অক্টোবরের ঝিলিমিলি সকালে আমরা তিনজন সিলেট শহর থেকে তামাবিল বর্ডারে পৌঁছলাম। প্রয়োজনীয় কাজকর্ম শেষে যখন আমরা ভারতে, তখন কেমন যেন এক অজানিত অনুভব! সুরেলা, সুরম্য! অঝোর বৃষ্টিধারায় আনন্দের কদম, কেয়ারা ফুটতে লাগল থরে বিথরে। আহা! আমার এত দিনের ইচ্ছেকুঁড়িরা দখিন হাওয়ায় সাতসুরে পেখম মেলছে। এই অনুভব যে অনির্বাচ্য! তিনজনের উপযোগী ছোট্ট গাড়িটা ছুটছে। সুদক্ষ তরুণ ড্রাইভার। নাম বিডিং। সিলেটের জাফলং থেকে অপলকে দেখেছি ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ। শুনেছি তার মায়াবি হাতছানি। আজ সেই ব্রিজ পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই পাহাড় আর পাহাড়! কর্মকোলাহলক্লিষ্ট জনাকীর্ণ পৃথিবীর বাইরে এ যে এক নিঝুমপুরি। পথের খুব কাছে একদিকে মৌন নির্নিমেষ শৈলশ্রেণি। অন্য পাশে সুগভীর খাদ। পথের কোনো কানো অংশ পাহাড়ের শীর্ষদেশের সমান্তরাল উচুঁ। নৈঃশব্দ্যের ইন্দ্রজালঘেরা অনন্যসুন্দর এই রূপকথার দেশ! আকাশটা রে আলতো ছুঁয়ে সুদূর পাহাড় কয়, ‘আমি তোমার পড়শি জেনো মিথ্যে মোটে নয়!’ আসলেও ঠিক তাই। ঝরনাবালিকারাও এ কথার সাথে সুর মিলিয়ে কলস্বরে গেয়ে উঠল, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ ঐ পাহাড়ের ঝরনা আমি ঘরে নাহি রই গো, উধাও হয়ে ব ‘... আজ বুঝি ফাগুন উৎসব! পাথরের খাঁজে খাঁজে কত যে ফুল! যেন ফুলের বন্যা। নিষ্প্রাণ পাথরের সাথে সপ্রাণ ফুলের কোমল মধুর এই ভাব-বন্ধন কত যে চিত্তস্পর্শী । ফুলেদের কণ্ঠেও জীবনের মধুমতী উৎসার, ‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে আমি বনফুল গো‘। আসলে প্রাচ্যের স্কটল্যান্ডখ্যাত মেঘের বাড়ি (মেঘালয়) রাজ্যের রাস্তাটা সত্যিই অপরূপ! এই সুন্দরতার সোনার কাঠির ছোঁয়ায় মন ভেসে যায় দূর সুদূর গানের দেশে, যেখানে মন বাউলের একতারায় বাজে সাত সুরের মূর্ছনা, ‘যে পথ সকল দেশ পারায়ে উদাস হয়ে যায় হারায়ে। সে পথ বেয়ে কাঙাল পরান যেতে চায় কোন অচিনপুরে। দূরে কোথায় দূরে দূরে।’ শহরের কাছাকাছি আসতেই মুগ্ধতার ভিন্ন রকম ব্যঞ্জনা! সাত রঙের ফুলঝুরি ! সারি সারি পাইন গাছের অলৌকিক লাবণ্য প্রভায় মন পাখা মেলে দিল। তাদের কণ্ঠে কী সুন্দর স্বাগত সংগীত! এরা মনে করিয়ে দিল সৈয়দ মুজতবা আলীর সুবিখ্যাত গ্রন্থ 'দেশে-বিদেশে'র কথা। আহা! কাবুল নদীর পাড়জুড়ে রাশি রাশি চিনার গাছ,তন্বী তরুণী । এ দৃশ্য কল্পনায় কতবার দেখেছি! আর এখন দেখছি শ্যামবর্ণা পাইনবনের স্নিগ্ধ শীতল আলিম্পন। নিসর্গের এ শ্রীনিকেতন রমণীয়তায় অপূর্ব! আমাদের হোটেলজুড়েও নান্দনিক আবহ। আমার খুব খুব পছন্দের বাঁশ -বেতের কারুকাজ অত্যন্ত হৃদয়রঞ্জক। শিলং শহরে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য বাড়ি, ব্রিটিশ স্থাপত্যকলা, সুরম্য মসজিদ, বিশাল লেক, আশ্রম প্রভৃতি দেখলাম। পরদিন ভোর সাতটায় চেরাপুঞ্জির দিকে যাত্রা। সেখানে তখন অঝোর বৃষ্টি আর কুয়াশার লুকোচুরি। কিন্তু পর্যটকের অভাব নেই। কুয়াশার আঁচলে ঢাকা সাতবোন জলপ্রপাতের কলগুঞ্জনে মন ভরে গেল। মাউসমাই গুহার কাছে গিয়ে দেখি অনেকেই প্রবেশ করেও ফিরে আসছেন। তাঁদের আতঙ্কিত মুখ দেখে আমি আর পপি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম শেষটা দেখবই। আমাদের দলে একজন দিদি ছিলেন, তিনি নির্বিকার। এ গুহা-যাত্রার ভাষাচিত্র অঙ্কন অসাধ্য। মাথা তোলা বা দাঁড়ানোর প্রশ্নই ওঠে না। ডানে-বাঁয়ে তাকানোর উপায়ও নেই। জলসিক্ত সরু পথে পাশাপাশি দুজন যাওয়া অসাধ্য। ভেতরে অবশ্য লাইট জ্বলছে । অত্যন্ত পিচ্ছিল, দুর্গম, অসমান গোলাপি রঙের পাথরের গুহা। মাথা বাঁচিয়ে বসে বসে হেঁটে কত আর যাওয়া যায়? হায়! পথ যে শেষ হয় না! একসময় ভোরের বাঁশি শোনা গেল। বিজয়ের আনন্দে আমরা তখন আত্মহারা। পরদিন এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলিলং গেলাম। বিচিত্র বর্ণিল ফুল আর লতা-পাতায় এ যেন এক ফুলের জলসা। স্ফটিকস্বচ্ছ জলের উমঘট নদীসহ অনেক কিছু দেখে পপি আর আমি ছুটলাম জীবন্ত সেতু দর্শনে। খাসি পৌরাণিক কাহিনি মতে, তাদের পূর্বপুরুষরা স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এসেছেন জীবন্ত সেতুর মাধ্যমে। এ সেতু স্বর্গ ও পৃথিবীকে যুক্ত করেছে। সত্যিই সেতু এক অপার বিস্ময়! এ যে কল্পলোকের চিত্রকথা! অপ্রশস্ত সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গেছে। অনেকের হাতেই লাঠি। আমরা লাঠি ছাড়া। সিঁড়ির একদিকে কাঁটাতার আর বাঁশের বেষ্টনী, অন্যদিকে আকাশস্পর্শী পাহাড়। আমরা উঠছি তো উঠছিই, কিন্তু নদীর কূল যে পাচ্ছি না। এবার সিঁড়ি নিচের দিকে। আমরা নেমেই চলেছি । মেঘলা গা ছমছমে পরিবেশ। রহস্যের আলো-আঁধারি ছাওয়া পাতালপুরির পথ আর শেষ হয় না। কতদূর আর কতদূর... হঠাৎ চোখের সামনে অভূতপূর্ব এক দৃশ্য! আশ্চর্য সুন্দর বয়ননৈপুণ্যে ভাস্বর সেই কাঙ্ক্ষিত সেতু। একটা খালের ওপর বিভিন্ন সাইজের গাছের শেকড়ে তৈরি সেতুর ভাষা-বিগ্রহ নির্মাণের সাধ্য আমার নেই! নিচে ঝিরিঝিরি পানির প্রবাহ। এলাকায় জনবসতি চোখে পড়েনি। আমরা এপার থেকে ওপারে গেলাম। অত্যন্ত সতর্ক সেতু -প্রহরী। সেতুর মাঝখানে দাঁড়ানো যাবে না। নিরন্তর তাড়ার মাঝেও কিছু ছবি তোলা হলো। পরদিন সেই আরণ্য পথে ঘরে ফেরার পালা। আসলে মানুষের মন এক রহস্যময় বিরাট বিশ্ব! এর সীমা নেই, শেষ নেই, তল নেই! কেন জানি না এক উদাস বৈরাগ্যে আমার মন ছেয়ে গেল। গোধূলির বিবাগি বাতাসে তখন ক্লান্ত ফুলের গন্ধ। কী গহন গভীর এই বিপন্ন বিষাদ! অধরা কিন্তু অনুভববেদ্য। ছোঁয়া যায় না অথচ দিগন্তব্যাপ্ত! ঠিক তখন প্রবাল দ্বীপের ম্লান আলো-ছায়ায় কার যেন কণ্ঠ শোনা গেল! এ কী! এ কণ্ঠ যে রবীন্দ্রনাথের, ‘সৌন্দর্য মাত্রেই আমাদের মনে অনিত্যের সঙ্গে নিত্যের একটা বিরোধ বাঁধিয়ে অকারণ বেদনার সৃষ্টি কর’।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।