শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ শ্রেণিকক্ষ ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে ফ্রান্সে ব্যাপক বিক্ষোভে নেমেছেন শত শত হাইস্কুল শিক্ষার্থী। রাজধানী প্যারিস থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত মঁপেলিয়ে, নঁত, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সহিংসতা দমনে শুক্রবার ১,৭৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন দাঙ্গা ও শহুরে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনের মতে, দেশের ৩,৭০০টি স্কুলের মধ্যে ৭৩৫টি এই অস্থিরতার কবলে পড়েছে। এদিকে শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, মূল শিক্ষার্থীদের বাইরে থাকা বহিরাগতরা আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তুলছে। বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে এবং এতে অন্তত ৬৫ জন কর্মী আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং বেশ কিছু পেট্রোল বোমা, কুঠার ও শক্তিশালী আতশবাজি জব্দ করেছে। আন্দোলনকারীদের মতে, অতিরিক্ত স্কুলের সময়সীমা, ক্লাসরুমের প্রতিকূল পরিবেশ ও শিক্ষা বাজেট ছাঁটাইয়ের কারণেই তাদের এই ক্ষোভ। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে শুরু হওয়া এই সহিংস আন্দোলন ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ওপর জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারমন্ত্রী। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সমাবেশের অধিকারের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে দেশটির একাধিক প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়ন।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবের ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার প্রতিচ্ছবি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যন্ত, প্রতিটি পর্যায়ে দেশের জনগণ অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। দেশের আপামর জনতা গণতন্ত্র, সম্পদের সুষম বণ্টন, মৌলিক অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামের নারী, শিশুসহ সবার আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন শহিদ হন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি এনে দেয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার করে। এই দাবিগুলো পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে নির্বাচনটি অনিয়ম ও বিরোধী দল দমন দ্বারা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দুই বছর আগে যে গণতন্ত্র ও পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য এত জীবনের নস্যাৎ করা হলো। একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার আর একটি দলের কাছে পরাজিত হলো কাঙিক্ষত স্বাধীনতা। সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে তৈরি করা হয় রাষ্ট্রীয় গুণ্ডাবাহিনী, যার নাম রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনী দেশের স্বাধীনতাকামী, গণতন্ত্রকামী, মুক্তিকামী মানুষের কাউন্টার পার্ট হিসেবে অবস্থান নেয়। তিন বছরে এদের হাতে হাজার হাজার মানুষ হত্যার শিকার হয়। সে সময়ের সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল জাসদ, ভাসানী সমর্থিত দল ও নকশাল। এ প্রসঙ্গে আবু জাফর মোস্তফা সাদেক তাঁর ‘বৈপ্লবিক প্রেক্ষাপটে কমরেড সিরাজ সিকদার’ গ্রন্থে রক্ষীবাহিনী, মুজিববাদী ও আওয়ামী লীগারদের হাতে নিহত কিছু অংশের একটি ছোট তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) প্রায় ১৩৯ জন শহিদ হন।” জাসদের ইনুকে শহিদের তালিকা দিতে বললে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণশক্তি থেকে ৪৪ জনের নাম তুলে ধরতে পারেন। সে সময় সবচেয়ে জঘন্য ও আলোচিত ঘটনা ছিল কমরেড সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জাসদ নেতা মেজর এম এ জলিল ভারতের আগ্রাসন ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁকে কোনো উপাধি তো দেয়া হয়নি, বরং তাঁকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় যশোর সেনানিবাসে একটি নির্জন বাড়িতে আটকে রাখা হয়। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক ট্রাইবুনালে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য জলিলকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে বিয়োগান্তক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। যদিও পরবর্তীকালে জাতিকে আশাহত হতে হয়। ১৯৯৬ সালে নির্বাচন বাতিল ও নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করে, তবে ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের কারণে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করে। এ সময়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে সরকার ফ্যাসিবাদী নীতিতে পরিচালিত হয়েছে। একদলীয় শাসন, বিরোধী দলগুলোর প্রতি অত্যাচার, বাকস্বাধীনতাসহ সব মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, গুম, হত্যা, আয়না ঘরের কার্যক্রম, যা টর্চার সেল হিসেবে ভীতির সৃষ্টি করে। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত, শাপলা চত্বরে আলেমসমাজকে রাতের আঁধারে নৃশংস হত্যা ও লাশ গুম করে গণকবর দেয়া হয়। নির্বাচনের নামে প্রহসন, রাতের আঁধারে ভোটের রেজাল্ট, নির্বাচন ছাড়াই ২০১৩ সালে ১৫৬ জন সাংসদের বিজয়, লুট, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বিদেশে অর্থ পাচারসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সংগঠিত হয়নি। ৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ এবং রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি চালায় এবং পরবর্তী সময়ে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি দেয়া হয়, যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি নামে পরিচিত। বাংলা ব্লকেড চলাকালীন রাজধানীতে শুধু মেট্রোরেল চালু ছিল। পরবর্তী দিনগুলোতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এক বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি” হিসেবে অভিহিত করেন, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গ করে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ এবং ‘চাইতে গেলাম অধিকার; হয়ে গেলাম রাজাকার’ স্লোগান দেয়। এর পরের দিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, মন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার অভিযোগ আনেন। ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “গত রাতে বিক্ষোভ করে আমরা সোমবার ১২টার প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি।” পরবর্তী দিনগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলে। ১৭ জুলাই রাতে তারা ১৮ জুলাইয়ের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা করে। এই আন্দোলনে হাসিনা সরকার নৃশংসভাবে প্রায় ১৪০০ নিরস্ত্র ছাত্রদের হত্যা করে এবং গণহত্যার দায়ভার এড়াতে ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে সেনাবাহিনীর স্পেশাল বিমানে করে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পতিত হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দিনশেষে দেখা গেল, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে চাপের মুখে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেকে সবচেয়ে বেনিফিশিয়ারি হিসেবে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার জীবন ও শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা হারিয়ে গেল সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। দুই শত বছর ধরে বাঙালির সাম্য ও ন্যায্যতার রাষ্ট্রের সোনার হরিণ হাতের নাগালের বাইরে রয়ে গেল আজও।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিটের (NEET) প্রশ্ন ফাঁসের জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর 'আস্থা রেখে' আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ২৫ জুলাই নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে সরকারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর দলটির মুখপাত্র সৌরভ দাস এই ঘোষণা দেন। গত ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহে মর্মাহত হয়ে দেশের ঐক্যের স্বার্থে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বলে এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন। তার পদত্যাগের পর সিজেপি তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় লেখে, ‘তেলাপোকা জিতেছে, গণতন্ত্র জিতেছে।’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো সরকার বিবেচনা করবে এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে না। পাশাপাশি প্রশ্ন ফাঁসের হতাশায় যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, তাদের পরিবারকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। এ ছাড়া ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সিতে (এনটিএ) রদবদল করে সংস্থাটির ৪৭ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, প্রশ্ন ফাঁস রোধে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি টাকা জরিমানার কঠোর বিধান রেখে আগামী সপ্তাহেই সংসদে নতুন বিল তোলা হবে। মন্ত্রিসভায় এই আইনের খসড়া ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। রোববার মোমবাতি মিছিল আন্দোলন প্রত্যাহার করা হলেও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা জানাতে রোববার মোমবাতি মিছিলের ডাক দিয়েছে সিজেপি। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে বিহারের অন্তত তিনটি জেলায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ওই আন্দোলনে অংশ নেয়ায় জেজেডিপ্রধান ও লালু প্রসাদ যাদবের ছেলে তেজ প্রতাপ যাদবকে আটক করেছিল পুলিশ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।
শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে। বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি। বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’। বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।” বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।” বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি... ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।” আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব। এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?” আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।” চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।” এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম। সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে। এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর। বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।” বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম। হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।