চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রশাসনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রদবদল হয়েছে। দীর্ঘ সতেরো বছরের বিতর্কিত শাসনপর্বের অবসানের পর অনুষ্ঠিত এই জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এতে নির্বাচিত সরকার নিয়ে জনমনে যে বহুল প্রতীক্ষিত উন্নয়নের প্রত্যাশা ছিল, তা এ সরকার আসলে এখন অবধি কতটুকু পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে, তা নির্ণয় করা এখনই করা সম্ভব নয়। তবুও হাকিকত বিচারে তাদের গৃহীত কিছু পদক্ষেপ যেমন জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছে, আবার তেমনি কতগুলো প্রশ্নবিদ্ধও হয়েছে। আর গণতান্ত্রিক চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য এটিই স্বাভাবিক। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনে হাওয়া বদল আমাদের দেশের নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং একটি দল নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলি থেকে পদোন্নতি, পদায়ন, দায়িত্ব পালনের দায়ভার অর্পণ থেকে সরাসরি অবসরের ব্যবস্থা কিংবা কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন—এসবই মূলত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই ওঠে, যখন একটি বিষয় জনতার নাগরিক চেতনার সামনে আবছা কুয়াশার পর্দা ফেলে। সেটা হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশ্নটি কেবল পরিবর্তন হচ্ছে কি না, এতেই থেমে থাকে নাকি বরং এই পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তনের নীতি, পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য কী, সেটাও সমান গুরুত্ব বহন করে। সংগত কারণেই জবাব হবে—হ্যাঁ। কারণও যৌক্তিক। কেবল পরিবর্তন হলেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সাবলীল ধারায় এগুচ্ছে বলে বিবেচনা করা ভুল। তার চেয়ে এই রং বদলানোর খেলায় প্রণীত নীতিমালা এবং এর নেপথ্য কারণটাও সুস্পষ্টভাবে উঠে আসা আবশ্যক। অন্তত আজকের জনতা এমনটাই চায়। কারণ, সময়ের সঙ্গে প্রচলিত রাজনৈতিক চেতনার যে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, এটা বোধকরি বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে বাংলাদেশের প্রশাসনের একাধিক পরিবর্তনের মাঝে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো। ২৮ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁদের অবসরের এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগে থেকেই ওএসডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারার অধীনে জনস্বার্থে তাঁদের অবসর দেয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্যানুযায়ী এমনটাই জানা গেছে। এখন মনে হতেই পারে, ভাই মগের মুল্লুক নাকি কিংবা জোর যার মুল্লুক তার, এমন কিছু? আদৌতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক বদলি, পদোন্নতি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও অবসরকে আইনানুগ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, এসব গৃহীত পদক্ষেপ রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। তার পরও একটা কৌতূহল রয়েই যায়—আইনসম্মত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ন্যায়সঙ্গত হওয়া, দুটো বিষয় কি সব সময় একই সমান্তরাল গতিতে ধাবমান? এ প্রশ্ন কেবল নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা কোনো সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে তর্কের খাতিরে করছি না। করছি একজন স্বাধীন রাষ্ট্রের সাধারণ একজন নাগরিকের কৌতূহল থেকে। এটি মূলত বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার দিকে গভীরভাবে আলোকপাত করার এক মোক্ষম সুযোগ। প্রশাসন কি সরকারের, নাকি রাষ্ট্রের? এ প্রশ্নের জবাব কী? একজন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের সময় কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা হিসেবে নন, বরং তিনি আনুগত্য জ্ঞাপন করেন সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রের প্রতি। সরকারের রাজনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন করা তাঁর দায়িত্বের অংশ হলেও প্রশাসনের পেশাগত নিরপেক্ষতা রক্ষাও তাঁর অন্যতম দায়িত্ব, যা এড়ানোর সুযোগ নেই। আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণটাও বদলে যায়। এক সরকারের সময়ে যিনি প্রভাবশালী, অন্য দলের ক্ষমতার সময়ে তিনি হয়ে পড়েন অনাকাঙ্ক্ষিত। কেউ পদোন্নতি পান তো কেউ বনে যান ওএসডি, কেউ বদলি হন তো কেউ চলে যান অবসরে। দাবার পাশার কী আজব চাল! গুটির ছক পরিবর্তনে বুদ্ধির নকশাও পাল্টে যায় সুকৌশলে। তবে এই সংস্কৃতি কোনো একটি সরকারের সৃষ্টি নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী একটি প্রবণতা। সাম্প্রতিক সব ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তাই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে, তা হলো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনের আনুগত্যও কি পরিবর্তনশীল, নাকি প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি পেশাদার ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর কাঠামোতে পরিণত হবে? তা সেই জেরে ৩২ জন সাবেক ডিসির অবসর—এ ঘটনা কি কেবলই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, নাকি নতুন নজির? আসুন একটু পেছনে যাই। ২০১৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিতর্কিত অধ্যায়। সেই নির্বাচনে জেলা প্রশাসকদের অনেকেই রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০২৬ সালে তাঁদের মধ্যকার ৩২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত সেই পুরোনো নির্বাচনী অধ্যায়কে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে বলে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টারের দাবি। যুক্তি খণ্ডাতে গেলে দুটি কারণ সামনে আসবে। প্রথমত, কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনকালে গুরুতর অনিয়ম বা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে এবং তার প্রমাণ থাকলে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার রাষ্ট্র রাখে। সরকারি কর্মকর্তা পদে আসীন মানেই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন, সেটি মনে রাখা জরুরি। দ্বিতীয় যে যুক্তি, এটি আরও প্রাসঙ্গিক। শুধু কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে কি একজন কর্মকর্তাকে দায়ী করা সম্ভব? যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ—যৌক্তিক দাবি। কিন্তু যদি মূল বিবেচনা এখানে হয় যে তিনি কোন সময়ে দায়িত্বে ছিলেন, তবে একই যুক্তি অন্য সরকারের সময় অন্য কোনো কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হতে পারে। আর তখন প্রশাসনে একটি বিপজ্জনক বার্তা থেকে যায়—আজকের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গ নিরাপদ হলেও ভবিষ্যৎ কিন্তু অনিশ্চিত। আর এমন পরিবেশে পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রতিশোধের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে প্রশাসনের বাধ্যতামূলক অবসর, বদলি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ওএসডি এবং সংযুক্তির মতো পুরোনো চর্চা অব্যাহত থাকার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের মাঝে প্রতিশোধের সংস্কৃতি শেষ হবে কি না, তা নিয়েও প্রকট হয়েছে অনিশ্চয়তা (দ্য ডেইলি স্টার)। এই পর্যবেক্ষণটি মূলত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নতুন সরকার যদি পুরোনো সরকারের প্রশাসনিক রাজনৈতিকীকরণের সমালোচনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা কিন্তু স্বাভাবিকই থাকে—নতুন সরকার সেই পুরোনো চর্চার পুনরাবৃত্তি করা থেকে বিরত থাকবে। সরকার পরিবর্তনের বড় সাফল্য তখনই হবে, যখন নতুন সরকার নিজের রাজনৈতিক সুবিধার খাতিরে পুরোনো প্রশাসনিক পদ্ধতি ব্যবহারে অপারগ থাকবে। তার মানে, সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা বিরোধী দলের প্রতি সরকারের আচরণে যেমন, তেমনি প্রশাসনের প্রতিও সরকারের আচরণে। এবার আসা যাক মেধাভিত্তিক প্রশাসনের প্রয়োজনীয়তায়, যা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই মেধাভিত্তিক প্রশাসন তৈরি করতে প্রথমেই কর্মকর্তাদের মাঝে একটি বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে, তাঁদের ক্যারিয়ার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ধ্বংস হবে না। একজন কর্মকর্তা যদি ভাবেন যে আজকের সিদ্ধান্ত আগামীতে তাঁর বিরুদ্ধে সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, তাহলে তিনি কখনোই ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। ফলে প্রশাসনে নিরাপদ সিদ্ধান্তের সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা দক্ষ রাষ্ট্র তৈরির অন্তরায়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কখনো কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু কর্মকর্তারা যদি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করেন, সেখানে প্রশাসনিক কার্যকারিতা তার সক্ষমতা হারায়। সুতরাং প্রশাসনের স্বাধীনতা মানে সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের স্বাধীনতা নয়, বরং আইন ও পেশাগত নীতির মধ্য দিয়ে কাজ করার নিরাপত্তা। এখানে সরকারের দায়িত্বটা যেমন কঠিন, তেমনি তার অবস্থান ধরে রাখাও সহজ বিষয় নয়। নতুন সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন বিগত সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ সামনে আসতে পারে। কিছু কর্মকর্তা যাঁরা হয়তো সত্যিই অনিয়মে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে জনগণের মাঝে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, যা নতুন সরকারের সঙ্গে জনতার দূরত্ব তৈরি ও আস্থাহীনতার জন্ম দেবে। তাই সব কর্মকর্তাকে শুধু আগের সরকারের লোক বলে বহাল রাখা কোনো সমাধান নয়। সমাধান হলো—ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, কাজের রেকর্ডকে মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তা তদন্ত করা যেতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেয়া জরুরি। আর অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনের শাসন তো রয়েছেই। এতে করে সরকারের সিদ্ধান্ত শক্তিশালী হবে এবং প্রশাসনের ওপর জনগণ আস্থাশীল হয়ে উঠবে। তবে সত্যি এটাই, আমাদের সরকার বদলালেও প্রশাসনিক সংস্কৃতির তেমন পরিবর্তন হয় না। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইনসহ ২০২৬ সালে একাধিক নতুন আইন প্রণীত হয়েছে। একই বছরে জনপ্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাঠামো নিয়েও আইনগত পরিবর্তন হয়েছে। তবে এতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার মতো কিছু নেই। কারণ, এই আইনের বদলই যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন, যেখানে বদলি, পদোন্নয়ন ও অবসরের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট মানদণ্ড উপস্থিত থাকবে। রাজনৈতিক সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করবে প্রশাসন, কিন্তু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারলে সরকারেরও ফায়দা। কারণ, তখন সরকার তার রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন পাবে। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন রাজনীতির অক্ষের বাইরে নয়। কারণ, নির্বাচিত সরকারই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির অধীনস্থ করা এবং নির্বাচিত সরকারের নীতি বাস্তবায়ন—দুটো আলাদা বিষয়, এটি বুঝতে হবে। প্রশাসনকে সরকারি নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে সত্য, কিন্তু কর্মকর্তার পেশাগত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর দক্ষতা, সততা, কর্মদক্ষতা ও আইনের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে। এই পার্থক্য যত স্পষ্ট হবে, রাষ্ট্র ততই শক্তিশালী হবে। রাজনীতির ময়দানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজকের সিদ্ধান্তের ওপর ন্যস্ত নয়, বরং তাতে আগামীতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তার ওপর নির্ভর করে। আজকের সরকার বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে আগামীকাল অন্য সরকার তখন ওই একই যুক্তি ব্যবহার করতে পারে। তাতে করে বর্তমানের গৃহীত সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়বে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি সহজ নীতির সক্রিয় উপস্থিতি জরুরি। যে ক্ষমতা আজ আমরা ব্যবহার করছি, আগামীকাল বিরোধী অবস্থানে থেকেও সেই ক্ষমতার মুখোমুখি হতে আমরা প্রস্তুত কিংবা রাজি তো? প্রশ্নটি মনে করছি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে আমাদের আকাঙ্ক্ষাও। এই পরিবর্তন কেবল নতুন মুখ, নতুন পদ, নতুন প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়। জনগণ যা চায়, তা হলো—রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতে সত্যিই কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না? পুরোনো সরকারের ভুলের বিচার প্রয়োজন, কিন্তু সেটি করতে গিয়ে সেই প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের নতুন মানদণ্ড তৈরি করে, তাহলে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। একটি সত্যিকারের সংস্কারকামী জনমুখী সরকার যেমন প্রশাসন তৈরি করবে, সেখানে একজন কর্মকর্তা এটাও অবগত হবেন—তিনি কোনো রাজনৈতিক সরকারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নন, তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একজন পেশাদার কর্মী মাত্র। আজকের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রতিস্থাপন করে যদি মেধা, দক্ষতা, সততা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে সেটিই হবে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। কারণ, রাজা যায়, পাট বদলায়, কিন্তু রাজ্য থেকে যায়। আর সেই রাজ্য বা রাষ্ট্রের প্রশাসন যদি প্রতিবার ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রং বদলায়, তাহলে রাজনৈতিক পটের যতই পরিবর্তন ঘটুক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই পরিণত হবে না। বাংলাদেশের এখন যা প্রয়োজন, তা শুধু নতুন প্রশাসনব্যবস্থা নয়—একটি নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতি।
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, গবেষক ও সমাজসংস্কারকদের প্রস্তুত হওয়ার সুষম ক্ষেত্র। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন এবং বিগত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অগ্রণী ও ফলপ্রসূ। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, ক্যাম্পাস রাজনীতি কখনোই অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং সুশৃঙ্খল, মূল্যবোধভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো বর্তমান সময়ে আমাদের ক্যাম্পাস রাজনীতি কি নেতৃত্ব তৈরির কারখানা হিসেবে কাজ করছে, নাকি ক্রমেই সহিংসতা, দখলদারত্ব ও বিভাজনের প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে? সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ আগস্ট ২০২৬ ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর উত্তেজনা দ্রুত অন্যান্য ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে পড়ে। ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সংগঠনের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যার রেশ পাশের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ এলাকাতেও পৌঁছায়। একই দিনে ঢাকা কলেজে পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের খবরও আসে। ধারাবাহিক এসব ঘটনা প্রমাণ করে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক উত্তেজনা খুব অল্প সময়েই অন্য ক্যাম্পাসে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ছাত্ররাজনীতি জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। অতীতের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক নেতা তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেই। অর্থাৎ ছাত্ররাজনীতি একটি ‘লিডারশিপ স্কুল’ হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। বিতর্কচর্চা, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংকট মোকাবেলার মতো গুণাবলি অর্জনের প্রাণকেন্দ্র ছিল শিক্ষাঙ্গন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আদর্শভিত্তিক রাজনীতির জায়গা দখল করেছে প্রভাব বিস্তার, হল দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং প্রতিপক্ষ দমনের সংস্কৃতি। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন রাজনীতিকে গণসেবার পরিবর্তে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলে ক্যাম্পাসে মতের ভিন্নতা অনেক সময় সহিংস সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে আগ্রহী নয়; তারা নিরাপদ, সেশনজটমুক্ত এবং গবেষণাবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ চায়। একই ধরনের পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বিভিন্ন গবেষণা ও আলোচনায়। সেখানে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সহিংসতামুক্ত শিক্ষাজীবনের ওপর জোর দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। তরুণদের নাগরিক অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইউনেস্কো বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে নেতৃত্ব বিকশিত হয়, সহিংসতা নয়। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবকে সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যুবসম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ ক্যাম্পাসে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, শিক্ষাবিরতি ও অস্থিতিশীলতা তাদের সেই লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একটি সহিংস ঘটনার প্রভাব শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর নয়; পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সুনাম এবং অভিভাবকদের আস্থার ওপরও পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতার পেছনে কয়েকটি কারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, দলীয় রাজনীতির অতিরিক্ত প্রভাব। দ্বিতীয়ত, ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি। তৃতীয়ত, প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সংকট। চতুর্থত, অপরাধের যথাযথ বিচার না হওয়া। যখন কোনো সহিংস ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না, তখন অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ে। তবে সমাধান ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয়। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু সেখানে সহিংসতার পরিবর্তে বিতর্ক, নির্বাচন, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং যুক্তিনির্ভর মতবিনিময়কে উৎসাহ দেয়া হয়। অর্থাৎ সমস্যা রাজনীতিতে নয়, সমস্যা রাজনীতির নামে সহিংস ও সংস্কৃতিতে। বাংলাদেশেও প্রয়োজন শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতি। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন, স্বচ্ছ সাংগঠনিক কার্যক্রম, ক্যাম্পাসে অস্ত্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও শিক্ষাঙ্গনকে সংঘাতের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার না করে নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা যদি দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিক নেতৃত্ব, সহনশীলতা ও যুক্তিবাদী সংস্কৃতির চর্চা নিশ্চিত করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে অভিভাবক, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার দাবিকে জোরালো করা। আজকের বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ঘণ্টা গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য মূল্যবান। যদি সেই সময় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অস্থিরতায় নষ্ট হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। অতএব, ক্যাম্পাস রাজনীতি থাকবে কারণ গণতন্ত্রে মতপ্রকাশ ও সংগঠনের অধিকার মৌলিক। তবে সেই রাজনীতি হতে হবে আদর্শ, যুক্তি, সহনশীলতা ও জনকল্যাণের রাজনীতি সহিংসতা, দখলদারত্ব ও প্রতিহিংসার নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হবে নেতৃত্ব তৈরির কারখানা, সহিংসতার প্রজননক্ষেত্র নয় এই প্রত্যাশাই আজ দেশের প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাঙ্গনের চরিত্রে, আর শিক্ষাঙ্গনের চরিত্র নির্ধারণ করে সেই জাতির আগামী দিনের নেতৃত্ব।
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র যেন আবারও এক অস্থির সময়ের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত ও সাইবার প্রতিযোগিতাসহ পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন। সব মিলিয়ে পৃথিবী এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শান্তি আর যুদ্ধের মধ্যবর্তী সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি বিশ্বকে কেবল বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, নাকি মানবসভ্যতা ইতোমধ্যেই এক মহাসংকটের মধ্যে প্রবেশ করেছে? এ প্রশ্নের উত্তর আবেগ নিয়ে নয়, বাস্তবতার আলোকে খুঁজতে হবে। কারণ, বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন ঘোষণা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি সবকিছু স্বাভাবিক আছে এমন ধারণাও বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বর্তমান বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি বড় শক্তির কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়। বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রতিযোগিতা নতুন নয়। ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ফরাসি প্রভাব, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ, এখন যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা নৌবহরের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মহাকাশ, সাইবার অবকাঠামো ও তথ্যপ্রবাহের জগতে। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের কথা বললেও বাস্তবে তাদের প্রতিযোগিতার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। একটি আঞ্চলিক সংঘাতও আজ বৈশ্বিক খাদ্যবাজার, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে হাজার মাইল দূরের যুদ্ধও অন্য দেশের মানুষের রান্নাঘর, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো পারমাণবিক অস্ত্র। পৃথিবীতে এমন পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যার একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহৃত হলেও মানবসভ্যতা অকল্পনীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। যদিও পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক প্রতিরোধের নীতিকে যুদ্ধ ঠেকানোর একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরে, তবুও ভুল হিসাব, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি কখনো পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে, যুদ্ধ অনেক সময় পরিকল্পনার চেয়ে ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই শুরু হয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নতুন ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ড্রোন, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ও সাইবার সক্ষমতা যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিয়েছে। আজ একটি সফল সাইবার হামলা কোনো দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা, ব্যংকিং খাত, হাসপাতাল কিংবা যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে অচল করে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধের ময়দান আর সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও এখন শক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায়ই বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক অবস্থানও এই প্রতিযোগিতার দ্বারা প্রভাবিত হয়। তবে এই বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি আজ এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে বড় আকারের যুদ্ধ পরাশক্তিদের নিজেদের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আধুনিক শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, আর্থিক ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে পূর্ণমাত্রার সংঘাত কোনো এক দেশের নয়, সবার জন্যই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই অনেক ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলোকে সংযত থাকতে বাধ্য করে। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট সামরিক নয়; এটি আস্থার সংকট। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস যত বাড়ছে, ততই অস্ত্র প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। এক পক্ষ নিজের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, অন্য পক্ষ সেটিকে হুমকি হিসেবে দেখছে। এই নিরাপত্তা-দ্বন্দ্বই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, মহামারি, জ্বালানি রূপান্তর, পানির সংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের মতো বহু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক সময় এসব যৌথ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দেয়। ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। তাদের জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির প্রতি অঙ্গীকার। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। সবশেষে বলা যায় যে, বর্তমান বিশ্বকে কেবল বিপর্যয়ের পথে বা মহাসংকটে - এ দুইয়ের যেকোনো একটি শব্দে সীমাবদ্ধ করা যথেষ্ট নয়। বাস্তবতা হলো, বিশ্ব একটি গভীর ও বহুমাত্রিক মহাসংকটের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এ সংকট এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত, অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত বা সহযোগিতার অভাব এটিকে বড় বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে। তবে সবকিছুর পরও হতাশার কারণ নেই। ইতিহাস দেখায় যে, তীব্র প্রতিযোগিতার সময়ও কূটনীতি, সংলাপ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সমঝোতা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনোই স্থির নয়; সংঘাতের পাশাপাশি সহযোগিতাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থনীতি, জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলোর সহযোগিতা এখনো বিশ্ব স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা মানবসভ্যতার জন্য একটি বাস্তব ও গুরুতর চ্যালেঞ্জ। তবে এটি এমন নয় যে, বিশ্ব অবধারিতভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে সংলাপকে, সংঘাতের চেয়ে কূটনীতিকে এবং সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বৈশ্বিক দায়বদ্ধতাকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয় তার ওপর। ক্ষমতার রাজনীতি যদি সহযোগিতার রাজনীতিকে পুরোপুরি ছাপিয়ে যায়, তাহলে বর্তমান মহাসংকট একসময় বৈশ্বিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। আর যদি আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব দূরদর্শিতা, সংযম ও পারস্পরিক আস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এ সংকটই ভবিষ্যতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা গঠনের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।