Breaking news

বিপ্লব

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিপ্লবের ইতিহাস দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার এক প্রতিচ্ছবি

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবের ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার প্রতিচ্ছবি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যন্ত, প্রতিটি পর্যায়ে দেশের জনগণ অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। দেশের আপামর জনতা গণতন্ত্র, সম্পদের সুষম বণ্টন, মৌলিক অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামের নারী, শিশুসহ সবার আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।   ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন শহিদ হন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি এনে দেয়।   ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার করে। এই দাবিগুলো পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।   ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।   ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে নির্বাচনটি অনিয়ম ও বিরোধী দল দমন দ্বারা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দুই বছর আগে যে গণতন্ত্র ও পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য এত জীবনের নস্যাৎ করা হলো। একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার আর একটি দলের কাছে পরাজিত হলো কাঙিক্ষত স্বাধীনতা। সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে তৈরি করা হয় রাষ্ট্রীয় গুণ্ডাবাহিনী, যার নাম রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনী দেশের স্বাধীনতাকামী, গণতন্ত্রকামী, মুক্তিকামী মানুষের কাউন্টার পার্ট হিসেবে অবস্থান নেয়। তিন বছরে এদের হাতে হাজার হাজার মানুষ হত্যার শিকার হয়। সে সময়ের সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল জাসদ, ভাসানী সমর্থিত দল ও নকশাল।   এ প্রসঙ্গে আবু জাফর মোস্তফা সাদেক তাঁর ‘বৈপ্লবিক প্রেক্ষাপটে কমরেড সিরাজ সিকদার’ গ্রন্থে রক্ষীবাহিনী, মুজিববাদী ও আওয়ামী লীগারদের হাতে নিহত কিছু অংশের একটি ছোট তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) প্রায় ১৩৯ জন শহিদ হন।”     জাসদের ইনুকে শহিদের তালিকা দিতে বললে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণশক্তি থেকে ৪৪ জনের নাম তুলে ধরতে পারেন। সে সময় সবচেয়ে জঘন্য ও আলোচিত ঘটনা ছিল কমরেড সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড।   মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জাসদ নেতা মেজর এম এ জলিল ভারতের আগ্রাসন ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁকে কোনো উপাধি তো দেয়া হয়নি, বরং তাঁকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় যশোর সেনানিবাসে একটি নির্জন বাড়িতে আটকে রাখা হয়। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক ট্রাইবুনালে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য জলিলকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।   ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে বিয়োগান্তক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। যদিও পরবর্তীকালে জাতিকে আশাহত হতে হয়।   ১৯৯৬ সালে নির্বাচন বাতিল ও নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করে, তবে ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের কারণে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।   ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করে। এ সময়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে সরকার ফ্যাসিবাদী নীতিতে পরিচালিত হয়েছে। একদলীয় শাসন, বিরোধী দলগুলোর প্রতি অত্যাচার, বাকস্বাধীনতাসহ সব মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, গুম, হত্যা, আয়না ঘরের কার্যক্রম, যা টর্চার সেল হিসেবে ভীতির সৃষ্টি করে। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত, শাপলা চত্বরে আলেমসমাজকে রাতের আঁধারে নৃশংস হত্যা ও লাশ গুম করে গণকবর দেয়া হয়।   নির্বাচনের নামে প্রহসন, রাতের আঁধারে ভোটের রেজাল্ট, নির্বাচন ছাড়াই ২০১৩ সালে ১৫৬ জন সাংসদের বিজয়, লুট, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বিদেশে অর্থ পাচারসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সংগঠিত হয়নি।        ৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ এবং রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি চালায় এবং পরবর্তী সময়ে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি দেয়া হয়, যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি নামে পরিচিত। বাংলা ব্লকেড চলাকালীন রাজধানীতে শুধু মেট্রোরেল চালু ছিল। পরবর্তী দিনগুলোতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে।   এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এক বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি” হিসেবে অভিহিত করেন, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গ করে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ এবং ‘চাইতে গেলাম অধিকার; হয়ে গেলাম রাজাকার’ স্লোগান দেয়। এর পরের দিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, মন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার অভিযোগ আনেন।   ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “গত রাতে বিক্ষোভ করে আমরা সোমবার ১২টার প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি।” পরবর্তী দিনগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলে। ১৭ জুলাই রাতে তারা ১৮ জুলাইয়ের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা করে।   এই আন্দোলনে হাসিনা সরকার নৃশংসভাবে প্রায় ১৪০০ নিরস্ত্র ছাত্রদের হত্যা করে এবং গণহত্যার দায়ভার এড়াতে ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে সেনাবাহিনীর স্পেশাল বিমানে করে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পতিত হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।   দিনশেষে দেখা গেল, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে চাপের মুখে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেকে সবচেয়ে বেনিফিশিয়ারি হিসেবে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার জীবন ও শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা হারিয়ে গেল সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। দুই শত বছর ধরে বাঙালির সাম্য ও ন্যায্যতার রাষ্ট্রের সোনার হরিণ হাতের নাগালের বাইরে রয়ে গেল আজও।  

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬ 0
গণবিপ্লব দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির নতুন অধ‍্যায়
গণবিপ্লব দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির নতুন অধ‍্যায়

সম্প্রতি নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই ক্ষুদ্র দেশগুলোর জনতা বর্তমানে আর পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সন্তুষ্ট নয়। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন, পরিবর্তন, স্বচ্ছতা, সাথে জনতার অংশগ্রহণের সুষম একটি রাজনৈতিক চর্চার জন‍্য উপাদানগুলোর যথাযথ সংমিশ্রণ ও ফলাফলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে তারা এখন আগ্রহী।   মানুষ এখন তথাকথিত গতানুগতিক রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে। সেই সাথে নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবির পাশাপাশি শিক্ষা, সচেতনতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যপাঠ ও চর্চার বিষয়টিকেও তারা সমান্তরালভাবে রাজনীতির চিন্তা-চেতনার সাথে গ্রথিত করে নিচ্ছে।   প্রচলিত যেকোনো ন্যারেটিভের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরাশক্তির নিকট বশ্যতা অস্বীকার করে নিজ রাষ্ট্রকে এক সমুন্নত মর্যাদায় উন্নীত করতে জনগণ এখন অনেক সোচ্চার। আর গণ-আন্দোলনের পরে পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।   নেপালে যেখানে তরুণ প্রজন্মের উত্থান কেবল দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনে সন্তুষ্ট না থেকে একে আধুনিক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার শপথ নেয়, অপরপক্ষে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র একটি দেশ হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে৷ ইতোপূর্বে বিদেশি প্রভাব দেশীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করলেও বাংলাদেশে সেটি বর্তমানে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রথার ওপরও প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার আন্দোলন প্রমাণ করেছে, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ কোনো সরকারের জনতার হাতে পরাস্ত হওয়াটাই নিয়তি। একটি দেশের অর্থনীতি ধসে পড়লে প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতাটাও গুঁড়িয়ে যায়। এদিকে আফগানিস্তানে আলোকপাত করলে দেখা যায়, তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানকার নিপীড়িত, নিমজ্জিত জাতির মাঝেও অসন্তোষ ও দাবিদাওয়া বিদ্যমান, যদিও প্রকাশের সুযোগ সীমিত৷ ক্ষুদ্র এসব রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক রাজনীতির সাথে বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ রচিত হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক সব পটভূমিকে কেন্দ্র করে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত রাজনীতির প্রতিযোগিতাকে প্রখর করে তুলছে৷ ভারতের সাথে নেপালের ঐতিহাসিক একটি ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকলেও এখন চীনের সঙ্গে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দেশটির পরিবর্তিত রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে৷   পক্ষান্তরে বাংলাদেশের চব্বিশের অভ্যুত্থান একটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি জনগণের একটি সংরক্ষক মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে, যাতে করে নিজ কূটনৈতিক স্বার্থে এতিহাসিক দ্বন্দ্ব ভুলে পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ককে বেগবান করতে চাইছে। (সম্প্রতি পাকিস্তানে ভিসামুক্ত সুবিধা, সরাসরি সমুদ্র ও বিমান যোগাযোগ সুবিধাসহ দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাঝে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক এমন ইঙ্গিতই বহন করে) শ্রীলঙ্কায় ধসে পড়া পলিটিক্যাল দৃশ্য বদলাতে ভারত এগিয়ে আসা সত্ত্বেও সেখানে চীন তার শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করছে৷ চীনের এই কৌশলগত ও বিনিয়োগনীতি একইভাবে প্রভাবিত করছে পাকিস্তান, নেপালসহ বাংলাদেশেও। তবে আফগানিস্তানে সৃষ্ট পরিবর্তনকে পাকিস্তান অনেকটাই অস্বস্তির চোখে দেখে। যেহেতু এশিয়ার একটি শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক প্রভাব সেখানে বিদ্যমান। সে কারণে পাকিস্তান এটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখে আসছে।   ফলে আফগানিস্তানের যেকোনো পরিবর্তন স্পষ্টতই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি আলোড়ন তোলে৷ সংগঠিত সব রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন এটাই সব সময় প্রমাণ করে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার নিমিত্তে। যুগে যুগে সংগঠিত বিপ্লবগুলো প্রমাণ করেছে, ইতিহাস পরিবর্তনের লাগামটা মূলত জনতার হাতেই থাকে। আর বিক্ষোভ বিপ্লবে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির রূপটাই বদলায় না, বরং আঞ্চলিক ও বিশ্বের বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করে নিজ রাজনীতির কৌশলকে নতুন করে সাজিয়ে নিতে। কৌতূহলে জেগেই ওঠে এসব পরিবর্তন মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন খাতে প্রভাবিত করবে? এটা তো স্পষ্ট, সব দেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার। কোনো প্রকার ন্যারেটিভ চাপানো কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার তারা মানতে নারাজ৷ উদাহরণ স্বরূপ, বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত‍্যাগসহ আরও কিছু দাবি আদায়ে উত্তাল তরুণদের নতুন শক্তির উত্থান ও ক্রমবিকাশ এর আরও একটি প্রমাণ। সুতরাং, প্রমাণিত জনগণের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ কোনো দেশের সরকারেরই নেই৷ আবার এই আন্দোলনগুলো বড় শক্তির রাষ্ট্রের ভূমিকাগুলোকে ক্রমেই জটিল করে তুলবে।   ভারত যেখানে ঐতিহ্যের প্রভাব বলয় ধরে রাখতে নিরাপদ সীমান্তের নিশ্চয়তা নিতে চাইবে নিজের আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে, সেখানে পাকিস্তান চাইবে মিত্র দেশগুলোর সাথে ইতিবাচক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে। এদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই শূন্যতায় প্রভাব বিস্তারে তৎপর থাকবে। চীন যেখানে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে মনোযোগী হবে, সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হবে এবং ইসলামি ঐক্যের সমর্থন জড়ো করতে পরিশ্রম করবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এই বহুমাত্রিক ভূরাজনীতিতে এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি এশিয়া ক্রমশ বৈশ্বিক শক্তির অদৃশ্য প্রতিযোগিতার সেন্টার পয়েন্ট হিসেবে দাঁড়াবে৷ জলবায়ুর পরিবর্তন তথা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অভিবাসনও আগামীর সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সহযোগিতা ও বিরোধের জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীসমূহের পানি বণ্টন প্রশ্নে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরির প্রবল সম্ভাবনা বিদ্যমান৷ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা আসন্ন। সাইবার নিরাপত্তা, এআইভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি, সমুদ্র নিরাপত্তা আগামী দিনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।   ভারত মহাসাগরে কৌশলগত গুরুত্বের উত্থানে বিভিন্ন দেশের সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনাও কম নয়, যা একদিকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও অন্যদিকে প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করবে৷ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সামনে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ তথা নিরাপত্তাহীনতা এমন সম্ভাবনার সম্মুখে প্রতিবন্ধক স্বরূপ৷ সব বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিবর্তিত ভূরাজনীতি ভবিষ্যতে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরির সঙ্গে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও গড়ে তুলবে৷ এই অবস্থায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য দরকার সুস্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের ওপর৷   মনে রাখা জরুরি, এই বৃহৎ অঞ্চলের জনগণ এখন কেবল দর্শক নয়, বরং তারা রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার দক্ষ সৈন্যবহর৷ তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার কায়েম করা৷ নচেৎ যেকোনো বৃহৎ পরিবর্তন ঘটানো কেবলই সময়ের ব্যাপার৷ অতএব, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ওপরও নির্ভরশীল৷ দক্ষিণ এশিয়ার আগামীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধ আজকের ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপরই গড়ে উঠবে৷ অতএব, ছক সাজাতে হবে ভেবেচিন্তে; বিরোধ নয়, বরং পারস্পরিক রাষ্ট্রের সম্মান ও সম্প্রীতির বার্তার ওপর ভর করে৷

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0