বাইপোলার ডিসঅর্ডার একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে ব্যক্তির মেজাজ, শক্তি, ঘুম, চিন্তাভাবনা ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ও কম ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অর্থাৎ ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার পর্ব দেখা যায়; আবার কখনো গভীর বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। এর চিকিৎসায় ওষুধ ও সাইকোথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি জীবনযাপন, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম এবং খাদ্যাভ্যাসও সামগ্রিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা ডায়েট বাইপোলার ডিসঅর্ডার সারিয়ে দিতে পারে না। পুষ্টি চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং এটি চিকিৎসার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।
মস্তিষ্ক শরীরের অত্যন্ত সক্রিয় একটি অঙ্গ। এর স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা এবং বিপাকীয় জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তাই বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ‘মুড ঠিক করার খাবার’ খোঁজার পরিবর্তে একটি সুষম, বৈচিত্র্যময় ও নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ছোলা, পূর্ণশস্য, মাছ, ডিম, পরিমিত পরিমাণে মাংস, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারের পরিমাণ কমানো উপকারী।
বাংলাদেশি খাদ্যসংস্কৃতিতে ভাত বা রুটি বাদ দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এর সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, ডাল, মাছ বা অন্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস যুক্ত করা যেতে পারে।
মাছের তেলে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্ক ও হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ, যেমন সার্ডিন, ম্যাকারেল বা অন্যান্য স্থানীয়ভাবে পাওয়া মাছ এর ভালো উৎস হতে পারে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং কিছু গবেষণায় বিষণ্নতার উপসর্গে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে প্রমাণ এখনো এমন নয় যে ওমেগা-৩-কে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের স্বতন্ত্র চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, অতিরিক্ত ক্যালরি কমানো বা অনিয়মিত খাবারের অভ্যাস শরীরের শক্তি ও ক্ষুধার স্বাভাবিক ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে ঘুমের অনিয়মও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে, ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার সময় ঘুমের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন, এনার্জি ড্রিংক বা রাতের দিকে বেশি চা-কফি গ্রহণ ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ ক্ষুধা, ওজন, রক্তে শর্করা, রক্তের চর্বি বা অন্যান্য বিপাকীয় সূচকে পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ওজন, রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ ও লিপিড প্রোফাইলসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সূচক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ সতর্কতার বিষয় হলো লিথিয়াম। লিথিয়াম গ্রহণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীরে পানিশূন্যতা এবং সোডিয়াম গ্রহণে বড় ধরনের পরিবর্তন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই লিথিয়াম গ্রহণের সময় নিজের ইচ্ছায় লবণ বা পানি গ্রহণের পরিমাণে বড় পরিবর্তন আনা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।
বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ব্যবহৃত কিছু ওষুধের কারণে কারও ওজন বাড়তে পারে। তাই ওজন বৃদ্ধি হলে ব্যক্তিকে শুধু ‘কম খেতে হবে’ বা ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ওজন ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, ওষুধের প্রভাব এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, হারবাল পণ্য, ডিটক্স ডায়েট, দীর্ঘমেয়াদি উপবাস বা বিশেষ ডায়েটকে ‘প্রাকৃতিক চিকিৎসা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। এসব দাবির অনেকগুলোর পেছনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশেষ করে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো মানসিক রোগের ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী, পুষ্টিবিদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণের সময় তার ওষুধ, বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওজন, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং খাদ্যসংস্কৃতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, খাদ্য বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসার বিকল্প নয়; তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস চিকিৎসার পাশাপাশি শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং একটি স্থিতিশীল জীবনযাপন সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
শিক্ষা হলো জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। এটি চরিত্র গঠন, নৈতিকতার উন্মেষ এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। তবে শিক্ষার এই আলো কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয় বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি একজন শিক্ষিত মানুষের কী দায়বদ্ধতা রয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। উপযুক্ত শিক্ষা মানুষকে ভালো-মন্দ অনুধাবন করতে শেখায়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো এমন একটি মানবিক, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল চরিত্র গড়ে তোলা, যা মানুষকে সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে শেখায়। জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে মানুষের দায়বদ্ধতাও বৃদ্ধি পায়। একজন অশিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষের কাছ থেকে সমাজ যতটুকু প্রত্যাশা করে, একজন শিক্ষিত মানুষের কাছে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা থাকে। জ্ঞান হলো একপ্রকার শক্তি, আর এই শক্তিকে সমাজে ভালো কাজে ব্যবহার করাই শিক্ষার প্রতি আমাদের প্রধান দায়বদ্ধতা। নিজে নীতি ও আদর্শ মেনে চলা এবং সমাজে সত্য ও সুবিচারের পক্ষে অবস্থান নেয়া। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমাজ থেকে নানা ধরনের কুসংস্কার দূর করতে নেতৃত্ব দেয়া। সমাজের দরিদ্র, নিরক্ষর ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের শিক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে এগিয়ে আসা। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা, গাছ লাগানো এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নিজে সচেতন হওয়া ও অন্যকে সচেতন করা। আইন মেনে চলা, দেশের সম্পদে অপচয় না করা, দুর্নীতি প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়া এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা, গুজব রোধ করা এবং সাইবার জগতে দায়িত্বশীল আচরণ করাও শিক্ষিত নাগরিকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। আজকের যুগে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতার চরম অবক্ষয় ঘটছে। অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি দুর্নীতি, অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং অন্যায় কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। এর মূল কারণ—শিক্ষাকে আমরা কেবল ‘জীবিকা অর্জনের উপায়’ বানিয়ে ফেলেছি, ‘জীবন গড়ার মাধ্যম’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সনদকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে নৈতিক ও দায়বদ্ধতাসম্পন্ন শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষা ও দায়বদ্ধতা একে অপরের পরিপূরক। দায়বদ্ধতাহীন শিক্ষা সমাজ ও জাতির জন্য কুফল বয়ে আনে। একটি সুন্দর, প্রগতিশীল ও মানবিক সমাজ গঠন করতে হলে প্রতিটি শিক্ষিত নাগরিককে তার অর্জিত জ্ঞানের আলো দিয়ে অন্যের জীবনকে আলোকিত করা। নিজের স্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে অর্জিত জ্ঞানকে নিয়োজিত করাই হোক শিক্ষা অর্জনের পরম ও চরম সার্থকতা।
একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্ন পেরিয়ে ভার্চুয়াল এই ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে দুচোখে যখন দেখি চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় শুধু ইটপাথরের বহুতলা দালানকোঠা, পায়ের নিচে কংক্রিট, পিচঢালা রাস্তাঘাট, আর বুকভরে দম নিতে গেলে শুধুই ধুলা-ময়লা ও বিষাক্ত ধোঁয়া, তখন আমাদের শৈশব, গ্রামীণ জীবন কিংবা পুরোনো দিনের সেই সরল ও মধুর দিনগুলোর স্মৃতিকথা খুব মনে পড়ে যায়। যেখানে ছিল চারদিকে শুধুই সবুজ আর সবুজ প্রকৃতি, নৈসর্গিক অপরূপ দৃশ্য, নির্মল বায়ু। বুকভরে শ্বাস নিলে শুধুই বিশুদ্ধ বাতাস, অক্সিজেন। এক একটা শতবর্ষী গাছ ছিল যেন এক একটা অক্সিজেন ফ্যাক্টরি। ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। খেলাধুলার জন্য ছিল পর্যাপ্ত মাঠ, বিস্তীর্ণ পতিত জমি, খড়ের ভূই, বড় বড় আম-কাঁঠালের বাগান। শীতের শেষে সারা মাঠ ফাঁকা, যেন সব বল খেলার মাঠ। গরু-ছাগল মাঠে থাকত এড়া। সারা মাঠে খেলেছি কত যে খেলা! বেশ কিছু খেলার নাম এখন এই নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা জানেই না। আমাদের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডুসহ বেশ কিছু খেলা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। উল্লেখযোগ্য কিছু খেলার নাম আমি মনে করতে চাই, যেমন : হাডুডু, লাঠিখেলা, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়া বাঁধা, বুড়ি চুঁ, মার্বেল, ডাংগুলি, কিতকিত, কানামাছি, বাঘবন্দি, কড়ি সারা, গুটি খেলা, ইচিং বিচিং, গুলতি বন্দুক, তির ধনুক, পটকা ফোটানো, ঘুড়ি ওড়ানো, লাঠিভরে হাঁটা, সাঁতার কাটা, কলার ভেলা প্রভৃতি। এ ছাড়া শীতকালে সন্ধ্যার পরে খেজুর গাছের ছোবড়া দিয়ে মশাল বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে দৌড়ানো। এমন কত যে খেলা, সেই আনন্দ-অনুভূতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সেই হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। বর্তমানে আমরা সবাই যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি, কীসের নেশায় যেন শুধু ছুটছি আর ছুটছি। কারও কোনো অবসর নেই, নেই আগের মতো বিনোদন, নেই সেই খেলাধুলা, আর খেলার মাঠ। শুধু খেলার মাঠ নয়; এখন ফসলের জমিও প্রায় সব হারিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে বড় বড় ইমারত। তাই অতীতের সেই খেলাধুলার আর সুযোগ নেই, আজ আমাদের সন্তানেরা সেগুলো চেনেই না। তাই সময় এসেছে আমাদের বর্তমান শিশু-কিশোর ও আগামী প্রজন্মকে নিয়ে ভাবার। শুধু মোবাইলে গেম খেলা নিয়ে বসে থেকে তাদের কর্মস্পৃহা ও কর্মক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। এদের শরীরচর্চা, দৈহিক বৃদ্ধি ও মেধা বিকাশের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে খেলাধুলার এবং ফিরিয়ে আনা দরকার আমাদের ঐতিহ্যবাহী সব খেলাগুলো। বোঝাতে হবে আমাদের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। গ্রামবাংলার কত উৎসব এখন আর দেখাই যায় না। সেই জারি-সারি, পালা গান, প্রেণী গান, সুরে সুরে পুথি কিতাব পাঠ এখন আর শোনাই যায় না। বৈশাখী নববর্ষ উৎসব ছাড়াও ছিল হেমন্তের নবান্ন উৎসব। নতুন আমন ধান উঠলে গুঁড়ো কুটে বিভিন্ন রকম পিঠা, আর নতুন খেজুরের গুড়, আহ! মনে করলেই জিহ্বায় জল এসে যায়। আবার যখন চৈত্রের খাঁ খাঁ রৌদ্র, চারদিকে নেই ধান, পাট, শুধু ধু-ধু মাঠ, বৃষ্টির জন্য সবাই গর্ত কেটে তাতে পানি ঢেলে কোলা ব্যাঙ ছেড়ে দেয়া হতো, আর সবাই কাদা-পানি মেখে; কাদাখেই করে গান ধরা হতো, ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে-রে তুই আল্লাহ’। তারপর বাড়ি বাড়ি চাল তুলে খির রান্না করে খাওয়া হতো। কোনো দিন সত্যিই যেন ঈশান কোণে কালবৈশাখীর মেঘ গুড়গুড় করে ডেকে বৃষ্টি নেমে আসত। তখন আমাদের আনন্দে বুকটা ভরে যেত। মৃত্তিকা আবার ফিরে পেত যেন তার পুনর্জীবন, উর্বর মাটিতে গাছগাছালি হতো সবুজ সতেজ। সেই নির্মল বায়ু প্রকৃতি এখন আর নেই, সবকিছুই আজ পরিবর্তন। আমাদের বৈচিত্র্যময় ছয়টি ঋতু এখন আলাদা করে চেনাই যায় না। সেই বড় বড় বৃক্ষও আর নেই। এদিকে ইটের ভাটার কালো ধোঁয়ায় বাতাস হচ্ছে দূষিত, যানবাহনে হচ্ছে শব্দদূষণ, পলিথিন ব্যাগ আর রাসায়নিক সারে হচ্ছে পরিবেশ ও ভূমি দূষণ, নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি, ডিপ-স্যালোয় বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির চাপ, ওদিকে গ্রিনহাউজ ইফেক্ট। এসব কিছুর কারণে পরিবর্তন আসছে আমাদের চিরসবুজ প্রকৃতিতে। এখন পরিবেশের এই বিপর্যয়ের ব্যাপারে আমাদের স্বচেতনতা সৃষ্টি করার কোনো বিকল্প নেই। অধিক পরিমাণে গাছ লাগিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে পরিবেশের ভারসাম্য। নতুন সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে স্বপ্নভরা আগামী দিনগুলো হোক চিরসবুজ সুন্দর ও সুখের।
প্রতিবছর ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে যতটা খোলাখুলি আলোচনা হয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা ঠিক তার তুলনায় এখনো অনেক পেছনে। অথচ একজন মানুষের পূর্ণাঙ্গ সুস্থতার জন্য শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও সমান গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে মানুষের জীবনে মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এই চাপ এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণা ও স্থানীয় গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মাঝে মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা খুবই প্রবল। পড়াশোনার চাপ, কর্মসংস্থানের অভাব, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের সর্বনাশ ডেকে আনছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেকই পরিবার থেকে দূরে থাকা, দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা, সেশন জট এবং নানা অনিশ্চয়তার কারণে তীব্র অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই মানসিক অবসাদের পরিণতি আত্মহত্যায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাবে একটা বড় অংশ আসক্ত হয়ে পড়েছে মাদকের মতো ভয়ংকর নেশায়; যা আমাদের সমাজেকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে যাচ্ছে। তবে এই মানসিক অবসাদগ্রস্তের পেছনে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থা একা দায়ী নয়, এর পেছনে বড় অংশীদার আমাদের সমাজ এবং আশপাশের মানুষের মানসিকতা। বর্তমানে আধুনিক এই পৃথিবীতে ‘বডি শেমিং’ এবং শারীরিক গঠন দুর্বলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা একধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, যা একটি ভিকটিমের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে, সেই ব্যক্তির নিজের ওপরে ঘৃণা করা শুরু করে, নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরে বিভিন্ন রকম নেতিবাচক চিন্তা না শুরু হয় এবং সবশেষে আত্মহত্যা করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। চলতি বছরের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় আমাদের আশপাশে যারা মানসিক অবসাদগ্রস্ত অবসাদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাদের কথাগুলো শোনা, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থ্যসেবায় ও সমাজে পরিবর্তন আনা। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানসিক রোগ কোনো অপরাধ নয়, এটি যেকোনো শারীরিক রোগের মতো নিরাময়যোগ্য। এ রোগ নিরাময় করতে শুধু প্রয়োজন সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং সময়মতো পেশাদারের পরামর্শ। তাই আসুন, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হই এবং অন্যকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করি। একটি দেশের যুবসমাজ ও সুসংগঠিত সমাজ গঠনে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার বিকল্প নেই।