Breaking news
ফিচার

প্রযুক্তি ও স্মার্টফোনের ফাঁদে বিপন্ন বন্ধন

আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু
আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু সহকারী অধ্যাপক মহাস্থান মাহীসওয়ার কলেজ, বগুড়া
জুলাই ১৯, ২০২৬ • 0

​আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে জীবনের বেগ, তেমনি কেড়ে নিচ্ছে জীবনের আবেগ। একই ছাদ, একই ঘর, এমনকি একই বিছানা, কিন্তু সেখানে কোনো ফিসফাস নেই, নেই সারা দিনের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার চেনা গুঞ্জন। আছে কেবল চারকোণা স্ক্রিনের স্মার্টফোনের নীল আলো আর আঙুলের অবিরাম যান্ত্রিক ওঠানামা।

 

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমরা যেন এক অদ্ভুত ‘একাকিত্বের মেলা’য় বাস করছি, যেখানে পাশের মানুষটি ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠছে, আর হাজার মাইল দূরের ভার্চ্যুয়াল অবয়বটি হয়ে উঠছে পরম আত্মীয়। মুঠোফোনে আসক্তি আজ আর কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এটি আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর মূলে আঘাত হানছে।

 

মুঠোফোনে আসক্তি রাতারাতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে গড়ে ওঠেনি, এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ। যেগুলোকে আমরা সংক্ষেপে নিম্নরূপে তুলে ধরতে পারি। 

 

​ডোপামিন ড্রাইভ ও তাৎক্ষণিক আনন্দ : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইক, কমেন্ট বা গেমের রিওয়ার্ড মানুষের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন নিঃসরণ করে, যা ক্ষণিকের জন্য ভালো লাগার অনুভূতি দেয়। বাস্তব জীবনের চেয়ে এই ভার্চ্যুয়াল জগৎ থেকে দ্রুত ও সহজে আনন্দ পাওয়ার তাড়না মানুষকে আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়।

 

​একাকিত্ব ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি : বাস্তব জীবনে একাকিত্ব, কাজের চাপ বা বিষণ্ণতা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে অনেকেই অবচেতনভাবে স্ক্রিনকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন, যা পরবর্তী সময়ে অভ্যাসে পরিণত হয়।

 

​অভিভাবকদের অসচেতনতা ও ব্যস্ততা : কর্মব্যস্ত মা-বাবা অনেক সময় সন্তানকে শান্ত রাখতে বা নিজেরা ঝামেলাযুক্ত থাকতে খুব ছোটবেলাতেই তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন।

 

​বিকল্প সুস্থ বিনোদনের অভাব : অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকট শিশু-কিশোরদের ঘরে বন্দী করে ফেলেছে, যার সহজ বিকল্প হয়ে উঠেছে মুঠোফোনের স্ক্রিন।

 

​পারিবারিক বন্ধনে ফাটল ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব : ​একসময় বাঙালি পরিবারের প্রাণ ছিল যৌথ পরিবারের গল্পগাছা আর রাতের খাবার টেবিল। সেখানে সারা দিনের ক্লান্তি ধুয়ে যেত মা-বাবা, ভাই-বোন বা জীবনসঙ্গীর হাসিমুখের আলাপে। আজ সেই টেবিল নীরব। খাবার প্লেটের পাশে সগর্বে শুয়ে থাকে স্মার্টফোন।

 

​মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘ফাবিং’ (Phubbing), অর্থাৎ মুখোমুখি কথোপকথনের সময় সঙ্গীকে উপেক্ষা করে ফোনে মগ্ন থাকা। এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। এর প্রভাবগুলো হচ্ছে—

 

​পারস্পরিক আস্থার সংকট : স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে এটি একধরনের অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিচ্ছে। একই ঘরে থেকেও একে অপরকে সময় না দেয়ায় জন্ম নিচ্ছে একাকিত্ব ও সন্দেহপ্রবণতা।

 

​সহানুভূতির অভাব : মুখোমুখি কথা না বলায় আমরা মানুষের চোখের ভাষা বা আবেগের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারছি না। ফলে মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও সহমর্মিতা হ্রাস পাচ্ছে।

 

আমরা শারীরিকভাবে একটু-আধটু কাছাকাছি থাকলেও মানসিকভাবে দূরে চলে যাচ্ছি। কখনো কখনো এই মানসিক দূরত্ব এতটাই প্রভাব ফেলে যে, তা শারীরিকভাবেও দম্পতির মাঝখানে দেয়াল তৈরি করে দেয়। এই দূরত্বের দীর্ঘমেয়াদি ফলস্বরূপ একদিকে যেমন গভীর মানসিক বিষণ্ণতা তৈরি হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে তা পারিবারিক বিচ্ছেদের পথকে উসকে দিচ্ছে।

 

​শৈশবের অপমৃত্যু : আজকের শিশু-কিশোররা চড়ুইভাতি, গোল্লাছুট বা ফুটবল খেলার আনন্দ চেনে না। তাদের শৈশব এখন চার ইঞ্চির স্ক্রিনে বন্দী। বিকেলে খেলার মাঠগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে, আর ঘরের কোণে বসে শিশুরা খেলে ‘ফ্রি ফায়ার’ বা ‘পাবজি’। শারীরিক খেলাধুলা না করায় শিশুদের মেধা বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে স্থূলতা এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার মতো আচরণগত সমস্যা।

 

অন্ধকারের নতুন গলি ডিজিটাল জুয়া ও মাদকাসক্তি : মুঠোফোনে আসক্তির সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো এটি খুব সহজেই তরুণ প্রজন্মকে অপরাধ ও অন্যান্য মরণনেশার দিকে ধাবিত করছে। স্ক্রিন টাইম যত বাড়ছে, তরুণদের মধ্যে একঘেয়েমি কাটাতে অবক্ষয়ের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে।

 

​ডিজিটাল জুয়ার ফাঁদ : তিনপাত্তি, ওয়ান-এক্স বেট বা বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্র। গেমের আসক্তি থেকে শুরু হওয়া এই জুয়া একপর্যায়ে তরুণদের সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে।

 

​মাদকাসক্তির সাথে সংযোগ : জুয়ায় হেরে যাওয়া বা দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে থাকার ফলে সৃষ্ট মানসিক অবশতা ও হতাশা কাটাতে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তিতে। অর্থাৎ ভার্চ্যুয়াল জগতের অন্ধকার সরাসরি বাস্তব জীবনের অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে।

 

​জাতীয় দৈনিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক উপাত্তে যেসব চিত্র আরও ভয়াবহ আকারে ফুটে উঠেছে, সেগুলো হচ্ছে—

 

​মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় : বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’-এর একটি জরিপে (যা গত ১০ জুন ২০২৪ তারিখে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকসমূহে প্রকাশিত হয়) দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭২.৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী মাত্রাতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন মাত্রার মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তাদের মধ্যে ঘুমহীনতা, হঠাৎ রেগে যাওয়া ও মনোযোগহীনতার হার সবচেয়ে বেশি।

 

​অনলাইন জুয়ার থাবা : দৈনিক প্রথম আলোর এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনলাইন জুয়ায় জড়িত, যার সিংহভাগই কিশোর ও যুবসমাজ। প্রতিদিন শত কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে এই জুয়ার মাধ্যমে।

 

​পারিবারিক কলহ ও বিবাহবিচ্ছেদ : ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো এবং পরে ১০ জানুয়ারি ২০২৫ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছরে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে এবং ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০টির কাছাকাছি তালাকের নোটিশ জমা পড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে এই আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নেপথ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘সঙ্গীকে সময় না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো, পারিবারিক সম্পর্কে চরম উদাসীনতা এবং ভার্চ্যুয়াল জগতের মোহ থেকে তৈরি পরকীয়া আসক্তি।

 

​প্রযুক্তি আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ ফিরে সম্পর্কের মায়ায় বাস্তবে প্রযুক্তিকে বর্জন করা সম্ভব নয়, তবে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের হাতেই। এই নীরব মহামারি থেকে বাঁচতে পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। যেমন ঘুমানোর ঘর ও খাবার টেবিলকে সম্পূর্ণ ‘মুঠোফোন মুক্ত’ ঘোষণা করতে হবে। পরিবারে অন্তত এ দুই জায়গায় যেন কেবল নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা হয়।

 

সপ্তাহে অন্তত এক দিন বা দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় (যেমন সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৯টা) পরিবারের সবাই মিলে মুঠোফোন বন্ধ রেখে গল্প করা, বইপড়া বা গান শোনার অভ্যাস করতে হবে।

 

স্থানীয় ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে পাড়ায় পাড়ায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন বাড়াতে হবে, যাতে তরুণরা মাঠের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

 

শেষ কথা হলো, স্মার্টফোন বা আধুনিক সামাজিক মিডিয়াকে বর্জন নয় বরং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। স্মার্টফোন যেন আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি না হয়ে ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখার সময় এখনই। প্রযুক্তির আলো যেন আমাদের হৃদয়ের আন্তরিকতার আলোকে নিভিয়ে না দেয়। আসুন, স্ক্রিনের কৃত্রিম উজ্জ্বলতা সরিয়ে আমরা আবার ফিরে যাই মানুষের চোখের মায়ায়, ফিরে যাই একসাথে বসে চায়ের কাপে ঝড় তোলা সেই চিরচেনা ভালোবাসার দিনগুলোতে।

 

0 Comments

Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

ফিচার

View more
‘সুখের মতো অসুখ’-এর দিনগুলিতে রবীন্দ্রনাথ

আর্জেন্টিনা অনেক দূরের দেশ। রবীন্দ্রনাথের কাছে তখন অচেনা পৃথিবী। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন প্লাজা হোটেলে। সেখান থেকে একদিন স্বপ্নের মতো তাঁকে চলে যেতে হলো সান ইসিদ্রোতে। বিচিত্র লাল-নীল ফুলের উৎসবে সজ্জিত সুন্দর বাড়ি, মিরালরিও ভিলা। বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নদী দেখা যায়, রুপালি নদী, নদীর নাম রিও ডেলা প্লাটা।   রবীন্দ্রনাথ ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে বসে নদী দেখেন। নদী তো নয় যেন এক নারীর রহস্য-প্রতিকৃতি। কে সেই নারী, কোত্থেকে আবির্ভূত হলো সেই নিরুপমা বিদেশিনী, যাঁর সংস্পর্শে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত আবেগে ভেসে যাচ্ছেন, অশ্রুতে হাসিতে হয়ে পড়ছেন চঞ্চল উন্মনা। অসুস্থতার মধ্যেও যেন সুখের মতো অসুখে জর্জরিত হয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরতে চাইছেন, কিন্তু ফেরা হচ্ছে না। অদ্ভুত এক পিছুটান তাঁকে আটকে ধরেছে। কী সেই পিছুটান?   লা হিয়া কোন্ডা দেলসুর, যার অর্থ দক্ষিণের মোনালিসা। সবাই তাঁকে চেনে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নামে।   পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের বসন্ত ঋতু তখন মিশে যাচ্ছিল গ্রীষ্মের সাথে, প্রকৃতির এমনই নাটকীয় পরিবর্তনের কালে রবীন্দ্রনাথের সাথে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ভাবের আদান-প্রদান হয়, নৈঃশব্দ্যের ভেতর সঞ্চারিত হয় নতুন শব্দমালা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়ার ভাষা বুঝতেন না, তাহলে তাঁদের ভাববিনিময়ের মাধ্যম কী ছিল? সুখের মতো অসুখের দিনগুলিতে রবীন্দ্রনাথ কী ভাবতেন, কী লিখতেন, আর তিনি কীভাবেই-বা পৌঁছালেন এমন এক রহস্যময় অজানা ভাষার দেশে!   রবীন্দ্রনাথের জীবনের এমন রহস্যময় কালপর্বের ভারী পর্দা উন্মোচিত হয়েছে গত ১২ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে। রবীন্দ্রনাথ আর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অলৌকিক অপূর্ব সুন্দর সাক্ষাতের অসাধারণ বিন্যাস, ম্যাড থেটারের নাটক ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’। নাটকটি গবেষণাধর্মী প্রযোজনা হওয়ায় শুধু সাধারণ দর্শক নয়, ছাত্র, শিক্ষক গবেষকসহ কবি-সাহিত্যিকদেরও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া।   নাটকটি রচনা, নির্দেশনা ও পরিকল্পনা করেছেন ম্যাড থেটারের প্রধান পরিচালক আসাদুল ইসলাম। নাটকটির চরিত্র সংখ্যা দুটি। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রে অভিনয় করেছেন আসাদুল ইসলাম এবং ভিক্টোরিয়া চরিত্রে সোনিয়া হাসান।   রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর শতাব্দীপ্রাচীন প্রেমকে নাটকের মধ্য দিয়ে স্মরণে ম্যাড থেটার বিরল ব্যতিক্রম। নতুন উদ্বোধন ঘটেছে ম্যাড থেটারের সাড়া জাগানো নাটক ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’-এর মধ্য দিয়ে। গত ১২ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনেটে হয়েছে নাটকটির ত্রয়োদশ প্রদর্শনী।    

অক্টোবর ২১, ২০২৬ 0

শিক্ষা এবং আমাদের দায়বদ্ধতা

বাইপোলার ডিসঅর্ডার : মনের যত্নে খাবারও কি গুরুত্বপূর্ণ

এআই ভিডিওর মোহে মিডিয়া

বিদ্যার্জন ও শিক্ষা

বিদ্যার্জন ও শিক্ষালাভ মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাণিজগতের মধ্যে মানুষই এমন এক প্রাণী, যে জন্মের পর শিক্ষা ও বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়। সুশিক্ষা, বিদ্যার্জন ও মানবিক গুণাবলির চর্চা ছাড়া কেবল মানুষের অবয়ব ধারণ করলেই প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে ওঠা যায় না।   তাই মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার জন্যই আমাদের বিদ্যা অর্জন করতে হয়। আর সেই লক্ষ্যে শিশুকাল থেকে আমরা বিদ্যার্জনের প্রথম ধাপে বর্ণ শেখা শুরু করি। এরপর যেতে শুরু করি বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এ রকম আরও নানা প্রতিষ্ঠানে। এসব বিদ্যাপীঠে গিয়ে আমরা বিদ্যা লাভ করি। বছরের পর বছর পরীক্ষা দিয়ে মূল্যবান সনদ অর্জন করি এবং সমাজের চোখে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। কিন্তু এত পরিশ্রম, অধ্যাবসায়ের পরও অনেক জ্ঞানী ব্যক্তির অনেক কাজকর্ম, চিন্তাভাবনা, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও যুক্তি-তর্ক অনেক সময় অজ্ঞ ব্যক্তিদের মনেও প্রশ্ন জাগায়।   জ্ঞান মানুষকে চিনতে শেখায়, বিদ্যা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে, আর সুশিক্ষা তাকে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। বস্তুত প্রকৃত শিক্ষার সূচনা হয় ভ্রূণাবস্থাতেই। এরপর শিশুর মা-বাবা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ সবার আচার-ব্যবহার ও কথোপকথন থেকেই শিশু শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে। এ কারণেই হয়তো সেই পুরোনো প্রচলিত প্রবাদটির উদ্ভব হয়েছিল—’সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’।   পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে পাওয়া শিক্ষা কেবল শিশুর নৈতিক চরিত্রই গঠন করে না; বরং তার সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, মনোবল গঠন, আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার মানসিকতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ শেখার ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। সৎ সঙ্গের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশু স্বার্থপরতা পরিহার করে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে এবং ভালোবাসার চর্চা করতে শেখে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে ও বুঝতে শেখে—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। তারা সহনশীল, বিনয়ী, নম্র-ভদ্র ও পরোপকারী হওয়ার পাশাপাশি সর্বোপরি একজন সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা পায়। অন্তরে লালন করতে শেখে—‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’।   একটি সুন্দর ও সুস্থ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু সব সময় যে ‘মানুষ’ হিসেবে বিকশিত হয়, তা নয়। এর ব্যতিক্রমও আছে। আবার অনেক নেতিবাচক পরিবেশ ও প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যেও অনেক সময় উন্নত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। একেই বলে—‘গোবরেও পদ্মফুল’।   সর্বোপরি, বলতে চাই, বড় বড় বই-পুস্তক পাঠ করে এবং বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে বিদ্বান হওয়া যায় সত্য; কিন্তু তাতেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হলে নিরন্তর আত্মশুদ্ধির জন্য সাধনা প্রয়োজন। জীবের প্রতি প্রেম থাকতে হয়, ক্ষমা করার মতো মহৎ গুণ আয়ত্ত করতে হয়। পরস্পরকে ও প্রকৃতিকে নিজের মতো ভালোবাসতে হয়। ভালোবাসার মাধ্যমেই জয় করতে হয় জগৎ।  

অক্টোবর ১৮, ২০২৬ 0

স্মৃতিময় সোনালি অতীত

রঙে রঙে আনন্দ

ভয়েস ওভার অ্যাক্টিং নিয়ে ক্যারিয়ার

কন্যারা স্বপ্ন বোনে, সমাজ কি তার দাম দিতে প্রস্তুত

কন্যাদের শিক্ষিত করা আর সেই শিক্ষাকে জীবন গঠনের কাজে লাগানো— আমরা প্রায়ই এ দুই বিষয়কে এক করে ফেলি। প্রতিবছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস এলে আমরা বিগত বছরের অর্জনের হিসাব দেখে গৌরব করি। কিন্তু সেই অর্জন শেষ পর্যন্ত একটি মেয়ের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় কারোরই হয় না।   পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিক্ষার এই নির্মম সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ৮৩.৭ শতাংশ হলেও উচ্চমাধ্যমিকে এসে তা অর্ধেকের কাছাকাছি, অর্থাৎ ৪৩.৯ শতাংশে নেমে আসে। আবার বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ে নারীদের বেকারত্বের হার ২০.৩৯ শতাংশ, যা পুরুষের (১১.৩১ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও অনেক কন্যাশিশু সেই শিক্ষার ধারা ধরে রাখতে পারছে না। আবার যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করছে, কর্মক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শিক্ষিত হওয়া আর সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করা—এই দুয়ের মাঝের ব্যবধানটা এখনো অনেক বড়।   একটি কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের রূপরেখা তৈরি হয়ে যায় তার জন্মের পর থেকেই। ‘মেয়ে তো পরের ঘরে চলে যাবে’—আমাদের সমাজে প্রচলিত এ কথাটি এতটাই সাধারণ যে একে আর কোনো অন্যায় মনে হয় না। অথচ এই এক মানসিকতার কারণেই একটি মেয়ের পুষ্টি, পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। বিশেষ করে, গ্রামীণ সমাজে এখনো খাবারের টেবিলে বড় মাছের টুকরোটি তুলে দেয়া হয় ছেলের প্লেটে, আর মেয়ের ভাগে জোটে ছোটটি। ছেলের পড়াশোনার পেছনে পানির মতো টাকা ঢালা হলেও মেয়ের ক্ষেত্রে শোনা যায় হতাশাজনক প্রশ্ন—‘আর কত পড়বে?’   আমরা শিক্ষার পরিসংখ্যান দিয়ে নিজেদের আত্মতুষ্টি পাই, কিন্তু আড়ালের চিত্রটি ভিন্ন। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ে অসংখ্য মেয়ে। কারণ হিসেবে কখনো আসে চরম দারিদ্র্য, কখনো যাতায়াতের নিরাপত্তা অভাব, আবার কখনো বা অকাল বিয়ের তোড়জোড়। বাল্যবিয়ে রোধে আইন আছে ঠিকই, কিন্তু সামাজিক চাপের কাছে সেই আইন প্রায়ই হার মানে। ‘মেয়ে বড় হয়ে গেছে’, ‘লোকে কী বলবে’ কিংবা ‘ভালো পাত্র হাতছাড়া হয়ে যাবে’—এ ধরনের সামাজিক অজুহাত প্রতিনিয়ত বহু সম্ভাবনাময় মেয়ের স্বপ্নের অকালমৃত্যু ঘটায়। কম বয়সে বিয়ের পরিণামে অল্প বয়সে মাতৃত্ব, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি আর চিরতরে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ হারানোর মতো অন্ধকার নেমে আসে। একটি মেয়ের শৈশব ধ্বংস হলে তার ক্ষতি কেবল একক নয়; পরবর্তী প্রজন্মও সেই বৈষম্যের চক্রে আটকা পড়ে।   পড়াশোনার পাশাপাশি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা আজ চরম সংকটে। কন্যাসন্তান ঘরে থাকা যেন মা-বাবার জন্য এক সার্বক্ষণিক আতঙ্কের নাম। সমাজ আজও তাদের একটি নিরাপদ শৈশব দিতে পারছে না। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না খুঁজে সমাধান খুঁজি মেয়ের পোশাক ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষার দৈন্যদশা তুলে ধরে। পত্রিকার পাতায় এসব খবর দেখার পর আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা জন্মাবে কবে?   এই অবস্থা থেকে উত্তরণের দায় আমাদের সবার। পরিবারকে শুরুতেই বৈষম্য দূর করে মেয়েকে প্রশ্ন করার, ‘না’ বলতে শেখার এবং নিজের স্বপ্নের পিছে দৌড়ানোর আত্মবিশ্বাস দিতে হবে। স্কুলগুলোকে ঝরে পড়া ঠেকাতে আরও সংবেদনশীল ভূমিকা রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আর নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, আশপাশে বাল্যবিয়ে বা নির্যাতনের কোনো আয়োজন দেখলে মুখে কলুপ না এটে তা প্রতিহত করা।   আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়, এটি সমাজের আত্মপ্রতিফলন ও জবাবদিহির দিন। একটি মেয়ের স্বপ্নের দাম আসলে কোনো টাকায় পরিমাপ করা যায় না, তার মূল্য হলো আমাদের একটি সুসংগঠিত ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন হলো, সেই মূল্য দিতে আমরা আর কত দিন দেরি করব?   দিনশেষে এটাই কামনা যে, স্বপ্নের ডানা মেলুক প্রতিটি আত্মজা। শুভ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস।   

অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস এবং আমাদের করণীয়

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস : মাঠে মাঠে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও আগামীর চ্যাম্পিয়ন

ছবিটি প্রথম আলো থেকে নেয়া

চাকমা সমাজে চুঙুলং পূজার গুরুত্ব ও সামাজিক বৈধতা