প্রত্যেক মানুষ কোনো না কোনো রাষ্ট্রের অধিবাসী। তাই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মানুষের মৌলিক অধিকার হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও বিনোদন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি রাষ্ট্রের কাছ থেকে এসব মৌলিক অধিকার যথাযথভাবে পাচ্ছি? বাস্তবতা বলছে, মোটেই না। আর এই অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিতদের মধ্যে রয়েছে আমাদের দেশের পথশিশুরা। পথশিশুদের জীবন যেন অভিশাপের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কথা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না, সমাজও তাদের প্রতি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করে না। অনেক শিশুর পরিবার তাদের ছেড়ে চলে গেছে; কারও বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে, আবার কারও বাবা-মা জীবিত নেই। ফলে শৈশবের স্নেহ, মায়া-মমতা ও নিরাপদ আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা অনিশ্চিত ও বিভীষিকাময় জীবন যাপন করছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ অক্টোবর জাতীয় পথশিশু দিবস পালিত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ১২ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবসও পালিত হয়। এসব দিবস পথশিশুদের অধিকার ও দুর্দশার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও শুধু দিবস পালন যথেষ্ট নয়; তাদের জীবনমান পরিবর্তনের জন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। পথশিশুদের অধিকাংশের নিজস্ব কোনো ঘরবাড়ি বা স্থায়ী বাসস্থান নেই। তারা ভাসমান জীবন যাপন করে। শহরের ফুটপাত, পার্ক, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, ওভারব্রিজ, শপিংমলসহ বিভিন্ন খোলা স্থানে তাদের দেখা যায়। খোলা আকাশের নিচেই অনেককে রাত কাটাতে হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মানসিক ও শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছে। সাম্প্রতিক সরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও পথশিশুদের জীবনযাত্রার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ‘Survey on Street Children 2022’–এর তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া পথশিশুদের ৭১.৮ শতাংশ পড়তে ও লিখতে পারে না। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু খোলা বা জনসমাগমস্থলে ঘুমায় এবং প্রায় অর্ধেক শিশু মাটির ওপর পাটের বস্তা, কার্টন, পলিথিন বা পাতলা কম্বল বিছিয়ে ঘুমায়। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি গত তিন মাসে অসুস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছে। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের কর্মজীবনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক শিশুকে বর্জ্য সংগ্রহ, ভিক্ষাবৃত্তি, ফুল-বেলুন বিক্রি, চায়ের দোকান, কারখানা কিংবা বিভিন্ন অনিরাপদ কাজে যুক্ত হতে হয়। জরিপে অংশ নেওয়া কর্মরত শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ করতে গিয়ে আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে এবং প্রায় অর্ধেক শিশু কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশে পথশিশুর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। ২০২৪ সালে UNICEF Bangladesh প্রকাশিত ‘Children Living in Street Situations in Bangladesh 2024’ গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩৪ লাখের বেশি শিশু পিতামাতার যত্ন ছাড়া রাস্তায় বসবাস করছে। তবে ‘পথশিশু’ বলতে কেবল রাস্তায় থাকা সব শিশুকে বোঝানো হয় না; তাই এই সংখ্যাকে সরাসরি দেশের মোট পথশিশুর সংখ্যা হিসেবে উল্লেখ না করে রাস্তায় বসবাসকারী ও পিতা-মাতার যত্নবঞ্চিত শিশু হিসেবে দেখা অধিকতর সঠিক। এই শিশুরা নিরাপদ পরিবেশ ও যথাযথ পরিচর্যার অভাবে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকে। মাদক সেবন, মাদক পরিবহন বা বিক্রি, চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এসব অপরাধের জন্য শিশুদের এককভাবে দায়ী করা যায় না; বরং দারিদ্র্য, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব তাদের বিপথগামী হওয়ার অন্যতম কারণ। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মেয়ে পথশিশুরা যৌন হয়রানি ও যৌন নির্যাতনের অত্যন্ত ঝুঁকিতে থাকে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী ও অপরাধী চক্র তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে যৌন শোষণ, ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করতে পারে। এমনকি শিশুদের অক্ষম করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার মতো নির্মম ঘটনাও সমাজে বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এই শিশুদের শোষণ করে যারা অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং শিশুদের নিরাপদ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পথশিশুদের জীবনে মাদকও একটি ভয়াবহ সংকট। ক্ষুধা, একাকিত্ব, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সঙ্গদোষ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক শিশু মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে, ইনহেলেন্ট বা ‘ড্যান্ডি’ জাতীয় মাদক কিছু পথশিশুর মধ্যে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ক্ষুধা ও বাস্তবতার কষ্ট ভুলে থাকার জন্য কেউ কেউ এসব নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের মাদক তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ২০২৬ সালের বাস্তবতায় পথশিশুদের সমস্যাকে শুধু দারিদ্র্যের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মানবাধিকার, শিশু অধিকার, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় সমস্যা। একটি শিশুর জন্ম তার নিজের সিদ্ধান্ত নয়। সে কোন পরিবারে জন্ম নেবে, তার পরিবার দরিদ্র হবে কি না, বাবা-মা তাকে দেখাশোনা করবে কি না—এসব কিছুই তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই একটি শিশু রাস্তায় জন্মেছে বা রাস্তায় বসবাস করছে বলে তার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। পথশিশুদের সহযোগিতা ও সুশৃঙ্খল জীবন গঠনের জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক, সামাজিক সংগঠন, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন, মানসম্মত শিক্ষা, পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের পরিবারে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন এবং তা সম্ভব না হলে নিরাপদ বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু শিশুদের আশ্রয় দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যেন তারা সম্মানজনকভাবে জীবিকা অর্জন করতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের ব্যবহার করে যারা মাদক ব্যবসা, ভিক্ষাবৃত্তি, যৌন শোষণ বা অন্যান্য অপরাধ পরিচালনা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। পথশিশু কোনো বোঝা নয়; তারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ। আজ যে শিশুটি ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে, যথাযথ শিক্ষা ও সুযোগ পেলে সেই শিশুই আগামী দিনে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা দেশের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হতে পারে। তাদের অবহেলা করা মানে শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট করা নয়, বরং দেশের সম্ভাবনাকে নষ্ট করা। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে হলে পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমাদের প্রত্যেকেরও রয়েছে। আসুন, পথশিশুদের করুণা নয়—অধিকার দিই। তাদের বোঝা নয়—সম্পদ হিসেবে দেখি। তাদের রাস্তায় ফেলে না রেখে নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সুন্দর ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করি। আগামীর বাংলাদেশ হোক পথশিশুসহ সব মানুষের জন্য নিরাপদ, মানবিক, বৈষম্যহীন ও বাসযোগ্য—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর। ভাবা গিয়েছিল, এ সংস্থা আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার্থে বৃহৎ ভূমিকা নেবে। মানবাধিকার রক্ষা করবে। সেই সাথে বিশ্বব্যাপী আর্থ- সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রেও মুখ্য একটা চালিকাশক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহায়তা, যুদ্ধ প্রতিরোধ, নিরস্ত্রীকরণ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে জাতিসংঘ। সোজা কথায় বলা যায়, বিশ্বাস ও আস্থার দূত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। জাতিসংঘের বিচার বিভাগীয় অঙ্গ, যা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস রূপে পরিচিত, তা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আইনি বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করবে। আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব। ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সার্বিক বিরোধিতা এবং পরাধীন জাতির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের বিষয়টিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ এক অনুঘটক। মানুষের শাশ্বত মর্যাদা রক্ষার শপথ গ্রহণ করেছিল জাতিসংঘ। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রী এলিনর রুজভেল্টের সভাপতিত্বে একটা মানবাধিকার কমিশন গঠন করে। মানবাধিকার নিয়ে বহু আলোচনা, বহু সভা, বহু মতামত - সবাই ইতিবাচকতার পক্ষে। কিন্তু এখানেই আবার একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। লিখিত খসড়া আর বাস্তবতায় অনেক পার্থক্যের অবলোকন। সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে সত্যিই কি জাতিসংঘের নিজস্ব সিস্টেম বা ব্যবস্থা আছে? মনে হয় কারও মুখাপেক্ষী! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করল। মানবাধিকার ও সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি আঘাত। মানবাধিকারের জনক জাতিসংঘ নীরব। উদাহরণ এখানেই থেমে যায় না। আজকের উদ্ভূত পরিস্থিতি ভীষণ জটিল ও সংকটময়। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণ। ইসরায়েলের সিরিয়া, ইরান, লেবানন আক্রমণ। তারও অনেক আগে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধ। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। কখনো সামনাসামনি আবার কখনো ছায়াযুদ্ধ। এই তো কদিন আগেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজক পরিস্থিতি এবং ভয়ংকর যুদ্ধের সূচনা। আফ্রিকার ছোট ছোট দেশগুলো হয় গৃহযুদ্ধ নয়তো বহিঃশত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে বিপর্যস্তপ্রায়। তাহলে জাতিসংঘের ভূমিকা কী? দোষ-ত্রুটির কথা আলোচনার টেবিলে আসুক। যুদ্ধ সমাধান হতে পারে না। জাতিসংঘের যে উদ্দেশ্যে স্থাপনা, সেই উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে কি? কার্যপদ্ধতির মধ্য দিয়েই বিভিন্ন দেশের মানুষের আস্থা-ভরসা অর্জন করার ক্ষেত্রে একটা ফাঁক রয়ে যাচ্ছে মনে হয়। ‘পিস কিপিং অপারেশন’ বড় একটা কার্যক্রম জাতিসংঘের। সনদের ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, শান্তিরক্ষার প্রয়োজনে জাতিসংঘ বিবদমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা পর্যন্ত নিতে পারে। শান্তিরক্ষক হিসেবে কঠোর হতে পারে। ১৯৯১-৯২ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবং পঞ্চাশের দশকে কোরিয়ায় যৌথ সামরিক অভিযান হয়েছে। আজ যে দেশেই হোক, যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশু, নারী, অসহায় সাধারণ মানুষ। আগ্রাসন আক্রমণ কখনো কাম্য নয়। গাজা, ফিলিস্তিনের বিধ্বস্ত চিত্র প্রতিনিয়ত দেখছি। আতঙ্কে শিউরে উঠছি। খাবার নেই। জল নেই। রাস্তাঘাট চূর্ণ। তিল তিল করে গড়ে তোলা সুন্দর গ্রাম, শহর, নগর, কলকারখানা, বন্দর ধ্বংস হয়ে গেছে। হাহাকারের চিহ্ন বুকে নিয়ে কান্নারত আক্রান্ত দেশ। ক্ষতি তো সবার। আক্রমণকারীও কি ভালো থাকে? ব্যুমেরাং হয়ে বুকে বাজে অভিশাপ তারও। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়া। একটা যুদ্ধ যখন দুটি দেশের মধ্যে হয়, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য সব দেশেও। এখানেই চরম দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে হবে জাতিসংঘকে। শান্তিবিঘ্নকারীর প্রতি কঠোরতার অবলম্বন চাই। ই বি টমকিনস তাঁর ‘The UN in Perspective’ বইয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বজোড়া বিপর্যয় এড়াতে বা রাষ্ট্রসমূহকে সমূহ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, তা শান্তিরক্ষামূলক কর্মপদ্ধতি।’ রোসালিন হিগিনসের মন্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক, ‘জাতিসংঘের শান্তিরক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত এবং নির্দেশিত তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বা কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিরোধ, সংকোচন, তীব্রতা হ্রাস বা অবসান।’ যুক্তি দেখাতে পারেন অনেকে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতি, আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন, সব পক্ষেরই সহযোগিতা ইত্যাদির প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্বের জায়গায় তো আসতেই হবে জাতিসংঘকে। বলপ্রয়োগমূলক কিছু ব্যবস্থা সব সময় নিতে হবে তা নয়। ড. রাধারমণ চক্রবর্তীর কথায়, ‘বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা এবং হাল্কা কূটনৈতিক ব্যবস্থা - দুইয়ের মাঝামাঝি।’ আজকের এই পরিবর্তিত বিশ্বে উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘকে আরও গণতান্ত্রিক, কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক বিষয়ের সফল সমাধান ঘটছে না। বিশ্বকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নিতেই হবে। লাশের স্তূপের ওপর বসে পিশাচের উল্লাস আর দেখতে চাই না। আগামী প্রজন্মের কাছে একটা সুন্দর পৃথিবী থাক মানবতায় গড়া। জাতিসংঘের শুভ উদ্যোগ এবং সার্থক প্রয়াস হোক দিশারি।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।