ভারতের আসামে মাত্র দুই দিনের বিশেষ অভিযানে ১১০০টির বেশি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর রাজ্যের নগাঁও, গোলাঘাট ও হোজাই জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখলমুক্ত করতে এ অভিযান চালানো হয়। সংবাদমাধ্যম সিয়াসাত ডেইলির বরাতে জানা গেছে, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি কয়েক দশক পুরোনো ১০টিরও বেশি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর প্রথম দিনেই তিন জেলার ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। এর পরের দিন নগাঁওয়ের লুটুমারি-লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আরও পাঁচ থেকে ছয় শতাধিক পরিবারের স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় প্রশাসন। উচ্ছেদ শুরুর আগেই স্থানীয় অনেক বাসিন্দা নিজেদের সহায়-সম্বল গুটিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বনভূমি পুনরুদ্ধারে এ ধরনের অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। এদিকে নিজেদের অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করার সরকারি সিদ্ধান্ত দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ব্রিটিশ আমলে প্রচলিত ‘টাউঙ্গিয়া’ ব্যবস্থার অধীনে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবে সেখানে বৈধভাবেই বসতি গড়েছিলেন। উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা গৌহাটি হাইকোর্টে গেলেও আদালত বন সুরক্ষার স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁদের আবেদন নাকচ করে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আসামে বিজেপির এক দশকের শাসনামলে উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ১৯০০০ পরিবারের অধিকাংশই মুসলিম। বনভূমি সংরক্ষণের যুক্তি দেখিয়ে সরকার এ পদক্ষেপ নিলেও স্থানীয়দের ভূমির অধিকার ও পুনর্বাসন সংকট নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজ আর প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক যুগ ছাড়িয়ে উত্তর-আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে বেশ আগে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের পরিক্রমায়, মন-মননের চিন্তাভাবনা ধ্যানধারণায় বৈশ্বিক মেরুকরণের আবর্তনে বা বিবর্তনে সগৌরবে মর্যাদার আসনে আসীন। যেখানে পরিবর্তনই সময়ের ধর্ম, বিপর্যয়ও সেখানে মহিমান্বিত। হোক গদ্য কিংবা পদ্যের ভাষা; ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস সবিস্তর। শাসন-শোষণে ঔপনিবেশিক হিংস্রতার পরিমাণ অপরিমেয়। ধ্বংসযজ্ঞের করুণ পরিণতি সীমাহীন। বাঙালির রক্তে ভেজা মাটি সাত সমুদ্রের মতো। প্রবল বন্যায় সবকিছু যেমন ভাসিয়ে নেয় কিংবা ভূমিকম্পের তীব্রতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বস্তুগত-অবস্তুগত তথা প্রাণের বিপর্যয় ঘটে, অস্তিত্ব মুখথুবড়ে পড়ে, সেখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অক্ষত থাকার চিন্তা বাহুল্য। মূল কথা হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর কৃত্রিম দুর্যোগ বিপর্যয়ের চরম ধ্বংসাত্মক শক্তির দুই ভাই। এক ভাইয়ের আক্রমণে কিছু থাকে তো আরেক ভাইয়ের আক্রমণে স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার বারোটা বাজে। বাংলার সংস্কৃতি ও বাংলা গদ্যের বেলায়ও ঠিক তেমন। বিজাতি বা বিভাষী হলো দুর্যোগ, কিন্তু দুর্যোগেরও একটা উপকারী দিক থাকে। যেখানে উর্বরতা বাড়ে, সেখানে ফসল ফলানোও যায় ভালো। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিজাতীয় ভাষা বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিতে কী পরিমাণ অবদান রেখেছে, সেটা সাহিত্যের আদিমতম ইতিহাস বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। তাই দুর্যোগের পরও কিছু নতুনত্ব থাকে। এই রূপান্তরের বিবর্তন পর্যায়ক্রমে জ্ঞাত হওয়া যায় ভাষা ও সাহিত্যের আদি গ্রন্থগুলোর পণ্ডিতদের মতামত ও বিভেদের আলোচনা-সমালোচনা থেকে। বাংলা ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য বা গুণ সহজ-সরল, সাবলীল, প্রাঞ্জল, অসংযতহীন ও ধ্বনিমাধুর্য লক্ষ করা গেলেও পরবর্তী সময়ে বাংলা গদ্যে দুর্বোধ্যতা ও জটিলতা পরিলক্ষিত হয়; যার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পাশ্চাত্য প্রভাব আর বিজাতি ও বিভাষীয় ক্ষমতার প্রভাবে বাংলা ভাষার প্রাণস্পন্দন, শেকড় বা নাড়ির টানের ব্যবচ্ছেদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস চর্যাপদ থেকে ধরা হলেও শুভযাত্রা তারও অনেক পরে। মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও রামগতি ন্যায়রত্নের ‘বঙ্গ ভাষার ইতিহাস’ ও ‘বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থ দুটিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করলে কোনটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম আলোচিত গ্রন্থ, তা নিয়ে মতভেদ লক্ষ করা যায়। তবে সপ্তম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় লেখার শিরোপা বা মুকুট চর্যাপদের লেখক মীননাথকেই দিতে হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রথম উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ পদ্মনাভ ঘোষাল ও অবিনাশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘গৌড়ীয় ভাষাতত্ত্ব’ (১৮৭৫), রাজনারায়ণ বসুর ‘বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বক্তৃতা’ (১৮৭৮), হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বর্তমান শতাব্দীর বাঙ্গালা সাহিত্য’ (১৮৮১) এবং দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ (১৮৯৬) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থের আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে এবং নানা মতভেদের আলোকে বলা যায়, বাংলা গদ্য সাহিত্যের যাত্রা উনিশ শতক থেকে শুরু হয়েছিল। অনেকে বাংলা গদ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন ষোড়শ শতাব্দীতে ‘বাংলা সাহিত্য’ সূচনার মাধ্যমে। আবার কেউ কেউ বলেন বৈষ্ণব সাধনতত্ত্ব বিষয়ক গদ্যগ্রন্থকে। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসকে বাংলা গদ্যের আদি লেখক বলা হলেও মতভেদ রয়েছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী কালকে সজনীবাবু অন্ধকার যুগ বলেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অন্ধকার যুগে হয়তো তেমন কোনো সাহিত্যকর্মের নিদর্শন পাওয়া যায়নি বটে, কিন্তু তার পরও এই সময়ে প্রাপ্ত ও রচিত প্রধান সাহিত্য ও নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাক ও খনার বচন, প্রাকৃতপৈঙ্গল, শূন্যপুরাণ ও সেকশুভোদয়া। সজনীবাবু নবম শতাব্দী সময়কাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যের অভাববোধ করেছেন। যদিও পর্তুগালের লিসবনে প্রথম বাংলা গদ্যগ্রন্থ ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ (১৭৪৩) মুদ্রিত হয়। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা গদ্য সাহিত্য ভাব ও কাজের গদ্য নিদর্শন প্রতীয়মান। কারণ, এ সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুলতানি আমলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ষোড়শ ও সতেরো শতকে সুলতানি আমলে নবাবদের মৌঠুহর অঙ্কিত বাংলা লেখায় জয়পুত্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একই শতাব্দীতে আসাম, ত্রিপুরা ও কাছাড়ের মতো রাজ্য বা প্রদেশের সরকারি কাজকর্মের ভাষাও ছিল বাংলা, যা মহারাজ নারায়ণের পত্রেও দেখা গেছে। এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, প্রাচীন বাংলা গদ্য সাহিত্য আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যকে বিকশিত করেছে। বাংলা গদ্যের এই বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে মধ্যবিত্ত সমাজের আত্মবিকাশে এবং জীবন জিজ্ঞাসার তাড়নায়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য উচ্চশিক্ষিত তরুণদের যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাভাবনা, চেতনা, ভাবের গভীরতা ও ভাবের বাহনই ছিল গদ্য। গদ্য যুক্তি, তর্ক-বিতর্ক, তর্ক-বিবাদ, বিচার-বিশ্লেষণের ভাষা, আর পদ্য আবেগ, অনুভূতি, উচ্ছ্বাস ও কল্পনার ভাষা। বাংলা গদ্যের বিকাশে পয়ার ছন্দের একটা আধিপত্য ছিল। অন্যদিকে গদ্য-পদ্যরীতিতে সাম্যভাবমূলক মিলন দেখা যায়, যার মাধ্যমে আখ্যায়িকা বিবৃতি, প্রথাবদ্ধ দেবার্চনা বর্ণনা, বাদপ্রতিবাদ ও কথোপকথন প্রভৃতি কাব্যাঙ্গে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা কাব্যোৎকর্ষের মানদণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। এটা গুণগত দিক থেকে মানসম্মত না হলেও এর উপযোগিতা অসাধারণ ও অসামান্য।, যা কাব্যজগতের ত্রিশংকু কবিতার স্বর্গ এবং গদ্যের মর্ত্য বলেই বিবেচিত। রেনেসাঁসের আগে ইউরোপের কোথাও পুরোপুরি সাহিত্যিক গদ্যের বিকাশ ঘটেনি। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধের ইংরেজি সাহিত্যে সাহিত্যিক গদ্য ছিল না। ইংরেজি সাহিত্যে গদ্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটে সপ্তদশ শতাব্দীতে ড্রাইডেনের হাতে, তা-ও পদ্য সাহিত্য মারফতে। এর আগে শেকসপিয়ার ও বেকনের গদ্যটাও ছিল কাব্যগদ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে প্রসার ঘটতে থাকে মুদ্রাযন্ত্রের ইংল্যান্ডের হাত ধরেই। ফলে গদ্যের পথ প্রসারিত হতে থাকে। উন্মুক্ত হতে থাকে। প্রসার ছড়িতে পড়তে থাকে ইন্টারনেটের মতো বিশ্বব্যাপী। স্বাধীন বাংলাদেশের গদ্যের বিকাশও স্বাভাবিকভাবে এর আওতাধীন হয়ে পড়ে। মুদ্রণ ও পুস্তক ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। আলতুস, মানুটিয়াস, প্রথম ফ্রান্সিস নাভাবের রানি, মার্ঘারেটের মতো ব্যক্তিরা তখন খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁদের মধ্যে মার্গারেট ইতালির স্টাইলে রচনায় উদ্বুদ্ধ করতেন, যা পরে ফরাসিরা লুফে নেন। ফরাসি গদ্যের নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রসার লাভ করতে থাকে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।