নদী মানে শুধু পানি নয়; নদী মানে জীবন, জীবিকা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য আশীর্বাদ। দেশের বুকজুড়ে সুতোর মতো ছড়িয়ে আছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, ব্রহ্মপুত্রসহ শত সহস্র নদ-নদী। এসব নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনপদ, বিকশিত হয়েছে কৃষি, মৎস্য, নৌযোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অবলম্বন। পৃথিবীর প্রায় সব প্রাচীন সভ্যতাই নদীকেন্দ্রিক। বসতি স্থাপন, কৃষিকাজ, পানীয় জলের সংস্থান এবং যোগাযোগের জন্য মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশেও জনবসতির বিস্তার ঘটেছে মূলত নদীতীরবর্তী এলাকায়। ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরাপদ সুপেয় পানির প্রাপ্যতা বজায় রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নদীর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ সংরক্ষণ অপরিহার্য। আজ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর দিকে তাকালে মনে হয়, তাদের বুকে জমে আছে বহু বছরের নীরব আর্তনাদ। যে নদীগুলো একসময় প্রবল স্রোতে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল, সেগুলোর অনেকই আজ নাব্যতা হারিয়ে সংকুচিত ও প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, জীবিকা, ইতিহাস ও আবেগের প্রতীক তিস্তা নদী আজ সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে উজানের দেশ ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণ, বাঁধ নির্মাণ এবং একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশের তিস্তাসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার কোটি কোটি মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর গতিপথ রোধ করে গড়ে ওঠা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেশের অভ্যন্তরীণ নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, কপোতাক্ষ, চিত্রা, নবগঙ্গা, লবণদহ, হরিধোয়ার মতো ২৯টি নদীকে জৈবিকভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নদী ও শাখানদী মৃত বা শুকিয়ে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হিসেবে নদী দখল করে কলকারখানা ও যত্রতত্র ভবন নির্মাণকে দেখা হয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন নদীবাহিত পলি অপসারণ না হওয়ায় নদীতে চর জেগে উঠছে এবং নদী তার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ হারাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারত আন্তঃসীমান্ত ৫৪টি নদীর মধ্যে ৩৬টিতে ৫৪টি বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, যার ফলে বাংলাদেশ তার ন্যায্য পানির প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়। ভারত বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির চাপ সামলাতে কোনো আলোচনা বা পূর্বসতর্কতা ছাড়াই বাঁধগুলো খুলে দিচ্ছে যে কারণে সিলেট, রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জেলা আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে। আকস্মিক বন্যার ফলে বন্যাকবলিত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে যখন কৃষিজমিতে সেচের পানির চাহিদা সর্বাধিক তখন নদীগুলোর বুকজুড়ে দেখা যায় ধু-ধু বালুচর। একসময়ের খরস্রোতা নদী যেন ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় জলধারায় পরিণত হয়। এই বৈপরীত্য শুধু নদীর নয়; এটি নদীনির্ভর মানুষের জীবনসংগ্রামেরও নির্মম বাস্তবতা। নদী দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, দূষণ, অবৈধ বালু উত্তোলন, খাল ভরাট এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অবহেলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা, শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট, কৃষিতে মরুকরণের প্রবণতা, মৎস্যসম্পদের ক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি এবং সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এসব দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, অপুষ্টি, পানিবাহিত রোগ এবং নারী ও শিশুদের বাড়তি দুর্ভোগ আজ নদীকেন্দ্রিক জনপদের নিত্য বাস্তবতা। এই সংকট থেকে উত্তরণে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে উজান ও ভাটির স্বার্থ সমন্বয় করে সহযোগিতামূলক পানি ব্যবস্থাপনার একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নদীবহুল বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে চীনের নদী প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে নদী রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ, নদী দখল ও দূষণ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, খাল ও নদী পুনঃখনন, নিয়মিত পলি অপসারণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, পর্যটন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। নদীকেন্দ্রিক জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট এবং বর্ষার বন্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি। এ লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ নদী পুনরুদ্ধার ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। কারণ নদী বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, জীবিকা বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে এবং বাঁচবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা কোনো একক অঞ্চলের দাবি নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। নদীগুলো আজও বয়ে চলেছে, কিন্তু তাদের বুকে জমে আছে দীর্ঘদিনের নীরব আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ একদিন ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তিতে রূপ নিক—এই প্রত্যাশাই বাংলাদেশের মানুষের। নদী ফিরে পাক তার স্বাভাবিক গতি, আর নদীর সজীব স্রোতের সঙ্গে ফিরে আসুক মানুষের মুখের হাসি, সমৃদ্ধির স্বপ্ন এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে বর্তমান সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রকল্পটির মূল প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রমের প্রাথমিক ধাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। মূল কাজ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিরূপণে পরিকল্পনা কমিশনে প্রায় ২৩ কোটি টাকার একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিশ্বমানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। সরকারের এই মেগা উদ্যোগের আওতায় ১১০ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা ও নদী ড্রেজিং, ৬৭টি স্পার নির্মাণ এবং ২২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ শক্তিশালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কাম পাকা সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া নদীশাসনের মাধ্যমে প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি পুনরুদ্ধার করে কৃষি ও শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করা হবে। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সড়ক উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। একই সঙ্গে এটি শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব ও বর্ষার ভাঙন রোধ করে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করবে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পানিসম্পদমন্ত্রী প্রকল্পটির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরার পরই পুরো কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মতো নদীভাঙনকবলিত জেলাগুলোতে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে লাখো মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলের স্থায়ী দুর্যোগ মোকাবেলার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রযুক্তি যদি মানবিকতাকে বিসর্জন দেয়, তাহলে সেই প্রযুক্তির প্রয়োজন কোথায়? সময়ের সাথে সাথে মানুষের মনুষ্যত্বের অবনমন মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। জাতি হিসেবে আমরা যে শৌখিনতা প্রদর্শন করছি, হয়তো সে সময় এখনো আসেনি। অতিমাত্রায় আসক্তি হলে যেকোনো ভালো তার মাধুর্যতা হারায় এ কথা সর্বজন স্বীকৃত। অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা আমাদের অতিমাত্রায় শঙ্কিত করছে। গত ২৭ মে নরসিংদী রেলস্টেশনে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা আমাদের সুপ্ত বোধে সজোরে ধাক্কা মেরেছে। আমরা যে এখনো মানবিক মানুষ হতে পারিনি, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। নরসিংদী রেলস্টেশনে ঢাকাগামী আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেসের ধাক্কায় পরপারে পাড়ি জমান সুজন নামের এক দুর্ভাগা যুবকের স্ত্রী ও পুত্রসন্তান। সুজন বলেন, “ট্রেন আসার সময় আমরা বুঝতে পারিনি। ট্রেনটি কাছে আসতেই আমি চিৎকার করে উঠি। আমার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দৌড় দিয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।” সংবাদমাধ্যম ও ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে আমরা দেখি, কঠিন বাস্তবতার নিদারুণ স্বাক্ষী সুজন কাঁধে স্ত্রী ও কোলে সন্তানের (ছেলে) লাশ এবং অন্য হাতে মেয়ে ও শপিং ব্যাগ নিয়ে রেললাইন পার হচ্ছেন। সুজনের ভাষায়, “আমার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) এবং দেড় বছরের ছেলে সাফওয়ান ওরফে হাসেম ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। তখন দুই লাশ এবং জীবিত সন্তানকে নিয়ে আমাকে একাই রেললাইন পার হতে হয়েছে। কাঁধে ছিল স্ত্রীর এবং বুকে ছিল সন্তানের লাশ; অন্য হাতে ছিল আমার আরেক মেয়ে ও শপিং ব্যাগ। কিন্তু আমাকে সাহায্য করার মতো একজন মানুষও পাইনি। সবাই শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল এবং ভিডিও আর টিকটক করছিল।” প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে জানা যায়, দুর্ঘটনার পরপরই শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হয়। কিন্তু সাহায্যের জন্য তেমন কেউ এগিয়ে আসেনি। অধিকাংশই ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিল। এমনকি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেও তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়নি। এখন প্রশ্ন হলো, স্টেশনে থাকা শত শত মানুষের মধ্যে এমন একজন হৃদয়বান মানুষও কি ছিল না তাকে সাহায্য করার? স্ত্রী ও সন্তানকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য অন্তত পাশে দাঁড়ানোর? এর চেয়ে মানুষের আর কি দুঃসময় আসে! মানবতা কি জাদুঘরে স্থান দখল করেছে? আন্তরিকতা, উপলব্ধি ক্ষমতা, মানুষের দুঃখ বোঝার মানসিকতা লোপ পেয়েছে? এমন দুঃসময়ে ভেঙেচুরে চুরমার হওয়া মানুষটিকে সাহায্য না করে মোবাইলে ভিডিও ধারণ নিঃসন্দেহে মানুষের বিকৃত মানসিকতার পরিচয়। নৈতিকতার আর কত অবনমন হলে আমাদের বোধদয় হবে? সভ্যতার উৎকর্ষে হয়তো আমরা প্রযুক্তিগত দিক থেকে আধুনিক হচ্ছি, কিন্তু ডিভাইস ব্যবহার বিধি সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞাত? মানুষের চক্ষুলজ্জা উঠে গেলে আর কিছু বাকি থাকে না। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মানুষ সমাজের উপাকারে তো আসেই না, উপরন্তু দেশের অনিষ্টের অনিবার্য কারণ হয়ে ওঠে। সামাজিক মানুষ হিসেবে নিজেকে বিনির্মাণের দীক্ষা নিতে না পারলে মানব জন্মের সার্থকতা কোথায়? বর্তমানে উঠতি প্রজন্ম ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের যে অপব্যবহার শুরু করেছে, তা জাতির জন্য অশনিসংকেত। যেকোনো উপায়ে ভাইরাল হওয়ার নোংরা বাসনা তরুণদের নিম্নমানের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। ফলে আমরা দেখছি নানামুখী অবক্ষয়যুক্ত সমাজের ভঙ্গুর স্থিরচিত্র। উদাহরণস্বরূপ, বিপদে এগিয়ে না এসে তা মোবাইলে ধারণ করে ভিউয়ার্স বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের হীনম্মন্যতার জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। ডুবন্ত শিশুকে সাহায্য না করে মোবাইলে সে দৃশ্য ধারণ কোন ধরনের মানসিকতা? মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য যেন অচল প্রবাদে পরিণত হওয়ার প্রহর গুনছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত শটস ভিডিওগুলো কিন্তু আমাদের চিন্তার প্রতিফলন। কিন্তু সেখানে দৃশ্যমান ভিডিওগুলোতে প্রজ্ঞা কোথায়? সবই রগরগে দৃশের রঙিন চিত্রায়ণ। তরুণ প্রজন্মের এহেন হীন মানসিকতা ও ডিভাইস আসক্তি জাতিকে কোন পথে নিয়ে চলেছে, তা ভেবে দেখার এখনই উপযুক্ত সময়। প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ, তারপর বিনোদন। তবে তা অবশ্যই সুস্থ হতে হবে। কিন্তু বিনোদনের নামে যেভাবে অশ্লীলতাকে প্রমোট করা হচ্ছে, তা চরম হতাশার এবং জাতি হিসেবে কখনোই তা প্রত্যাশার নয়। শুধু কি সুজনের কাঁধে লাশই শেষ কথা! সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিকতার অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে। বিবেকহীন মানুষের পদভারে কলংকিত হয়েছে জমিন। রামিশা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা আমাদের ঘুমাতে দেয় না। মানুষ কত বড় নৃশংস হলে এমন হৃদয়বিদারক কাজ ঘটাতে পারে? শিউরে ওঠে হৃদয়। নিরাপত্তাহীনতা কাঁধে বয়ে দিনযাপন এক অলিখিত নরকবাস। বর্তমান অবস্থা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে সমাজের এলিট শ্রেণিও উদাসীন ও দায়িত্বহীন হয়ে পড়েছে। নিজেদের নিয়ে ব্যস্ততা ও অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিকতা স্বাভাবিক মানুষের বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত করেছে। তা না হলে কীভাবে মিরপুরে একজন মায়ের মৃত্যু সংবাদ সাত দিন পর চাউর হয়? একজন রত্নগর্ভা মায়ের মরদেহ সাত দিন ধরে একা ফ্ল্যাটে পড়ে থাকে? পোকামাকড়ের খাবারে পরিণত হয়? পারিবারিক বন্ধন কতটা শিথিল হলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও জঘন্যতম ঘটনা ঘটে! অথচ সেই অভাগী মায়ের এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, মেয়ে ও জামাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নাগরিক ব্যস্ততা তাদের এতটাই অন্ধ করেছে যে, বছরের বিশেষ দিনেও (ঈদ) মাকে ফোন করে খবর নেয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। মা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে মমতা আর ত্যাগে তাদের মানুষ করেছেন, শিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সমাজে সম্মানিত অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। হায় রে মানুষ! চরম অকৃতজ্ঞ মানুষ! শুধু কি শিক্ষিত হলেই মানুষ হওয়া যায়? মানুষ মানুষ হয় কীসে? জাগ্রত মনুষ্যত্ববোধ মানুষকে মানুষ রূপে গড়ে তোলে। পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, শ্রদ্ধাবোধ, সহযোগিতার মনোভাব, সামাজিক মূল্যবোধ একজন মানুষকে আদর্শ মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে তৈরি করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কাজেই আমাদের মানসিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে। তবেই মানবিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। নতুবা মূল্যবোধ বিসর্জিত যাচ্ছেতাই সমাজের বাসিন্দা হয়ে ব্যর্থতার গ্লানি বয়ে সামনের পথচলা অব্যাহত থাকবে। আমরা গ্লানি নয়, বরং সমৃদ্ধ দেশের সুনাগরিক হিসেবে আগামীর দিন যাপন করতে চাই এই হোক দীপ্ত অঙ্গীকার।
এপ্রিলের ঝাঁ ঝাঁ রোদের দিনগুলোতে একদিন হলুদ রঙের দুপুর পেরিয়ে কমলা রঙের রোদের ভেতর প্রবেশ করার অপেক্ষায় বসে আছি বারান্দায়। বারান্দার অজস্র গাছের সাথে একাকিত্ব ভাগ করে নিয়েছি প্রতিটি বিকেল। দেখেছি শূন্য ঘরের দেয়ালগুলো ক্রমশই মলিন হতে। এখন কেমন যেন সবকিছুতেই হাঁপিয়ে উঠেছি। নিঃসঙ্গ আর অবসাদগ্রস্ত পথিকের মতো শূন্য দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছি ছাদের লালচে রঙের রেলিঙের দিকে। দেখি অনিমেষ বসে আছে। আমার হাফগ্রিল বারান্দা দিয়ে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে ছাদের এ-পাশটা। এ সময় তো ওর অফিসে থাকার কথা। ছাদে কী করছে ও! তাহলে কি আগেই চলে এসেছে! আমাকে অবাক করে দিতে ছাদে গেছে! কখন এলে? ছাদে কী করো? অনিমেষ হেসে বলে, ছাদে আসো। আমার ভেতর একটা দুঃখী শালিক পাখি ডেকে উঠে মনটাকে বিষণ্ন করে দিল আরও। আমার সাথে অনিমেষের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বহুদিন হলো। কেউ কারও মনের খোঁজ রাখি না এখন। আমার আছে নিঃসঙ্গ দিন আর দীর্ঘ একাকিত্ব। অনিমেষের ব্যস্ত জীবন। আমি যেন সামনের রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে থাকা শত বছরের পুরোনো একটা গাছ। যে শত ঝড়ে, জলে ভিজে, রোদে পুড়ে মলিন হয়ে গেছে। কী ভাবছ? এসো। - অনিমেষ আবার ডাকল। এই অনিমেষকে আমি চিনতে পারছি না। ও তো অনেক বছর হলো এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলে না। শুধু কটা টুকিটাকি কাজের কথা ছাড়া। হুম আসছি। আমার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ জেগে ওঠে। দূর থেকে জুঁই ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসে। আমি ছাদে গেলাম। অনিমেষ বলল- দেখো আকাশটা কী সুন্দর! আমি ফিরে গেলাম পুরোনো দিনগুলোতে। যেখানে আমরা অল্পবয়সী ছিলাম। ভেসে যেতাম ভালোবাসার স্রোতে। যেখানে অনিমেষ ছিল এমন সহজ, সুন্দর। হঠাৎ করেই পৃথিবীটাকে অসহ্য সুন্দর মনে হচ্ছে। ঝিরিঝিরি বাতাসে কেঁপে উঠি আমি। উপলব্ধি করি যে পৃথিবীতে ভালোবাসা বেঁচে থাকে সে পৃথিবীর অসহ্য সুন্দর। টবে রাখা ফুলগুলো সুন্দর। জীবনানন্দ দাশের কবিতা সুন্দর। ভালোবাসাহীন পৃথিবী মলিন, নিস্তব্ধ। পাতাহীন গাছের মতো। শুধু ডালপালা ছড়িয়ে বেঁচে থাকা। হঠাৎ আমার মনে হতে থাকে, অনিমেষ যেন একটা বিশাল দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। দেয়ালের ওপারে বিস্তীর্ণ পথ, যা পাড়ি দিয়ে নিজের খুব কাছাকাছি চলে আসা যায় না। সেখানে সম্পর্ক আবেগকে স্পর্শ করতে পারে না। আমার ভেতর বিভ্রান্তি খেলা করল। নিজের এই অসহ্য একঘেঁয়ে জীবনটার জন্য অনিমেষকেই দায়ী মনে হলো। ভেতর থেকে কেউ উচ্চ স্বরে কিছু বলে উঠছে আমাকে। জারুল ফুলগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে। আমি আকাশ দেখি, মেঘ দেখি, উড়ে যাওয়া পাখিদের দেখি। তারপর জোরে একটা ধাক্কা দিই অনিমেষকে। টাল সামলাতে না পেরে অনিমেষ নিচে পড়ে যেতে থাকে। পৃথিবীর সব একঘেয়েমির পাঠ ভুলে আমার নিজেকে হাল্কা লাগে খুব।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।