Breaking news

বাংলাদেশ টেলিভিশন

প্রতীকী ছবি
বিটিভির লোগো বদল নয় : ইতিহাস মুছে ফেলার এই উদ্যোগ বন্ধ করুন

বাংলাদেশ টেলিভিশন সংক্ষেপে বিটিভি। নামটি উচ্চারণ করলেই বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্মের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি পরিচিত দৃশ্য—লাল-সবুজের সেই প্রতীক। এই প্রতীক শুধু একটি লোগো নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও পরিচিত দৃশ্যমান চিহ্ন। এটি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক যাত্রার সাক্ষী। এটি কোটি মানুষের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য ও জীবনের অসংখ্য স্মৃতির অংশ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসের এক উজ্জ্বল প্রজন্ম। সেই ঐতিহাসিক লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ আমরা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।   এটি কোনো সাধারণ নকশা বদলের বিষয় নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় প্রতীককে সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ। আর বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এমন কোনো প্রতীককে ক্ষমতাসীনদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে পরিবর্তন করার অধিকার কোনো সরকারের নেই।   এই লোগো কারা তৈরি করেছিলেন, সেটিও মনে রাখা দরকার। আজ যাঁরা বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন, তাঁদের আগে জানা উচিত এই লোগোর পেছনে কারা ছিলেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা ও সাম্প্রতিক গবেষণামূলক প্রতিবেদনে শিল্পী ইমদাদ হোসেনকে বিটিভির ঐতিহাসিক লোগোর মূল নকশাকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে লোগো তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে শিল্পী কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার এবং শিল্প নির্দেশক মহিউদ্দিন ফারুকের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ এই লোগো এক দিনের কোনো সাধারণ অফিশিয়াল নকশা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন সব মানুষ, যাঁরা বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।   সাদা-কালো যুগ পেরিয়ে যখন বাংলাদেশ টেলিভিশন ১৯৮০ সালে রঙিন সম্প্রচারে প্রবেশ করে, তখন ঐতিহাসিক লোগোটির পুনরায় রঙিন উপস্থাপনার সঙ্গে মুস্তাফা মনোয়ারের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেই আজকের সিদ্ধান্তের একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। সাদা-কালো থেকে রঙিন সম্প্রচারে যাওয়ার মতো এত বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময়ও যখন এই ঐতিহাসিক পরিচয়কে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়নি, তখন আজ কোন যুক্তিতে সেটিকে পরিবর্তন করতে হবে?   প্রযুক্তি বদলেছে। সম্প্রচারব্যবস্থা বদলেছে। টেলিভিশনের পর্দা বদলেছে। বাংলাদেশ বদলেছে। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক পরিচয় তার ঐতিহ্য নিয়ে টিকে থেকেছে। তাহলে আজ হঠাৎ কেন সেটিকে বদলে দিতে হবে? ভাবুন একবার—দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে। একটি নতুন রাষ্ট্র তার নতুন পরিচয় নির্মাণ করছে। সেই সময় বাংলাদেশের শিল্পীরা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের একটি প্রতীক নির্মাণ করছেন। সেই প্রতীক পরবর্তী পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। আর আজ স্বাধীনতার এত বছর পর এসে সেই প্রতীককেই বদলে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে! এটি কি এতটাই তুচ্ছ একটি বিষয়? আমরা বলি, ‘না’। একটি লোগোর ভেতরে একটি সময়ের ইতিহাস থাকে। বিটিভির লাল-সবুজ লোগোকে যারা কেবল একটি গ্রাফিক ডিজাইন হিসেবে দেখেন, তাঁরা এই প্রতীকের সামাজিক ও ঐতিহাসিক মূল্য বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন। একটি জাতির ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। ইতিহাস থাকে স্থাপনায়। ইতিহাস থাকে স্মৃতিস্তম্ভে। ইতিহাস থাকে ছবিতে। ইতিহাস থাকে গানে। ইতিহাস থাকে চলচ্চিত্রে। ইতিহাস থাকে মানুষের স্মৃতিতে। আর ইতিহাস থাকে প্রতীকে। বিটিভির লোগো সেই প্রতীকগুলোর একটি।   স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমের পর্দায় এই প্রতীক ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের দৃশ্যমান পরিচয়ের অংশ। দশকের পর দশক ধরে মানুষ এই প্রতীক দেখেছে। এই প্রতীক দেখেই বুঝেছে—এবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। একটি প্রজন্ম এই প্রতীক দেখে বড় হয়েছে। তারপর সেই প্রজন্মের সন্তানরাও একই প্রতীক দেখেছে। এটি তাই একটি প্রজন্মের নয়—প্রজন্মের পর প্রজন্মের উত্তরাধিকার।   সাদা-কালো থেকে রঙিন—তবুও ইতিহাস বদলাতে হয়নি। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ টেলিভিশন যখন সাদা-কালো সম্প্রচার থেকে রঙিন সম্প্রচারে প্রবেশ করল, তখন প্রযুক্তিগতভাবে সেটি ছিল একটি বিশাল পরিবর্তন। কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য বিটিভির ঐতিহাসিক পরিচয়কে ছুড়ে ফেলার প্রয়োজন হয়নি। ঐতিহাসিক লোগোই নতুন রঙিন যুগে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি বদলেছে—ইতিহাস বদলায়নি। সময় বদলেছে—পরিচয় বদলায়নি। সম্প্রচারব্যবস্থা বদলেছে—ঐতিহ্য বদলায়নি। আজকের দিনে এসে সেই ঐতিহ্যকে কেন বদলে ফেলতে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর জনগণ জানতে চায়।   আজ কেন এই পরিবর্তনের প্রয়োজন? বিটিভির বর্তমান কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবেই লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন লোগোর জন্য সাধারণ মানুষ ও ডিজাইনারদের কাছ থেকে ধারণা ও নকশা আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন আরও মৌলিক।   বিটিভির সবচেয়ে বড় সমস্যা কি তার লোগো? মানুষ কি বিটিভি দেখে না তার লোগো পুরোনো বলে? নাকি মানুষ প্রশ্ন তোলে অনুষ্ঠান ও কনটেন্টের মান নিয়ে? সংবাদ পরিবেশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে? প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে? প্রতিভাবান শিল্পী ও নির্মাতাদের যথাযথ সুযোগ দেয়া নিয়ে? প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে? দর্শকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের দূরত্ব নিয়ে?   বাংলাদেশ টেলিভিশনের সামনে যদি সত্যিই এত বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন থাকে, তাহলে দেশের মানুষ জানতে চায়—লোগো পরিবর্তনই কেন অগ্রাধিকার? বিটিভির দর্শক কি তার লোগো নিয়ে অসন্তুষ্ট? বাংলাদেশের মানুষ কি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করেছে যে এই লোগো পরিবর্তন করতে হবে? কোনো গণ-আন্দোলন হয়েছে? কোনো জনগণভিত্তিক দাবি উঠেছে? কোনো প্রজন্ম কি বলেছে—এই প্রতীক আর আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না? না। বরং এই লোগো এখনো মানুষের কাছে পরিচিত, আবেগের ও স্মৃতির প্রতীক। তাহলে কার প্রয়োজন মেটাতে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ? জনগণের? নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া জরুরি।   যদি সত্যিই বিটিভিকে বদলাতে হয়, তাহলে বদলানোর জায়গা কি এতটাই কম যে প্রথম আঘাতটি করতে হবে তার ঐতিহাসিক লোগোর ওপর? একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের দুর্বলতা ও প্রাণহীন জায়গাগুলো না বদলে তার স্মৃতি বদলে দেয়াই কি আধুনিকায়ন? আমরা তা মনে করি না।   আমরাও পরিবর্তনের পক্ষে, তবে সেই পরিবর্তন ইতিহাস, ঐতিহ্য আর লোগোর নয়; বরং বিটিভির ভেতরের সিস্টেমের। আধুনিকতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে প্রথা ও অনুষ্ঠানের মান উন্নয়ন করতে হবে, কনটেন্টে পরিবর্তন আনতে হবে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। লোগো পরিবর্তন করে ইতিহাস মুছে ফেললেই আধুনিক হওয়া যায় না। বরং আধুনিকতা তাকেই বলে—নিজের চেহারা বদলানো নয়, নিজের আচরণ বদলানো।   রাষ্ট্রীয় প্রতীককে রাজনৈতিক সময়ের অধীন করা যাবে না। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের দৃশ্যমান চিহ্ন নিয়েও একধরনের পরিবর্তনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার স্মারক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ঐতিহাসিক নাম, ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও বিভিন্ন দৃশ্যমান প্রতীক নিয়ে পরিবর্তন, অপসারণ কিংবা পুনর্বিন্যাসের ঘটনা ইতোমধ্যেই জনপরিসরে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে।   ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্মৃতিবাহী বিভিন্ন স্থাপনা ও শিল্পকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে যদি এখন রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা-উত্তর ঐতিহাসিক পরিচয়ও পরিবর্তনের আওতায় আসে, তাহলে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক—আমরা কি সত্যিই ইতিহাস সংরক্ষণ করছি, নাকি ইতিহাসের দৃশ্যমান চিহ্নগুলো একে একে মুছে দিচ্ছি? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা নয়। ইতিহাস হলো একটি জাতির স্মৃতি। আর যে জাতি তার স্মৃতির দৃশ্যমান চিহ্নগুলো একে একে মুছে ফেলে, একসময় তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজের ইতিহাসই অপরিচিত হয়ে ওঠে।   আজ বিটিভি—আগামীকাল আর কী? আজ যদি বলা হয় একটি ঐতিহাসিক লোগো পুরোনো, তাই সেটি বদলে দিতে হবে, তাহলে আগামী দিনে অন্য কোনো ঐতিহাসিক প্রতীকও একই যুক্তিতে বদলে দেয়া সম্ভব। তারপর আরেকটি। তারপর আরেকটি। একসময় দেখা যাবে, নতুন প্রজন্মের সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসের দৃশ্যমান পরিচয়গুলোই আর অবশিষ্ট নেই। এভাবেই ইতিহাস একদিন মুছে যায়। একবারে নয়। একটি করে। একটি নাম দিয়ে। একটি প্রতীক দিয়ে। একটি স্থাপনা দিয়ে। একটি লোগো দিয়ে। আর তাই আজ প্রতিবাদ করা প্রয়োজন।   আমরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো সরকারের সম্পত্তি নয়। কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের ইতিহাসের দৃশ্যমান চিহ্নগুলো নিজের রাজনৈতিক বয়ান অনুযায়ী মুছে দিতে পারে না। সরকার পরিবর্তন হবে। ক্ষমতার মানুষ পরিবর্তন হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তন হবে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ইচ্ছা অনুযায়ী পুনর্লিখন করা যাবে না। যে শিল্পীরা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণে অবদান রেখেছেন, তাঁদের সৃষ্টি মুছে দিয়ে নতুন করে ইতিহাস সাজানোর অধিকার কারও নেই। ইতিহাসকে পছন্দমতো সম্পাদনা করা ইতিহাসচর্চা নয়—এটি ইতিহাসের প্রতি অন্যায়।   আমাদের প্রতিবাদ স্পষ্ট। আমরা বিটিভির ঐতিহাসিক লাল-সবুজ লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগের ঘোর বিরোধিতা করছি। আমরা এই উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, এটি কেবল একটি লোগো পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান উত্তরাধিকারকে সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ। এই লোগোর সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের প্রতি এটি অসম্মান। এই দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতি এটি অবজ্ঞা। প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতির প্রতি এটি অবহেলা এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান চিহ্নের প্রতি এটি অন্যায়। তাই আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বিটিভির ঐতিহাসিক লাল-সবুজ লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এই ঐতিহাসিক প্রতীককে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বলি করা যাবে না। বরেণ্য শিল্পীদের সৃষ্টি মুছে ফেলার এই উদ্যোগ প্রত্যাহার করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের দৃশ্যমান স্বাক্ষরগুলো রক্ষা করতে হবে।   আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাসের প্রতীকও পরিবর্তিত হবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র পুরোনো স্মৃতি মুছে দিয়ে নিজের পছন্দের ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে আমাদের সন্তানদের সামনে বাংলাদেশের ইতিহাসের দৃশ্যমান চিহ্নগুলো একে একে অদৃশ্য হয়ে যাবে। আমরা ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতির বিরুদ্ধে। আমরা স্বাধীনতার স্মৃতি মুছে ফেলার বিরুদ্ধে। আমরা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার বিরুদ্ধে। আর সেই কারণেই বিটিভির লাল-সবুজ লোগো নিয়ে আমাদের অবস্থান একেবারে পরিষ্কার—এই লোগো পরিবর্তন করা যাবে না। কারণ, এটি কোনো সরকারের লোগো নয়। কোনো দলের লোগো নয়। কোনো ব্যক্তির লোগো নয়। এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যের। এটি সেই বাংলাদেশের, যে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর নিজের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের পর্দায় নিজের একটি নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি সেই বাংলাদেশের, যার শিল্পীরা এই প্রতীক নির্মাণে যুক্ত ছিলেন। এটি সেই বাংলাদেশের, যে বাংলাদেশের মানুষ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্রতীককে দেখে এসেছে। এটি আমাদের স্মৃতি। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার ইতিহাসের অংশ।   সরকার বদলাবে। ক্ষমতা বদলাবে। সময় বদলাবে। কিন্তু ইতিহাস বদলানোর অধিকার কারও নেই। বিটিভির লাল-সবুজ লোগো থাকুক। স্বাধীনতার এই দৃশ্যমান স্বাক্ষর থাকুক। বাংলাদেশের ইতিহাস বাংলাদেশেরই থাকুক।      

সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0