Breaking news
ফিচার

ফিচার

বিয়ের পরের দিন ‘বৌভাত’ নামটি কীভাবে হলো

শফিউর রহমান
শফিউর রহমান লেখক, কার্টুনিস্ট ও রম্য কলামিস্ট, রাজশাহী
জুলাই ২৬, ২০২৬ • 0
বাংলার চিরাচরিত বৌভাতের চিত্র
বাংলার চিরাচরিত বৌভাতের চিত্র

আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক অবিনশ্বর প্রথা হলো ‘বৌভাত’। নামটার মধ্যে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ আছে — একদিকে ‘বৌ’, অন্যদিকে ‘ভাত’। কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, এই নামটির আসল ব্যুৎপত্তি বা ঐতিহাসিক পটভূমি কী? কেন বিয়ের ঠিক পরের দিনটিকে কাবাবের হাড্ডি বা হানিমুনের বদলে পাতে ভাতের হাঁড়ি টেনে নেয়ার দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হলো?


গবেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ, ‘বিয়ে হলো তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা, আর বৌভাত হলো তার ব্যবহারিক ল্যাবরেটরি, যেখানে তত্ত্বের মারপ্যাঁচ চুকেবুকে কেবল উদরপূর্তির হিসাব মেলানো হয়।’


কথিত আছে, বিয়ের দিন বরপক্ষের লোকজন কনের হাজারো গুণ দেখার সুযোগ পায় না। তাই পরের দিন আস্ত একটা জাতিকে নিমন্ত্রণ করে ঘরে এনে বসিয়ে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য একটাই, বৌয়ের হাতের প্রথম রান্না খেয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বেহুঁশ হয় নাকি হাসপাতালে দৌড়ায়, তার নিখাদ লাইভ টেলিকাস্ট দেখা।
 

বৌভাত শব্দটির গভীর মূলে তাকালে দেখা যায়, এটি আসলে ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপক। এতদিন যোগ্য শাশুড়ি রান্নাঘর সামলাতেন, আজ থেকে তিনি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’। আর নতুন বৌয়ের ঘাড়ে পুরো তিন শ কুড়ি পদের ডেকচির দায়িত্ব সঁপে দিয়ে শান্তিতে নিশ্বাস ফেলার নামই বৌভাত।

এই বিশেষ দিনে বরযাত্রী কিংবা আমন্ত্রিত অতিথিরা খাবারের টেবিলে বসে মাংসের পিস গোনার যে মহৎ কর্মটি করেন, তা অন্য কোনো সামাজিক উৎসবে দেখা যায় না। ‘মাংসের সাইজ একটু ছোট হলো কেন?’ কিংবা ‘বোরহানিটা একটু পাতলা হয়েছে’—এসব অমূল্য রত্নগর্ভা মন্তব্য ছাড়া বৌভাতের আসর জমেই না।
 

বরপক্ষের পকেট ফাঁকা করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হিসেবেও অনেক সমাজবিজ্ঞানী একে চিহ্নিত করেছেন। একে তো কবরেজ খানা, তার ওপর আবার আস্ত একটা ভাতের পাহাড় — সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অর্থনৈতিক বিনোদন।


সংক্ষেপে বলতে গেলে, জীবনের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার অর্থাৎ বিবাহ নামক মহাতিথির পরের দিনই যে কেন ‘বৌভাত’ নাম দেয়া হলো, তার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এই উদরসর্বস্ব বাঙালি সংস্কৃতির চিরন্তন সত্যে।

 

0 Comments

Popular post
ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

নগরীর দেবী

ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। ​তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে ​তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।     

গঙ্গার নৌকায় আমার ভবিষ্যৎ

শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে।   বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল।   গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।   বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’।   বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।”   বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল।   তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।”   বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি...   ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।”   আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম।   হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব।   এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?”   আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।”   চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।”   এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো।   হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন।   দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম।   সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।   আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে।   এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়।   এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর।   বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।”   বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম।   হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।  

ফিচার

View more
‘সুখের মতো অসুখ’-এর দিনগুলিতে রবীন্দ্রনাথ

আর্জেন্টিনা অনেক দূরের দেশ। রবীন্দ্রনাথের কাছে তখন অচেনা পৃথিবী। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন প্লাজা হোটেলে। সেখান থেকে একদিন স্বপ্নের মতো তাঁকে চলে যেতে হলো সান ইসিদ্রোতে। বিচিত্র লাল-নীল ফুলের উৎসবে সজ্জিত সুন্দর বাড়ি, মিরালরিও ভিলা। বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নদী দেখা যায়, রুপালি নদী, নদীর নাম রিও ডেলা প্লাটা।   রবীন্দ্রনাথ ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে বসে নদী দেখেন। নদী তো নয় যেন এক নারীর রহস্য-প্রতিকৃতি। কে সেই নারী, কোত্থেকে আবির্ভূত হলো সেই নিরুপমা বিদেশিনী, যাঁর সংস্পর্শে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত আবেগে ভেসে যাচ্ছেন, অশ্রুতে হাসিতে হয়ে পড়ছেন চঞ্চল উন্মনা। অসুস্থতার মধ্যেও যেন সুখের মতো অসুখে জর্জরিত হয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরতে চাইছেন, কিন্তু ফেরা হচ্ছে না। অদ্ভুত এক পিছুটান তাঁকে আটকে ধরেছে। কী সেই পিছুটান?   লা হিয়া কোন্ডা দেলসুর, যার অর্থ দক্ষিণের মোনালিসা। সবাই তাঁকে চেনে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নামে।   পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের বসন্ত ঋতু তখন মিশে যাচ্ছিল গ্রীষ্মের সাথে, প্রকৃতির এমনই নাটকীয় পরিবর্তনের কালে রবীন্দ্রনাথের সাথে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ভাবের আদান-প্রদান হয়, নৈঃশব্দ্যের ভেতর সঞ্চারিত হয় নতুন শব্দমালা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়ার ভাষা বুঝতেন না, তাহলে তাঁদের ভাববিনিময়ের মাধ্যম কী ছিল? সুখের মতো অসুখের দিনগুলিতে রবীন্দ্রনাথ কী ভাবতেন, কী লিখতেন, আর তিনি কীভাবেই-বা পৌঁছালেন এমন এক রহস্যময় অজানা ভাষার দেশে!   রবীন্দ্রনাথের জীবনের এমন রহস্যময় কালপর্বের ভারী পর্দা উন্মোচিত হয়েছে গত ১২ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে। রবীন্দ্রনাথ আর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অলৌকিক অপূর্ব সুন্দর সাক্ষাতের অসাধারণ বিন্যাস, ম্যাড থেটারের নাটক ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’। নাটকটি গবেষণাধর্মী প্রযোজনা হওয়ায় শুধু সাধারণ দর্শক নয়, ছাত্র, শিক্ষক গবেষকসহ কবি-সাহিত্যিকদেরও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া।   নাটকটি রচনা, নির্দেশনা ও পরিকল্পনা করেছেন ম্যাড থেটারের প্রধান পরিচালক আসাদুল ইসলাম। নাটকটির চরিত্র সংখ্যা দুটি। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রে অভিনয় করেছেন আসাদুল ইসলাম এবং ভিক্টোরিয়া চরিত্রে সোনিয়া হাসান।   রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর শতাব্দীপ্রাচীন প্রেমকে নাটকের মধ্য দিয়ে স্মরণে ম্যাড থেটার বিরল ব্যতিক্রম। নতুন উদ্বোধন ঘটেছে ম্যাড থেটারের সাড়া জাগানো নাটক ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’-এর মধ্য দিয়ে। গত ১২ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনেটে হয়েছে নাটকটির ত্রয়োদশ প্রদর্শনী।    

অক্টোবর ২১, ২০২৬ 0

শিক্ষা এবং আমাদের দায়বদ্ধতা

বাইপোলার ডিসঅর্ডার : মনের যত্নে খাবারও কি গুরুত্বপূর্ণ

এআই ভিডিওর মোহে মিডিয়া

বিদ্যার্জন ও শিক্ষা

বিদ্যার্জন ও শিক্ষালাভ মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাণিজগতের মধ্যে মানুষই এমন এক প্রাণী, যে জন্মের পর শিক্ষা ও বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়। সুশিক্ষা, বিদ্যার্জন ও মানবিক গুণাবলির চর্চা ছাড়া কেবল মানুষের অবয়ব ধারণ করলেই প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে ওঠা যায় না।   তাই মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার জন্যই আমাদের বিদ্যা অর্জন করতে হয়। আর সেই লক্ষ্যে শিশুকাল থেকে আমরা বিদ্যার্জনের প্রথম ধাপে বর্ণ শেখা শুরু করি। এরপর যেতে শুরু করি বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এ রকম আরও নানা প্রতিষ্ঠানে। এসব বিদ্যাপীঠে গিয়ে আমরা বিদ্যা লাভ করি। বছরের পর বছর পরীক্ষা দিয়ে মূল্যবান সনদ অর্জন করি এবং সমাজের চোখে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। কিন্তু এত পরিশ্রম, অধ্যাবসায়ের পরও অনেক জ্ঞানী ব্যক্তির অনেক কাজকর্ম, চিন্তাভাবনা, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও যুক্তি-তর্ক অনেক সময় অজ্ঞ ব্যক্তিদের মনেও প্রশ্ন জাগায়।   জ্ঞান মানুষকে চিনতে শেখায়, বিদ্যা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে, আর সুশিক্ষা তাকে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। বস্তুত প্রকৃত শিক্ষার সূচনা হয় ভ্রূণাবস্থাতেই। এরপর শিশুর মা-বাবা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ সবার আচার-ব্যবহার ও কথোপকথন থেকেই শিশু শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে। এ কারণেই হয়তো সেই পুরোনো প্রচলিত প্রবাদটির উদ্ভব হয়েছিল—’সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’।   পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে পাওয়া শিক্ষা কেবল শিশুর নৈতিক চরিত্রই গঠন করে না; বরং তার সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, মনোবল গঠন, আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার মানসিকতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ শেখার ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। সৎ সঙ্গের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশু স্বার্থপরতা পরিহার করে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে এবং ভালোবাসার চর্চা করতে শেখে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে ও বুঝতে শেখে—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। তারা সহনশীল, বিনয়ী, নম্র-ভদ্র ও পরোপকারী হওয়ার পাশাপাশি সর্বোপরি একজন সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা পায়। অন্তরে লালন করতে শেখে—‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’।   একটি সুন্দর ও সুস্থ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু সব সময় যে ‘মানুষ’ হিসেবে বিকশিত হয়, তা নয়। এর ব্যতিক্রমও আছে। আবার অনেক নেতিবাচক পরিবেশ ও প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যেও অনেক সময় উন্নত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। একেই বলে—‘গোবরেও পদ্মফুল’।   সর্বোপরি, বলতে চাই, বড় বড় বই-পুস্তক পাঠ করে এবং বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে বিদ্বান হওয়া যায় সত্য; কিন্তু তাতেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হলে নিরন্তর আত্মশুদ্ধির জন্য সাধনা প্রয়োজন। জীবের প্রতি প্রেম থাকতে হয়, ক্ষমা করার মতো মহৎ গুণ আয়ত্ত করতে হয়। পরস্পরকে ও প্রকৃতিকে নিজের মতো ভালোবাসতে হয়। ভালোবাসার মাধ্যমেই জয় করতে হয় জগৎ।  

অক্টোবর ১৮, ২০২৬ 0

স্মৃতিময় সোনালি অতীত

রঙে রঙে আনন্দ

ভয়েস ওভার অ্যাক্টিং নিয়ে ক্যারিয়ার

কন্যারা স্বপ্ন বোনে, সমাজ কি তার দাম দিতে প্রস্তুত

কন্যাদের শিক্ষিত করা আর সেই শিক্ষাকে জীবন গঠনের কাজে লাগানো— আমরা প্রায়ই এ দুই বিষয়কে এক করে ফেলি। প্রতিবছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস এলে আমরা বিগত বছরের অর্জনের হিসাব দেখে গৌরব করি। কিন্তু সেই অর্জন শেষ পর্যন্ত একটি মেয়ের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় কারোরই হয় না।   পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিক্ষার এই নির্মম সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ৮৩.৭ শতাংশ হলেও উচ্চমাধ্যমিকে এসে তা অর্ধেকের কাছাকাছি, অর্থাৎ ৪৩.৯ শতাংশে নেমে আসে। আবার বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ে নারীদের বেকারত্বের হার ২০.৩৯ শতাংশ, যা পুরুষের (১১.৩১ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও অনেক কন্যাশিশু সেই শিক্ষার ধারা ধরে রাখতে পারছে না। আবার যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করছে, কর্মক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শিক্ষিত হওয়া আর সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করা—এই দুয়ের মাঝের ব্যবধানটা এখনো অনেক বড়।   একটি কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের রূপরেখা তৈরি হয়ে যায় তার জন্মের পর থেকেই। ‘মেয়ে তো পরের ঘরে চলে যাবে’—আমাদের সমাজে প্রচলিত এ কথাটি এতটাই সাধারণ যে একে আর কোনো অন্যায় মনে হয় না। অথচ এই এক মানসিকতার কারণেই একটি মেয়ের পুষ্টি, পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। বিশেষ করে, গ্রামীণ সমাজে এখনো খাবারের টেবিলে বড় মাছের টুকরোটি তুলে দেয়া হয় ছেলের প্লেটে, আর মেয়ের ভাগে জোটে ছোটটি। ছেলের পড়াশোনার পেছনে পানির মতো টাকা ঢালা হলেও মেয়ের ক্ষেত্রে শোনা যায় হতাশাজনক প্রশ্ন—‘আর কত পড়বে?’   আমরা শিক্ষার পরিসংখ্যান দিয়ে নিজেদের আত্মতুষ্টি পাই, কিন্তু আড়ালের চিত্রটি ভিন্ন। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ে অসংখ্য মেয়ে। কারণ হিসেবে কখনো আসে চরম দারিদ্র্য, কখনো যাতায়াতের নিরাপত্তা অভাব, আবার কখনো বা অকাল বিয়ের তোড়জোড়। বাল্যবিয়ে রোধে আইন আছে ঠিকই, কিন্তু সামাজিক চাপের কাছে সেই আইন প্রায়ই হার মানে। ‘মেয়ে বড় হয়ে গেছে’, ‘লোকে কী বলবে’ কিংবা ‘ভালো পাত্র হাতছাড়া হয়ে যাবে’—এ ধরনের সামাজিক অজুহাত প্রতিনিয়ত বহু সম্ভাবনাময় মেয়ের স্বপ্নের অকালমৃত্যু ঘটায়। কম বয়সে বিয়ের পরিণামে অল্প বয়সে মাতৃত্ব, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি আর চিরতরে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ হারানোর মতো অন্ধকার নেমে আসে। একটি মেয়ের শৈশব ধ্বংস হলে তার ক্ষতি কেবল একক নয়; পরবর্তী প্রজন্মও সেই বৈষম্যের চক্রে আটকা পড়ে।   পড়াশোনার পাশাপাশি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা আজ চরম সংকটে। কন্যাসন্তান ঘরে থাকা যেন মা-বাবার জন্য এক সার্বক্ষণিক আতঙ্কের নাম। সমাজ আজও তাদের একটি নিরাপদ শৈশব দিতে পারছে না। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না খুঁজে সমাধান খুঁজি মেয়ের পোশাক ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষার দৈন্যদশা তুলে ধরে। পত্রিকার পাতায় এসব খবর দেখার পর আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা জন্মাবে কবে?   এই অবস্থা থেকে উত্তরণের দায় আমাদের সবার। পরিবারকে শুরুতেই বৈষম্য দূর করে মেয়েকে প্রশ্ন করার, ‘না’ বলতে শেখার এবং নিজের স্বপ্নের পিছে দৌড়ানোর আত্মবিশ্বাস দিতে হবে। স্কুলগুলোকে ঝরে পড়া ঠেকাতে আরও সংবেদনশীল ভূমিকা রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আর নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, আশপাশে বাল্যবিয়ে বা নির্যাতনের কোনো আয়োজন দেখলে মুখে কলুপ না এটে তা প্রতিহত করা।   আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়, এটি সমাজের আত্মপ্রতিফলন ও জবাবদিহির দিন। একটি মেয়ের স্বপ্নের দাম আসলে কোনো টাকায় পরিমাপ করা যায় না, তার মূল্য হলো আমাদের একটি সুসংগঠিত ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন হলো, সেই মূল্য দিতে আমরা আর কত দিন দেরি করব?   দিনশেষে এটাই কামনা যে, স্বপ্নের ডানা মেলুক প্রতিটি আত্মজা। শুভ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস।   

অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস এবং আমাদের করণীয়

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস : মাঠে মাঠে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও আগামীর চ্যাম্পিয়ন

ছবিটি প্রথম আলো থেকে নেয়া

চাকমা সমাজে চুঙুলং পূজার গুরুত্ব ও সামাজিক বৈধতা