Breaking news
উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিপ্লবের ইতিহাস দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার এক প্রতিচ্ছবি

রবীন জাকারিয়া
রবীন জাকারিয়া কবি ও লেখক মুনসীপাড়া, রংপুর
সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬ • 0

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবের ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার প্রতিচ্ছবি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যন্ত, প্রতিটি পর্যায়ে দেশের জনগণ অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। দেশের আপামর জনতা গণতন্ত্র, সম্পদের সুষম বণ্টন, মৌলিক অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামের নারী, শিশুসহ সবার আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন শহিদ হন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি এনে দেয়।

 

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার করে। এই দাবিগুলো পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।

 

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

 

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে নির্বাচনটি অনিয়ম ও বিরোধী দল দমন দ্বারা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দুই বছর আগে যে গণতন্ত্র ও পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য এত জীবনের নস্যাৎ করা হলো। একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার আর একটি দলের কাছে পরাজিত হলো কাঙিক্ষত স্বাধীনতা। সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে তৈরি করা হয় রাষ্ট্রীয় গুণ্ডাবাহিনী, যার নাম রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনী দেশের স্বাধীনতাকামী, গণতন্ত্রকামী, মুক্তিকামী মানুষের কাউন্টার পার্ট হিসেবে অবস্থান নেয়। তিন বছরে এদের হাতে হাজার হাজার মানুষ হত্যার শিকার হয়। সে সময়ের সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল জাসদ, ভাসানী সমর্থিত দল ও নকশাল।

 

এ প্রসঙ্গে আবু জাফর মোস্তফা সাদেক তাঁর ‘বৈপ্লবিক প্রেক্ষাপটে কমরেড সিরাজ সিকদার’ গ্রন্থে রক্ষীবাহিনী, মুজিববাদী ও আওয়ামী লীগারদের হাতে নিহত কিছু অংশের একটি ছোট তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) প্রায় ১৩৯ জন শহিদ হন।”

 

 

জাসদের ইনুকে শহিদের তালিকা দিতে বললে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণশক্তি থেকে ৪৪ জনের নাম তুলে ধরতে পারেন। সে সময় সবচেয়ে জঘন্য ও আলোচিত ঘটনা ছিল কমরেড সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড।

 

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জাসদ নেতা মেজর এম এ জলিল ভারতের আগ্রাসন ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁকে কোনো উপাধি তো দেয়া হয়নি, বরং তাঁকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় যশোর সেনানিবাসে একটি নির্জন বাড়িতে আটকে রাখা হয়। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক ট্রাইবুনালে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য জলিলকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

 

৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে বিয়োগান্তক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। যদিও পরবর্তীকালে জাতিকে আশাহত হতে হয়।

 

১৯৯৬ সালে নির্বাচন বাতিল ও নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করে, তবে ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের কারণে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করে। এ সময়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে সরকার ফ্যাসিবাদী নীতিতে পরিচালিত হয়েছে। একদলীয় শাসন, বিরোধী দলগুলোর প্রতি অত্যাচার, বাকস্বাধীনতাসহ সব মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, গুম, হত্যা, আয়না ঘরের কার্যক্রম, যা টর্চার সেল হিসেবে ভীতির সৃষ্টি করে। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত, শাপলা চত্বরে আলেমসমাজকে রাতের আঁধারে নৃশংস হত্যা ও লাশ গুম করে গণকবর দেয়া হয়।

 

নির্বাচনের নামে প্রহসন, রাতের আঁধারে ভোটের রেজাল্ট, নির্বাচন ছাড়াই ২০১৩ সালে ১৫৬ জন সাংসদের বিজয়, লুট, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বিদেশে অর্থ পাচারসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সংগঠিত হয়নি। 

 

 

 

৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ এবং রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি চালায় এবং পরবর্তী সময়ে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি দেয়া হয়, যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি নামে পরিচিত। বাংলা ব্লকেড চলাকালীন রাজধানীতে শুধু মেট্রোরেল চালু ছিল। পরবর্তী দিনগুলোতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে।

 

এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এক বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি” হিসেবে অভিহিত করেন, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গ করে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ এবং ‘চাইতে গেলাম অধিকার; হয়ে গেলাম রাজাকার’ স্লোগান দেয়। এর পরের দিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, মন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার অভিযোগ আনেন।

 

১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “গত রাতে বিক্ষোভ করে আমরা সোমবার ১২টার প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি।” পরবর্তী দিনগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলে। ১৭ জুলাই রাতে তারা ১৮ জুলাইয়ের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা করে।

 

এই আন্দোলনে হাসিনা সরকার নৃশংসভাবে প্রায় ১৪০০ নিরস্ত্র ছাত্রদের হত্যা করে এবং গণহত্যার দায়ভার এড়াতে ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে সেনাবাহিনীর স্পেশাল বিমানে করে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পতিত হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

 

দিনশেষে দেখা গেল, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে চাপের মুখে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেকে সবচেয়ে বেনিফিশিয়ারি হিসেবে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার জীবন ও শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা হারিয়ে গেল সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। দুই শত বছর ধরে বাঙালির সাম্য ও ন্যায্যতার রাষ্ট্রের সোনার হরিণ হাতের নাগালের বাইরে রয়ে গেল আজও।

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

২৪-এর সাতকাহন

শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়।   কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ।   চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা।   এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।  

বদলে যাওয়া সময়ে তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধের সংকট ও উত্তরণ

নব্যপ্রযুক্তির এ যুগে তরুণ প্রজন্ম ও নৈতিক শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক এবং একটি আদর্শ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সোশ্যাল মিডিয়ার রাজত্ব এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বিশ্বে তরুণদের মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নৈতিকতার মজবুত ভিত্তি থাকা অত্যন্ত জরুরি।   বর্তমান তরুণ প্রজন্ম, যাকে আমরা ‘জেন-জি’ বা ‘ডিজিটাল নেটিভস’ বলছি, তারা তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করছে। কিন্তু তথ্যের এই প্রাচুর্য কি তাদের ভেতরে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটাতে পারছে? প্রখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের সেই অমর বাণী আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক, ‘শিক্ষা হলো মিথ্যার বিনাশ এবং সত্যের আবিষ্কার’। আজ আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের কেবল ক্যারিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শেখাচ্ছে, নাকি একজন সৎ ও মানবিক মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করছে।   আজকের তরুণদের একাংশের দিকে তাকালে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি এক গভীর নৈতিক ও মানবিক শূন্যতা দৃশ্যমান হয়। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই আমাদের চোখ আটকে যায় কিশোর গ্যাংয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং পাশবিক ধর্ষণের মতো শিউরে ওঠা সব সংবাদে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং আমাদের সামষ্টিক নৈতিক অবক্ষয়ের তীব্র বহিঃপ্রকাশ।   বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, তুচ্ছ কথা-কাটাকাটি, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব কিংবা টিকটক-লাইকিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’। এই গ্যাং কালচারের কারণে অকালে ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ। রাস্তায় স্কুলগামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া কিশোররা। এমনকি সামান্য ফেসবুক পোস্ট বা প্রেমের বিরোধকে কেন্দ্র করে সহপাঠীকে পিটিয়ে বা কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে।   এই অপরাধীরা কিন্তু সমাজবিচ্ছিন্ন কেউ নয়; এদের অনেকেই মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। এখান থেকেই প্রমাণিত হয়, শুধু জিপিএ-৫ বা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করলেই চলে না, তরুণ সমাজকে সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।   বিশ্বখ্যাত আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস বলেছিলেন, “শিক্ষা কোনো পাত্র পূরণ করার প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি অগ্নি প্রজ্বলন।” আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ পাত্র পূরণের (তথ্য মুখস্থ করার) প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, কিন্তু মানবিকতার সেই আলো প্রজ্বলন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। নৈতিক সংকটের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ১. প্রচলিত শিক্ষায় মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে কেবল ভালো ফলের ওপর অতিরিক্ত জোর দেয়া হচ্ছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার ইঁদুরদৌড়ে শামিল হয়ে শিক্ষার্থীরা সহমর্মিতা, সততা ও ত্যাগের মতো গুণগুলো শিখতে পারছে না। ২. যৌথ পরিবারের অভাব এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে অভিভাবকরা সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে পারছেন না। অনেক পরিবারে সন্তানের নৈতিক স্খলনের চেয়ে তার পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হওয়াকে বেশি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ৩. প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে তরুণরা অনেক সময় সস্তা লাইক-কমেন্ট ও গ্যাং কালচারের মোহে অন্ধ হয়ে পড়ছে। ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম জীবনধারা তাদের বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য ও দায়িত্ববোধ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।   তরুণদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে, পরিবার হলো মানুষের প্রথম পাঠশালা। একজন শিশু তার মা-বাবার আচরণ দেখেই সততা ও মিথ্যার পার্থক্য শেখে। বিশ্বখ্যাত পার্সিয়ান কবি শেখ সাদি (র.) বলেছিলেন, “তুমি যদি চাও তোমার সন্তান সৎ ও নীতিমান হোক, তবে তাকে শৈশব থেকেই সৎ মানুষের সাহচর্যে রাখো এবং নিজে সততার আদর্শ হও।”   সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। এ ছাড়া আধুনিক প্যারেন্টিং কর্মশালার মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা সন্তানদের অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রমে সঠিক গাইডলাইন দিতে পারেন। মা-বাবাকে বুঝতে হবে, সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন বা বাইক তুলে দেয়ার চেয়ে তাকে সময় দেয়া এবং তার মানসিক খোঁজ রাখা অনেক বেশি মূল্যবান।   শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু সার্টিফিকেট বিতরণের কেন্দ্র হলে চলবে না, একে হতে হবে মানুষ গড়ার কারিগর। শুধু আইনের ভয় বা জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের ভেতরের মানবিক বোধ থেকে নৈতিক পথ বেছে নেয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাক্রম বা কারিকুলামে মূল্যবোধ ও জীবনমুখী দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।   শিক্ষকরা নিজেরা সৎ ও আদর্শ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে রোল মডেল বা অনুকরণীয় হয়ে উঠবেন। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আবদুল কালাম একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন, “যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তিনজন সামাজিক মানুষ তা করতে পারেন—পিতা, মাতা ও শিক্ষক।”   এ ছাড়া ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং জনকল্যাণমূলক কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সমাজে সৎ, পরিশ্রমী ও মানবিক মানুষদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া উচিত, যাতে তরুণরা সমাজে ইতিবাচক রোল মডেল খুঁজে পায়। অপরাধী, ধর্ষক বা অসৎ উপায়ে গ্যাং লিডার হওয়া ব্যক্তিদের যখন রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়, তখন তরুণরা বিভ্রান্ত হয়।   খেলাধুলা, স্কাউটিং এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের (যেমন : থিয়েটার, বিতর্ক, বই পড়া) মাধ্যমে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটানো সম্ভব।   প্রচলিত উপদেশের মোড়কে জোর করে নীতিশিক্ষা চাপিয়ে দেয়ার দিন শেষ। আজকের জেন-জি ও নতুন প্রজন্মকে নীতিমান করতে হলে তাদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিতে হবে এবং যুক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের আত্মমর্যাদাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “শিক্ষা হলো তাই, যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং বিশ্বচরাচরের সাথে আমাদের জীবনের সামঞ্জস্য বিধান করে।”   তরুণদের মাঝে যদি আমরা সেই সামঞ্জস্য, সেই মানবিক বোধ ও সততার বীজ বুনে দিতে না পারি, তবে আমাদের সব অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়বে। আসুন, আমরা তরুণদের কেবল সফল ক্যারিয়ারিস্ট নয়, বরং একজন ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। তবেই আগামী দিনের সমাজ হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সুন্দর পৃথিবী।      

উপসম্পাদকীয়

View more
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিপ্লবের ইতিহাস দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার এক প্রতিচ্ছবি

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবের ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার প্রতিচ্ছবি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যন্ত, প্রতিটি পর্যায়ে দেশের জনগণ অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। দেশের আপামর জনতা গণতন্ত্র, সম্পদের সুষম বণ্টন, মৌলিক অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামের নারী, শিশুসহ সবার আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।   ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন শহিদ হন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি এনে দেয়।   ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার করে। এই দাবিগুলো পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।   ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।   ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে নির্বাচনটি অনিয়ম ও বিরোধী দল দমন দ্বারা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দুই বছর আগে যে গণতন্ত্র ও পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য এত জীবনের নস্যাৎ করা হলো। একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার আর একটি দলের কাছে পরাজিত হলো কাঙিক্ষত স্বাধীনতা। সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে তৈরি করা হয় রাষ্ট্রীয় গুণ্ডাবাহিনী, যার নাম রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনী দেশের স্বাধীনতাকামী, গণতন্ত্রকামী, মুক্তিকামী মানুষের কাউন্টার পার্ট হিসেবে অবস্থান নেয়। তিন বছরে এদের হাতে হাজার হাজার মানুষ হত্যার শিকার হয়। সে সময়ের সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল জাসদ, ভাসানী সমর্থিত দল ও নকশাল।   এ প্রসঙ্গে আবু জাফর মোস্তফা সাদেক তাঁর ‘বৈপ্লবিক প্রেক্ষাপটে কমরেড সিরাজ সিকদার’ গ্রন্থে রক্ষীবাহিনী, মুজিববাদী ও আওয়ামী লীগারদের হাতে নিহত কিছু অংশের একটি ছোট তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) প্রায় ১৩৯ জন শহিদ হন।”     জাসদের ইনুকে শহিদের তালিকা দিতে বললে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণশক্তি থেকে ৪৪ জনের নাম তুলে ধরতে পারেন। সে সময় সবচেয়ে জঘন্য ও আলোচিত ঘটনা ছিল কমরেড সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড।   মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জাসদ নেতা মেজর এম এ জলিল ভারতের আগ্রাসন ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁকে কোনো উপাধি তো দেয়া হয়নি, বরং তাঁকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় যশোর সেনানিবাসে একটি নির্জন বাড়িতে আটকে রাখা হয়। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক ট্রাইবুনালে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য জলিলকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।   ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে বিয়োগান্তক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। যদিও পরবর্তীকালে জাতিকে আশাহত হতে হয়।   ১৯৯৬ সালে নির্বাচন বাতিল ও নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করে, তবে ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের কারণে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।   ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করে। এ সময়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে সরকার ফ্যাসিবাদী নীতিতে পরিচালিত হয়েছে। একদলীয় শাসন, বিরোধী দলগুলোর প্রতি অত্যাচার, বাকস্বাধীনতাসহ সব মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, গুম, হত্যা, আয়না ঘরের কার্যক্রম, যা টর্চার সেল হিসেবে ভীতির সৃষ্টি করে। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত, শাপলা চত্বরে আলেমসমাজকে রাতের আঁধারে নৃশংস হত্যা ও লাশ গুম করে গণকবর দেয়া হয়।   নির্বাচনের নামে প্রহসন, রাতের আঁধারে ভোটের রেজাল্ট, নির্বাচন ছাড়াই ২০১৩ সালে ১৫৬ জন সাংসদের বিজয়, লুট, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বিদেশে অর্থ পাচারসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সংগঠিত হয়নি।        ৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ এবং রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি চালায় এবং পরবর্তী সময়ে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি দেয়া হয়, যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি নামে পরিচিত। বাংলা ব্লকেড চলাকালীন রাজধানীতে শুধু মেট্রোরেল চালু ছিল। পরবর্তী দিনগুলোতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে।   এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এক বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি” হিসেবে অভিহিত করেন, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গ করে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ এবং ‘চাইতে গেলাম অধিকার; হয়ে গেলাম রাজাকার’ স্লোগান দেয়। এর পরের দিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, মন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার অভিযোগ আনেন।   ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “গত রাতে বিক্ষোভ করে আমরা সোমবার ১২টার প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি।” পরবর্তী দিনগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলে। ১৭ জুলাই রাতে তারা ১৮ জুলাইয়ের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা করে।   এই আন্দোলনে হাসিনা সরকার নৃশংসভাবে প্রায় ১৪০০ নিরস্ত্র ছাত্রদের হত্যা করে এবং গণহত্যার দায়ভার এড়াতে ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে সেনাবাহিনীর স্পেশাল বিমানে করে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পতিত হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।   দিনশেষে দেখা গেল, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে চাপের মুখে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেকে সবচেয়ে বেনিফিশিয়ারি হিসেবে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার জীবন ও শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা হারিয়ে গেল সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। দুই শত বছর ধরে বাঙালির সাম্য ও ন্যায্যতার রাষ্ট্রের সোনার হরিণ হাতের নাগালের বাইরে রয়ে গেল আজও।  

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬ 0

ঢাকার জলাশয় : ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং অগ্নিনির্বাপণ সংকট মোকাবেলা

হরমুজ প্রণালি : গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা

কিশোর অপরাধের দায় : আইন নাকি সামাজিক পচন

বদলে যাওয়া সময়ে তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধের সংকট ও উত্তরণ

নব্যপ্রযুক্তির এ যুগে তরুণ প্রজন্ম ও নৈতিক শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক এবং একটি আদর্শ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সোশ্যাল মিডিয়ার রাজত্ব এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বিশ্বে তরুণদের মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নৈতিকতার মজবুত ভিত্তি থাকা অত্যন্ত জরুরি।   বর্তমান তরুণ প্রজন্ম, যাকে আমরা ‘জেন-জি’ বা ‘ডিজিটাল নেটিভস’ বলছি, তারা তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করছে। কিন্তু তথ্যের এই প্রাচুর্য কি তাদের ভেতরে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটাতে পারছে? প্রখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের সেই অমর বাণী আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক, ‘শিক্ষা হলো মিথ্যার বিনাশ এবং সত্যের আবিষ্কার’। আজ আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের কেবল ক্যারিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শেখাচ্ছে, নাকি একজন সৎ ও মানবিক মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করছে।   আজকের তরুণদের একাংশের দিকে তাকালে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি এক গভীর নৈতিক ও মানবিক শূন্যতা দৃশ্যমান হয়। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই আমাদের চোখ আটকে যায় কিশোর গ্যাংয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং পাশবিক ধর্ষণের মতো শিউরে ওঠা সব সংবাদে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং আমাদের সামষ্টিক নৈতিক অবক্ষয়ের তীব্র বহিঃপ্রকাশ।   বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, তুচ্ছ কথা-কাটাকাটি, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব কিংবা টিকটক-লাইকিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’। এই গ্যাং কালচারের কারণে অকালে ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ। রাস্তায় স্কুলগামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া কিশোররা। এমনকি সামান্য ফেসবুক পোস্ট বা প্রেমের বিরোধকে কেন্দ্র করে সহপাঠীকে পিটিয়ে বা কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে।   এই অপরাধীরা কিন্তু সমাজবিচ্ছিন্ন কেউ নয়; এদের অনেকেই মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। এখান থেকেই প্রমাণিত হয়, শুধু জিপিএ-৫ বা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করলেই চলে না, তরুণ সমাজকে সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।   বিশ্বখ্যাত আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস বলেছিলেন, “শিক্ষা কোনো পাত্র পূরণ করার প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি অগ্নি প্রজ্বলন।” আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ পাত্র পূরণের (তথ্য মুখস্থ করার) প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, কিন্তু মানবিকতার সেই আলো প্রজ্বলন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। নৈতিক সংকটের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ১. প্রচলিত শিক্ষায় মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে কেবল ভালো ফলের ওপর অতিরিক্ত জোর দেয়া হচ্ছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার ইঁদুরদৌড়ে শামিল হয়ে শিক্ষার্থীরা সহমর্মিতা, সততা ও ত্যাগের মতো গুণগুলো শিখতে পারছে না। ২. যৌথ পরিবারের অভাব এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে অভিভাবকরা সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে পারছেন না। অনেক পরিবারে সন্তানের নৈতিক স্খলনের চেয়ে তার পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হওয়াকে বেশি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ৩. প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে তরুণরা অনেক সময় সস্তা লাইক-কমেন্ট ও গ্যাং কালচারের মোহে অন্ধ হয়ে পড়ছে। ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম জীবনধারা তাদের বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য ও দায়িত্ববোধ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।   তরুণদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে, পরিবার হলো মানুষের প্রথম পাঠশালা। একজন শিশু তার মা-বাবার আচরণ দেখেই সততা ও মিথ্যার পার্থক্য শেখে। বিশ্বখ্যাত পার্সিয়ান কবি শেখ সাদি (র.) বলেছিলেন, “তুমি যদি চাও তোমার সন্তান সৎ ও নীতিমান হোক, তবে তাকে শৈশব থেকেই সৎ মানুষের সাহচর্যে রাখো এবং নিজে সততার আদর্শ হও।”   সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। এ ছাড়া আধুনিক প্যারেন্টিং কর্মশালার মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা সন্তানদের অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রমে সঠিক গাইডলাইন দিতে পারেন। মা-বাবাকে বুঝতে হবে, সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন বা বাইক তুলে দেয়ার চেয়ে তাকে সময় দেয়া এবং তার মানসিক খোঁজ রাখা অনেক বেশি মূল্যবান।   শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু সার্টিফিকেট বিতরণের কেন্দ্র হলে চলবে না, একে হতে হবে মানুষ গড়ার কারিগর। শুধু আইনের ভয় বা জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের ভেতরের মানবিক বোধ থেকে নৈতিক পথ বেছে নেয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাক্রম বা কারিকুলামে মূল্যবোধ ও জীবনমুখী দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।   শিক্ষকরা নিজেরা সৎ ও আদর্শ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে রোল মডেল বা অনুকরণীয় হয়ে উঠবেন। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আবদুল কালাম একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন, “যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তিনজন সামাজিক মানুষ তা করতে পারেন—পিতা, মাতা ও শিক্ষক।”   এ ছাড়া ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং জনকল্যাণমূলক কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সমাজে সৎ, পরিশ্রমী ও মানবিক মানুষদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া উচিত, যাতে তরুণরা সমাজে ইতিবাচক রোল মডেল খুঁজে পায়। অপরাধী, ধর্ষক বা অসৎ উপায়ে গ্যাং লিডার হওয়া ব্যক্তিদের যখন রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়, তখন তরুণরা বিভ্রান্ত হয়।   খেলাধুলা, স্কাউটিং এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের (যেমন : থিয়েটার, বিতর্ক, বই পড়া) মাধ্যমে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটানো সম্ভব।   প্রচলিত উপদেশের মোড়কে জোর করে নীতিশিক্ষা চাপিয়ে দেয়ার দিন শেষ। আজকের জেন-জি ও নতুন প্রজন্মকে নীতিমান করতে হলে তাদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিতে হবে এবং যুক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের আত্মমর্যাদাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “শিক্ষা হলো তাই, যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং বিশ্বচরাচরের সাথে আমাদের জীবনের সামঞ্জস্য বিধান করে।”   তরুণদের মাঝে যদি আমরা সেই সামঞ্জস্য, সেই মানবিক বোধ ও সততার বীজ বুনে দিতে না পারি, তবে আমাদের সব অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়বে। আসুন, আমরা তরুণদের কেবল সফল ক্যারিয়ারিস্ট নয়, বরং একজন ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। তবেই আগামী দিনের সমাজ হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সুন্দর পৃথিবী।      

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ 0

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং কৃষিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব ও করণীয়

ছবি : সংগহীত

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড : আমাদের কিশোরসমাজের গভীর সংকটের আয়না

আর কত অপ্রতিমের মৃত্যু দেখবে বাংলাদেশ

নীরব মহামারির আত্মহত্যা প্রতিরোধে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ

সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এই দিনে আত্মহত্যার মতো বেদনাদায়ক পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য সংগঠনগুলো সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে। চলতি বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য—‘একত্রে আমরা আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারি’ (আমরা পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারি)।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় প্রাণ হারান। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ নিজেদের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা আর্থিক শ্রেণির সমস্যা নয়; উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল—সব সমাজেই এই নীরব ব্যাধি চেপে বসেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ছবিটা স্বস্তিদায়ক নয়। তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।​   মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কেউ হঠাৎ করে আত্মহত্যা করেন না। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি কোনো না কোনোভাবে তাঁর অসহায়ত্ব ও মানসিক কষ্টের ইঙ্গিত দেন। অথচ আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কুসংস্কারের কারণে মানসিক সমস্যাকে এখনো ‘পাগলামি’ বলে ছোট করা হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের কষ্টের কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করার সাহস পান না। বিষণ্ণতা কিংবা মানসিক উদ্বেগকে চিকিৎসাযোগ্য রোগ হিসেবে মেনে না নেয়াটাই এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।   ​আত্মহত্যা রোধে কেবল আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা যথেষ্ট নয়; দরকার পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ বাড়ানো, তরুণদের মানসিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। আসুন, অবহেলা বন্ধ করি, পরিচিত কারোর ব্যবহারে অস্বাভাবিক হতাশা বা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। আপনার একটি সহানুভূতিশীল কান ও সহমর্মিতার হাত হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে একটি অমূল্য প্রাণ।    

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0

মানবতার সংকট : সভ্যতার বড় চ্যালেঞ্জ

মৌলিক অধিকারের টানাপোড়েন

মশার সঙ্গে নয়, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই নিজেদের অবহেলার সঙ্গে

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিপ্লবের ইতিহাস দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার এক প্রতিচ্ছবি

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬ 0