আর্জেন্টিনা অনেক দূরের দেশ। রবীন্দ্রনাথের কাছে তখন অচেনা পৃথিবী। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন প্লাজা হোটেলে। সেখান থেকে একদিন স্বপ্নের মতো তাঁকে চলে যেতে হলো সান ইসিদ্রোতে। বিচিত্র লাল-নীল ফুলের উৎসবে সজ্জিত সুন্দর বাড়ি, মিরালরিও ভিলা। বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নদী দেখা যায়, রুপালি নদী, নদীর নাম রিও ডেলা প্লাটা। রবীন্দ্রনাথ ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে বসে নদী দেখেন। নদী তো নয় যেন এক নারীর রহস্য-প্রতিকৃতি। কে সেই নারী, কোত্থেকে আবির্ভূত হলো সেই নিরুপমা বিদেশিনী, যাঁর সংস্পর্শে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত আবেগে ভেসে যাচ্ছেন, অশ্রুতে হাসিতে হয়ে পড়ছেন চঞ্চল উন্মনা। অসুস্থতার মধ্যেও যেন সুখের মতো অসুখে জর্জরিত হয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরতে চাইছেন, কিন্তু ফেরা হচ্ছে না। অদ্ভুত এক পিছুটান তাঁকে আটকে ধরেছে। কী সেই পিছুটান? লা হিয়া কোন্ডা দেলসুর, যার অর্থ দক্ষিণের মোনালিসা। সবাই তাঁকে চেনে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নামে। পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের বসন্ত ঋতু তখন মিশে যাচ্ছিল গ্রীষ্মের সাথে, প্রকৃতির এমনই নাটকীয় পরিবর্তনের কালে রবীন্দ্রনাথের সাথে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ভাবের আদান-প্রদান হয়, নৈঃশব্দ্যের ভেতর সঞ্চারিত হয় নতুন শব্দমালা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়ার ভাষা বুঝতেন না, তাহলে তাঁদের ভাববিনিময়ের মাধ্যম কী ছিল? সুখের মতো অসুখের দিনগুলিতে রবীন্দ্রনাথ কী ভাবতেন, কী লিখতেন, আর তিনি কীভাবেই-বা পৌঁছালেন এমন এক রহস্যময় অজানা ভাষার দেশে! রবীন্দ্রনাথের জীবনের এমন রহস্যময় কালপর্বের ভারী পর্দা উন্মোচিত হয়েছে গত ১২ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে। রবীন্দ্রনাথ আর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অলৌকিক অপূর্ব সুন্দর সাক্ষাতের অসাধারণ বিন্যাস, ম্যাড থেটারের নাটক ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’। নাটকটি গবেষণাধর্মী প্রযোজনা হওয়ায় শুধু সাধারণ দর্শক নয়, ছাত্র, শিক্ষক গবেষকসহ কবি-সাহিত্যিকদেরও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া। নাটকটি রচনা, নির্দেশনা ও পরিকল্পনা করেছেন ম্যাড থেটারের প্রধান পরিচালক আসাদুল ইসলাম। নাটকটির চরিত্র সংখ্যা দুটি। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রে অভিনয় করেছেন আসাদুল ইসলাম এবং ভিক্টোরিয়া চরিত্রে সোনিয়া হাসান। রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর শতাব্দীপ্রাচীন প্রেমকে নাটকের মধ্য দিয়ে স্মরণে ম্যাড থেটার বিরল ব্যতিক্রম। নতুন উদ্বোধন ঘটেছে ম্যাড থেটারের সাড়া জাগানো নাটক ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’-এর মধ্য দিয়ে। গত ১২ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনেটে হয়েছে নাটকটির ত্রয়োদশ প্রদর্শনী।
আসাদুল ইসলাম
অক্টোবর ২১, ২০২৬
0
ধরা যাক, পর্দায় প্রয়াত সুচিত্রা সেন ও উত্তম কুমারকে আবার অভিনয় করতে দেখা যাচ্ছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো মুহূর্তে স্ক্রিপ্ট বা ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন করছে এবং শারীরিক কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই বিপজ্জনক স্টান্ট ফুটিয়ে তুলছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে না, সাথে খুব অল্প সময়ে নিখুঁতভাবে দৃশ্যগুলো দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এআই ভিডিওর কল্যাণে মিডিয়া জগতে এই বিপুল পরিবর্তন একদিকে যেমন সময় ও অর্থ সাশ্রয় করছে, ঠিক একইভাবে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের নিরাপত্তাজনিত প্রশ্ন তুলছে। তা ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে এআই ভিডিওর বিপুল জনপ্রিয়তা কীভাবে ব্যবহারকারীদের প্রভাবিত করছে তাও লক্ষণীয় বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় বাস্তবের চেয়ে এখন এআই অ্যানিমেশন ভিডিও অনেক বেশি জনপ্রিয়। এর পেছনে রয়েছে চোখধাঁধানো ভিজ্যুয়াল ও তীব্র কালার গ্রেডিং, যা মানুষের মনোযোগ দ্রুত আকর্ষণ করে। এখানে ‘অ্যাক্ট টু’ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অভিনেতাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং মুখের এক্সপ্রেশন রেকর্ড করে কাল্পনিক চরিত্রের ওপর নিখুঁতভাবে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে অ্যালগরিদমের কারসাজি। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নতুন ও ট্রেন্ডিং জিনিস বেশি প্রমোট করে। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে এই ভিডিওগুলো সব থেকে বেশি মেয়েদের আকৃষ্ট করে। কেননা বিশ্বজুড়ে কে-পপ ও অ্যানিমে জগতে বিশালসংখ্যক মেয়ে ভক্ত রয়েছে, এবং এই ভিডিওতে বেশির ভাগ কে-পপ বা অ্যানিমের চরিত্রের অবতার বানানো হয়, যার ফলে মেয়েরা বেশি আকৃষ্ট হয়। এর প্রভাব তাদের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। এআই ভিডিওতে নিখুঁত নারী ও পুরুষ চরিত্র দেখার ফলে অনেক সময় বাস্তব চেহারা বা গায়ের রঙের সাথে তুলনা চলে আসে। ফলে তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও বডি ইমেজ ইস্যু তৈরি হতে পারে। এআই ভিডিও যেহেতু অভিনয় জগতে বিশাল পরিবর্তন এনেছে, এটি আর্থিকভাবে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রকে ক্ষতির সম্মুখীন করছে। যেমন ছোটখাটো বিজ্ঞাপন বা শিক্ষণীয় কনটেন্টের জন্য এখন আর অভিনেতা ভাড়া করা হচ্ছে না। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো Synthesia বা HeyGen-এর মতো এআই টুল ব্যবহার করে অনেক সস্তায় এআই অবতার দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে নবাগত অভিনেতাদের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। আবার ব্যাকগ্রাউন্ড ভিডিওতে আগে যেখানে বড় যুদ্ধের ময়দান বা বিপুলসংখ্যক লোক প্রয়োজন হতো, এখন এআইয়ের মাধ্যমে মানুষের ডিজিটাল ভিড় তৈরি করা হয়। তা ছাড়া একটি মাত্র কমান্ড বা প্রম্পট দিয়ে একাধিক অ্যাঙ্গেল থেকে পুরো দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব, যা এডিটিংকে সহজ করে দিয়েছে। স্বয়ংক্রিয় এডিটিংয়ের ফলে বিভিন্ন মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারাচ্ছে। আবার ভার্চ্যুয়াল ইনফ্লুয়েন্সার (যেমন মিকেলা বা লিল মিকেলার মতো ক্যারেক্টার) ব্যবহার করার মাধ্যমে বাস্তব জগতের ইনফ্লুয়েন্সারদের ওপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্ভরশীলতা কমে যাচ্ছে। এই ডিপফেক এআই ভিডিওগুলোর কারণে সমাজে একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হয়েছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘লায়ার্স ডিভিডেন্ড’ বলেছেন। এর অর্থ এআই ভিডিও এত বেশি নিখুঁত হচ্ছে যে, এখন মানুষ আসল ভিডিওকেও নকল বা ভুয়া মনে করছে। এর ফলে যদি কোনো মানুষ সত্যিকারের কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে সে অতি সহজেই বিষয়টিকে এআই বলে দায় এড়াতে পারে, যা মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এআই বিষয়ক এসব সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সরকারি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এআই ভিডিওকে চেনার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এআই অ্যাক্ট’-এ যেকোনো এআই জেনারেটেড কনটেন্টে ওয়াটারমার্ক বা লেবেল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে দর্শকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘নো ফেকস অ্যাক্ট’ (NO FAKES Act)-এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার চেহারা ও কণ্ঠ ব্যবহার পুরোপুরি অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে মানুষের চেহারা ও কণ্ঠস্বরকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, যাতে কেউ এটি লঙ্ঘন করলে সরাসরি আদালতে মামলা করা যায়। এআই ভিডিও অনেক ক্ষেত্রে যেভাবে মানুষের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত করছে, পাশাপাশি এটি নতুন কর্মসংস্থানেরও বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করছে। যেমন : প্রম্পট ডিরেক্টর এবং এআই এথিক্স অডিটর। যারা পরবর্তী সময়ে নিখুঁত ভিডিও বানানোর জন্য প্রম্পটকে দিকনির্দেশনা দেবে এবং এআই এথিক্স অডিটরের মাধ্যমে কোনো ভিডিও আসল নাকি নকল তা যাচাই করবে। যেহেতু এআই নিখুঁতভাবে মানুষের আবেগকে ফুটিয়ে তুলতে পারে, এখানে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে এগুলো যেন শুধু বিনোদনের মাধ্যম হয়; এগুলো কোনোভাবেই যেন আসল মানুষের আবেগকে প্রতিস্থাপিত করতে না পারে।
তামিম নূরানী প্রেমা
অক্টোবর ১৮, ২০২৬
0
শিক্ষা হলো জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। এটি চরিত্র গঠন, নৈতিকতার উন্মেষ এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। তবে শিক্ষার এই আলো কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয় বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি একজন শিক্ষিত মানুষের কী দায়বদ্ধতা রয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। উপযুক্ত শিক্ষা মানুষকে ভালো-মন্দ অনুধাবন করতে শেখায়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো এমন একটি মানবিক, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল চরিত্র গড়ে তোলা, যা মানুষকে সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে শেখায়। জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে মানুষের দায়বদ্ধতাও বৃদ্ধি পায়। একজন অশিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষের কাছ থেকে সমাজ যতটুকু প্রত্যাশা করে, একজন শিক্ষিত মানুষের কাছে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা থাকে। জ্ঞান হলো একপ্রকার শক্তি, আর এই শক্তিকে সমাজে ভালো কাজে ব্যবহার করাই শিক্ষার প্রতি আমাদের প্রধান দায়বদ্ধতা। নিজে নীতি ও আদর্শ মেনে চলা এবং সমাজে সত্য ও সুবিচারের পক্ষে অবস্থান নেয়া। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমাজ থেকে নানা ধরনের কুসংস্কার দূর করতে নেতৃত্ব দেয়া। সমাজের দরিদ্র, নিরক্ষর ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের শিক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে এগিয়ে আসা। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা, গাছ লাগানো এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নিজে সচেতন হওয়া ও অন্যকে সচেতন করা। আইন মেনে চলা, দেশের সম্পদে অপচয় না করা, দুর্নীতি প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়া এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা, গুজব রোধ করা এবং সাইবার জগতে দায়িত্বশীল আচরণ করাও শিক্ষিত নাগরিকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। আজকের যুগে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতার চরম অবক্ষয় ঘটছে। অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি দুর্নীতি, অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং অন্যায় কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। এর মূল কারণ—শিক্ষাকে আমরা কেবল ‘জীবিকা অর্জনের উপায়’ বানিয়ে ফেলেছি, ‘জীবন গড়ার মাধ্যম’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সনদকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে নৈতিক ও দায়বদ্ধতাসম্পন্ন শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষা ও দায়বদ্ধতা একে অপরের পরিপূরক। দায়বদ্ধতাহীন শিক্ষা সমাজ ও জাতির জন্য কুফল বয়ে আনে। একটি সুন্দর, প্রগতিশীল ও মানবিক সমাজ গঠন করতে হলে প্রতিটি শিক্ষিত নাগরিককে তার অর্জিত জ্ঞানের আলো দিয়ে অন্যের জীবনকে আলোকিত করা। নিজের স্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে অর্জিত জ্ঞানকে নিয়োজিত করাই হোক শিক্ষা অর্জনের পরম ও চরম সার্থকতা।
মোহাম্মদ করিম হোসেন
অক্টোবর ১৯, ২০২৬
0
আনন্দের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। এর জন্য বিশেষ স্থান, কাল কিংবা পাত্রের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি সুন্দর মন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনের বাস্তবতাকে সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা। অথচ আমাদের সমাজে এই উদার দৃষ্টিভঙ্গির অভাবই অনেক সময় চোখে পড়ে। ফলে আমরা নিজের প্রাপ্তির আনন্দ উপভোগ না করে অন্যের প্রাপ্তি দেখে আক্ষেপ করি। এটি হয়তো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু যারা এই সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন, তারাই প্রকৃত অর্থে প্রশান্ত, পরিতৃপ্ত ও সুখী জীবন যাপন করেন। উন্নত দেশগুলোর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্ক, সৃজনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই উদ্দেশ্যে স্কুলগুলোতে নিয়মিত নানা আয়োজন করা হয়—কখনো শিক্ষার্থীদের জন্য, কখনো অভিভাবকদের অংশগ্রহণে। আমাদের সন্তানের স্কুলেও বিভিন্ন সময় এমন ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সুযোগ পেলেই আমরা সেসব অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করি। এতে শিশুদের যেমন আনন্দ হয়, তেমনি অভিভাবকদের মধ্যেও পারস্পরিক পরিচয়, মতবিনিময় ও সৌহার্দ্যের একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে আমাদের সন্তানের স্কুলে ‘Parents Mingle’ নামে এমনই একটি আয়োজন হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে স্কুলে পৌঁছে দেখি, প্রতিটি আসনের সামনে রঙিন কাগজে মোড়ানো একটি করে উপহারের বাক্স রাখা আছে। নিয়ম ছিল—যিনি যে আসনে বসবেন, সেই বাক্সটিই হবে তাঁর। আমি ও আমার স্ত্রী পাশাপাশি বসেছিলাম। বাক্স খুলতেই ভেতরে পেলাম একটি করে ফ্রেমে আঁকা ছবি এবং রং করার প্রয়োজনীয় উপকরণ। প্রত্যেকের জন্যই ছিল ভিন্ন ভিন্ন ছবি। আমার ভাগ্যে এলো একটি সুন্দর চিত্র, আর আমার স্ত্রীর ছবিটি ছিল আলাদা। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, সব অভিভাবকই শিশুর মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে নিজেদের ছবিতে রঙের ছোঁয়া দিচ্ছেন। কেউ গল্প করছেন, কেউ মিটিমিটি হাসছেন, আবার কেউ গভীর মনোযোগে রঙের পর রং বসিয়ে ছবিকে প্রাণবন্ত করে তুলছেন। আয়োজকেরা মাঝেমধ্যে এসে উৎসাহ দিচ্ছিলেন, স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করছিলেন এবং স্ন্যাকস পরিবেশন করছিলেন। প্রাণচঞ্চল সেই পরিবেশে সময় যেন ডানা মেলে উড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ঘোষণা এলো—যিনি যে ছবিতে রং করেছেন, সেই ছবিটিই তাঁর। অর্থাৎ সবাই নিজেদের রঙে সাজানো চিত্রটি স্মারক হিসেবে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন। ঘোষণাটি শুনে মনের অজান্তেই বলে উঠলাম, ওয়াও! মুহূর্তেই উপলব্ধি করলাম, আনন্দ সৃষ্টি করতে খুব বড় কিছুর প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু সুন্দর একটি ভাবনা। সেখানে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল না জয়-পরাজয়ের কোনো হিসাব। কেউ পরাজিত হননি, সবাই ছিলেন বিজয়ী। প্রত্যেকের হাতে ছিল নিজের সৃষ্টির আনন্দ, নিজের শ্রমের স্মৃতি এবং নিজের অর্জনের গর্ব। আয়োজকদের এই অনন্য চিন্তাভাবনা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে গেল। এই ছোট্ট আয়োজন আমাকে নতুন একটি শিক্ষা দিয়েছে, নতুন প্রেরণাও জুগিয়েছে। আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেয়া যায়। একটি সাধারণ রঙতুলিও মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে, নতুন সম্পর্কের সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে পারে এবং জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু নির্মল মুহূর্ত উপহার দিতে পারে। এটি ছিল আমার জীবনের এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। আগে কখনো এভাবে বসে ছবি আঁকার সুযোগ হয়নি। রঙের পরতে পরতে যেন নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করলাম। সেদিন উপলব্ধি করলাম, শিল্পী হওয়ার জন্য নিখুঁতভাবে আঁকতে জানতে হয় না; প্রয়োজন শুধু আনন্দ নিয়ে রঙ ছড়িয়ে দেওয়ার সাহস। হয়তো সেদিনই নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক নতুন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। সেই রঙিন সময় আজও মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলো অনেক সময় রঙে নয়, আনন্দে আঁকা হয়।
মোহাম্মদ মহিবুর রহমান
অক্টোবর ১২, ২০২৬
0
চাকমা জাতির আদি সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিতে চুঙুলং পূজা এক অনন্য ও অপরিহার্য স্থান দখল করে আছে। সূর্যবংশীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে এই পূজা কেবল একটি আচার নয়, বরং এটি একটি দম্পতিকে সামাজিকভাবে স্বামী-স্ত্রীর স্বীকৃতি দেয়ার একমাত্র বৈধ পথ। চাকমা সমাজে বিশ্বাস করা হয় যে, পরমেশ্বর ও পরমেশ্বরীর আশীর্বাদ ছাড়া কোনো দাম্পত্য জীবন সার্থক হতে পারে না। বিবাহকালীন সময়ে এই দেব-দেবীর উদ্দেশে পূজা নিবেদন করাই হলো চুঙুলং। এটি সম্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো যুগলকে সামাজিকভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য করা হয় না। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী, এই পূজা সম্পন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দম্পতির একত্র বসবাস বা সহবাসকে অবৈধ ও সামাজিক আইনবিরুদ্ধ মনে করা হয়। চাকমা সাহিত্যের কালজয়ী ‘রাধামন-ধনপদি’ পালা গানে চুঙুলং-এর গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই আখ্যান থেকে আমরা দেখি যে, বিবাহ কেবল ঘটা করে অনুষ্ঠান করা বা ‘জোড়া বানা’ (বিবাহের প্রস্তুতিমূলক আচার) সম্পন্ন করার নাম নয়। ধনপদি যখন এক মহাজনের ছেলের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছিলেন এবং বিয়ের প্রাথমিক সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছিল, তখনো কিন্তু সমাজ তাকে বিবাহিত বলে মেনে নেয়নি। বিবাহের চূড়ান্ত লগ্নে রীতি অনুসারে ভোরে যখন ধনপদি 'চুঙুলং পানি' আনতে যান, তখন সেই পবিত্র কলস নিয়ে তিনি তার প্রকৃত প্রেমিক রাধামনের গৃহে উপস্থিত হন। রাধামন ও ধনপদির এই সাহসী পদক্ষেপের পর গ্রামে যে সালিশ বসেছিল, সেখানেও জয় হয়েছিল তাদেরই। সালিশের রায় প্রমাণ করে যে: শুধু বিয়ের আয়োজন বা অন্য কোনো লৌকিকতা বিবাহকে পূর্ণতা দেয় না। চুঙুলং পূজার জন্য আনা জল বা এই আচারের সংকল্প যার সাথে সম্পন্ন হয়, সমাজ তাকেই বৈধ জীবনসঙ্গী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ধনপদি রাধামনের গৃহে চুঙুলং কলস নিয়ে ওঠার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হয় যে, তার বিবাহের আধ্যাত্মিক ও আইনি বৈধতা রাধামনের সাথেই যুক্ত হয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, চাকমা সমাজ ব্যবস্থায় চুঙুলং পূজা হলো একটি পবিত্র রক্ষাকবচ এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মূল চাবিকাঠি। রাধামন-ধনপদি পালার মাধ্যমে এই শিক্ষাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, চুঙুলং ব্যতিরেকে বিবাহ অসম্পূর্ণ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটিই বিবাহের চূড়ান্ত আইনগত ও সামাজিক ছাড়পত্র, যা যুগ যুগ ধরে চাকমা সমাজের নীতি ও আদর্শ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।
ইনজেব চাঙমা
অক্টোবর ১২, ২০২৬
0
বাইপোলার ডিসঅর্ডার একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে ব্যক্তির মেজাজ, শক্তি, ঘুম, চিন্তাভাবনা ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ও কম ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অর্থাৎ ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার পর্ব দেখা যায়; আবার কখনো গভীর বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। এর চিকিৎসায় ওষুধ ও সাইকোথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি জীবনযাপন, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম এবং খাদ্যাভ্যাসও সামগ্রিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা ডায়েট বাইপোলার ডিসঅর্ডার সারিয়ে দিতে পারে না। পুষ্টি চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং এটি চিকিৎসার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। মস্তিষ্ক শরীরের অত্যন্ত সক্রিয় একটি অঙ্গ। এর স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা এবং বিপাকীয় জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তাই বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ‘মুড ঠিক করার খাবার’ খোঁজার পরিবর্তে একটি সুষম, বৈচিত্র্যময় ও নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ছোলা, পূর্ণশস্য, মাছ, ডিম, পরিমিত পরিমাণে মাংস, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারের পরিমাণ কমানো উপকারী। বাংলাদেশি খাদ্যসংস্কৃতিতে ভাত বা রুটি বাদ দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এর সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, ডাল, মাছ বা অন্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস যুক্ত করা যেতে পারে। মাছের তেলে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্ক ও হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ, যেমন সার্ডিন, ম্যাকারেল বা অন্যান্য স্থানীয়ভাবে পাওয়া মাছ এর ভালো উৎস হতে পারে। বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং কিছু গবেষণায় বিষণ্নতার উপসর্গে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে প্রমাণ এখনো এমন নয় যে ওমেগা-৩-কে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের স্বতন্ত্র চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, অতিরিক্ত ক্যালরি কমানো বা অনিয়মিত খাবারের অভ্যাস শরীরের শক্তি ও ক্ষুধার স্বাভাবিক ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে ঘুমের অনিয়মও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে, ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার সময় ঘুমের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন, এনার্জি ড্রিংক বা রাতের দিকে বেশি চা-কফি গ্রহণ ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ ক্ষুধা, ওজন, রক্তে শর্করা, রক্তের চর্বি বা অন্যান্য বিপাকীয় সূচকে পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ওজন, রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ ও লিপিড প্রোফাইলসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সূচক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ সতর্কতার বিষয় হলো লিথিয়াম। লিথিয়াম গ্রহণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীরে পানিশূন্যতা এবং সোডিয়াম গ্রহণে বড় ধরনের পরিবর্তন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই লিথিয়াম গ্রহণের সময় নিজের ইচ্ছায় লবণ বা পানি গ্রহণের পরিমাণে বড় পরিবর্তন আনা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ব্যবহৃত কিছু ওষুধের কারণে কারও ওজন বাড়তে পারে। তাই ওজন বৃদ্ধি হলে ব্যক্তিকে শুধু ‘কম খেতে হবে’ বা ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ওজন ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, ওষুধের প্রভাব এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা। বাইপোলার ডিসঅর্ডার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, হারবাল পণ্য, ডিটক্স ডায়েট, দীর্ঘমেয়াদি উপবাস বা বিশেষ ডায়েটকে ‘প্রাকৃতিক চিকিৎসা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। এসব দাবির অনেকগুলোর পেছনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশেষ করে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো মানসিক রোগের ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী, পুষ্টিবিদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণের সময় তার ওষুধ, বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওজন, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং খাদ্যসংস্কৃতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সবশেষে মনে রাখতে হবে, খাদ্য বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসার বিকল্প নয়; তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস চিকিৎসার পাশাপাশি শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং একটি স্থিতিশীল জীবনযাপন সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
রাইসা মেহজাবীন
অক্টোবর ১৯, ২০২৬
0
আমরা জানি, বন্ধ্যাত্ব বলতে নিয়মিত ও অসুরক্ষিত শারীরিক সম্পর্কের পর ১২ মাস বা তার বেশি সময় ধরে গর্ভধারণে ব্যর্থ হওয়াকে বোঝায়। বর্তমানে প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বন্ধ্যাত্বের সমস্যার সম্মুখীন হন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আমরা আরও জানি, তামাক ব্যবহার দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের অন্যতম কারণ। তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব শুধু এতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, তামাক ব্যবহার নারী ও পুরুষ উভয়েরই প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং দম্পতিদের জন্য গর্ভধারণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই WHO সুপারিশ করে, যারা সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের তামাকের এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং তামাক ছাড়তে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সহায়তা প্রদান করা উচিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক প্রমাণে দেখা গেছে, গুলসহ তামাকজাত দ্রব্য চিবানো এবং ধূমপান নারীর প্রজননক্ষমতার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, যাঁরা ধূমপান করেন বা তামাকজাত দ্রব্য চিবান, তাঁদের বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি তামাক ব্যবহার না করা নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ধূমপান বা তামাক চিবানো গর্ভধারণে বিলম্ব ঘটাতে পারে। যাঁরা গর্ভধারণের চেষ্টা করার সময়ও তামাক ব্যবহার চালিয়ে যান, তাঁদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়। WHO জানিয়েছে, যাঁরা ধূমপান ছেড়ে দেন, তাঁদের বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি ধূমপান চালিয়ে যাওয়া নারীদের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম হতে পারে। এ ছাড়া যাঁরা নিজেরা ধূমপান করেন না, তাঁরাও পুরোপুরি নিরাপদ নন। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শেও বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। তাই বাড়ি ও জনসমাগমস্থলে নারীদের তামাকের ধোঁয়া থেকে সুরক্ষা দেয়া প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। WHO-এর মতে, সিগারেট ধূমপান পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে রয়েছে বীর্যের গুণগত মানের অবনতি এবং যৌনক্ষমতার সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ধূমপান করেন বা তামাক ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো বেশি দেখা যেতে পারে। যেমন : শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া; শুক্রাণুর চলাচলের ক্ষমতা কমে যাওয়া; অস্বাভাবিক আকৃতির শুক্রাণু; ইরেকটাইল ডিসফাংশন; বীর্যপাতজনিত সমস্যা; কিছু ক্ষেত্রে অ্যাজুস্পার্মিয়া, অর্থাৎ বীর্যে সম্পূর্ণভাবে শুক্রাণুর অনুপস্থিতি। এ ছাড়া ই-সিগারেট ও ওয়াটারপাইপ (হুক্কা) ব্যবহারও বীর্যের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং শুক্রাণুর গুণগত মান খারাপ হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেসব দম্পতি বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ধূমপান চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। WHO-এর মতে, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের (IVF) মতো চিকিৎসার সময় ধূমপানের কারণে গর্ভধারণের হার এবং জীবিত সন্তান জন্মের হার কমে যেতে পারে। অনেকেই মনে করেন, শুধু সিগারেটই ক্ষতিকর। কিন্তু WHO-এর মতে, তামাক বিভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হয়, যেমন : সিগারেট, সিগার, বিড়ি, ওয়াটারপাইপ (হুক্কা), চিবানোর তামাক (গুল, জর্দা ইত্যাদি), নিকোটিনযুক্ত ই-সিগারেট এসব পণ্যই প্রজনন ব্যবস্থার ক্ষতি করতে পারে। বাংলাদেশের ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৫.৫ শতাংশ বর্তমানে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (HTP) এবং নিকোটিন পাউচের মতো নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করছেন। আর জীবনে অন্তত একবার এসব পণ্য ব্যবহার করেছেন ২৮.১ শতাংশ তরুণ। WHO সুপারিশ করে, প্রজননক্ষম বয়সের মানুষের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের নিয়মিত তামাক ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করা উচিত এবং তামাক ছাড়তে কার্যকর সহায়তা প্রদান করা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে কাউন্সেলিং, কুইটলাইন সেবা, মোবাইল মেসেজিং প্রোগ্রাম, চ্যাটবট ও মোবাইল অ্যাপের মতো ডিজিটাল সহায়তা, প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত তামাক ছাড়ার ওষুধ প্রভৃতি।
এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
প্রতিটি সৃষ্টি মূল্যবান। কোনো প্রাণী নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি; সৃষ্টিকর্তা এমনি এমনি সৃষ্টি করেননি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সব প্রাণীর বাঁচার অধিকার রয়েছে। ওদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করবেন না, পারলে সহানুভূতিশীল হয়ে পাশে দাঁড়ান। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় প্রাণীগুলো মানুষের ভালোবাসারই অপেক্ষায় থাকে। বিশেষ করে যেসব কুকুর-বিড়াল রাজপথে কিংবা অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায়, তাদের জীবনের বড় একটা অংশ কাটে অনাহারে। নিজের খাবারের সামান্য একমুঠো ওদের তুলে দিলে তাদের ক্ষুধার কষ্ট মেটে, আর বিনিময়ে পাওয়া যায় নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র ঠান্ডার সময়ে প্রাণীগুলোকে তাড়িয়ে না দিয়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ দিন। ওদের কৃতজ্ঞ চোখের চাহনিই আপনাকে বুঝিয়ে দেবে এই সামান্য দরদের মূল্য। ওদের গায়ে ছোটখাটো ক্ষত বা ঘা দেখলে অবহেলা করবেন না। ঘরে থাকা সামান্য হলুদের গুঁড়া কিংবা সামান্য কিছু টাকার একটু অ্যান্টিসেপটিক মেডিসিন ওদের ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তুলতে পারে। এতে শুধু তারাই সুস্থ থাকে না, সংক্রমণ থেকে আমাদের চারপাশের পরিবেশও নিরাপদ থাকে। পাখি শিকার বন্ধে সচেতন হোন এবং চোখের সামনে কোনো প্রাণীকে নির্যাতন হতে দেখলে তার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ওদের কথা বলার ভাষা নেই, নিজের অধিকার দাবি করার শক্তি নেই। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমরা যদি এই অবলা প্রাণীগুলোর পাশে না দাঁড়াই, তবে ওদের আগলে রাখবে কে! সামান্য সহানুভূতি দিয়েই শুরু হোক আমাদের পশুপাখিদের ভালোবাসার এই পথচলা।
সোহাগ চন্দ্র রায়
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
বিদ্যার্জন ও শিক্ষালাভ মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাণিজগতের মধ্যে মানুষই এমন এক প্রাণী, যে জন্মের পর শিক্ষা ও বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়। সুশিক্ষা, বিদ্যার্জন ও মানবিক গুণাবলির চর্চা ছাড়া কেবল মানুষের অবয়ব ধারণ করলেই প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে ওঠা যায় না। তাই মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার জন্যই আমাদের বিদ্যা অর্জন করতে হয়। আর সেই লক্ষ্যে শিশুকাল থেকে আমরা বিদ্যার্জনের প্রথম ধাপে বর্ণ শেখা শুরু করি। এরপর যেতে শুরু করি বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এ রকম আরও নানা প্রতিষ্ঠানে। এসব বিদ্যাপীঠে গিয়ে আমরা বিদ্যা লাভ করি। বছরের পর বছর পরীক্ষা দিয়ে মূল্যবান সনদ অর্জন করি এবং সমাজের চোখে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। কিন্তু এত পরিশ্রম, অধ্যাবসায়ের পরও অনেক জ্ঞানী ব্যক্তির অনেক কাজকর্ম, চিন্তাভাবনা, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও যুক্তি-তর্ক অনেক সময় অজ্ঞ ব্যক্তিদের মনেও প্রশ্ন জাগায়। জ্ঞান মানুষকে চিনতে শেখায়, বিদ্যা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে, আর সুশিক্ষা তাকে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। বস্তুত প্রকৃত শিক্ষার সূচনা হয় ভ্রূণাবস্থাতেই। এরপর শিশুর মা-বাবা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ সবার আচার-ব্যবহার ও কথোপকথন থেকেই শিশু শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে। এ কারণেই হয়তো সেই পুরোনো প্রচলিত প্রবাদটির উদ্ভব হয়েছিল—’সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে পাওয়া শিক্ষা কেবল শিশুর নৈতিক চরিত্রই গঠন করে না; বরং তার সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, মনোবল গঠন, আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার মানসিকতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ শেখার ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। সৎ সঙ্গের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশু স্বার্থপরতা পরিহার করে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে এবং ভালোবাসার চর্চা করতে শেখে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে ও বুঝতে শেখে—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। তারা সহনশীল, বিনয়ী, নম্র-ভদ্র ও পরোপকারী হওয়ার পাশাপাশি সর্বোপরি একজন সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা পায়। অন্তরে লালন করতে শেখে—‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’। একটি সুন্দর ও সুস্থ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু সব সময় যে ‘মানুষ’ হিসেবে বিকশিত হয়, তা নয়। এর ব্যতিক্রমও আছে। আবার অনেক নেতিবাচক পরিবেশ ও প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যেও অনেক সময় উন্নত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। একেই বলে—‘গোবরেও পদ্মফুল’। সর্বোপরি, বলতে চাই, বড় বড় বই-পুস্তক পাঠ করে এবং বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে বিদ্বান হওয়া যায় সত্য; কিন্তু তাতেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হলে নিরন্তর আত্মশুদ্ধির জন্য সাধনা প্রয়োজন। জীবের প্রতি প্রেম থাকতে হয়, ক্ষমা করার মতো মহৎ গুণ আয়ত্ত করতে হয়। পরস্পরকে ও প্রকৃতিকে নিজের মতো ভালোবাসতে হয়। ভালোবাসার মাধ্যমেই জয় করতে হয় জগৎ।
মেরী হাওলাদার
অক্টোবর ১৮, ২০২৬
0
একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্ন পেরিয়ে ভার্চুয়াল এই ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে দুচোখে যখন দেখি চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় শুধু ইটপাথরের বহুতলা দালানকোঠা, পায়ের নিচে কংক্রিট, পিচঢালা রাস্তাঘাট, আর বুকভরে দম নিতে গেলে শুধুই ধুলা-ময়লা ও বিষাক্ত ধোঁয়া, তখন আমাদের শৈশব, গ্রামীণ জীবন কিংবা পুরোনো দিনের সেই সরল ও মধুর দিনগুলোর স্মৃতিকথা খুব মনে পড়ে যায়। যেখানে ছিল চারদিকে শুধুই সবুজ আর সবুজ প্রকৃতি, নৈসর্গিক অপরূপ দৃশ্য, নির্মল বায়ু। বুকভরে শ্বাস নিলে শুধুই বিশুদ্ধ বাতাস, অক্সিজেন। এক একটা শতবর্ষী গাছ ছিল যেন এক একটা অক্সিজেন ফ্যাক্টরি। ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। খেলাধুলার জন্য ছিল পর্যাপ্ত মাঠ, বিস্তীর্ণ পতিত জমি, খড়ের ভূই, বড় বড় আম-কাঁঠালের বাগান। শীতের শেষে সারা মাঠ ফাঁকা, যেন সব বল খেলার মাঠ। গরু-ছাগল মাঠে থাকত এড়া। সারা মাঠে খেলেছি কত যে খেলা! বেশ কিছু খেলার নাম এখন এই নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা জানেই না। আমাদের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডুসহ বেশ কিছু খেলা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। উল্লেখযোগ্য কিছু খেলার নাম আমি মনে করতে চাই, যেমন : হাডুডু, লাঠিখেলা, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়া বাঁধা, বুড়ি চুঁ, মার্বেল, ডাংগুলি, কিতকিত, কানামাছি, বাঘবন্দি, কড়ি সারা, গুটি খেলা, ইচিং বিচিং, গুলতি বন্দুক, তির ধনুক, পটকা ফোটানো, ঘুড়ি ওড়ানো, লাঠিভরে হাঁটা, সাঁতার কাটা, কলার ভেলা প্রভৃতি। এ ছাড়া শীতকালে সন্ধ্যার পরে খেজুর গাছের ছোবড়া দিয়ে মশাল বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে দৌড়ানো। এমন কত যে খেলা, সেই আনন্দ-অনুভূতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সেই হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। বর্তমানে আমরা সবাই যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি, কীসের নেশায় যেন শুধু ছুটছি আর ছুটছি। কারও কোনো অবসর নেই, নেই আগের মতো বিনোদন, নেই সেই খেলাধুলা, আর খেলার মাঠ। শুধু খেলার মাঠ নয়; এখন ফসলের জমিও প্রায় সব হারিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে বড় বড় ইমারত। তাই অতীতের সেই খেলাধুলার আর সুযোগ নেই, আজ আমাদের সন্তানেরা সেগুলো চেনেই না। তাই সময় এসেছে আমাদের বর্তমান শিশু-কিশোর ও আগামী প্রজন্মকে নিয়ে ভাবার। শুধু মোবাইলে গেম খেলা নিয়ে বসে থেকে তাদের কর্মস্পৃহা ও কর্মক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। এদের শরীরচর্চা, দৈহিক বৃদ্ধি ও মেধা বিকাশের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে খেলাধুলার এবং ফিরিয়ে আনা দরকার আমাদের ঐতিহ্যবাহী সব খেলাগুলো। বোঝাতে হবে আমাদের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। গ্রামবাংলার কত উৎসব এখন আর দেখাই যায় না। সেই জারি-সারি, পালা গান, প্রেণী গান, সুরে সুরে পুথি কিতাব পাঠ এখন আর শোনাই যায় না। বৈশাখী নববর্ষ উৎসব ছাড়াও ছিল হেমন্তের নবান্ন উৎসব। নতুন আমন ধান উঠলে গুঁড়ো কুটে বিভিন্ন রকম পিঠা, আর নতুন খেজুরের গুড়, আহ! মনে করলেই জিহ্বায় জল এসে যায়। আবার যখন চৈত্রের খাঁ খাঁ রৌদ্র, চারদিকে নেই ধান, পাট, শুধু ধু-ধু মাঠ, বৃষ্টির জন্য সবাই গর্ত কেটে তাতে পানি ঢেলে কোলা ব্যাঙ ছেড়ে দেয়া হতো, আর সবাই কাদা-পানি মেখে; কাদাখেই করে গান ধরা হতো, ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে-রে তুই আল্লাহ’। তারপর বাড়ি বাড়ি চাল তুলে খির রান্না করে খাওয়া হতো। কোনো দিন সত্যিই যেন ঈশান কোণে কালবৈশাখীর মেঘ গুড়গুড় করে ডেকে বৃষ্টি নেমে আসত। তখন আমাদের আনন্দে বুকটা ভরে যেত। মৃত্তিকা আবার ফিরে পেত যেন তার পুনর্জীবন, উর্বর মাটিতে গাছগাছালি হতো সবুজ সতেজ। সেই নির্মল বায়ু প্রকৃতি এখন আর নেই, সবকিছুই আজ পরিবর্তন। আমাদের বৈচিত্র্যময় ছয়টি ঋতু এখন আলাদা করে চেনাই যায় না। সেই বড় বড় বৃক্ষও আর নেই। এদিকে ইটের ভাটার কালো ধোঁয়ায় বাতাস হচ্ছে দূষিত, যানবাহনে হচ্ছে শব্দদূষণ, পলিথিন ব্যাগ আর রাসায়নিক সারে হচ্ছে পরিবেশ ও ভূমি দূষণ, নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি, ডিপ-স্যালোয় বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির চাপ, ওদিকে গ্রিনহাউজ ইফেক্ট। এসব কিছুর কারণে পরিবর্তন আসছে আমাদের চিরসবুজ প্রকৃতিতে। এখন পরিবেশের এই বিপর্যয়ের ব্যাপারে আমাদের স্বচেতনতা সৃষ্টি করার কোনো বিকল্প নেই। অধিক পরিমাণে গাছ লাগিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে পরিবেশের ভারসাম্য। নতুন সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে স্বপ্নভরা আগামী দিনগুলো হোক চিরসবুজ সুন্দর ও সুখের।
আবু জাফর বিশ্বাস
অক্টোবর ১২, ২০২৬
0
ভয়েস ওভার অ্যাক্টিং (Voice-over Acting) বলতে সহজ কথায় বোঝায়—পর্দায় উপস্থিত না হয়ে শুধু নিজের কণ্ঠস্বর বা আওয়াজ ব্যবহার করে অভিনয় করা। একে সংক্ষেপে VO বলা হয়। যখন কোনো চরিত্র, বিজ্ঞাপন বা তথ্যচিত্রে আমরা কাউকে দেখতে পাই না কিন্তু তাঁর কথা শুনতে পাই, সেটাই হলো ভয়েস ওভার। বলা যায়, ভয়েস ওভার অ্যাক্টিং হলো এমন এক শিল্প, যেখানে শিল্পী নিজের চেহারা না দেখিয়ে শুধু কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে কোনো চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন বা কোনো তথ্য বর্ণনা করেন। এটি কেবল রিডিং পড়া নয়, বরং কণ্ঠের মাধ্যমে অভিনয় করা। এই পেশায় কাজের সুযোগ বহুমুখী। যেমন : অ্যানিমেশন ও কার্টুন : এটি ভয়েস অ্যাক্টিংয়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গা। এখানে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের জন্য ভিন্ন ভিন্ন টোনে কথা বলতে হয়। বিজ্ঞাপন (TVC/RDC) : টেলিভিশন বা রেডিওর বিজ্ঞপ্তিতে পণ্যের ব্র্যান্ড ভয়েস হওয়া। ডাবিং : বিদেশি সিনেমা, তুর্কি বা কোরিয়ান সিরিয়ালগুলোকে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা। বাংলাদেশে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের এই ডাবিং সিরিয়াল এখন বেশ জনপ্রিয়। অডিও বুক ও পডকাস্ট: বর্তমান সময়ে এটি খুবই জনপ্রিয়। পুরো একটি বইকে কণ্ঠের জাদুতে জীবন্ত করে তোলা। ভিডিও গেমস : বিশ্বজুড়ে গেমিং ইন্ডাস্ট্রিতে ভয়েস ওভার আর্টিস্টদের বিশাল চাহিদা রয়েছে। ই-লার্নিং ও ডকুমেন্টারি : শিক্ষামূলক ভিডিও বা তথ্যচিত্রে বর্ণনাকারী বা ন্যারেটর হিসেবে কাজ করা। একজন সফল ভয়েস আর্টিস্ট হতে হলে কিছু বিশেষ গুণের প্রয়োজন। যেমন : স্পষ্ট উচ্চারণ : শব্দের সঠিক ও শুদ্ধ উচ্চারণ জানা বাধ্যতামূলক। আবেগের নিয়ন্ত্রণ : শুধু কণ্ঠ দিয়ে হাসি, কান্না বা রাগ প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ : দীর্ঘ সংলাপ বলার সময় দম নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় কৌশল। শব্দ প্রক্ষেপণ : মাইক্রোফোনের সামনে কতটুকু দূরত্বে এবং কোন স্বরে কথা বলতে হবে সেই কারিগরি জ্ঞান। এই পেশায় আসতে হলে আপনাকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। যেমন : প্রশিক্ষণ : ভালো কোনো মেন্টর বা প্রতিষ্ঠানের আন্ডারে ভয়েজ মড্যুলেশন ও উচ্চারণের কোর্স করতে পারেন। ডেমো তৈরি : আপনার কণ্ঠের বৈচিত্র্য বোঝানোর জন্য ছোট ছোট কয়েকটি ক্লিপ রেকর্ড করে একটি ‘ভয়েজ রিল’ বা ডেমো পোর্টফোলিও তৈরি করুন। হোম স্টুডিও : শুরুতে একটি ভালো মানের মাইক্রোফোন, সাউন্ড কার্ড এবং শব্দহীন ছোট একটি জায়গায় নিজের সেটআপ তৈরি করে প্র্যাকটিস শুরু করুন। নেটওয়ার্কিং : প্রোডাকশন হাউজ, বিজ্ঞাপন সংস্থা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের কাজের নমুনা শেয়ার করুন। ভয়েস ওভার অ্যাক্টিং এমন একটি পেশা, যেখানে ফ্রিল্যান্সিং করার সুযোগ সবচেয়ে বেশি। কাজের মান ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে এখানে আয়ের পরিমাণও বাড়ে। একটি ছোট বিজ্ঞাপনের ৩০ সেকেন্ডের ভয়েসের জন্য যেমন কয়েক হাজার টাকা পাওয়া সম্ভব, তেমনি বড় প্রজেক্ট বা দীর্ঘমেয়াদি ডাবিং প্রজেক্টে সম্মানী অনেক বেশি হয়। শেষ কথা এভাবে বলা যায়, ভয়েস ওভার অ্যাক্টিং কোনো গতানুগতিক কাজ নয়; এটি একটি সাধনা। কণ্ঠকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর এই শিল্পে ধৈর্য এবং নিয়মিত অনুশীলন থাকলে আপনিও হতে পারেন একজন সফল ভয়েস ওভার স্টার আর্টিস্ট।
আরিফ হাসান
অক্টোবর ১১, ২০২৬
0
একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্য, শিল্প ও সংগীতের মতো সৃজনশীল চর্চাও শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে সংগীত এমন একটি মাধ্যম, যা আনন্দের সঙ্গে শিশুর মনন, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বিকাশে সহায়তা করতে পারে। সংগীত শেখার মাধ্যমে শিশুর মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির চর্চা হয়। একটি গান শেখার সময় তাকে কথা, সুর ও তাল মনে রাখতে হয়। নিয়মিত অনুশীলনের ফলে মনোযোগ দিয়ে কোনো বিষয় আয়ত্ত করার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গান শেখার মাধ্যমে শব্দের সঠিক উচ্চারণ ও ভাষার ব্যবহারেও শিশুর অনুশীলন হয়। সংগীত শিশুর আবেগ প্রকাশের একটি সুন্দর মাধ্যম। অনেক শিশু নিজের অনুভূতি সহজে কথায় প্রকাশ করতে পারে না। গান বা সুরের মাধ্যমে তারা আনন্দ, ভালো লাগা কিংবা মনের নানা অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পায়। ফলে সংগীত শিশুর মানসিক জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। অন্যদের সামনে গান পরিবেশন করাও শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। শুরুতে অনেক শিশু মানুষের সামনে কথা বলতে বা গান গাইতে সংকোচ বোধ করে। ধীরে ধীরে অনুশীলন ও পরিবেশনের সুযোগ পেলে সেই সংকোচ কমতে পারে। নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ শিশুকে আত্মবিশ্বাসী হতে উৎসাহিত করে। সংগীতচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধৈর্য ও নিয়মিত অনুশীলনের অভ্যাস। একটি গান এক দিনে ভালোভাবে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। বারবার অনুশীলন করতে হয়, ভুল থেকে শিখতে হয় এবং ধীরে ধীরে উন্নতি করতে হয়। এই অভ্যাস শিশুর জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দলবদ্ধভাবে গান শেখা ও পরিবেশনের মাধ্যমে শিশুর মধ্যে সহযোগিতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানের মানসিকতা তৈরি হতে পারে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের তাল মিলিয়ে গান করতে গিয়ে শিশু বুঝতে শেখে—একসঙ্গে কাজ করতে হলে অন্যের কথা শুনতে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সংগীতের মাধ্যমে শিশুর নিজের দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচয় ঘটে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, পল্লিগীতি, লোকসংগীতসহ বিভিন্ন ধরনের বাংলা গান আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছোটবেলা থেকেই এসব গানের সঙ্গে পরিচিত হলে শিশুর মধ্যে নিজের সাংস্কৃতিক শেকড় সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তবে শিশুদের সংগীতের শেখানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আনন্দময় পরিবেশ। শিশুর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে তার বয়স, আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী শেখানোর সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। প্রতিযোগিতার চেয়ে শেখার আনন্দ ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেয়া হলে সংগীতচর্চা শিশুর জন্য আরও উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নির্ধারিত হয় না। তার চিন্তা, অনুভূতি, সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধও ভবিষ্যৎ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা পরিবার ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সংগীত শুধু গান শেখায় না—এটি শিশুকে শুনতে, অনুভব করতে, অনুশীলন করতে, প্রকাশ করতে এবং নিজের ভেতরের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে শেখায়।
সুজন খান
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
আমি ঢাকায় থাকি। বিশ বছর আগে প্রায় পঙ্গুত্ববরণ করতে বসেছিলাম। সেটি ছিল আমার জীবনের একটি নির্মম অধ্যায়। আমি বসে কাজ করি। দীর্ঘদিন বসে কাজ করার কারণে আমার মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করতাম এবং চেয়ারে একদমই বসতে পারতাম না। আমার হোম ফিজিশিয়ান সব সময় আমাদের পরিবারের চিকিৎসা দিতেন। তিনি আমার অবস্থা দেখে বললেন, “আপনি একটি এমআরআই করুন।” আমি এমআরআই করলাম। তিনি রিপোর্ট দেখে বললেন, “এটি বেশ জটিল। আপনি একজন ভালো অর্থোপেডিক ডাক্তারের কাছে যান।” তিনি ঢাকার দুজন বিখ্যাত ও স্বনামধন্য অর্থোপেডিক সার্জনের পরামর্শ দিলেন। আমি তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম এবং প্রথমজনের কাছে গেলাম। এখানে তাঁদের নাম উল্লেখ করছি না, যেহেতু তাঁরা দুজনই স্বনামধন্য ও জনপ্রিয় চিকিৎসক। প্রথমজন আমার এমআরআই দেখে বললেন, “আপনার লাম্বার ফোর ও লাম্বার ফাইভ (L4-L5) অংশে ডিস্কের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা যাকে ডিস্ক প্রোল্যাপ্স বলেন। এখানে অপারেশন লাগবে।” আমাকে বোঝালেন, মেরুদণ্ডের ওই অংশ থেকে ফ্লুইড বেরিয়ে যাচ্ছে। বাজেট জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, “সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার কমবেশি হতে পারে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাসপাতালে আমাকে কত দিন থাকতে হতে পারে? তিনি বললেন, “এটা অপারেশনের পরের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। দশ, পনেরো, বিশ দিন, এমনকি এক মাসও থাকতে হতে পারে।” আমি বললাম, এখন কি আমাকে কোনো চিকিৎসাপত্র দেবেন? তিনি একটু চিন্তা করে একটি পেইনকিলার দিয়ে বললেন, “ব্যথা বেশি হলে খাবেন, না হলে খাবেন না।” আমি কিছুটা হতাশ হয়ে চলে এলাম। এবার আমার হোম ফিজিশিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী দ্বিতীয় ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনিও অনেক স্বনামধন্য চিকিৎসক। তিনিও একই কথা বললেন—অপারেশন লাগবে। আমি বাজেটের কথা বললাম। তিনি বললেন, “চার-পাঁচ লাখের মতো লাগতে পারে।” বাজেট তখন আমার জন্য বড় বিষয় ছিল না। কিন্তু আমি অপারেশনকে ভয় পেলাম। সাধারণত কাটা-ছেঁড়ার ব্যাপারে আমার একটু ভয় আছে। আমি এসব তথ্য নিয়ে আবার আমার হোম ফিজিশিয়ানের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনিও অনেক স্বনামধন্য ছিলেন। আমেরিকায় ছিলেন, ৪৫ বছর বয়সে এসে বাংলাদেশে চিকিৎসা দেয়া শুরু করেছিলেন। মূলত তিনি ছিলেন মেডিসিন ও শিশু বিশেষজ্ঞ। তিনি বললেন, “না, আপনি অপারেশন করবেন না। এসব অপারেশনের ক্ষেত্রে সাকসেস হিস্টরি খুবই কম। আপনি চেষ্টা করুন, কোনো থেরাপির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে একটু এগোতে পারেন কি না।” আমি ঢাকার দুটি বড় থেরাপি সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। মূলত তাঁরাও কিছুটা চিন্তিত হলেন। চিকিৎসার ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। বললেন, “যদি ডাক্তার বলে থাকে অপারেশন করতে, তাহলে সেটাই করা আপনার জন্য উত্তম।” আমি তখন আসলে বিছানায় পড়ে গেলাম। প্রায় ছয় মাস আমি বিছানায় ছিলাম। হঠাৎ একদিন আমার বন্ধুবর এক বড় ভাই ফোন করে বললেন, “দেলোয়ার, তুমি কোথায়?” আমি বললাম, আমি তো এই রকম অসুস্থ। আমার লাম্বার ফোর ও লাম্বার ফাইভ ডিস্ক প্রোল্যাপ্স। এখন আমি প্রায় ছয় মাস ধরে বিছানায়। তিনি বললেন, “আমি তোমাকে একজন ডাক্তারের নাম ও ঠিকানা দিচ্ছি। সেখানে যোগাযোগ করে আমার কথা বলবে।” এরপর তিনি আমাকে ড. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলীর নাম ও ঠিকানা দিলেন। তখন তিনি সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতালে বসতেন। আমি আর কালবিলম্ব না করে পরের দিন ডাক্তারের কাছে গেলাম। প্রথম দেখাতেই আমি তাঁর ভক্ত হয়ে গেলাম। কী সুন্দর, প্রসন্ন চেহারা! তিনি এমআরআই রিপোর্ট দেখে বললেন, “আপনার ছোট্ট একটি অপারেশন আছে। এখানে কোনো কাটা-ছেঁড়া হবে না। আপনি বুঝতেও পারবেন না। আর এটা আমি আজই করব।” তিনি আমাকে একটি কেবিন দিলেন। সেখানে কিছু চিকিৎসাপত্র দিয়ে বললেন, বিকেলে এই সার্জারিটি করা হবে। আমি বললাম, এটা কী ধরনের সার্জারি? রোগীদের অনেক নির্বোধ প্রশ্ন থাকে। কখনো কখনো মানুষ মানসিক চাপ, হতাশা বা মুডের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও থাকে। এটাকে বলে মুড সুইং। অন্যের কথা বলতে পারব না, তবে আমার অসুস্থতার বেলায় বিষয়টি আমি নিজেও অনুভব করি। তাই অহেতুক অনেক প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে। তবে যত অভিজ্ঞতা বাড়ছে, ততই বুঝতে পারছি—সব প্রশ্ন হয়তো করার প্রয়োজন নেই। তিনি নির্মল একটি হাসি দিয়ে বললেন, “এটা লেজার দিয়ে করা হবে। সংক্ষেপে PLDD বলে। আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই।” তাঁর হাসিটা আমার মনে দ্যুতি ছড়াল। মনে মনে ভাবলাম, মানুষ এত সুন্দর হয় কীভাবে? আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। যদিও লেজার সম্পর্কে তখন আমার কোনো ধারণাই ছিল না এবং আমি বুঝতেও পারিনি এটি কীভাবে করা হয়। তার পরও নতুন একটি পদ্ধতির কথা শুনে এবং কাটা-ছেঁড়া যেহেতু লাগবে না, এতে আমি বেশ সন্তুষ্ট হলাম। বিকেল পাঁচটায় ডাক্তার সাহেব আমার অপারেশন করলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পরে আমাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হলো। পরদিন সকালে এসে তিনি বললেন, “উঠুন।” আমি বললাম, আমি উঠতে পারব? তিনি হেসে বললেন, “আচ্ছা, চেষ্টা তো করুন।” আমি আস্তে আস্তে উঠলাম। তিনি বললেন, “আমার দুই আঙুল ধরুন।” আমি ধরলাম। তিনি আমাকে একটু হাঁটালেন। তারপর বললেন, “গুড। আজকেই আপনি বাড়ি যেতে পারেন। তবে বিছানায় প্রায় এক মাস রেস্ট নেবেন। আমি একটা চিকিৎসাপত্র পাঠিয়ে দিচ্ছি।” আমি বললাম, বিলটা? তিনি হেসে বললেন, “চিকিৎসাপত্রের সঙ্গেই থাকবে।” আমি হাঁটতে পেরে যেন এটাকে চিকিৎসা না ভেবে মিরাকল কিছু ভাবলাম। যদিও তিনি বলেছিলেন, “No miracle. It’s happening.” এমন হাড়ের রোগের একজন ‘জাদুকর’ আমার শহরে আছেন—এই ভাবনায় আমার মন ভরে উঠল। যথারীতি ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আমার চিকিৎসাপত্র ও বিল হাতে এল। আমি বিলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। এও কি সম্ভব? মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা! (বিশ বছর আগের কথা, বর্তমানের নয়) যিনি বিলটি হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁকে ডাকলাম। বললাম, বিলে আপনাদের কোনো ভুল হয়নি তো? তিনি হেসে বললেন, “এখানে সেই সুযোগ নেই।” আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম—আমার এই দরিদ্র দেশে যেন ডাক্তারের বরপুত্র হয়ে ডা. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলীর আবির্ভাব হয়েছে। এরপর কালে কালে প্রায় বিশ বছর পেরিয়ে গেল। হাঁটছি, চলছি, কখনো দৌঁড়াচ্ছি। যেন আমার নতুন ভুবন শুরু হলো। তাঁর কাছে আমার মায়ের হাড়ের জটিল চিকিৎসাও করিয়েছি। আমি এরপর ছোটখাটো, জটিল যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ নিয়ে চলতাম। বর্তমানে আফতাবনগরে তাঁর দশতলা BLCS Institute and Hospital হয়েছে। দিন দিন তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বাড়তে লাগল। ডাক্তার স্যার থেকে ধীরে ধীরে ভাই সম্বোধনে চলে এলাম; যদিও এ সম্পর্কের যোগ্য মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না। একজন রোগীর অস্বস্তি অনেক। সে দিশেহারা। এমনকি কখনো কখনো অসুস্থতার কারণে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু একটি বিশ্বাস, সঠিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা—তাকে আবার সজীব করে তোলে। বহু প্রবাসী রোগী উন্নত দেশ থেকে ছুটে আসেন সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার আশায়। আমি তাঁর কাছে এমনও রোগী দেখেছি—অসহায়, ভারসাম্যহীন, কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। কিন্তু তিনি জানেন, তিনি একজন মানবিক চিকিৎসক। সেই রোগীর মনোবল কীভাবে চাঙা করতে হয়, সেই অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসা প্রদান করতে হয়। আর যখন সেই রোগী সুস্থতার পর হাসি দিয়ে বলেন, “আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আসি।” রোগীটি চেম্বার থেকে বেরিয়ে দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলে যখন বলেন, “হে মহান আল্লাহ, তুমি ডাক্তারকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রেখো।”—তখন আমার মনে হয়, এমন ডাক্তার তো আধ্যাত্মিক মানুষই। পৃথিবীতে কিছু কিছু জিনিস একটাই হয়। যেমন বিখ্যাত কোহিনূর। তেমনি পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষও হয়তো একজনই হন। হয়তো আমার জীবনের বিচরণ খুবই স্বল্প, তাই দেখাটাও সীমিত। সেই সীমিত দেখার মধ্যেই তিনি আমার কাছে সেরা, তিনি একক। বিশ বছর পর আমি তাঁর আরেকটি অধ্যায় আবিষ্কার করলাম। আমার জ্বর হয়েছিল। তাই আমার কাছাকাছি একটি স্বনামধন্য ও বহুল আলোচিত হাসপাতালে আমার বন্ধুবর বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে ফোন দিলাম। তিনি বললেন, “চেম্বারে আসতে হবে না। আপনি দুটি মেডিসিন খান। আমি SMS করে দিচ্ছি।” আমি সেই ওষুধ দুদিন নিলাম। কিন্তু আমার কোনো উন্নতি হলো না। হঠাৎ করে ইয়াকুব ভাইয়ের ফোন পেলাম। একটু কথা হলো। তিনি বললেন, “আপনার কী হয়েছে?” আমি বললাম, আজ তিন দিন যাবৎ জ্বর। এর মধ্যে হয়তো আমি একটা কাশি দিয়েছিলাম। উনি বললেন, “কী কী ওষুধ খাচ্ছেন?” আমি ওষুধ দুটির নাম বললাম। তিনি বললেন, “এগুলো ফেলে দেন। আমি এখনই আপনাকে কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি। এটি সেবন করতে থাকুন।” এ কথা বলেই ফোন কেটে দিলেন। তিনি পাঁচ রকমের ওষুধের একটি তালিকা SMS-এর মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলেন। আমি কালবিলম্ব না করে সেই ওষুধ সেবন শুরু করলাম। দুদিনের মধ্যে কিছুটা সুস্থতাবোধ করলাম। তিনি দুদিন পরে আমাকে ফোন দিলেন। বললেন, “আপনার কিছু টেস্ট করা দরকার। এগুলো করিয়ে রাখেন।” আমি বললাম, আপনি কোথায়? তিনি বললেন, “আমি লন্ডনে। প্লেনে আছি, ঢাকায় আসছি। আগামীকাল রিপোর্টগুলো নিয়ে আসেন, আমি দেখব।” আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম—একটি কাশি শুনে যে মানুষ ৮,০৪০ কিলোমিটার দূর থেকে সমস্ত শরীর স্ক্যান করে ফেলেন, তিনি কি শুধুই ডাক্তার? আমি গভীর চিন্তায় মগ্ন হলাম। আমাকে এখন আর তাঁকে শুধুই ডাক্তার মনে হলো না। মনে হলো, একজন আধ্যাত্মিক মানুষ। আজ বুঝতে পারলাম, তিনি হাজার হাজার রোগীকে কীভাবে সেবা দেন, কীভাবে ধৈর্য ধরে তাঁদের কথা শোনেন, কীভাবে তাঁদের সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন। চোখে জল আসছে। কিন্তু বলার ভাষা আমার নেই। আসলে আমি কোন ভাষায় তাঁকে সম্বোধন করব, কী লিখব—আমি জানি না। আমি অত বড় লেখকও নই। এত আবেগী মানুষ আমি যে লিখতে গিয়েও আসল সত্যটা লিখতে পারি না। তিনি একজন আধ্যাত্মিক মানুষ, দেহের কারিগর, তিনি একজন নির্মোহ ডাক্তার। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, তাঁর জন্য প্রার্থনা করব। তিনি বেঁচে থাকুন। শুধু আমার জন্য নয়—আমাদের এই দরিদ্রতম রাষ্ট্র বাংলাদেশের মানুষের সেবা করে যেন তাঁর দিন যায়। যথাযথভাবে আমি সেদিনই পরীক্ষাগুলো করালাম। তিনি প্রায় আট রকমের পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাতে ছিল একটি চেস্ট এক্স-রে। আমি পরের দিন যেহেতু কিছুটা সুস্থবোধ করছিলাম, আমার সহধর্মিণীকে বললাম, চলো, আমরা যাই। ফোন করে বিকেলে আফতাবনগরে তাঁর চেম্বারে গেলাম। তিনি রিপোর্টগুলো দেখে বললেন, “এ তো দেখছি ইন্নালিল্লাহ পড়ার অবস্থা! আমি যে ধারণাটা করেছি, তাই। আপনার নিউমোনিয়া হয়েছে, ফুসফুসে পানি জমে গেছে।” এরপর খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, “আচ্ছা, কোনো সমস্যা নেই। আমি যে চিকিৎসাপত্র দিয়েছি, তা চলবে। আপনি যান। বাসায় গিয়ে রেস্ট নিন।” আমি চেম্বার থেকে বের হতে হতে ভাবলাম, তিনি সাক্ষাৎ একজন অতিমানবীয়, আধ্যাত্মিক মানুষ। এবারও এ যাত্রায় বোধ হয় বেঁচে গেলাম। বর্তমানে তাঁর স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা প্রায় শেষ—এমনটাই আমি জেনেছি। যদি এটির প্রবর্তন ও প্রয়োগ আমাদের দরিদ্রতম দেশে শুরু হয়, হয়তো অনেক দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় তিনি মানুষের উপকার করতে পারবেন এবং বিদেশমুখী না হয়ে আমরা এই দেশেই উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাব। আমি একজন সাধারণ মানুষ, একজন সাধারণ নাগরিক। তবুও বলব, প্রতিটি সরকারের কাছে তাঁকে দেশের সম্পদ মনে করে সহযোগিতা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, লাখ লাখ রোগী হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের এই মানের একজন চিকিৎসক পাওয়া সহজ নয়। তিনি শুধু আমাদের সম্পদ নন, তিনি দেশের সম্পদ। তাঁকে রক্ষা করা, তাঁকে যত্ন করা আমাদের সকলেরই প্রয়োজন—এমনকি সরকারেরও। তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি। এই লেখায় শুধু আমার মনের কথাই লিখেছি। চিকিৎসার কোনো টার্মিনোলজিই আমি জানি না। তাই হয়তো অনেক কিছু স্পষ্ট করে বলতে পারিনি। আমার চিকিৎসা-সংক্রান্ত বর্ণনায় কোথাও ভুল বা অস্পষ্টতা থাকলে তা সংশোধনযোগ্য। ভুলত্রুটি মার্জনীয়।
দেলোয়ার হোসেন
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে জন্ম নেয় একটি সম্ভাবনা। সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, তার চোখে ভবিষ্যৎ একই রকম উজ্জ্বল হওয়ার কথা। অথচ আমাদের সমাজে কন্যাশিশুর জন্মের মুহূর্ত থেকেই কখনো কখনো তার সম্ভাবনার পাশে অদৃশ্য কিছু সীমারেখা টেনে দেয়া হয়। ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কন্যাশিশুকে ভালোবাসা যথেষ্ট নয়, তাকে তার প্রাপ্য অধিকারটুকুও দিতে হবে। একটি মেয়ে জন্মালে আমরা তাকে আদর করে বলি ‘রাজকন্যা’। কিন্তু বড় হতে না হতেই সেই রাজকন্যার সামনে হাজির হয় অসংখ্য ‘না’। এত দূরে যেয়ো না, বেশি পড়াশোনার কী দরকার, রাতে বাইরে থাকা যাবে না, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ো না, পাশের বাড়ির মেয়ে এটা পারে-ওটা পারে, তোমাকেও পারতে হবে, এর সাথে মিশবে না, ওর সাথে মিশবে না ইত্যাদি। নিষেধের এই দেয়ালগুলো কখনো নিরাপত্তার নামে, কখনো সামাজিকতার নামে, আবার কখনো পারিবারিক সংস্কার কিংবা নিরাপত্তার নামে তৈরি হয়। প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা কি স্বাধীনতার বিকল্প হতে পারে? নাকি নিরাপদ সমাজ তৈরির দায়িত্ব মেয়েটির ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাই? কন্যাশিশুর জীবনের প্রথম মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয় তার শিক্ষাজীবনে। শিক্ষা একটি কন্যাশিশুর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু আজও অনেক মেয়ের হাতে বইয়ের বদলে তুলে দেয়া হয় সংসারের দায়িত্ব। অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে অনেক পরিবারে ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সহজ হয়, আর মেয়েটির শিক্ষাজীবন হয়ে পড়ে ‘ত্যাগের জায়গা’। কখনো-বা তাকে দায়ে পড়ে স্থানীয় মহিলা ডিগ্রি কলেজ বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয়া হয় এই লক্ষ্যে যে, বাসায় থাকবে, পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দেবে! অথচ একজন মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে শুধু একজন মানুষকে শিক্ষিত করা নয়; এর সঙ্গে শিক্ষিত হয় একটি পরিবার, সচেতন হয় একটি প্রজন্ম, বদলে যায় একটি সমাজের ভবিষ্যৎ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাল্যবিবাহের নির্মম বাস্তবতা। যে বয়সে একটি মেয়ে নিজের স্বপ্নের ভাষা খুঁজে পাওয়ার কথা, সে বয়সেই তাকে শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব বুঝে নিতে হয়। এই অসময়ের বিয়ে শুধু তার শৈশব কেড়ে নেয় না; কেড়ে নেয় শিক্ষা, আত্মনির্ভরতা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার। একটি মেয়ের ভবিষ্যৎকে ‘ভালো ঘরে বিয়ে’ দিয়ে মাপার মানসিকতা যতদিন থাকবে, ততদিন উন্নয়নের গল্পও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আরও ভয়ংকর ব্যাপার হলো কন্যাশিশুর নিরাপত্তাহীনতা। রাস্তায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা ভার্চুয়াল জগতে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হওয়ার ভয় অনেক মেয়ের নিত্যসঙ্গী। কখনো তারা প্রতিবাদ করলে প্রশ্ন ওঠে তাদের পোশাক, চলাফেরা, সময় কিংবা চরিত্র নিয়ে। অর্থাৎ অপরাধীর বদলে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় ভুক্তভোগীকে। এই সংস্কৃতি শুধু অন্যায় নয়, এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের গভীর সংকটের প্রকাশ। কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা কোনো দয়া বা উপকার নয়; এটি তার জন্মগত অধিকার। তাকে সমান শিক্ষা দিতে হবে, নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ দিতে হবে, নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তার স্বপ্নকে ‘মেয়ে হিসেবে এইটুকুই ঢের’—এমন কথা বলে ছোট করা যাবে না। আমরা প্রায়ই বলি, ‘মেয়েরা আজ সব পারে।’ কিন্তু প্রশ্ন হওয়া উচিত—সব পারার পথটি কি আমরা তাদের জন্য সমান করে দিয়েছি? আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে তাই শুধু শুভেচ্ছা আর স্লোগান নয়, প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এমন একটি সমাজ প্রয়োজন, যেখানে কন্যাশিশুকে ভবিষ্যতে কারও স্ত্রী বা কারও মা হওয়ার পরিচয়ের আগে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখা হবে। কারণ, একটি মেয়ের স্বপ্ন থামিয়ে দিলে শুধু একটি জীবন থামে না; থেমে যায় একটি সম্ভাব্য পরিবার, একটি সম্ভাব্য প্রজন্ম এবং একটি সম্ভাব্য সমাজের অগ্রযাত্রা। কন্যাশিশুকে বাঁচতে দিন, শিখতে দিন, স্বপ্ন দেখতে দিন। তার আকাশ ছোট করে নয়, বরং পুরো আকাশটাকেই তার জন্য উন্মুক্ত করে তুলি। কারণ, কন্যাশিশুর মুক্তিই শুধু তার একক মুক্তি নয়—এই মুক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি মুক্ত, মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজের ভবিষ্যৎ।
পাপিয়া শারমিন পুষ্প
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
শরতের নীল আকাশে যখন পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়, শিউলি ফুলের মৃদু সুবাসে ভোরের বাতাস ভরে ওঠে, তখনই বাঙালির অন্তরাত্মায় বেজে ওঠে এক অতি পরিচিত সুর। সে সুর আনন্দের, সে সুর আবাহনের, আবার একই সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনাকে ঘিরে যে পবিত্র প্রভাত বাঙালির মনে শারদোৎসবের প্রথম আলো জ্বেলে দেয়, তার নাম মহালয়া। মহালয়া কেবল পঞ্জিকার একটি তিথি নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি, পারিবারিক আবেগ এবং ধর্মীয় অনুভূতির এক অনন্য সম্মিলন। এই দিন যেন অদৃশ্য এক সেতু নির্মাণ করে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে, পিতৃপুরুষের স্মৃতি ও জীবিত প্রজন্মের চেতনার মধ্যে, অমর্ত্যলোকের বিশ্বাস ও মর্ত্যজীবনের আনন্দের মধ্যে। মহালয়ার ভোর তাই বাঙালির কাছে একই সঙ্গে বিষাদময়, পবিত্র ও আনন্দমুখর। মহালয়ার সঙ্গে দেবী দুর্গার আবাহনের যে সম্পর্ক বাঙালি সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছে, তার পেছনে রয়েছে দেবীমাহাত্ম্য ও দুর্গাপূজার দীর্ঘ পৌরাণিক ঐতিহ্য। পুরাণে বর্ণিত হয়েছে, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা যখন বিপর্যস্ত, তখন তাঁদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হন মহাশক্তি দেবী দুর্গা। দেবতাদের অর্পিত বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তিনি অসুরশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত মহিষাসুরকে বধ করেন। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরম্পরায় মহালয়া সেই দেবী-আবাহনের প্রতীকী সূচনা। যদিও পুরাণের বিভিন্ন আখ্যান ও আচারপরম্পরায় দেবীর আবির্ভাব ও পূজার সময় সম্পর্কে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, বাঙালির শারদীয় সংস্কৃতিতে মহালয়া থেকেই যেন দেবী দুর্গার আগমনের প্রতীক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পৌরাণিক কাহিনির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরও গভীর। মহিষাসুর কেবল পুরাণের একটি চরিত্র নন; তিনি মানুষের অন্তরের অহংকার, হিংসা, লোভ, অন্ধকার ও অসুরপ্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যাত হতে পারেন। আর দেবী দুর্গা হলেন সেই শুভশক্তির প্রতীক, যা অশুভকে পরাজিত করে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠা ঘটায়। তাই মহালয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্ধকার যত গভীরই হোক, শুভবোধের আলো জ্বালানোর দায়িত্ব মানুষেরই। মহালয়ার ভোর হওয়ার আগেই গঙ্গার ঘাট, নদীর তীর কিংবা জলাশয়ের ধারে বহু মানুষ সমবেত হন পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে। হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় মহালয়া অমাবস্যা পিতৃপক্ষের সমাপ্তির দিন হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে পরলোকগত পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের উদ্দেশ্যে জল, তিল ও অন্যান্য উপাচার নিবেদন করা হয়। ‘তর্পণ’ শব্দের মধ্যেই রয়েছে তৃপ্তি বিধানের ধারণা। কিন্তু এই আচার কেবল ধর্মীয় বিধান হিসেবে দেখলে এর গভীর মানবিক তাৎপর্যটি ধরা পড়ে না। আমরা যে সমাজে দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের জীবন, সংস্কৃতি, পরিবার ও মূল্যবোধের ভিত নির্মাণ করেছেন পূর্ববর্তী প্রজন্ম। তাঁদের স্মরণ করা মানে নিজের শেকড়কে স্মরণ করা। তর্পণের আচার তাই এক অর্থে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। শুধু নিজের নিকটজন নয়, অজ্ঞাত ও বিস্মৃত পূর্বপুরুষদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানোর যে মানসিকতা এই পরম্পরায় রয়েছে, তার মধ্যে নিহিত রয়েছে স্মৃতি ও মানবিকতার এক বিস্তৃত বোধ। ভোরের অন্ধকার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। নদীর জলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, হাতে কুশ ও তিল, মন্ত্রোচ্চারণের মৃদু ধ্বনি, দূরে জ্বলতে থাকা প্রদীপ—সব মিলিয়ে মহালয়ার প্রভাত এক গভীর আবেগময় আবহ সৃষ্টি করে। সেখানে বর্তমান মুহূর্তের সঙ্গে মিশে যায় বহু অতীতের স্মৃতি। বাঙালির মহালয়া এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র—দুটি নাম যেন পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। আকাশবাণীর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠান মহালয়ার ভোরকে যে সাংস্কৃতিক আবহ দিয়েছে, তা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের স্মৃতিতে এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে প্রচারিত এই অনুষ্ঠান পরবর্তীকালে মহালয়ার সঙ্গে এমনভাবে একাত্ম হয়ে যায় যে, বাঙালির কাছে মহালয়ার ভোর মানেই হয়ে ওঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গম্ভীর, আবেগময় কণ্ঠে চণ্ডীপাঠের ধ্বনি। তাঁর উচ্চারণে শাস্ত্রপাঠ কেবল ধর্মীয় আচার হয়ে থাকেনি; তা রূপ নিয়েছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র সংগীত পরিচালনার সঙ্গে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। অনুষ্ঠানের গান ও আবহসংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বহু বিশিষ্ট শিল্পী। তাঁদের কণ্ঠ ও সুর মহালয়ার প্রভাতকে দিয়েছে এক অনির্বচনীয় আবেগ। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে। রেডিওর জায়গায় এসেছে মোবাইল ফোন, স্ট্রিমিং পরিষেবা ও ডিজিটাল মাধ্যম। কিন্তু মহালয়ার ভোরে আজও বহু মানুষ পুরোনো রেডিও কিংবা মোবাইলের পর্দায় সেই পরিচিত অনুষ্ঠান শুনে নেন। প্রযুক্তি বদলেছে, শ্রবণের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু অনুভূতিটি বদলায়নি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ যেন সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রতি বছর বাঙালিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার শৈশব, পরিবার ও শিকড়ের কাছে। মহালয়া যেন বাঙালির উৎসবের অদৃশ্য কাউন্টডাউন শুরু করে দেয়। মনে হয়—আর মাত্র কয়েকটি দিনের অপেক্ষা, তার পরই মায়ের আগমন। শহর থেকে মফস্বল, গ্রাম থেকে প্রবাস—সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এক বিশেষ উৎসবের উত্তেজনা। কুমোরের কর্মশালায় তখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। প্রতিমার রং, অলংকার, সাজসজ্জা—সবকিছুতেই যেন তাড়াহুড়োর মধ্যে এক গভীর নিষ্ঠা। দেবীর চোখ আঁকার পর্বকে ঘিরেও রয়েছে বিশেষ আবেগ ও ধর্মীয় বিশ্বাস। অনেক শিল্পী ও ভক্তের কাছে এই ‘চক্ষুদান’ প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠার প্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী মুহূর্ত। তবে মহালয়ার আনন্দ শুধু পূজামণ্ডপে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির ব্যক্তিগত স্মৃতিও। ছোটবেলায় বাবার পাশে বসে রেডিও শোনা, মায়ের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সকালের খাবারের গন্ধ, শিউলি কুড়োনোর দিন, পুজোর নতুন জামাকাপড়ের অপেক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে মহালয়া হয়ে ওঠে স্মৃতির এক উজ্জ্বল দরজা। প্রবাসী বাঙালির কাছে এই অনুভূতি আরও তীব্র। সুদূর আমেরিকা, ইউরোপ, দিল্লি কিংবা মুম্বাইয়ের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও মহালয়ার ভোরে পরিচিত চণ্ডীপাঠ শুনলে হঠাৎ মনে পড়ে যায় ফেলে আসা বাড়ি, পাড়ার পুজোমণ্ডপ, আত্মীয়স্বজন এবং শৈশবের সেই নির্মল দিনগুলো। দূরত্ব তখন আর দূরত্ব থাকে না; একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার শেকড়ের কাছে। এ কারণেই মহালয়া শুধু একটি তিথি নয়—এটি বাঙালির সমষ্টিগত স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল। মহালয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—অন্ধকার কখনো চিরস্থায়ী নয়। অশুভের শক্তি যত প্রবলই মনে হোক, শুভবোধের জাগরণ তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। আজকের পৃথিবীতে মানুষের জীবন নানা সংকট, বিভাজন, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই সময়ে দেবী দুর্গার আবাহনকে যদি আমরা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে না দেখে শুভবোধের জাগরণের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করি, তবে মহালয়ার তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই যেমন শুভবোধ আছে, তেমনই আছে অহংকার, লোভ, হিংসা ও সংকীর্ণতার অন্ধকার। সেই অন্তর্গত অসুরকে চিনে তাকে পরাজিত করার সাধনাই হতে পারে মহালয়ার প্রকৃত শিক্ষা। বাইরের প্রতিমায় দেবীকে আবাহন করার পাশাপাশি নিজের অন্তরেও যদি সত্য, ন্যায়, মমতা ও মানবিকতার আবাহন ঘটাতে পারি, তবেই এই পবিত্র দিনের সার্থকতা। মহালয়া তাই একই সঙ্গে স্মরণের, আত্মশুদ্ধির এবং আগমনের দিন। একদিকে পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, অন্যদিকে দেবীশক্তির আবাহন—এ দুই প্রবাহ মিলেই গড়ে ওঠে মহালয়ার অনন্য সাংস্কৃতিক সত্তা। শরতের নির্মল আকাশের নিচে তাই আবারও বেজে উঠুক আগমনী সুর। মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যাক হিংসা ও অন্ধকার; জেগে উঠুক শুভবুদ্ধি, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা। দেবীর আবাহন হোক শুধু মন্দিরে নয়, প্রতিটি মানুষের অন্তরে। যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ। মহালয়ার পবিত্র প্রভাতে অমর্ত্যলোকের আবাহন ছুঁয়ে যাক মর্ত্যের প্রতিটি হৃদয়। শিউলির গন্ধে, শরতের নীল আকাশে, চণ্ডীপাঠের মন্ত্রধ্বনিতে এবং মানুষের নির্মল প্রার্থনায় জেগে উঠুক নতুন আলোর প্রত্যয়। আগমনী সুরে মুখরিত হোক চরাচর।
বিধান চন্দ্র সান্যাল
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, মফস্বল কিংবা ছোট শহরের মাঠে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু-কিশোর খেলাধুলা করে। কারও পায়ে থাকে ফুটবলের জাদু, কেউ দৌড়ে অন্যদের ছাড়িয়ে যায়, কেউ ব্যাট-বল হাতে দেখায় অসাধারণ সম্ভাবনা। কিন্তু প্রতিভা থাকলেও সবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয় না। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, সুযোগ-সুবিধার সংকট কিংবা সঠিক সময়ে প্রতিভা শনাক্ত না হওয়ার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হারিয়ে যায়। এই বাস্তবতায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তৃণমূল পর্যায় থেকে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের ধাপে ধাপে উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ক্রীড়া পরিদপ্তর কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে। ‘নতুন কুঁড়ি’ নামটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিভা অন্বেষণের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। সেই ভাবনাকে ক্রীড়াঙ্গনে নিয়ে এসে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’। ২০২৬ সালের প্রথম আসরে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি ইভেন্টের মাধ্যমে প্রতিভা যাচাই করা হয়। দ্বিতীয় আসরে আরও দুটি ইভেন্ট যুক্ত হয়েছে ভলিবল ও টেবিল টেনিস; এখন মোট ১০টি ইভেন্ট নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে। শুধু বড় শহর নয়, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে খেলোয়াড় বাছাইয়ের কাঠামো তৈরি হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবানদের সামনে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই; বরং অনেক সময় প্রতিভা খুঁজে বের করার যথাযথ ব্যবস্থা থাকে না। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই—এটি প্রতিভাকে মাঠ থেকে তুলে এনে একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। একজন শিশু হয়তো পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে ঢাকায় গিয়ে কোনো একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে পারে না। কিন্তু তার গ্রামের মাঠেই যদি প্রতিভা শনাক্ত করা হয়, তাহলে তার সামনে জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার দরজা খুলে যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ কেবল খেলোয়াড় তৈরি করে না; বরং একটি দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। ভবিষ্যতে জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য খেলোয়াড় তৈরির ভিত গড়ে উঠতে পারে এখান থেকেই। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলার সবচেয়ে বড় সুফল হলো শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। নিয়মিত খেলাধুলা শরীরকে সক্রিয় রাখে, সহনশীলতা বাড়ায় এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। তবে খেলাধুলার উপকারিতা শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠে একজন শিশু শেখে সময় মেনে চলতে, নিয়ম ও শৃঙ্খলা মানতে, জয়-পরাজয় মেনে নিতে, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে, নেতৃত্ব দিতে, প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে এবং ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে। ফলে একজন ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোন, গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটায়। এর ফলে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাঠকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগও কমছে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ মাঠকে আবার শিশু-কিশোরদের মিলনস্থলে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই এলাকার বিভিন্ন পরিবারের সন্তান একসঙ্গে খেলবে, প্রতিযোগিতা করবে এবং বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রীড়া সংগঠক, কোচ, রেফারি ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। আমি নিজে একজন খেলোয়ার ছিলাম। সেখান থেকে ভলিবল রেফারি, কোচ, ক্রীড়া সংগঠক হয়েছি। আমি বিভিন্ন জায়গায় ভলিবল নিয়ে কাজ করার সময় লক্ষ করেছি, গ্রামের খেলোয়াররা শহরের খেলোয়াদের থেকে বেশি চাপ নিতে পারে এবং এদের মধ্যে প্রতিভা আছে। সেটিকে বিকাশিত করতে দরকার ভালো পরামর্শ ও সুযোগ। যেটি তৈরি করে দিচ্ছে নতুন কুড়ি স্পোর্টস। আমাদের আশপাশের অনেক খেলোয়ার আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, এটি একটি প্রতিবন্ধকতা। আমার তত্ত্বাবধানে একজন খেলোয়ার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, সে লেখাপড়ার পাশাপাশি তার বাবার হোটেলে কাজ করছে। ফলে তার নিয়মিত প্র্যাকটিসে কিন্তু একটা প্রভাব পড়ছে এবং তার শারীরিক ও মানসিকভাবে একটা চাপ পড়ছে। অথচ সে কিন্তু একজন প্রতিভাবান খেলোয়ার। গত সিজনে সে খুলনা বিভাগীয় পর্যায় মার্শাল আর্ট (উশু) ৪৫+ ওজনে তৃতীয় হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস একটি নতুন সম্ভাবনার নাম। আজকের যে শিশু উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের একটি মাঠে দৌড়াচ্ছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হয়তো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে। হয়তো কোনো একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, স্বচ্ছ বাছাই এবং নিয়মিত পরিচর্যা। একটি কুঁড়িকে শুধু চিহ্নিত করলেই ফুল ফোটে না—তার জন্য প্রয়োজন মাটি, পানি, আলো ও পরিচর্যা। ঠিক তেমনি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ যে প্রতিভাগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তাদের যথাযথ পরিচর্যা করতে পারলেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ফুটতে পারে নতুন নতুন সম্ভাবনার ফুল। ‘নতুন কুঁড়ি’ তাই শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম নয়—এটি হতে পারে আগামীর চ্যাম্পিয়ন তৈরির একটি স্বপ্নযাত্রা।
আশিকুর রহমান সৌরভ
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
প্রতিবছর ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে যতটা খোলাখুলি আলোচনা হয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা ঠিক তার তুলনায় এখনো অনেক পেছনে। অথচ একজন মানুষের পূর্ণাঙ্গ সুস্থতার জন্য শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও সমান গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে মানুষের জীবনে মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এই চাপ এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণা ও স্থানীয় গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মাঝে মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা খুবই প্রবল। পড়াশোনার চাপ, কর্মসংস্থানের অভাব, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের সর্বনাশ ডেকে আনছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেকই পরিবার থেকে দূরে থাকা, দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা, সেশন জট এবং নানা অনিশ্চয়তার কারণে তীব্র অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই মানসিক অবসাদের পরিণতি আত্মহত্যায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাবে একটা বড় অংশ আসক্ত হয়ে পড়েছে মাদকের মতো ভয়ংকর নেশায়; যা আমাদের সমাজেকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে যাচ্ছে। তবে এই মানসিক অবসাদগ্রস্তের পেছনে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থা একা দায়ী নয়, এর পেছনে বড় অংশীদার আমাদের সমাজ এবং আশপাশের মানুষের মানসিকতা। বর্তমানে আধুনিক এই পৃথিবীতে ‘বডি শেমিং’ এবং শারীরিক গঠন দুর্বলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা একধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, যা একটি ভিকটিমের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে, সেই ব্যক্তির নিজের ওপরে ঘৃণা করা শুরু করে, নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরে বিভিন্ন রকম নেতিবাচক চিন্তা না শুরু হয় এবং সবশেষে আত্মহত্যা করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। চলতি বছরের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় আমাদের আশপাশে যারা মানসিক অবসাদগ্রস্ত অবসাদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাদের কথাগুলো শোনা, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থ্যসেবায় ও সমাজে পরিবর্তন আনা। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানসিক রোগ কোনো অপরাধ নয়, এটি যেকোনো শারীরিক রোগের মতো নিরাময়যোগ্য। এ রোগ নিরাময় করতে শুধু প্রয়োজন সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং সময়মতো পেশাদারের পরামর্শ। তাই আসুন, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হই এবং অন্যকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করি। একটি দেশের যুবসমাজ ও সুসংগঠিত সমাজ গঠনে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার বিকল্প নেই।
বোরহান উদ্দিন নাদিম
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
কন্যাদের শিক্ষিত করা আর সেই শিক্ষাকে জীবন গঠনের কাজে লাগানো— আমরা প্রায়ই এ দুই বিষয়কে এক করে ফেলি। প্রতিবছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস এলে আমরা বিগত বছরের অর্জনের হিসাব দেখে গৌরব করি। কিন্তু সেই অর্জন শেষ পর্যন্ত একটি মেয়ের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় কারোরই হয় না। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিক্ষার এই নির্মম সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ৮৩.৭ শতাংশ হলেও উচ্চমাধ্যমিকে এসে তা অর্ধেকের কাছাকাছি, অর্থাৎ ৪৩.৯ শতাংশে নেমে আসে। আবার বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ে নারীদের বেকারত্বের হার ২০.৩৯ শতাংশ, যা পুরুষের (১১.৩১ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও অনেক কন্যাশিশু সেই শিক্ষার ধারা ধরে রাখতে পারছে না। আবার যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করছে, কর্মক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শিক্ষিত হওয়া আর সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করা—এই দুয়ের মাঝের ব্যবধানটা এখনো অনেক বড়। একটি কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের রূপরেখা তৈরি হয়ে যায় তার জন্মের পর থেকেই। ‘মেয়ে তো পরের ঘরে চলে যাবে’—আমাদের সমাজে প্রচলিত এ কথাটি এতটাই সাধারণ যে একে আর কোনো অন্যায় মনে হয় না। অথচ এই এক মানসিকতার কারণেই একটি মেয়ের পুষ্টি, পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। বিশেষ করে, গ্রামীণ সমাজে এখনো খাবারের টেবিলে বড় মাছের টুকরোটি তুলে দেয়া হয় ছেলের প্লেটে, আর মেয়ের ভাগে জোটে ছোটটি। ছেলের পড়াশোনার পেছনে পানির মতো টাকা ঢালা হলেও মেয়ের ক্ষেত্রে শোনা যায় হতাশাজনক প্রশ্ন—‘আর কত পড়বে?’ আমরা শিক্ষার পরিসংখ্যান দিয়ে নিজেদের আত্মতুষ্টি পাই, কিন্তু আড়ালের চিত্রটি ভিন্ন। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ে অসংখ্য মেয়ে। কারণ হিসেবে কখনো আসে চরম দারিদ্র্য, কখনো যাতায়াতের নিরাপত্তা অভাব, আবার কখনো বা অকাল বিয়ের তোড়জোড়। বাল্যবিয়ে রোধে আইন আছে ঠিকই, কিন্তু সামাজিক চাপের কাছে সেই আইন প্রায়ই হার মানে। ‘মেয়ে বড় হয়ে গেছে’, ‘লোকে কী বলবে’ কিংবা ‘ভালো পাত্র হাতছাড়া হয়ে যাবে’—এ ধরনের সামাজিক অজুহাত প্রতিনিয়ত বহু সম্ভাবনাময় মেয়ের স্বপ্নের অকালমৃত্যু ঘটায়। কম বয়সে বিয়ের পরিণামে অল্প বয়সে মাতৃত্ব, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি আর চিরতরে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ হারানোর মতো অন্ধকার নেমে আসে। একটি মেয়ের শৈশব ধ্বংস হলে তার ক্ষতি কেবল একক নয়; পরবর্তী প্রজন্মও সেই বৈষম্যের চক্রে আটকা পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা আজ চরম সংকটে। কন্যাসন্তান ঘরে থাকা যেন মা-বাবার জন্য এক সার্বক্ষণিক আতঙ্কের নাম। সমাজ আজও তাদের একটি নিরাপদ শৈশব দিতে পারছে না। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না খুঁজে সমাধান খুঁজি মেয়ের পোশাক ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষার দৈন্যদশা তুলে ধরে। পত্রিকার পাতায় এসব খবর দেখার পর আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা জন্মাবে কবে? এই অবস্থা থেকে উত্তরণের দায় আমাদের সবার। পরিবারকে শুরুতেই বৈষম্য দূর করে মেয়েকে প্রশ্ন করার, ‘না’ বলতে শেখার এবং নিজের স্বপ্নের পিছে দৌড়ানোর আত্মবিশ্বাস দিতে হবে। স্কুলগুলোকে ঝরে পড়া ঠেকাতে আরও সংবেদনশীল ভূমিকা রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আর নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, আশপাশে বাল্যবিয়ে বা নির্যাতনের কোনো আয়োজন দেখলে মুখে কলুপ না এটে তা প্রতিহত করা। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়, এটি সমাজের আত্মপ্রতিফলন ও জবাবদিহির দিন। একটি মেয়ের স্বপ্নের দাম আসলে কোনো টাকায় পরিমাপ করা যায় না, তার মূল্য হলো আমাদের একটি সুসংগঠিত ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন হলো, সেই মূল্য দিতে আমরা আর কত দিন দেরি করব? দিনশেষে এটাই কামনা যে, স্বপ্নের ডানা মেলুক প্রতিটি আত্মজা। শুভ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস।
নুসরাত তাবাসুম নাজিফা
অক্টোবর ১০, ২০২৬
0
কোষ্ঠকাঠিন্য খুবই সাধারণ একটি হজমের সমস্যা। তবে এটি নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। এসব ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় সঠিক ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, কোষ্ঠকাঠিন্য সম্পর্কে প্রচলিত পাঁচটি ভুল ধারণা সম্পর্কে জানা জরুরি। বেশি ফাইবার খেলেই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে : কোষ্ঠকাঠিন্য হলে অনেকে মনে করেন, বেশি আঁশযুক্ত খাবার খেলেই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা ঠিক নয়। পর্যাপ্ত ফাইবার না খাওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি কারণ হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন : মানসিক চাপ, হরমোনের সমস্যা, অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচলে সমস্যা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, থাইরয়েডের সমস্যা এবং খাদ্য অসহিষ্ণুতা।তাই হঠাৎ করে অনেক বেশি ফাইবার খাওয়া সব সময় উপকারী নয়। দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া উচিত। প্রতিদিন মলত্যাগ হলে কোষ্ঠকাঠিন্য নেই : প্রতিদিন মলত্যাগ করলেই যে কোষ্ঠকাঠিন্য নেই, এমন নয়। মলত্যাগের সময় বেশি চাপ দিতে হলে বা মল শক্ত, শুকনো ও দলাযুক্ত হলে সেটিও কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হতে পারে। আবার মলত্যাগের পরও যদি মনে হয় পুরোপুরি মল বের হয়নি, সেটিও কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি লক্ষণ হতে পারে। তাই শুধু কতবার মলত্যাগ হচ্ছে তা নয়, মলের ধরন এবং মলত্যাগের সময় কেমন অনুভূতি হচ্ছে, সেটিও খেয়াল করা জরুরি। টয়লেটে বসার ভঙ্গি নিয়ে ভাবার দরকার নেই : টয়লেটে বসার ভঙ্গিও মলত্যাগ সহজ বা কঠিন হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণ কমোডে বসার সময় পায়ের নিচে ছোট একটি টুল ব্যবহার করে হাঁটু নিতম্বের চেয়ে কিছুটা ওপরে রাখা যেতে পারে। এতে শরীরের ভঙ্গি কিছুটা পরিবর্তিত হয় এবং মলত্যাগ সহজ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত জোরে চাপ দেয়া উচিত নয়। কোষ্ঠকাঠিন্য শুধু অস্বস্তিকর, ক্ষতিকর নয় : কোষ্ঠকাঠিন্য সাধারণ সমস্যা হলেও দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য দৈনন্দিন জীবনকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। তাই বারবার কোষ্ঠকাঠিন্য হলে বা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলে স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। মলত্যাগের চাপ চেপে রাখলে সমস্যা নেই : ব্যস্ততা, কর্মস্থল বা যাতায়াতের কারণে অনেকেই মলত্যাগের চাপ চেপে রাখেন। মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতি হলেও নিয়মিতভাবে মলত্যাগের চাপ উপেক্ষা করা ভালো নয়। মল দীর্ঘ সময় অন্ত্রে থাকলে সেখান থেকে আরও পানি শোষিত হয়। ফলে মল শক্ত হয়ে যেতে পারে এবং পরে মলত্যাগ করা আরও কঠিন হতে পারে। মলত্যাগের একটি নিয়মিত অভ্যাস তৈরি করাও উপকারী। যেমন : প্রতিদিন সকালের নাশতার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পর কিছু সময় টয়লেটে বসার অভ্যাস করা যেতে পারে। তবে জোর করে মলত্যাগ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। নিয়মিতভাবে শরীরকে মলত্যাগের সুযোগ দিলে ধীরে ধীরে একটি স্বাভাবিক রুটিন তৈরি হতে পারে। শেষ কথা হচ্ছে, কোষ্ঠকাঠিন্য শুধু কম ফাইবার খাওয়ার কারণে হয়—এমন ধারণা ঠিক নয়। খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাপন, মানসিক চাপ, ওষুধ এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। তাই সমস্যা বারবার হলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে নিজের মতো করে চিকিৎসা না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া ভালো।
লিনা আকতার
অক্টোবর ৫, ২০২৬
0
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে... সূর্য উদয়ের সাথে সাথে যার মুখ দিয়ে ওপরের শব্দগুলো উচ্চারিত হতো আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সাথে সাথে উচ্চারণ করতাম, সেই আমাদের গুরুকুলের গুরু দেবেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ। আমাদের শিক্ষাজীবনের গুরু মহাশয়। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে সামান্য একটুকরো জায়গায় ছিল আমাদের গুরুকুল। মাটির দেয়ালের ওপর ছনের ছাউনি ঘর। সামান্য উঠোন। মাটিতে আসন পেতে ছিল আমাদের পড়ার স্থান। আজ সেখানে মাটির ঘরও নেই গুরুও নেই। আমাদের গুরুকুল ছিল পূর্বমুখী। গাছগাছালি ছায়াঘেরা সুনিবিড় শান্ত পাখি ডাকা সকালে শুরু হতো আমাদের পাঠদান। শ্যামবর্ণের চেহারার দীপ্ত চোখের জ্যোতি ভোরের আলোর সাথে ছড়িয়ে দিতেন আমাদের পাঠদানে। কাঠের খড়ম পায়ে সামান্য জলচৌকিতে বসেই পড়াতেন আমাদের। জন্মের পর থেকে খড়ি দেয়ার পর আমরা প্রতিদিন ভোরে পাঠদান নিতাম গুরুকুলে। শাসন আদর মেশানো ছিল গুরুশিক্ষা। জীবনের সঠিক শিক্ষার বীজ বপন করে সুন্দর সত্য মানবিক গুণাবলি দিয়ে পরিচর্যা করে চারা গজানোই ছিল তাঁর মূল শিক্ষা। আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে চাকরি জীবনে গুরু মহাশয়কে ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারিনি তাঁর আদর্শ। আজ না ফেরার দেশে তিনি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে গুরু মহাশয়কে হাজারও প্রণাম।
ঘোষ উত্তম
অক্টোবর ৫, ২০২৬
0
ব্যথা হলে সাধারণত ওষুধের কথাই প্রথমে মনে আসে। কিন্তু মানুষের শরীরের ভেতরেও রয়েছে ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব একটি ব্যবস্থা। এর সঙ্গে জড়িত এন্ডোজেনাস ওপিওয়েড, যার মধ্যে বিটা-এন্ডরফিন অন্যতম। ব্যায়াম, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম এবং শরীরের নানা জৈবিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। তবে ‘ব্যায়াম করলেই শরীরে এন্ডরফিন বেড়ে গিয়ে সব ব্যথা চলে যায়’ এমন ব্যাখ্যা পুরোপুরি সঠিক নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ব্যায়ামের পর ব্যথা কম অনুভূত হওয়ার পেছনে এন্ডরফিনের পাশাপাশি এন্ডোক্যানাবিনয়েড, সেরোটোনিন, নরঅ্যাড্রেনালিন এবং মস্তিষ্কের ব্যথা-নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুপথও কাজ করে। ব্যায়ামের পর সাময়িকভাবে ব্যথার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় Exercise-Induced Hypoalgesia (EIH) বলা হয়। অর্থাৎ ব্যথার উৎস পুরোপুরি চলে না গেলেও মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র সেই ব্যথাকে কিছুটা কম তীব্র হিসেবে অনুভব করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের সময় শরীরের endogenous opioid system সক্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে, পর্যাপ্ত সময় ও তীব্রতার ব্যায়ামে বিটা-এন্ডরফিনসহ endogenous opioid-এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে শুধু এন্ডরফিনই এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ এমন প্রমাণ নেই। বরং ব্যায়ামের সময় মস্তিষ্কের descending pain modulation system সক্রিয় হয়। এই ব্যবস্থা মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্তরে ব্যথার সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে endocannabinoid system-ও সক্রিয় হতে পারে। ফলে ব্যথা অনুভবের পাশাপাশি উদ্বেগ, স্ট্রেস ও মানসিক অস্বস্তির মাত্রাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। এ কারণেই দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার বদলে নিয়মিত ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী শারীরিক সক্রিয়তা অনেকের জন্য ব্যথা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক ব্যথার ক্ষেত্রে ব্যায়ামকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ, কোন ধরনের ব্যায়াম, কতটা তীব্রতা এবং কোন রোগীর ক্ষেত্রে কতটা উপকারী হবে, তা ব্যক্তি ও রোগভেদে আলাদা। সাম্প্রতিক একটি umbrella review-তেও exercise-induced hypoalgesia নিয়ে প্রমাণকে পুরোপুরি একরকম বা নিশ্চিত বলা হয়নি। শুধু ব্যায়াম নয়, খাবারের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক। এখানে আসে পুষ্টির বিষয়টি। খাবার সরাসরি ‘এন্ডরফিনের ওষুধ’ হিসেবে কাজ করে এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যাভ্যাস শরীরের প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং শরীরের ওজনকে প্রভাবিত করতে পারে; আর এগুলোর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সম্পর্ক রয়েছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও meta-analysis-এ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় whole-food dietary intervention নিয়ে ৪৩টি গবেষণাগোষ্ঠী বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে সামগ্রিকভাবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যথা কমার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কোনো একটি নির্দিষ্ট ডায়েটকে সবার জন্য সবচেয়ে কার্যকর বলা যায়নি। গবেষকেরা খাদ্যের গুণমান, পুষ্টিঘনত্ব এবং ওজন ব্যবস্থাপনাসহ একাধিক বিষয়কে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ব্যথার সম্পর্ক নিয়ে অন্য একটি systematic review-তেও একই ধরনের সতর্কতা পাওয়া যায়। ২০টি observational study-এর মধ্যে অর্ধেক গবেষণায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে Mediterranean-type dietary pattern-এর সঙ্গে কম ব্যথার সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে বেশির ভাগ গবেষণা observational হওয়ায় কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না। সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের আরও একটি systematic review এবং meta-analysis-এ ৩৩টি randomized controlled trial এবং ৩,৪৭৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে Mediterranean diet কিছু প্রদাহ-সম্পর্কিত biomarker যেমন hs-CRP, IL-6 ও IL-17—কমাতে পারে। তবে সব inflammatory marker-এ একই ধরনের পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। ব্যথা কমানোর জন্য খাদ্যের সামগ্রিক মানের দিকে নজর দেয়া বেশি যুক্তিযুক্ত। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম ও বীজ, মাছ এবং পরিমিত স্বাস্থ্যকর চর্বি এ ধরনের nutrient-dense খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ultra-processed খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিনির্ভর খাদ্য কমানো উপকারী হতে পারে। তবে পুষ্টি দিয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ এখনো সব রোগের ক্ষেত্রে সমান শক্তিশালী নয়। বিশেষ করে, নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো restrictive diet শুরু করা উচিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮–৬৪ বছর বয়সী সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে ১৫০–৩০০ মিনিট moderate-intensity aerobic activity, অথবা ৭৫–১৫০ মিনিট vigorous-intensity activity করার পরামর্শ দেয়া হয়। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুদিন major muscle groups নিয়ে muscle-strengthening exercise করার কথা বলা হয়েছে। যারা বর্তমানে খুব কম সক্রিয়, তাদের অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় ও তীব্রতা বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়। অর্থাৎ ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পুষ্টি, ঘুম ও স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা সবকিছু মিলিয়েই শরীরের pain-modulation system-কে সহায়তা করা সম্ভব। এন্ডরফিন মানুষের শরীরে থাকা একটি জটিল জৈবিক ব্যবস্থার অংশ। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা শরীরকে শুধু শক্তিশালী করে না; ব্যথা, স্ট্রেস ও অনুভূতির সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। আর সেই প্রক্রিয়ায় ভালো খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও পুষ্টি জোগায়। তবে নতুন, তীব্র, ক্রমাগত বাড়তে থাকা বা কারণ-অজানা ব্যথাকে শুধু ‘এন্ডরফিনের অভাব’ মনে করে উপেক্ষা করা উচিত নয়। ব্যথা কখনো কখনো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও হতে পারে।
রাইসা মেহজাবীন
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের সরু রাস্তা ধরে হাঁটলে প্রথমেই চোখে পড়ে সারি সারি পুরোনো বাড়ি। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর দেয়ালে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও পুরোনো দরজা-জানালা এখনো টিকে আছে। দিনের ছুটিতে এখানে মানুষের আনাগোনা বাড়ে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরছেন, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে দেখছেন কয়েক শ বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো। কিন্তু আজকের এই শান্ত পানাম নগর একসময় এমন ছিল না। একসময় এই জায়গায় মানুষের ব্যস্ততা ছিল, ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরবাড়ি আর প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। ব্যবসার কাজে মানুষ আসত, পণ্য কেনাবেচা হতো, পরিবার নিয়ে মানুষ বসবাস করত। যে রাস্তায় আজ পর্যটকেরা ধীরে ধীরে হাঁটেন, সেই রাস্তাতেই একসময় চলত মানুষের ব্যস্ত যাতায়াত। সোনারগাঁও ছিল বাংলার প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদগুলোর একটি। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্ব বহুদিনের। সেই বাণিজ্যিক পরিবেশের সঙ্গে গড়ে ওঠে পানাম নগরও। বিশেষ করে, কাপড় ও তাঁতপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে এর সমৃদ্ধির সম্পর্ক ছিল। ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে এখানে তৈরি হয়েছিল বসতি, আর সেই বসতিকে ঘিরেই ধীরে ধীরে একটি শহরের রূপ নেয় পানাম। সেই সময়ের পানাম নগরকে আজ চোখের সামনে দেখা সম্ভব নয়। তবে পুরোনো বাড়িগুলোর দিকে তাকালে কল্পনা করা যায় এর বিশাল কারুকাজ। কোনো একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো একসময় ব্যবসার হিসাব নিয়ে কথা বলতেন কয়েকজন মানুষ। পাশের বাড়ির বারান্দায় বসে পরিবারের কেউ অপেক্ষা করতেন। সকালে ঘরের দরজা খুলে মানুষ বের হতো, দিনের কাজ শেষে আবার ফিরে আসত। শিশুদের ছোটাছুটি, পরিবারের ব্যস্ততা, অতিথির আসা-যাওয়া—সব মিলিয়ে এই বাড়িগুলোও একসময় মানুষের জীবনে ভরা ছিল। আজ সেই মানুষগুলো নেই। কিন্তু তাদের বসবাসের চিহ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে। পানাম নগরের বাড়িগুলোর দিকে তাকালে স্থাপত্যের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ে। খিলান, জানালা, বারান্দা ও নানা অলংকরণে তৈরি ভবনগুলোতে স্থানীয় নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি ইউরোপীয় প্রভাবও দেখা যায়। রাস্তার দুই পাশে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলো যেন একটি সময়কে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। তবে এসব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শুধু স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখলেই গল্পটা শেষ হয় না। একজন দর্শনার্থী হয়তো একটি পুরোনো জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—এই জানালার পাশে কে দাঁড়াতেন? এই দরজাটা দিয়ে প্রতিদিন কত মানুষ যাতায়াত করত? এই বাড়ির ভেতরে কোনো শিশুর শৈশব কেটেছিল কি না? কোনো পরিবার এখানে কত বছর বসবাস করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সহজে পাওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে অনেক গল্প হারিয়ে গেছে। থেকে গেছে শুধু কিছু দেয়াল, দরজা, জানালা আর স্থাপত্য। একসময় পানাম নগরের জীবনও থেমে যেতে শুরু করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র বদলে যায়। মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে মানুষ এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে থাকে। যে বাড়িগুলো একসময় মানুষের কণ্ঠে মুখর ছিল, সেগুলো একসময় ফাঁকা হয়ে পড়ে। একটি শহর এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের শহর থেকে ইতিহাসের শহরে পরিণত হয়। আজ পানাম নগরে গেলে সেই পরিবর্তন সহজেই বোঝা যায়। পুরোনো ভবনগুলোর অনেকগুলোতেই বয়সের ছাপ। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও রং মলিন। তবু এসবের মাঝেও জায়গাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি। ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে আসা মানুষের ভিড় দেখা যায়। তরুণ-তরুণীরা ছবি তুলছেন। শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ঘুরছেন। কেউ স্থাপত্য দেখছেন, কেউ ইতিহাস জানতে চাইছেন। অনেকেই হয়তো প্রথমবার বুঝতে পারছেন, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকা কোনো বিষয় নয়, কখনো কখনো সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো যায়। একটি শিশুকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে পুরোনো বাড়িগুলোর সামনে হাঁটতে দেখা যায়। সে হয়তো বারবার জানতে চাইছে, “এখানে আগে মানুষ থাকত?” প্রশ্নটি ছোট। কিন্তু পানাম নগরের গল্পের সঙ্গে যেন পুরোপুরি মিলে যায়। কারণ, এ শহরের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভবন নয়, বরং সেই ভবনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন। আজ যারা এখানে ঘুরতে আসেন, তারা কেউ সেই পুরোনো মানুষগুলোর নাম জানেন না। তাদের পরিবার, পেশা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের কথাও জানেন না। তবু পুরোনো বাড়িগুলো দেখে তারা সেই অচেনা মানুষদের জীবন কল্পনা করেন। একজন ব্যবসায়ী কেমন ছিলেন, একটি পরিবার কীভাবে থাকত, একটি শিশুর দিন কীভাবে কাটত — এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই অতীতটা নতুন করে সামনে আসে। আর এখানেই পানাম নগরের আলাদা গুরুত্ব। এটি শুধু ছবি তোলার একটি জায়গা নয়। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে বর্তমানের মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য অতীতের একটি জীবনের কাছাকাছি যেতে পারে। তবে এই পুরোনো শহরকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও কম নয়। দর্শনার্থীদের অসচেতন আচরণ, দেয়ালে লেখা, স্থাপনার ক্ষতি কিংবা অবহেলা এসব ধীরে ধীরে পুরোনো স্থাপনাগুলোর ক্ষতি করতে পারে। একটি পুরোনো দেয়াল আমাদের কাছে হয়তো শুধু একটি দেয়াল, কিন্তু সেই দেয়ালের পেছনে হয়তো রয়েছে বহু মানুষের জীবনের গল্প। তাই পানাম নগর সংরক্ষণ মানে শুধু পুরোনো ভবনগুলোকে রক্ষা করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসটাকেও ধরে রাখা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে পানাম নগরের ভিড়ও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। যারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিলেন, তাঁরা ছবি আর কিছু স্মৃতি নিয়ে বাড়ির পথে ফেরেন। দোকানপাট গুটিয়ে যায়, রাস্তা আবার শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু সারি সারি পুরোনো বাড়িগুলো থেকে যায়। পরদিন আবার কেউ আসবে। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী ইতিহাসের অংশ হিসেবে এই শহর দেখতে আসবে, কোনো পরিবার সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে আসবে, কিংবা কোনো তরুণ পুরোনো একটি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে।তখন হয়তো আবার সেই একই প্রশ্ন উঠবে—এই বাড়িতে একসময় কারা থাকত? এখানে কি ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ হতো? পানাম নগরের সব উত্তর হয়তো আর কখনো পাওয়া যাবে না। কিন্তু যতদিন মানুষ সেই প্রশ্ন করবে, ততদিন এই পুরোনো শহর শুধু অতীত হয়ে থাকবে না। এ নগর সব সময় আমাদের অতীতের একটি গল্প বলে যাচ্ছে। এখন সেই গল্পের পরের অধ্যায় আমাদের হাতে; আমরা কি পানাম নগরকে শুধু দেখার মতো একটি পুরোনো শহর হিসেবে রেখে যাব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্যও তাকে একটি জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে বাঁচিয়ে রাখব? কারণ, একটি শহর তার মানুষ হারিয়ে ফেললেও মানুষের গল্প হারিয়ে যায় না কখনো। তা পুরোনো দেয়াল হয়ে থেকে যায়, আর নতুন প্রজন্ম এসে সেই দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আবার গল্পটি খুঁজে নেয়।
লামিয়া আক্তার তন্নি
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
যেদিন আমি প্রথম পিরিয়ডের সাথে পরিচিত হই, বয়সটা তখন হবে নয় বছর মাত্র। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় এই অবস্থা! আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। পরিবারের লোকজনও প্রত্যাশা করতে পারেনি। সেদিন আমি স্কুলে ছিলাম। স্কুলের ম্যাডাম বেঞ্চে রক্তের দাগ দেখে জিজ্ঞেস করলেন এখানে বসেছিল কে? আমি বললাম, আমি বসেছি। আমি বেঞ্চ চেঞ্জ করে বসেছিলাম। ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল। প্রথম বেঞ্চ থেকে সেকেন্ড বেঞ্চে গেলাম। রক্ত দেখে বুঝিনি সে কারণে। আমার সাথে অন্য মেয়েরা বসে ছিল। কিন্তু প্রথম বেঞ্চে রক্তের দাগের কারণে আর কেউ বসেনি। ম্যাডাম আমাকে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন ম্যাডাম আমাকে বাসায় পাঠালেন। একটা ছোট্ট চিরকুট লিখে দিলেন আমার গার্ডিয়ান বরাবর। বাসায় পৌঁছানোর পর আমার গার্ডিয়ান কাগজটা পড়ে আমার দিকে তাকালেন। এরপর আমার পোশাক সব চেঞ্জ করালেন এবং একটা কাপড় বিশেষ জায়গায় পড়তে দিলেন। বুঝতে পারছিলাম না। বুঝিয়ে দিলেন। এর পরও বুঝছিলাম না। পরে তিনিই পরিয়ে দিলেন। এই অসময়ে এভাবে পিরিয়ডের মুখোমুখি হাওয়ায় আমাকে ডাক্তারের কাছে পর্যন্ত নিতে হয়েছে। প্রায়ই আমার জ্বর আসত এবং ব্যথাও করত। ডাক্তার দেখে বলেছেন স্বাভাবিক আছে। যদিও ডাক্তার তখন ব্যাপারটা প্রত্যাশিত নয় বলেছেন। তিনি কিছু ওষুধ লিখে দেন। আমার যতটুকু মনে পড়ছে এই হলো নিজের জীবনের সংক্ষিপ্ততা। নিজের জীবনের একটা ধাপের পর অনেক বছর পর একদিন আমি স্কুলের জব শেষে বাসায় ফিরছিলাম। আমি যে পথ দিয়ে হাঁটি, সেটা সাধারণত নীরব থাকে। মানুষজনের চলাফেরা তেমন একটা থাকে না ওই পথ দিয়ে। আমার বাসার পথ এখান দিয়ে কাছে; সে জন্যই আমি ওই পথে আসতাম। আমি যখন হাঁটছি, আমার সামনে জেলার সরকারি স্কুলের একটি মেয়েকে দেখতে পাই। ড্রেস দেখে চিনি আর কি। কিন্তু একটু কাছাকাছি যেতেই দেখি মেয়েটির সাদা সালোয়ারটি রক্তে ভেজা এবং পা দিয়েও রক্ত পড়ছে। পেছনে জামাতেও প্রচুর রক্ত লেগে আছে। খেয়াল করে দেখলাম মেয়েটি কাঁদছে। আশপাশে দু-একটা রিকশা ও মানুষ হেঁটে যাচ্ছে এবং মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে। আমি মেয়েটির আরও অনেক কাছে চলে গেলাম দ্রুত। গিয়ে ওকে দাঁড় করালাম। আমি বললাম, তুমি কাঁদছ কেন? আর তোমার এ অবস্থা কেন? তখন মেয়েটি কাঁদতে থাকে। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো? ও বলে এইটে। কিছু কথা বলার পর আমি যা বোঝার বুঝে যাই। ওর মা ওকে রিকশার ভাড়া প্রতিদিন দেয়। আজ টাকা হারিয়ে ফেলেছে। তার ওপর এই অবস্থা! ও খুব অস্বস্তি পাচ্ছে বুঝলাম। টাকা না থাকায় রিকশা দিয়ে যেতে পারছিল না। তাই আরও দেরি হয়ে গেছে বুঝলাম। স্কুলে সম্ভবত ব্যাপারটা কেউ খেয়াল করেনি। একটা দোকান থেকে পানি নিয়ে ওকে খাওয়াই, রিকশা ডাকি। আমি তখন আমার বাসার কাছে চলে এসেছিলাম। আমার বাসার কাছ থেকে মেয়েটিকে রিকশায় তুলে ওর বাসার ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে ওকে নিয়ে চললাম ওর বাসায়। ওখানে পৌঁছে ওর মা-বাবার হাতে ওকে বুঝিয়ে দিই। আর রিকশাওয়ালাকে কিছু টাকা দিই, যাতে তিনি রিকশা ধুয়ে ফেলেন। কারণ, রিকশায় পিরিয়ডের দাগ লেগে গিয়েছিল এবং নিচেও পড়েছিল। রিকশাওয়ালা মধ্যবয়সী, সে জন্য সব বুঝতে পেরেছিল। তার পরও একটু রাগান্বিত ছিল; ঘ্যান ঘ্যান করছিল। আমি তাকে বুঝিয়ে চলে যেতে বলি। মেয়েটির মা-বাবার সাথে কথা বলি এবং মেয়েটির জন্য একটি সেনোরা প্যাড ওদের বাসার সাথে ডিসপেনসারি থেকে আনি। কিন্তু মেয়েটির দাদি আমাকে বাধা দেয়। আমি তার দাদিকে ও মাকে বোঝাতে সক্ষম হই এবং বলি, প্রতি মাসে যদি আপনারা প্যাড কিনতে না পারেন, তাহলে আমাকে বলবেন। আমি কিনে দেব। তখন মেয়েটির বাবা বলল, “না আপা, আপনি আজ অনেক উপকার করেছেন। লাগবে না। আমি প্রতি মাসে কিনে নিয়ে আসব আমার মেয়ের জন্য।” তখন মা আর দাদি কিছু বলল না। তাদেরকিছু স্বাস্থ্যসম্পর্কিত টিপস এবং এটার প্রয়োজনীয়তা বোঝাই। মেয়েটির পরিবারের সাথে আমার সখ্য ও যোগাযোগ ছিল দীর্ঘদিন। মেয়েটির ২১ বছর বয়সে বিয়ে হয়। বিয়ের আগে ছেলের সম্পর্কে বিস্তারিত জানায় আমাকে। তখন আমি বলি, তাহলে বিয়ে দেয়া যায়। তা ছাড়া মেয়েটির মধ্যেও যথেষ্ট ম্যাচুরিটি এসেছিল এবং সবকিছুই বুঝত, জানত। মেয়েটির এখন দুই সন্তান। সুখী জীবন যাপন করছে। একটি জেলা শহরে সম্ভবত তখন আমি এই ট্যাবুটা ভেঙেছি, কারণ তার মা-বাবা ও দাদি প্রায় জায়গায় আমার কথা বলত কীভাবে তাদের মেয়েকে রাস্তা থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম আর প্যাডের কাহিনি, মেয়ের বাপের সামনে বলা, রিকশাওয়ালাকে ম্যানেজ করা। তখন আমি নিজের মাঝে নিজে খুব আত্মতৃপ্তি পাই ঘটনাটি মনে করলে। আমার সময়ে আমি স্বাস্থ্য বার্তা সম্পর্কে জানতাম না। কেউ আমাকে জানায়নি। পরে মায়ের কাছে জেনেছি। পিরিয়ডের শুরুতে মা ছিল গ্রামে। আমি ঢাকায়। প্রতি মাসে পিরিয়ডের যন্ত্রণা ও কাজগুলো আমাকে খুবই প্যারা দিত। কাপড় ধোয়া, বাথরুমে শুকাতে দেয়া। বাথরুমে ওপরের দড়িতে নাগাল পেতাম না। সবার সামনে থেকে টুল এনে বারবার বাথরুমে যেতাম ২০ মিনিট পরপর। কাপড় শুকাত না। শুতে ভয় পেতাম। পরে যদিও বারান্দায় শুকানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাতেও ছিল সমস্যা। দূরে থেকে মানুষ মনে হয় যেন তাকিয়ে থাকত কিছু একটা শুকাতে দিচ্ছি। এই মেয়েটির উপকারটা যখন আমি করি, সেদিনও মনে পড়ছিল নিজের জীবনের কাহিনিগুলো। আজ এখানে লিখতে পেরে অনেক ভালো লাগছে।
সাহিদা সাম্য লীনা
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়। কিন্তু সেই মানুষগুলো নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালেই রাখে। কারণটা হলো পারিবারিক সমস্যা। যেসব শিশু একটি বিশৃঙ্খল পরিবারে বড় হয়, তারা নিজেদের মধ্যে শুধু ভয় খুঁজে পায়। সেই ভয় শিশুর মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। পারিবারিক সমস্যা, বাবা-মায়ের ঝগড়া শিশুর নিজসত্তাকে বোঝার ও উপলব্ধি করার শক্তি নষ্ট করে দেয়। সেই শিশু যখন স্কুলে যায়, বাইরের পরিবেশে মেশে, তখন তার কাছে সেই জগৎ ভিন্ন মনে হয়। সে সবকিছুতেই ভয় খুঁজে পায়। তার মনে হয়, সকলে তার শুধু ক্ষতিই করবে। এ চিন্তা নিয়েই সে বড় হয়। পারিবারিক সমস্যার ফলে একটি ছয়-সাত বছরের শিশু জীবনকে অভিশাপ মনে করে। সেই কোমল মনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যায়। সেই ছয়-সাত বছরের শিশু কোনো বন্ধু বানাতে পারে না। কারণটা হলো—তার মনে হয়, এই পৃথিবীটা যেন একটি ভয়ংকর জঙ্গল, যেখানে শুধু হিংস্র জন্তুরা থাকে। আর সেই হিংস্র জন্তুরা হচ্ছে ‘মানুষ’। শিশুর কোমল মনে এটি একটি ভয়ের কারণ। পারিবারিক সমস্যায় বেড়ে ওঠা শিশুটি যখন বড় হয়, কিশোর-কিশোরী হয়, তখনো তার মনের মধ্যে এ ভয় স্থান পেতে থাকে। এ ভয় তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়... তখনো তার চারপাশের ব্যস্ত পৃথিবীকে তার অচেনা লাগে। সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চায়, তবে প্রতিবারই সে নিরাশ হয়। পারিবারিক সমস্যা, বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ, ঝগড়া, এমনকি মারপিটও শিশুর মনে একধরনের ভয় সৃষ্টি করে, যা তার মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। সেই পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুটি প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠে। এর ফলে জন্ম নেয় দুর্বল মানসিকতা, দুশ্চিন্তা, ভয়, হতাশা, আত্মসন্দেহের মতো বড় বড় মানসিক সমস্যা। যার ফলে তারা বড় হলেও নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না, একাকিত্বের মাঝে জীবনযাপন করে। প্রতিবারই নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে, তবুও খুঁজে পায় না। সুশৃঙ্খল পরিবারের মধ্যে শিশু বেড়ে উঠলে ভবিষ্যতে সে একজন শিক্ষিত, স্বাভাবিক ও সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। একটি আদর্শ শিক্ষিত রাষ্ট্রের জন্য একটি শিশুকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে একটি স্বাধীন ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য শিশু কীভাবে বেড়ে উঠছে, সেদিকে লক্ষ করা উচিত। সবশেষে বলতে পারি, শিশুরা নিষ্পাপ ও সুন্দর। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে, ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলতে হবে এবং মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আবরার জাওয়াদ
অক্টোবর ৩, ২০২৬
0
আমরা মেডিকেল জগতের সাথে যারা আছি, তারা সবাই কফি এনেমা সম্পর্কে কমবেশি জানি। তবে পুরোপুরি জানি না। কফি এনেমা হলো মলদ্বারের মাধ্যমে কোলনের ক্যাফেইনযুক্ত কফি ও পানির মিশ্রণ করে প্রবেশ করানো একটি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি আবিষ্কৃত হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। সেই সময় জার্মানি চিকিৎসকরা বিভিন্ন রোগের বিকল্প হিসেবে এবং ক্যান্সার চিকিৎসা উপায় খুঁজতে গিয়ে মলদ্বারে কফি ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ওষুধ আর ব্যথানাশক সংকট দেখা দিলে সেনাদের ওপর এই কফি এনেমা ব্যবহার করে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করা হতো। এ পদ্ধতিকে আরও বেশি জনপ্রিয় করেছে জার্মানি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. মাক্স গার্সন। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সালে তাঁর বিখ্যাত গার্সন থেরাপিতে কফি এনেমাকে যুক্ত করেন। এভাবে কফি এনেমা সম্পর্কে তৎকালীন চিকিৎসক সমাজ জানতে পারে। গার্সন থেরাপি অনুসারে এটি যকৃতের পিত্তরস নির্গমন করে, যা যকৃৎকে বিষমুক্তকরণ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। তারপর এতে পেটের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় এবং শরীরকে শক্ত ও হাড়গুলোকে মজবুত করে। তবে এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখা কোনো চিকিৎসক দিতে পারেননি। প্রোক্টোপ্রোকটিলাইটিস ও কোলাইটিস মলদ্বার ও বৃহদন্ত্রে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা রক্তপাত ও ব্যথার কারণ হয়। ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা : শরীরে খনিজের মাত্রা নষ্ট হয়ে যায়, যা গুরুতর ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দনের সমস্যা ঘটাতে পারে। সংক্রমণ ও সেপসিস : ভুল পদ্ধতিতে এনেমা করলে অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ এবং রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ (Sepsis) হতে পারে। ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা : ক্যাফেইনের অতিরিক্ত শোষণের ফলে শরীর অতিরিক্ত তরল হারিয়ে ফেলে। অন্ত্রের পেশি দুর্বল হওয়া : নিয়মিত এনেমা ব্যবহারের ফলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য বেড়ে যায়। তবে এর অপকারিতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখা আছে এবং প্রমাণ আছে। তাই বর্তমান চিকিৎসকরা রোগীদের কফি এনেমার পরামর্শ দেন না। ২৫ মে ২০২৩ তারিখে Cleveland Clinic এর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সামিতা গার্গ কফি এনেমা না দেয়ার পরামর্শ দেন। তারপর ২০২০ সালে এসিজি রিপোর্ট অনুসারে একটি Case রিপোর্ট পাবলিশ করে যে কফি এনেমার মাধ্যমে এক সুস্থ ব্যক্তির প্রোক্টোপ্রোকটিলাইটিস হয়েছে। তাই চিকিৎসকরা বলেন, কফির পরিবর্তে তরল পানি (ঠান্ডা পানি অথবা ঘর তাপমাত্রার পানি) দিয়ে এনেমা করলে ভালো হয়। আমি মনে করি, যেহেতু এর উপকারিতা সম্পর্কে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখা বা যুক্তি প্রমাণ হয়নি, তাই কফি এনেমা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
অক্টোবর ২, ২০২৬
0
আমি ভালো আছি। বিষাদের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও মৃদু হেসে বলি, ভালো আছি। অথচ এ দুটি শব্দের অন্তরালে চাপা পড়ে আছে সহস্র দীর্ঘশ্বাস, অগণিত অনুচ্চারিত অভিমান ও অভিযোগ। একদিন মানুষকে সহজেই বিশ্বাস করতাম, সবাইকে আপন করে নেয়াই ছিল আমার স্বভাব। আজ সেই সরলতাই আমার সবচেয়ে পুরোনো ক্ষত। আপনজনের আঘাত বারবার পেতে পেতে শিখেছি—সব নৈকট্য আপন নয়, সব মমতা চিরস্থায়ী নয়, সবার ভালোবাসা আমার জন্য নয়। আমি পাষাণ হইনি। শুধু অনুভূতির দরজাকে শক্ত করে দিয়েছি। কষ্ট এখনো হয়, অভিমান এখনো জাগে; শুধু প্রকাশ করার ভাষাটা হারিয়ে গেছে। মানুষের ভিড়ে হাসি, স্বাভাবিকতার অভিনয় করি, আর রাত্রির নৈঃশব্দ্যে নিজের কাছেই স্বীকার করি—আমি ক্লান্ত। কখনো কখনো আমার আগের সরলতায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কেউ আপন সেজে এলে আজ ভালোবাসার আগে ভয় জাগে—যদি তারাও একদিন বদলে যায়? তাই দূরত্বই এখন আশ্রয়, নৈঃশব্দ্যই সঙ্গী। অন্যের সুখকে নিজের সুখের চেয়ে বড় করতে করতে একদিন আবিষ্কার করলাম—সবাইকে আপন করতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি। আমারও স্বপ্ন ছিল, নিজের মানুষদের আজীবন আপন রাখার। কিন্তু জীবন শিখিয়েছে, মানুষ আসে শুধু ভালোবাসতে নয়, কখনো কখনো বিশ্বাসের মূল্য শেখাতেও। তাই আজও কেউ জিজ্ঞেস করলে ‘কেমন আছ?’ আমি হাসি। কারণ, কিছু সত্য বলা যায় না। শুধু নীরবে বহন করতে হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সরলতা হারাই। এর চেয়েও বড় সত্য হলো, আমাদের আশপাশের মানুষের আচরণই অনেক সময় আমাদের বদলে যেতে শেখায়।
ফাবিহা ইসলাম
অক্টোবর ২, ২০২৬
0
জীবন আসলে কোনো সরল পথের নাম নয়। তার বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে থাকে রৌদ্র, ছায়া, প্রাপ্তি আর হারানোর মৃদু পদধ্বনি। যে দিনটিকে আমরা দুহাত দিয়ে আঁকড়ে রাখতে চাই, সে-ই যেন সবার আগে দূরে সরে যায়। আবার যে বেদনা একদিন অসহনীয় মনে হয়, সময়ের গভীরে তারই ভেতর থেকে জন্ম নেয় নতুন কোনো বোধ, নতুন কোনো আলো। তাই জীবনের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি নয়—শুধু এতটুকু, চলার পথে হৃদয় যেন কঠিন না হয়ে যায়। মানুষ আসুক, মানুষ চলে যাক; সম্পর্ক বদলাক, সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে যাক—তবু ভালোবাসা থাকুক তার নিজস্ব আলোয়। শেষ প্রহরে ফিরে তাকিয়ে যেন বলতে পারি—সব পাইনি, সবকিছু আমার হয়ে থাকেনি; তবু যা পেয়েছি, তাকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছি। যে মানুষগুলো এসেছিল, তাদের ভালোবেসেছি; যে দিনগুলো চলে গেছে, তাদের স্মৃতিকে সযত্নে রেখেছি। আর যে জীবন আমাকে দেয়া হয়েছিল, তাকে কোনো অভিযোগের ভারে নয়—ভালোবাসার আলোয়, গভীর মমতায়, সত্যিকার অর্থেই ভালোবেসে বেঁচেছি।
ড. নজরুল ইসলাম খান
সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
0
শরতের আশ্বিনকে বলা হয় শুভ্রতার প্রতীক। শরতের আশ্বিন মানেই বৈচিত্র্যময় লাবণ্যময়ী। সাদা কাশফুল, শিউলি ঝরা সকাল, ঢাকের শব্দ, স্নিগ্ধ জোছনা, আলো-ছায়ার খেলা দিনভর। আশ্বিনে শরৎ সেজে ওঠে ভোরের শিউলি ফুল আর ঘাসের ওপর হালকা মুক্তোর দানার মতো শিশির ভেজা মিষ্টি রোদের পশরা নিয়ে। শাপলা, শালুক, পদ্ম, জুঁই, মল্লিকা, মালতি, ছাতিম, দোলনচাঁপা, জারুল, নয়নতারা, ধুতরা, কেয়া আর কাশফুলে সৌরভ ছড়াবে প্রকৃতির রারি শরৎ। শরতের মেঘহীন নির্মল নীলাকাশে সাদা মেঘমালার ভেলা ভেসে বেড়ানোর সাথে সবুজ মাঠের ওপর উড়ে যায় শালিক, ময়না, টিয়ের ঝাঁক। অবারিত সবুজ মাঠের ছোঁয়ায় নিথর প্রকৃতি ফিরে পায় সজীবতা। অপরূপ চিত্র আশ্বিন শরতের আগমনে শ্বেতশুভ্র রূপলাবণ্যে নতুন সাজে সেজে উঠবে প্রকৃতি। বিলের জলে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে লাল-সাদা শাপলা ও শালুক ফুল। শরতের আশ্বিনরূপ ঐশ্বর্য এত মোহ, এত বৈচিত্র্যময়! প্রকৃতির অপরূপ অপার সৌন্দর্যে মোহিত রূপের সান্নিধ্যে চায় প্রকৃতির কাছাকাছি কবিও খুঁজে ফেরে তারে। আশ্বিন এলেই ভোরের বাতাসে কেমন এক মায়াবী গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে—শিউলির গন্ধ। রাতের আঁধার পেরিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই সাদা-কমলা শিউলিরা নীরবে ঝরে পড়ে ঘাসের বুকে, যেন প্রকৃতি আপন হাতে লিখে রাখে শরতের শুভেচ্ছা পত্র। শিশির ভেজা পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া শৈশব বুঝি আবার ফিরে এসেছে। শিউলি কুড়োনোর সেই ভোর, মায়ের আঁচল, পূজার গন্ধ আর অকারণ আনন্দ—সবকিছু মিশে যায় আশ্বিনের কোমল হাওয়ায়। শিউলি ঝরে যায়, কিন্তু তার সুবাস থেকে যায় হৃদয়ের গোপন অলিন্দে; ঠিক তেমনি কিছু স্মৃতি সময়ের কাছে হার মানে না, বরং প্রতি আশ্বিনে নতুন করে মন ছুঁয়ে যায়। একদিন খুঁজেছিনু যারে বকের পাখার ভিড়ে বাদলের গোধূলি-আধাঁরে মালতীলতার বনে, কদমের তলে নিঝুম ঘুমের ঘাটে, কেয়াফুল শেফালীর দলে! যাহারে খুঁজেছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে। ‘ঝরা পালক’, জীবনানন্দ দাশ। ভোরের শিশির ভেজা শিউলি ঝরা টুপটাপ শব্দহীন অনুভূতিই হলো আমাদের আশ্বিনের শরৎকাল। হালকা শীতের আমেজ আড় ভেঙে পদ্ম, শাপলা, শালুকের হাসি হৃদয়-মনকে করে তোলে প্রকৃতির প্রেমিক। তাই তো শরতের আশ্বিন আমাদের ভালোবাসার রানি।
ঘোষ উত্তম
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নবীন প্রজন্মের ওপর। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজনির্মাতা। তাই নবীনদের জাগরণ শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা রকম চ্যালেঞ্জ। তাই নবীনদের শুধু শিক্ষিত হলেই চলবে না; তাদের হতে হবে জ্ঞানী, বিবেকবান, দায়িত্বশীল ও মানবিক। শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে এবং সত্য-মিথ্যা বিচার করতে শেখায়। তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি জ্ঞানমূলক বই পড়তে হবে, প্রশ্ন করতে হবে এবং যুক্তি দিয়ে বিষয়কে বিচার করতে হবে। অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ না করে সত্য অনুসন্ধানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বিশ্বজ্ঞান অর্জনের জন্য অন্যান্য ভাষাও শেখা প্রয়োজন। ভাষা যত জানা যায়, জ্ঞানের তত বেশি দরজা খুলে যায়। সময় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই অলসতা, অকারণ আড্ডা কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে সময় নষ্ট না করে পড়াশোনা, সৃজনশীলতা, শরীরচর্চা ও আত্মউন্নয়নে সময় দিতে হবে। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে, তবে স্বপ্নের সঙ্গে থাকতে হবে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা। ব্যর্থতা এলে হতাশ না হয়ে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে—হোঁচট খাওয়া পরাজয় নয়; পড়ে গিয়ে আর না ওঠাই পরাজয়। জ্ঞান ও অর্থের চেয়ে মানুষের চরিত্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সত্যবাদিতা, সততা, বিনয়, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতাই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। লোভ, অহংকার ও হিংসা থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা না করে অনুপ্রেরণা নিতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ, মানুষ বড় হয় শুধু অর্থ-বিত্তে নয়, মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে। পিতা-মাতার ত্যাগ ও ভালোবাসার ঋণ অপরিসীম। তাঁদের সম্মান করা, যত্ন নেয়া এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানো সন্তানের দায়িত্ব। শিক্ষকরাও একজন শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের জ্ঞান, শাসন ও পরামর্শ জীবনের সঠিক পথ দেখাতে পারে। তাই পিতা-মাতা ও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নবীনদের জীবনের অন্যতম নৈতিক শিক্ষা হওয়া উচিত। কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধুত্বের প্রভাব গভীর। ভালো বন্ধু মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে; অসৎ সঙ্গ তাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। মাদক, নেশা ও অপরাধ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কাজে ব্যবহার করতে হবে; যেন প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করি। নিজেকে জয় করাই মানুষের বড় বিজয়। রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কথা বলার আগে ভাবতে হবে এবং ভুল হলে ক্ষমা চাইতে শিখতে হবে। নম্রতা ও আত্মসংযম মানুষের সৌন্দর্য বাড়ায়। একই সঙ্গে মানবিক হতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের কষ্ট বোঝা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি। দেশপ্রেম শুধু মুখের কথা নয়; এটি দায়িত্বশীল কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অন্যায়, অসততা ও দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে পারে। পরিবেশ রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব। বৃক্ষরোপণ, নদী-জলাশয় রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে নবীনদের এগিয়ে আসতে হবে। আজকের নবীনরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের জ্ঞান, চরিত্র, শ্রম ও মানবিকতার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে। তাই হে নবীন, জাগো। জ্ঞানকে করো তোমার আলো, সততাকে করো শক্তি, শ্রমকে করো হাতিয়ার এবং মানবতাকে করো জীবনের আদর্শ। পিতা-মাতাকে সম্মান করো, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করো, ভালো সঙ্গ গ্রহণ করো এবং নেশা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো—ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে পাওয়া যায় না, ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে হয়। আজকের ছোট্ট চারাই একদিন মহিরুহ হয়। তেমনি আজকের সচেতন নবীনই আগামী দিনের আলোকবর্তিকা। হে নবীন, জাগো—নিজেকে গড়ো, সমাজকে গড়ো, দেশকে গড়ো।
মোঃ নুরুল ইসলাম নিলয়
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
দীর্ঘ সময়ের কর্মচাপ শুধু মানসিক ক্লান্তি বা ঘুমের সমস্যার কারণ নয়; শরীরের বিপাকীয় ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং শরীরে কর্টিসল নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তনের সঙ্গে পেটের ভেতরে জমা ভিসেরাল ফ্যাট ও ইনসুলিন প্রতিরোধের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। ভিসেরাল ফ্যাট হলো পেটের গভীরে বিভিন্ন অঙ্গের চারপাশে জমা চর্বি। ত্বকের নিচে জমা চর্বির তুলনায় এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের ক্ষেত্রে শরীরের হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রিনাল (HPA) অক্ষ সক্রিয় হয়। এর মাধ্যমে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল নিঃসরণে পরিবর্তন ঘটে। কর্টিসল স্বল্পমেয়াদে শরীরকে চাপ মোকাবেলায় সাহায্য করলেও দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসে এর নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। চাপের সময় কর্টিসল শরীরে গ্লুকোজের প্রাপ্যতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। দীর্ঘস্থায়ীভাবে কর্টিসলের কার্যক্রমের পরিবর্তন হলে গ্লুকোজ বিপাক ও ইনসুলিনের কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় উচ্চ কর্টিসল কার্যক্রম, ভিসেরাল ফ্যাট এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ভিসেরাল ফ্যাট নিজেও বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় টিস্যু। এটি বিভিন্ন সিগন্যালিং অণু ও প্রদাহ-সম্পর্কিত উপাদান নিঃসরণ করে, যা ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস, ভিসেরাল ফ্যাট এবং বিপাকীয় পরিবর্তনের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। গবেষণার ফল এখানে একেবারে একমুখী নয়। ২০২৪ সালের একটি সিস্টেমিক রিভিউতে ৩২টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও শারীরিক গঠন বা বিপাকীয় সূচকের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাগুলোর ফল বেশ অসঙ্গতিপূর্ণ। অনেক গবেষণায় স্ট্রেসের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও শুধু স্ট্রেসকে সরাসরি শরীরের চর্বি বৃদ্ধির একক কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপের সঙ্গে অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং উচ্চ-ক্যালরির খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। এসব আচরণগত পরিবর্তনও ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় স্ট্রেস ও অ্যাডিপোসিটির সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন জীবনযাপনগত উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওজন বা কোমরের মাপ কমানোর আলোচনায় শুধু খাবারের পরিমাণ কমানোর দিকে নজর না দিয়ে ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, কর্মঘণ্টার ভারসাম্য এবং স্ট্রেস ব্যবস্থাপনাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কাজের মাঝে অল্প সময় হাঁটা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার বিরতি নেওয়া, কর্মদিবসের নির্দিষ্ট সমাপ্তি রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ তৈরি করা সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল বা ‘কুল-ডাউন’ পদ্ধতি সরাসরি ভিসেরাল ফ্যাট কমিয়ে দেয় এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। স্ট্রেস-ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কর্টিসল পরিবর্তনের প্রমাণ নিয়েও গবেষণার ফল এখনও সীমিত ও বৈচিত্র্যময়। অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রের দীর্ঘস্থায়ী চাপকে শুধু মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের স্ট্রেস শরীরের হরমোন ও আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে ভিসেরাল ফ্যাট বৃদ্ধির পেছনে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, জেনেটিক্সসহ একাধিক কারণ কাজ করে তাই কর্টিসলকে এককভাবে দোষী ও করা যাবে না।
রাইসা মেহজাবীন
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।