Breaking news
উপসম্পাদকীয়

শিক্ষায় ব্যয় : রাষ্ট্রের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ

ড. মো. বিল্লাল হোসেন
ড. মো. বিল্লাল হোসেন উপাধ্যক্ষ কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ • 0

একটি সেতু নির্মাণ করলে তার ওপর দিয়ে মানুষ ও পণ্য চলাচল করে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে শিল্পকারখানা ও ঘরবাড়ি আলোকিত হয়, একটি মহাসড়ক নির্মাণ করলে অর্থনীতির গতি বাড়ে। কিন্তু একটি ভালো বিদ্যালয় নির্মাণ করলে তার সুফল কোথায় গিয়ে শেষ হয়—তার হিসাব করা কঠিন। কারণ, একটি বিদ্যালয় মানুষ তৈরি করে আর মানুষই শেষ পর্যন্ত সেতু নির্মাণ করে, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে, শিল্প গড়ে, প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তাই শিক্ষাব্যয় আসলে মানবসম্পদে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগ, দারিদ্র্য হ্রাসে বিনিয়োগ, নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, সামাজিক বৈষম্য নিরসনে বিনিয়োগ, রাষ্ট্রের করভিত্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। ইউনেস্কো শিক্ষা অর্থায়নকে সরাসরি একটি  রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

 

শিক্ষায় কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শিক্ষায় আজ যে টাকা বিনিয়োগ করছি, তার ওপর নির্ভর করে আগামীতে আমরা কেমন মানুষ, কেমন অর্থনীতি এবং কেমন রাষ্ট্র পেতে যাচ্ছি? একজন শিশু মানসম্মত শিক্ষা পেলে তার জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ে, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ে। কর্মসংস্থান বাড়লে আয় বাড়ে। আয় বাড়লে ভোগ ও সঞ্চয় বাড়ে। আয় বাড়লে করের আওতাও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষিত মানুষ স্বাস্থ্য, পরিবার, নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে অধিক সক্ষম হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের OECD Education at a Glance প্রতিবেদনে দেখা যায়, OECD দেশগুলোতে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে উচ্চতর আয় ও ভালো কর্মসংস্থানের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং শিক্ষার প্রকৃত রিটার্ন শুধু পরীক্ষার ফল নয়—একজন মানুষের সারাজীবনের উৎপাদনশীলতা।

 

একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের মেধা ও দক্ষতার সীমা নেই।

সিঙ্গাপুরের মতো দেশ দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতি দক্ষ মানবসম্পদের শক্তি দিয়ে অনেকটাই অতিক্রম করা সম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়া দেখিয়েছে, যুদ্ধোত্তর দারিদ্র্য থেকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণের পথে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি দেখিয়েছে, শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সংযোগ কীভাবে দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি করতে পারে। আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু তেল, গ্যাস, কয়লা বা খনিজ নয়– জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং মানুষের সক্ষমতা এগুলোও মূল্যবান সম্পদ। একটি মেধাবী শিক্ষার্থীকে যথাযথ শিক্ষা দেওয়া মানে কেবল একজন শিক্ষার্থীকে সফল করা নয়, ভবিষ্যতের একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক, কৃষিবিদ, প্রযুক্তিবিদ কিংবা দক্ষ কারিগর তৈরির সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করা।

 

শিক্ষা মানুষের কর্মসংস্থানের সক্ষমতা বাড়ায়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে—শিক্ষা হতে হবে মানসম্মত ও কর্মজগতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু সনদ বাড়লে হবে না, দক্ষতা বাড়াতে হবে। একজন দক্ষ কর্মী একই সময়ে ভালোভাবে, দ্রুত এবং কম অপচয়ে কাজ করতে পারে। একজন কৃষক যদি আধুনিক কৃষিপদ্ধতি বুঝতে পারেন, একজন উদ্যোক্তা যদি হিসাব ও বাজার বিশ্লেষণ জানেন, একজন শ্রমিক যদি আধুনিক যন্ত্র পরিচালনা করতে পারেন, একজন শিক্ষক যদি কার্যকরভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন—তাহলে শিক্ষা সরাসরি উৎপাদনশীলতায় রূপ নেয়। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি হলো শিক্ষা। একজন দরিদ্র পরিবারের শিশু যদি মানসম্মত শিক্ষা পায়, তার সামনে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এভাবেই শিক্ষা একটি প্রজন্মের দারিদ্র্যকে পরবর্তী প্রজন্মে বহন করার বদলে সামাজিক গতিশীলতার সিঁড়ি তৈরি করতে পারে। ইউনেস্কো বলছে, ১৯৮০ সাল থেকে শিক্ষা বৈশ্বিক চরম দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

 

একজন মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে শুধু একজন নারীকে শিক্ষিত করা নয় বরং একটি পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করা। শিক্ষিত নারীর কর্মসংস্থান–আয়, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সন্তানদের শিক্ষা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পারে। একজন শিক্ষিত মা শিশুর পুষ্টি, টিকা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সম্ভাবনা রাখেন। একজন শিক্ষিত নাগরিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুল তথ্য যাচাই করার সক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে বেশি অর্জন করতে পারেন। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য-সচেতন নাগরিক তৈরির জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ করাও প্রয়োজন।

 

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শুধু শ্রমশক্তি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জ্ঞানশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, বায়োটেকনোলজি, ডেটা সায়েন্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—এসব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে হলে স্কুল পর্যায় থেকেই গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। আজ যে শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে একটি বৈজ্ঞানিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করছে, আগামীকাল সে হয়তো নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবক হবে। কিন্তু এই সম্ভাবনা তখনই বাস্তব হয়, যখন দরিদ্র, গ্রামীণ, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায়। শিক্ষা মানুষকে শুধু পেশাজীবী করে না, আদর্শ  নাগরিকও তৈরি করে।যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ, ভিন্নমতকে সম্মান করা, তথ্য যাচাই করা, আইন ও অধিকার সম্পর্কে জানা, দায়িত্বশীল আচরণ করা—এসব গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক দক্ষতা।

 

শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু বাজেট বাড়ানো নয়। অকার্যকর প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান না বাড়ে, তাহলে সেটি প্রকৃত বিনিয়োগ নয়। শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি হতে হবে ফলাফলভিত্তিক। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন, মূল্যায়নে সংস্কার, কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারে। শিক্ষা নিয়ে একজন তরুণ যেন কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন, একজন উদ্যোক্তা যেন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন, একজন গবেষক যেন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারেন। আজ একটি শিশুর গণিতের ভিত্তি শক্তিশালী করার অর্থ হয়তো আগামীকাল একজন প্রকৌশলী তৈরি করা। আজ একজন শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ দেয়ার অর্থ হয়তো ২০ বছর পরে একটি উদ্ভাবন।  শিক্ষার বিনিয়োগের ফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাওয়া যায়।

 

যে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ কিনতে চায়, তাকে শিক্ষায় বিনিয়োগ করতেই হবে। আজকের শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিশুরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, প্রশাসক, শ্রমিক, শিল্পী ও নীতিনির্ধারক। তাদের জ্ঞান যত শক্তিশালী হবে, রাষ্ট্র তত শক্তিশালী হবে। তাদের দক্ষতা যত উন্নত হবে, অর্থনীতি তত উৎপাদনশীল হবে। তাদের সৃজনশীলতা যত বিকশিত হবে, দেশ তত উদ্ভাবনী হবে। তাই শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা প্রতিটি টাকা  আগামী দিনের আয়, উৎপাদন, উদ্ভাবন, সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির বীজ। সেতু ভেঙে গেলে আবার সেতু বানানো যায়। কারখানা বন্ধ হলে আবার কারখানা চালু করা যায়। কিন্তু একটি প্রজন্মের শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করা অনেক কঠিন। তাই এখনই সময় শিক্ষাকে ‘ব্যয়ের খাত’ থেকে ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিনিয়োগ’ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করার। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মাটির নিচে নয়, তার মানুষের মেধার ভেতরে। আর সেই মেধাকে সম্পদে রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো শিক্ষা।

 

 

ড. মো. বিল্লাল হোসেন

উপাধ্যক্ষ

মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

গঙ্গার নৌকায় আমার ভবিষ্যৎ

শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে।   বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল।   গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।   বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’।   বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।”   বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল।   তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।”   বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি...   ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।”   আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম।   হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব।   এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?”   আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।”   চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।”   এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো।   হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন।   দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম।   সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।   আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে।   এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়।   এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর।   বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।”   বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম।   হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।  

২৪-এর সাতকাহন

শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়।   কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ।   চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা।   এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।  

উপসম্পাদকীয়

View more
পে-স্কেল : বেতন বাড়লেই কি মানুষ ধনী হয়ে যায়

নতুন পে-স্কেলের খবরটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চোখে পড়ছে। কেউ খুশি হয়েছেন, কেউ স্বস্তি পেয়েছেন, আবার কেউ বেশ কটাক্ষ করেই বলছেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের তো বেতন এমনিতেই ভালো, তার ওপর আবার এত বাড়ানো হলো কেন?’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কথাও দেখা যাচ্ছে, ‘সরকারি চাকরি করলেই তো জীবন সেট!’ এসব কথা পড়তে পড়তে আমার মনে একটি প্রশ্নই বারবার এসেছে, বেতন বাড়লেই কি একজন মানুষ ধনী হয়ে যায়?   আমার মনে হয়, বিষয়টিকে এত সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন জাতীয় পে-স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রেড ভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে এই সংখ্যাগুলো দেখেই প্রত্যেক সরকারি চাকরিজীবীর হাতে রাতারাতি দ্বিগুণ বা তারও বেশি টাকা চলে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে; পূর্ণ বেতন বৃদ্ধি ২০২৭ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।   তার পরও সংবাদমাধ্যমে যখন বড় করে লেখা হয়—‘বেতন বাড়ল ১০০ শতাংশ’, ‘১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি’—তখন সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টি একটু অন্যভাবেই ধরা দিতে পারে। মনে হতে পারে, সরকারি চাকরিজীবীরা বুঝি এক লাফে অনেক বেশি ধনী হয়ে গেলেন। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, একজন সরকারি চাকরিজীবীর সংসারে বাজার খরচ কত? বাড়িভাড়া কত? সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত—সব মিলিয়ে মাস শেষে তাঁর হাতে কতটুকুই-বা থাকে?   অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো উচিত নয়। বরং দীর্ঘ সময় পর একটি নতুন বেতনকাঠামো এসেছে। ২০১৫ সালের পর নতুন পে-স্কেল কার্যকর হচ্ছে, আর এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। নতুন কাঠামো তৈরির সময় সরকারও মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা ও সরকারি আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনার কথা জানিয়েছে। তাহলে আপত্তিটা কোথায়?   আমার মনে হয়, আপত্তির জায়গাটা সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ায় নয়; বরং একই সময়ে অন্যদের আয় কতটা বাড়ছে—সেই প্রশ্নে। একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লে তাঁর সংসারের আয় বাড়ে। কিন্তু একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন কি একইভাবে বাড়ে? একজন দোকানের কর্মচারী, রিকশাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা নিম্নআয়ের পরিবারের আয় কি প্রতিবছর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে? সব সময় তো নয়।   জুলাই ২০২৬ সালে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—দুই ধরনের ব্যয়ের ক্ষেত্রেই মানুষের ওপর চাপ ছিল। অর্থাৎ একজনের আয় যদি বাড়ে, কিন্তু অন্যজনের আয় একই জায়গায় পড়ে থাকে এবং বাজারের খরচ বাড়তেই থাকে, তাহলে সেই মানুষের মনে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক—‘আমার জন্য কী?’ এই প্রশ্নকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।   আবার সরকারি চাকরিজীবীদেরও এক কথায় ‘ধনী’ বলে দেয়া ঠিক নয়। সরকারি চাকরিতে থাকা মানেই সবার আয় এক নয়। একজন নিম্নগ্রেডের কর্মচারী এবং একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জীবনযাত্রার পার্থক্য যেমন আছে, তেমনি তাঁদের আর্থিক দায়িত্বেরও পার্থক্য আছে। তাই ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, সবাই ধনী হয়ে যাচ্ছে’—এমন সাধারণীকরণ যেমন ঠিক নয়, তেমনি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেই দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন ভাবাও ঠিক নয়। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় বৈষম্যের অনুভূতিটা।   যখন একজন মানুষ দেখেন, তাঁর নিজের আয় বছরের পর বছর খুব বেশি বাড়ছে না, অথচ একই সময়ে অন্য একটি শ্রেণির আয় কাঠামোগতভাবে বাড়ছে, তখন তাঁর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। সেই ক্ষোভ থেকেই হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ আসে। কিন্তু সেই কটাক্ষের ভাষাও আমাদের ভেবে দেখা দরকার। কারণ, একজন সরকারি কর্মচারীও এই সমাজেরই মানুষ। তিনিও বাজারে গিয়ে একই দামে চাল-ডাল কেনেন, বাড়িভাড়া দেন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যয় দেন। তাঁর বেতন বাড়ার খবর দেখে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রূপ করার আগে আমাদের মনে রাখা উচিত—বেতন বৃদ্ধি কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ নয়। তবে এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বড় হয়ে যায়।   যদি সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সংশোধন করা হয়, তাহলে একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কীভাবে বাড়ানো যায়, সে প্রশ্নও সামনে আসা প্রয়োজন। শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লেই তো একটি দেশের মানুষের জীবনমান বাড়ে না। বরং আমাদের এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দরকার, যেখানে একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর ন্যায্য বেতন পাবেন, আবার একজন বেসরকারি চাকরিজীবীও ন্যায্য মজুরি পাওয়ার সুযোগ পাবেন; একজন শ্রমিকের আয়ও যেন দ্রব্যমূল্যের কাছে প্রতিনিয়ত হেরে না যায়। আর সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও আমার একটি ছোট প্রশ্ন আছে।   আমরা কি শুধু শতাংশের হিসাব দেখাব, নাকি সেই শতাংশের পেছনের বাস্তবতাটাও মানুষের সামনে তুলে ধরব? ‘১০০ শতাংশ বৃদ্ধি’ কিংবা ‘১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি’—শিরোনাম হিসেবে আকর্ষণীয়। কিন্তু একজন পাঠক যদি শুধু এই সংখ্যাটিই দেখেন, তাহলে তিনি হয়তো ভাববেন, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর বেতন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অথচ বাস্তবে নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রেড ১–৯-এ বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং গ্রেড ১০–২০-এ ৫০ শতাংশ কার্যকর হচ্ছে; ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে হার আরও বাড়বে এবং পূর্ণ বৃদ্ধি জুলাই ২০২৭ থেকে কার্যকর হবে। অন্যান্য সংশোধিত ভাতার পূর্ণ বাস্তবায়ন ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে। তাই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও সংখ্যার পাশাপাশি ব্যাখ্যাটা জরুরি।   আমার কাছে নতুন পে-স্কেল আসলে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার গল্প নয়। এটি আমাদের সামনে আরেকটি বড় প্রশ্নও রেখে যায়, এ দেশের প্রত্যেক মানুষের আয় কি তার জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে?   সরকারি চাকরিজীবীরা তাঁদের প্রাপ্য বেতন পাবেন, এটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি দেশের অন্য শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান নিয়েও রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। কারও বেতন বাড়লে তাকে হিংসে করার প্রয়োজন নেই। আবার কারও আয় বাড়েনি বলে তার কষ্টকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।   শেষ পর্যন্ত পে-স্কেলের সাফল্য শুধু এই হিসাব দিয়ে মাপা উচিত নয় যে বেতন কত শতাংশ বেড়েছে। বরং বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন মানুষের মাসের শেষে আগের চেয়ে একটু বেশি স্বস্তি এসেছে কি না। কারণ, কাগজে বেতন বাড়া একটি সংখ্যা। কিন্তু মানুষের জীবনে স্বস্তি আসা—সেটিই তার আসল অর্থ।

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0

সৌরবিদ্যুতেই মিলবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান

মানবিক মূল্যবোধের সংকটে আমাদের সমাজ

সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্য : ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের তিন অমীমাংসিত প্রশ্ন

শিক্ষায় ব্যয় : রাষ্ট্রের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ

একটি সেতু নির্মাণ করলে তার ওপর দিয়ে মানুষ ও পণ্য চলাচল করে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে শিল্পকারখানা ও ঘরবাড়ি আলোকিত হয়, একটি মহাসড়ক নির্মাণ করলে অর্থনীতির গতি বাড়ে। কিন্তু একটি ভালো বিদ্যালয় নির্মাণ করলে তার সুফল কোথায় গিয়ে শেষ হয়—তার হিসাব করা কঠিন। কারণ, একটি বিদ্যালয় মানুষ তৈরি করে আর মানুষই শেষ পর্যন্ত সেতু নির্মাণ করে, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে, শিল্প গড়ে, প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তাই শিক্ষাব্যয় আসলে মানবসম্পদে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগ, দারিদ্র্য হ্রাসে বিনিয়োগ, নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, সামাজিক বৈষম্য নিরসনে বিনিয়োগ, রাষ্ট্রের করভিত্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। ইউনেস্কো শিক্ষা অর্থায়নকে সরাসরি একটি  রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।   শিক্ষায় কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শিক্ষায় আজ যে টাকা বিনিয়োগ করছি, তার ওপর নির্ভর করে আগামীতে আমরা কেমন মানুষ, কেমন অর্থনীতি এবং কেমন রাষ্ট্র পেতে যাচ্ছি? একজন শিশু মানসম্মত শিক্ষা পেলে তার জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ে, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ে। কর্মসংস্থান বাড়লে আয় বাড়ে। আয় বাড়লে ভোগ ও সঞ্চয় বাড়ে। আয় বাড়লে করের আওতাও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষিত মানুষ স্বাস্থ্য, পরিবার, নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে অধিক সক্ষম হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের OECD Education at a Glance প্রতিবেদনে দেখা যায়, OECD দেশগুলোতে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে উচ্চতর আয় ও ভালো কর্মসংস্থানের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং শিক্ষার প্রকৃত রিটার্ন শুধু পরীক্ষার ফল নয়—একজন মানুষের সারাজীবনের উৎপাদনশীলতা।   একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের মেধা ও দক্ষতার সীমা নেই। সিঙ্গাপুরের মতো দেশ দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতি দক্ষ মানবসম্পদের শক্তি দিয়ে অনেকটাই অতিক্রম করা সম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়া দেখিয়েছে, যুদ্ধোত্তর দারিদ্র্য থেকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণের পথে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি দেখিয়েছে, শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সংযোগ কীভাবে দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি করতে পারে। আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু তেল, গ্যাস, কয়লা বা খনিজ নয়– জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং মানুষের সক্ষমতা এগুলোও মূল্যবান সম্পদ। একটি মেধাবী শিক্ষার্থীকে যথাযথ শিক্ষা দেওয়া মানে কেবল একজন শিক্ষার্থীকে সফল করা নয়, ভবিষ্যতের একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক, কৃষিবিদ, প্রযুক্তিবিদ কিংবা দক্ষ কারিগর তৈরির সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করা।   শিক্ষা মানুষের কর্মসংস্থানের সক্ষমতা বাড়ায়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে—শিক্ষা হতে হবে মানসম্মত ও কর্মজগতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু সনদ বাড়লে হবে না, দক্ষতা বাড়াতে হবে। একজন দক্ষ কর্মী একই সময়ে ভালোভাবে, দ্রুত এবং কম অপচয়ে কাজ করতে পারে। একজন কৃষক যদি আধুনিক কৃষিপদ্ধতি বুঝতে পারেন, একজন উদ্যোক্তা যদি হিসাব ও বাজার বিশ্লেষণ জানেন, একজন শ্রমিক যদি আধুনিক যন্ত্র পরিচালনা করতে পারেন, একজন শিক্ষক যদি কার্যকরভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন—তাহলে শিক্ষা সরাসরি উৎপাদনশীলতায় রূপ নেয়। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি হলো শিক্ষা। একজন দরিদ্র পরিবারের শিশু যদি মানসম্মত শিক্ষা পায়, তার সামনে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এভাবেই শিক্ষা একটি প্রজন্মের দারিদ্র্যকে পরবর্তী প্রজন্মে বহন করার বদলে সামাজিক গতিশীলতার সিঁড়ি তৈরি করতে পারে। ইউনেস্কো বলছে, ১৯৮০ সাল থেকে শিক্ষা বৈশ্বিক চরম দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।   একজন মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে শুধু একজন নারীকে শিক্ষিত করা নয় বরং একটি পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করা। শিক্ষিত নারীর কর্মসংস্থান–আয়, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সন্তানদের শিক্ষা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পারে। একজন শিক্ষিত মা শিশুর পুষ্টি, টিকা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সম্ভাবনা রাখেন। একজন শিক্ষিত নাগরিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুল তথ্য যাচাই করার সক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে বেশি অর্জন করতে পারেন। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য-সচেতন নাগরিক তৈরির জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ করাও প্রয়োজন।   চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শুধু শ্রমশক্তি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জ্ঞানশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, বায়োটেকনোলজি, ডেটা সায়েন্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—এসব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে হলে স্কুল পর্যায় থেকেই গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। আজ যে শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে একটি বৈজ্ঞানিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করছে, আগামীকাল সে হয়তো নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবক হবে। কিন্তু এই সম্ভাবনা তখনই বাস্তব হয়, যখন দরিদ্র, গ্রামীণ, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায়। শিক্ষা মানুষকে শুধু পেশাজীবী করে না, আদর্শ  নাগরিকও তৈরি করে।যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ, ভিন্নমতকে সম্মান করা, তথ্য যাচাই করা, আইন ও অধিকার সম্পর্কে জানা, দায়িত্বশীল আচরণ করা—এসব গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক দক্ষতা।   শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু বাজেট বাড়ানো নয়। অকার্যকর প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান না বাড়ে, তাহলে সেটি প্রকৃত বিনিয়োগ নয়। শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি হতে হবে ফলাফলভিত্তিক। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন, মূল্যায়নে সংস্কার, কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারে। শিক্ষা নিয়ে একজন তরুণ যেন কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন, একজন উদ্যোক্তা যেন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন, একজন গবেষক যেন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারেন। আজ একটি শিশুর গণিতের ভিত্তি শক্তিশালী করার অর্থ হয়তো আগামীকাল একজন প্রকৌশলী তৈরি করা। আজ একজন শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ দেয়ার অর্থ হয়তো ২০ বছর পরে একটি উদ্ভাবন।  শিক্ষার বিনিয়োগের ফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাওয়া যায়।   যে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ কিনতে চায়, তাকে শিক্ষায় বিনিয়োগ করতেই হবে। আজকের শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিশুরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, প্রশাসক, শ্রমিক, শিল্পী ও নীতিনির্ধারক। তাদের জ্ঞান যত শক্তিশালী হবে, রাষ্ট্র তত শক্তিশালী হবে। তাদের দক্ষতা যত উন্নত হবে, অর্থনীতি তত উৎপাদনশীল হবে। তাদের সৃজনশীলতা যত বিকশিত হবে, দেশ তত উদ্ভাবনী হবে। তাই শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা প্রতিটি টাকা  আগামী দিনের আয়, উৎপাদন, উদ্ভাবন, সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির বীজ। সেতু ভেঙে গেলে আবার সেতু বানানো যায়। কারখানা বন্ধ হলে আবার কারখানা চালু করা যায়। কিন্তু একটি প্রজন্মের শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করা অনেক কঠিন। তাই এখনই সময় শিক্ষাকে ‘ব্যয়ের খাত’ থেকে ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিনিয়োগ’ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করার। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মাটির নিচে নয়, তার মানুষের মেধার ভেতরে। আর সেই মেধাকে সম্পদে রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো শিক্ষা।     ড. মো. বিল্লাল হোসেন উপাধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ  

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ 0

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিপ্লবের ইতিহাস দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার এক প্রতিচ্ছবি

ঢাকার জলাশয় : ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং অগ্নিনির্বাপণ সংকট মোকাবেলা

হরমুজ প্রণালি : গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা

কিশোর অপরাধের দায় : আইন নাকি সামাজিক পচন

সমাজে অপরাধ বা অনিয়ম বাড়লেই আমাদের প্রথম দাবি ওঠে কঠোরতর আইনের। কিন্তু আইন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা মাত্র, প্রতিরোধের উৎস নয়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার নিশ্চিত করাই আইনের কাজ; সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রতিরোধ তার দায়িত্ব নয়। কিশোর অপরাধের এই পুনরাবৃত্তির শেকড় এক দিনে তৈরি হয়নি, এমনকি আইনের অপর্যাপ্ততার কারণেও নয় বরং সমাজের অভ্যন্তরীণ পচনে।   বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনসংখ্যার বিশাল অংশ তরুণ-কিশোর, অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে জনমিতিক লভ্যাংশ। এই শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু আমাদের কিশোর সমাজ আজ খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সাইবার বুলিং ও গ্যাং কালচারের ভয়ংকর পথে হাঁটছে। যে প্রজন্মের কাঁধে আগামীর রাষ্ট্র, তারা ধ্বংসের অতলে তলিয়ে গেলে জাতি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।   তাহলে খোঁজ করি কিশোর অপরাধের শেকড়গুলো : পরিবার হচ্ছে প্রথম পাঠশালা ও প্রথম ব্যর্থতা : শিশুর প্রথম পাঠশালা বিদ্যালয় নয়, পরিবার। সেখানে মূল্যবোধ শিখতে ব্যর্থ হলে সে দ্রুতই বিপথে যায়। স্নেহ অমূল্য কিন্তু অন্ধ স্নেহ বিষাক্ত। অতীতের যৌথ পরিবারে শাসন ও স্নেহের ভারসাম্য ছিল। আজকের একক পরিবারে ব্যস্ত মা-বাবা সময়ের ঘাটতি মেটান গ্যাজেট দিয়ে, যা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘গিল্ট প্যারেন্টিং’। এর পরিণতি মারাত্মক। সন্তান কখনো ‘না’ শব্দটির মুখোমুখি হতে শেখে না, শেখে না প্রত্যাখ্যান বা ব্যর্থতা সহ্য করতে। জীবনের ছোটখাটো প্রতিকূলতাতেই তারা ভেঙে পড়ে বা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি জটিল হয় যখন শিক্ষক ক্লাসরুমে শাসন করলে মা-বাবা উল্টো শিক্ষককেই অপমান করেন, অথচ একসময় ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ সমাজে কদরের সাথে পালিত হতো। পরিবারের এই ভুল আশকারাই সন্তানের মনে অহংকার, সহনশীলতাহীনতা ও বেপরোয়া মানসিকতার প্রথম বীজ রোপণ করে। মানবিক প্রজন্ম গড়তে পরিবারকেই শাসন-স্নেহের চিরন্তন সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনতে হবে।   পরিচয় সংকট, সম্মান-স্বীকৃতি এবং মিডিয়ার গ্ল্যামারের নেতিবাচক প্রভাব : বয়ঃসন্ধিকাল হলো আত্মপরিচয় খোঁজার সময়, যখন কিশোর প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সম্মান-স্বীকৃতি চায়। ইতিবাচক উপায়ে তা না পেলে তারা দ্রুতই নেতিবাচক পথ বেছে নেয়। গুরুজনদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধার জায়গায় আজ একধরনের কৃত্রিম ঔদ্ধত্য দেখা যায়; নিয়ম অমান্যকে অনেক কিশোর বীরত্বের প্রতীক মনে করে। এই অবক্ষয়ে ঘি ঢালছে আধুনিক মিডিয়া-সিনেমা-ওয়েব সিরিজে অপরাধীকে নায়কের আসনে বসানো হচ্ছে, অপরাধ জগৎকে দেখানো হচ্ছে গ্ল্যামারাস জীবন হিসেবে। টিকটক-রিলসে সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে কিশোররা মেতে উঠছে উগ্রতা ও পেশিশক্তির বিকৃত প্রদর্শনীতে। লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের কৃত্রিম ডোপামিন তাদের আরও বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন কাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পথ থেকে ফেরাতে দরকার পারিবারিক সুসম্পর্ক, সঠিক নির্দেশনা ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা।   কংক্রিটের খাঁচা ও আপেক্ষিক বঞ্চনা : অপরিকল্পিত নগরায়ণের জাঁতাকলে পিষে গেছে খেলার মাঠ ও প্রাণবন্ত শৈশব। পরিবেশগত মনস্তত্ত্বের ধারণা অনুযায়ী, এই ‘কংক্রিটের খাঁচা’ কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশকে অবরুদ্ধ করে। সুস্থ শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ না পেয়ে তাদের উদ্বৃত্ত শক্তি রূপ নিচ্ছে আচরণগত উগ্রতায় বা স্ক্রিনের অন্ধকারে। নতুন মাত্রা যোগ করেছে সোশ্যাল মিডিয়া সৃষ্ট ‘আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ’। লিওন ফেস্টিঞ্জারের ‘সোশ্যাল কম্প্যারিজন থিওরি’ অনুযায়ী মানুষ নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করে; ভার্চুয়াল জগতে অন্যের ঝলমলে জীবন দেখে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত কিশোররা হীনম্মন্যতায় ভোগে। রবার্ট কে মার্টনের ‘স্ট্রেইন থিওরি’ ব্যাখ্যা করে, সমাজ যখন বস্তুগত সফলতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে কিন্তু বৈধ সুযোগ রুদ্ধ থাকে, তখন তীব্র ‘স্ট্রেইন’ তৈরি হয়, আর এই চাপ থেকেই কিশোররা শর্টকাট বা অপরাধের দিকে ধাবিত হয়।   জুয়া, মাদক ও ক্ষমতার মোহ : তিনটি শক্তি আজ কিশোর সমাজকে গ্রাস করছে, অনলাইন জুয়া, সিন্থেটিক মাদক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহ। মোবাইল ব্যাংকিং-ক্রিপ্টোর সহজলভ্যতায় অনলাইন জুয়া এখন কিশোরদের হাতের মুঠোয়; জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে ঋণ মেটাতে তারা চুরি-ছিনতাই, এমনকি খুনেও জড়িয়ে পড়ছে। ইয়াবা-আইসের মতো মাদক তাদের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নিচ্ছে, টাকার জন্য জন্মদাতাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করছে না। এই অন্ধকার জগৎকে সুরক্ষা দিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ‘বড় ভাই’ কালচার। এডউইন সাদারল্যান্ডের ‘ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন থিওরি’ অনুযায়ী অপরাধ জন্মগত নয়, ভুল সঙ্গ-পরিবেশ থেকে শেখা। এই বড় ভাইয়েরা কিশোরদের পেশিশক্তির হাতিয়ার বানায়, আর আইনি ছত্রচ্ছায়ায় তারা নিজেদের ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ ভাবতে শুরু করে গড়ে ওঠে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য।   ভোক্তা প্রজন্ম, উদ্ভাবক নয় : প্রযুক্তি আজ কিশোরদের হাতের মুঠোয়, কিন্তু ব্যবহার সীমাবদ্ধ সস্তা বিনোদনে। শর্ট ভিডিওর অ্যালগরিদম যে অস্বাভাবিক ডোপামিন নিসৃত করে, তা তৈরি করছে ‘পপকর্ন ব্রেইন’, দীর্ঘ মনোযোগের ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বের শিশুরা প্রযুক্তি দিয়ে প্রোগ্রামিং-রোবট-গেম তৈরি শেখে, অথচ আমাদের কিশোররা কেবল নিষ্ক্রিয় ভোক্তা। এর মূল দায় আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার, যা প্রযুক্তি ব্যবহারে কোনো সৃজনশীল দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি।   রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং অপরাধের নেপথ্যে ক্ষমতার ছায়া : রাজনৈতিক নেতৃত্বই দেশের মূল্যবোধ ও নীতি পরিচালনা করে; সেই নেতৃত্ব বিপথগামী হলে জাতির নৈতিক পতন অনিবার্য। কিশোর গ্যাং সৃষ্টি ও গ্ল্যামারাইজেশনের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংশ্লিষ্টতা প্রায় সব আলোচনায় উন্মোচিত। একে বলা হয় ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রাজনীতি’, যেখানে স্থানীয় নেতারা কায়েমি স্বার্থে বেপরোয়া কিশোরদের লাঠিয়াল বানায়। কথিত ‘'বড় ভাই’রা প্রথমে অপরাধে উৎসাহিত করে, পরে ক্ষমতার প্রভাবে আইনি হাত থেকে উদ্ধার করে ‘ত্রাণকর্তা’ বনে যায়, কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দাস বানিয়ে দখলদারি-চাঁদাবাজির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এই ছত্রচ্ছায়া না ভাঙা পর্যন্ত হাজারও আইনেও কিশোর গ্যাং কালচার রোধ সম্ভব নয়।   এসব সমস্যা থেকে আমাদের পথ খুঁজতে হবে। খণ্ডিত নয়, চাই সামগ্রিক সংস্কার, যেখানে পরিবার, সমাজ, রাজনীতিবিদ ও আইন সমানে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোর অপরাধ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; পরিবার, সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যর্থতার ফসল। মুক্তি পেতে চাই সমন্বিত পদক্ষেপ : ১. ‘গিল্ট প্যারেন্টিং’ থেকে সচেতন অভিভাবকত্বে : গ্যাজেট-নির্ভরতা বন্ধ করে সন্তানকে মানসম্পন্ন সময় দিতে হবে, অন্ধ স্নেহের বদলে অনুশাসনের সীমারেখা টানতে হবে, ‘না’ শোনা ও ব্যর্থতা মেনে নেয়ার শক্তি জোগাতে হবে। ২. ‘কংক্রিটের খাঁচা’ ভাঙা : নগর পরিকল্পনায় খেলার মাঠ, পার্ক, পাঠাগার বাধ্যতামূলক করতে হবে; পাঠ্যক্রমে ‘মিডিয়া লিটারেসি’ যুক্ত করে আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ থেকে মুক্ত করতে হবে। ৩. ‘ধ্বংসের ত্রিভুজ’ ভাঙা : অনলাইন জুয়ার লেনদেন কঠোরভাবে ব্লক করতে হবে, সিন্থেটিক মাদকের জোগান শূন্যে নামাতে হবে, এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ‘বড় ভাই’ ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ৪. শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর : ‘ভোক্তা’ থেকে ‘স্রষ্টা’ : জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক পাঠ্যক্রম থেকে বেরিয়ে জাপানের মতো চরিত্র গঠন ও ফিনল্যান্ডের মতো আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; মাধ্যমিক পর্যায়ে আইটি ল্যাব, কোডিং, রোবোটিক্স চালু করতে হবে। দেং শিয়াওপিং কারিগরি শিক্ষার সুবাদে দুর্ভিক্ষপীড়িত চীনকে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছেন, তা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। ৫. বিচার কাঠামোর আধুনিকায়ন ও ‘রেস্টোরেটিভ জাস্টিস’ : ২০১৩ সালের শিশু আইন কার্যকর করে প্রতিটি জেলায় ‘শিশু আদালত’ চালু করতে হবে; কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশন কর্মকর্তা, সাইকোলজিস্ট ও সমাজকর্মী নিয়োগ করে প্রকৃত পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।   আইন-বিচার রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার হাতিয়ার, কিন্তু সমাজের ভিত মজবুত না হলে কোনো আইনই কার্যকর হয় না। আজকের কিশোররাই আগামীর বাংলাদেশ। এই জনমিতিক লভ্যাংশ জুয়া-মাদক-অবক্ষয়ে হারিয়ে গেলে জাতি হবে মেরুদণ্ডহীন। তাই দোষারোপ নয, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে চাই আমূল পরিবর্তন। অন্ধ স্নেহের লাগাম টেনে সন্তানকে মূল্যবোধ আর কারিগরি জ্ঞানে গড়ে তুলতে পারলেই এই বিপুল কিশোর শক্তি হয়ে উঠবে জাতির অমূল্য সম্পদ।

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ 0

বদলে যাওয়া সময়ে তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধের সংকট ও উত্তরণ

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং কৃষিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব ও করণীয়

ছবি : সংগহীত

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড : আমাদের কিশোরসমাজের গভীর সংকটের আয়না

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

পে-স্কেল : বেতন বাড়লেই কি মানুষ ধনী হয়ে যায়

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0