বাঙালি জাতিকে শোষণ করার দীর্ঘ একটি ইতিহাস আছে। অতীতে বিভিন্ন সময় বাঙালি জাতি শোষিত হয়েছে বহিরাগত শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে। এখন বহিরাগত শাসক নেই, তবু শোষিত হচ্ছে। শোষিত হচ্ছে নিজেদের দ্বারাই। নিজেদের মধ্যেই এখন সৃষ্টি হয়েছে একটি শোষকগোষ্ঠী। শোষণ করছে নিজেদেরকেই। তাই বাঙালি এখন একই সাথে শোষক ও শোষিত।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এই বিভাজন তৈরি হয়েছে এবং ক্রমশ বেড়েছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে নিজেদের মধ্যে এই শোষক-শোষিত বিভাজন ছিল না। কারণ, তখন সবাই ছিল শোষিত। শোষিতদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটি ঐক্য থাকে। শোষণের অবসান ঘটলে সেই ঐক্য আর থাকে না। তখন মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী চেতনা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। বিচ্ছিন্ন মানুষ সব সময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নিজের স্বার্থে অন্যের স্বার্থ নষ্ট করে। নিজের সাথে অন্যের একটি বিভাজন সৃষ্টি করে। এভাবে সে হয় শোষক হয়ে ওঠে, নয়তো শোষিত হয়।
সাম্রাজ্যবাদী শোষণ কিংবা ঔপনিবেশিক শোষণের সাথে জাতির অভ্যন্তরীণ শ্রেণিশোষণের একটি পার্থক্য আছে। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ হলো দখলদার কর্তৃক শোষণ। অন্যের দখলে থাকলে শোষিত হতে হয়। সেই শোষণ মেনে না নিয়ে উপায় থাকে না। তখন শোষিত জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধভাবে শোষিত হয়। ঔপনিবেশিক শোষণের চিত্রও অনেকটা একই। দখলকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য দখলদাররাই উপনিবেশ তৈরি করে।
ঔপনিবেশিক শক্তি সব সময় শোষণের একটি রূপরেখা তৈরি করে নেয়। সেই রূপরেখায় শাসক ও শাসিতের মধ্যে একটি আইনগত বিষয় থাকে বটে; কিন্তু শোষণের পথও উন্মুক্ত থাকে। শাসকশক্তি উপনিবেশকে নানাভাবে শোষণ করে নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করে। ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, তখন ব্রিটিশ শাসক ভারতবর্ষে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়াও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং কিছু আচরণিক উন্নয়নের ফলে ভারতবাসীর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছিল বলে অনেকে ইংরেজ শাসকের প্রশংসা করেন।
ভারতবাসীকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ইংরেজ। আবার ভারতকে শোষণও করেছে সবচেয়ে বেশি। দেশভাগের সাথে বৃহৎ বাংলাও বিভক্ত হয়েছিল। বাংলার পূর্ব অংশ মুসলিমপ্রধান হওয়ায় পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার ঔপনিবেশিক কায়দায় শোষণ করেছে দেশের এই পূর্ব অংশটি। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এই বৈষম্য ও শোষণ এতটাই উন্মুক্ত হয়েছিল যে তার সমাপ্তি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে। বাঙালি জাতির এই ধারাবাহিক শোষণ ও সম্পদ নির্গমনের বিষয় তুলে ধরাই বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য।
পাল যুগ, সেন যুগ ও সুলতানি আমলে বাঙালি জাতির সমাজজীবনে খুব বেশি পরিবর্তন সাধিত হয়নি। সে সময় শাসকগোষ্ঠী ধর্ম, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ ভাষা ও ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা দিত বলে অন্যান্য ধর্ম, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সমৃদ্ধ হতে পারত না। এটাকে সাংস্কৃতিক শোষণ বলা যেতে পারে।
মোগল আমল থেকে অর্থনৈতিক শোষণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে থাকে। এ সময় বাংলায় স্বাধীন নবাবি আমলের সূচনা হলেও দিল্লির সম্রাটকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েই নবাবি শাসন পরিচালনা করতে হতো। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা অধিকার করে নতুন রাজস্বব্যবস্থা চালু করেন। তার আগে বারো ভূঁইয়ারা স্বাধীনভাবেই নিজ নিজ জমিদারি পরিচালনা করতেন।
বারো ভূঁইয়াদের হাত থেকে বাংলা অধিকার করে সম্রাট আকবর রাজা মানসিংহকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন (১৫৯৪)। তখন থেকে সুবা বাংলার রাজস্ব দিয়ে বাংলার উন্নয়ন হোক বা না হোক, দিল্লির দরবারে নিয়মিত রাজস্ব দিতেই হয়েছে। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলা থেকে বছরে ১০ লাখ টাকা নিতেন। সুবাদার শায়েস্তা খানের দৈনিক আয় ছিল দুই লাখ টাকা, যা তৎকালীন বিশ্বে ছিল বিরল ঘটনা। তাঁর সময় খাদ্যদ্রব্যের মূল্য কম ছিল। এই কম থাকার একটি মন্দ দিকও ছিল। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত বলে যে ইতিহাস পাওয়া যায়, সে ইতিহাসের উল্টোপিঠও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
তখন বাংলার বেশির ভাগ লোক কৃষক ছিল। ফসল বিক্রি করেই তারা অন্যান্য প্রয়োজন মেটাত। তাই শস্যের দাম কম হওয়ায় তাদের খুব একটা লাভ হয়নি। বরং কম দামে শস্য বিক্রি করে খাজনা পরিশোধ করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়েছে। মোগল সম্রাটদের মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা আর ব্যয়বহুল স্থাপত্যের পেছনে ব্যয়িত বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি বড় অংশের জোগান দিতে হয়েছে বাংলার দরিদ্র কৃষকদের।
মোগল হেরেম আর দৃষ্টিনন্দন দিল্লি শহর নির্মাণের পেছনে যে বাংলার কত হতদরিদ্র কৃষকের চোখের জলও যুক্ত আছে, সে খবর কে রেখেছে? কিছুটা পাওয়া যায় সাহিত্যে। এ বিষয়ে বহুল প্রচলিত লোকছড়াটি হলো-
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দিব কিসে। ধান ফুরালো পান ফুরালো
খাজনার উপায় কী। আর কটা দিন সবুর করো
রসুন বুনেছি।
শান্তিপ্রিয় আর অসহায় কৃষকদের কষ্টার্জিত শস্য বর্গিরা লুট করে নিলে বুলবুলি পাখি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল খোয়া গেলে, এমনকি ধান ও পান ফুরিয়ে গেলেও সামনে যে শস্য ঘরে আসছে (রসুন) সেই শস্য বিক্রি করে খাজনা দেয়ার কথা চিন্তা করতে হতো কৃষকদের। বোঝাই যায়, শতকষ্টেও বাংলার কৃষকদের খাজনা দিতে হতো শাসকগোষ্ঠীর বিলাসিতার ব্যয় মেটানোর জন্য।
সুবাদার ইসলাম খাঁ সমগ্র বাংলায় মোগল শাসন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ঢাকায় অবস্থান করতেন এবং রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। মোগল সিম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি গভীর আনুগত্য দেখিয়ে নতুন রাজধানী ঢাকার নামকরণ করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর (১৬১২)। মোগল আমলে বাংলার আরেকজন প্রভাবশালী সুবাদার ছিলেন শাহজাদা সুজা (সম্রাট শাহজাহানের পুত্র)। তিনি প্রায় ২১ বছর বাংলার শাসক ছিলেন। বাংলায় ইংরেজ বেনিয়াদের বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন তিনি। জেব্রাইল ব্রাউটন নামক এক ইংরেজ ডাক্তারের চিকিৎসায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি মাত্র তিন হাজার টাকা নজরানার বিনিময়ে সারা বাংলায় ইংরেজ বণিকদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দিয়েছিলেন। এতে বাংলার ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বাংলার সম্পদ ইংল্যান্ডের ডান্ডি, ম্যানচেস্টারে পাচার হওয়ার পথ সৃষ্টি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বাংলায় ইংরেজ বণিকদের বাণিজ্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও তারা আগের মতোই তিন হাজার টাকাই নজরানা দিয়ে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সুবাদার শায়েস্তা খান ইংরেজ বণিকদের এই বিশেষ সুবিধা বাতিল করার চেষ্টা করলে ইংরেজদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের শেষ দিকেই মোগল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। এ সময় মোগল রাজপরিবার প্রধানত বাংলার রাজস্ব দিয়েই চলত। ফলে তৎকালীন বাংলার সুবাদার মুর্শিদকুলী খানকে সম্রাট রাজস্ব ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এই স্বাধীনতার সুযোগে সুবাদার মুর্শিদকুলী খান নিজেকে নবাব হিসেবে ঘোষণা করে নবাবি আমলের সূত্রপাত করেন। কিন্তু তখনো বাংলা থেকে দিল্লির দরবারে রাজস্ব পাঠানো হতো। ‘নবাবি আমলে বাংলা থেকে দিল্লিতে (মোগল সম্রাটের দরবারে) এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা থেকে এক কোটি পঁচিশ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব নজরানাস্বরূপ পাঠানো হতো’ [ ড. এস এম হাসান, বাংলার ইতিহাস, পৃ.৩৩৭]।
মোগল সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। বাংলায় নবাব আলীবর্দী খানের শাসনামলে ইংরেজ বণিকদের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। আলীবর্দী খান মারাঠা দস্যু বা বর্গীদের দমন করার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করেন এবং সময় সময় এই অর্থ ইংরেজদের নিকট থেকেও আদায় করতেন। নবাবকে সাহায্য করার সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সিরাজউদ্দৌলার শাসনামলে পলাশীর যুদ্ধে (১৭৫৭) ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিজয়ী হয়ে শাসন ও শোষণ ক্ষমতা লাভের পথ নির্মাণ করে। বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) মীর কাসিমকে পরাজিত করে বাংলার আধিপত্য লাভ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের এক ফরমান বলে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে এবং একই সাথে বাংলায় নবাবের রাজত্ব শেষ হয় এবং কোম্পানির শাসন শুরু হয়। শুরুতেই কোম্পানি দিল্লির সম্রাটের বৃত্তি বন্ধ করে দেয় এবং বাংলার নবাবের বৃত্তি ৫৩ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে প্রথমে ৪১ লাখ এবং পরে তা ৩২ লাখ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি করে। এ সম্পর্কে রেজা খান অভিযোগ করেন যে, নবাব আলীবর্দী খানের আমলে পূর্ণিয়া জেলায় বাৎসরিক রাজস্ব যেখানে মাত্র ৪ লাখ টাকা ছিল, সেখানে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে তা বৃদ্ধি করে ২৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। অন্যান্য জেলাতেও একইভাবে রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও তা দিয়ে বাংলার উন্নয়ন হয়নি। বেশির ভাগ অর্থই চলে গেছে ইংল্যান্ডে। এর ফলেই বাংলায় দেখা দিয়েছিল ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) নামক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের বর্ণনা দিয়েছেন। কোম্পানির শাসনামলে বাংলাকে যেভাবে শোষণ করা হয়েছিল, তা শোষণের ইতিহাসের এক বড় অধ্যায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিপ্লবের মাধ্যমে এক শ বছরের কোম্পানি শাসনের অবসান হলে যে প্রকৃত ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়, সেই শাসনেও বাংলার সম্পদ নির্গমনের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। বাংলা দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান অংশে পড়ে মুসলিম প্রধান পূর্ব বাংলা। শুরু হয় শোষণের আরেক ইতিহাস। এবার শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের কবলে পড়ে বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র শুরু করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। প্রথমে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়। তারপর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বাতিঘর রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করে। মূলত সেখানেও ব্যর্থ হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক শোষণ চালায় খুব সফলভাবে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হলেও রাজধানী স্থাপন করে পশ্চিম পাকিস্তানে। রাজনৈতিক তাৎপর্যমণ্ডিত শহর লাহোরকে বাদ দিয়ে করাচিতে রাজধানী স্থাপন করা হয় এবং রাজধানী উন্নয়নের নামে ২০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইয়ুব খান ইসলামাবাদে রাজধানী স্থানান্তর করে এর উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেন ২০ কোটি টাকা। এ সময় ঢাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় মাত্র ২ কোটি টাকা। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর এবং সমস্ত অস্ত্র কারখানা স্থাপিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। সামরিক বাহিনীর চাকরিগুলো ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় একচেটিয়া। ফলে সামরিক খাতে ব্যয়িত অর্থের (বার্ষিক আয়ের ৭৫% এবং পরে ৬০%) সুবিধাভোগী ছিল সম্পূর্ণ পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ। ১৯৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু আয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৩২% বেশি। দশ বছর পরে (১৯৬৯-৭০) পার্থক্যের পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ৬১%। কেন্দ্রীয় সরকারের সব হেড অফিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে অবাধে অর্থ চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত অর্থ দিয়েই হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যয় করত ২০% (পরে ৩০% করা হয়েছিল)। পাকিস্তান সৃষ্টির ১৫ বছরের মাথায় পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেয় ৬০ কোটি টাকা। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে উদ্বৃত্ত হয় ৩৮ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সীমাহীন শোষণের ফলেই বাঙালি জাতি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ১৯৭১- এর ১৬ ডিসেম্বর অর্জন করে হাজার বছরের কাঙিক্ষত স্বাধীনতা।
একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশ কি শোষণমুক্ত হতে পেরেছে? মোগল আমলে দিল্লির অধীনস্ত হওয়ার আগে প্রায় চার শতাব্দী পর্যন্ত অধিকাংশ সময় বাংলা স্বাধীন ছিল। সে সময় বাংলার ধন-সম্পদ বাংলায়ই থাকত। ফলে মোগলপূর্ব বাংলা খুবই সমৃদ্ধ ছিল। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় এসেছিলেন ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর বর্ণনা থেকেও বাংলার সেই সমৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়। মূলত মোগল আমল থেকেই শুরু হয় শোষণের সংস্কৃতি। মোগল আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে দিল্লিতে, ইংরেজ আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে ইংল্যান্ডে আর পাকিস্তান আমলে বাংলার অর্থ চলে গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। একাত্তর-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থ কোথাও যাবে না; বাংলাদেশেই ব্যয় হবে, বাংলাদেশ হবে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা; এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ শোষণমুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের অর্থ বিদেশে পাচার হওয়াও বন্ধ হয়নি। এখন মোগল নেই, ইংরেজ নেই, পাকিস্তানি শোষকরাও নেই। তাহলে কে শোষক? শোষক নিজেদের মধ্যেই।
এখন বাঙালি নিজেদের দ্বারাই নিজেরা শোষিত। বাংলাদেশের অর্থ এখন আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয় দেশের একশ্রেণির নীতিহীন রাজনীতিক, দুর্নীতিবাজ আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দ্বারা। যে দেশপ্রেমের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তা এখন বিলুপ্তির পথে। দেশপ্রেম আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বড় দুঃখ করে বলেছিলেন, “সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।” বঙ্গবন্ধুর স্বল্পকালীন শাসনামলে ওই চোরদের দমন করা সম্ভব হয়নি। এখন ওই চোরদেরই বংশবিস্তার ঘটেছে। এরা দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে পালিয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে সামারিক-বেসামরিক অনেক আমলা টাকার কুমির হয়েছিল। তাদের পরিবার-পরিজন বিলাসী জীবন যাপন করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিষয়টিকে উপজীব্য করে কবি ও সাংবাদিক আব্দুল গণি হাজারী লিখেছিলেন ‘আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী’ নামক একটি প্রতীকী কবিতা। কবিতাটি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশেও সামরিক-বেসামরিক অনেক আমলা সীমাহীন সম্পদের মালিক হয়ে যাচ্ছে। অসাধু রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরাও সম্পদের পাহাড় গড়ছে। বিদেশেও পাচার করছে। কানাডায় বেগম পাড়া আর মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম এই বাংলাদেশের অর্থেই গড়ে উঠেছে।
প্রাচীন বাংলা ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। বাংলার কৃষকের ‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর পুকুরভরা মাছ’ ছিল - কথাটি শুধু কথার কথা নয়। ইবনে বতুতা বাংলাকে ‘দোজখপুর নিয়ামত’ বা ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ নরক বলেছিলেন। কারণ, বাংলার ধন-সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে বহিঃর্শক্তি বাংলা আক্রমণ করে ধন-সম্পদ লুট করে নিত। লুণ্ঠনের এই ধারাবাহিকতা বর্তমানেও চলছে। তবে এখন বাইরের শক্তি নয়; ভেতরের শক্তিই লুণ্ঠন করছে। তারাই সম্পদ পাচার করছে। সম্পদ পাচারের সাথে এখন যোগ হয়েছে মেধা পাচার। মেধাবীরা এখন দেশ ছেড়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। ধরে রাখার চেষ্টাও নেই খুব একটা। প্রবাসে গিয়ে প্রায় সবাই স্থায়ী হতে চায়। যারা পিছিয়ে পড়ে, তারাই ফিরে আসে। ভালো কিছু করতে পারলে স্থায়ী হয়ে যায় প্রবাসেই। এটা দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে। তবে সুশাসন ব্যতিত শুধু অবকাঠামো উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। দুর্নীতি ক্রমশ বাড়ছে। ফলে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না। শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হলে সম্পদ ও মেধা দুটোই পাচার হয়ে যাবে। যেখানে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত নয়, মানুষ সেখান থেকে মাইগ্রেট হয়ে যাবেই। তবে বাঙালির মাইগ্রেশন ঘটেছে দুইভাবে। কেউ শোষিত হয়ে দেশ ছেড়েছে। আবার কেউ শোষণ করে দেশ ছেড়েছে। যারা শোষণ করে দেশ ছেড়েছে, তারা একা যায়নি, সম্পদ নিয়ে গেছে। এখনো যাচ্ছে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
মাদ্রাসা শিক্ষা আমাদের সমাজ, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুগ যুগ ধরে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য আলেম, শিক্ষক, ইমাম, খতিব ও সমাজসেবক তৈরি হয়েছেন। তাঁরা ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারের পাশাপাশি মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছেন। দুঃখজনকভাবে সত্যি, কিছু ব্যক্তির বিতর্কিত, অনৈতিক কিংবা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ও আলেম সমাজকে নিয়ে কটূক্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধর্মীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই অনেকে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সব আলেম, সব হুজুর কিংবা পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে একই পাল্লায় মাপছেন। এটি যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি ন্যায়সংগতও নয়। একজন চিকিৎসক অপরাধ করলে আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানকে দোষী বলি না। একজন শিক্ষক অন্যায় করলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে অপরাধী বলি না। একজন ব্যবসায়ী প্রতারণা করলে সব ব্যবসায়ীকে প্রতারক বলা যায় না। তাহলে একজন মাদ্রাসাশিক্ষিত ব্যক্তি বা ধর্মীয় বক্তা অন্যায় করলে তাঁর দায় কেন হাজার হাজার নির্দোষ আলেম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে? অপরাধী যে-ই হোক, তাঁর পরিচয় যা-ই হোক—অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাঁর বিচার হওয়া উচিত। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে কিংবা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে না। একইভাবে, একজনের অপরাধের কারণে পুরো একটি শিক্ষাব্যবস্থা বা জনগোষ্ঠীকে অপমান করাও ন্যায়বিচার হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” (সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৬৪)। এই শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একজনের অন্যায়ের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তবে অভিযোগ ওঠা আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট, ভিডিও কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা অনুচিত। আবার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে দায়মুক্ত রাখাও অন্যায়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং ন্যায়সংগত বিচার। অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মান পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বিচার হোক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, গুজব, আবেগ কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। মাদ্রাসা শুধু ধর্মীয় বিধিবিধান শেখানোর জায়গা নয়। প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি, শিষ্টাচার, আত্মসংযম ও মানবিকতা গড়ে তোলা। কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা, ইসলামের ইতিহাস ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। ইসলামের প্রথম প্রত্যাদেশের সূচনাই হয়েছে জ্ঞানার্জনের আহ্বান দিয়ে, “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা আল-আলাক, আয়াত ১)। জ্ঞানচর্চা ইসলামের মৌলিক শিক্ষারই অংশ। আমাদের সমাজের অসংখ্য মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসায় শিক্ষকরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অনেক আলেম ও শিক্ষক নীরবে ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের অবদান হয়তো প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয় না, কিন্তু সমাজে তাঁদের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এসব অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া মানে অবশ্য মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সবকিছুকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়; বরং ভালো দিকগুলোকে স্বীকার করে দুর্বলতা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই দায়িত্বশীল অবস্থান। কেউ ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নিলে, প্রতারণা করলে, অর্থ আত্মসাৎ করলে, নির্যাতন চালালে কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই কথা বলতে হবে। দাড়ি, টুপি, পাগড়ি কিংবা ধর্মীয় পোশাক কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেয় না। আবার এসব পোশাক পরার কারণে কাউকে সন্দেহভাজন বা অপরাধী ভাবারও কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। মানুষকে পোশাক বা পরিচয় দিয়ে নয়, তার কাজ, আচরণ ও চরিত্র দিয়ে বিচার করা উচিত। ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে অপরাধীকে আড়াল করা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। সত্যিকারের ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার কোথাও সমস্যা থাকলে তা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত। শিক্ষার মান, আধুনিক পাঠ্যক্রম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো বিষয় নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা আর সব মাদ্রাসাকে খারাপ বলা এক বিষয় নয়। কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে ‘সব হুজুর ভণ্ড’ কিংবা ‘সব মাদ্রাসা খারাপ’—এমন মন্তব্য অযৌক্তিক সাধারণীকরণ। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে লাখো মানুষের চরিত্র নির্ধারণ করা যুক্তিবাদী সমাজের পরিচয় হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করার আগে আমাদের ভাবা উচিত, সেই বক্তব্যের কারণে কতজন নির্দোষ মানুষও অপমানিত হতে পারেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে সত্যনিষ্ঠা, দায়িত্বশীল ভাষা এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাও জরুরি। সমালোচনা হোক নির্দিষ্ট কাজ ও সমস্যার, কোনো পুরো শ্রেণিকে হেয় করার জন্য নয়। মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে কথা বলার অর্থ মাদ্রাসার সবকিছুকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করা নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মানুষ সততা, ন্যায়বিচার ও আদর্শের উচ্চতর মান প্রত্যাশা করে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও বেশি। কোথাও অনিয়ম, নির্যাতন, আর্থিক অস্বচ্ছতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে রক্ষা না করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায় সত্য গোপন করা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও দক্ষ হয়ে উঠবে। প্রয়োজনীয় সংস্কারকে ঐতিহ্যের বিরোধিতা হিসেবে না দেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। সমাজে ভালো-মন্দ মানুষ সব পেশা ও শ্রেণিতেই রয়েছে। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—কোনো শ্রেণিই এর ব্যতিক্রম নয়। তাই একজন মানুষের ভুল বা অপরাধ দিয়ে পুরো শ্রেণিকে বিচার করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। একটি গাছে একটি পচা ফল পাওয়া গেলে ফলটি সরিয়ে ফেলতে হয়; তার জন্য পুরো বাগানকে ধ্বংস করা কোনো সমাধান নয়। একইভাবে, কিছু ব্যক্তির অপরাধের কারণে শত শত বছরের ধর্মীয় শিক্ষার ঐতিহ্য, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং লাখো নির্দোষ শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে অপমান করা উচিত নয়। বরং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় এনে সৎ মানুষদের কাজের পরিবেশ ও সম্মান রক্ষা করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। ভণ্ডামির প্রতিবাদ অবশ্যই হোক। ধর্মের নামে প্রতারণার বিরুদ্ধে সমাজ সোচ্চার হোক। অপরাধী হুজুর হোক, শিক্ষক হোক কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের মানুষ—তাঁর বিচার হোক অপরাধের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের নামে মাদ্রাসা শিক্ষা, ইসলামি মূল্যবোধ কিংবা পুরো আলেম সমাজকে কটূক্তি করা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মানের কথা বলে অন্যায়কে আড়াল করাও সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের প্রয়োজন অন্ধ সমর্থন নয়, অন্ধ বিরোধিতাও নয়; প্রয়োজন ন্যায়সংগত, যুক্তিনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হই, কিন্তু নির্দোষের প্রতি ন্যায়বান থাকি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, কিন্তু সামষ্টিক অপমান নয়। ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করি, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করি। কারণ একটি সুস্থ সমাজ বিদ্বেষ ও সামষ্টিক অপমানের ওপর গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে জ্ঞান, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আত্মসমালোচনা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
একটি কল্যাণমুখী ও উন্নত সমাজ গঠনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ রক্ষা এবং সামাজিক মানবাধিকার নিশ্চিতকরণে অলাভজনক সংস্থা (Non-Profit Organizations) ও ট্রাস্টগুলো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে যেকোনো সামাজিক, দাতব্য বা কল্যাণমূলক উদ্যোগকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে এর আইনি ভিত্তি মজবুত করা আবশ্যক। বাংলাদেশে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গঠনের একাধিক আইনি পথ রয়েছে। উদ্যোক্তা ও উদ্যমী সমাজসেবীদের জন্য এই আইনি প্রক্রিয়া, নিবন্ধন পদ্ধতি এবং পরবর্তী কমপ্লায়েন্স সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে মূলত তিনটি ভিন্ন আইনি কাঠামোর অধীনে অলাভজনক ও সামাজিক সংস্থা গঠন ও পরিচালনা করা হয়ে থাকে। যেমন : ১. যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (RJSC) অধীনে নিবন্ধিত সোসাইটি ও ফাউন্ডেশন : বাংলাদেশে সমাজসেবামূলক ও অলাভজনক সংস্থা গঠনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও আধুনিক মাধ্যম হলো Societies Registration Act, 1860-এর অধীনে নিবন্ধন নেওয়া। গঠন প্রক্রিয়া : ন্যূনতম ৭ জন সাধারণ সদস্য একত্র হয়ে স্মারক (Memorandum of Association) ও নিয়মাবলি (Rules & Regulations) চূড়ান্ত করে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (RJSC) আবেদন করতে পারেন। গতিশীলতা ও সুবিধা : প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, গঠনতন্ত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত থাকলে খুব স্বল্প সময়ে (সঠিকভাবে প্রসেস করলে মাত্র ৫ কর্মদিবসের মধ্যে) এর প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করা সম্ভব। এই নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একটি পৃথক আইনি সত্তা (Legal Entity) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা নিজস্ব নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন, ব্যাংকিং লেনদেন পরিচালনা এবং দেশি-বিদেশি অনুদান গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। ২. রেজিস্ট্রি অফিসের অধীনে নিবন্ধিত ট্রাস্ট (Trust) : কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তি, তহবিল বা অর্থকে স্থায়ীভাবে সামাজিক বা দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে চান, তবে ট্রাস্ট গঠন করা সবচেয়ে উত্তম উপায়। গঠন প্রক্রিয়া : Trust Act, 1882-এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট ট্রাস্ট ডিড (Trust Deed) তৈরি করতে হয়। এই ডিডে ট্রাস্টের লক্ষ্য, মূলধন পরিচালনা, ট্রাস্টি বোর্ডের ক্ষমতা ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। নিবন্ধন : ড্রাফটকৃত ট্রাস্ট ডিডটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে স্থানীয় রেজিস্ট্রেশন আইনের অধীনে নিবন্ধিত করতে হয়। স্থায়ী মেমোরিয়াল ফান্ড, শিক্ষাবৃত্তি বা হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রাস্ট ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। ৩. কোম্পানি আইনের অধীনে অলাভজনক স্মারক (Section 28 Entity) : কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী মুনাফাহীন উদ্দেশ্যে কোম্পানি গঠন করা যায়, যা সাধারণত ‘Section 28 Company’ বা প্রসঙ্গানুসারে লিমিটেড ফাউন্ডেশন নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডাররা কোনো লভ্যাংশ (Dividend) গ্রহণ করতে পারেন না; অর্জিত সমুদয় অর্থ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে পুনর্বিনিয়োগ করতে হয়। যেকোনো ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রারম্ভিকভাবে নিম্নলিখিত নথি ও তথ্যসমূহ প্রস্তুত রাখা আবশ্যক : ১. নাম ছাড়পত্র (Name Clearance) : নির্ধারিত নাম অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে যায় কি না তা যাচাই করে ছাড়পত্র গ্রহণ। ২. গঠনতন্ত্র ও স্মারক : প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্যে, পরিচালনা পর্ষদের গঠন, সাধারণ সভার নিয়মাবলি ও তহবিল ব্যবস্থাপনার স্পষ্ট ধারা সংবলিত আইনি দলিল। ৩. পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও NID/পাসপোর্ট : প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পর্ষদের সকল সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি। ৪. কার্যালয়ের ঠিকানা : প্রতিষ্ঠানের অফিস বা নিবন্ধিত ঠিকানা নিশ্চিতকরণে ভাড়ার চুক্তিপত্র বা ইউটিলিটি বিলের কপি। অনেক উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটি ভুল ধারণা দেখা যায়—প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর মওকুফ হয়ে যায়। বিষয়টি আসলে তা নয়। ট্যাক্স এক্সিম্পশন সনদ : আয়কর আইন অনুযায়ী কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্টকে করমুক্ত সুবিধা পেতে হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) নির্দিষ্ট ধারার অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়কর অব্যাহতি সনদ (Tax Exemption Certificate) লাভ করতে হয়। বার্ষিক ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন : রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পর প্রতিটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য কর শনাক্তকরণ নম্বর (TIN) গ্রহণ এবং প্রতিবছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক আয়ের হিসাব পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (CA) ফার্ম দিয়ে অডিট করানো এবং কমপ্লায়েন্স বজায় রাখা আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ। একটি সমাজসেবামূলক বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে এর প্রাথমিক আইনি দস্তাবেজ বা গঠনতন্ত্র কতটা নিখুঁতভাবে প্রণীত হয়েছে তার ওপর। অস্পষ্ট গঠনতন্ত্র বা ত্রুটিপূর্ণ স্মারকের কারণে পরবর্তী সময়ে পরিচালনাসংক্রান্ত জটিলতা, এনবিআর (NBR) বা অন্যান্য সরকারি দপ্তরের সাথে প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। একজন অভিজ্ঞ কর আইনজীবী ও কোম্পানি আইন উপদেষ্টার সরাসরি পরামর্শ ও সহায়তা গ্রহণ করলে যেমন সময় বাঁচে, তেমনি প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামোর প্রতিটি দিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকিমুক্ত থাকে। প্রফেশনাল লিগ্যাল গাইডলাইনের মাধ্যমে যেকোনো জটিলতা এড়িয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফাউন্ডেশন, সোসাইটি বা ট্রাস্ট রেজিস্ট্রেশনের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণমুখী ভাবনার সঠিক বাস্তবায়নে আইনি নিবন্ধন হলো প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সঠিক নিয়মে গঠিত ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আসুন, আইনি বিধিবিধান মেনে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুসংগঠিত অলাভজনক ক্ষেত্র গড়ে তুলি।
স্ট্যাটাস কনজামশন বা মর্জাদাভিত্তিক ভোগ কী, তা জানার আগে আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা করে নিই। এখন থেকে বেশ কিছু বছর আগেও আমরা আমাদের ঘরে তিন বেলা খাবারের বাইরে যে খাবার খেতাম, তার অধিকাংশই ছিল বাড়িতে তৈরি পিঠা, মুড়ি, মোয়া, চিড়া, চটপটি এসব। এরপর হাতে এলো পেটিস, ডেনিস, শিঙাড়া, সমুচা, মোগলাই, চকবার, হালিম, ফুচকা, ফালুদা। তারপর এল স্যান্ডউইচ, বার্গার, পিৎজা পেরিয়ে আমরা এখন খাচ্ছি দোসা, বিফ সিজলিং, রেশমি কাবাব, জালি কাবাব, স্যুপ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, অন্থন। খাবারের এই যে আধুনিকায়ন হলো, এই যে বিভিন্ন ভিনদেশি খাবার আমাদের বিশেষ খাবারের তালিকায় উঠে এল, তা কীভাবে হলো? আমার দৃষ্টিতে যে কারণগুলো পড়েছে— ১. আমাদের দেশ থেকে বিত্তবানেরা বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে শুধু হাওয়া নয়, খাওয়ার রুচিরও বদল করে আসেন। ২. রেমিট্যান্স যোদ্ধা যাঁরা প্রবাসে যান, তাঁদের একটি বড় অংশ সেখানকার হোটেল বা রেস্টুরেন্টে কাজ করেন এবং দেশে এসে বিদেশি খাবারগুলোকে দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। ৩. মোগল আমল থেকেই ভোজনরসিকদের চাহিদা বিবেচনায় বাইরের দেশ থেকে পাচক বা রাঁধুনি আমদানি করা হয়। আমাদের দেশে আগত বিদেশিদের খাদ্য সরবরাহের জন্য ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতেও দেশি-বিদেশি রাঁধুনি রাখা হয়। এই যে বিশেষজ্ঞ রাঁধুনি, তাঁদের অস্থায়ী সহকারী যাঁরা থাকেন, তাঁরা চাকরিচ্যুত হলে সাবলম্বী হতেও বিভিন্ন স্থানে নিজ উদ্যোগে বিদেশি খাবারের হোটেল বা রেস্টুরেন্ট শুরু করেন। মূল কথা, এই বিদেশি খাবারগুলো বিভিন্নভাবে বিত্তবানের হাত ধরেই দেশে ঢুকেছে। তারপর বিত্তবানদের হাত থেকে ক্যাসিং ঠিক রেখে ফরেন নাম নিয়ে নিম্নমানের খাবার হয়ে পথেপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। কেন পথেপ্রান্তে? কেন নিম্নমান? নতুন উদ্যোক্তারা অল্প মূলধন নিয়ে বিদেশি খাবারের প্রকৃত মান রেখে খাদ্য উৎপাদন করলেও তারা বিত্তবানদের রুচি মোতাবেক স্থান ম্যানেজ করতে পারে না। আবার স্থান পাওয়া গেলেও ওই পরিমাণে বিত্তবান বা রিচম্যান পাওয়া যায় না। কাজেই টার্গেট যখন রিচফুড বিক্রি করা, তখন রিচম্যান খুঁজে বের করে সেই মোতাবেক রেস্টুরেন্ট স্থাপন করতে হবে। এই রিচফুড প্রোডাকশনের সাথে জড়িত উদ্যোক্তারা রিচফুড বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রচারে নেমে যখন ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা করে, তখন তারাই সমাজের একটি অংশকে রিচ হিসেবে সামনে তুলে নিয়ে আসে। সমাজের এই অংশ রিচ হতে বাধ্য হয়। কীভাবে বাধ্য হয়? গলির মাথায় কফিশপ ও ফাস্টফুডের ভ্যান এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ রিচ ফুড প্রায় গরিবের হাতের নাগালে পৌঁছে গেল। তখন গরিব তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে রিচ হতে চেষ্টা করছে। মূল কথা, বিত্তবানদের বিদেশি রিচ ফুডের ক্যাসিং ঠিক রেখে মানে কমিয়ে এনে গরিবের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে ভ্রাম্যমাণ ফাস্টফুডের দোকান। প্রথম প্রথম সকলে শখে খেতে থাকলেও পরে তা ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ধনী-গরিব সবাই এখন সপ্তাহে একটা দিন ফাস্টফুড না খেলে কেমন যেন জীবনে জোশ আসে না। অর্থাৎ এই ফাস্টফুড খাওয়াটা একটা স্ট্যাটাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিত্তবানরা ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে যাচ্ছেন, মধ্যবিত্তরা শহরের রেস্টুরেন্ট বা ধাবায় গিয়ে বসছেন, গরিবেরা ফাস্টফুড ভ্যান বা গলির মুখের কফিশপে বা হকার্স মার্কেটের ভাবির ভ্যাবাচ্যাকা বা চিকনি-চামেলি বার্গার হাটে গিয়ে বসছেন। মানুষ ফাস্টফুড খাওয়াটাকে একটি সামাজিক মর্যাদার অবস্থায় নিয়ে গেছে। যখন একদিকে মানুষের তিন বেলা খাবারের অভাব থেকে গেছে ঠিক, সেই সময়েই আরেক পাশে এসব ফাস্টফুডের ধাবায় ক্রেতাদের লম্বা সিরিয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে সেল্ফি তুলে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে। সমাজে নিজের মর্যাদা শো (উপস্থাপন) করছে। এই যে নিজের সোশ্যাল স্ট্যাটাস বা সামাজিক মর্যাদা দেখাতে মাঝে মাঝেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন শ্রেণির ফাস্টফুড বা রিচফুড ভোগ করে, এটাই মূলত স্ট্যাটাস কনজামশন। অর্থাৎ নিজ সামর্থ বা সচ্ছলতা প্রকাশে সোশ্যাল স্ট্যাটাস বা সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় বা প্রদর্শনের লক্ষ্যে আমরা যে বিশেষ বিষয়াদি ভোগ করি, সেটাকেই মূলত স্ট্যাটাস কনজামশন বলে। ফাস্টফুড হচ্ছে স্ট্যাটাস কনজামশনের নিম্নতর উদাহরণ। এরপর আছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ, আপডেটেড আইফোন ব্যবহার, রয়্যাল এনফিল্ড বাইক, রোলেক্স ঘড়ি, জেন্টেল পার্ক, রিচম্যান, ইনফিনিটি, ক্যাটস আই ব্র্যান্ডের পোশাক—এ রকম নানাবিধ দামি ব্র্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখা অথবা প্রদর্শন। উপর্যুক্ত জীবনাচার আলোচনায় বোঝা যায় যে, স্ট্যাটাস কনজামশন বা মর্যাদাভিত্তিক ভোগ তখনই হয়, যখন মানুষ কেবল কোনো পণ্যের কার্যকারিতা বা প্রয়োজনীয়তার জন্য তা কেনে না, বরং সমাজে নিজের সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং অবস্থান প্রদর্শন করার জন্য পণ্য ভোগ বা ক্রয় করে। এখন বিষয় হলো, ফাস্টফুড পর্যন্ত স্ট্যাটাস কনজামশনে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষও বিভিন্নভাবে অংশ নিতে পারছে, পোশাকের ক্ষেত্রেও রেপলিকা (কপি) ব্যবহার করে অংশ নিতে পারছে। আইফোন, মোটরবাইক, ল্যাপটপের রেপলিকা (কপি) নেই, নিম্নমান নেই। এই জায়গাতে এসে মানুষে মানুষে বিভেদ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশীর, আত্মীয়ের সাথে আত্মীয়ের, বন্ধুর সাথে বন্ধুর সামাজিক মর্যাদায় ব্যবধান ফুটে উঠছে। যাঁরা বয়স্ক বা বুঝদার, তাঁরা নিজেদের সামলে নিচ্ছেন, ধনীদের অভিশাপ দিয়ে, সকল সচ্ছল মানুষের অর্থকে অবৈধ ও হারাম বিবেচনা করে নিজেদের সামলে নিচ্ছেন। বিপত্তিটি বাধছে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীদের মধ্যে। তারা নিজের অবিভাবকের আর্থিক অবস্থা না বুঝেই বন্ধুর অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজামশনে আকৃষ্ট হচ্ছে; চাহিদাতত্ত্ব অনুযায়ী যা তার চাহিদা হওয়ার কথা নয়, যা তার অভাব হওয়ার কথা নয়, সেই চাহিদা পূরণে তার অবিভাবক ব্যর্থ হচ্ছেন এবং সেই অভাবে তারা কাতর হয়ে নানাবিধ নেতিবাচক কাহিনিতে জড়িয়ে যাচ্ছে; হতাশ হয়ে বন্ধুর অতিরঞ্জিত ব্যয়বহুল জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে, অথবা তার বিলাসদ্রব্য ছিনিয়ে নিতে বন্ধুকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া পরশ্রিকাতরতায় ভুগে নানান অনৈতিক, অসামাজিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যেমন : সন্তান অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে, বন্ধু বন্ধুকে হত্যা করছে, চুরি-ছিনতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে, হতাশায় ভুগে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি বা মনোবল হারাচ্ছে। আমাদের এই উন্নয়নশীল দেশে সবার জীবনে একসাথে উন্নয়ন হয় না। একটি পরিবার থেকে একজনের উন্নয়ন হয়, একটি বংশ থেকে একজনের উন্নয়ন হয়, একটি গ্রাম থেকে একজনের উন্নয়ন হয়। এই একজন একই সাথে পরিবার, বংশ, গ্রামের জন্য যেমন উন্নয়নের উদাহরণ, গর্বের বস্তু, তেমনি তার অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজামশনের কারণে সে সর্বত্র ঈর্ষার পাত্রেও পরিণত হয়। তার প্রতি নজর পড়ে, অধিক দুষ্টদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। একদল যখন এই উদাহরণকে আদর্শ মেনে এগিয়ে যেতে সাহস পায়, তেমনি অন্য একটি দল পরশ্রীকাতরতায় ভুগে তাকে আক্রমণ করে পিছিয়ে দিতে চায়। এটাই চরম সত্য। স্ট্যাটাস কনজামশন থাকবেই। এটা নতুন কিছু নয়, তবে নিজেদের আর্থিক অবস্থা, নিজের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আপনজনের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে তার প্রকাশ হওয়া উচিত। আমার-আপনার স্ট্যাটাস কনজামশন যেন অন্যকে আহত না করে। অন্যের পরশ্রীকাতর স্বভাবকে উস্কে না দেয়। আমাদেরই সচেতন হতে হবে। যার জীবন তার উপার্জিত অর্থে চলছে, আমারটা আমার অর্থে চালাতে হবে। কাজেই অন্যের সোশ্যাল স্ট্যাটাসের সাথে মিল রাখতে গিয়ে যেন অনটনে পড়তে না হয়। এক বেলা ভালো খেয়ে বাকি দুই বেলা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে না হয়। এক জীবনে অনেক ভোগ করার সুযোগ থাকলেও সব ভোগ করা যায় না। এক জীবনে যেটুকু নিজে জোগাড় করতে পারব তাই আমার। অন্যেরটা দেখে অভাববোধ হলেই তা অভাব নয়, সেটা পরশ্রীকাতরতা, যা জীবনের সুখ নষ্টের মূল উপকরণ। আসুন আমরা সচেতন হই, আমরা যেমন পরশ্রীকাতরতায় ভুগব না, তেমনি আমাদের অতিরঞ্জিত মর্যাদাভিত্তিক ভোগ-বিলাসিতা দেখিয়ে অন্যের পরশ্রীকাতর স্বভাবকে উস্কে দেব না, আমরা অন্যের রোষের বা ঈর্ষার শিকার হব না।