আত্মহত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই আত্মহত্যার খবর চোখে পড়ে। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্ক—বিভিন্ন বয়সের মানুষ নানা ধরনের মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক সংকটে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিভিন্ন প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে আত্মহত্যাকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৬৪ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ১৯৪ জনই ছিলেন স্কুলশিক্ষার্থী। এ ধরনের তথ্য আমাদের শিক্ষা ও পরিবারব্যবস্থার পাশাপাশি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গভীরভাবে নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও আত্মহত্যার হার নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। ঝিনাইদহ তার একটি উদাহরণ। ১৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলার ছয় উপজেলায় গত এক বছরে ৩৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাকটিভিটিজের (সোভা) তথ্য অনুযায়ী, জেলাটিতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০০ মানুষ আত্মহত্যা করেন। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহে ৩,১৫২ জন আত্মহত্যা করেছেন এবং এ সময়ে প্রায় ২২,০০০ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলেও সংগঠনটির তথ্যের বরাত দিয়ে জানা যায়। আত্মহত্যার পেছনে কোনো একক কারণকে দায়ী করা যায় না। ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক সংকট, মাদকাসক্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সহিংসতার অভিজ্ঞতা কিংবা তীব্র মানসিক চাপ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তির মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা এর পূর্ববর্তী কোনো সংকেত দেখা দিলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া প্রয়োজন। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—আত্মহত্যাকে ব্যক্তির দুর্বলতা, কাপুরুষতা বা একক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। এর পেছনে অনেক সময় জটিল মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক সংকট কাজ করে। তাই সংকটে থাকা একজন মানুষের প্রয়োজন বিচার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি ও সহায়তা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তান বা পরিবারের সদস্যের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে। মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনতে হবে, উপহাস বা তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে। সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তার কাছে পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা, কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে আত্মহত্যার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে, যাতে সংবাদ পরিবেশন কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে পারস্পরিক সহমর্মিতা, মানবিকতা ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মাদকের বিস্তার, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য সামাজিক সংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আত্মহত্যা প্রতিরোধকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব। একজন মানুষ যখন গভীর সংকটে থাকেন, তখন তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁকে একা না রাখা এবং প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ তাই শুধু একটি জীবন বাঁচানোর উদ্যোগ নয়; এটি একটি সহমর্মী ও মানবিক সমাজ গড়ার দায়িত্বও।
ডেঙ্গু আমাদের কাছে আর নতুন কোনো রোগ নয়। প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা ডেঙ্গুর কথা ভাবি, মশা নিধন অভিযান দেখি, সচেতনতামূলক প্রচারণা শুনি। হাসপাতালগুলোতে বাড়ে রোগীর চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সতর্কবার্তা, বাসাবাড়িতে শুরু হয় মশারি, কয়েল ও স্প্রে ব্যবহারের তোড়জোড়। তারপর কিছুদিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু ডেঙ্গু ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে। বাংলাদেশে চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনক। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গুতে ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৯০-এ পৌঁছেছে। শুধু ২১ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টাতেই ১,৬৫৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটছে। ফলে ডেঙ্গুকে রাজধানীকেন্দ্রিক একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। প্রশ্ন হলো—প্রতিবছর একই সময়ে একই সংকটের মুখোমুখি হয়েও আমরা কেন স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারছি না? ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অনেকটা এমন হয়ে গেছে, যেন আগুন লাগার পর আমরা শুধু আগুন নেভানোর চেষ্টা করছি; কিন্তু আগুন লাগার কারণটি দূর করছি না। রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসা দেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার আগেই প্রশ্ন করতে হবে—যে পরিবেশে এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে, সেটি আমরা কেন তৈরি হতে দিচ্ছি? একটি ছোট প্লাস্টিকের পাত্রে জমে থাকা পানি, ছাদের টবে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনের পানি কিংবা অযত্নে পড়ে থাকা কোনো পাত্র—এসবই এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল। অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু হাসপাতালের বিছানায় হয় না; যুদ্ধটা শুরু করতে হয় আমাদের বাড়ির বারান্দা, ছাদ, রাস্তার পাশ, নির্মাণস্থল, ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, মানুষের চলাচল এবং অপর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গু কেবল একটি ভাইরাস বা একটি মশার গল্প নয়। এটি পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানুষের আচরণের সম্মিলিত প্রতিফলন। আমাদের আরেকটি বড় ভুল হলো—ডেঙ্গুকে কেবল ‘মশার কামড়ের রোগ’ হিসেবে দেখা। বাস্তবে এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। একজন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শুধু একজন রোগী আক্রান্ত হন না; একটি পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। একজন কর্মজীবী মানুষের কয়েক দিনের অসুস্থতা পরিবারের আয় কমিয়ে দিতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে। আর একজন মানুষের মৃত্যু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই ডেঙ্গুর পরিসংখ্যানকে শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। ১৯০টি মৃত্যু মানে ১৯০টি পরিবারের শোক। ৬৩ হাজারের বেশি হাসপাতালে ভর্তি মানে হাজার হাজার পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। তবে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোও সমাধান নয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই যে গুরুতর অবস্থা হবে, তা নয়। কিন্তু অবহেলারও সুযোগ নেই। জ্বর হলে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে, রোগের গতিপ্রকৃতি ও সতর্কতামূলক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। কারণ, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সময়মতো শনাক্তকরণ, সতর্কতামূলক লক্ষণ চিহ্নিত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে চিকিৎসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসকরাও একা এ যুদ্ধ জিততে পারবেন না। একজন চিকিৎসক রোগীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন, হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে পারে, কিন্তু বাইরে যদি প্রতিদিন নতুন নতুন এডিসের প্রজননস্থল তৈরি হয়, তাহলে হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে না। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু অভিযান চালিয়ে, মাইকিং করে কিংবা কয়েক দিন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন নিয়মিত মশার উপস্থিতি ও প্রজননস্থল পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থলে দায়িত্বশীলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘Integrated Vector Management’-এর ওপর গুরুত্ব দেয়—অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধন নয়; একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের মশার সংস্পর্শ কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে নাগরিকের ভূমিকাও কম নয়। নিজের বাসার আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা কোনো ছোট কাজ নয়। ছাদে, টবে বা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদে পানি জমে থাকলে তাকে সতর্ক করাও দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ-মন্দির, বাজার, অফিস, কারখানা ও নির্মাণস্থল—প্রতিটি জায়গাকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অংশ হতে হবে। WHO-এর সাম্প্রতিক বাংলাদেশভিত্তিক আলোচনাতেও সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য খাত ও জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা হাসপাতাল নয়—আমাদের নিজেদের ঘর ও আশপাশের পরিবেশ। আজ যদি আমরা শুধু রোগী গুনতে থাকি, আগামীকাল সংখ্যাটা আরও বড় হতে পারে। কিন্তু আজ যদি প্রতিটি সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করি, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াই, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করি এবং চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিই, তাহলে ডেঙ্গুর বোঝা কমানোর বাস্তব সুযোগ রয়েছে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে শুধু মশার বিরুদ্ধে নয়; এটি আমাদের অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধেও একটি যুদ্ধ। একটি এডিস মশা খুবই ছোট। কিন্তু সেই ছোট মশার জন্য যদি আমাদের অবহেলা বড় হয়ে ওঠে, তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, শুধু সিটি করপোরেশনের নয়, শুধু চিকিৎসকেরও নয়। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু—‘কতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো?’—এটা নয়। প্রশ্ন হলো—পরবর্তী রোগীটি যেন আক্রান্ত না হন, তার জন্য আমরা আজ কী করলাম?
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার কামড়ে হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুসংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জাতীয় দৈনিক স্টার নিউজ গত ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রন্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন; মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৭৫ এবং ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১৩,০৯৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ৪৩ জন মারা গেছে। শুধু জুলাই মাসের প্রথম ২৬ দিনেই ৬,৬৯৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছে ২৫ জন। চলতি বর্ষা মৌসুমেও ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই মহামারি থেকে বাঁচতে কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে একযোগে কাজ করতে হবে। একই সাথে ডেঙ্গু লক্ষণ ও সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউএস সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের অফিশিয়াল গাইডলাইন অনুযায়ী ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান ও প্রাথমিক লক্ষণসমূহ হচ্ছে ক) এডিস মশার কামড়ের ৪-১০ দিন পর সাধারণত ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দেয়। এর অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো আকস্মিক ১০৩-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তীব্র জ্বর, চোখের পেছনে ও হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে লালচে র্যাশ। খ) জ্বর কমে যাওয়ার ৩-৭ দিন পর রোগীর অবস্থা বেশি আশঙ্কাজনক হতে পারে। পেট ব্যথার সাথে অবিরাম বমি, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট এবং অত্যন্ত ক্লান্ত বোধ করা ডেঙ্গুর প্রধান বিপদচিহ্ন। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানের ডেঙ্গু অনেক বেশি ছদ্মবেশী। তাই এই বিপদচিহ্নগুলো দেখা দিলে তা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের পূর্বাভাস দেয়, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় ১. উৎস নিধন : কীটতত্ত্ববিদ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, এডিস মশা সরাসরি পানির ওপর ভাসমান অবস্থায় ডিম পাড়ে না, তারা সাধারণত যেকোনো কৃত্রিম বা প্রকৃতিক পাত্রের ভেতরের ভেজা দেয়ালে জলরেখার ঠিক ওপরে ডিম পাড়ে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, টায়ার বা ডাবের খোসায় যেন ৩ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তাহে কমপক্ষে একবার বাসাবাড়ির আঙিনাসহ মশার প্রজননস্থলগুলো পরিষ্কার করা আবশ্যক। ২. ব্যক্তিগত সুরক্ষা : এডিস মশা মূলত দিনের বেলা বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে কামড়ায়। তাই এ সময় হালকা রঙের এবং শরীর ঢাকা লম্বা পোশাক পরিধান করা উচিত। ঘুমানোর সময় (এমনকি দিনের বেলাতেও) মশারি ব্যবহার করা এবং উন্মুক্ত ত্বকে মসকুইটো রিপেলেন্ট বা মশা তাড়ানোর ক্রিম ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। ৩. সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা : কেবল নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই চলবে না। নির্মাণাধীন ভবন, স্কুল, কলেজ, অফিস ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে। এ জন্য স্থানীয় কমিউনিটির সবাইকে নিয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা যেতে পারে। ৪. সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা : প্রশাসনকে কেবল লার্ভিসাইড বা ফগিং স্প্রে করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বৈজ্ঞানিক উপায়ে মশার হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ৫. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল তাদের নির্দেশিকায় জানিয়েছে, ডেঙ্গুর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা কার্যকর বৈশ্বিক ভ্যাকসিন না থাকায় মশার কামড় থেকে নিজেকে বাঁচানো এবং মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করাই এর একমাত্র কার্যকর উপায়। ৬. স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। জরুরি চিকিৎসা নির্দেশনা রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রেখে ডাবের পানি, ইউনি স্যালাইন, লেবুর শরবত ও স্যুপ জাতীয় প্রচুর তরল খাওয়াতে হবে। জ্বরের জন্য কেবল প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ানো যাবে না, কারণ এগুলো অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জ্বরের শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে CBC & Dengue NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করানো উচিত। পরিশেষে বলা যায়, ডেঙ্গু কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন না হই, তাহলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। সুতরাং সকলে নিজেদের চারপাশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখি এবং সচেতন হই, তবেই একটি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবমুক্ত সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য একটি বিশেষ মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার কনস্যুলেট জেনারেল, দুবাই এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি, আজমানের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় আমিরাতের আইন-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। দুবাই ও উত্তর আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামান সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আমিরাতের প্রচলিত বিধি-বিধান এবং স্থানীয় রীতি-নীতি যথাযথভাবে অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়া প্রবাসীরা তাদের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও বিভিন্ন সেবা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পান এবং কনস্যুলেট প্রতিনিধিরা এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। সভায় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী অংশ নেন।
অতি সম্প্রতি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলা বড় ধরনের মানবিক সংকটে পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু জনপদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়েছে। প্রতিটি বড় ভূমিকম্পের মতো এই বিপর্যয়ও আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—প্রকৃতি কখনো আগাম সতর্ক করে না; কিন্তু প্রস্তুতির অভাবের মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে। সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কয়েক সেকেন্ডের একটি ভূমিকম্প বহু বছরের উন্নয়ন, পরিশ্রম ও স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করলেও ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও তীব্রতা এখনো নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই ভূমিকম্প মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো দুর্যোগ-পরবর্তী তৎপরতার চেয়ে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দেয়া। ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করেছে, ভূমিকম্পে প্রাণহানির প্রধান কারণ কেবল ভূকম্পন নয়; বরং দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণে অনিয়ম এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি। একই মাত্রার ভূমিকম্প দুটি দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কোথাও হাজারো মানুষের মৃত্যু ঘটে, আবার কোথাও ক্ষয়ক্ষতি সীমিত থাকে। এই পার্থক্যের নাম প্রস্তুতি। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করেছে। অনেক ভবন আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল নকশায় নির্মিত নয়। কোথাও উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতি, কোথাও চিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতা, আবার কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়েছে। ফলে ভূমিকম্পের প্রাথমিক আঘাতের পাশাপাশি দ্বিতীয় পর্যায়ের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগের পর যত দক্ষ উদ্ধার অভিযানই পরিচালিত হোক না কেন, দুর্যোগের আগে যথাযথ প্রস্তুতির বিকল্প নেই। বিশ্বের কয়েকটি দেশ এই শিক্ষা অনেক আগেই গ্রহণ করেছে। জাপান তার অন্যতম উদাহরণ। ভূমিকম্প সেখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা, তবু তুলনামূলকভাবে প্রাণহানি কম। কারণ দেশটি কঠোর ভবন নির্মাণবিধি, উন্নত প্রকৌশল প্রযুক্তি, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে একটি দুর্যোগ-সহনশীল সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। শিশুরা স্কুলজীবন থেকেই ভূমিকম্পের সময় করণীয় শেখে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করে এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। চিলিও কঠোর নির্মাণনীতি ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একই ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো না গেলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ মূলত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ; তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বাস্তবে এই ধারণা বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের প্রভাবাধীন অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতীতের একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প সেই বাস্তবতারই সাক্ষ্য বহন করে। ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও আমাদের প্রস্তুতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, ঘনবসতি, দুর্বল তদারকি এবং আইন বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা সম্ভাব্য একটি ভূমিকম্পকে জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে। রাজধানী ঢাকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই মহানগরে অনেক এলাকায় ভবনের মধ্যবর্তী দূরত্ব অত্যন্ত কম। একটি ভবন ধসে পড়লে পাশের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংকীর্ণ সড়ক, তীব্র যানজট, উন্মুক্ত স্থানের অভাব এবং জটিল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই চিত্র কমবেশি চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য বড় শহরেও বিদ্যমান। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা থাকলেও বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় না। কোথাও অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা হয়, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও অনুমতির বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়। এসব অনিয়ম শুধু আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস। একটি বড় ভূমিকম্পে এসব ভবনই ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে। অবকাঠামোর পাশাপাশি জনসচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবেলায় সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এখনো সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে লিফট ব্যবহার করেন, সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি করেন কিংবা গুজবের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। অথচ অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়া অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করতে পারে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে অন্তত দুবার ভূমিকম্প মহড়া, নিরাপদ নির্গমনপথের অনুশীলন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও বিপণিবিতানেও নিয়মিত দুর্যোগ মহড়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্যোগ প্রস্তুতি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জীবন রক্ষার একটি কার্যকর উপায়। প্রযুক্তিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইলভিত্তিক জরুরি সতর্কবার্তা, ডিজিটাল মানচিত্র, ড্রোনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধের ব্যবস্থা উদ্ধারকাজকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে। একই সঙ্গে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর জন্য আধুনিক সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত যৌথ মহড়া নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা গেলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। দুর্যোগ প্রস্তুতিতে নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি পরিবারের একটি জরুরি পরিকল্পনা থাকা উচিত। একটি ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থল নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি। এসব প্রস্তুতি ছোট মনে হলেও সংকটের সময় জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বিশ্বের সামনে একটি সফল উদাহরণ স্থাপন করেছে। আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে হাজার হাজার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায় যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কঠোর বাস্তবায়ন থাকলে ভূমিকম্প প্রস্তুতিতেও একই ধরনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। প্রকৌশলী যখন নিরাপদ নকশা প্রণয়ন করেন, ঠিকাদার যখন মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেন, স্থানীয় প্রশাসন যখন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে, শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীদের সচেতন করেন, গণমাধ্যম যখন তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং সাধারণ মানুষ যখন নিজ নিজ পরিবারকে প্রস্তুত করে, তখনই একটি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে—প্রকৃতিকে থামানো যায় না, কিন্তু প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। তাই এটি শুধু দূরদেশের একটি সংবাদ নয়; বাংলাদেশের জন্যও একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভবন নির্মাণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতিকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সচেতনতা জোরদার করার এখনই উপযুক্ত সময়। ভূমিকম্প কোনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। কিন্তু প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ আমাদের হাতে আজই রয়েছে। আমরা যদি অন্য দেশের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি এবং এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিই, তাহলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগে অসংখ্য প্রাণ ও বিপুল সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে। ভেনেজুয়েলার ধ্বংসস্তূপ তাই কেবল একটি দেশের ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি জাগরণের আহ্বান। আজকের দূরদর্শী সিদ্ধান্তই আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হতে পারে।
সম্প্রতি নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই ক্ষুদ্র দেশগুলোর জনতা বর্তমানে আর পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সন্তুষ্ট নয়। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন, পরিবর্তন, স্বচ্ছতা, সাথে জনতার অংশগ্রহণের সুষম একটি রাজনৈতিক চর্চার জন্য উপাদানগুলোর যথাযথ সংমিশ্রণ ও ফলাফলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে তারা এখন আগ্রহী। মানুষ এখন তথাকথিত গতানুগতিক রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে। সেই সাথে নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবির পাশাপাশি শিক্ষা, সচেতনতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যপাঠ ও চর্চার বিষয়টিকেও তারা সমান্তরালভাবে রাজনীতির চিন্তা-চেতনার সাথে গ্রথিত করে নিচ্ছে। প্রচলিত যেকোনো ন্যারেটিভের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরাশক্তির নিকট বশ্যতা অস্বীকার করে নিজ রাষ্ট্রকে এক সমুন্নত মর্যাদায় উন্নীত করতে জনগণ এখন অনেক সোচ্চার। আর গণ-আন্দোলনের পরে পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে। নেপালে যেখানে তরুণ প্রজন্মের উত্থান কেবল দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনে সন্তুষ্ট না থেকে একে আধুনিক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার শপথ নেয়, অপরপক্ষে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র একটি দেশ হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে৷ ইতোপূর্বে বিদেশি প্রভাব দেশীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করলেও বাংলাদেশে সেটি বর্তমানে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রথার ওপরও প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার আন্দোলন প্রমাণ করেছে, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ কোনো সরকারের জনতার হাতে পরাস্ত হওয়াটাই নিয়তি। একটি দেশের অর্থনীতি ধসে পড়লে প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতাটাও গুঁড়িয়ে যায়। এদিকে আফগানিস্তানে আলোকপাত করলে দেখা যায়, তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানকার নিপীড়িত, নিমজ্জিত জাতির মাঝেও অসন্তোষ ও দাবিদাওয়া বিদ্যমান, যদিও প্রকাশের সুযোগ সীমিত৷ ক্ষুদ্র এসব রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক রাজনীতির সাথে বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ রচিত হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক সব পটভূমিকে কেন্দ্র করে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত রাজনীতির প্রতিযোগিতাকে প্রখর করে তুলছে৷ ভারতের সাথে নেপালের ঐতিহাসিক একটি ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকলেও এখন চীনের সঙ্গে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দেশটির পরিবর্তিত রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে৷ পক্ষান্তরে বাংলাদেশের চব্বিশের অভ্যুত্থান একটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি জনগণের একটি সংরক্ষক মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে, যাতে করে নিজ কূটনৈতিক স্বার্থে এতিহাসিক দ্বন্দ্ব ভুলে পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ককে বেগবান করতে চাইছে। (সম্প্রতি পাকিস্তানে ভিসামুক্ত সুবিধা, সরাসরি সমুদ্র ও বিমান যোগাযোগ সুবিধাসহ দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাঝে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক এমন ইঙ্গিতই বহন করে) শ্রীলঙ্কায় ধসে পড়া পলিটিক্যাল দৃশ্য বদলাতে ভারত এগিয়ে আসা সত্ত্বেও সেখানে চীন তার শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করছে৷ চীনের এই কৌশলগত ও বিনিয়োগনীতি একইভাবে প্রভাবিত করছে পাকিস্তান, নেপালসহ বাংলাদেশেও। তবে আফগানিস্তানে সৃষ্ট পরিবর্তনকে পাকিস্তান অনেকটাই অস্বস্তির চোখে দেখে। যেহেতু এশিয়ার একটি শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক প্রভাব সেখানে বিদ্যমান। সে কারণে পাকিস্তান এটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখে আসছে। ফলে আফগানিস্তানের যেকোনো পরিবর্তন স্পষ্টতই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি আলোড়ন তোলে৷ সংগঠিত সব রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন এটাই সব সময় প্রমাণ করে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার নিমিত্তে। যুগে যুগে সংগঠিত বিপ্লবগুলো প্রমাণ করেছে, ইতিহাস পরিবর্তনের লাগামটা মূলত জনতার হাতেই থাকে। আর বিক্ষোভ বিপ্লবে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির রূপটাই বদলায় না, বরং আঞ্চলিক ও বিশ্বের বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করে নিজ রাজনীতির কৌশলকে নতুন করে সাজিয়ে নিতে। কৌতূহলে জেগেই ওঠে এসব পরিবর্তন মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন খাতে প্রভাবিত করবে? এটা তো স্পষ্ট, সব দেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার। কোনো প্রকার ন্যারেটিভ চাপানো কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার তারা মানতে নারাজ৷ উদাহরণ স্বরূপ, বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ আরও কিছু দাবি আদায়ে উত্তাল তরুণদের নতুন শক্তির উত্থান ও ক্রমবিকাশ এর আরও একটি প্রমাণ। সুতরাং, প্রমাণিত জনগণের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ কোনো দেশের সরকারেরই নেই৷ আবার এই আন্দোলনগুলো বড় শক্তির রাষ্ট্রের ভূমিকাগুলোকে ক্রমেই জটিল করে তুলবে। ভারত যেখানে ঐতিহ্যের প্রভাব বলয় ধরে রাখতে নিরাপদ সীমান্তের নিশ্চয়তা নিতে চাইবে নিজের আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে, সেখানে পাকিস্তান চাইবে মিত্র দেশগুলোর সাথে ইতিবাচক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে। এদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই শূন্যতায় প্রভাব বিস্তারে তৎপর থাকবে। চীন যেখানে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে মনোযোগী হবে, সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হবে এবং ইসলামি ঐক্যের সমর্থন জড়ো করতে পরিশ্রম করবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এই বহুমাত্রিক ভূরাজনীতিতে এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি এশিয়া ক্রমশ বৈশ্বিক শক্তির অদৃশ্য প্রতিযোগিতার সেন্টার পয়েন্ট হিসেবে দাঁড়াবে৷ জলবায়ুর পরিবর্তন তথা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অভিবাসনও আগামীর সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সহযোগিতা ও বিরোধের জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীসমূহের পানি বণ্টন প্রশ্নে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরির প্রবল সম্ভাবনা বিদ্যমান৷ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা আসন্ন। সাইবার নিরাপত্তা, এআইভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি, সমুদ্র নিরাপত্তা আগামী দিনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। ভারত মহাসাগরে কৌশলগত গুরুত্বের উত্থানে বিভিন্ন দেশের সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনাও কম নয়, যা একদিকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও অন্যদিকে প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করবে৷ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সামনে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ তথা নিরাপত্তাহীনতা এমন সম্ভাবনার সম্মুখে প্রতিবন্ধক স্বরূপ৷ সব বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিবর্তিত ভূরাজনীতি ভবিষ্যতে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরির সঙ্গে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও গড়ে তুলবে৷ এই অবস্থায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য দরকার সুস্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের ওপর৷ মনে রাখা জরুরি, এই বৃহৎ অঞ্চলের জনগণ এখন কেবল দর্শক নয়, বরং তারা রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার দক্ষ সৈন্যবহর৷ তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার কায়েম করা৷ নচেৎ যেকোনো বৃহৎ পরিবর্তন ঘটানো কেবলই সময়ের ব্যাপার৷ অতএব, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ওপরও নির্ভরশীল৷ দক্ষিণ এশিয়ার আগামীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধ আজকের ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপরই গড়ে উঠবে৷ অতএব, ছক সাজাতে হবে ভেবেচিন্তে; বিরোধ নয়, বরং পারস্পরিক রাষ্ট্রের সম্মান ও সম্প্রীতির বার্তার ওপর ভর করে৷
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।