Breaking news

স্ক্রিন

প্রতীকী ছবি
স্ক্রিনের আলোয় নিভে যাচ্ছে শিশুদের শৈশব

শৈশব মানুষের এক আজন্মলালিত স্বপ্ন। শৈশবের দুরন্তপনা, লুটোপুটি—সবই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়। কিন্তু শৈশবের এই দুরন্তপনার জায়গা দখল করেছে ভয়াবহতম স্ক্রিন আসক্তি। শিশু-কিশোররা এখন মাঠে খেলাধুলা না করে বরং মোবাইল কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে নষ্ট করছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যাদের থাকার কথা মাঠের দুরন্তপনায় মাতোয়ারা, তারাই আজ স্ক্রিনের সামনে নস্যাৎ করছে তাদের মূল্যবান সময়।   বাংলাদেশে শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং এর আসক্তি নিয়ে সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ৮৩ শতংশ শিশু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপদ সীমার (দৈনিক ২ ঘণ্টা) চেয়ে বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। রাজধানীতে এই হার আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকায় বসবাসকারী ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী স্কুলগামী শিশুরা গড়ে দৈনিক প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা (প্রায় ৫ ঘণ্টা) মোবাইল, টেলিভিশন, কম্পিউটার বা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে ব্যয় করছে।   অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্তির ফলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একজন শিশুর শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি ও বিকাশে খেলাধুলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহারের ফলে চোখের সমস্যা, যেমন চোখ শুষ্ক হওয়া, চোখে জ্বালা, এমনকি মায়োপিয়া (কাছের জিনিস দেখার অস্পষ্টতা) এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাসও পেতে পারে। তা ছাড়া স্ক্রিন থেকে নিঃসৃত নীল আলো মেলাটোনিন হরমোন নষ্ট করে। যার ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। তা ছাড়া মেদবহুলতা এবং ঘাড় ও পিঠে ব্যথার অন্যতম কারণ এই স্ক্রিন আসক্তি।   শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রেও স্ক্রিন আসক্তি এক মারণঘাতী রূপে আবির্ভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ৫ জন শিশুর মধ্যে ২ জন শিশু কোনো না কোনোভাবে স্ক্রিন আসক্তির ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। মনোবিজ্ঞানীদের মতানুযায়ী, শিশুরা চারপাশের পরিবেশ স্পর্শ করে, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি দেখে এবং বাস্তব যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষা ও আবেগ শেখে। স্ক্রিন কখনো মানুষের এই বাস্তব মিথস্ক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। ফলে একটা শিশুর স্বাভাবিক মনোজগৎ তৈরি না হয়ে এক স্ক্রিননির্ভর জগৎ তৈরি হয়। তা ছাড়া বর্তমানে দ্রুতগতির শর্ট ভিডিও বা রিলস শিশুদের মনোযোগ সুপ্ত অবস্থাতেই নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে তারা শিক্ষকের কথা শোনা, কোনো কিছু নতুন করে শেখার ব্যাপারে চরম অধৈর্যের পরিচয় দেয়।   স্ক্রিন আসক্তির ফলে মনোযোগ কমে যাওয়া এবং চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্ত শিশুরা খুব দ্রুত হাইপার-অ্যাক্টিভ এবং খিটখিটে হয়ে যায়। যেকোনো ইচ্ছা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ না হলে তারা তীব্র ক্ষোভ বা জেদ প্রকাশ করে। বাস্তব জগতের ছোটখাটো মানসিক চাপ বা ব্যর্থতা নেয়ার মতো মানসিক সহনশীলতা তাদের তৈরি হয় না। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা তার জীবনকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করতে পারে পরবর্তী জীবনে, যা সম্পর্কে এখনই সচেতন হতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মই।   স্ক্রিন আসক্তির ফলে শৈশবের খেলাধুলা কিংবা গল্প শোনার মতো কাজে শিশুরা আর আনন্দ পায় না। ডোপামিন হলো আনন্দ-অনুভূতি সৃষ্টির হরমোন, যা শিশুদের আসক্তির ফলে বেশি নিঃসৃত হচ্ছে। আর যেহেতু শিশুরা এখন গল্প শোনা কিংবা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে ঐভাবে পারদর্শী নয়, ফলে পরবর্তী সময়ে একাকিত্ব কিংবা অ্যাংজাইটির মতো সমস্যাগুলো জীবনের স্বাভাবিক পথে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিশুর এই আসক্ত জীবন পরবর্তীকালে শিশুর মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে।   শিশুর স্ক্রিন আসক্তি ও মানসিক বিকাশ নিয়ে তথ্যগুলো সত্যিই চিন্তার বিষয়। এই পরিস্থিতি থেকে শিশুদের ফিরিয়ে আনা এখনকার সময়ে বাবা-মা এবং অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তবে অভিভাবকদের সচেতনতাই এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। অভিভাবকরা কঠোরভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ক্রিন টাইম মেনে ফোন, ল্যাপটপ বা টিভি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই কার্যকর উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন দেয়া যাবে না এবং ২–৫ বছরের শিশুদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা। এই টাইমলাইন কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য অভিভাবকদের খাবার ঘর এবং শোবার ঘরে কোনো রকম স্ক্রিন, যেমন ফোন, ল্যাপটপ বা টিভি ব্যবহার না করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখানো হতে পারে কার্যকর উপায়। তা ছাড়া শিশুদের আকর্ষণীয় বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন : বই পড়া, মাঠে খেলাধুলার সুন্দর সুযোগ তৈরি হতে পারে স্ক্রিন আসক্তি থেকে মুক্তির কার্যকর উপায়।   একজন অভিভাবক নিজে ফোনে ডুবে থেকে কখনো তাঁর সন্তানকে স্ক্রিন আসক্তিমুক্ত করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনতে হবে। একজন সচেতন অভিভাবকের ভূমিকা পালন এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিন টাইম কমিয়ে পরিবারের সন্তানদের সময় দিন। এতে একদিকে যেমন কোয়ালিটি টাইম পাবে সন্তান, তেমনি স্ক্রিন আসক্তি থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে সন্তানকে। এ ছাড়া শিশুদের ডিভাইসে বিভিন্ন রকম কাস্টমাইজড শিশু-উপযোগী অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। ইউটিউব কিডস, গুগল ফ্যামিলি লিংকের মতো প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ ব্যবহার করা হতে পারে সমাধান। তা ছাড়া স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিন টাইম সেট করে দিলে শিশুদের ডিভাইস নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে একদিকে মা-বাবার দেখভাল করার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে, অন্যদিকে শিশুও স্বাভাবিকভাবে নির্দিষ্ট সময় ফোন কিংবা ডিভাইস ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে।   শিশুরা সাধারণত অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে। শিশুদের সামনে তাই ডিভাইস যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করে বই পড়ার মতো অনুসরণীয় কার্যক্রম করলে শিশুও বই পড়া কিংবা খেলাধুলা করতে শিখবে। তা ছাড়া খাওয়া ও শোয়ার সময় ডিভাইস ব্যবহার একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে ঘরের মধ্যে ডিভাইস-ফ্রি জোন করা যেতে পারে। ফলে শিশুরাও কঠোরভাবে ওই জিনিসগুলো অনুকরণ করে স্ক্রিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে। তবে কখনো জোর করে ডিভাইস শিশুদের থেকে কেড়ে নেয়া উচিত নয়। এতে তারা জেদি হয়ে উঠতে পারে। তাই অভিভাবকদের ধৈর্য নিয়ে স্ক্রিন টাইম ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। একটি স্ক্রিন আসক্ত শিশুকে সুষ্ঠু, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকদের ভূমিকাই মুখ্য। তা ছাড়া নিয়মিত শিশুর দেখভাল করা, পর্যাপ্ত সময় প্রদান এবং শিশুদের মধ্যে আত্ম-উপলব্ধি জাগ্রত করার মাধ্যমে সম্ভব শিশুকে স্ক্রিনের আসক্তি থেকে মুক্ত রাখা।   প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এ যুগে স্ক্রিন আসক্তি যেন এক কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শৈশবের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো চঞ্চলতা। কিন্তু আজ মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা টেলিভিশনের করাল গ্রাসে যেন হারিয়ে যেতে বসেছে এই স্বাভাবিক শৈশবের দুরন্তপনা কিংবা চাঞ্চল্য। আগামী প্রজন্মের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে স্ক্রিনের আলোর অন্ধকারে। তাই এখনই প্রয়োজন সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে স্ক্রিনের আলোয় নিভে যেতে না পারে আমাদের শৈশবের স্বাভাবিকতা।   মো. মেহরাব হোসেন শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
Popular post
ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

নগরীর দেবী

ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। ​তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে ​তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।     

গঙ্গার নৌকায় আমার ভবিষ্যৎ

শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে।   বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল।   গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।   বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’।   বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।”   বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল।   তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।”   বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি...   ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।”   আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম।   হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব।   এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?”   আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।”   চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।”   এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো।   হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন।   দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম।   সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।   আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে।   এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়।   এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর।   বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।”   বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম।   হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।  

Top week

সাহিত্য

বাবা

অক্টোবর ২৩, ২০২৬ 0