অপরূপার বৃষ্টি ভীষণ পছন্দ! সবুজ গাছপালা, পাখির কিচিরমিচির আর নিস্তব্ধ প্রকৃতি—এসব যেন তার অস্থির মনকে প্রশান্ত করে তোলে। এক বিকেলে সে একা হাঁটছে। চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ, ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নড়াচড়া আর পাখির সুরেলা ডাক যেন এক স্বপ্নের জগৎ তৈরি করেছে। আজ আকাশের মন ভালো নেই। চারপাশে কালো মেঘ ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সামলে রাখতে না পারলে আকাশ কেঁদে ফেলবে। কিন্তু অপরূপার মন খুব খুশি, কারণ এমন আবহাওয়া তার খুব প্রিয়। হঠাৎ করে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নামল বৃষ্টি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার সমস্ত মন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে থেমে দাঁড়িয়ে গেল। কোথায় যেন হারিয়ে গেল তার চিন্তা। কিছু ভাবার চেষ্টা করেও পারল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে একা। নীরব। আর সেই নীরবতার মাঝেই তার শরীরের প্রতিটি কোণ বৃষ্টিতে ভিজে গেল। একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। চারদিকে নেমে এল প্রশান্ত এক নীরবতা। ভেজা চুল, চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজল, বৃষ্টিভেজা গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে পরিবেশটা এক গভীর আবেশ তৈরি করল। ঠান্ডা বাতাসে গা শিউরে উঠল অপরূপার। তবুও সে নড়ল না। এই মুহূর্তটা যেন কেবল তার একার। কোনো ব্যস্ততা নেই, কোনো কোলাহল নেই—শুধু সে আর প্রকৃতি। বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ে যে শব্দ তুলেছিল, তা যেন গিয়ে ঠেকেছে তার হৃদয়ের গভীরতম কোণে। সেই অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না, কেবল অনুভব করা যায়। হঠাৎ দূরে এক পাখির ডাক তাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে সে। প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে যেন ফেলে আসছে তার অস্থিরতা, ক্লান্তি আর না-বলা কথাগুলো। আজ বৃষ্টির সঙ্গে কেবল শরীরই নয়, মনটাও ভিজেছে। ভিজে গিয়ে ধুয়ে গেছে সব মলিনতা। আজ অপরূপা যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছে নতুনভাবে। তার ঠোঁটে এক অম্লান হাসি। চোখে তৃপ্তির ছায়া। বাতাসে ভেসে বেড়ায় অপরূপার শান্ত, স্থির মন। তাকে দেখে মনে হয়, সে আজ সত্যিই মুক্ত।
বৃষ্টি যখন নামল ভীষণ আকাশ অন্ধ করে মেঘ ছুটেছে ঘোড়ায় চেপে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ওই যে দূরের পাহাড়চূড়া ছুঁয়ে দিতে। আমি তখন ঘরে বসে ভাবছি একা নিবিড় মনের গহিন কোণে লুকিয়ে জলের ফোঁটা তোমার জন্য হৃদয়টা যে লাগছে ভীষণ ফাঁকা। তোমার কাছে যাওয়ার স্বপ্নগুলো তাই পাঠিয়ে দিলাম মেঘ ব্যাটাকে ডাকপিয়ন করে পৌঁছে দিতে তোমার হাতে। আমার এখন তৃষ্ণা ব্যাকুল তোমার গোলাপ রাঙা জোড়া ঠোঁটের মধুর হাঁড়িতে।
আকাশে ঘন মেঘের মেলা, মন কেমন করা বাতাসের খেলা। আমাদের অতি প্রিয় শ্রাবণ মাস। বর্ষা ঋতুর এই দ্বিতীয় মাসটি যেন একাধারে রোমান্টিক, নস্টালজিক ও ভরপুর মজাদার। ভ্যাপসা গরমের পিঠাপিঠি এসে শ্রাবণ যেন প্রকৃতির বুকে এক ফালি শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। শ্রাবণ মাসের সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য হলো ঘুম। সকালবেলা বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, এসির বা ফ্যানের তো কোনো দরকারই নেই—প্রকৃতি নিজেই ফ্যান চালিয়ে দিয়ে রেখেছে। এমন মোহময় আবহাওয়ায় কম্বলের ওম টেনে ঘুমানোর যে আনন্দ, তা পৃথিবীর কোনো ফাইভ স্টার হোটেলেও পাওয়া যাবে না। অফিসের বস বা ক্লাসের স্যারের বকুনি না থাকলে এ মাসে আস্ত একটা জীবন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়া যায়। বৃষ্টি মানেই বাঙালির পেটের ভেতর অদ্ভুত এক হুলুস্থুল শুরু হওয়া। আর সেই হুলুস্থুলের মোক্ষম দাওয়াই হলো ভুনা খিচুড়ি, ডিম অমলেট ও ভাজা ইলিশ মাছ (কিংবা বেগুন ভাজা)। শ্রাবণের মেঘের গর্জন আর গরম খিচুড়ির ধোঁয়া—দুটো মিলে যেন এক অবর্ণনীয় ঐকতান তৈরি করে। ডায়েট-শাইয়েট সব এ মাসে লম্বা ছুটিতে যায়; কারণ বৃষ্টির দিনে ক্যালোরি গোনা বড় পাপ। মজার দিক ছাড়াও শ্রাবণের কিছু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা থাকে। যেমন হঠাৎ করে রাস্তায় হাঁটুজল জমে যাওয়া। রিকশায় চড়ে অফিস বা কলেজে যাওয়ার সময় যখন রিকশার চাকা ঢেউ তোলে, তখন নিজেকে কোনো ক্রুজ শিপের ক্যাপ্টেন বলে মনে হয়। আর জুতো ভিজে যাওয়ার যে চিরন্তন যন্ত্রণা, তা তো শ্রাবণের সঙ্গেই ফ্রিতে পাওয়া যায়। শ্রাবণ মাসে ছাতা হলো মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু অথবা সবচেয়ে বড় শত্রু। ঝোড়ো বাতাসে ছাতা উল্টে গিয়ে পেঁজা তুলার মতো ফুলে যাওয়ার দৃশ্য কমবেশি সবাই দেখেছেন। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে ব্যাগ আর লুঙ্গি বা ট্রাউজার্স হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে পথ চলার দৃশ্য শ্রাবণের ক্লাসিক ছবি। সংক্ষেপে শ্রাবণ মানেই জানালার ধারে বসে এক কাপ গরম চা আর রবীন্দ্রনাথের গান; প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য রিমঝিম ছাতায় লুকোচুরি আর ফুচকা বা গরম ভাজা জিলাপির সাথে বৃষ্টির ফোঁটার মিতালি। সব মিলিয়ে শত ব্যস্ততার মধ্যেও শ্রাবণ আমাদের মনে একটুখানি শৈশব ফিরিয়ে দেয়। তাই ছাতা মাথায় দিন বা রিকশায় জল ছাঁটতে ছাঁটতে চলুন, শ্রাবণের এই দিনগুলোকে মন খুলে উপভোগ করুন।
বাংলাদেশে বর্ষা এলে প্রত্যেক মানুষের জীবনধারা বদলে যায়। গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে মুক্তি আর প্রকৃতির সজীবতা নতুনরূপে সবার প্রাণে সঞ্চার করে বিপুল আনন্দানুভূতি। প্রকৃতির এই ভিন্নরূপের প্রভাব যাপিত জীবনে যেমন পড়ে, তেমনি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও পড়ে। কবি কালিদাস বর্ষার মেঘকে দূত করে তাঁর মানসপ্রিয়ার কাছে পাঠাতে চেয়েছেন। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি তাঁর কাব্যের নাম দিয়েছিলেন ‘মেঘদূত’। বর্ষায় মেঘের ছুটাছুটি আর নান্দনিক বৃষ্টিধারা শুধু কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীমনেই প্রভাব ফেলে না, সাধারণ মানুষের মনকেও করে তোলে চঞ্চল। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ থেকে শুরু করে বর্তমানের নবীন কবির কবিতা খুঁজলেও বর্ষার দু-একটি পঙক্তি খুঁজে পাওয়া যাবেই। বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋতু পর্যায়ের অনেক গান ও কবিতা লিখেছেন। এই ঋতু পর্যায়ের গানগুলোর মধ্যে বর্ষার গানই প্রাধান্য পেয়েছে। বর্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সংখ্যাও কম নয়। ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে, ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে’ কিংবা ‘বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝর, আউশের ক্ষেত জলে ভর ভর’ এ রকম অসংখ্য কবিতায় কবিগুরু বর্ষার রূপ ও বাঙালির যাপিত জীবনে বর্ষার প্রভাব তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। বর্ষা এলেই আমরা সবাই রবীন্দ্রনাথের সেই ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটি না গেয়ে থাকতে পারি না এবং এ গানের মাধ্যমেই আমরা কদম ফুলের শুভেচ্ছা জানিয়ে বর্ষাকে অভিনন্দিত করি। বর্ষার বৃষ্টিধারার রূপে মুগ্ধ প্রেমিক মনের আকুতি হয় এ রকম - এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন কাছে যাব কবে পাব ওগো তোমার নিমন্ত্রণ। বাংলা কবিতায় বর্ষাবন্দনার শেষ নেই। প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বর্ষা ও বৃষ্টি বাংলা কবিতার প্রধান উপাদান হয়ে আছে। ফলে সব কবিই বর্ষাকে নিয়ে দু-একটি কবিতা রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বৃষ্টির দিনে’ কবিতায় বলেছেন - এমন দিনে তারে বলা যায় এমন ঘনঘোর বরিষায় এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরঝরে তপনহীন ঘন তমসায়। বৃষ্টির অপরূপ দৃশ্য ও মায়াবি রূপ আমাদের মোহিত করে, আন্দোলিত করে, শিহরিত করে। আষাঢ়-শ্রাবণে বাঙালির জীবনে থাকে অনন্ত অবসর। এ সময় ভাটিয়ালি, মুর্শিদিসহ নানা লোকগানের আসর জমে গ্রামে-গঞ্জে। বাংলার শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বর্ষার প্রভাব তাই সুদূরপ্রসারী। আমরা যদি ঋতুভিত্তিক গান ও কবিতার একটি তালিকা করি, তাহলে দেখা যাবে সেখানে বর্ষার গান ও কবিতার সংখ্যাই বেশি। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ও জসীমউদ্দীন তাঁদের রচনায় বর্ষাকে মহিমান্বিত করেছেন। তিরিশের কবিরাও প্রভাবিত হয়েছেন বর্ষার রূপবৈচিত্র্যে। বর্তমানের কবিরাও বর্ষাকে কবিতার বাইরে রাখতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ জমিদারি সূত্রে বাংলাদেশের শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুরে আসতেন নদীপথেই। দুকূল প্লাবিত নদীপথে বর্ষার রূপবৈচিত্র্য কবিকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, বর্ষাই তাঁর প্রিয় ঋতু হয়ে উঠেছিল। ফলে আমরা দেখতে পাই তাঁর ‘গীত বিতান’ গানের সংকলনে শুধু বর্ষা নিয়েই গানের সংখ্যা ১২০টি। বর্ষায় নদীগুলো কানায় কানায় ভরে যায়। রূপ বদলায় প্রকৃতি। কাজের ব্যস্ততা কমে যায়। কবিমনে রোমান্টিকতার জন্ম হয়। লেখা হয় প্রেম, বিরহ আর প্রিয়মিলনের কবিতা। একদিকে গরমের দাপট কমে যায়, অন্যদিকে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি নতুনভাবে সজীব হয়ে ওঠে। জুঁই, কামিনী, দোলনচাঁপা, রজনীগন্ধা, বেলি, কদম-কেয়াসহ আরও অনেক ফুলের সমারোহে ভরে যায় প্রকৃতি। পুকুরে, খালে-বিলে ফোটে রঙিন পদ্মফুল। মাছেরা নতুন পানি পেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। এই মোহনীয় দৃশ্য কবিমনকে ভাবুক ও ঋদ্ধ করে তোলে। স্বাভাবিক যাপিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। তাই তো রবীন্দ্রনাথ বলেন - আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না। বর্ষা নিয়ে কবি জসীমউদ্দীনের ভাবনার শিল্পরূপ পেয়েছে তাঁর ‘পল্লী বর্ষা’ কবিতায়। বর্ষা পল্লীর জনজীবন ও প্রকৃতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে এবং বর্ষা এলে গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনধারা কীভাবে বদলে যায়, সে বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর এ কবিতায় - গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায় গল্প গানে কী জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায় কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রশি কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাকা বাঁধে কষি কষি। মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ করুণ ভাটির সুরে আমির সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে এসবের মাঝে রূপকথা যেন আর এক রূপে আঁকে। জসীমউদ্দীনের এ কবিতায় আমরা বর্ষায় গ্রামীণ জনজীবনের পরিবর্তন লক্ষ করি। মূলত হেমন্তের মুগ্ধতায় আন্দোলিত কবি জীবনানন্দ দাশও তাঁর কবিতায় বর্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। বাংলা ভাষার আধুনিক ও শুদ্ধতম এ কবি নিসর্গ ও নির্জনতাকে ভালোবেসেছেন। বর্ষার প্রতিও তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে ‘এ জল ভালো লাগে’ কবিতায়। এ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ বর্ষাকে তুলে ধরেছেন আরেক ভিন্নরূপে। তাঁর কাব্য ভাষায় - এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রুপালি জল কত দিন এসে ধুয়েছে আমার দেহ বুলায়ে দিয়েছে চুল চোখের উপরে তার শান্ত স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে আবেগের ভরে ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে; এই জল ভালো লাগে; নীলপাতা মৃদু ঘাস রৌদ্রের দেশে ফিঙ্গা যেমন তার দিনগুলো ভালোবেসে- বনের ভেতর বার বার উড়ে যায়, তেমনি গোপন প্রেমে এই জল ঝরে আমার দেহের পরে আমার চোখের পরে ধানের আবেশে...’ জীবনানন্দ সব সময়ে প্রকৃতি ও জীবনকে একই সমান্তরালে নিয়ে আসেন। তাঁর এ কবিতায়ও বর্ষা ও ব্যক্তিজীবন একাকার হয়ে আছে। বর্ষা নিয়ে কবি মহাদেব সাহার কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে দারুণ রোমান্টিকতা। তাঁর কাব্য ভাষায় - আমার কিন্তু বৃষ্টি খুব ভালো লাগে, বৃষ্টি আমার শৈশবের মতো মেয়েরা ভিজতে চায় বৃষ্টিতে, ভিজুক না মেয়েরা জলে না নামলে পদ্মফুল ফুটবে কেন! এই হলো বর্ষার দার্শনিক রূপ। বর্ষা শুধু বৃষ্টি নয়; বর্ষা মানে ঘন-কালো মেঘের ছুটাছুটি, বর্ষা মানে দুকূল প্লাবিত নদী, নালা, খাল-বিল; বর্ষা মানে উত্তাল ঢেউ আর যৌবন-জোয়ারের পূর্ণতা। তাই বর্ষার কবিতায় আমরা দিগন্ত প্লাবিত আকুল আবেগের সন্ধান পাই। শুধু কবিতায় নয়; আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম ছোটগল্পেও আমরা বর্ষার রূপবৈচিত্র্য ও প্রভাব দেখতে পাই। কবিতার পরিমিতিবোধে যে সীমাবদ্ধতা থাকে, সেটি ছাপিয়ে গল্পের আঙ্গিকে বর্ষা আরও বেশি সম্প্রসারিত ভাবের ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে। বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য গল্পে প্লাবিত বন্যা, বর্ষার জল, ঝড় ও ভারী বর্ষণের চিত্র দেখা যায়। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পে মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। “এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেক দিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বাইছে।... আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেয়াল; অনেক দিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে।” বর্ষার কোনো একটি মুহূর্ত কীভাবে মনকে মোহিত করে, সেই অনুভূতি খুঁজে পাওয়া যায় নাসির উদ্দীন বাকীর ‘বৃষ্টির গল্প’ নামক গল্পে। গল্পের বর্ণনায়, “শ্রাবণের রাত। সেই বিকেল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। জানালার গ্লাসে জমেছে ফোঁটায় ফোঁটায় জল। আবার গল্পের বইয়ে মনোযোগ দেই। রাত বাড়ে। ঘোর বর্ষার রাত।” বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উঠান উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণে, দৃশ্যকল্প তৈরিতে, কথোপকথনে বর্ষার প্রসঙ্গ বারবার আসতে দেখা যায়। মানিক বধ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’, হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’সহ অনেক উপন্যাসেই বর্ষার অনুপম দৃশ্যের বর্ণনা আছে। সৃজনশীল কাব্য-গান ও গল্প-উপন্যাসের মতো মননশীল প্রবন্ধেও খুঁজে পাওয়া যায় বর্ষার নান্দনিক বর্ণনা। প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বর্ষা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যে, যেদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় সমগ্র আকাশ বর্ষায় ভরে গিয়েছে। মাথার উপর থেকে অবিরাম অবিরল অবিচ্ছিন্ন বৃষ্টির ধারা পড়ছে। সে ধারা এতো সূক্ষ্ম নয় যে চোখ এড়িয়ে যায়, অথচ এতো স্থল নয় যে তা চোখ জুড়ে থাকে। আর কানে আসছে তার একটানা আওয়াজ; সে আওয়াজ কখনো মনে হয় নদীর কূলুধ্বনি, কখনো মনে হয় তা পাতার মর্মর।” এভাবেই বর্ষা প্রভাবিত করে চলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগৎকে। বর্ষা এমনই এক ঋতু; যার বৈচিত্র্যময় রূপের বর্ণনা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেও শেষ করা যাবে না। বর্ষা প্রকৃতির দশ দিককেই মোহিত করে। তবে বর্ষার কিছু বিষাদময় রূপও আছে। একটানা বর্ষণে অনেক সময় নদীভাঙন, ভূমিধস হয়। কৃষকের স্বপ্নের শস্য ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। নিম্ন আয়ের দিনমজুরেরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। তাই যারা দিন এনে দিন খায়, বর্ষা তাদের জন্য দারুণ দুশ্চিন্তার কারণ হয়। ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে নগরবাসীর দুর্ভোগ বেড়ে যায়। বর্ষার এই নেতিবাচকতা উপেক্ষা করেই বাংলা সাহিত্যে বর্ষার রূপমাধুরী বর্ণিত হয়েছে নানাভাবে। বর্ষার কবিতা ও গান যুগ যুগ ধরে পাঠক-শ্রোতাদের মননে ও হৃদয়ে আনন্দ-বেদনা, ভাব ও ভাবনার জন্ম দিয়েছে। তাই যাপিত জীবনে বর্ষার আবেদন চিরন্তন।
বাংলার সাহিত্যাকাশে হুমায়ূন আহমেদ এমন এক জাদুকর, যাঁর লেখার সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্ষা মানেই হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস, কদম ফুল, নীল শাড়ি আর এক অদ্ভুত উদাস করা নস্টালজিয়া। বৃষ্টিকে তিনি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঋতু হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে রূপ দিয়েছেন মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ ও অনুভূতির এক জীবন্ত ক্যানভাস হিসেবে। হুমায়ূন আহমেদের নাটক বা উপন্যাসে বৃষ্টি নামলেই যেন গল্পের মোড় ঘুরে যায়। তাঁর চরিত্রগুলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসে, বৃষ্টির শব্দ শুনে আনমনা হয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টি মানেই নুহাশপল্লীর মাটিতে ভেজা সোঁদা গন্ধ। বৃষ্টির ফোঁটায় গাছের পাতার শব্দ আর চারপাশের সবুজ যেন পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হুমায়ূন আহমেদের অনেক চরিত্র বৃষ্টিকে একা উপভোগ করতে ভালোবাসে। বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় দিয়ে রিকশায় চড়া কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখার দৃশ্য তাঁর লেখায় অত্যন্ত কাব্যিক রূপ পেয়েছে। এ ছাড়া তাঁর জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর জীবনেও বর্ষা এক বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। হিমুর পরনে থাকে পকেট কাটা হলুদ পাঞ্জাবি। বৃষ্টিতে ভিজে হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে যখন হিমু হেঁটে বেড়ায় নিউমার্কেট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে, তখন সেই দৃশ্যটি হয়ে ওঠে বোহেমিয়ান ও রহস্যময়। যুক্তিবাদী মিসির আলী হয়তো বৃষ্টির কাব্যিকতায় সঁপে দেন না নিজেকে, তবুও শরতের আকাশ বা আষাঢ়ের মেঘ তাঁর ভাবনার জগৎকেও কোথাও না কোথাও ছুঁয়ে যায়। বৃষ্টি নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত কিছু অনুভূতি ও ভাবনা আমরা সবাই জানি। তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টিতে বৃষ্টি নিয়ে এমন কিছু পঙক্তি বা দৃশ্য পাওয়া যায়, যা আজও পাঠকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে : "বৃষ্টি কার ভালো লাগে না? সবার ভালো লাগে। তবে বৃষ্টির নিজস্ব একটা দুঃখ আছে। সেই দুঃখ সবাই বুঝতে পারে না।" বর্ষার দিনে হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানেই ছিল এক কাপ গরম চা, টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ, যা মধ্যবিত্ত বাঙালির ড্রয়িংরুমের চেনার ছবি। বাঙালির কাছে হুমায়ূন আহমেদ আর বর্ষা সমার্থক এক নাম। যত দিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, তত দিন আষাঢ়ের প্রথম কদম ফুল আর ঝুম বৃষ্টির শব্দে ঘুরেফিরে আসবে হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি করা সেই মায়াবী জগৎ, যেখানে বৃষ্টি মানেই একবুক স্মৃতিকাতরতা আর অন্য রকম এক ভালো লাগা।
বাংলার প্রকৃতি ছয় ঋতুর অপূর্ব সমাহারে সাজানো। এ ছয় ঋতুর মধ্যে বর্ষা সবার চেয়ে অনন্য। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস নিয়ে বর্ষাকাল। আষাঢ়ের প্রথম দিন থেকেই আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করে। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো মুষলধারে বৃষ্টি নেমে আসে। চারদিকে জলের কলতান, ব্যাঙের ডাক, নদীর ঢেউ আর সবুজ প্রকৃতির মিলনে বর্ষা যেন নতুন প্রাণের বার্তা নিয়ে আসে। আষাঢ়ের মাস পড়তে না পড়তেই শুরু হয় বর্ষার আগমন। আকাশজুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা, দমকা হাওয়া আর অবিরাম বৃষ্টির ধারা প্রকৃতিকে বদলে দেয়। দীর্ঘ খরার পর যখন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা শুকনো মাটিতে পড়ে, তখন চারদিকে এক মিষ্টি সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এ গন্ধ মানুষের মনকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে ভরে ওঠে। নদী ফিরে পায় তার ভরা যৌবন। চারপাশে শুধু জল আর জল, যেন প্রকৃতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। বর্ষার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য দেখা যায় গ্রামবাংলায়। গ্রামের কাঁচা রাস্তা, সবুজ ধানের খেত, নদীর পাড় আর খাল-বিল বৃষ্টির পানিতে আরও সজীব হয়ে ওঠে। খালের ধারে, বিলের জলে ফুটে ওঠে সাদা ও লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হয় যেন জলের বুকে ফুলের মেলা বসেছে। গাছপালার ধুলোবালি ধুয়ে যায়, পাতাগুলো হয়ে ওঠে ঝকঝকে সবুজ। পাখিরা ডালে ডালে বসে গান গায়। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। বর্ষা শুধু সৌন্দর্যের ঋতু নয়, এটি কৃষকের আশীর্বাদের ঋতুও। বাংলাদেশের কৃষি অনেকাংশে বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার পানিতে জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা আসে। ধান, পাটসহ নানা ধরনের ফসল ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। নদীর পানি যখন উপচে জমিতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার সঙ্গে পলিমাটিও আসে। এই পলিমাটি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ফলে কৃষকরা পরবর্তী মৌসুমে ভালো ফলন পান। বর্ষা শেষে কৃষকের মুখে হাসি ফোটে। তাদের কষ্ট সার্থক হয়। বর্ষাকালে নদীনালায় মাছের পরিমাণও বেড়ে যায়। বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ খাল-বিল ও নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। সাধারণ মানুষও কম দামে মাছ কিনে খেতে পারে। যারা মাছ কিনে খেতে পারে না, তারাও বিভিন্নভাবে মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করে। তাই বর্ষা বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটির বাস্তব রূপ বর্ষাকালেই বেশি দেখা যায়। তবে বর্ষার যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনি রয়েছে কিছু কষ্ট ও দুর্ভোগ। অতিবৃষ্টির কারণে অনেক সময় বন্যা দেখা দেয়। নদীর পানি বেড়ে গ্রামাঞ্চলের বাড়িঘর, রাস্তা ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়। অনেক মানুষ গৃহহারা হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়। গবাদিপশু নিয়ে তারা চরম বিপদে পড়ে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। পানিবাহিত নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করে এ সময়। চরাঞ্চলের মানুষের জীবন বর্ষাকালে আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক সময় তাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়া সম্ভব হয় না। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়। তবুও এসব কষ্টের মধ্যেও মানুষ নতুন আশার স্বপ্ন দেখে। কারণ তারা জানে, বর্ষার এই পানি একদিন নতুন ফসলের সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। শহরের মানুষও বর্ষাকালের দুর্ভোগ থেকে মুক্ত নয়। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই অনেক শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রাস্তাঘাট ডুবে যায়, যানজট বেড়ে যায়। কর্মজীবী মানুষের চলাচলে সমস্যা হয়। তবুও শহরের পার্ক, গাছপালা ও খোলা মাঠে বর্ষার সৌন্দর্য এক অন্য রকম আবহ তৈরি করে। বর্ষা আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সংগীতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা কবিতা, গান ও গল্পে বর্ষার রূপ বারবার ফিরে এসেছে। কবিরা বর্ষার মেঘ, বৃষ্টি, নদী ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তাদের লেখায় অমর করে রেখেছেন। বর্ষার দিনে জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখা, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শোনা কিংবা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে মেঘমালা দেখা মানুষের মনে এক বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয়। বর্ষার রূপবৈচিত্র্য সত্যিই অসাধারণ। কখনো সে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে, কখনো আবার দুঃখ ও দুর্ভোগের কারণ হয়। তবুও বর্ষা ছাড়া বাংলার প্রকৃতিকে কল্পনা করা যায় না। নদী-নালা, খাল-বিল, মাঠ-ঘাট আর সবুজ প্রকৃতি বর্ষার স্পর্শে নতুন জীবন ফিরে পায়। বর্ষার জলধারা শুধু প্রকৃতিকেই নয়, মানুষের মনকেও সজীব করে তোলে। রাশি রাশি বৃষ্টির জলে যখন নদী-নালা ভরে ওঠে, মাঠ-ঘাট ডুবে যায়, তখনই প্রকৃতি তার সত্যিকারের বর্ষারূপ ফিরে পায়। জলমগ্ন বাংলার বুকজুড়ে তখন সৃষ্টি হয় এক অপার সৌন্দর্য। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর জীবনের নানা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বর্ষা বাংলার মানুষের জীবনে চিরকাল এক অনন্য ঋতু হয়ে থাকবে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।