Breaking news

সুস্থতা

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস এবং আমাদের করণীয়

প্রতিবছর ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে যতটা খোলাখুলি আলোচনা হয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা ঠিক তার তুলনায় এখনো অনেক পেছনে। অথচ একজন মানুষের পূর্ণাঙ্গ সুস্থতার জন্য শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও সমান গুরুত্ব রয়েছে।    বর্তমানে এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে মানুষের জীবনে মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এই চাপ এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণা ও স্থানীয় গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মাঝে মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা খুবই প্রবল। পড়াশোনার চাপ, কর্মসংস্থানের অভাব, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের সর্বনাশ ডেকে আনছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেকই পরিবার থেকে দূরে থাকা, দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা, সেশন জট এবং নানা অনিশ্চয়তার কারণে তীব্র অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই মানসিক অবসাদের পরিণতি আত্মহত্যায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাবে একটা বড় অংশ আসক্ত হয়ে পড়েছে মাদকের মতো ভয়ংকর নেশায়; যা আমাদের সমাজেকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে যাচ্ছে।   তবে এই মানসিক অবসাদগ্রস্তের পেছনে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থা একা দায়ী নয়, এর পেছনে বড় অংশীদার আমাদের সমাজ এবং আশপাশের মানুষের মানসিকতা। বর্তমানে আধুনিক এই পৃথিবীতে ‘বডি শেমিং’ এবং শারীরিক গঠন দুর্বলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা একধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, যা একটি ভিকটিমের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে, সেই ব্যক্তির নিজের ওপরে ঘৃণা করা শুরু করে, নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরে বিভিন্ন রকম নেতিবাচক চিন্তা না শুরু হয় এবং সবশেষে আত্মহত্যা করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে।   চলতি বছরের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় আমাদের আশপাশে যারা মানসিক অবসাদগ্রস্ত অবসাদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাদের কথাগুলো শোনা, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থ্যসেবায় ও সমাজে পরিবর্তন আনা।   আমাদের মনে রাখতে হবে, মানসিক রোগ কোনো অপরাধ নয়, এটি যেকোনো শারীরিক রোগের মতো নিরাময়যোগ্য। এ রোগ নিরাময় করতে শুধু প্রয়োজন সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং সময়মতো পেশাদারের পরামর্শ।   তাই আসুন, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হই এবং অন্যকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করি। একটি দেশের যুবসমাজ ও সুসংগঠিত সমাজ গঠনে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার বিকল্প নেই।  

অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0
সুস্থ জাতি গঠনে পুষ্টিশিক্ষা জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি

সুস্থ জাতি গঠনের আলোচনা হলে আমরা সাধারণত হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ কিংবা আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার কথা বলি। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি তৈরি হয় হাসপাতালের বাইরে মানুষের প্রতিদিনের খাবারের টেবিলে। কী খাব, কতটুকু খাব, কখন খাব এবং কোন খাবার কেন প্রয়োজন এই মৌলিক জ্ঞানই পুষ্টিশিক্ষা। তাই পুষ্টিশিক্ষা শুধু খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সচেতনতা তৈরির বিষয় নয়; এটি রোগপ্রতিরোধ, সুস্থ জীবনযাপন এবং একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার।   আমরা কী খাই, তার প্রভাব শুধু শরীরের ওজনের ওপর পড়ে না। খাদ্য আমাদের শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, কর্মক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি না পেলে তার শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার কৈশোরে সঠিক পুষ্টির অভাব ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।   বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে পুষ্টির চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। একদিকে অপুষ্টি, খর্বাকৃতি ও রক্তস্বল্পতার মতো সমস্যা রয়েছে; অন্যদিকে নগরায়ণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতার কারণে বাড়ছে অতিরিক্ত ওজন ও অসংক্রামক রোগ। অর্থাৎ একই সমাজে অপুষ্টি ও অতিপুষ্টি দুই ধরনের সমস্যা পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, খাবারের গুণগত মান সম্পর্কেও মানুষকে সচেতন করা জরুরি।   পুষ্টিশিক্ষা মানুষকে কঠিন বৈজ্ঞানিক তথ্য মুখস্থ করানোর বিষয় নয়। বরং দৈনন্দিন জীবনের সহজ সিদ্ধান্তগুলোকে সঠিক করার সক্ষমতা তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য। যেমন একটি সুষম খাবারের প্লেটে শর্করা, প্রোটিন, শাকসবজি ও ফলমূলের যথাযথ উপস্থিতি কেন প্রয়োজন; অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কেন কমানো উচিত; পর্যাপ্ত পানি পান কেন গুরুত্বপূর্ণ; খাবারের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।   বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের জন্য পুষ্টিশিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় তৈরি হওয়া খাদ্যাভ্যাস অনেক সময় বড় হওয়ার পরও থেকে যায়। স্কুল যদি শুধু বইয়ের জ্ঞান না দিয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচন, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মৌলিক ধারণা শেখায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা নিজের পাশাপাশি পরিবারেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। একটি শিশু যখন বুঝতে শেখে কেন প্রতিদিন শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম বা মাছের মতো পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন, তখন তার খাদ্য নির্বাচনও ধীরে ধীরে সচেতন হয়।   তবে পুষ্টিশিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, পরিবার, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি পর্যায়েও এর বিস্তার প্রয়োজন। বিশেষ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর খাদ্যতথ্য মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ‘ডিটক্স’, দ্রুত ওজন কমানোর ডায়েট, নির্দিষ্ট কোনো খাবারকে সব রোগের সমাধান হিসেবে উপস্থাপন এ ধরনের দাবির মধ্যে অনেকগুলোই বৈজ্ঞানিকভাবে দুর্বল বা বিভ্রান্তিকর। ফলে মানুষকে শুধু পুষ্টি সম্পর্কে জানানো নয়, তথ্য যাচাই করার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।   পুষ্টিশিক্ষা জনস্বাস্থ্যের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে রোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য আগেই সচেতন হওয়া বেশি কার্যকর। মানুষ যদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি গ্রহণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে ব্যক্তি যেমন সুস্থ থাকতে পারে, তেমনি পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর চিকিৎসাব্যয়ের চাপও কমতে পারে।   পুষ্টিশিক্ষা কার্যকর করতে হলে বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু ‘স্বাস্থ্যকর খাবার খান’ বললেই হবে না; স্বাস্থ্যকর খাবার মানুষের নাগালের মধ্যে আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যের দাম, আয়, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি, পারিবারিক অভ্যাস ও খাদ্যের প্রাপ্যতা সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়ে পুষ্টি বার্তা তৈরি করতে হবে। মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরামর্শই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।   জনস্বাস্থ্য মূলত প্রতিরোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর একটি হলো জ্ঞান। চিকিৎসক অসুস্থতার চিকিৎসা করতে পারেন, কিন্তু একজন সচেতন মানুষ প্রতিদিনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেই কমিয়ে দিতে পারেন। সেই সচেতন সিদ্ধান্ত নেয়ার ভিত্তি তৈরি করে পুষ্টিশিক্ষা।   তাই পুষ্টিশিক্ষাকে শুধু স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি দেশের মানুষ কী খাচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতনতা যত বাড়বে, সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত জনস্বাস্থ্যের বড় পরিবর্তন সব সময় হাসপাতাল থেকে শুরু হয় না, অনেক সময় তার শুরু হয় একটি সঠিক খাবার বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে।     রাইসা মেহজাবীন ফিটনেস পুষ্টিবিদ বিএসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ।

সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬ 0
Popular post
ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

নগরীর দেবী

ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। ​তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে ​তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।     

গঙ্গার নৌকায় আমার ভবিষ্যৎ

শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে।   বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল।   গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।   বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’।   বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।”   বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল।   তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।”   বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি...   ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।”   আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম।   হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব।   এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?”   আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।”   চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।”   এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো।   হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন।   দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম।   সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।   আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে।   এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়।   এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর।   বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।”   বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম।   হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।  

Top week

সাহিত্য

বাবা

অক্টোবর ২৩, ২০২৬ 0