বিয়ে মানুষের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় । আমরা কমবেশি সবাই বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন দেখি । স্বপ্ন দেখি নিজের একটা সংসারের। একজন জীবনসঙ্গীর। যাকে নিজের জমানো সবটুকু ভালোবাসা দেয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করে ভালোবাসা, আদর, যত্ন , ভক্তি দিয়ে স্বামীর মন জয় করতে। ছোট থেকে তাঁদের ভেতর যে সংসারের স্বপ্ন বেঁধে দেয়া হয়, সেই স্বপ্নের সংসার বাস্তবে গড়ে তুলতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের আপ্রাণ চেষ্টা থাকে সুন্দর সাজানো গোছানো একটা নিজের সংসারের। সম্পূর্ণ নিজের সংসার। আর তাই তো স্বামী সে যেমনই হোক মেয়েরা মানিয়ে চলতে চেষ্টা করে। সংসার টিকিয়ে রাখতে, সুখী দাম্পত্য জীবন গড়তে দিনরাত এক করে ফেলে । তাদের একটাই লক্ষ্য থাকে স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাকা। কোনো মেয়ে প্রথম চড় বা থাপ্পড় খেয়ে ডিভোর্স দিতে যায় না। না বিচার সালিস বসায়। স্বামীর দেয়া প্রথম অপমানে সে অবাক হয় ঠিকই, কিন্তু সে স্বামীর নয়, বরং নিজের ভুল খুঁজতে শুরু করে। স্বামীর দেয়া প্রতিটি চড় খেয়েও সে নিজেরই দোষ খুঁজে নেয়। সংসারে প্রতিনিয়ত যে অর্থনৈতিক শোষণ চলে, সেগুলো সে নিজের সমস্যা বলেই মনে করে। বিবাহিত নারীদের কিন্তু ভীষণ লজ্জা লাগে স্বামীর কাছে হাত পাততে । সন্তানদের বেতন, টিউশন ফি, নিজের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিংবা স্যানিটারি ন্যাপকিন সবই তার জোগাড় করতে হয় । স্বামীর কাছে টাকা চাইতে গিয়ে যাতে আর অপমানিত হতে না হয়, তাই নারী নিজে আয়-রোজগার শুরু করে, নয়তো বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনে। টানাটানির সংসার কিংবা বদমেজাজি স্বামীর সংসার ইচ্ছে করলেই মেয়েরা ভেঙে দিতে পারে , কিন্তু পারে না । কারণ সংসারে নারীর ইনভেস্টমেন্ট থাকে সবচেয়ে বেশি। তাই সংসার ভাঙলে নারীই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া নিজের কষ্ট আর শ্রম খরচ করে যে সংসার সে গড়ে তুলেছে, তা কীভাবে ছেড়ে চলে যাবে? শুধু নিজের গড়া সংসারের মায়ায় কত নারী সংসার করে যায়! তা ছাড়া সংসার ছেড়ে চলে গেলে লোকে তো তাকেই দোষ দেবে। তার কোথায় কোথায় সমস্যা, সেই আলোচনায় মুখর হবে। গল্প চলবে পেছনে । কত রং মাখিয়ে কথা বলবে! যেন খারাপ স্বামী কপালে জুটেছে, সেটাও তারই দোষ । তার লোভের ফল। পাপের কারণ। আর তাই সেই লোভের ফল বা পাপের শাস্তি হিসেবে সে সংসার করে । আর যখন আর সহ্য করতে পারে না, তখন আত্মহত্যা করে। না হয় নিজের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, যত্ন সব হারিয়ে মৃত মানুষ হয়ে বেঁচে থাকে । শুধু হাতে গোনা দৃ-একজন নিজেকে বাঁচাতে সব বাধা ভেঙে ডিভোর্স নেয়। কখনো কি ভেবেছেন কেন নারী যৌবনের চমৎকার সময়গুলো একটি মাত্র পুরুষের সাথে কাটিয়ে কেন চুল পাকিয়ে ডিভোর্স নেয়? কেন সে নিজের এত শখের সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসে? দিন মাস বছর ধরে এত পাহাড়সমান ধকল সামলাতে সামলাতে কি নারীর মনে হতে পারে না, না অনেক হয়েছে এবার একটু বিশ্রাম নিই? অধিকাংশ ক্লান্ত বিধ্বস্ত নারী তার টক্সিক, মরে যাওয়া, পচে যাওয়া দাম্পত্য জীবন থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না। কারণ, তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই কিংবা ভয়। সমাজ আর পরিবারের ভয়ে সে বেরিয়ে আসতে পারে না । তাই তারা তাদের অবস্থানে থেকে নিজেদের ভালো ও সুখী রাখতে ব্যস্ত থাকে। তার মানে এই না যে যারা আছে তারা সফল, যারা বেরিয়ে গেছে বা ডিভোর্স হয়েছে তারা ব্যর্থ! কেউ যদি পাশে থেকেও কাছের মানুষ না হয়, সাথে থেকেও সহযোগিতা না করে, মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে, মনের যত দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়, এমন সঙ্গী নিয়ে কেন পথ হাঁটতে হবে? কাউকে পাল্টানো চেষ্টা না করে নিজের পথ পাল্টে নেওয়াটাই উত্তম। জীবন তো একটাই, যে যেভাবে পারে সুন্দর করে গুছিয়ে যাপন করুক। যার বিয়ে করতে ভালো লাগে, সে বিয়ে করুক। যার ইচ্ছে নেই সে একা থাকুক । যার সংসার ভালো লাগে, সে সংসার করুক। যিনি ক্লান্ত, তিনি বিশ্রাম নিন। আপনার ভাগের জীবন আপনি যাপন করুন। অন্যদেরও তাদের জীবন যাপন করতে দিন। নারী হলে অন্য নারীদের পাশে দাঁড়ান। কারোর দুঃখ দেখে হাততালি না দিয়ে সহানুভূতিশীল হোন। নিজেদের মন পরিষ্কার রাখুন। নিজেকে ভালোবাসুন। ভালো রাখুন। সুন্দর করে গুছিয়ে রাখুন।
আকাশে রঙিন ভোরের আভা মেখে যখন গ্রাম জেগে ওঠে, তখনই মেঠোপথে দেখা মেলে বাউল` জয়নালের। কাঁধে ঝোলা, হাতে একতারা, চোখে যেন অন্য দুনিয়ার আলো। তার হাঁটা যেন গানের তালে বাঁধা, তার নিশ্বাসে লুকিয়ে থাকে শত শোক-সুখের সুর। সে গাইতে থাকে লালন ফকিরের বিখ্যাত গান- মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।। গান ধরলেই মনে হয়, বাতাসও যেন থমকে শোনে। লোকজন জয়নালকে ডাকে ‘ছন্নছাড়া’, কেউ বলে ‘পাগল’, কিন্তু তার গান শোনার পর বোঝা যায়—সে একজন বিরহের প্রেমিক, আবার মুক্তিরও ফেরিওয়ালা। জয়নালের জীবনটা এমন ছিল না। একসময় তারও ছিল সংসার, ছিল প্রিয়তমা আসমা জান। আসমা জানের চোখে ভরপুর ছিল স্বপ্ন। ছিল ধানের একচিলতে উঠোন। সন্ধ্যায় আসমার হাতের রান্নার সুস্বাদু ম-ম ঘ্রাণে ঘর ভরে যেত। কিন্তু জয়নালের বুকে হঠাৎই জন্ম নিল অদ্ভুত তৃষ্ণা। গানের সুরে মানুষের মন খোঁজা, আত্মার দর্শন মিলা। সংসারের চার দেয়ালে বন্দী তার ভালো লাগল না। এমনকি আসমার ভালোবাসার আঁচলও তাকে বেঁধে রাখতে পারল না। এক রাতে বৃষ্টি ঝরছিল। আসমা জান নাইওর এসেছিল বাপের বাড়ি। সাথে স্বমী জয়নালও। গভীর রাত। বাইরে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। আসমা জান ঘুমিয়ে ছিল। আর জয়নাল নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল দোতারা হাতে। ঝোড়ো হাওয়ার মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “হে অদৃশ্য সৃষ্টির মালিক, আমি কি তোমার কাছে পৌঁছাতে পারব?” বাতাসে যেন প্রতিধ্বনি ভেসে এলো, “পথে নামলেই পথ খুলে যায়।” দিন যায়, বছর যায়। জয়নালের গান ভেসে ওঠে নদীর ঘাটে, গঞ্জের হাটে, মেলার মাঠে আর লঞ্চ-স্টিমারে। তার সুরে প্রেম আর বিরহ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। একবার মেলার আখড়ায় গাইছিল সে। ভিড়ের মাঝে এক তরুণ এসে জিজ্ঞেস করল, “বাউল ভাই, এত ঘুরে বেড়ান কেন? ঘর-সংসার ছেড়ে মানুষকে ভালোবাসা যায় না? সংসার করতে ইচ্ছে হয় না৷ নাকি সংসার নাই? ঘোলে কি আর দুধের স্বাদ মিটে? গান বাজনা মনের খোরাক। আর সংসার হলো বেঁচে থাকার খুঁটি। সেই খুঁটি ভেঙে গেলে জীবন পানসে হয়ে যায়। তরুণের তাত্ত্বিক কথা শুনে জয়নাল হাসে। মনের কোণে একটা ব্যথা চিন চিন করতে থাকে। বছর পাঁচ হয় স্ত্রী আসমা জানকে ঘুমে রেখে ঘর ছেড়েছে। এর মাঝে আর কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। জয়নাল দোতারা বাজিয়ে বলল, “ভাই, সংসারের বাঁধন ভালোবাসাকে শেকল দেয়। আর পথের ধুলোয় মানুষকে পেলে, তার চোখে চোখ রাখলে বোঝা যায়, সব প্রেম আসলে একই প্রেম। ঘরের প্রেমও, দুনিয়ার প্রেমও, ঈশ্বরের প্রেমও। তরুণ আর কথা না বাড়িয়ে চুপ হয়ে গেল। জয়নালের অন্তরে এক গভীর শূন্যতা ছায়া ফেলে। রাতে নদীর পাড়ে বসে সে আকাশ দেখে। চোখের পর্দায় আসমা জানের মুখ ভেসে উঠে। সে ফিসফিস করে বলে, ‘আসমা জান, আমি তোমায় ছেড়ে এসেছি, কিন্তু গানে গানে আমি তোমারই প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফিরি।’ এক বৃদ্ধ সাধক, যিনি পাশেই ধ্যানে বসেছিলেন, চোখ মেলে বললেন, “বাবা, প্রেম আর বিরহকে আলাদা ভেবো না। প্রেমের ভেতরেই বিরহ লুকানো, বিরহের ভেতরেই প্রেম। দোতারায় যখন টান দাও, দুটি তারে ভিন্ন সুর বাজে, কিন্তু শেষে মিলেমিশে এক হয়। জীবনও তাই। তবে দোতারার একটা তার ছিঁড়ে গেলে যেমন সুর ওঠে না, সংসারজীবনও ঠিক তাই। মন ভেঙে গেলে কাচ ভাঙার মতো আর জোড়া লাগে না। বৃদ্ধ সাধকের কথায় বুকের ভেতর চিন চিন ব্যথাটা একটু বেড়ে গেল। জয়নাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নোয়াল। জীবনের অংঙ্ক বড়ই জটিল। পরদিন সে ফিরল নিজের গ্রামে। কাশফুলে ভরে গেছে মাঠ, আকাশনীলে সাদাকালো মেঘের মেলা বসেছে। জয়নাল এসে দাঁড়াল শ্বশুরবাড়ির পুরোনো উঠোনে। দরজায় নক করতেই আসমা জান বেরিয়ে এল। জয়নালের চোখে এক অদ্ভুত নীরবতা। কী বলে নিজের দোষ ভাঙাবে ঠিক করতে পারে না। জয়নালকে দেখে আসমা জানও অবাক। পাঁচ বছর যার কোনো খোঁজ ছিল না, সে হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? জয়নাল মাথা নিচু করে জানতে চায়, “আসমা জান, কেমন আছ? আসমা বলল, “আপনি কি আপনার মনের মানুষ খুঁজে পেয়েছেন?” জয়নালের বুক কেঁপে উঠল। জয়নাল এক মুহূর্তে বুঝে গেল, তার গান, তার প্রেম, তার ভ্রমণ - সবকিছু ছিল মনের ঘোর। তরুণ আর বৃদ্ধ সাধকের তাত্ত্বিক কথায় জয়নালের বাউলজীবনের ঘোর কাটলেও আসমা জানের প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। সে পথে পথে ঘুরেফিরে অনেক মানুষ দেখেছে। অনেক গান গেয়েছে। কিন্তু স্ত্রী আসমা জানের মতো দরদি মানুষ পায়নি। একটা অচেনা কষ্টে চোখ ভিজে আসে। দোতারা বুকে চেপে ধরে সে গেয়ে ওঠে, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’ “আসমা জান, সত্যি বলতে তোমার মতো কাউকে খুঁজে পাইনি। তুমি যে আমার অন্তরে গানের সুরে মিশে আছ।” জয়নালের কথা শুনে আসমা জান একটুখানি হেসে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। তার পরও চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু আসমা জান কিছু না বলে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “তোমার আসমা জান আর তোমার নেই। সে এখন দূর আকাশের চাঁদ-তারা।” জয়নাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের ভেতর থেকে অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসে, “বাহিরে কে এল?” আসমা জান কোনো জবাব না দিয়ে ঘরের দরজা বিকট শব্দে এঁটে দেয়। গলার স্বরটা জয়নালের চেনা চেনা লাগে। অনেকটা তার ওস্তাদজির কণ্ঠ। ওস্তাদ গানের তালিম দিতে গিয়ে আসমা জানের ঠিকানা নিয়েছিল। বলেছিল, যদি ওদিকে যায় তাহলে দেখা করবে। তাহলে কি ওস্তাদজি আসমা জানকে বিয়ে করেছে? কিছুই ভাবতে পারে না। সবকিছু এলোমেলো লাগে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ে, আর সেই মুহূর্তে জয়নাল বুঝে যায়, তার জীবনটা তারছেঁড়া বেসুরা এক দোতারা। অন্তহীন গান, যার দুঃখের শেষ নেই। জয়নালের চোখে কালো মেঘের বিজলি চমকাতে থাকে। বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। এক মুহূর্তে সে বুঝে যায়, ওস্তাদই তার আসমা জানকে দখল করেছে। এখন পথই তার ঘর, খোলা আকাশই তার মাথার ছাদ, আর গানই তার মুক্তি। আসমা জানের চোখে যে অশ্রুর ঝিলিক দেখেছিল, তা তার শেষ আশীর্বাদ, আবার শেষ বিদায়ও। দোতারা বুকে জড়িয়ে সে হাঁটতে থাকে মেঠোপথ ধরে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে, যেন প্রতিটি ফুল তার ছিন্ন জীবনের সাদা অশ্রুবিন্দু। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে যায় জয়নালের কণ্ঠ- ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।।’ গানের সুর ভেসে ওঠে দূরের নদীতে, কাশবনে, হয়তো আসমা জানের জানালার কাচেও ঠেকে যায় জয়নালের সুর। আসমা জান হয়তো শুনবে, হয়তো শুনবে না। কিন্তু সেই সুরে তার ভালোবাসা আর অভিমান মিলেমিশে চিরকাল বেঁচে থাকবে। আর জয়নাল? সে চলে যায় অদৃশ্য পথের দিকে, এক ছিন্ন দোতারার সুরে, যা থামবে না কোনো দিন, যেমন থামে না প্রেমের অশ্রু, যেমন থামে না বিরহের গান। হয়তো আসমা জানের বুকেও একদিন প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজবে জয়নালের গান।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।