বা ঈর্ষার শিকার হব না।
মোঃ মিজানুর রহমান
অক্টোবর ১৩, ২০২৬
0
‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বাংলাদেশ’—এই চিরন্তন সত্য বাণীটি আমাদের জাতীয় জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ডাক্তার, শিক্ষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক—সব পেশার মানুষই বেঁচে থাকার জন্য কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বাস্তবচিত্র বড়ই করুণ। অন্নদাতা এই কৃষকদের দুর্দশার শেষ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮.৫% এখনো প্রত্যক্ষভাবে কৃষির সাথে যুক্ত। অথচ কৃষি উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও পটাশ সার, কীটনাশক, বীজ, ডিজেল এবং সেচ খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) ও বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে প্রতি একর জমিতে ধান বা সবজি উৎপাদনে কৃষকের খরচ বেড়েছে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ, অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি ফসলের ন্যায্য বাজারমূল্য। এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে এক নির্মম দ্বিমুখী সংকট। উৎপাদিত ফসলের দাম যদি খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায় এবং মূল্যস্ফীতি ঘটে। আবার দাম না বাড়ালে উৎপাদন খরচ মেটাতে গিয়ে কৃষকের ভিটেমাটি বিক্রির উপক্রম হয়। এই দুষ্টচক্র থেকে কৃষিকে মুক্ত করতে হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য উন্নত বিশ্বের আদলে কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) মাধ্যমে কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মত, স্মার্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির ওপর উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা আধুনিক উপায়ে কম খরচে অধিক ফলন ফলাতে পারেন। কৃষকদের আরেকটি বড় অন্তরায় হলো পুঁজি বা ঋণের অভাব। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ বরাদ্দ দেয়া হলেও তার বড় একটি অংশ প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে পৌঁছায় না। সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জামানত ছাড়া ঋণ দিতে চায় না, অথচ দেশে প্রকৃত কৃষকদের একটি বড় অংশই ভূমিহীন বা বর্গা চাষি। তাই প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের জন্য বিনাশর্তে, বিনা জামানতে এবং স্বল্প সুদে বা প্রয়োজনে ‘ফসলভিত্তিক সহজ ঋণ’ (Crop Loan) নিশ্চিত করতে হবে, যেন ফসল তোলার পর কৃষক সহজেই সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারেন। পাশাপাশি, কৃষিকে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সময় এসেছে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এখনো কৃষি পেশাকে অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হয়। ফলে জেনজি (Gen Z) বা আলফা প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হয় না। অথচ হাইড্রোফোনিক, পলিহাউস চাষাবাদ, অ্যাগ্রো-টেক বা এআই (AI) নির্ভর স্মার্ট কৃষির ছোঁয়া লাগাতে পারলে এটি হতে পারে দেশের অন্যতম লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। শিক্ষিত তরুণেরা কৃষিতে যুক্ত হলে দেশের বেকারত্ব যেমন দূর হবে, তেমনি কৃষি খাতে আসবে বৈপ্লবিক রূপান্তর। পরিশেষে, খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে হলে আমাদের কৃষিকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও বাজার-বান্ধব করতে হবে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক ও সম্মানিত পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে আমাদের খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে না। বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের (Agro-processing) মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
হাবিবুল্লাহ মোল্লা
অক্টোবর ১৩, ২০২৬
0
বাঙালির ইতিহাসে রক্ত আছে, কান্না আছে, বীরত্ব আছে; অভাব শুধু আত্মসমালোচনার। এই জাতি বারবার বুকের রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখেছে, তারপর সেই ইতিহাসের শিক্ষা মুছে দিয়ে পুরোনো ভুলের নতুন সংস্করণ মঞ্চস্থ করেছে। যে শাসকের বিরুদ্ধে একদিন রাজপথ কাঁপিয়েছে, ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে তারই মতো ক্ষমতাবান হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। যে অন্যায় তাকে রাস্তায় নামিয়েছে, সুযোগ পেয়ে সেই অন্যায়েরই সুবিধাভোগী হতে চেয়েছে। তারপর আবার নির্যাতিত হয়েছে, কেঁদেছে, রক্ত দিয়েছে, স্লোগান তুলেছে। এ যেন ইতিহাস নয়, একই ভুলের পুনরাবৃত্তিতে অভ্যস্ত একটি জাতির দীর্ঘ আত্মবিস্মৃতি। প্রশ্ন হলো, বাঙালি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, নাকি ইতিহাসকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করতে শেখে? তার বিজয় কি মুক্তির দরজা খোলে, নাকি ক্ষমতার ঘরে কেবল নতুন মালিক প্রবেশ করে? জাতির সংকটকে জন্মগত কাপুরুষতা কিংবা আবেগপ্রবণতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সহজ, কিন্তু সত্য অনুসন্ধানের জন্য যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক আচরণ তৈরি হয় রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে। বাঙালির সংকটও তার রক্তে নয়; তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক নৈতিকতায়—যেখানে মানুষ নিজের জন্য ন্যায় চায়, অথচ ব্যক্তিস্বার্থে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে। ১৯৫২ সালে বাঙালি ভাষার অধিকারের জন্য লড়েছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে, ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। প্রতিটি অর্জন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু শাসক বদলানোর সঙ্গে শাসনের চরিত্র কতটা বদলেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন হয়েছে, নাগরিকের অধিকার কতটা দলনিরপেক্ষ হয়েছে—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরও জরুরি। শাসকের পতন একটি রাজনৈতিক ঘটনা; ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক অর্জন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সামরিক শাসন, নির্বাচনী রাজনীতি, গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়নের নানা বয়ান দেখেছে। তবু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত ও দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে তোলার সংগ্রাম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। চাকরি, ব্যবসা কিংবা নিরাপত্তার জন্য রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে নাগরিক অধিকারপ্রত্যাশী মানুষ থেকে ক্ষমতার অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে ওঠে। তখন প্রশ্ন থাকে না, ‘আমার অধিকার কোথায়?’ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, ‘আমার লোক কোথায়?’ এই মানসিকতার প্রতিফলন সমাজেও দেখা যায়। ঘুষের শিকার মানুষ সুযোগ পেলে নিজেই ঘুষ দিতে বা নিতে পারে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ব্যবসায়ী রাজনৈতিক আশ্রয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোণঠাসা করার সুবিধা খুঁজতে পারেন। ন্যায়সংগত সমাজের প্রত্যাশী অভিভাবক সন্তানের চাকরির জন্য নিয়ম ভাঙার সুপারিশ চাইতে পারেন। নিজের স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার নাগরিকও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের স্বাধীনতা অস্বীকার করতে পারেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায় অবশ্যই বেশি, কারণ আইন, প্রশাসন ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা তার হাতে। কিন্তু নাগরিকের সুবিধাবাদও অন্যায়কে সামাজিক প্রশ্রয় দেয়। শাসক যখন ক্ষমতাকে অধিকার মনে করেন, অনুসারী তখন ক্ষমতাবানের নৈকট্যকে যোগ্যতা ভাবেন, আর সাধারণ মানুষ নিয়ম মানাকে দুর্বলতা মনে করতে শুরু করে। অন্যায় তখন শুধু ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থা থাকে না; নিচ থেকেও তার সমর্থন তৈরি হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এ সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুত রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভের বৃহত্তর বিস্ফোরণে রূপ নেয়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও উঠে আসে। সরকার পতনের সময় প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়। এ ঘটনাপ্রবাহের শিক্ষা স্পষ্ট। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন যেমন অগ্রহণযোগ্য, প্রতিশোধের নামে সংঘটিত সহিংসতাও তেমনি অগ্রহণযোগ্য। একটির নিন্দা করে অন্যটিকে বৈধতা দেয়া ন্যায়বিচার নয়; তা নৈতিকতার দলীয়করণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ক্ষমতার পতনকে কেবল বিজয়ের চোখে দেখলে পরবর্তী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্নগুলো আড়াল হয়ে যায়। স্বৈরাচারী শাসনের পতন নিজে আত্মঘাতী নয়; তা মুক্তির প্রয়োজনীয় শর্তও হতে পারে। আত্মঘাতী হয়ে ওঠে সেই মানসিকতা, যা পতনকেই পূর্ণ মুক্তি মনে করে, কিন্তু পরবর্তী রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে ভাবতে চায় না। বিজয়ের পরই রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়। তখন দেখতে হয়, ক্ষমতাসীনরা বিরোধী মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন কি না, বিচারব্যবস্থা ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত থাকছে কি না, প্রশাসন নাগরিককে দলীয় পরিচয়ের বদলে অধিকার অনুযায়ী বিবেচনা করছে কি না। এসব পরিবর্তন ছাড়া গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের আয়োজন হয়ে থাকতে পারে; নাগরিকের স্বাধীনতা হয়ে ওঠে না রাষ্ট্রের স্থায়ী ভিত্তি। বিপ্লবের আবেগ সাময়িকভাবে মানুষকে একত্র করতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানই পারে সেই আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে। যে আন্দোলন ন্যায়বিচারের দাবি তোলে, কিন্তু নিজের পক্ষের অপরাধীর বিচার চাইতে অস্বস্তি বোধ করে, সে ন্যায়বিচারের বদলে ক্ষমতার হাতবদলকে প্রশ্রয় দেয়। যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করে ক্ষমতায় পৌঁছায়, তারপর বিরোধী মতকে শত্রু মনে করে, সে পুরোনো ব্যবস্থার নাম বদলায়, চরিত্র নয়। আর যে জনগণ নতুন ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার অধিকার বিসর্জন দেয়, সে নিজের স্বাধীনতার ভিত্তিই দুর্বল করে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ২০২৪–২০২৫ সালের জরিপগুলোতেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। এসব ফলাফল কোনো চূড়ান্ত ঐতিহাসিক রায় নয়; তবে মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার পরিবর্তন আর মানুষের প্রত্যাশা পূরণ এক বিষয় নয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই আদর্শের চেয়ে পরিচয়, নীতির চেয়ে নেতা এবং নাগরিকত্বের চেয়ে দলীয় আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে। আমরা নেতাকে ভালোবাসি, কিন্তু তাঁর ভুল ধরতে শিখি না। দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করি, কিন্তু দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করি না। ফলে রাজনীতি নাগরিকের বিবেককে শাণিত করার বদলে তাকে আনুগত্যের শিকলে বেঁধে ফেলে। এই শেকল ভাঙতে হলে নিজেদের নির্দোষ ভাবার অভ্যাসও ভাঙতে হবে। নাগরিকের দায়িত্ব হলো অপরাধের বিচার পরিচয় দিয়ে নয়, প্রমাণ ও নীতির ভিত্তিতে চাওয়া; ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, এমনকি সেই ক্ষমতা নিজের পছন্দের মানুষের হাতে থাকলেও। আত্মসমালোচনা মানে নিজের অর্জন অস্বীকার করা নয়; অর্জনকে অর্থবহ করতে তার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা। যে সমাজ ভুল স্বীকারকে পরাজয় ভাবে, সে সংশোধনের পথও বন্ধ করে দেয়। বাঙালির প্রয়োজন আরেকটি বিজয় নয়; প্রয়োজন বিজয়ের অর্থ বদলে দেওয়া। বিজয় মানে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়, তার অধিকারও নিশ্চিত করা। বিজয় মানে নিজের নেতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলা নয়, তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা। বিজয় মানে রাষ্ট্রের চাবি হাতে পাওয়া নয়, রাষ্ট্রের দরজা সবার জন্য খুলে দেওয়া। বাঙালি শিখে জেতে, নাকি জিতে শেখে—তার উত্তর কোনো জাতিগত ভাগ্যে লেখা নেই। তা নির্ধারিত হবে আমাদের রাজনৈতিক আচরণ, নাগরিক সাহস ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মধ্য দিয়ে। প্রতিবার পতনের পর যদি আমরা নতুন প্রতিমা গড়ি, নতুন স্লোগান লিখি, অথচ পুরোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের বিজয়ী বলবে না; বলবে, আমরা একই ভুলকে বিভিন্ন নামে পুনরাবৃত্তি করেছি। একটি জাতির সবচেয়ে বড় পরাজয় ক্ষমতা হারানো নয়, নিজের ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা হারানো। যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শুধু অন্যায়কারীর পরিচয় বদলাতে চায়, সে মুক্তি অর্জন করে না; মুক্তির সম্ভাবনাকেই বিপন্ন করে। সত্যিকারের ইতিহাস শুরু হয় বিজয়ের দিনে নয়, বিজয়ী যখন প্রথমবার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়ায়—সেদিন।
শহীদ রায়হান
অক্টোবর ১৩, ২০২৬
0
বিশ্বের উন্নয়নশীল ও উন্নত অনেক দেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। সুইজারল্যান্ড তার আল্পস পর্বতমালা, নেপাল হিমালয়, ভিয়েতনাম পাহাড়ি উপত্যকা এবং মালয়েশিয়া তার রেইনফরেস্টভিত্তিক পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। বাংলাদেশও এমন একটি অনন্য সম্পদের অধিকারী, যার নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। অপরূপ পাহাড়, কাপ্তাই হ্রদ, ঝরনা, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য এবং বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল সঠিক পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্প অন্যতম দ্রুত বিকাশমান খাত। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপদ পরিবেশ এবং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে বহু দেশ পর্যটনকে জাতীয় আয়ের বড় উৎসে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। একই অঞ্চলে পাহাড়, হ্রদ, নদী, বন, ঝরনা এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এমন সমন্বয় দেশের অন্য কোথাও নেই। এর সঙ্গে রয়েছে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় হস্তশিল্প। এই সম্পদগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপন করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি বহুমাত্রিক পর্যটন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকার যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ ভ্রমণব্যবস্থা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, ইকো-রিসোর্ট, ভিউপয়েন্ট, ট্র্যাকিং রুট, ক্যাম্পিং জোন, নৌভ্রমণ সুবিধা, ডিজিটাল গাইডিং ব্যবস্থা এবং আধুনিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সেবা নিশ্চিত করে, তাহলে পর্যটকদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পর্যটন মৌসুম দীর্ঘ হবে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সারা বছর ধরে সচল থাকবে। পর্যটনের বিকাশের সবচেয়ে বড় সুফল আসে কর্মসংস্থানে। একটি পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পর্যটক গাইড, নিরাপত্তা, কৃষি, খাদ্য সরবরাহ, হস্তশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ফটোগ্রাফি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ অসংখ্য খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গাইড, আতিথেয়তা ব্যবস্থাপক, ভাষা বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের বিকাশেও পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্য, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, হস্তশিল্প, স্থানীয় ফলমূল, মধু, মসলা, আদা-হলুদ এবং কৃষিপণ্যের বাজার বহুগুণ সম্প্রসারিত হবে। এতে স্থানীয় উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়লে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক ক্ষমতায়নও ত্বরান্বিত হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পিত পর্যটন অঞ্চল, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কর-সুবিধা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পর্যটন অবকাঠামো, হোটেল, রিসোর্ট এবং বিনোদন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। এর ফলে সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রবাহ (Multiplier effect) সৃষ্টি হবে। উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপ অবশ্যই পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাহাড় কাটা, বন উজাড়, জলাধার দখল কিংবা জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে না। তাই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন সংরক্ষণ এবং জলসম্পদ রক্ষায় কঠোর নীতি অনুসরণ করতে হবে। ইকো-ট্যুরিজম ও দায়িত্বশীল পর্যটনের নীতি অনুসরণ করলে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে। সুশাসন এই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আইনশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যটন খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। অনলাইন বুকিং, ভার্চুয়াল ট্যুর, বহুভাষিক মোবাইল অ্যাপ, স্মার্ট পর্যটন তথ্যকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উন্নয়নের সুফল যেন স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছায়। স্থানীয় জনগণের মতামত, অংশগ্রহণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে উন্নয়ন হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং গ্রহণযোগ্য। এতে সামাজিক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও বিনিয়োগের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামকে শুধু একটি সুন্দর ভ্রমণস্থল হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটিকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি সমন্বিত পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান, আধুনিক অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির সমন্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগামী দিনের বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সময়ের দাবি একটাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের অপরিসীম সম্ভাবনাকে আর অবহেলা নয়। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে পর্যটন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশের অভিযাত্রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে উজ্জ্বল অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র।
এম মহাসিন মিয়া
অক্টোবর ১১, ২০২৬
0
একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই-বা কার? সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯টি শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮টি শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না। সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা একধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর। ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। শিশুরা নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সব সময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে। জিডি নেয়াই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন। সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক। প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেউ তাঁদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে, তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি। একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে। ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে। হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে। এটি শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ—বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও। শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম—সবারই ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়। এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয়—সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে। শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে। শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়, ‘শিশুটি কোথায়?’ আরও জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?’ আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
নিকোলাস বিশ্বাস
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
কখনো কখনো একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না। সেটি আমাদের চারপাশের সমাজকে নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে এনে দেয়। কুমিল্লার ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাটি তেমনই একটি প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের দায় যার, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে আমার মনে আরেকটি প্রশ্ন আসে, হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়? নিরাপত্তা কি শুধু বাবা-মায়ের দায়িত্ব? একজন মা তাঁর সন্তানকে যতই সতর্ক করুন, তিনি তো প্রতিটি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। একজন বাবা সন্তানকে বিপদ চিনতে শেখাতে পারেন, কিন্তু সন্তানের চারপাশের প্রত্যেক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। শিশু যখন বাড়ির বাইরে যায়, তখন তার নিরাপত্তার একটি অংশ অদৃশ্যভাবে নির্ভর করে সেই সমাজের ওপর, যার মধ্য দিয়ে সে চলাচল করে। পাশের দোকানদার তাকে চেনেন কি না। প্রতিবেশী তাকে দেখলে খেয়াল করেন কি না।স্কুলের শিক্ষক জানেন কি না সে কার সঙ্গে মিশছে। স্থানীয় মানুষজন কোনো অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে সেটি গুরুত্ব দেন কি না। অর্থাৎ একটি শিশুর চারপাশে নিরাপত্তার একটি সামাজিক বলয় থাকার কথা। প্রশ্ন হলো, সেই বলয় কি আগের মতো শক্ত আছে? শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে, ঝুঁকি সাধারণত একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির যুব সহিংসতা-বিষয়ক গবেষণা-ভিত্তিক কাঠামোতে ব্যক্তি, পরিবার, সম্পর্ক, স্কুল, কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সমাজ — সব স্তরের ঝুঁকি ও সুরক্ষামূলক বিষয় বিবেচনা করা হয়। একই গবেষণায় দেখা যায়, পরিবার বা পরিবারের বাইরের দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ, বাবা-মায়ের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারা এবং স্কুলে ইতিবাচক সম্পর্ক কিশোরদের জন্য সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু নজরদারির বিষয় নয়। সংযোগও নিরাপত্তা। একটি শিশু যদি জানে, বিপদে পড়লে কার কাছে যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে এবং কে তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে, তাহলে তার চারপাশে একটি অদৃশ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি হয়। এই জায়গাটিই হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। তবে আগের দিনের সমাজকে নিখুঁত করে দেখার কোনো কারণ নেই। তখনো অপরাধ ছিল, ঝুঁকি ছিল, শিশু নির্যাতন ছিল। তবু একটি বিষয় ছিল, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ একে অন্যকে চিনত। একটি শিশু কার সন্তান, কোন বাড়িতে থাকে, কোন স্কুলে পড়ে, এসব তথ্য অনেকের জানা থাকত। এখন শহুরে জীবনে আমরা একই ভবনে থাকি, কিন্তু একে অন্যকে চিনি না। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে জানি না। আমাদের সন্তানের সঙ্গে কারা মিশছে, সব সময় জানি না। আমাদের সন্তানের বন্ধুর বড় ভাই কে, সে কোথায় যায়, কী করে—এসবও অনেক সময় আমাদের অজানা থেকে যায়। এটি শুধু সামাজিক পরিবর্তন নয়; এটি নিরাপত্তার কাঠামোকেও বদলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার থেকে কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশ পর্যন্ত একাধিক স্তরে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ শিশুর সুরক্ষা কোনো একক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের আরেকটি বিষয় ভাবায়, প্রথম দিকে ঘটনাটি আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে তদন্তে অপ্রতিমের সঙ্গে তার চেয়ে বয়সে বড় কয়েকজনের যোগাযোগ, কথিত বন্ধুত্বের বিষয়ও সামনে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে। তদন্তকারীরা এ সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। এ তথ্যগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। শিশুর নিরাপত্তা শুধু অপরিচিত মানুষ থেকে তাকে দূরে রাখার বিষয় নয়। আমাদের পরিচিত মানুষদের সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কার কথায় কোথাও যাচ্ছে, কে তাকে প্রভাবিত করছে—এসব নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে এমন সম্পর্ক থাকা দরকার, যেখানে শিশু ভয় না পেয়ে সত্যি কথা বলতে পারে। কারণ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কখনো কখনো শিশুকে আরও গোপনীয় করে তুলতে পারে। নিরাপত্তার জন্য তাই শুধু নজরদারি নয়, প্রয়োজন বিশ্বাসের সম্পর্ক। একটি শিশুকে রক্ষা করার জন্য আমাদের হয়তো আরও বেশি সিসিটিভি দরকার, আরও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা দরকার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি দরকার। কিন্তু এর পাশাপাশি দরকার মানুষ। এমন শিক্ষক, যিনি বুঝতে পারবেন কোনো শিশু হঠাৎ বদলে গেছে। এমন বাবা-মা, যাঁদের সঙ্গে সন্তান নিজের অস্বস্তির কথা বলতে পারে। এমন প্রতিবেশী, যিনি কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে ‘এটা আমার বিষয় নয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। এমন কমিউনিটি, যেখানে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে মানুষ প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবে না; এবং এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে একটি শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ, নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না। নিরাপত্তা তৈরি হয় সম্পর্ক দিয়ে। অপ্রতিমের মৃত্যুর পর হয়তো অনেক বাবা-মা সন্তানকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করবেন। কোথায় যাবে, কার সঙ্গে যাবে, কখন ফিরবে—সবকিছু আরও কঠোরভাবে নির্ধারণ করবেন। তাঁদের ভয়কে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমরা যদি প্রতিটি ট্র্যাজেডির পর শিশুদের স্বাধীনতা কমিয়ে দিই, অথচ সমাজের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন না তুলি, তাহলে আমরা সমস্যার বোঝা শিশুর ওপরই চাপিয়ে দিই। একটি শিশু কেন স্বাধীনভাবে বাইরে যেতে পারবে না? কেন তাকে সব সময় ভয় নিয়ে চলতে হবে? কেন নিরাপদ থাকার জন্য তার পৃথিবী ছোট করতে হবে? বরং আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারি না, যেখানে একটি শিশু স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠবে এবং একই সঙ্গে তার চারপাশে থাকবে দায়িত্বশীল মানুষের একটি নিরাপত্তার বলয়? অপ্রতিমকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। তার পরিবার যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, সেটিও কোনো বিচার পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যদি আমরা শুধু অপরাধীর শাস্তি দাবি করে থেমে যাই, তাহলে একটি বড় সুযোগ হারাব। আমাদের দেখতে হবে কোথায় কোথায় সামাজিক সংযোগ দুর্বল হচ্ছে। কোথায় শিশুরা বড়দের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কোথায় কমিউনিটি একে অন্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছে। কোথায় আমরা নিরাপত্তাকে শুধু ক্যামেরা, তালা আর পাহারার মধ্যে সীমাবদ্ধ করছি। কারণ, একটি শিশুর নিরাপত্তার প্রথম প্রাচীর সব সময় দেয়াল নয়। কখনো সেটি একজন মা। কখনো একজন শিক্ষক। কখনো একজন প্রতিবেশী। কখনো একজন বন্ধু। কখনো এমন একজন অপরিচিত মানুষ, যিনি বিপদ দেখে এগিয়ে আসেন। অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে না; এটি আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোরও হিসাব চায়। আমরা কি এখনো এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে পথে একটি শিশুকে দেখলে তাকে শুধু ‘অন্যের সন্তান’ বলে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে নিজের সন্তানের মতো নিরাপদে বাড়ি ফেরার দায়িত্বটুকু অনুভব করি? নাকি পাশাপাশি বসবাস করতে করতে আমরা এতটাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি যে, একটি শিশুকে ঘিরে আজও অনেক মানুষ থাকে, অথচ তাকে আগলে রাখার মতো একটি সামাজিক নিরাপত্তার বলয় থাকে না? অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। তবে একই সঙ্গে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক নিরাপত্তার বলয়টিকেও পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ, একটি শিশুকে নিরাপদ রাখা কেবল তার ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ, যেখানে একটি শিশুর নিরাপত্তা তার পরিবারের একার দায়িত্ব না হয়ে আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে।
জয়া মাহবুব
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান জরুরি। কিন্তু একটি দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কতটা সফল, তা শুধু কতজন গ্রেপ্তার হলেন, কতটি মামলা হলো কিংবা কত টাকার সম্পদ জব্দ করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে দুর্নীতির সুযোগ কতটা কমেছে, সরকারি অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ হয়েছে এবং ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ কতটা সমান হয়েছে, তার ওপর। দুর্নীতির অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা ব্যবস্থার পরিবর্তন দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে; দ্বিতীয়টি ভবিষ্যতে অনিয়মের সুযোগ কমায়। তাই কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের জন্য অপরাধের তদন্ত ও শাস্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার কিংবা নতুন সংস্কার উদ্যোগের পরও নাগরিকেরা যদি সরকারি সেবা পেতে ঘুষ ও হয়রানির মুখোমুখি হন, তাহলে দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। সমস্যাটি শুধু ব্যক্তির অসততায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অস্বচ্ছতা, অভিযোগ নিষ্পত্তির দুর্বলতা এবং অনিয়মের প্রতিকার নিশ্চিত করতে না পারাও এর সঙ্গে যুক্ত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপের ফল প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ২৫ জুন। জরিপ অনুযায়ী, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। ঘুষ দিতে হয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারকে। জরিপে ২০২৩ সালের তুলনায় দুর্নীতির অভিজ্ঞতা এবং ঘুষের শিকার পরিবারের অনুপাত যথাক্রমে ১৫ দশমিক ১ ও ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। জরিপে ২০২৫ সালে ঘুষের মোট আনুমানিক পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি জরিপের আওতাভুক্ত সেবাখাতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা জাতীয় হিসাব, দেশের সব ধরনের দুর্নীতির মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাপ নয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার সরকারি অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা সম্পর্কে জানে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির শিকার হওয়ার পাশাপাশি প্রতিকার পাওয়ার পথ সম্পর্কেও নাগরিকদের বড় অংশের ধারণা সীমিত। এই বাস্তবতা দেখায়, শুধু আইন প্রণয়ন বা অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। নাগরিককে এমন একটি ব্যবস্থা দিতে হবে, যেখানে ঘুষ ছাড়াই সেবা পাওয়া সম্ভব, অভিযোগ জানানো নিরাপদ এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়। সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্প দুর্নীতি প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতার অভাব, পক্ষপাতমূলক শর্ত, স্বার্থের সংঘাত এবং কাজের মান যাচাইয়ে দুর্বলতা সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব সমস্যা মোকাবেলায় শুধু অনিয়মের পর তদন্তের ওপর নির্ভর না করে ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে সরকারি ক্রয়বিধি, ২০২৫ কার্যকর হয়েছে। এতে সরকারি ক্রয়ে ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক ব্যবহার, চুক্তির প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় প্রকাশ এবং প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিভিন্ন বিধান রয়েছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে বিধিমালা কার্যকর হওয়া আর তার সুফল বাস্তবে পাওয়া এক বিষয় নয়। দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ছে কি না, চুক্তির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে কি না এবং প্রকল্প নির্ধারিত ব্যয় ও মান অনুযায়ী সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। অনিয়ম শনাক্ত হলে দ্রুত প্রতিকার ও দায় নির্ধারণও নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু আইনগত ক্ষমতার ওপর নয়, সেই ক্ষমতা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগের সক্ষমতার ওপরও। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার নৈকট্য যেন তদন্তকে প্রভাবিত না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই আইনি মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হবে।একই সঙ্গে কমিশনের স্বাধীনতার অর্থ জবাবদিহির বাইরে থাকা নয়। তদন্ত হতে হবে প্রমাণনির্ভর, মামলা হতে হবে আইনসম্মত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য বিচারের অধিকার সুরক্ষিত থাকতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি এই ধারাবাহিকতাই দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদের বিবরণ দাখিলের ব্যবস্থাও দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বিবরণ জমা নেয়া যথেষ্ট নয়। ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য যাচাই, স্বার্থের সংঘাত শনাক্ত এবং অসংগতি পাওয়া গেলে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। একইভাবে, সরকারি নিরীক্ষায় অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর সুপারিশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তারও হিসাব রাখা জরুরি। নিরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের কার্যকর পদ্ধতি না থাকলে নিরীক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে। ২০২৫ সালের ২০ জুন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি উন্নত করার লক্ষ্যে ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। এর আওতায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয়, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং নিরীক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে। তবে অর্থায়ন অনুমোদনকে সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। বাস্তবায়নের অগ্রগতি, অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং নাগরিকের কাছে সুফল পৌঁছানোর ভিত্তিতেই এর সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারে চারটি অগ্রাধিকার বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রথমত, সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, চুক্তি এবং অগ্রগতির তথ্য জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণ ও স্বার্থের সংঘাত যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহির কাঠামো দিতে হবে। চতুর্থত, নাগরিকের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ সুযোগ, অভিযোগের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা এবং প্রতিকার না পেলে পুনর্বিবেচনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য নিয়মিত কিছু সূচকও প্রকাশ করা দরকার। যেমন কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মের কত অংশের প্রতিকার হয়েছে, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা কতটা বেড়েছে এবং সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের অভিজ্ঞতা কমছে কি না। এসব তথ্য প্রকাশিত হলে সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের পক্ষে সংস্কারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃঢ়তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই দৃঢ়তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর তার ওপর। ব্যক্তি ও সরকার পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু নিয়ম, তদারকি ও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল থাকলে একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু কতজন শাস্তি পেলেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, সরকারি অর্থের অপচয় কমেছে কি না, অভিযোগের প্রতিকার কার্যকর হয়েছে কি না এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে কি না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে; আর দুর্নীতির ব্যবস্থা বদলে দেয় সেই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর পথ। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন অভিযানের পাশাপাশি এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে অনিয়ম গোপন রাখা কঠিন, জবাবদিহি এড়ানো অসম্ভব এবং আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান।
এলিন মাহবুব
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি, পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান সংকটের প্রেক্ষাপটে, তখন একটি শব্দ বহুল আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো গ্রিন ইকোনমি বা সবুজ অর্থনীতি। গ্রিন ইকোনমি এখন সময়ের দাবি। গ্রিন ইকোনমি বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় পরিবেশকে ক্ষতি না করে। এখানে সামাজিক কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব শিল্প-কারখানা, জৈব কৃষি, টেকসই বনায়ন এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহার—এসবই গ্রিন ইকোনমির মূল স্তম্ভ। ভবিষ্যৎ বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে গ্রিন ইকোনমির বিকল্প নেই। গ্রিন ইকোনমির মূল ক্ষেত্রসমূহ ও সমস্যাগুলো হলো— নবায়নযোগ্য জ্বালানি : বাংলাদেশে গ্রিন ইকোনমির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌরশক্তি ব্যবহারের জন্য অনুকূল। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সৌর হোম সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বায়োগ্যাস, বায়ুশক্তি এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ বেশি প্রয়োজন হয়। যেটা আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কঠিন। তার ওপর প্রযুক্তির ঘাটতি, দক্ষ জনবল, সুষ্ঠু পরিকল্পনা তো আছেই। তবে যত দ্রুত সম্ভব জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনা জরুরি। নাহয় জীবাশ্ম জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও গ্রিন বিল্ডিং : গ্রিন বিল্ডিং হলো এমন একটি ভবন, যেটি তৈরি করার সময় এমনভাবে তৈরা করা হয়, যাতে পরিবেশের ক্ষতি না করে জ্বালানি ও সম্পদ সাশ্রয় করে। এখানে নবায়নযোগ্য ও সৌরশক্তি ব্যবহার হয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এলইডি লাইট ব্যবহার হয়, বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা হয়, পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়, বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয় এবং ছাদে নানা ধরনের গাছপালা লাগানো হয়। গ্রিন ইকোনমিকে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হলেও এখনো আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বেশি দেখা যায়। পোশাক কারখানা গ্রিন হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অন্যান্য শিল্প-কারখানা (যেমন : চামড়া, ডাইং, প্লাস্টিক) মারাত্মকভাবে নদী ও পরিবেশ দূষণ করছে। যেটি পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশের শহরগুলোতে,বিশেষ করে ঢাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার টন ময়লা তৈরি হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় দিনশেষে এগুলো যায় কোনো না কোনো খালে বা জলাশয়ে।ফলাফল দেখা যায় নদী দূষণ, জলজ প্রাণীর মৃত্যু। আবার প্লাস্টিক, পলিথিন যত্রতত্র ফেলার ফলে হালকা বর্ষনেই দেখা দেয় নগর বন্যা। সুতরাং পরিবেশের ভারসাম্য রাখার জন্য সঠিকভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে পরিবেশ দূষণ কমানো দরকার। টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা : টেকসই পরিবহন হলো এমন একটি পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও বায়ুদূষণ কমায় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমায়। এটি সবার জন্য নিরাপদ। এর মূল মাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল বা বৈদ্যুতিক বাস, সাইকেল চালানো বা হাঁটা। টেকসই পরিবহনের জন্য দূরপাল্লার পরিবহনে সড়কপথের ওপর চাপ কমিয়ে সাশ্রয়ী নৌপথ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তাহলে সড়ক পথে যানজট কমবে। পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণও কমবে। টেকসই কৃষি ও বনায়ন : টেকসই কৃষি ও বনায়ন হলো এমন ব্যবস্থা, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে দীর্ঘ মেয়াদে কৃষিকাজ করা হয়। টেকসই কৃষিতে পরিবেশেবান্ধব জৈব সার, কীটনাশক ও আধুনিক কৃষিব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হয়। অন্যদিকে টেকসই বনায়নের মাধ্যমে বন সংরক্ষণ, নতুন গাছ লাগানো, বন উজাড় রোধ, সামাজিক বনায়ন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হয়। টেকসই কৃষি ও বনায়ন গ্রিন ইকোনমির অন্যতম ভিত্তি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, কেননা এটি একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে। গ্রিন ইকোনমি কোনো বিলাসিতা নয় বরং টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সংকট মোকাবেলার অপরিহার্য পথ। কারণ পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন হয়, সেটা সাময়িক এবং তা ঘনিয়ে আনে চরম বিপর্যয়। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহ দেশের অর্থনীতি ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই বাংলাদেশের জন্য গ্রিন ইকোনমি অপরিহার্য। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, শিল্প-কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করতে হবে, সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, গণপরিবহন ও রেলপথ সম্প্রসারণ করতে হবে এবং জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি এসব কঠোরভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা তদারক করতে হবে। তাহলেই আগামীতে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে উঠবে।
খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
একবিংশ শতকে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হলো দক্ষিণ চীন সাগর। প্রতিবছর এই বাণিজ্যিক জলপথ দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিচালিত হয়। এ জন্য দক্ষিণ চীন সাগর শুধু একটি সাগর নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক, খনিজ সম্পদ ও ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এই অঞ্চল ঘিরে অনেক রাষ্ট্র রয়েছে, তার মধ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ, যার ফলে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। দক্ষিণ চীন সাগরের কৌশলগত গুরুত্বের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। এখানে প্রচুর পরিমাণে খনিজ ও জ্বালানি পদার্থ থাকায় এটি চীনের জন্য একটি অর্থনৈতিক জোন। দক্ষিণ চীন সাগরের আয়তন হলো প্রায় ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটার। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে ১১০০ কোটি ব্যারেল খনিজ তেল মজুদ আছে এবং প্রায় ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ আছে। চীন যেহেতু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক উন্নত এবং চীনের বাণিজ্যিক পদ্ধতি হলো রপ্তানি পদ্ধতি, সেহেতু চীনের অধিক পরিমাণ জ্বালানি অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সে ক্ষেত্রে চীনের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পেট্রোলিয়াম নেই। দক্ষিণ চীন সাগরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পেট্রোলিয়াম থাকায় চীন এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগর মৎস্য সম্পদের ঘাঁটি। ফাও (FAO) এর তথ্যমতে, পুরো বিশ্বের চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ মাছ এই অঞ্চলে রয়েছে। এই অঞ্চল দিয়ে যে সমুদ্র বাণিজ্য হয়, তা বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পুরো বিশ্বের বাণিজ্য পথের প্রায় ২০ শতাংশ। এত লভ্যাংশ কোনো দেশই ছেড়ে দেয় না। একটি দেশ শক্তিশালী ও উন্নত হতে তার সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা প্রয়োজন। দক্ষিণ চীন সাগরের সিংহভাগ চীন দাবি করে এবং আশপাশের দেশের অংশটুকুও চীনের দখলদারত্বে রয়েছে। কিন্তু সেই দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। দেশগুলো হলো তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ব্রুনাই। চীন দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকার ওপর ঐতিহাসিক অধিকারের দাবি করে, যা ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ নামে পরিচিত। ১৯৪৭ সালে প্রথম চীন এগারো ড্যাশ লাইন তৈরি করে। ২০২৩ সালে এসে টেন ড্যাশ লাইন দিয়ে তাইওয়ানকে নিজের দখলে নিতে চাচ্ছে চীন। চীনের দেয়া এসব দাবির সঙ্গে একমত নয় বাকি দেশসমূহ। ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত চীনের দাবির বিপক্ষে রায় দিলেও চীন তা প্রত্যাখ্যান করে। দক্ষিণ চীন সাগরে অনেক ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। সেই দ্বীপগুলো বিভিন্ন দেশের হওয়া সত্ত্বেও চীন সেখানে দখলদারত্ব করে জনসংখ্যাপূর্ণ দ্বীপগুলোকে নিজের আওতায় এবং যে দ্বীপে পানি ছিল, সেখানে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে মিলিটারি জোন স্থাপন করে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক দিয়ে উদীয়মান শক্তিশালী রাষ্ট্র চীন। চীনের অর্থনীতির সিংহভাগ আমদানি ও রপ্তানি নির্ভরযোগ্য। চীনের এক পাশ ল্যান্ড লক হওয়ায় বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্য হয় সমুদ্রপথে। সমুদ্রপথ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একটি সহজ বাণিজ্যিক পন্থা। চীনের বড় সমুদ্রবন্দর দক্ষিণ চীন সাগরের সাথে, যা দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করে। পশ্চিম এশিয়া থেকে জ্বালানি একই পথে চীন আমদানি করে। এই সাগর ইউরোপ, আফ্রিকার পথে সংযোগ পথ সৃষ্টি করে। এই সাগরের মধ্য দিয়ে চীন বাণিজ্যের অর্ধেকের বেশি পণ্য ও সামুদ্রিক পথে আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে বেইজিংয়ের ওপর আক্রমণ করতে পারে, তাই চীনের এই পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাবমেরিন দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দেয়া প্রয়োজন। যেহেতু দক্ষিণ চীন সাগর প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রান্তিক সাগর, সেহেতু দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য সৃষ্টি করা মানে প্রশান্ত মহাসাগরের অঞ্চলগুলোতে প্রভাব বিস্তার করা। তাই দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করাসহ নানা কর্মকাণ্ড প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের জন্য উদ্বেগের এবং দক্ষিণ চীন সাগর চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত সামরিক টহল পরিচালনা করছে। ওয়াশিংটনের দাবি অনুসারে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় সব দেশের নৌযান অবাধে চলার অধিকার রয়েছে। তাই দক্ষিণ চীন সাগর একটি বৈশ্বিক বিরোধী। কারণ, চীনের নিজস্ব মত অনুযায়ী, তারা একনায়কতন্ত্র আধিপত্য সৃষ্টি করতে চায়, অবাধ যান চলাচলে চীনের ওপর হুমকি আসার আশঙ্কা রয়েছে। এই আশঙ্কাকে যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে রূপ দিতে চাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তাই বিভিন্ন আইন জনসমক্ষে হাজির করছে এবং তারা ওই অঞ্চলে অবাধ নৌ চলাচল ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্র বাণিজ্য দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর নির্ভরশীল মাত্র ১৪ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরের আধিপত্য বিস্তার করার মূল লক্ষ্য সামরিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা, উদীয়মান আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে চীনকে রুখে দেয়া, দক্ষিণ চীন সাগরের বিপুল সম্পদ করায়ত্ত করা। এই প্রতিযোগিতায় শুধু দেশগুলো বিরাজ করছে না বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতেও একটি কালো ছায়া বিরাজ করছে। বর্তমানের বিশ্ব ব্যবস্থায় জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দক্ষিণ চীন সাগরের সাথে জড়িত। যদি এই অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের সংঘাত হয়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে এবং পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব সমস্যার সমাধানে শান্তিপূর্ণ সংলাপ, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
জান্নাতুল ফেরদৌস আনান
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। এখন কর্তব্য অবহেলাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া বা তার পক্ষে সাফাই গেয়ে তাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে সেটি নেহাতই অপপ্রয়াস। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের সামনে দাঁড়ানো সেই আয়না, যা আমাদের সিস্টেমের নগ্নতাকে রূঢ়ভাবে প্রকাশ করে। এ সত্যের দর্পণে আমরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসার মান, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও দেখতে পাই। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর এক নামি-দামি হাসপাতালে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের করুণ মৃত্যু চিকিৎসাব্যবস্থায় কথিত অবহেলা নিয়ে জনমনে আবারও একটি ভয়ংকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের এই তথাকথিত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটুকু নিরাপদ? আভানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুরোনো শঙ্কাকে নতুন করে সামনে আনলেও এর সিলসিলা বহুকাল ধরে জারি রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর প্রসবব্যবস্থা, শিশুর অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং এ সম্পর্কে উদাসীনতা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। সিস্টেমের নগ্ন মারপ্যাঁচের খেসারত ইতোমধ্যে হামের মহামারির মধ্য দিয়ে দেশের অগণিত শিশু জীবন দিয়ে চুকিয়েছে। সেই রেশ মিটতে না মিটতেই আভানের ঘটনা জনমনে ভয়ংকর ধাক্কা দিয়েছে। শিশুটির পরিবারের পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রয়োগে গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার নেগেটিভ ফল আসার পরও কেন শিশুটিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হলো, কেন তার শারীরিক অবস্থার প্রকৃত হালচাল পরিবারের কাছে গোপন করা হলো, এসব প্রশ্ন কেবল আভানের পরিবার নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারকেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া, মনে আতঙ্কের ঢেউ। আভানের মৃত্যুর নেপথ্যে আসল কোন সত্য লুকিয়ে আছে, চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল কি না, শিশুটিকে দেয়া চিকিৎসা সিদ্ধান্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, এসবের জবাব কেবল সঠিক তদন্তেই উদঘাটন সম্ভব। তাই অভিযোগ সত্য ধরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও অন্যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য উদঘাটনের অধিকার। আর এই অধিকার জনগণের। জনগণের এই যৌক্তিক দাবিকে মাথা পেতে নিয়ে সঠিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করাই একটি দক্ষ রাষ্ট্র প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। একজন রোগীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারের প্রথম স্বাভাবিক কৌতূহল হবে, ‘কেন?’ অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ‘কেন’র জবাব খুঁজে পাওয়ার পথ মোটেও স্বচ্ছ ও সরল নয়, বরং অস্বচ্ছতায় ভরা এক প্যাঁচালো গোলকধাঁধা। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, হাসপাতালের আইসিইউসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যক্তিদের মুনাফালিপ্সার মতো অভিযোগও আলোচনায় আসে। প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক, চিকিৎসা কি কেবল সেবা, নাকি অধিকার? বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৬.৫, যা ২০২৪ সালে হ্রাস পেয়ে ৩০.৫ এ দাঁড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এই অগ্রগতি একই সঙ্গে আমাদের সামনে নতুন দায়িত্বের ভিত তৈরি করেছে। শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারা যদি প্রথম সাফল্য হয়, তবে তার পরের সাফল্য হবে নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে প্রায় ২২। অর্থাৎ শিশুমৃত্যু কমলেও ঝুঁকি আজও রয়ে গেছে। তবে এই ঝুঁকি কেবল রোগের নয়, ব্যবস্থারও। ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অদক্ষতা, ওষুধের ভুল প্রয়োগ, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবারের কাছে গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক মানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্বাস্থ্যসেবা বলতে কেবল হাসপাতাল তৈরি করে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরে তোলাকে বোঝায় না। কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল বিষয় হলো সঠিক রোগ নির্ণয়, দক্ষ জনবল, যথাযথ চিকিৎসা প্রোটোকল, পর্যবেক্ষণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভুল হলে তার সঠিক জবাবদিহি। চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানও আমাদের দেশের অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। ২০২৫ সালের ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫৪/১০০ এবং প্রায় ৪১.৭ শতাংশ মানুষ নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর আরেকটি বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রকাশনায় দেখা যায়, দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজেকেই বহন করতে হয়। অতএব, মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সময় কেবল অসুস্থতার ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকির এক অদৃশ্য মানসিক বোঝাও বহন করে। একটি শিশুর চিকিৎসা ব্যর্থ হলে পরিবার কেবল সন্তানকে হারায় না, অনেক পরিবার একই সঙ্গে হারায় সঞ্চয়, ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়, এমনকি জীবনের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর্থিক বিনিময়ে যে চিকিৎসাসেবা আমরা পাই, তার সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, আস্থা ও মৌলিক অধিকার। পৃথিবীর কোনো দেশেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে গরমিল একেবারেই নেই, এমন নয়। একজন চিকিৎসকও রক্তমাংসে গড়া মানুষ। রোগ নির্ণয়ে জটিলতা থাকতেই পারে। চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাও বলে, চিকিৎসাজনিত জটিলতা ও অবহেলা এক নয়। সুতরাং এগুলোকে ‘লেজে গোবরে মেখে’ এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো রোগী মারা গেলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসককে দায়ী করাও ভুল, আবার ভুল চিকিৎসা বা কর্তব্য অবহেলার অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও অগ্রহণযোগ্য। এই ধোঁয়াশা দূর করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো। ২০২৬ সালের প্রকাশিত এক আইনবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে রোগীর পরিবারের কাছে তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চিকিৎসাজনিত অ্যাডভার্স ইভেন্ট প্রকাশের জন্য বর্তমানে সুস্পষ্ট স্ট্যাটুটরি ডিউটি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। এখানেই এখন বিশেষভাবে ভাবতে হবে। রোগীর স্বজন তাদের সন্তান বা স্বজনের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে তার সঠিক জবাব পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ‘এটা জটিলতা ছিল’ অথবা ‘আমরা সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী করেছি’ বলে দায়সারা জবাব দিয়ে দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। রোগীর পরিবারের সংশয় কাটাতে চিকিৎসার নথি, ওষুধের তালিকা, পরীক্ষার ফল, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা ও নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক অভিযোগ দাখিল করার পর কতটা সহজে, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিকার পাবেন? শুধু অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়। গুরুতর চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নথি সংরক্ষণ এবং পরিবারের কাছে তা প্রদানের নিশ্চয়তা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, হাসপাতাল ও চিকিৎসকের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ, অবহেলা প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি মানে চিকিৎসকদের ভয় দেখানো নয়, বরং ভুলের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসার পরিবেশ তৈরি করা। আমাদের মাঝে সামাজিক স্মৃতির এক অদ্ভুত সমস্যা বিরাজমান। একটি শিশু মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম নেয় ক্ষোভ। মানুষ বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। কয়েক দিন কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়। অতঃপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে ভুলিয়ে দেয়। হিসাবের খাতায় যোগ হয় কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু ওই সংখ্যার নেপথ্যে থাকে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। আভান হয়তো কোনো পরিসংখ্যানের একটি অংশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরিবারের কাছে সে নিছক কোনো সংখ্যা নয়। সে ছিল একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী। এই আবেগটাকেই রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। হতে হবে সংবেদনশীল। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য বলতে কয়টি হাসপাতাল মাথা তুলেছে, কতটি অত্যাধুনিক আইসিইউ আছে, কতজন দক্ষ চিকিৎসক আছেন, শুধু তা দিয়ে সাফল্য বিচার করলে গোটা গণিতটাই ভুল হবে। এই সাফল্য পরিমাপ করতে হবে একজন সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা অকপটে বলতে পারছেন কি না এবং সত্য জানতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে কি না, তার ওপর। একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে রোগীকে শুধু রোগী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হয়। আমরা চাইব, আভানের মৃত্যুর এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায় দ্রুত নির্ধারিত হোক। অভিযোগে অসততা থাকলে সেটিও সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠুক। তবে কোনো অবস্থাতেই সত্যকে যেন আরেকটি শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কবরের আঁধারে দাফন হতে না হয়। কারণ, আজকের প্রশ্নটি শুধু আভানের জন্য নয়, আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্য। ‘হাসপাতালের ফটক পেরুলে একজন নাগরিক কি কেবলই চিকিৎসাটুকুই পাবেন, নাকি তার সঙ্গে নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারেরও ন্যায্য ভাগীদার হবেন?’ এ প্রশ্নের জবাব না মিললে অঢেল উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার মাঝেও প্রশ্নটি আমাদের উত্ত্যক্ত করেই চলবে, ‘আমরা কি তবে সব সময়ই শেষ অবধি কেবল হিসাবের খাতার এক মামুলি সংখ্যাই রয়ে যাব?’
সোনিয়া তাসনিম
অক্টোবর ৭, ২০২৬
0
কুড়িগ্রামের মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে সংকট কোনো নতুন শব্দ নয়। নদীভাঙন, বন্যা, দারিদ্র্য কিংবা কর্মসংস্থানের অভাব—এসবের সঙ্গে এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই করে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংকটের ধরনও বদলেছে। এখন কৃষকের দুশ্চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার পাওয়ার অনিশ্চয়তা, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম, তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকের বিস্তার এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। প্রশ্ন হলো এত সংকটের মধ্যেও কুড়িগ্রামের মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটি কোথায়? সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সারের সংকট। আমন মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাটেও সারের দাবিতে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন। কোথাও কৃষকেরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এখানে বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখা দরকার। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেলায় সারের বরাদ্দ ও সরবরাহ রয়েছে এবং অতিরিক্ত চাহিদা, বিতরণব্যবস্থা ও আস্থার সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। আবার কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রয়োজনের মুহূর্তে ডিলারের কাছে গিয়ে তাঁরা সার পাচ্ছেন না। অর্থাৎ কাগজে বরাদ্দ থাকলেই হবে না; সঠিক সময়ে, সঠিক কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোই মূল কথা। একজন কৃষকের কাছে কয়েক দিন দেরিতে পাওয়া সারও অনেক সময় কার্যত না পাওয়ার সমান। কারণ, কৃষির মৌসুম অপেক্ষা করে না। ধান বা সবজির প্রয়োজনীয় সময় চলে গেলে পরে পাওয়া সার দিয়ে সেই ক্ষতি সব সময় পূরণ করা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। অক্টোবরেও এসব দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। কুড়িগ্রামের মতো কৃষিনির্ভর জেলায় এর প্রভাব শুধু পাম্পের তেলের দাম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না। জমি চাষ, সেচ, ফসল পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে। কৃষককে তখন একদিকে সার ও অন্যান্য উপকরণের খরচ সামলাতে হয়, অন্যদিকে উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে বাড়তি পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ কোথায় গিয়ে পড়ে? কৃষক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তা—সবাই তার অংশ বহন করে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্ভবত কুড়িগ্রামের তরুণ সমাজ। আমাদের জেলার বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম। কিন্তু তাদের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে অনেকেই কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে চলে যায়। কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট যে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা, বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তার চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে, জেলায় দারিদ্র্যের হার ৭০.৮ শতাংশ। একজন তরুণ নিজের জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র গেলে সেটিকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। অনেকের জন্য এটি প্রয়োজনের সিদ্ধান্ত। নিজের এলাকায় যদি একটি সম্মানজনক চাকরি, ব্যবসার সুযোগ কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে কেন একজন তরুণ পরিবার ছেড়ে হাজার কিলোমিটার দূরে যেতে চাইবে? আর কর্মসংস্থানের অভাবের সঙ্গে যখন হতাশা যুক্ত হয়, তখন আরেকটি বিপদ সামনে আসে—মাদক ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড। কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ গাঁজা, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক জব্দ হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও ফুলবাড়ী সীমান্তে মাদক জব্দের খবর এসেছে। একই মাসে ফুলবাড়ীতে ট্যাপেন্টাডলসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখলে চলবে না। একজন তরুণ কেন মাদকের দিকে যাচ্ছে, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, বেকারত্ব, হতাশা—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। মাদক ঠেকাতে আইন প্রয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অভিযান দিয়ে একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা যাবে না। তাদের সামনে বিকল্প জীবন তৈরি করতে হবে। খেলাধুলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান—এসবও মাদকবিরোধী লড়াইয়ের অংশ হওয়া উচিত। আরেকটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে ভাবায়—শিক্ষা। একটি জেলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু কুড়িগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের খবর নতুন নয়। রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে ৬০টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৮ জন—৩২টি পদ শূন্য। এতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়েও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের আগস্টের এক প্রতিবেদনে কুড়িগ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩৬৬টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আমরা যদি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে চাই, কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ করে তুলতে চাই, তাহলে প্রথমেই তাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকবিহীন বা শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়-কলেজ দিয়ে দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের পুরোনো চক্র। নদীভাঙনে মানুষ জমি হারায়, বসতভিটা হারায়, কখনো জীবিকার শেষ অবলম্বনটুকুও হারায়। তারপর নতুন জায়গায় গিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। এই বাস্তুচ্যুতি শুধু একটি পরিবারের বর্তমানকে নয়, সন্তানের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করে। তাই কুড়িগ্রামের সংকটকে আলাদা আলাদা বাক্সে রেখে দেখলে হবে না। কৃষকের সারসংকট, জ্বালানির বাড়তি খরচ, কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকের বিস্তার, শিক্ষার দুর্বলতা এবং নদীভাঙন—সবগুলো একে অন্যের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। সমাধানও তাই হতে হবে সমন্বিতভাবে। প্রথমত, কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময় সারের স্বচ্ছ ও কার্যকর বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে, কারা পাচ্ছে এবং কৃষক কেন লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না—এসব প্রশ্নের জবাবদিহি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, কুড়িগ্রামে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। শুধু ধান বা সবজি উৎপাদন করলেই হবে না; সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে। তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সব তরুণ সরকারি চাকরি করবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং কৃষিভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। চতুর্থত, মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে শুধু অভিযাননির্ভর না করে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের নিজেদেরও এতে যুক্ত করতে হবে। সবশেষে প্রয়োজন কুড়িগ্রামকে শুধু সমস্যার জেলা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার জেলা হিসেবে দেখা।কুড়িগ্রামের কৃষি আছে, নদী আছে, সীমান্তবাণিজ্যের সম্ভাবনা আছে, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। সবচেয়ে বড় কথা—এই জেলার মানুষ পরিশ্রম করতে জানে। প্রয়োজন শুধু সেই পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। আমরা কুড়িগ্রামবাসী করুণা চাই না। আমরা চাই সমান সুযোগ। কৃষক যেন প্রয়োজনের সময় সার পান, শ্রমিক যেন কাজ পান, তরুণ যেন নিজের এলাকায় ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন, শিক্ষার্থী যেন শিক্ষক সংকটে পিছিয়ে না পড়ে এবং কোনো পরিবার যেন মাদকের কারণে তার সন্তানকে হারানোর ভয় না পায়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা। কুড়িগ্রামের মানুষ বহুদিন ধরে সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। এখন সময় শুধু সংকট গুনে যাওয়ার নয়; সংকটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটার। কুড়িগ্রাম পিছিয়ে থাকার জেলা নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগ পেলে এই জেলাই হতে পারে উত্তরের সম্ভাবনার অন্যতম কেন্দ্র। প্রশ্নটা তাই কুড়িগ্রাম কতটা পিছিয়ে—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কুড়িগ্রামকে এগিয়ে নিতে আমরা এখন কতটা আন্তরিক?
হেদায়েতুল ইসলাম খান
অক্টোবর ৭, ২০২৬
0
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সম্ভাব্য উপস্থিতি চিহ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রজুড়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর যৌথ অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফল বলছে—বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অজানা খনিজ সম্পদের দেশ হিসেবে নতুনভাবে উন্মোচিত হতে চলেছে। এ ক্ষেত্রে সোনাদিয়া খনিজ সম্পদের ওপর একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জার্নাল ডিসকভার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টান বিশ্ববিদ্যালয়; এবং বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোঃ সাকাউথ হোসেন, মোঃ শাহরিয়ার রহমান,গোলাম তকি এবং মাফতিহা জাহান। তাঁদের গবেষণা বাংলাদেশের সোনাদিয়া দ্বীপের ভারী খনিজ পদার্থের ভূ-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং রিজার্ভ অনুমান শীর্ষক দ্বীপের নানান দিক অন্বেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এর ভারী খনিজ সম্পদের আয়তন। গবেষকদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক মূল্য এবং লুকানো মজুদের ভূতাত্ত্বিক তাৎপর্য নিম্নরূপ : সোনাদিয়া কক্সবাজার জেলার মহেশখালী থানার ছোট একটি দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় নয় বর্গকিলোমিটারের বিস্তৃত। দ্বীপটি ম্যানগ্রোভ। উপকূলীয় সমন্বয়ে গঠিত এবং এর চারদিকে পানি। এর পৃষ্ঠের নিচে ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল ও মোনাজাইটের মতো ভারী খনিজ পদার্থের মজুদ আছে। সোনাদিয়ায় এই মূল্যবান খনিজ পদার্থের অনুমানিক মজুদ প্রায় ৭ লাখ টন, যার মধ্যে গারনেট ও ইলমেনাইট সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ১৯৮০ দশক থেকে ভূতাত্ত্বিক জরিপের কাজ শুরু হয়। তবে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) প্রায় ২০ বছর ধরে খনিজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে খনিজের সন্ধান পেয়েছেন। জিএসবি গবেষকদের মতে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহের পাহাড়ি ঢলের আসা পলি, নদী অববাহিকার বালু, জেগে ওঠা চর এবং কয়লা খনি থেকে বিরল বা ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। জিএসবির অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, “২০১৬ সালে যুমনা নদীর বালুতে আমরা ভারী আকরিকের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিরল বা ভারী মৃত্তিকা মৌল পেয়েছি। এবং সঙ্গে কিছু মাত্রায় লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম ও থরিয়াম পেয়েছি।” শুধু তা-ই নয়, দেশের সব কটি নদীতেই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমনকি দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে পাওয়া কয়লা ও ছাইয়েও বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর পরে ধরলা নদীর বালু পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে জিএসপির গবেষকরা স্যামারিয়াম, ইউরেনিয়াম,গ্যাভালিয়াম, টারবিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মত বিরল মৃত্তিকা মৌলের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষক মোঃ আলী আকবর বলেন, মূলত বালুতে থাকা খনিজ মোনাজাইট ও জিরকনের সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা মৌলের উপস্থিতি প্রমাণ মিলেছে। প্রতি কেজি বালুতে ৬০ থেকে ১৭৬ মিলিগ্রাম এসব মৌলের উপস্থিতি পেঁয়েছেন। তবে ধরলা নদীতে পাওয়া বিরল খনিজ বাণিজ্যিকভাবে কতটা উত্তোলনযোগ্য, তা জানাতে পারেননি জিএসবি গবেষকরা। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ১০০ মিলিগ্রামের ওপর হলে উত্তোলনযোগ্য হয়। দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়ায় গবেষকরা কয়লা গবেষণা করে দেখেছেন, পোড়া কয়লা ছাইয়ের ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিগ্রাম বিরল খনিজের উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকরা সোনাদিয়ার বালি গবেষণা করে দেখেছেন ৫১.৫২ শতাংশ গারনেট, ৩৮.১৪ শতাংশ ইলমেনাইট, ৫.৭৪ শতাংশ ম্যাগনেটাইট, ১.০১ শতাংশ জিরকন, ৩.৫৭ শতাংশ রুটাইল এবং ০.১ শতাংশ মোনাজাইট পাওয়া যায়। বেশ কয়েক বছর যাবৎ স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ে জরিপে ব্রহ্মপুত্র ও যুমনা নদীর বালুতে রুটাইল, গারনেট, জিরকন, ম্যাগনেটাইটসহ মূল্যবান খনিজ পদার্থের উপস্থিতির নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে। এরপর সোনাদিয়া দ্বীপের টিলাগুলোতে গবেষণা করে দেখা গেছে, ভারী খনিজের পদার্থের ঘনত্ব সমুদ্রের সৈকতের অংশের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলের তুলনায়। গবেষকদের অনুমান অনুসারে টিলাগুলোতে প্রায় গারনেট ২৭৬,৮৬৮ টন, ইলমেনাইট আছে ১০,২৫,৫৫৮ টন, জিরকন ১৫৮,১১৭ টন, লিউকক্সিন ৯৬৭০৯ টন, ম্যাগনেটাইট ৮০,৫৯৯ টন, মোনাজাইট ১৭৩৫২ টন। তবে উপকূল অঞ্চল ও পশ্চাৎপসরণ অঞ্চলের পরিমাণে তারতম্য রয়েছে। গবেষণা করে দেখা গেছে যে সমুদ্রের স্রোত, ঢেউ এবং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে ক্রমাগত পলি জমা হওয়ার ফলে সোনাদিয়া খনিজ মজুতকে ভবিষ্যতে আরও আশাব্যঞ্জক করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। দেশের প্রয়োজনের তুলনায় আহরণের পরিমাণ খুব কম। এর ফলে দেশের প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে কয়লা, খনিজ তেল, চুনাপাথর, চিনামাটি, তামা, সিলিকা বালু, পারমাণবিক খনিজ পদার্থ জিরকন, মোনাজাইট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, লিউকক্সিন প্রভৃতি। এ ছাড়া গন্ধক, নুড়িপাথর, খনিজবালি, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ লবণ, কঠিন শিলা, সর্বাপেক্ষা সহজ ও হালকা হাইড্রো- কার্বন মিথেন। আন্তর্জাতিকভাবে ১৭টি মৌলের একটি গ্রুপ হলো বিরল বা ভারী খনিজ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির নামকরণ অনুযায়ী, পর্যায় সারণির ল্যান্থানাইড সিরিজের ১৫টি মৌলের ল্যান্থানাম, সিরিয়াম, প্লাসিয়োডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, প্রমিথিয়াম, স্যারিয়াম, ইউরোপিয়াম, গ্যাডোলিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হোলসিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইটারবিয়াম, লুটোশিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম একত্রে বিরাল খনিজ বলছে যুক্তরাষ্ট্রের জিওসায়েন্স ইনস্টিটিউট সংস্থাটি। আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প প্রতিরক্ষা খাতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিরল খনিজের ব্যবহার আছে। যেমন মুঠোফোন, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড, টেলিভিশনের এলইডি ডিসপ্লে তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি যেমন লেজার, রাডার, সোলার সিস্টেম, জেট ইঞ্জিন, মিশাইল সিস্টেম, যুদ্ধবিমান, রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বেশ কয়েকটি দেশের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ১৭টি বিরল মৌলের মধো ৮ থেকে ১১টি মৌল বিদ্যমান। পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বিরল মৌল নেই। তার মধ্যে বর্তমান বিশ্বে ৮০ শতাংশ খনিজ চীন নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটিতে ৪ কোটি ৪০ লাখ টন বিরল খনিজ মজুদ আছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্রাজিল, যার মজুদ আছে ২ কোটি ১০ লাখ টন। তা ছাড়া ভারতের ৬৯ লাখ টন, অস্ট্রেলিয়ায় ৫৭ লাখ টন, রাশিয়ার ৩৮ লাখ টন, ভিয়েতনামের ৩৫ লাখ টন মজুত আছে। ২০২৪ সালে চীন খনিজ উৎপাদন করেছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন। আমেরিকা উৎপাদন করেছে মাত্র ৪৫ হাজার টন। বিশ্বের যে সব দেশে খনিজ সম্পদ আছে এবং উত্তোলনে সক্ষম, সে দেশের অর্থনীতি সাসটেইনেবল। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, যারা খনিজের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সৌদি আরবে খনিজ তেল জিডিপির ৫০ শতাংশ অবদান রাখে। রাশিয়ায় জিডিপির ২০ শতাংশ, ইরান জিডিপির ২৩ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে বিশাল অর্থনীতির দ্বার উন্মোচনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, জিএসবি দেশে আট ধরনের আবিষ্কৃত আর্থিক বাজার মূল্যের হিসাব নিরূপণ করেছে ২ কোটি ২৬ হাজার ১৪০ কোটি ডলার, বাংলা টাকায় কনভার্ট করলে দাঁড়ায় ২৪১.৯৭ ট্রিলিয়ন টাকা। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে কয়লা মজুদ আছে, যার পরিমাণ ৭২৫ কোটি টন। যার বর্তমান বাজার মূল্য আসবে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। পিট কয়লা মজুদের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। চুনা পাথর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫২৭ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে ৭৫ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। এভাবে আর অন্য সব খনিজের পরিমাণ যোগ করলে বিশাল পরিমাণ অর্থ দাঁড়াবে। জিএসবি গবেষকদের মতে, ভারী খনিজ ও অন্যান্য খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিজাত করা সম্ভব হলে দেশে প্রতিবছর ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। ভারী বা বিরল ও অন্য সব খনিজ গবেষণা ও প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে আনা সম্ভব হলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশে পরিগণিত হবে।
তারেক মাহমুদ
অক্টোবর ৫, ২০২৬
0
তথ্য শব্দের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। তথ্য বলতে কোনো ব্যক্তি, বিষয়, ঘটনা, প্রতিষ্ঠান বা বস্তুর সম্পর্কে পাওয়া জ্ঞান, বিবরণ, উপাত্ত বা সংবাদকে বোঝায়। সহজভাবে বললে, কোনো বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য যে তথ্য বা বিবরণ পাওয়া যায়, সেটিই তথ্য। তথ্য শুধু কিছু কাগজপত্র, পরিসংখ্যান কিংবা সরকারি নথির নাম নয়। তথ্য হলো নাগরিকের ক্ষমতা। একজন নাগরিক যখন জানতে পারেন তাঁর এলাকার রাস্তা নির্মাণে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, একটি প্রকল্পের কাজ কবে শেষ হওয়ার কথা, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, কিংবা জনস্বার্থের কোনো সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হয়েছে—তখন তিনি শুধু একটি তথ্য জানছেন না; তিনি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইবার সক্ষমতা অর্জন করছেন। এ কারণেই ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসের গুরুত্ব এত বেশি। জাতিসংঘ ২০১৯ সালে ২৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘International Day for Universal Access to Information’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। UNESCO-ও তথ্যপ্রাপ্তিকে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি নতুন নয়। ২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার রয়েছে এবং অনুরোধের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে বাধ্য। একই আইনে সরকারি কর্তৃপক্ষকে তাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকের কাছে সহজলভ্য করার কথাও বলা হয়েছে। আইনের কাগজে-কলমে এই অধিকার যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাস্তবে নাগরিক কতটা সেই অধিকার ভোগ করতে পারছেন? জনগণও এ বিষয়ে কতটা জানে? তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন দপ্তরে যেতে হবে, কোন প্রক্রিয়ার তথ্য পেতে হবে, আদৌ কি জনগণ সেটা জানে? তথ্য অধিকার আইনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো, নাগরিককে তথ্যের জন্য অনুগ্রহপ্রার্থী না রেখে অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক নাগরিক এখনো সরকারি অফিসে তথ্য চাইতে গেলে মনে করেন, তিনি যেন কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন। কোথায় আবেদন করতে হবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে, কত দিনের মধ্যে তথ্য পাওয়ার কথা, তথ্য না পেলে কোথায় আপিল করতে হবে—এসব বিষয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা সীমিত। আইন অনুযায়ী তথ্য চাওয়ার জন্য লিখিত, ইলেকট্রনিক বা ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। সাধারণ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেয়ার কথা; একাধিক ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট হলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ ব্যবস্থা আছে। প্রশ্ন হলো, ব্যবস্থাটি কি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে যথেষ্ট সহজ, পরিচিত ও কার্যকর হয়ে উঠেছে? আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা কাজ করেছে—সরকারি তথ্য মানেই যেন অফিসের সম্পদ। নাগরিক চাইলে কিছু তথ্য দেয়া যাবে, না চাইলে দেয়া হবে না। তথ্য অধিকার আইন এ ধারণার জায়গায় একটি ভিন্ন দর্শন দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প এবং জনস্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখাই স্বাভাবিক নয়; বরং নির্দিষ্ট আইনগত ব্যতিক্রম ছাড়া তথ্য উন্মুক্ত রাখাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা। আইনের ৬ ধারায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম এবং সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকদের কাছে সহজলভ্য করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে—এমন ব্যবস্থা আইনটির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সুশাসনের জায়গায় এখানেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার : তথ্য চাওয়ার পর দেয়া নয়, প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই প্রকাশ করা। এখানেও আইনে পথ দেখানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়া গেলে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আপিলের সুযোগ রয়েছে। এরপর প্রয়োজন হলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার ব্যবস্থাও রয়েছে। তথ্য কমিশনের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যও দেখায় যে তথ্য অধিকার নিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন, অভিযোগ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। কমিশনের একটি প্রতিবেদনে মোট ৩৬,২৭৭টি বিষয়ে নিষ্পত্তির তথ্য রয়েছে; সেখানে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য চাওয়া আইনটির আওতাভুক্ত নয়, কোথাও যথাযথ কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়নি, কোথাও আপিল করা হয়নি—এমন নানা কারণও উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তথ্য অধিকার এখন আর কেবল সেমিনার বা দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা নয়; নাগরিকরা বাস্তবেই এই আইনি কাঠামো ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বোঝা যায়, আইনটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে নাগরিকের জ্ঞান, সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটি শুধু তথ্য না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তথ্যের অস্তিত্বই নাগরিকের কাছে অজানা। কোনো দপ্তরে কী তথ্য আছে, কে সেই তথ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কোন তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করার কথা—এসব পরিষ্কার না হলে তথ্য অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আরেকটি বিষয় হলো তথ্যের ভাষা। কোনো সরকারি ওয়েবসাইটে শত শত পৃষ্ঠার নথি আপলোড করা হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি বুঝতেই না পারেন সেখানে কী আছে, তাহলে সেটিকে কার্যকর তথ্যপ্রকাশ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? তথ্য প্রকাশের সঙ্গে তাই তথ্যের ব্যবহারযোগ্যতা যুক্ত করতে হবে। একটি প্রকল্পের বাজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। কত টাকা বরাদ্দ, কত টাকা খরচ, কাজের অগ্রগতি কত, ঠিকাদার কে, কাজের মেয়াদ কত—এসব তথ্য যদি সহজ ভাষায়, নিয়মিত এবং অনুসন্ধানযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়, তখনই তথ্য জনগণের কাজে লাগে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সভা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, সেমিনার হয়েছে, ব্যানার-ফেস্টুনে তথ্য অধিকারের কথা লেখা হয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু দিবসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—একজন সাধারণ নাগরিক কি কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই তথ্য চাইতে পারেন? তিনি কি জানেন, তথ্য না পেলে তাঁর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী? তিনি কি জানেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে? তিনি কি এমন তথ্য সহজেই অনলাইনে পান, যা তাঁকে আলাদা করে আবেদন করতে হয় না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তথ্য চাওয়ার কারণে তিনি কি নিজেকে হয়রানির শিকার বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি মনে করেন? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেবে, আমরা আইন কতটা পেয়েছি আর অধিকার কতটা পেয়েছি। তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য তিনটি জায়গায় পরিবর্তন জরুরি— প্রথমত, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ বাড়াতে হবে। জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট, ক্রয়, প্রকল্প, সিদ্ধান্ত, জনবল, সেবা ও ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত এবং সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে হবে। একজন গ্রামের কৃষক, একজন শিক্ষার্থী, একজন সাংবাদিক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক যেন তথ্য চাওয়ার জন্য জটিল প্রশাসনিক ভাষা বা প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল না হন। তৃতীয়ত, তথ্য দিতে অনীহার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। তথ্য গোপন করার প্রবণতা নয়, তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতিই হতে হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক আচরণ। কারণ তথ্য অধিকার কোনো বিশেষ শ্রেণির অধিকার নয়। এটি সাংবাদিকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন কৃষকেরও প্রয়োজন; একজন গবেষকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন শিক্ষার্থী বা স্থানীয় নাগরিকেরও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে ২০২৪ সালের তথ্য অধিকার দিবসের মূল আলোচনায়ও সরকারি খাতে তথ্য অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। UNESCO বলেছে, তথ্য অধিকারকে সরকারি সংস্থাগুলোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মধ্যে মূলধারায় নিয়ে আসাই বাস্তব অগ্রগতির অন্যতম লক্ষ্য। পরিশেষে তথ্য অধিকার দিবসে তাই শুধু এ প্রশ্ন করলে হবে না—‘তথ্য অধিকার আছে কি?’ উত্তর আমরা জানি—আছে। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন আছে, তথ্য কমিশন আছে, তথ্য চাওয়ার বিধান আছে, আপিল ও অভিযোগের ব্যবস্থাও আছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো—এই অধিকার কতটা সহজে, কতটা নির্ভয়ে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণকে তথ্য দেয়ার অর্থ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানো। কারণ অন্ধকারে গুজব জন্ম নেয়, সন্দেহ বাড়ে। আলোয় আসে প্রশ্ন। আর প্রশ্নের উত্তরদায়ী রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তাই ২৮ সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে জরুরি বার্তা হতে পারে একটাই, ‘তথ্য দেয়ার দরজা খোলা’ বললেই হবে না; সেই দরজা দিয়ে সাধারণ নাগরিক যেন সত্যিই ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন—সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।
শফিকুল ইসলাম খোকন
অক্টোবর ৫, ২০২৬
0
প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষার প্রসার, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই দিনটি মূলত সেই সত্যটিকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও স্বপ্ন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন চিকিৎসক মানুষের শরীর সুস্থ করেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন; আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষকে, যে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য সব দায়িত্ব পালন করবে। তাই শিক্ষকের অবদানকে কোনো নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা বা পদমর্যাদার মাপকাঠিতে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে এবং নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে দৃশ্যমান অগ্রগতি। প্রযুক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে। তবে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয় না। মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর মূল্যায়ন, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ কম পাচ্ছে। মুখস্থনির্ভরতা, অতিরিক্ত গাইডনির্ভরতা, কোচিং-নির্ভরতা এবং ফলাফলকেন্দ্রিক মানসিকতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে। ফলে শিক্ষাকে শুধু ভালো ফল অর্জনের মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলেন। তিনি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করেন, সম্ভাবনাকে বিকশিত করেন এবং ব্যর্থতার পরও নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেন। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাঁদের যথাযথভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত। তবে এ দায়িত্ব পালন করতে হলে শিক্ষককেও হতে হবে দক্ষ, আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রযুক্তিবান্ধব, নৈতিক ও মানবিক। শিক্ষককে যদি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও মূল্যায়ন কৌশল সম্পর্কে দক্ষ করে তোলা যায়, তাহলে শ্রেণিকক্ষ আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠবে। আমাদের সমাজে শিক্ষককে ঐতিহাসিকভাবেই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। ‘শিক্ষক জাতির বিবেক’—এই কথাটি আমাদের সামাজিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই সামাজিক মর্যাদার অনেক সময় অসামঞ্জস্য দেখা যায়। একদিকে শিক্ষককে জাতি গঠনের প্রধান কারিগর বলা হয়, অন্যদিকে অনেক শিক্ষককে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক কাজ, অতিরিক্ত দায়িত্ব ও নানা সামাজিক চাপ সামলাতে হয়। এতে শিক্ষকতার মূল কাজ—শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীকে সময় দেয়া—ব্যাহত হতে পারে। শিক্ষকের মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, নীতিনির্ধারণ, কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও সামাজিক আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষক যেন সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারেন—এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। শিক্ষক যদি আর্থিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে তার পেশাগত মনোযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো নানা ধরনের আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কাজের চাপ, সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্বের মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য প্রয়োজন। শিক্ষকের সম্মানী শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়; এটি শিক্ষার মানে বিনিয়োগ। একটি ভালো শ্রেণিকক্ষ শুধু বেঞ্চ, চেয়ার, বোর্ড ও ভবনের সমষ্টি নয়। সেখানে থাকতে হবে নিরাপদ, আনন্দময়, প্রশ্নবান্ধব ও বৈষম্যহীন পরিবেশ। শিক্ষার্থী যেন ভুল করতে ভয় না পায়, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ না করে এবং নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ পায়—এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একইভাবে শিক্ষককেও এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন। প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ও ভাষা-ল্যাব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ শিক্ষার পরিবেশকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে প্রযুক্তি কখনো শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের সহায়ক শক্তি। শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি শিক্ষকের দায়িত্বের কথাও বলতে হবে। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হলেও এটি একই সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব। শিক্ষককে সময়নিষ্ঠ হতে হবে, নিয়মিত পাঠ প্রস্তুতি নিতে হবে, শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষককে শুধু বইয়ের জ্ঞান জানলেই চলবে না। তাঁকে জানতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, মানসিক স্বাস্থ্য, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পরিবর্তিত কর্মজগতের প্রয়োজনীয়তা। শিক্ষকদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তাঁরা চান সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন-ভাতা, পেশাগত নিরাপত্তা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ এবং সামাজিক মর্যাদা। তাঁরা চান না যে শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা হোক। একজন শিক্ষার্থী কতটা ভালো মানুষ হলো, কতটা যুক্তিবাদী হলো, কতটা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠল—এসবও শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হোক। একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় কোনো পদোন্নতি, পুরস্কার বা আর্থিক সুবিধা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—একদিন তাঁর কোনো শিক্ষার্থী এসে বলবে, “স্যার, আপনার কথা আমি আজও মনে রেখেছি।” একজন শিক্ষক যখন দেখেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাজের জন্য কাজ করছে, মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে—তখন সেই আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনো অর্জনের তুলনা চলে না। তবে এই মানসিক প্রাপ্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও প্রয়োজন। ভালো কাজের জন্য শিক্ষককে সম্মাননা, গবেষণার সুযোগ, পেশাগত উন্নয়ন এবং নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষকতা আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার শিক্ষার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য জানলেই হবে না; তাকে হতে হবে সমস্যা সমাধানকারী, সৃজনশীল, যোগাযোগে দক্ষ, প্রযুক্তিবান্ধব এবং নৈতিকভাবে সচেতন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবেন শিক্ষক। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে শুধু ‘বিষয়ের শিক্ষক’ নয়, বরং শিক্ষার্থীর মেন্টর, পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুস্পষ্ট পথ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর একটি দিন নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। শিক্ষককে সম্মান করতে হলে শুধু কথায় নয়, কাজে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা বাড়াতে হবে, কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে, ন্যায্য সম্মানি নিশ্চিত করতে হবে এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে—তাঁরা শুধু একটি চাকরি করছেন না; তাঁরা একটি প্রজন্ম নির্মাণ করছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—শিক্ষককে শুধু সম্মান নয়, সম্মানজনক অবস্থান দিতে হবে; শুধু প্রত্যাশা নয়, প্রয়োজনীয় সুযোগও দিতে হবে; শুধু দায়িত্ব নয়, দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই শিক্ষক দিবসের উদযাপন হবে অর্থবহ, আর শিক্ষার ভবিষ্যৎ হবে আরও আলোকিত।
মোঃ নুরুল ইসলাম নিলয়
অক্টোবর ৫, ২০২৬
0
বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে আমাদের শহর, যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চল, আবাসন ও জীবনযাত্রা। একের পর এক সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও নগর অবকাঠামো আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এই অগ্রগতি প্রয়োজনীয়, কারণ উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু উন্নয়নের এই যাত্রার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে মাটি, পানি, নদী, বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর আমাদের জীবন দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। পরিবেশকে ধ্বংস করে উন্নয়ন অথবা উন্নয়ন থামিয়ে পরিবেশ রক্ষা — এই চিরন্তন দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন দর্শন, যেখানে অর্থনীতি এগোবে, মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং একই সঙ্গে প্রকৃতিও তার প্রয়োজনীয় জায়গা পাবে। একটি রাস্তা নির্মাণের পর যদি বর্ষায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, একটি শিল্পকারখানার বর্জ্যপানি যদি নদী বা খালকে দূষিত করে, কিংবা একটি শহর গড়ে উঠতে গিয়ে প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফলের পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত দায়ও তৈরি হয়। সেই দায় শেষ পর্যন্ত আমাদের সমাজকেই বহন করতে হয়। এ কারণে পরিবেশকে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ের একটি আনুষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকল্পের ধারণা ও পরিকল্পনার শুরু থেকেই পরিবেশকে বিবেচনায় নিতে হয়। প্রকল্প কোথায় হবে, কীভাবে হবে, কতটুকু জমি ব্যবহার করবে, পানি ও জ্বালানি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, বর্জ্য কোথায় যাবে, স্থানীয় মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি কী হতে পারে, এসব বিষয় প্রকল্পের ধারণা ও পরিকল্পনার শুরু থেকেই বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এ জায়গাতেই পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের (ইআইএ) গুরুত্ব। এতে শুধু পরিবেশ রক্ষা হয় না; প্রকল্পের স্থায়িত্ব, কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়ে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ইআইএ কোনো প্রকল্পকে থামানোর হাতিয়ার নয়; বরং প্রকল্পকে আরও ভালোভাবে করার একটি সুযোগ। একটি নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্ষার পানি কোথা দিয়ে যাবে, কোথায় জলাবদ্ধতা হতে পারে, কৃষিজমি ও জলাশয়ের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং স্থানীয় মানুষের চলাচল কীভাবে বজায় থাকবে — এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে একটি শিল্পপ্রকল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্যপানি শোধন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, কঠিন ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে শুধু পরিকল্পনা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়নই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। নির্মাণকাজে ধুলা, শব্দ ও কম্পন নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক ও জ্বালানির নিরাপদ সংরক্ষণ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (EMP) তাই কেবল প্রতিবেদনের একটি অধ্যায় নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকর নির্দেশিকা। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যত বেশি সমন্বয় থাকবে, উন্নয়ন তত বেশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হবে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ইআইএর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নতুন অবকাঠামোকে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের উপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি। জলবায়ু সহনশীলতা এখন টেকসই অবকাঠামোর অন্যতম মৌলিক শর্ত। ইআইএর মাধ্যমে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি চিহ্নিত করে অবকাঠামোর নকশা, পানি নিষ্কাশন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নির্মাণসামগ্রী নির্বাচন ও জরুরি প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। দ্রুত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের শহরগুলোতে খাল, জলাভূমি ও পানি ধারণের প্রাকৃতিক স্থান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, বাড়ছে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি। এর সমাধান শুধু বড় ড্রেন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পানি প্রবাহ, পানি ধারণ ও পানি নিষ্কাশনের পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। ইআইএর মাধ্যমে প্রকল্পের নকশা ও নিষ্কাশন পরিকল্পনার পর্যায়েই সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিত করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে নতুন কংক্রিট অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে একটি খাল, জলাভূমি বা প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণই অধিক কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে। শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও পরিবেশকে ব্যয় হিসেবে নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কম পানি ও জ্বালানি ব্যবহার, কম বর্জ্য উৎপাদন, wastewater treatment, emission control, cleaner production এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ একটি আধুনিক শিল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ইআইএর মাধ্যমে এসব বিষয়কে শুধু compliance requirement হিসেবে নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি resource efficiency ও operational sustainability এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পরিবেশগত দক্ষতা বাড়লে দূষণ কমার পাশাপাশি সম্পদের অপচয় কমতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও বাড়তে পারে। ইআইএর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো stakeholder engagement। একটি এলাকার স্থানীয় মানুষ অনেক সময় এমন তথ্য জানেন, যা শুধু technical survey থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। কোন খাল বর্ষায় সক্রিয় থাকে, কোথায় পানি জমে, কোন রাস্তা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, কোন জলাশয় স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, এসব তথ্য প্রকল্পের বাস্তব ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই meaningful stakeholder engagement শুধু অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি ইআইএকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও স্থানীয় প্রেক্ষাপটসম্মত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে সব পরিবেশগত প্রভাব সব সময় পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্ভাব্য প্রভাবগুলো আগে থেকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ইআইএর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ পায়, প্রভাব শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে mitigation, monitoring, stakeholder engagement এবং corrective action পর্যন্ত। ফলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা একটি বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম না হয়ে প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রের অংশ হয়ে ওঠে। সবশেষে, একটি প্রকল্পকে শুধু নির্মাণ শেষ হওয়ার দিন দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় বহু বছর পরে যখন অবকাঠামোটি কার্যকর থাকে, স্থানীয় পরিবেশ নিরাপদ থাকে, মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত হয় এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যেও প্রকল্পটি টিকে থাকে। তাই পরিকল্পনা থেকে নকশা, নির্মাণ থেকে পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত পুরো জীবনচক্রেই পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইআইএর প্রকৃত মূল্য এখানেই; এটি উন্নয়নকে থামায় না বরং উন্নয়নকে আরও সচেতন, দূরদর্শী এবং দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে; এখন প্রয়োজন সেই উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেয়া। এমন উন্নয়ন, যেখানে সড়ক হবে কিন্তু পানি চলাচলের পথ বন্ধ হবে না; শিল্প হবে কিন্তু নদী দূষিত হবে না; শহর বড় হবে কিন্তু জলাভূমি হারিয়ে যাবে না; নতুন অবকাঠামো হবে কিন্তু সামান্য বন্যা বা তাপপ্রবাহেই অচল হয়ে পড়বে না। ইআইএর মতো বৈজ্ঞানিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া সেই উন্নয়নের পথকে আরও টেকসই, দূরদর্শী ও পরিবেশসম্মত করে তুলতে পারে। উন্নয়ন হোক, তবে প্রকৃতির হাত ধরে। কারণ নদী, খাল, জলাভূমি, বন, মাটি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্য উন্নয়নের পথে কোনো বাধা নয়। এগুলোই আমাদের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে উন্নয়ন এগিয়ে চলে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন আগামী দিনের বোঝা না হয় বরং ইআইএর মাধ্যমে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ, জলবায়ু সহনশীল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশের ভিত্তি ভিত্তি গড়ে তোলে।
হৃদয় হাসান
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
লিবিয়ার সির্ত শহরের নিকটবর্তী এক কৃষক-বেদুইন পরিবারে ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। অন্য শিশুদের নিয়ে তিনিও তাঁর নিজ গ্রামে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষালাভ করেন। সাবহার প্রিপারেটরি স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা ও ইউনিভার্সিটি অব লিবিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি বেনগাজির সামরিক একাডেমিতে যোগদান করেন। সময়টি ছিল ১৯৬০-এর দশক, যখন রাজতান্ত্রিকভাবে লিবিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল রাজা ইদ্রিস আল-সেনুসি। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় আশির কাছাকাছি। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি তুরস্কে অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাষ্ট্রের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন ক্রাউন প্রিন্স হাসান আল-রিদা আল-মাহদি আস-সেনুসি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও তাঁর কিছু সহযোগী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধমে রাজা ইদ্রিস আল-সেনুসিকে উৎখাত করেন। এর পেছনে কারণ ছিল গাদ্দাফি রাজতন্ত্রের ঘোরবিরোধী ছিলেন এবং ইদ্রিসের পশ্চিমাপন্থী নীতির বিরোধিতা করতেন। লিবিয়ায় তখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ছিল এবং আরব জাতীয়তাবাদী মহলে ইদ্রিস সরকারের পশ্চিমাপন্থী অবস্থান নিয়ে সমালোচনা ছিল। এদিকে গাদ্দাফি কোনো রকম প্রতিরোধ-রক্তপাত ব্যতিরেকেই ক্ষমতা দখল করেন এবং রাজতন্ত্র বিলুপ্তির ঘোষণা করে লিবিয়ান আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষমতা দখলের পর তিনি আমেরিকান ও ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলোকে বিতাড়িত করেন এবং তেল সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করেন। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন নির্মাণের মাধ্যমে সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। ইসলামি ও সমাজতান্ত্রিক ধারণার সমন্বয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের প্রচার করেন। এর অংশ হিসেবে মদ্যপান, নাইট ক্লাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং কিছু খ্রিস্টান গির্জা বন্ধ করে দেন। তিনি আরব দেশগুলোকে সমন্বিত শক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করেন। সাম্রাজ্যবাদ ও যায়নবাদ-বিরোধিতা এবং ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে পশ্চিমাদের সঙ্গে তাঁর বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৯৭০ সালে তিনি ইসরায়েলবিরোধী মুজাহিদদের অর্থায়নের জন্য ‘জিহাদ ফান্ড’ চালু করেন এবং প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করেন। এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি লিবিয়ার সমর্থন এবং পরবর্তী সময়ে কথিত সন্ত্রাসবাদে লিবিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ লিবিয়ার ওপর বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পশ্চিমা ও ন্যাটোর পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিবিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনগাজিতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তা বড় আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয় National Transitional Council (NTC)। দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসনকে কারণ হিসেবে বিক্ষোভকারীরা উল্লেখ করে। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, গুলি ও হত্যাকাণ্ড চালান। এদিকে কাতার, ফ্রান্স, আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ এনটিসি ও গাদ্দাফিবিরোধী বাহিনীকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে এবং ন্যাটো বিমান হামলা পরিচালনা করে। ২০ অক্টোবর সকাল প্রায় সাড়ে আটটা বা সাড়ে নয়টার দিকে গাদ্দাফির অনুগতদের একটি বড় বহরে ন্যাটো বিমান হামলা চালায়। হামলার পর গাদ্দাফি ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী প্রাণে রক্ষা পান এবং তাঁরা একটি রাস্তার নিচের ড্রেনেজ পাইপের ভেতর আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে গাদ্দাফিবিরোধীরা তাঁকে খুঁজে পেতে সক্ষম হয় এবং তারা গাদ্দাফি ও তাঁর সহযোগীদের আটক করে। প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গাদ্দাফিকে জীবিত অবস্থায় আটক করার পর তাঁকে মারধর ও গুলিবর্ষণ করে। কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গাদ্দাফির মরদেহ মিসরাতার একটি হিমায়িত সংরক্ষণাগারে প্রায় চার দিন জনসাধারণের দেখার জন্য রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মরুভূমির অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হয়। প্রায় নয় মাসের আন্দোলন, বিদ্রোহ ও পশ্চিমা হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘ চার দশকের শাসনক্ষমতার। গাদ্দাফি তাঁর জীবদ্দশায় দেশ ও জাতির জন্য যে কর্মযজ্ঞ করেছেন, তা অবিস্মরণীয়। তাঁর সময়কার সামাজিক জীবনে যে স্থিতি ও শান্তি দেখা গিয়েছিল, গাদ্দাফি হত্যাকাণ্ডের পর দেড়-দশকেও তা দেখা যাওয়া তো দেখা যায়নি। ফলে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর দরিদ্রতা। পশ্চিমা ও জায়নবাদী চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে তারা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, তার মাসুল আজ পর্যন্ত তারা দিচ্ছে।
এম সাফায়াত হোসেন
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
খাদ্য ঘাটতির দেশে বাড়তি উৎপাদন কীভাবে সম্ভব হলো, সে গল্প কি আমরা জানি? খাদ্য নিরাপত্তা এ দেশে চালের নিরাপত্তার সমার্থক। দিনে দুই থেকে তিনবার যে জাতির পাতে ভাত ওঠে, তার ভাতের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের কাঁধে, সেটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি গত ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি ৫৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদীয় আইনে নতুন নাম পায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভদিনে ব্রির কয়েকটি যুগান্তকারী সাফল্যের গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরতে এই আয়োজন। গত সাড়ে পাঁচ দশকে ব্রির সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে চালের উৎপাদন চার গুণেরও বেশি উন্নীতকরণ। ব্রি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে মোট চালের উৎপাদন ছিল ৯.৭৭ মিলিয়ন টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০.৬৩ মিলিয়ন টনে, অর্থাৎ চালের উৎপাদন গত সাড়ে পাঁচ দশকে বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। এই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ, আবাদি জমি কমেছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির হাত ধরে। বর্তমানে মোট উৎপাদনের ৫৩ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, ৪০ শতাংশ আমন থেকে এবং ৭ শতাংশ আউশ থেকে। কৃষকের মাঠেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। ব্রির তথ্যমতে, আউশ মৌসুমে ব্রির জাতের গ্রহণযোগ্যতা ৭৩.৩১ শতাংশ, আমনে ৫৮.৪৩ শতাংশ এবং বোরোতে ৫৭.২৯ শতাংশ। ব্রির জাত চাষ করে কৃষকের ফলন ৪০ শতাংশ এবং আয় ৮৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। দেশি জাতের স্বল্প ফলন থেকে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী জাত বৈচিত্র্যে এসেছে এই কাঙিক্ষত সমাধান। ব্রি এ পর্যন্ত ১২৭টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে ১১৭টি ইনব্রিড ও ১০টি হাইব্রিড। এর মধ্যে জলবায়ুর ঘাতসহনশীল ৪০টি, পুষ্টিসমৃদ্ধ ৩০টি, সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের ১৪টি, জিংক সমৃদ্ধ ৭টি, স্বল্প গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের লো-জিআই চাল ৪টি এবং রোগ প্রতিরোধী ২টি। ব্রি উদ্ভাবিত ২৩টি জাত ১৪টি দেশে চাষ হচ্ছে, যা দেশের গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। ব্রি উদ্ভাবিত কয়েকটি জাত দেশের কৃষির চেহারা বদলে দিয়েছে। বিআর৩ ও বিআর১১, ৪৯, ৮৭, ১০৩ আমনে এবং ব্রি ধান২৮, ২৯, ৮৮, ৮৯, ৯২,১০২,১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৮ বোরোতে দশকের পর দশক ধরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা মোকাবেলায় আগাম পাকা ব্রি ধান৩৩ গরিব চাষির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন করলে এটি ১০০ দিনের মধ্যেই পাকে, যা মঙ্গা দূরীকরণে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক জাতগুলোতেও বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। ব্রি ধান১১৪ ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ব্রি ধান১১৫ ভিটামিন-ই ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। ব্রি ধান১১৬ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দেয়। লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান১১৭ উপকূলে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দিতে পারে এবং সম্পূর্ণ জীবনচক্রে ১০ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করে। হাওরাঞ্চলের জন্য ঠান্ডাসহিষ্ণু ও আগাম জাত ব্রি ধান১১৮ উদ্ভাবিত হয়েছে। এ বছর আগাম বন্যায় প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হাইব্রিডের মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান৮ হেক্টরপ্রতি ১০.৫ থেকে ১১ টন এবং লবণসহিষ্ণু ব্রি হাইব্রিড ধান১০ অনুকূল পরিবেশে ৯.৭ থেকে ১০.৭ টন ফলন দিতে সক্ষম। ব্রি এখন ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রজনন কর্মসূচিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ৩২টি টার্গেট প্রোডাক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়েছে এবং প্রজনন চক্র সাড়ে তিন থেকে চার বছর কমানো হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার জেনোটাইপের পূর্ণ জিনোম ফিঙ্গারপ্রিন্টিং সম্পন্ন হয়েছে। ৪ লাখেরও বেশি ফিক্সড লাইন উদ্ভাবিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ জাতের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে। সম্পদ সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষায়ও সরাসরি বপন পদ্ধতিতে (ডিএসআর) জলমগ্ন পদ্ধতির তুলনায় মিথেন নির্গমন ৩৪ শতাংশ হ্রাস করছে। যদিও ধান চাষে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের চেয়ে প্রশমন হয় বেশি। ব্রির দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রে ৩০-৩৫ শতাংশ সার সাশ্রয় হয়, ফলন ৫-১২ শতাংশ বাড়ে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে। সেচে সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় এডব্লিউডি ব্যবস্থা কৃষকের খরচ সাশ্রয় করছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্রি এ পর্যন্ত ৫৪টি যন্ত্র উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ বপন, রোপণ, আগাছা দমন ও মাড়াই যন্ত্র এবং কম্বাইন হারভেস্টার। বীজ বপনের পাওয়ার সিড সোয়ারের দাম প্রায় ৮০ হাজার টাকা এবং তা দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশীয় কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আমদানি নির্ভরতা কমেছে। যন্ত্র উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল সেবায়ও ব্রি এগিয়েছে অনেকখানি। মাঠের পোকামাকড় ও রোগ পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। রয়েছে ধানের জাতের স্মার্ট প্রোফাইলিং অ্যাপ ও বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংক। ব্রির এগ্রামেট সেবা ও কল সেন্টারে জুন-জুলাই ২০২৬ সময়ে মোট ১ হাজার ৬৫৭টি কল এসেছে, যার বেশির ভাগই সহায়তা ডেস্কসংক্রান্ত। সার ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়েও কৃষকেরা প্রশ্ন করেছেন। ভালো জাত মাঠে পৌঁছাতে চাই মানসম্পন্ন বীজ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রি ১৩০টি জাতের নিউক্লিয়াস বীজ সংরক্ষণ করেছে এবং ২৩২ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৫টি সিডনেট অংশীদারকে প্রায় ২০০ টন বীজ প্রতিবছরই বিতরণ করা হচ্ছে। ধান বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে গত পাঁচ বছরে ব্রি মোট ৫১ হাজার ৪২০ জন অংশীজনকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার মধ্যে কৃষক ৪২ হাজার ২০৪ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রি মোট ২৯টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণ) এবং ব্র্যাক ব্যাংক ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ডস। ব্রির অবদান অর্থনৈতিক বিচারেও লাভজনক। ধান গবেষণায় বিনিয়োগের প্রতিদান নিয়ে পাঁচটি গবেষণা হয়েছে। সেগুলোর হিসাবে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে ফেরত এসেছে ২৬ থেকে ৫৪ টাকা। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে ১.১২ শতাংশ হারে, আবাদি জমি কমছে ০.২৪ শতাংশ হারে, আর তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতি দশকে প্রায় ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্রির ভাষায়, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, একে টেকসই করতে নিরন্তর প্রচেষ্টা দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার তাগিদও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করার জন্য ব্রি কয়েকটি কৌশল হাতে নিয়েছে। কৃষকের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ টন ধরে দেশের চাহিদা মেটাতে অন্তত ৬.২৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমি রক্ষার কৌশল নিয়ে কাজ করছে ব্রি। ব্রির মতে, জেনেটিক গেইনের গতি বছরে অন্তত ৪৪ কেজি বা হেক্টর হারে বাড়ানো দরকার। ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৩৮ মিলিয়ন হেক্টর পতিত জমিতে ধান চাষ করে বাড়তি ১.০৬ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি ৪.৪৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উন্নত শস্যবিন্যাস চালু করে আরও ৪.০৪ মিলিয়ন টন বাড়তি ধান উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণার অগ্রাধিকারে রয়েছে স্পিড ব্রিডিং, জিনোমিক প্রেডিকশন ও হ্যাপলোটাইপভিত্তিক প্রজননের মতো আধুনিক কৌশল। এ ছাড়া রয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর জাত, জলবায়ু সহনশীলতা, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। চলমান গবেষণায় সি৪ রাইস, জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে লবণাক্ততা সহনশীলতা ও ব্লাস্ট প্রতিরোধ এবং টু-লাইন হাইব্রিড প্রজনন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। উচ্চ আয়ের জন্য মূল্য সংযোজিত ধানজাত পণ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাইস ভ্যালু চেইন গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। দিনে দিনে প্রতিষ্ঠানটির পরিধিও বাড়ছে। বর্তমানে ১৯টি গবেষণা বিভাগ এবং সদর দপ্তরের বাইরে ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে আরও ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬টি স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে । এতে স্থানভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের সমস্যার সমাধান আরও সহজ হবে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা না বললেই নয়। এর মধ্যে অপর্যাপ্ত জনবল, পদোন্নতি ও চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতা, এবং গবেষণা বরাদ্দের অপ্রতুলতা উল্লেখযোগ্য। ব্রির অনুমোদিত ৩১৮টি বিজ্ঞানী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৭১ জন। যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি টাকার বিনিয়োগ বহুগুণ হয়ে ফেরে, তার গবেষণা ও জনবলে বিনিয়োগ বাড়ানোই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ৫৬ বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান কয়েকজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা দেশের কোটি মানুষের পাতে ভাত পৌঁছানোর নেপথ্য শক্তি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্রির সব বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষককে অভিনন্দন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জমি সংকটের যুগে ব্রির ওপর প্রত্যাশা আরও বাড়বে, আর সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় সহায়তা। ড. এম আব্দুল মোমিন কৃষিবিদ ও কৃষি সাংবাদিক এবং ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গাজীপুর
ড. এম আব্দুল মোমিন
অক্টোবর ৩, ২০২৬
0
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।
শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে। বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি। বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’। বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।” বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।” বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি... ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।” আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব। এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?” আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।” চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।” এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম। সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে। এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর। বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।” বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম। হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।