Breaking news

হাম

শিশুর মৃত্যু, ভুল চিকিৎসা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি

কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। এখন কর্তব্য অবহেলাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া বা তার পক্ষে সাফাই গেয়ে তাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে সেটি নেহাতই অপপ্রয়াস। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের সামনে দাঁড়ানো সেই আয়না, যা আমাদের সিস্টেমের নগ্নতাকে রূঢ়ভাবে প্রকাশ করে। এ সত্যের দর্পণে আমরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসার মান, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও দেখতে পাই।   সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর এক নামি-দামি হাসপাতালে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের করুণ মৃত্যু চিকিৎসাব্যবস্থায় কথিত অবহেলা নিয়ে জনমনে আবারও একটি ভয়ংকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের এই তথাকথিত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটুকু নিরাপদ?   আভানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুরোনো শঙ্কাকে নতুন করে সামনে আনলেও এর সিলসিলা বহুকাল ধরে জারি রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর প্রসবব্যবস্থা, শিশুর অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং এ সম্পর্কে উদাসীনতা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। সিস্টেমের নগ্ন মারপ্যাঁচের খেসারত ইতোমধ্যে হামের মহামারির মধ্য দিয়ে দেশের অগণিত শিশু জীবন দিয়ে চুকিয়েছে। সেই রেশ মিটতে না মিটতেই আভানের ঘটনা জনমনে ভয়ংকর ধাক্কা দিয়েছে।   শিশুটির পরিবারের পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রয়োগে গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার নেগেটিভ ফল আসার পরও কেন শিশুটিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হলো, কেন তার শারীরিক অবস্থার প্রকৃত হালচাল পরিবারের কাছে গোপন করা হলো, এসব প্রশ্ন কেবল আভানের পরিবার নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারকেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া, মনে আতঙ্কের ঢেউ।   আভানের মৃত্যুর নেপথ্যে আসল কোন সত্য লুকিয়ে আছে, চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল কি না, শিশুটিকে দেয়া চিকিৎসা সিদ্ধান্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, এসবের জবাব কেবল সঠিক তদন্তেই উদঘাটন সম্ভব। তাই অভিযোগ সত্য ধরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও অন্যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য উদঘাটনের অধিকার। আর এই অধিকার জনগণের। জনগণের এই যৌক্তিক দাবিকে মাথা পেতে নিয়ে সঠিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করাই একটি দক্ষ রাষ্ট্র প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।   একজন রোগীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারের প্রথম স্বাভাবিক কৌতূহল হবে, ‘কেন?’ অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ‘কেন’র জবাব খুঁজে পাওয়ার পথ মোটেও স্বচ্ছ ও সরল নয়, বরং অস্বচ্ছতায় ভরা এক প্যাঁচালো গোলকধাঁধা। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, হাসপাতালের আইসিইউসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যক্তিদের মুনাফালিপ্সার মতো অভিযোগও আলোচনায় আসে।   প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক, চিকিৎসা কি কেবল সেবা, নাকি অধিকার? বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৬.৫, যা ২০২৪ সালে হ্রাস পেয়ে ৩০.৫ এ দাঁড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এই অগ্রগতি একই সঙ্গে আমাদের সামনে নতুন দায়িত্বের ভিত তৈরি করেছে। শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারা যদি প্রথম সাফল্য হয়, তবে তার পরের সাফল্য হবে নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা।   ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে প্রায় ২২। অর্থাৎ শিশুমৃত্যু কমলেও ঝুঁকি আজও রয়ে গেছে। তবে এই ঝুঁকি কেবল রোগের নয়, ব্যবস্থারও। ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অদক্ষতা, ওষুধের ভুল প্রয়োগ, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবারের কাছে গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক মানের সঙ্গে সম্পৃক্ত।   স্বাস্থ্যসেবা বলতে কেবল হাসপাতাল তৈরি করে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরে তোলাকে বোঝায় না। কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল বিষয় হলো সঠিক রোগ নির্ণয়, দক্ষ জনবল, যথাযথ চিকিৎসা প্রোটোকল, পর্যবেক্ষণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভুল হলে তার সঠিক জবাবদিহি।   চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানও আমাদের দেশের অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। ২০২৫ সালের ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫৪/১০০ এবং প্রায় ৪১.৭ শতাংশ মানুষ নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর আরেকটি বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রকাশনায় দেখা যায়, দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজেকেই বহন করতে হয়।   অতএব, মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সময় কেবল অসুস্থতার ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকির এক অদৃশ্য মানসিক বোঝাও বহন করে। একটি শিশুর চিকিৎসা ব্যর্থ হলে পরিবার কেবল সন্তানকে হারায় না, অনেক পরিবার একই সঙ্গে হারায় সঞ্চয়, ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়, এমনকি জীবনের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর্থিক বিনিময়ে যে চিকিৎসাসেবা আমরা পাই, তার সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, আস্থা ও মৌলিক অধিকার।   পৃথিবীর কোনো দেশেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে গরমিল একেবারেই নেই, এমন নয়। একজন চিকিৎসকও রক্তমাংসে গড়া মানুষ। রোগ নির্ণয়ে জটিলতা থাকতেই পারে। চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাও বলে, চিকিৎসাজনিত জটিলতা ও অবহেলা এক নয়। সুতরাং এগুলোকে ‘লেজে গোবরে মেখে’ এক করে দেখার সুযোগ নেই।   কোনো রোগী মারা গেলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসককে দায়ী করাও ভুল, আবার ভুল চিকিৎসা বা কর্তব্য অবহেলার অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও অগ্রহণযোগ্য। এই ধোঁয়াশা দূর করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো।   ২০২৬ সালের প্রকাশিত এক আইনবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে রোগীর পরিবারের কাছে তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চিকিৎসাজনিত অ্যাডভার্স ইভেন্ট প্রকাশের জন্য বর্তমানে সুস্পষ্ট স্ট্যাটুটরি ডিউটি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।   এখানেই এখন বিশেষভাবে ভাবতে হবে। রোগীর স্বজন তাদের সন্তান বা স্বজনের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে তার সঠিক জবাব পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ‘এটা জটিলতা ছিল’ অথবা ‘আমরা সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী করেছি’ বলে দায়সারা জবাব দিয়ে দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।   রোগীর পরিবারের সংশয় কাটাতে চিকিৎসার নথি, ওষুধের তালিকা, পরীক্ষার ফল, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা ও নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক অভিযোগ দাখিল করার পর কতটা সহজে, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিকার পাবেন?   শুধু অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়। গুরুতর চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নথি সংরক্ষণ এবং পরিবারের কাছে তা প্রদানের নিশ্চয়তা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, হাসপাতাল ও চিকিৎসকের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ, অবহেলা প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি মানে চিকিৎসকদের ভয় দেখানো নয়, বরং ভুলের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসার পরিবেশ তৈরি করা।   আমাদের মাঝে সামাজিক স্মৃতির এক অদ্ভুত সমস্যা বিরাজমান। একটি শিশু মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম নেয় ক্ষোভ। মানুষ বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। কয়েক দিন কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়। অতঃপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে ভুলিয়ে দেয়। হিসাবের খাতায় যোগ হয় কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু ওই সংখ্যার নেপথ্যে থাকে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।   আভান হয়তো কোনো পরিসংখ্যানের একটি অংশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরিবারের কাছে সে নিছক কোনো সংখ্যা নয়। সে ছিল একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী। এই আবেগটাকেই রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। হতে হবে সংবেদনশীল।   স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য বলতে কয়টি হাসপাতাল মাথা তুলেছে, কতটি অত্যাধুনিক আইসিইউ আছে, কতজন দক্ষ চিকিৎসক আছেন, শুধু তা দিয়ে সাফল্য বিচার করলে গোটা গণিতটাই ভুল হবে। এই সাফল্য পরিমাপ করতে হবে একজন সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা অকপটে বলতে পারছেন কি না এবং সত্য জানতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে কি না, তার ওপর।   একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে রোগীকে শুধু রোগী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হয়। আমরা চাইব, আভানের মৃত্যুর এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায় দ্রুত নির্ধারিত হোক। অভিযোগে অসততা থাকলে সেটিও সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠুক। তবে কোনো অবস্থাতেই সত্যকে যেন আরেকটি শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কবরের আঁধারে দাফন হতে না হয়। কারণ, আজকের প্রশ্নটি শুধু আভানের জন্য নয়, আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্য।   ‘হাসপাতালের ফটক পেরুলে একজন নাগরিক কি কেবলই চিকিৎসাটুকুই পাবেন, নাকি তার সঙ্গে নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারেরও ন্যায্য ভাগীদার হবেন?’ এ প্রশ্নের জবাব না মিললে অঢেল উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার মাঝেও প্রশ্নটি আমাদের উত্ত্যক্ত করেই চলবে, ‘আমরা কি তবে সব সময়ই শেষ অবধি কেবল হিসাবের খাতার এক মামুলি সংখ্যাই রয়ে যাব?’

অক্টোবর ৭, ২০২৬ 0
মুখগুলো

সন্ধ্যা ছয়টার ডাক্তার এখনো আসেনি। ঘড়িতে সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। হাসপাতালের করিডরে বসে আছি চেম্বারের ঠিক পাশে। সামনে লম্বা বেঞ্চ। বেঞ্চভরতি মুখ। প্রতিটি মুখ একটা গল্প। কেউ পড়ছে না, তবু পড়া যায়। বাম দিকে বৃদ্ধ লোকটা। হাতে পুরোনো একটা পলিথিন। ভেতরে রিপোর্ট। চোখ দুটো ফোলা। রাত জেগেছে বোধহয়। ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড় হয়েছে কি না, সেই হিসাব কষছে মনে মনে। ডাক্তার যখন বলবে ‘তিন লাখ লাগবে’, তখন মুখটা কেমন হবে, আমি আগেই দেখে নিচ্ছি। ডান দিকে একটা মেয়ে। বয়স কুড়ি হবে। কোলে ছয় মাসের শিশু। শিশুটা কাঁদছে না, চুপ। চুপ করে থাকাটাই ভয়ের। মেয়েটা বারবার ওড়নার আঁচলে মিশুর কপাল মুছছে। ঘাম নাকি জ্বর, বোঝা যায় না। মাঝখানে একটা লোক। হাতে মোবাইল। বারবার কাউকে ফোন দিচ্ছে, “ভাই, দুই হাজার ম্যানেজ করতে পারবা? ডাক্তার বলছে আজকের ভেতর জমা দিতে হবে।” ফোনের ওপাশে কী উত্তর আসে জানি না। লোকটার মুখটা আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে। আমি মানুষের মুখ পড়ি। এটাই আমার অভ্যাস। হাসপাতালে এলে বোঝা যায়, কষ্টের হাজার রকম রং আছে। সাদা বেডশিটের নিচে লুকানো থাকে লাল রক্ত, কালো দেনা, ধূসর অপেক্ষা। হঠাৎ করিডরে একটা নড়াচড়া। ডাক্তার এসেছেন। সাদা অ্যাপ্রোন, মুখে ক্লান্তি। রোগীর ঢল তাঁকে গিলে নেয়। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। আমার পালা আসবে। আমাকে বসিয়ে রেখে আমার স্বামী গেছে ওষুধ কিনতে। আমি মোবাইলের নোটপ্যাড খুলি। লিখতে চাই, কিন্তু চোখ আটকে যায় সামনের দৃশ্যে। হঠাৎ একটা আর্তনাদ। গগন বিদারি। ‘ও আমার সোনা! কথা ক সোনা! চোখ মেলা তাকা!’ হাসপাতালের ফ্লোর, দেয়াল, বাতাস, সব কেঁপে ওঠে। একজন মা। কোলে দুই-আড়াই বছরের শিশু। নিথর। চোখ বোজা। গায়ে লাল লাল গুটি। হামের গুটি। মায়ের চুল এলোমেলো, জামা ভেজা ঘামে। পাশে সম্ভবত বাবা। চোখ শুকনা। বাবারা কেঁদে ফেলতে পারে না, তাই তাদের কষ্টটাই সবচেয়ে ভারী হয়। মা বুক চাপড়াচ্ছে, ‘ও আমার জাদু, চোখ খোল বাবা। একবার মা বল। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শুধু তুই কথা ক।’ চারপাশে জমে যায় মানুষ। কেউ সান্ত্বনা দেয়, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয় কষ্টে।। সান্ত্বনার ভাষা ফুরিয়ে গেছে। আমি উঠে যাই। শুনি। কয়দিন ধরে জ্বর। সারা শরীর গোটায় ভরে গেছে। গ্রামের হাসপাতালে নিয়ে গেছে। বলেছে, ‘হাম’ হয়েছে, ওষুধ নাই। রেফার করে দিয়েছে শহরে। শহরের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। অক্সিজেন নাই, বেড নাই, ডাক্তার নাই, টিকা নাই — এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে মা-বাবার পা ক্ষয়ে গেছে। শেষে এই হাসপাতালে। ডাক্তার এসে নেড়ে দেখলেন। স্টেথোস্কোপ রাখলেন। মাথা নাড়লেন, “সরি। অনেক দেরি হয়ে গেছে, মৃত।” মা আবার চিৎকার করে ওঠে, “দেরি? কার দেরি? আমার পোলা তিন দিন ধইরা জ্বরে পুড়তেছে! তোমরা কী করছ? তিন দিন ধইরা এ হাসপাতাল, সে হাসপাতাল করতেছি। আজ কন সরি। বড় বড় হাসপাতাল সাজাইছেন, টিকা নাই, ওষুধ নাই? ও আল্লাহ আমার জাদুরে ফিরাইয়া দাও।” মায়ের কান্না কলিজা কামড়ে ধরছে। কেউ উত্তর দেয় না। আমি ফিরে আসি আমার বেঞ্চে। হাত কাঁপে। মোবাইলটা পড়ে যেতে নেয়। মনে পড়ে কাগজের খবর। সরকারি হিসাবেই ৪০০ শিশু মারা গেছে হামের টিকার অভাবে। ৪০০। সংখ্যাটা শুনতে ছোট লাগে, কিন্তু একটা মা যখন ‘ও আমার সোনা, জাদু বলে বুক চাপড়ায়’, তখন বোঝা যায়, ৪০০ মানে ৪০০টি করিডর, ৪০০টি আর্তনাদ, ৪০০টি মৃত ঘর। আরও শিশু মৃত্যুর পথে। আমার সামনের বেঞ্চে বসা বৃদ্ধ লোকটা এখনো পলিথিন চেপে ধরে আছে। তার ছেলের অপারেশন হবে। তিন লাখ টাকা। টাকা জোগাড় না হলে তার ছেলেও হয়তো এই করিডরেই নিথর হয়ে যাবে। ডান দিকের মেয়েটার শিশু সন্তানটি এখনো চুপ। মেয়েটা ফিসফিস করে দোয়া পড়ছে। মাঝের লোকটা ফোন কেটে দিয়েছে। মুখে হাসির মতো কিছু একটা টানছে। হয়তো ধার পেয়েছে। আমি বুঝি, হাসপাতাল শুধু রোগ সারায় না। এখানে মানুষের মুখ, মন প্রকাশ হয়ে যায়। অপারেশনের ভয়ে কাঁপা বাবা। ওষুধের টাকার অভাবে কুঁকড়ে যাওয়া মা। টিকার অভাবে মরে যাওয়া শিশু। দুঃখ-কষ্টের ব্যথায় নীল মা, বাবার ক্লান্ত মুখ। আর আমি, যে শুধু দেখছি, লিখছি অথচ কিছুই করতে পারছি না। ডাক্তার ডাকেন আমার নাম ধরে। আমি উঠি। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকাই। মা এখনো শিশুটাকে বুকে চেপে ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। বাবা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। আত্মীয়রা মাথা নিচু করে আছে। করিডরের বাতাস ভারী। অক্সিজেনের চেয়েও ভারী মানুষের নিশ্বাস। আমি চেম্বারে ঢুকি। ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন, কী সমস্যা? আমি বলতে পারি না। গলা আটকে আসে। আমার কেন আসা আমি ভুলে যাই। এই মুহূর্তে আমার সমস্যা তো আমার শরীরে না। আমার সমস্যা এই করিডরে। এই মুখগুলোতে। আমি শুধু বলি, ডাক্তার, মানুষ বাঁচান। ডাক্তার চশমা ঠিক করেন। ক্লান্ত হাসি দেন, “চেষ্টা করছি। আপনিও দোয়া করেন। মালিক আল্লাহ, আমরা নিমিত্ত মাত্র।” বাইরে বেরিয়ে দেখি, মা এখনো বসে আছে। শিশুটার ঠান্ডা হাত ধরে। আমি আর লিখতে পারি না। শুধু মনে মনে বলি, হে সিস্টেম, একটা টিকা কি খুব দামি ছিল? একটা শিশুর জীবনের চেয়েও? ৪০০/৫০০/১০০০ টিকার দামের চেয়ে?কোটি  কোটি টাকা নাকি একটা জীবন? সবকিছু ‘নিমিত্ত’ বললেই শেষ হয়ে যায়! ‘সিস্টেম’-এর কোনো দায় নেই? এই অকালে ঝরে যাওয়া শিশুরাই তো ছিল ভবিষ্যৎ। সিস্টেমের বলি এই শিশুরাই ছিল আগামী। এদের হাত ধরেই তো আগামী বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখত। হায় সিস্টেম!  

অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
স্মৃতিতে হুমায়ূন আহমেদ এবং বৃষ্টি বিলাস ও কদম ফুল

বাংলার সাহিত্যাকাশে হুমায়ূন আহমেদ এমন এক জাদুকর, যাঁর লেখার সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্ষা মানেই হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস, কদম ফুল, নীল শাড়ি আর এক অদ্ভুত উদাস করা নস্টালজিয়া। বৃষ্টিকে তিনি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঋতু হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে রূপ দিয়েছেন মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ ও অনুভূতির এক জীবন্ত ক্যানভাস হিসেবে।   হুমায়ূন আহমেদের নাটক বা উপন্যাসে বৃষ্টি নামলেই যেন গল্পের মোড় ঘুরে যায়। তাঁর চরিত্রগুলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসে, বৃষ্টির শব্দ শুনে আনমনা হয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টি মানেই নুহাশপল্লীর মাটিতে ভেজা সোঁদা গন্ধ। বৃষ্টির ফোঁটায় গাছের পাতার শব্দ আর চারপাশের সবুজ যেন পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।   হুমায়ূন আহমেদের অনেক চরিত্র বৃষ্টিকে একা উপভোগ করতে ভালোবাসে। বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় দিয়ে রিকশায় চড়া কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখার দৃশ্য তাঁর লেখায় অত্যন্ত কাব্যিক রূপ পেয়েছে। এ ছাড়া তাঁর জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর জীবনেও বর্ষা এক বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে।   হিমুর পরনে থাকে পকেট কাটা হলুদ পাঞ্জাবি। বৃষ্টিতে ভিজে হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে যখন হিমু হেঁটে বেড়ায় নিউমার্কেট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে, তখন সেই দৃশ্যটি হয়ে ওঠে বোহেমিয়ান ও রহস্যময়।   যুক্তিবাদী মিসির আলী হয়তো বৃষ্টির কাব্যিকতায় সঁপে দেন না নিজেকে, তবুও শরতের আকাশ বা আষাঢ়ের মেঘ তাঁর ভাবনার জগৎকেও কোথাও না কোথাও ছুঁয়ে যায়।   বৃষ্টি নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত কিছু অনুভূতি ও ভাবনা আমরা সবাই জানি। তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টিতে বৃষ্টি নিয়ে এমন কিছু পঙক্তি বা দৃশ্য পাওয়া যায়, যা আজও পাঠকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে : "বৃষ্টি কার ভালো লাগে না? সবার ভালো লাগে। তবে বৃষ্টির নিজস্ব একটা দুঃখ আছে। সেই দুঃখ সবাই বুঝতে পারে না।"   বর্ষার দিনে হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানেই ছিল এক কাপ গরম চা, টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ, যা মধ্যবিত্ত বাঙালির ড্রয়িংরুমের চেনার ছবি।   বাঙালির কাছে হুমায়ূন আহমেদ আর বর্ষা সমার্থক এক নাম। যত দিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, তত দিন আষাঢ়ের প্রথম কদম ফুল আর ঝুম বৃষ্টির শব্দে ঘুরেফিরে আসবে হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি করা সেই মায়াবী জগৎ, যেখানে বৃষ্টি মানেই একবুক স্মৃতিকাতরতা আর অন্য রকম এক ভালো লাগা।  

জুলাই ৩০, ২০২৬ 0
হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যু বাড়ছেই
হামের উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ জনে

সারা দেশে হাম এবং হামের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ জনে। ২৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১০৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৩০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৯৫টি শিশু। সব মিলিয়ে এই সময়ে মোট ৮২৫টি শিশু মারা গেছে। সারা দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৫। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৫৫৫ জন। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬৫৪ জন রোগী। চিকিৎসা শেষে এদের মধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার ৪৬৭ জন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে।

জুলাই ২৭, ২০২৬ 0
দেশে হাম ও উপসর্গে ৭৮০ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১৪ হাজার ছাড়াল

দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও একজনের প্রাণহানি এবং নতুন করে ১৪০ জনের রোগটি শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ২৪৪ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন। অধিদপ্তর জানায়, মৃতদের মধ্যে ৯৫ জন নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি ৬৮৫ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এছাড়া আলোচিত সময়ে এক লাখেরও বেশি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিলেও, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের বড় অংশই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0