কিংসফোর্ড চার্চের সামনে ফিওনেরাল চলাকালে হঠাৎ করেই অপ্রীতিকর একটা ঘটনা ঘটে। খালিল নামের ভদ্রলোকটি শ্যারবেলকে চার্চে ঢুকতে দেখে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসেন এবং তাকে চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি মারতে মারতে একেবারে সিঁড়ির নিচে ফেলে দেন। ফিউনেরালে এ কী ঘটনা! কেউ বুঝে ওঠার আগেই যা ঘটার, তা ঘটে গেছে।
এই ভদ্রলোক মারিয়ামের পরিবারের একজন ওয়েল-উইশার ভিন্ন কিছু নন। তবে সময় পরিক্রমায় বিষয়টা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, মারিয়াম যেন এই খালিলের মাঝে স্বামীর ছায়া দেখতে শুরু করেন। তাঁর তিনটি সন্তান সিডনিজীবনের শুরু থেকেই খালিলকে আংকেল বলে ডাকে। মারিয়ামের পরিবারের সব পরামর্শেই খালিলের ডাক পড়ে।
সিডনি শহরে মারিয়ামের জীবন শুরু করার মতো কিছুই ছিল না। তিনটি সন্তান নিয়ে এই মা শুধু বেঁচে ছিলেন, এর বেশি কিছু নয়। তারপর এই দীর্ঘ সময় কোন দিক দিয়ে গেল মারিয়ামের, আজ আর তার হিসাব মেলে না। এতগুলো মৃত্যু বুকে চেপে চিৎকার করে কান্নার সময়টুকুও হয়ে ওঠেনি। ক্রমাগত জীবনযুদ্ধে তাঁর ক্লান্ত হওয়ার সময়ও ছিল না যেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও লেবাননে ফেলে আসা জীবন, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখির মত ডাক দিয়ে তাঁকে আনমনা করে দিত। আল কালিমা সেন্ট অ্যান্থনি ক্যাথলিক পাবলিক স্কুল, দুরন্ত শৈশব, শিক্কায় তাঁদের বাড়ি, পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরের নীল জল, ছোট-বড় পাহাড়ে সোনালি রোদ, হৃদয়ে স্বর্গ।
১৯৭৬ সালের ৫ জুলাই দানবীয় এক ঘটনা ঘটে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে মা-বাবা, দুই ভাই, স্বামী, দেবর সব শেষ। কে বাঁচল আর কে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। তারপর মারিয়াম আর ভাবতে পারেন না। বীভৎস এই স্মৃতি চোখে ভেসে উঠতেই তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। এক অনিশ্চয়তার পথ ধরে সাইপ্রাস হয়ে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি।
শ্যারবেলের বয়স সাত বছর, অ্যানতোয়ানের চার আর এই অনাগত ক্রিশ্চিনা...। খালিল মারিয়ামের স্বামী জোসেফের সাথে কর্মসূত্রে পরিচিত। গ্রেটার ওয়েস্টার্ন সিডনির গিল্ডফোর্ডে তাঁর বাড়ির পাশে প্রায় পরিত্যক্ত একটা বাড়িতে আশ্রয় হয়েছিল মারিয়ামের। সিডনিতে ল্যান্ড করার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই মারিয়াম একটা কাবাব শপে চাকরি শুরু করেন। ক্রিশ্চিনার জন্ম হওয়া, তারপর ছয় মাস বয়সী মেয়েকে খালিলের স্ত্রী কারলার কেয়ারে দিয়ে শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। খালিলের পরামর্শে মারিয়াম একদিন নিজেই একটা পজিশন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। চলে যায় দিন মাস বছর।
‘এমন ব্যস্ততা কি আর চিরকাল থাকবে? ছেলে-মেয়েগুলো বড় হয়ে গেলেই দোকানটা ছেড়ে দেব। দেশ দেখতে যাব। ওখানে তো আমার মা-বাবা, ভাই, স্বামী-দেবর সবাই আছে।’ এই ‘আছে’ শব্দটা জড়িয়ে ধরেই যেন বেঁচে থাকা যায়। ‘নাই’ কী যে মর্মান্তিক, কাজ দূরে থাক, শোয়া থেকে মাথাটা তুলে বসার শক্তিটাও থাকে না যেন।
অ্যারাবিয়ান শপ। মারিয়ামের জাতার-সালাদের খ্যাতি এলাকাজুড়ে। এই নারীর হাতে একবার এই জাতার-সালাদ যে খেয়েছে, তাকে এখানে আবার আসতে হবে। ভোর পাঁচটা থেকে বেলা এগারোটা পর্যন্ত চলত দোকানটি। ক্রেতার দীর্ঘ লাইন। তারপর একদিন ছোট ক্রিশ্চিনাও হাইস্কুলে চলে গেলে দোকানটি দিনের দ্বিতীয়ার্ধেও বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা আটটা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ব্যবসা বেশ ভালো চলছে। ভাড়া বাসা ছেড়ে চার বেডরুমের একটা বাড়ি কেনেন মারিয়াম। মাসিক ইন্সটলমেন্টের পাশাপাশি বেশ কিছু ইউটিলিটি বিল নিয়মিত পে করা জীবনটাই যেন কেমন এক স্রোতের সাথে মিশে গেল। পেছন ফিরে তাকানোর কোনো উপায় নেই। শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া। সন্তানগুলোর মুখে খাবার তুলে দেয়া, তাদের জামাকাপড়, থাকার জায়গা, পড়াশোনার খরচ। তিনটি সন্তান নিয়ে সংগ্রামী এই মা মারিয়াম। এভাবেই ওরা তিনজন বড় হয়, ছেলেরা বিয়ে করে। একদিন ক্রিশ্চিনারও বিয়ে হয়ে গেলে মারিয়াম ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে পেনশনে চলে যান।
ঘরে-বাইরে ব্যস্ত জীবনের পর হঠাৎ করেই এই একা জীবন, যেন কেমন এক মায়া, পাশাপাশি একটা বোধ মারিয়ামকে ঘিরে ফেলে। ‘মেন্টাল হেল্থ’ এমনই একটা কথা, অপ্রমাণিত হলেও শক্তি অর্জন করল অনেক। দুই ছেলে মাকে নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাল না। প্রাথমিকভাবে মারিয়ামের ঠাঁই হয় ক্রিশ্চিনার বাসায়। গভীর ঘুমে মারিয়াম কথা বলতে থাকেন। কখনো চিৎকার করে ওঠেন। কেউ কাছে গিয়ে মাথায় হাত বোলাতেই শান্ত হন। কখনো নির্বিকার চেয়ে থাকেন। কাউকে চিনতে পারেন না।
সন্তানসম্ভবা ক্রিশ্চিনা তার দুই ভাইয়ের সাথে কথা বলল। না, মায়ের বিষয়ে তাদের কারোরই কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
স্মৃতিতে মারিয়ামের শ্বশুরবাড়ি ও বাবার বাড়ি উজ্জ্বল, উজ্জ্বল তার শৈশব-কৈশোর। নর্থ লেবাননের শিক্কায় তাঁদের বাড়িটা আজও আছে। আঙিনার ওই ছোট্ট গাছগুলো তো অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক অগোছালো অনুভূতির ভেতর এক শান্তিময় অনুভূতি ভোরের সূর্যোদয়ের মতো উঁকি দেয়। কত সুন্দর ছিল দিনগুলো—নতুন বিয়ে, নতুন সংসার, স্বামী-দেবর, ভালোবাসা, প্রথম পরশ। একদিন সবার মুখ উজ্জ্বল করে মা হওয়া, কোলজুড়ে এই শ্যারবেল, তারপর অ্যানতোয়ান। অনেক যত্ন-স্নেহ, সন্তানগুলো একদিন বড় হবে। ওখানে ছিল আমার সংসার, ওখানেই সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার অঙ্কুরোদগম হয়েছিল।
তারপর সেদিন এক আর্তচিৎকারে মারিয়াম বলেছিলেন, ‘আমি কোনো রাজনীতি, জাতি, ধর্ম কিছুই জানি না, আমি জানি আমার জীবন।’
কে ছিল ওরা! কী ছিল তাঁর স্বামীর অপরাধ! ১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে মৃত্যুর মিছিলে সন্তানগুলোকে নিয়ে পালানো। লোকে বলে বেঁচে থাকাটাই নাকি এক স্বর্গীয় আশীর্বাদ। মারিয়াম এই আশীর্বাদ বুঝতে পারেন না। এই নির্মম স্মৃতি বুকে চেপে দিনগুলো কেটে গেছে।
না, মারিয়ামের মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি নেই। ডাক্তার নিয়মিত অবজারভেশনে রেখেছেন, কিন্তু তেমন কোনো উন্নতির লক্ষণ নেই। এমন অবস্থায় মারিয়ামের বাড়িটা বিক্রি করে দেয়ার একটা গুঞ্জন ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মাকে চার মাস করে নিজ নিজ বাসায় রাখবে, এই শর্তে দুই ভাই আর ক্রিশ্চিনা রাজি হয়। তারপর বাড়িটা বিক্রি করে তিন ভাই-বোন মিলে টাকা ভাগ করে নিয়ে যায়। মারিয়াম বলেন—
এই তোরা আমার বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছিস?
হ মা, তোমার সামনেই তো সব কথা হয়েছে। তুমি সই না দিলে বিক্রি হলো কীভাবে?
ও আচ্ছা, আমি সই দিছি, না? কবে দিছি?
মা কী বলো এসব!
তোরা এক কাজ কর, আমাকে শিক্কায় নিয়ে যা। আমার বাবা, দুই ভাই—গত রাতে স্বপ্নে দেখেছি, তোর বাবা আমাকে নিতে এসেছে।
শ্যারবেল বলল—
বাবা আসছিল তোমাকে নিতে! চলে গেলে না কেন, মা?
তোদের না নিয়ে আমি কোথাও যাব না।
শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ান একে অপরের মুখ চেয়ে হাসে। ওদিকে ক্রিশ্চিনা অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।
তোমার দুই ছেলে লেবাননে যাবে না, মা। আমি তো ওখানে কিছুই চিনি না।
তুই চিনবি কী করে, তোর জন্মই তো অস্ট্রেলিয়ায়। একবার গেলেই ঠিক চিনতে পারবি। নিজের বাড়ি চিরকালই আপন।
বাড়িটা বিক্রি হওয়ার পর মারিয়াম ক্রিশ্চিনার সাথে আছে। মাকে নিয়ে ভাই-বোনের আলোচনায় ক্রিশ্চিনা স্বাভাবিকভাবে বললেও শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ানের কাছে তা আর স্বাভাবিক রইল না। মাঝে মাঝেই মারিয়াম রাতে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠেন।
যুক্তি, অযুক্তি, সুযুক্তি—সব মিলিয়ে ঘটনার শেষ এই দাঁড়াল, এভাবে ঘুমের মধ্যে চিৎকার, এলোমেলো কথা, আউলা আচার-আচরণ, মা কখন কী করে বসেন। সবারই তো জীবন আছে, কাজকর্ম আছে। রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে না পারলে তো যে-কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, তাঁকে সরকারি হাউজিংয়ে রাখা হবে। সার্বিক বিবেচনায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাসাও পাওয়া গেল।
মারিয়াম আপত্তি করলেন না। ডেইসিভিলের ইনডেভার রোডে একতলা কাঠের একটা বাড়ি। সামনে বাগান, বিভিন্ন গাছে ঘেরা পরিপাটি আঙিনা। বারান্দা থেকেই বড় রাস্তাটির ওই পারে কিংসফোর্ড চার্চটি দেখা যায়। এখানে এসে মারিয়ামের খুব ভালো লাগল। খুব যত্নে রাখা স্বামীর স্মৃতি—একটা জামা, কবি জিবরান কাহলিলের দুটো বই সুন্দর একটা শোকেসে সাজিয়ে তিনি এখানে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন। ভালোই চলছে। সপ্তাহে একদিন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার থেকে লোক এসে প্রয়োজনীয় শপিং করে দিয়ে যায়। কমিউনিটি সার্ভিসের গাড়ি এসে নিয়ে যাওয়া এবং অ্যারাবিয়ান দু-একজন নারীর সাথে আলাপ-পরিচয়।
কখনো পাহাড়ি এলাকা, কখনো সমুদ্র, বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা। জীবনের গল্প। মারিয়ামকে মাসে একবার করে তাঁর ছেলে-মেয়েরা পর্যায়ক্রমে দেখতে আসে। মারিয়াম বলেন—
মা, তুই আমার সাথে একদিন থাক। বাবা রে, তুই আরেকটু থাক। তোর কথা আমার খুবই মনে পড়ে।
কখনো মারিয়াম ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন। বাস্তবতার চাপে আড়াল হওয়া স্মৃতিগুলো বের হয়ে আসতে শুরু হয়। চোখের সামনে শিশুর মতো খেলা করে ফেলে আসা হৃদয়। মারিয়ামের ছোট বাড়িটা মনের মতো করে সাজিয়েছেন। বাসার সামনের আঙিনায় নানা রকম ফুলের গাছ। সম্প্রতি তিনি ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি গাছ রোপণ করেছেন। গাছগুলো বারান্দার খুব কাছে। এখানে বসে তিনি গাছের সাথে কথা বলেন। বড় গাছটা জোসেফ, জোসেফের পাশে ছোট গাছটাকে তিনি কোনো নাম ধরে ডাকেন না। এই টবে পানি দিতে গিয়ে তিনি থেমে যান। নামহীনা গাছটার সাথে তাঁর কথা থেমে যায়। পাশে শ্যারবেল, তারপর অ্যানতোয়ানের পাশে ক্রিশ্চিনা। অনেক কথার মাঝে শুধু নামহীন গাছটার দিকে নির্বাক চেয়ে থাকেন এই কথাহীনা।
ঠিক এমনই একদিন মারিয়ামকে দেখতে এসে খালিল দেখেন, মারিয়াম আর এই বাড়িতে নেই। বাড়িটা লক করা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই নারী ডিমেনসিয়ায় ভুগছেন, তাই মারিয়ামের বড় ছেলে তাঁকে এইজ কেয়ারে নিয়ে গেছে। খালিলের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আরে এ কী! মাকে নিয়ে এসব কী শুরু করল ওরা?
খালিল ঠিকানা সংগ্রহ করে তাঁকে দেখতে যান। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত মারিয়ামের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ।
মারিয়াম, আমি তোমাকে দেখতে এসেছি।
প্রায় মিনিটখানেক কোনো কথাই বলেননি তিনি। হঠাৎ করে কেঁদে বলেন—
জোসেফকে অনেক মিস করছি, কত মনে পড়ে! তার স্মৃতিগুলো দিয়ে কত সুন্দর করে বাসাটা সাজিয়েছিলাম! প্রতি মুহূর্তে তাকে অনুভব করতাম। ওরা আমার এত কষ্টে কেনা বাড়িটা বিক্রি করে দিল। আচ্ছা যা হোক, বাড়ি বিক্রির টাকা তো আমার ছেলে-মেয়েই নিয়েছে। কিছু মনে করিনি। সরকারি বাসাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমাকে তো ওখানেও থাকতে দিল না। এত এত মিথ্যা কথা বলে আমাকে এনে এখানে রেখে গেছে। আমি তো ডেইসিভিলের সরকারি বাড়িতে অনেক ভালো ছিলাম। এই এইজ কেয়ারে তো আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি কেন এখানে!
খালিল শ্যারবেলের সাথে যোগাযোগ করেন। একে একে মারিয়ামের তিন ছেলে-মেয়ের সাথেই কথা বলেন। সবারই ওই একই কথা। ‘মায়ের ডিমেনসিয়া বর্ডার লাইন ক্রস করে গেছে। এখন তাঁর সার্বক্ষণিক সুপারভিসন দরকার। নইলে কখন যে আবার বড় রাস্তায় গিয়ে গাড়িচাপা পড়ে! সার্বক্ষণিক দেখভাল কে করবে?’ এমন আরও অনেক কথা।
ডিমেনসিয়া! কী করে বুঝলে?
আচরণে বুঝেছি।
কী এমন আচরণ?
এই তো বাবার জন্য কাঁদে, বাসার সামনে গাছ লাগিয়ে ছেলে-মেয়ে বলে ভাবে। নিজে নিজে কথা বলে।
তোমরা দুই ভাই নিজের বাসায় না পারো তোমাদের আশপাশে কোথাও মায়ের থাকার ব্যবস্থা করতে পারতে।
এটাই তো সমস্যা, ক্রিশ্চিনা দুই সন্তান নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে আমার ওয়াইফ সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, চাকরি, বাসা সামলানো—সব সামাল দিয়ে মাকে দেখতে যে যাব, সময় করতে পারি না। ওখানে ডেইসিভিলের বাসা থেকে গার্ডেনার্স রোডের অপোজিটেই কিংসফোর্ড চার্চ। ফিউনেরাল ম্যাস তো প্রায়ই হয়। কফিনবাহী কালো গাড়ি এসে চার্চের সামনে থামতে দেখলেই শুরু করে বিলাপ। প্যাডিস্ট্রিয়ান ক্রসিং না মেনেই এত বড় ব্যস্ত রাস্তাটা পার হয়ে কফিনবাহী গাড়ি জড়িয়ে ধরে কাঁদে, কখনো-বা চার্চে ঢুকে কফিন জড়িয়ে ধরে শুরু করে আহাজারি। ফিউনেরাল করতে চার্চে আনে, কোথাকার কোন মরা, মা কাঁদবে কেন? কী একটা বিপদ! ওখানে থাকে একা, যদি গাড়িচাপা পড়ে! তখন তো হবে আরেক কেলেঙ্কারি। নিরাপত্তার কথা ভেবে ওল্ড হোমে দেয়া।
লেবাননের ওই গৃহযুদ্ধে যখন তোমাদের বাবা, কাকা, মামা সবাই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, তখন থেকে তোমাদের মা এত বড় শোক বুকে চাপা দিয়ে তিনটা সন্তানকে কোলেপিঠে আগলে রেখেছে। মারিয়াম কি তোমাদের কখনো এতিমখানায় পাঠানোর কথা ভুলেও ভেবেছে?
মারিয়ামের ছেলে-মেয়ে তিনজনই নীরব। সবাই মাথা নিচু করে বসে আছে।
মারিয়ামের এত কষ্টের বাড়িটা তোমরা বিক্রি করে দিলে? তোমাদের শৈশবের স্মৃতি, বেড়ে ওঠা, মায়ের স্ট্রাগল—হৃদয়ে একটুও দাগ কাটল না!
খালিল কিছুটা গরম স্বরে বললেন—
কাট দ্য ক্রাপ্ট। খুব ভালো করে বুঝতে পারছি, তোমাদের সাথে এমন কথার খই ভেজে কিচ্ছু হবে না। ওই কঠিন দিনের অভিজ্ঞতা তোমাদের নেই। কফিন জড়িয়ে ধরে মারিয়াম কেন কাঁদে, তোমরা তা বুঝবে না। তোমরা বলবে, কোথাকার কোন মরা। খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবীর সব মৃত্যুর মাঝেই মৃত্যুরা মিশে আছে। কী করে বুঝবে? শুধু এটুকু মনে রেখো, আমি তোমার বাবা জোসেফের বন্ধু। মারিয়াম আমার ওই বন্ধুর স্ত্রী। তোমাদের নিজ সন্তানের চেয়ে কোনো অংশে কম দেখিনি। শুধু এটুকু দাবিতে ওল্ড হোমে সপ্তাহে একবার মারিয়ামকে আমি দেখতে যাব। এখন থেকে সে আমার আপন বোন।
ঠিক তাই। খালিল প্রায় প্রতি সপ্তাহে ওল্ড হোমে মারিয়ামকে দেখতে যান। মাস দুই পরপর তাঁর নিজের গাড়িতে করে এনে মারিয়ামের ডেইসিভিলের বাড়িটা দেখান। এ বাড়িতে এখন একজন গ্রিক নারী থাকেন। নাম এলিজাবেথ। খালিল তাঁকে এলিজা বলে ডাকেন। আধভাঙা ইংলিশ, আন্তরিকতায় ভাষা যেন কোনো অন্তরায় নয়। মারিয়ামের গড়া বাগানটির যত্ন নেন তিনি। জোসেফের স্মৃতিগুলো আজও এ বাড়িতেই আছে। এলিজাবেথ খুব যত্ন করে রাখেন। মারিয়াম যখন বাগানে এসে বসেন, এলিজাবেথ তখন জোসেফের স্মৃতিগুলো মারিয়ামের সামনে এনে রাখেন। কল্পনায় সাজানো শিক্কায় ওই স্বপ্নের সংসারটা দেখেন মারিয়াম। স্মৃতির সাথে কথা বলেন। তাঁর জাতার শপ—ওখানে এখন একটা কফিশপ চালু হয়েছে। তিন সন্তান মিলে বিক্রি করে দেয়া বাড়িটাতে খালিল ইচ্ছে করেই আর যেতে চান না হয়তো। মারিয়ামকে নিয়ে খালিলের গাড়িটা আবার ওল্ড হোমের দিকে ফিরে যায়। এভাবেই খালিলের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকা মারিয়াম যেন একটা অন্য রকম জগত খুঁজে পান।
বছর ঘুরে নতুন বছরও প্রায় শেষ। ক্রিসমাস ছুটির কোনো এক দিনে একটা ঘটনা ঘটে। সেদিন ক্রিশ্চিনা মাকে দেখতে এলে মারিয়াম মেয়েকে চিনতে পারেন না। না, একেবারেই না। একে একে শ্যারবেল, অ্যানতোয়ান দুজনই মাকে দেখতে এল। মারিয়াম তিন সন্তানকেই আর চিনতে পারলেন না। খালিলের সাথে যোগাযোগ করা হলো। খালিল বললেন, ‘আরে এ আবার কোন ঘটনা! মা আবার সন্তান চিনে না কেমনে! আচ্ছা শোনো, এই শনিবার সকাল দশটায় তোমরা মায়ের কাছে আসবে, আমি থাকব।’
শনিবার খালিল সকাল নয়টার দিকেই চলে আসেন। মারিয়ামের আচরণে কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা না দেখে তিনি বিষয়টাকে সহজভাবেই নিয়েছিলেন। খালিলের সামনে মারিয়াম হয়তো এমনটা আর করবেন না। ওরা তিনজন যথাসময়ে চলে এলে দেখা গেল, ঘটনা আরও ভয়াবহ। না, মারিয়ামের তিনটা সন্তান যেন অচেনারও অচেনা। ক্রিশ্চিনা মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। খালিল ক্রিশ্চিনাকে আশ্বস্ত করেন—
এই মেয়ে চুপ থাকো। মারিয়ামের সাথে আমি কথা বলব। ঘটনাটা আসলে কী, তা আমাকে বুঝতে দাও।
ঠিক তখনই মারিয়ামের ছোট ছেলে অ্যানতোয়ান খালিলের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
তুমি তো বিশ্বাসই করতে চাও না, মায়ের ডিমেনসিয়া স্বাভাবিক পর্যায় পার হয়ে পুরোপুরি মানসিক রোগী হয়ে গেছে। নিজের সন্তান চেনে না! বুঝলে তো এখন?
শ্যারবেল তার ছোট ভাইয়ের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিল। এ দুই ছেলের মধ্যে মায়ের এই আচরণের প্রতিক্রিয়ায় তারা এটা প্রমাণ করে খুবই আনন্দিত যে, তাদের মা মানসিক রোগী। লোকসমাজে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার মতো মেন্টাল ফিটনেস তাঁর নেই। এ নারী কোনো পরিবারের সাথে থাকা তো আরও বিপজ্জনক। তাই মারিয়ামের জন্য ডাক্তার, নার্স আর নিরাপত্তাকর্মীদের সুপারভিসনে এই ওল্ড হোমে থাকাটাই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ।
খালিল চুপচাপ বসে শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ানের কথার ইঙ্গিত লক্ষ করেন। এদিকে ক্রিশ্চিনা মায়ের হাত ধরে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। মা সন্তানকে চিনতে পারছেন না, এর দায় মেন্টাল ইলনেসের। এখানে সন্তানদের কিছুই করার নেই। আ হা হা, বিশ্ব সংসার তখন খালিলের দিকে তাকিয়ে ইয়ার্কি করে। তাঁর শ্রবণে কী সব এলোমেলো শব্দ ভেসে আসে। কোথায় কোন গহিনে পথহারা শিশু যেন কাঁদে, মাকে খোঁজে। ঠিক তখনই তাঁর ইচ্ছে হয়, ইশ্, এখন যদি কোনো একটা উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কিছুক্ষণ কাঁদতে পারতাম, মনে হয় ভালো লাগত।’
এই শোনো, মারিয়াম তোমাদের মা। তোমাদের আচরণে কষ্ট পেয়ে না চেনার ভান করছেন, তা বোঝার মতো শক্তিটা পর্যন্ত হারিয়েছ তোমরা। অনুতপ্ত হয়ে মায়ের কাছে ক্ষমা না চেয়ে বরং উল্টা মাকে সাইকোপ্যাথ ভেবে খুশি মনে চলে যাচ্ছ—কথাগুলো বলতে গিয়েও খালিল নিজেকে সংযতই রাখলেন।
এ সময় মারিয়ামের চোখের দিকে তাকান খালিল। মারিয়ামও খালিলের দিকে একঝলক তাকিয়ে জানালা দিয়ে নিরুদ্দেশ আকাশের পানে চেয়ে রইলেন। এই দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শিক্কায় ঘটে যাওয়া ওই নির্মমতা যেন আবার এ দুজনের বুক কাঁপিয়ে গেল।
মারিয়াম একদিন বলেছিলেন, ‘খালিল, তুমি আর আমি একদিন শিক্কায় যাব। ভূমধ্যসাগরে ঢেউয়ে ঝলমল করা রুপালি জোছনা দেখব। পাহাড়ের গায়ে শুয়ে থাকা রোদ দেখব। আমার স্বামীর ভিটায় থাকব। আঙিনায় গাছ থাকবে, গাছের নাম হবে শ্যারবেল, অ্যানতোয়ান ও ক্রিশ্চিনা। আর বড় গাছটা, ওটা জোসেফ। বড় গাছটার পাশেই যে গাছটা থাকবে, ওটা কে জানো...’
মারিয়ামের মুখে হাসি। খালিল মারিয়ামের মুখ চেয়ে হাসেন।
তারপর বিকেলবেলায় ছাদে বসে সাগরের দিকে চেয়ে থাকব, চা খাব।
তুমি জানো খালিল, জোসেফ ভালো চা বানাতে পারে। আমাদের দেখে নীল সাগর কথা বলে উঠবে। আমাদের বাড়িটা একটু জীর্ণ হয়ে গেলেও আজও আছে। খালিল, তুমি অনেক ভালো মানুষ, আমাকে একদিন শিক্কায় নিয়ে যাবে?
খালিল করুণ দৃষ্টিতে মারিয়ামের দিকে চেয়ে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। দেশে যেতেই হবে, নইলে বাঁচব না তো।’
ক্রিশ্চিনা মারিয়ামের কাছে বসে আছে। শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ান খালিলের দিকে উপহাস অথবা বিদ্রূপ এমনই একটা দৃষ্টি দিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে খালিল এবার শিকারির গুলিতে আহত হরিণের মতো লাফিয়ে ওঠেন। আরবি-ইংলিশের মিশ্রণে কী সব লেবানিজ অশ্রাব্য গালাগালি শেষে মারিয়ামের মাথাটা বুকের কাছে টেনে বলেন—
এ রে শ্যারবেল, অ্যানতোয়ান, ভালো করে জেনে রাখিস, মারিয়ামকে আমার আপন বোন করে নিয়েছি। ভাবার কোনো কারণ নেই যে সে একা। তোদের যেন মারিয়ামের ফিউনেরালেও না দেখি।
হাত নেড়ে চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেয়ার ভঙ্গিতে খালিল আরও বললেন—
কথাটা মনে রাখিস।
মারিয়াম ডেইসিভিলের বাড়িতে যতদিন ছিলেন, ততদিন কিংসফোর্ড চার্চে ছিল তাঁর নিয়মিত আসা-যাওয়া। সেখানে কমবেশি সকলেই মারিয়ামকে চিনতেন। যেকোনো ফিউনেরাল, চার্চের সামনে কফিনবাহী কালো গাড়িটা দেখামাত্রই মারিয়াম দৌড়ে গিয়ে ফিউনেরালে যোগ দিতেন। কোথাকার কে মারা গেল, কার কফিন—এসব তাঁর মধ্যে কাজ করত না। অচেনা-অজানা মরে যাওয়া মানুষটার মায়ায় কেঁদে বুক ভাসাতেন তিনি। মারিয়ামের কান্না দেখে ফিউনেরালে অশ্রুজলে শোকের ছায়া নেমে আসত। ওই দৃশ্য আজও অনেকের চোখে ভাসে। আজ এই মারিয়ামের ফিউনেরাল ম্যাসে গুটিকয়েক লোকের মাঝে ক্রিশ্চিনার চোখের জলই সবাই দেখেছে। আরেকটা মানুষ, যাঁর চোখের জল পাথরচাপা পড়ে আছে, তিনি এই খালিল। আজ তাঁর এই রুদ্রমূর্তি—শ্যারবেলকে কিল-ঘুষি মেরে চার্চের সিঁড়িতে ফেলে দিয়েছেন। বিষয়টি দূর থেকে দেখে অ্যানতোয়ান এক দৌড়ে কোথায় পালিয়ে গেল, মায়ের ফিউনেরালে তার আর পাত্তা পাওয়া গেল না।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
হে জন্মভূমি মমতাময়ী হে রূপসী তব পাহাড় বুলন্দ ঝরনা তা সুন্দরী। তব নদ-নদী-নালা কত মর্মস্পর্শী গাছপালা সবুজ মাঠ ও তরুতরী; বসন্তের কোকিল ডাকত পাগলিনী করে, বর্ষার কালে ঝড় কালবৈশাখী উড়িয়ে নেয় যে ঘর গাছ সারি সারি। এসব প্রকৃতি দৃশ্য বিপুল হিতৈশী। এখানকার প্রকৃতি এত মায়াবিনী আমি দেখে বিমুগ্ধ সুন্দর দরশনি। তব শ্রী এত হৃদয়স্পর্শীক মোহিনী তুমি আমার জন্মভূমি হে ‘আমি ঋণী’। আমার চরম কৃতজ্ঞতা ও চরণে আমি জন্মগ্রহণ করেছি তোমাতেই।
আবার কিছু মানুষ গা ঘেঁষে চলতে চাইছে নানা ছুতো নিয়ে কখনো এই জামাটা নিয়ে কখনো হাঁটাচলা কথাবলা নিয়ে কখনো আবার পথসভায় বলা নিয়ে কখনো আমার কবিতা নিয়ে বলেনি কিছু; এই রবিবারের কাগজে আমার গল্প নিয়ে বলেনি কিছুই। বলছে কেবল আমার আড্ডার জায়গা নিয়ে আগে তো কখনোই বলেনি কোনো কথা হঠাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদী কথা শুনিয়ে দিল সেদিন আমি কেন পৈতা রাখিনি আজও সব বলব আমি এবার।
যেথায় ছিল ভুল তুমি ভিড়াইলে কূল জানি একদিন বুঝবে সেদিন আমায় খুঁজবে। পাবে নাকো আমায় রইব আমি শেষ ঠিকানায়। ফিরিঙ্গির নরক চাহিদায় আমি নরকে অবহেলায়। অঝোর কান্নায় নিশীথ রাতে ভাবি কেন পারলাম না আটকাতে।