ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্পের লাইন-১ ও লাইন-৫-এর অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়া হয়। এর মাধ্যমে দুই লাইনের পূর্তকাজ, ট্র্যাক নির্মাণ এবং আধুনিক সংকেতব্যবস্থার আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ বাস্তবায়নের পথ সুগম হলো। লাইন-১–এর সিপি-০৬ প্যাকেজের আওতায় বাড্ডা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ৫.১৮২ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পথ এবং বিমানবন্দর, টার্মিনাল-৩ ও খিলক্ষেত পাতাল স্টেশন নির্মিত হবে। ভ্যাট, করসহ ১১,৫৯০ কোটি টাকার এ কাজে জাপানের নিশিমাতসু, টিপিএল ও টোডার যৌথ কনসোর্টিয়ামকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হলেও তাদের দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে ৩২.০৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে সিপি-০৯ প্যাকেজে ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১,০৬৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এ কাজের জন্য ভারতের এলঅ্যান্ডটি ও সুমিতোমোর যৌথ উদ্যোগকে সুপারিশ করা হয়েছে, যাদের প্রস্তাবিত দর সরকারি হিসাবের চেয়ে ৪৯.৯২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া সিপি-১০ প্যাকেজের অধীনে মেট্রোরেলের স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, আধুনিক সংকেত ও টেলিযোগাযোগ, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়নে তিনটি বড় মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে এসব প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো মেট্রোরেল লাইন-১, লাইন-৫ নর্দান রুট এবং নতুন অনুমোদিত লাইন-৫ সাউদার্ন রুট। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তিনটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে লাইন-১ ও লাইন-৫ নর্দানের সংশোধিত প্রস্তাব এবং এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে বৈঠকে শুধু এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পটি উত্থাপনের কথা ছিল। তবে সার্বিক অগ্রগতির বিষয়টি মাথায় রেখে জাপানের অর্থায়নে চলমান বাকি দুটি প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ সংশোধনের প্রস্তাবও একই সভায় অনুমোদন দেয়া হয়। ব্যয় বরাদ্দের মধ্যে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ এর জন্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন ও টেকসই আধুনিকায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অবকাঠামো। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ খাতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে, মেগা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে ও ফোর-লেন মহাসড়ক নির্মাণ, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ঢাকা-কক্সবাজার সংযোগ আমাদের প্রকৌশল সক্ষমতার অনন্য স্মারক। তবে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, দ্রুত নগরায়ণ, তীব্র যানজট, ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই যুগে কেবল সড়ককেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা দিয়ে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অসম্ভব। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা, জনঘনত্ব ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার নিরিখে বিচার করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, দেশের পরিবহনব্যবস্থায় যুগান্তকারী গতিশীলতা আনতে হলে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত একটি 'রেল বিপ্লব' এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রশ্ন হতে পারে, কেন সড়ক নয়, রেলই একমাত্র টেকসই বিকল্প? বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ। এখানে কৃষিজমি ও বনাঞ্চল রক্ষা করা খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই অপরিহার্য। এই বাস্তবতায় সড়ক সম্প্রসারণের চেয়ে রেলের উন্নয়ন অনেক বেশি যৌক্তিক ও কার্যকর। চার বা ছয় লেনের একটি মহাসড়ক নির্মাণে যে বিশাল পরিমাণ ভূমির অধিগ্রহণ করতে হয়, একটি ডাবল লাইনের রেলপথ তার এক-চতুর্থাংশেরও কম জায়গায় তার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করতে সক্ষম। ফলে ভূমির অপচয় যেমন রোধ হয়, তেমনি ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহারও নিশ্চিত হয়। তা ছাড়া রেল বিপ্লবের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষাও হতে পারে। কারণ, সড়ক পরিবহনের তুলনায় রেল পরিবহন বহুগুণ বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির তথ্যমতে, ট্রেন প্রত্যেক যাত্রী বা প্রতি টন পণ্য পরিবহনে সাশ্রয়ী হারে শক্তি খরচ করে এবং কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ সড়কপথের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব এই যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। সেই সাথে রেল ভ্রমণ ও পণ্য পরিবহন সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী। সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ যেখানে প্রতিবছর জ্যামিতিক হারে বাড়ে, সেখানে রেলপথের স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা অনেক বেশি লাভজনক। বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরকে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। পরিসংখ্যানের আলোকে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের মোট কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনের মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ রেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়; বাকিটা চলে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর। এর ফলে মহাসড়কে অন্তহীন যানজট, সময় অপচয় ও লজিস্টিকস খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। যদি একটি সমন্বিত রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই পণ্য পরিবহনের হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সাথে সরাসরি ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজ রেল সংযোগ এবং প্রস্তাবিত বে-টার্মিনাল ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাথে রেলের লিংক লাইন স্থাপন করা গেলে ব্যবসার ক্ষেত্রে অপচয় নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং করছে, যা দেশের রেল অবকাঠামোর চেহারা বদলে দিতে শুরু করেছে। এই যেমন পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। ঢাকা থেকে ভাঙ্গা হয়ে যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত এই রেলপথ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে রাজধানীর সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে। এটি মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্য সরাসরি ঢাকায় আনার পথ সুগম করেছে, যা আঞ্চলিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ থেকে ১.৫ শতাংশ অবদান রাখছে। প্রসঙ্গত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের কথাও বলা যায়। পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এর ফলে কেবল পর্যটন খাতেরই বিকাশ ঘটেনি, বরং সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের মৎস্য ও লবণ শিল্প পরিবহনে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, নগর পরিবহনে এমআরটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে, ঢাকার অভ্যন্তরে যানজট নিরসনে বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল ইতোমধ্যেই তার ম্যাজিক দেখিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক রেলব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের কর্মঘণ্টা বাঁচানো সম্ভব। আমি মনে করি, 'রেল বিপ্লব' বাস্তবায়নে ৫ দফা কৌশলগত করণীয় বাস্তবায়ন করলে বিদ্যমান অর্জনগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ রেল বিপ্লবে রূপ দেয়া সম্ভব। রেলকে দেশের ১ নম্বর গণপরিবহনে পরিণত করতে হলে সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোতে হবে। প্রথমত : শতভাগ রেললাইনকে ডাবল ট্র্যাকিং ও ডুয়েল গেজে রূপান্তর করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজের গোলকধাঁধায় আটকে আছে। দেশের সব প্রধান রুটকে, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-খুলনা প্রভৃতিকে অনতিবিলম্বে ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। সিঙ্গেল লাইনের কারণে ক্রসিংয়ে যে সময় অপচয় হয়, তা দূর না করলে রেলের গতি ও শিডিউল বিপর্যয় ঠিক করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত : হাই-স্পিড রেল বা বুলেট ট্রেন চালুর উদ্যোগ ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে প্রস্তাবিত হাই-স্পিড বা দ্রুতগতির ট্রেনের প্রকল্পটি দ্রুত আলোর মুখ দেখতে হবে। এ দুই বাণিজ্যিক নগরীর দূরত্ব যদি ২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা যায়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে রকেটের গতিতে এগিয়ে নেবে। তৃতীয়ত : সমসাময়িক অস্থির বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। তাই রেলের বৈদ্যুতিকীকরণ অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের আধুনিক দেশগুলো এখন জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করছে। মেট্রোরেলের সফলতার পর আমাদের দূরপাল্লার প্রধান রুটগুলোতেও ওভারহেড ক্যাটেনারি লাইনের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এটি রেলের পরিচালন ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। চতুর্থত : আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ করে, ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে বাংলাদেশের সংযোগ আরও জোরালো করতে হবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সাথে আঞ্চলিক রেল ট্রানজিট ও কার্গো পরিবহন সুবিধা পুরোপুরি চালু করতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান লজিস্টিকস হাবে পরিণত হবে। পঞ্চমত : প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন রেলের ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি এর প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। টিকেট কালোবাজারি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা, স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং যাত্রী সেবার মানোন্নয়নে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে রেলের বাণিজ্যিক উইংকে দক্ষ পেশাদারদের দিয়ে স্বায়ত্তশাসিত মডেলে পরিচালনা করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন রেলের ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি এর প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। টিকেট কালোবাজারি সম্পূর্ণ নির্মূল করা, স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং যাত্রী সেবার মানোন্নয়নে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে রেলের বাণিজ্যিক উইংকে দক্ষ পেশাদারদের দিয়ে স্বায়ত্তশাসিত মডেলে পরিচালনা করা যেতে পারে। পরিশেষে বলতে চাই, সড়কপথ হয়তো সাময়িকভাবে কোনো অঞ্চলের যোগাযোগকে সহজ করতে পারে, কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতির স্থায়ী ও টেকসই মেরুদণ্ড গড়ে তোলে তার উন্নত রেলব্যবস্থা। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আধুনিক যুগে চীন, জাপান ও প্রতিবেশী ভারত তাদের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে রেলওয়েকেই মূল হাতিয়ার করেছে। উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা পূরণে রেলের এই রূপান্তর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। তাই সড়ক-কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আগামী জাতীয় বাজেটে রেল খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবমুখী একটি 'রেল বিপ্লব' ঘটানো গেলেই দেশের যোগাযোগব্যবস্থার টেকসই মুক্তি মিলবে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।