আমি জন্মের পরই প্রথম চোখ মেলে বাবাকে দেখেছিলাম। বাবা ডাক্তার হওয়ার সুবাদে আমার জন্ম জটিলতায় জন্য বাবা আঁতুর ঘরে ঢুকে পড়েছিলেন। বাবাকে নিয়ে লেখা বিরাট দুঃসাধ্য ব্যাপার। যখন সাংবাদিকতা করেছি, তখন বাবাকে নিয়ে কত তত্ত্বকথা লিখেছি। আর আজ এত বছর পর সত্যিই নিজের বাবাকে নিয়ে লিখতে বসে কিছুই মাথায় আসছে না। কত জ্ঞানী-গুণীজন বাবাকে নিয়ে কত কথা মধুরতার শব্দ চয়ন করে গেছেন, আর আমি? বটবৃক্ষ থেকে শুরু করে মাথার ওপর বিশাল আকাশ, ছাদ আরও কত কী লিখেছেন। সেই তুলনায় আমার বাবা তো কিছুই না, তবুও প্রত্যেক সন্তানের কাছে বাবা মহামূল্যবান মহিরুহ। আমার বাবা আমার জীবনের ছোট্ট একচিলতে চিলেকোঠা মাত্র। যে চিলেকোঠার দরজা-জানলা খুলে দিলেই বাবা হুহু করে সারা শরীরে শীতল পরশ বুলিয়ে দেয়। যতদূর যেদিকে চোখ যায়, শুধু বাবার মুখ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। চারদিকে গাছ। গাছে পাখপাখালির কণ্ঠে বাবার সেই পোষা ময়নার অবিকল ‘বাবা’ ডাক। বৃষ্টির রাতে বাবার গায়ের সাথে লেপ্টে পেটের ওপর পা তুলে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা অথবা বাবার কৈশোরে যৌবনের রূপকথার গল্প শোনা, এ যেন আরেক রূপকথার জন্মদাতা। জন্মের মাত্র এগারো দিনের মাথায় আমার বাবা তাঁর বাবাকে চিরকালের জন্য হারিয়েছেন। সেই পিতৃহারা মানুষটি পরবর্তী সময়ে বারো সন্তানের জনক হয়েছেন। চার সন্তানের শোক বুকে নিয়ে আটটি সন্তানকে তাঁর আদর্শ, মেধা, ধৈর্য, সততা দিয়ে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার অবধি নিয়ে গেছেন। এ হলো আমার বাবা; আমার গর্ব। আমার বাবা একজন নিষ্ফলা কৃষিপ্রেমিক। পেশায় ডাক্তার হওয়া সত্ত্বে কৃষির সাথে, মাটির সাথে সখ্য ছিল বলেই গ্রামের এক অপরূপ সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়ে বিয়ে করেন। আমৃত্যু গ্রামেই সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করেছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের সেবা করেছেন। তালগাছ হয়ে বাবা বাবুই পাখির মতো আটটি শৈল্পিক বাসা বুনন করে আমাদের ভালোবাসাময় সম্পর্কে মানুষ গড়ার কারিগর হতে চেষ্টা করেছেন। শেষটা তিনি আর দেখে যেতে পারলেন না। শেষের দিকের বাবা ঝড়ে বিধ্বস্ত ছেঁড়া পাল আর ভাঙা মাস্তুল নিয়েই হাল ধরার চেষ্টা করেছেন। ঘাটে তরি ভেড়ার আগেই লিভার সিরোসিসে এক পড়ন্ত বিকেলে বাবা না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। বাবা যখন শেষ যাত্রায় রওনা হলেন, তখন আমাকেই শেষবারের মতো দেখলেন, সেই আঁতুর ঘরে আমি যেমন বাবাকে প্রথম দেখি। বাবাকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বাবা হলো আমার জীবনের শীতলতম ছায়া মুখে শাসন, বুকে যার অন্তহীন মায়া আমার কাছে বাবা মানে কঠোর নিরাপত্তা বাবা, সে তো সবার জীবনে অকৃত্রিম এক সত্তা। আমার জীবনে বাবার শ্রম আর ত্যাগ যে অমূল্য এ ধরার কোনো ধন-সম্পদ নয়তো তাহার তুল্য আমার কাছে বাবা ছিল শিক্ষার এক প্রতিষ্ঠান হেথায় তিনি জীবন যুদ্ধে জয়ের মন্ত্র শেখান। প্রতিদিন কত কষ্ট করে রোদে পুড়ে ঘামে ভিজে আমাদের না খাওয়ায়ে খাওনিকো তুমি নিজে ভালোবাসা শুধু দিয়েছ মোদের চাওনি কোনো প্রতিদান যতদিন বাঁচি এই হৃদয়ে রবে তুমি অম্লান। বাবা তোমায় ভালোবাসি পারিনি কখনো বলতে তুমি আমার সাথেই আছ প্রতিটি পথ চলতে না ফেরার দেশে তুমি আজ পাব না তোমায় আরও বাবা, তুমি ছিলে এই ভুবনে, আমার প্রথম হিরো।
এক দিন দুদিন করে বাবার বুকেই কেটে যায় শৈশবের কয়েকটি বছর। আজ যেভাবে আমরা সন্তানকে রাতে বুকের ওপর শুইয়ে রাখি, এক দিন আমার বাবাও তার বুকের ওপর আমাকে ঘুমিয়ে রাখত। বাবারা এভাবেই সব সহ্য করে। বুকে সন্তান আর মাথায় সংসারের বোঝা বহন করে বাবা। কোনো দিন সন্তান বোঝা না হলেও ঠিকই অনেক বাবা একদিন সন্তানের কাছে বোঝা হয়! কেউ কেউ তাদের ছুড়ে ফেলে রাস্তায়। আমার বাবাকে আমি বহুভাবে দেখেছি। আমার শিশুবেলায় বাবার কাঁধে চড়ে যখন পৃথিবীটাকে দেখতাম, তখন বাবা ছিল এক রকম। বুঝতাম, বাবাদের কাঁধ আমার আশ্রয়। বিকেল হলেই কাঁধে চড়ে মাঠে যেতাম। যখন শিশুকাল পেরিয়ে আমি মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াই কৈশরের রঙিন জগতে, বাবা তখন আমার হিরো। আমি বাবাকেই অনুসরণ করতাম, আর আমার বড় হওয়ার সাথে সাথে বুঝলাম বাবা এক বটবৃক্ষ। শুধু বটবৃক্ষ নন, বাবা এক মেশিন। টাকা দরকার, পাচ্ছি, খাবার দরকার, বাবা বাজার থেকে আনছেন। সত্যি বলতে কি জীবনে যে নিশ্চিন্ত কয়েকটি বছর, তা কেবল মা-বাবা জীবিত থাকাকালীন শৈশব আর কৈশরের দিনগুলোই। তার পর থেকে সব ফ্যাকাশে হতে থাকে। সংসারে বাবাকে আমি বেশি অনুভব করেছি আমি নিজে বাবা হওয়ার পর থেকে। বাবাকে নিয়ে যেসব প্রশ্নের উত্তর আমি যৌবনে পাইনি, সেসবের উত্তর পেয়েছি আমি বাবা হওয়ার পর। বাবা যে সংসারের একটি বটগাছ, তখন আমি আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করি। আমাদের সমাজে যখন মাতৃত্বের জয়গান, সেখানে কমই বন্দনা হয় পিতৃত্বের, এ দোষ সমাজের নয়। আমাদের দৃষ্টিতে এই দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত সংসারেই। পরিশ্রান্ত সংসারের বাবার সাথে তার আদরের সন্তানদের দেখা হয় কমই। আহারের জোগান দিতেই কেটে যায় দিন-রাত। কোনোমতে টানা একটি সংসার সন্তান নিয়ে মা যখন কষ্ট করে, তখন সেটা চোখে পড়ে কিন্তু পেছন থেকে পুরো পরিবারের জন্য অবিশ্রান্ত খেটে যায় সেই সংসারের বাবা। আমার শৈশবের দেখা বাবা তখন বদলে যায়। আমি তখন বাবাকে বুঝতে শিখি। আমি বুঝতে পারি কেন বাবার কাছে চাইলেই কোনো জিনিস সহজে পাই না। একসময় ভাবতাম, হয়তো বাবা ইচ্ছে করেই আনে না। পরে বুঝলাম, এর জন্যও বাবার চোখের জল ঝরে। এই বাবার হাত ধরেই আমার স্কুলজীবনের সাথে পরিচয়, আমার প্রথম বাইরের জগতে পা রাখা। যখন আমি আমার সন্তানের চাহিদার জোগান দিতে পারতাম না, তখন বাবার মুখটা মনে পড়ত। বাবাও হয়তো দিতে না পারার কষ্টে বিঁধত। আমি ভাবতাম, বাবা চাইলেই পারে। বাবার ঘামে ভেজা শার্টের প্রতি বিরক্ত ছিলাম। বছর কেটে যেত এক জোড়া শার্ট আর প্যান্ট দিয়ে। জুতো জোড়া কেটে যেত বছরের পর বছর। কোনো দিন দেখিনি একটু বিলাসিতা করে সময় কাটানো। ভাবতাম, বাবারা মনে হয় এতটাই ব্যস্ত হয়। কিন্তু বুঝতাম না সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেন বাবা ব্যস্ত থাকে? আজ জানি, মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবারা কোনো দিনই অবকাশ পায় না। পরিবারের সদস্যদের চিন্তা করতে করতেই দিন-রাত এক হয়ে যায়। এই যে আজ কত বাবাকে দেখা পাওয়া যায় দেশের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে, এসব কেন হয়েছে? আইন করে মা-বাবাকে সন্তানদের কাছে রাখতে বাধ্য করতে হবে। যখন দেখি সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে বাবার লাশটা পর্যন্ত কবর দিতে আটকে রাখা হয়েছে, তখন মনে হয় বাবার ছোট্ট ওই বুকটা যে বড় জমিন ছিল, সেখানে তো সবার ঠাঁই ছিল। আজ তবে কেন এই পরিহাস! একবার অবশ্য অবসরের সময় পায়। আমার বাবাও পেয়েছিল। যেদিন আমার বাবার দেহটা নিথর নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সেদিন আর বাবার কোনো ব্যস্ততা দেখলাম না। দেখলাম, আমার মধ্যবিত্ত বাবার তখন আর কোনো তাড়া নেই। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। সংসারের সব ভার তখন ছেড়ে দিয়েছে আমার ওপর। মধ্যবিত্ত মার্কা সংসার আমাকে স্পর্শ করেনি। অথচ মানুষটাকে আমি কোনো দিন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পর্যন্ত দেখিনি। ঘুমের ভেতরেই কী যেন ভাবত! আমি জানি, বাবা সংসারের কথা ভাবত। পরদিন কী দিয়ে চলবে, সেই কথা ভাবত। মধ্যবিত্ত বাবাদের এ কথা ভাবতে হয়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আমি বাবাকে সংগ্রাম করতে দেখেছি। আমি নিজেও এখন বাবার মতো হয়ে গেছি। এক শার্ট গায়েই মাসের পর মাস কেটে যায়। আর নতুন জুতো তো কয়েক বছর। আমিও পরের দিনের কথা ভাবি। আর রাত একটু গভীর হলে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরি। এভাবে বহু বাবা রাতে ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে, সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে না পারায় নীরব থাকে। রাতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কোটি কোটি নক্ষত্রের মাঝে বাবাকে খুঁজি। বাবাকে কিছু কথা বলতে চাই। বলতে চাই, বাবা আমি ধীরে ধীরে তোমার মতো হয়ে গেছি। একদিন ঠিক তোমার কাছেই চলে আসব। বাবাকে এখন সবচেয়ে বেশি মিস করি। তখন বাবার সম্পর্কে যে ধারণাগুলো ছিল, এখন তা পাল্টেছে। জানি, একদিন আমিও বাবার মতো থেমে যাব। সব বাবাকেই থেমে যেতে হয়। আবার সব বাবাই বেঁচে থাকে সন্তানের বুকে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।