বাংলাদেশের অর্থনীতির অদৃশ্য স্তম্ভগুলোর কথা বলতে গেলে সবার আগে যে মানুষগুলোর নাম উচ্চারিত হওয়ার কথা, তাঁরা হলেন প্রবাসী শ্রমিক। রাষ্ট্রের উন্নয়নের পরিসংখ্যান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা গ্রামীণ অর্থনীতির সচলতার পেছনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ সবচেয়ে বড় এই অবদানকারীরা প্রায়শই থেকে যান আলোচনার বাইরে। তাঁদের ঘামে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, কিন্তু তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে বারবার পিছিয়ে পড়ি। একজন প্রবাসীর জীবন কেবল বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জনের গল্প নয়; এটি বিচ্ছেদের গল্প, আত্মত্যাগের গল্প, প্রতিদিন নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেয়ার গল্প। সন্তানের প্রথম হাঁটা, বাবার শেষ বিদায়, মায়ের অসুস্থতা, স্ত্রীর চোখের জল কিংবা ঈদের আনন্দ—সবকিছু থেকে দূরে থেকে তিনি কাজ করেন শুধু এই বিশ্বাসে যে, তাঁর কষ্টে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাবে, দেশেরও উপকার হবে। মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমি, মালয়েশিয়ার কারখানা, সিঙ্গাপুরের নির্মাণক্ষেত্র কিংবা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশি প্রতিদিন যে শ্রম দিচ্ছেন, তার প্রতিটি ফোঁটা ঘাম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করছে। তাঁরা মাস শেষে নিজের জন্য সামান্য অংশ রেখে উপার্জনের সিংহভাগ দেশে পাঠিয়ে দেন। সেই অর্থে চলে সংসার, গড়ে ওঠে ঘরবাড়ি, পড়াশোনা করে সন্তান, চিকিৎসা পান বৃদ্ধ মা-বাবা, সচল থাকে গ্রামের বাজার, শক্তিশালী হয় জাতীয় অর্থনীতি। রেমিট্যান্সকে আমরা প্রায়ই একটি অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে দেখি। অথচ এর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন মানুষের নির্ঘুম রাত, সীমাহীন পরিশ্রম, অপূর্ণ স্বপ্ন আর স্বদেশে ফেরার অপেক্ষা। তাই রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয়; এটি লাখো প্রবাসীর ত্যাগ, ভালোবাসা আর দেশপ্রেমের জীবন্ত দলিল। রাষ্ট্র যখন প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে সম্মান জানায়, তখন সেই সম্মানের বাস্তব প্রতিফলনও মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন ছবি দেখায়। দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরা একজন প্রবাসীর প্রথম অভিজ্ঞতা যদি হয় হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত জিজ্ঞাসাবাদ, দালাল চক্রের উৎপাত কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি, তাহলে তাঁর বুকের ভেতর জমে থাকা স্বদেশপ্রেমে অজান্তেই আঘাত লাগে। যে মানুষটি বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকার মর্যাদা বহন করেছেন, নিজের কষ্টার্জিত অর্থে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন, মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেই তিনি যেন অনুভব না করেন—তিনি অবাঞ্ছিত। সমস্যা শুধু বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে অবস্থানরত বহু বাংলাদেশির কাছে পাসপোর্ট নবায়ন, জন্মনিবন্ধন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কিংবা অন্যান্য কনস্যুলার সেবা পাওয়া এখনো এক দীর্ঘ ভোগান্তির নাম। কোথাও ধীরগতি, কোথাও তথ্যের অস্পষ্টতা, কোথাও আবার অসাধু দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য—এসব মিলিয়ে একজন প্রবাসীকে অতিরিক্ত অর্থ, সময় ও মানসিক চাপের বোঝা বহন করতে হয়। প্রযুক্তির এই যুগে নাগরিক সেবা যদি এখনো হয়রানির সমার্থক হয়ে থাকে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিদেশগামী শ্রমিকদের আরেকটি বড় দুর্ভাগ্য হলো প্রতারণার শিকার হওয়া। অনেকেই সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশে যান, কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন—চাকরি নেই, বেতন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নয়, কিংবা ভিসা-ই জাল। কেউ কেউ মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন, আবার অনেকে অবৈধ অবস্থানে পড়ে কারাভোগ কিংবা দেশে ফিরে আসার নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। এই প্রতারণা শুধু একজন মানুষের জীবনই ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয় এবং দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই বৈধ জনশক্তি রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়াকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা আজ সময়ের দাবি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিমান টিকেটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। ঈদ, ছুটি বা বিশেষ মৌসুম এলেই যেন একটি অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে টিকেটের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। বছরের পর বছর পরিবারের মুখ না দেখা একজন প্রবাসীর আবেগকে এভাবে ব্যবসার পণ্যে পরিণত করা শুধু অমানবিকই নয়, চরম অনৈতিকও। প্রবাসীদের জন্য এখন আর করতালি বা আনুষ্ঠানিক সম্মাননার চেয়ে বেশি প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। বিমানবন্দরে হয়রানিমুক্ত ও দ্রুত সেবা, বিশেষ ইমিগ্রেশন লেন, দূতাবাসে সময়োপযোগী ও স্বচ্ছ কনস্যুলার ব্যবস্থা, পাসপোর্ট নবায়নে অযথা বিলম্বের অবসান, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির কঠোর তদারকি, ভিসা প্রতারণা রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং বিমান টিকেটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ—এসব আর বিলাসিতা নয়; এগুলো একজন প্রবাসী নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। একই সঙ্গে প্রবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদেশে আইনি সহায়তা জোরদার, দুর্ঘটনা বা কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং দেশে ফিরে তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণও জরুরি। কারণ, একজন প্রবাসী শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান না; তিনি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পরিশ্রম, সততা ও সক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে দেশের মর্যাদাকেই সমুন্নত রাখা। আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, মেগা প্রকল্পের কথা বলি, অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিসংখ্যান তুলে ধরি। কিন্তু সেই অগ্রগতির ভিত্তিপ্রস্তর যাঁরা নীরবে স্থাপন করেন, তাঁদের কথা যেন আড়ালেই থেকে যায়। যে হাত বিদেশের প্রখর রোদে পুড়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, সেই হাতকে সম্মানের সঙ্গে ধরে রাখার দায় রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের সবার। প্রবাসীরা কোনো করুণার পাত্র নন; তাঁরা বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কারিগর। তাঁদের পাঠানো প্রতিটি রেমিট্যান্সের সঙ্গে দেশে ফিরে আসে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একজন মায়ের চিকিৎসা, একটি গ্রামের নতুন সম্ভাবনা এবং একটি জাতির এগিয়ে চলার শক্তি। তাই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। প্রবাসীদের শুধু 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা' বলে প্রশংসা করলেই দায় শেষ হয় না; সেই সম্মানকে বাস্তব সেবায়, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণে রূপ দিতে হবে। কারণ, যে জাতি তার নীরব নির্মাতাদের সম্মান করতে শেখে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই জাতিকেই সম্মানের আসনে বসায়। প্রবাসীদের ঘামে লেখা বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা যেন আর অবহেলার ইতিহাস না হয়। তাঁদের চোখের জল নয়, মুখের হাসিই হোক আগামী বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক।
প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধাদানের লক্ষ্যে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হতে যাচ্ছে সরকারের ‘প্রবাসী কার্ড’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই কার্ডের মাধ্যমে ১০টি বিশেষ সুবিধা প্রদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে সব প্রবাসী বাংলাদেশিকে এর আওতায় আনা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিমানবন্দর লাউঞ্জ ও মিট অ্যান্ড গ্রিট সুবিধা, টিকিট ও হোটেলে বিশেষ ছাড়, সরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকার এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় বিশেষ ছাড় পাবেন। এছাড়া কার্ডধারীর মৃত্যুতে মরদেহ দেশে পরিবহন, প্রবাসফেরতদের পুনর্বাসন, বীমা সুবিধা এবং জমি রেজিস্ট্রেশন ও ইউটিলিটি সেবায় অগ্রাধিকারের মতো সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট, সহজ ঋণ সুবিধা এবং পাসপোর্ট-কনস্যুলার সেবায় কার্ডধারীরা বাড়তি গুরুত্ব পাবেন। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ৫০ হাজার এবং ২০২৭ সালের জুন নাগাদ ২ লাখ প্রবাসী কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এর সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে কার্ডের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আরও আধুনিক করার নির্দেশনা দিয়েছেন। বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
সদ্য বিদায়ী জুন মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ২৮০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রবাসী আয়ের এই সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত অর্থবছরের (জুলাই-জুন) পুরো সময়ে দেশে মোট ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। তবে আগের মাসগুলোর ধারাবাহিকতার তুলনায় জুনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। গত বছরের জুনেও দেশে ২৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।