বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে মোট ৩৩০ কোটি ডলারের কঠিন শর্তের বিদেশি ঋণ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সচিবালয়ে অনমনীয় ঋণ সম্পর্কিত স্থায়ী (এসসিএনসিএল) কমিটির সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অনুমোদিত অর্থের মধ্যে বিআরইবির বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ২০ কোটি ডলার এবং জরুরি জ্বালানি আমদানির জন্য ভূতাপেক্ষ অনুমোদনে রয়েছে ৩১০ কোটি ডলার। বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে নেয়া হচ্ছে ২০ কোটি ডলার। সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে অতিরিক্ত ০.৫ শতাংশ স্প্রেডযুক্ত এই ২৫ বছর মেয়াদি ঋণে গ্র্যান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৫.৭০ শতাংশ হওয়ায় এটি অনমনীয় ঋণ হিসেবে বিবেচিত। এ অর্থ দিয়ে ঢাকাসংলগ্ন ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে লাইন নির্মাণ, উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে সরবরাহ উন্নত করা হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে নেয়া হচ্ছে ৩১০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি ঋণ। এর মধ্যে বিপিসির তেল আমদানিতে ২৫০ কোটি এবং পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানিতে ৬০ কোটি ডলার ব্যয় হবে। ছয় মাস মেয়াদি এই ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে ছয় মাসের টার্ম এসওএফআরের সঙ্গে ১.৭০ শতাংশ যুক্ত করে। ইআরডির নীতিমালা অনুযায়ী, অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধের ব্যয় যাতে মোট রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ কিংবা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে না যায়, তা বিবেচনায় রাখা হয়েছে। জাতীয় অগ্রাধিকার এবং নিজস্ব সক্ষমতা থেকে পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেই জরুরি জ্বালানি সরবরাহ অটুট রাখতে এ বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটার নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী ‘মিউজ’ চালুর পর কোম্পানিটির শেয়ারের দামে অভাবনীয় উল্লম্ফন ঘটেছে। চলতি সপ্তাহে বড় উত্থানের মধ্য দিয়ে মেটার প্রতিটি শেয়ারের দর প্রায় ৭৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিজ্ঞাপনের ওপর মেটার অতি-নির্ভরতা কমিয়ে নতুন রাজস্ব আয়ের পথ তৈরি করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে এবং ১৮ সেপ্টেম্বর কানাডায় ১৮ ঊর্ধ্ব ব্যবহারকারীদের জন্য মিউজ উন্মুক্ত করা হয়। ব্যবহারকারীর হয়ে কেনাকাটা, ভ্রমণ বুকিং ও ই-মেইল পাঠানোর ক্ষমতাসম্পন্ন এই বহুমুখী এআই এজেন্টটি বিনামূল্যের পাশাপাশি ২০ ও ১০০ ডলারের সাবস্ক্রিপশনেও পাওয়া যাচ্ছে। চালুর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে আইফোনে এটি ১৮ লাখ বার ডাউনলোড হয়েছে, যা চ্যাটজিপিটির প্রাথমিক রেকর্ডের চেয়েও বেশি। মেটার বার্ষিক ‘কানেক্ট’ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, মিউজ শিগগিরই তাদের স্মার্ট চশমায় যুক্ত হবে এবং ওয়ালমার্টের মতো শীর্ষ বিক্রেতাদের অংশীদারত্বে কেনাকাটা থেকে কমিশন আয়ের সুযোগ তৈরি করবে। এই সাফল্যের ওপর ভর করে বিনিয়োগ ব্যাংক জেপিমরগ্যান মেটার শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা ৯২০ ডলারে উন্নীত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, চ্যাটজিপিটির পর মিউজই হতে পারে ভোক্তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় এআই অ্যাপ্লিকেশন। তবে নতুন এই প্রযুক্তি ঘিরে কিছু বিতর্ক ও আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি অ্যামাজন তাদের প্ল্যাটফর্মে মিউজ ব্যবহারে বাধা দিয়ে অভিযোগ করেছে, মেটার এজেন্ট গ্রাহকের লগইন তথ্য সংরক্ষণ করছে—যদিও মেটা তা অস্বীকার করেছে। এছাড়া এক জরিপে দেখা গেছে, পাসওয়ার্ড সুরক্ষায় মাত্র ৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মেটার ওপর ভরসা রাখেন, যেখানে গুগলের ওপর আস্থা ৩০ শতাংশ মানুষের। এর আগে বিভিন্ন আইনি জটিলতা এবং চলতি বছরে এআই খাতে মেটার প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ধাক্কায় কোম্পানিটির শেয়ারে বড় পতন হয়েছিল। তবে প্রতিদিন ৩৬০ কোটির বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী থাকার সুবিধা কাজে লাগিয়ে মেটা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে চাইছে। এখন দেখার বিষয়, মিউজের এই গতি অতীতে থ্রেডসের মতো ধীর হয়ে যায় নাকি তা মেটার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সাফল্যে স্থায়ী রূপ নেয়। তথ্যসূত্র : বাসস
তারল্য সংকট কাটাতে ব্যাংকগুলোর অফশোর ইউনিটে থাকা প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রার আমানত দেশীয় ব্যাংকিং ইউনিটে স্থানান্তরের সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার ৪ আগস্ট জারি করা এক সার্কুলারে জানানো হয়েছে, এই তহবিল থেকে পর্যাপ্ত জামানতের বিপরীতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধন ও ভোক্তা ঋণ দেয়া যাবে। নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানান্তরিত এসব অর্থ দিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যবসায়ীদের স্বল্পমেয়াদি চলতি মূলধনের জোগান দেয়া যাবে। এ ছাড়া সাধারণ ব্যক্তি, প্রবাসী বা তাঁদের মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানিকেও পর্যাপ্ত জামানতের বিপরীতে ঋণ দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাওযায় ব্যাংকগুলোর অফশোর ইউনিটে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ও তারল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের অনেক ব্যাংক ঋণ বিতরণে তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে বলে অলস পড়ে থাকা এসব অর্থের যথাযথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতেই মূলত এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রবাসীদের আমানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে সাধারণত উচ্চ হারে মুনাফা দিতে হয়, যা অফশোর ইউনিটে অলস পড়ে থাকলে নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যাংকগুলোকে লোকসান গুনতে হয়। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো এসব অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করে আয় করতে পারবে এবং সেই আয় থেকে সহজেই প্রবাসীদের মুনাফা মেটাতে সক্ষম হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা যেন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নতুন করে না বাড়ান, সেই আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে সংগঠনটির নিজস্ব কার্যালয়ে নিত্যপণ্যের মজুত, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় এই কড়া বার্তা দেয়া হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান প্রশাসক মো. ফজলুল হক। মতবিনিময় সভায় নিত্যভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, নানা খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতা, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ী এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অংশ নেন। দেশের চলমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং নতুন সরকারি বেতন স্কেল ঘোষণার ঠিক পরপরই অনুষ্ঠিত হওয়া এই সার্বিক পর্যালোচনার বৈঠকটিকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার উদ্দেশে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, বাজারে বর্তমানে জিনিসপত্রের যে ঊর্ধ্বমুখী দাম, তাতে সাধারণ মানুষ এমনিতেই বেশ কষ্টের মধ্যে দিন পার করছে। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে কিছু মানুষের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে। এই সুযোগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যেন আগামীকাল থেকেই চাল, ডাল বা ভোজ্যতেলের দাম কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে না দেন, সে বিষয়ে বাজারের সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।
নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বম্বে সুইটসের মসলা, বাঘাবাড়ি ঘিসহ ১০টি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বিএসটিআই। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হওয়ায় ভোক্তাদের এসব পণ্য না কেনার পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। বিএসটিআই জানিয়েছে, বাঘাবাড়ি ব্র্যান্ডের ঘিতে মিল্ক ফ্যাটের বদলে পাম অলিন ও বনস্পতি ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। অন্যদিকে বম্বে সুইটসের হাঁসের মাংস, তেহারি, কালা ভুনা, গরুর মাংস ও মাছের মসলায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় অ্যাশ ও লবণ পাওয়া গেছে। নিম্নমানের অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে ‘অরুন বাঘাবাড়ী’, ‘নিউ রাঁধুনী’ ও ‘সিটি’ ব্র্যান্ডের ঘি এবং ‘এলডার্স’ ব্র্যান্ডের বাটার অয়েল। এসব পণ্যের বিভিন্ন রাসায়নিক মান নির্ধারিত সীমার বাইরে ছিল। বিএসটিআই মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক জানিয়েছেন, পণ্যের মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। নকল ও ভেজাল রোধে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে তিনি পণ্য কেনার আগে বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন, লাইসেন্স নম্বর ও মেয়াদ যাচাই করতে ভোক্তাদের পরামর্শ দেন।
গাড়ির পুরোনো যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে আনা কোটি টাকা মূল্যের চারটি বিলাসবহুল গাড়ি মোংলা বন্দরে জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় চালানটিতে রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের বড় অংশ শনাক্ত করা হয়েছে। কাস্টমস গোয়েন্দারা জানান, আস্ত গাড়িগুলোকে সাধারণ যন্ত্রাংশ হিসেবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না করে মাত্র তিন-চারটি বড় অংশে কেটে আনা হয়েছে, যা পরে জোড়া লাগিয়ে মূল কাঠামোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রায় ১০ হাজার ২২০ কেজি ওজনের এই চালানে দরজা, ইঞ্জিন, গিয়ারসহ নানা যন্ত্রাংশ ঘোষণা করা হলেও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৯ জুলাই এর খালাস স্থগিত করে কাস্টমস। পরে বিআরটিএ, কুয়েটের বিশেষজ্ঞ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় গাড়ির পরিচয় ও মডেল শনাক্ত করা হয়। জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া ২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার, ২০১০ সালের বিএমডব্লিউ, ২০১৬ সালের লেক্সাস ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট—এই চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি। অথচ পুরো চালানের ঘোষিত মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার, যার বিপরীতে শুল্ক-করসহ পরিশোধযোগ্য অর্থ আসে প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। কাস্টমস গোয়েন্দা জানিয়েছে, খণ্ডিত অবস্থাতেও এগুলো সম্পূর্ণ গাড়ির বৈশিষ্ট্য বহন করায় সে অনুযায়ী শুল্কায়ন করা হবে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ধরনের শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ঠেকাতে তাদের নজরদারি ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৬টি নতুন এবং ৪টি সংশোধিত প্রকল্প। মোট ব্যয়ের ৮ হাজার ৪৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এবং বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে মেটানো হবে। অনুমোদিত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ পুনর্নির্মাণ, ১০টি মেডিক্যাল কলেজে আধুনিক হোস্টেল নির্মাণ, সেতুগুলোর স্মার্ট মেইনটেন্যান্স প্রযুক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি, লালমনিরহাটে নদীভাঙন রোধ ও সীতাকুণ্ডে ফেরিঘাট শক্তিশালীকরণ। এ ছাড়া গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা জোরদার, মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, ডেসকো এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প পাস হয়েছে। সভায় ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও ৯টি প্রকল্প সম্পর্কে অবহিত করা হয় এবং ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যান্য মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শেয়ারবাজারে মার্জিন বা ঋণ সুবিধার নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত করে ১৯ আগস্ট রাতে গেজেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ না থাকলে মার্জিন ঋণ পাওয়া যাবে না। ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ১:১; অর্থাৎ নিজের ১ লাখ টাকা থাকলে সর্বোচ্চ আরও ১ লাখ টাকা ঋণ মিলবে। শুধু ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ারেই এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে। ‘জেড’, ‘এন’, ‘জি’ ক্যাটাগরি এবং এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিগুলো এই সুবিধার সম্পূর্ণ বাইরে থাকবে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, জীবন বিমা ছাড়া অন্যান্য খাতের শেয়ারের ক্ষেত্রে মূল্য আয়ের অনুপাত (পিই রেশিও) ৪০-এর বেশি হলে বা শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) নেতিবাচক হলে ঋণ মিলবে না। অন্যদিকে জীবন বিমার ক্ষেত্রে প্রাইস টু বুক ভ্যালু বা পিবি রেশিও ৩-এর বেশি হলে অথবা নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) নেতিবাচক হলে তা ঋণ সুবিধার অযোগ্য হবে। এ ছাড়া নিজের টাকায় মার্জিন অযোগ্য শেয়ার কিনলে তা গ্রাহকের ইক্যুইটি হিসেবে গণ্য হবে না। ঝুঁকি কমাতে নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, গ্রাহকের ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে ব্রোকারেজ হাউজ থেকে তাকে আগাম নোটিশ দিতে হবে এবং ২৫ শতাংশের নিচে নামলে নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রি করা যাবে। এ ছাড়া ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট বকেয়া ঋণের ২০ শতাংশের বেশি কোনো একক শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এক বছর মেয়াদি এই মার্জিন চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নযোগ্য এবং ঋণ অনুপাত ঠিক রেখে গ্রাহকরা যেকোনো সময় টাকা তুলতে পারবেন।
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার ‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে খসড়াটি প্রকাশ করেছে। বর্তমানে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই ও নীতিগত পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তথ্যসূত্র : বাসস প্রস্তাবিত এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডকে (সিএমএসএফ) একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই আইন কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা নগদ লভ্যাংশ, বোনাস ও রাইটস শেয়ার, রিফান্ড অর্থ ও আইপিওর অনাদায়ী অর্থ ফান্ডের অধীনে পরিচালিত হবে। তবে প্রকৃত মালিক বা তাঁদের উত্তরাধিকারীরা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে এসব সম্পদ পুনরায় ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। নতুন আইনটির ফলে সিএমএসএফ একটি আধুনিক নগদ লভ্যাংশ বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নগদ লভ্যাংশ বিতরণ প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীভূত হবে। বিনিয়োগকারীরা একই প্ল্যাটফর্ম থেকে তাঁদের প্রাপ্ত লভ্যাংশ এবং উৎসে কর কর্তনের সম্পূর্ণ চালান ও সনদ সংগ্রহ করতে পারবেন, যা কর সংক্রান্ত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতাকে অনেক সহজ করে তুলবে। ফান্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে দৈনন্দিন কাজ পরিচালিত হবে। পাশাপাশি তদারকির জন্য বিভিন্ন আর্থিক ও পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফান্ডের সুষ্ঠু পরিচালনায় নিয়মিত নিরীক্ষা ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের আইনি বাধ্যবাধকতাও থাকছে। এ ছাড়া তথ্য গোপন, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান বা ফান্ডের সম্পদ অপব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। নতুন আইনটি কার্যকর হলে বিদ্যমান ২০২১ সালের বিধিমালা বাতিল হয়ে যাবে। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই আইন দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়ে সিএমএসএফের অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ওয়াসি আজম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে অব্যবহৃত বিনিয়োগকারীর সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে এবং পুরো ব্যবস্থাটি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ হওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।
প্রায় দশ বছর অপেক্ষার পর অবশেষে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল আলোচিত চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। ২৭ জুলাই সকাল ১০টায় প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এর বাস্তবায়ন শুরু হতে চলেছে। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যা এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধার দিক থেকে জোনটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী নেতারা জানান, এই বিশেষায়িত অঞ্চলে পোশাকশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও অ্যাকসেসরিজ উৎপাদিত হলে চীনের ওপর আমদানিনির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনি উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন করে গতি এসেছে। ইতোমধ্যে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রকল্পটির সহায়ক অবকাঠামো যেমন জেটি, চার লেনের সংযোগ সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা নির্মাণে গত ১৬ জুন একনেক ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে চীন সরকার ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে। ২০১৪ সালে প্রথম সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর দীর্ঘসূত্রতা ও নানা জটিলতা কাটিয়ে আলোর মুখ দেখা এ প্রকল্পের কাজ ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বহুমুখী সংকটে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটালে চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সরকারি এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধা হারানো, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের মতো বিষয়গুলো এই চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পেছানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছে। আসন্ন জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) বৈঠক সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর স্থগিত করার সুপারিশ করেছে, যা এখন সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া মেধাস্বত্ব সুবিধা বাতিল হলে দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকে শ্রম অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তদন্তের কারণে দেশটির বাজারেও শুল্ক জটিলতা তৈরি হতে পারে। দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতিও বেশ চাপে রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তেলের আমদানি ব্যয় ৭২ শতাংশ ও সারের ব্যয় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভে টান পড়েছে। বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ এবং রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এই অস্থিতিশীল অর্থনীতিকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনতে এবং একটি মসৃণ এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে অন্তত আরও কয়েক বছর প্রস্তুতির সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলা কিউআর (Bangla QR) ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, এর ফলে নগদ অর্থ বহনের প্রয়োজন যেমন কমবে, তেমনি জাল ও ছেঁড়া নোটের ভোগান্তি থেকেও মুক্তি মিলবে। সোমবার (২০ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ‘বাংলা কিউআর রিলস মেকিং’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গভর্নর জানান, গত ১ জুলাই থেকে দেশের লেনদেনে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা একটি অভিন্ন কিউআর কোড ব্যবহার করে যেকোনো স্থান থেকে সহজে অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন। এটি একদিকে যেমন লেনদেনের গতি বাড়াবে, অন্যদিকে আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে। অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশেও দ্রুত বাড়ছে। সব ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহকদের জন্য বাংলা কিউআরের ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের লেনদেন ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও নগদ অর্থনির্ভরতামুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। উল্লেখ্য, বাংলা কিউআর সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার জনপ্রিয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই রিলস মেকিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত ১০ জন বিজয়ীকে পুরস্কার প্রদান করা হয়।
বর্ষার মৌসুমেও প্রয়োজনীয় পানি ও উপযুক্ত জলাশয়ের অভাবে কাটা পাট জাগ দিতে পারছেন না ঈশ্বরদীর পাটচাষিরা। এ কারণে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদীতে প্রধানত তোষা ও দেশি জাতের পাট চাষ হয়। চলতি মৌসুমে উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫৯ হেক্টর। তবে গত বছর পাটের ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বেড়ে যায়। ফলে এবার ৩৬৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগ বিনামূল্যে উন্নত জাতের পাটবীজ ও সার বিতরণ করেছে। উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের চরমিরকামারী গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, “এবার ১০ বিঘা জমিতে তোষা পাট চাষ করেছি। চার বিঘার পাট ইতোমধ্যে কেটেছি। কিন্তু জাগ দেয়ার মতো কোনো জায়গা পাচ্ছি না। পানি না থাকায় পাট নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছি।” অরণকোলা এলাকার কৃষক মো. মিজানুর বলেন, “আগে গ্রামের বিভিন্ন ডোবা-খালে সহজেই পাট জাগ দেয়া যেত। এখন অধিকাংশ জায়গা মাছ চাষের পুকুরে রূপ নিয়েছে। ফলে পাট পচানোর মতো জলাশয় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।” দিনমজুর কাদের আলী জানান, পাট কাটার পর কয়েক দিন জমিতে স্তূপ করে রেখে পাতা ঝরানো হয়। এরপর পানিতে ডুবিয়ে জাগ দিতে হয়। কিন্তু পানি না থাকায় কাটা পাট জমিতেই পড়ে আছে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও জাগ দেয়ার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, “এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলনের আশা করছি। বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে কৃষকরা লাভবান হবেন। কৃষকদের উৎসাহ দিতে ১০০ জন কৃষকের মধ্যে উন্নত জাতের পাটবীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “মাছ চাষের পুকুরে পাট জাগ দেয়া উপযুক্ত নয়। তাই কৃষকদের বাড়ির আশপাশের পরিত্যক্ত বা বুজে যাওয়া পুকুর এবং সরকারের খনন করা খালগুলো ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এসব জলাশয় পাট পচানোর জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বিকাশে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সদ্য পাস হওয়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপন করা হবে। এসব হাবে সাংস্কৃতিক মঞ্চ, সিনেপ্লেক্স এবং স্থানীয় পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া ‘একটি গ্রাম-একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, তাঁত, নকশিকাঁথাসহ দেশীয় পণ্যের প্রসার ঘটানো হবে। বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা জানান, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রামীণ তরুণদের দক্ষতা কাজে লাগালে বিপুল উদ্যোক্তা তৈরি হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন মনে করেন, দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক হাব গড়ে উঠলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য আয়ের নতুন পথ উন্মুক্ত হবে। এ খাতের প্রান্তিক উদ্যোক্তারাও সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বিকাশে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সদ্য পাস হওয়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপন করা হবে। এসব হাবে সাংস্কৃতিক মঞ্চ, সিনেপ্লেক্স এবং স্থানীয় পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া ‘একটি গ্রাম-একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, তাঁত, নকশিকাঁথাসহ দেশীয় পণ্যের প্রসার ঘটানো হবে। বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা জানান, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রামীণ তরুণদের দক্ষতা কাজে লাগালে বিপুল উদ্যোক্তা তৈরি হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন মনে করেন, দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক হাব গড়ে উঠলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য আয়ের নতুন পথ উন্মুক্ত হবে। এ খাতের প্রান্তিক উদ্যোক্তারাও সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত ‘বে টার্মিনাল’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তা অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, এই টার্মিনাল চালু হলে বন্দরে সরাসরি বড় মাদার ভেসেল ভিড়তে পারবে, যার ফলে আমদানি-রপ্তানির পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। একই সঙ্গে বন্দরকেন্দ্রিক কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর বিচার করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। সংসদ অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বন্দরটিকে দেশের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে জানান, রাষ্ট্রীয় সম্পদের কোনো ধরনের অপচয় রোধে সরকার বদ্ধপরিকর। নাব্যতা সংকটের কারণে বর্তমানে বড় জাহাজগুলো সরাসরি বন্দরে আসতে পারে না। বে টার্মিনাল নির্মিত হলে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
বাংলাদেশকে একটি ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে পুরোপুরি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি জানান, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়াই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, ব্লু-ইকোনমি ও ইকো-ট্যুরিজম খাতে ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানি আরও সহজ ও কার্যকর করতে যুবসমাজের জন্য চাহিদাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা, বিভিন্ন ভাষা শেখানো এবং যুগোপযোগী কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দুর্বল অর্থনীতির মধ্যেও দেশ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সব বাধা দূর করে তরুণ ও উদ্যোক্তাদের কাজে লাগানোর মাধ্যমেই একটি প্রত্যাশিত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডকে অন্যান্য সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি পণ্য বিতরণের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত টিসিবির কার্যক্রম মূল্যায়ন সভায় এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণের একটি রূপরেখা নিয়ে এসব আলোচনা হয়। সভায় বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, দরপত্রে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়লে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য কমবে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এজন্য দেশি-বিদেশি বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ভুল ব্যয় প্রাক্কলনের ওপর তিনি জোর দেন। এআই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করা হবে। অন্যদিকে, ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে টিসিবির পণ্য তালিকায় আরও নতুন সামগ্রী যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফয়সল আজাদ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।
শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে। বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি। বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’। বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।” বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।” বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি... ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।” আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব। এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?” আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।” চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।” এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম। সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে। এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর। বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।” বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম। হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।