একসময় বিদেশি ভাষা শেখাকে শখ হিসেবে দেখা হতো। কেউ সাহিত্য পড়তেন। কেউ ভ্রমণের জন্য শিখতেন। কেউ আবার ব্যক্তিগত আগ্রহে নতুন ভাষা আয়ত্ত করতেন। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। আজ বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দক্ষতা; এটি উচ্চশিক্ষা, চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে, পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে ভাষাজ্ঞান মানুষের পেশাগত ও মানবিক সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, অটোমেশন ও তথ্য বিশ্লেষণ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের সমাজ শুধু যন্ত্রনির্ভর হবে না। সেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও যোগাযোগ ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে। এ প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ই পঞ্চম শিল্পবিপ্লব বা ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-এর মূল কথা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও অটোমেশনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। পঞ্চম শিল্পবিপ্লব সেই প্রযুক্তিকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসে। এখানে শুধু প্রশ্ন করা হয় না, একটি যন্ত্র কত দ্রুত কাজ করতে পারে? প্রশ্ন করা হয়, সেই যন্ত্র মানুষের জীবন কতটা সহজ করছে? প্রযুক্তি কি নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে? এটি কি পরিবেশ রক্ষা করছে? কর্মক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা কি বজায় থাকছে? সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠী কি প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছে? পঞ্চম শিল্পবিপ্লব মানুষকে উৎপাদনব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখে। এটি প্রযুক্তিকে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। বরং সহযোগী হিসেবে দেখে। একটি রোবট ভারী কাজ করতে পারে। এটি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজও করতে পারে। কিন্তু নেতৃত্ব, সহানুভূতি, পরিকল্পনা, নৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংকট ব্যবস্থাপনা মানুষের দায়িত্ব। তাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা প্রয়োজন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির উদ্দেশ্য হলো ন্যায়সংগত, শান্তিপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব একটি বিশ্ব গড়ে তোলা। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বৈষম্য, পরিবেশ, শিল্প, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু প্রযুক্তি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সহযোগিতা প্রয়োজন। বোঝাপড়া প্রয়োজন। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। এসডিজি কোনো এক দেশের একক দায়িত্ব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা এখন বৈশ্বিক বিষয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জরুরি। আর সেই অংশীদারত্বের ভিত্তি হলো ভাষা ও যোগাযোগ। বিশ্বের বহু দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করেন। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় ফরাসি ভাষা শেখা একটি ভবিষ্যৎমুখী সিদ্ধান্ত। ফরাসি শুধু ফ্রান্সের ভাষা নয়, এটি কানাডা, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড এবং আফ্রিকার বহু দেশে ব্যবহৃত হয়। অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ফরাসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ফরাসির গুরুত্ব রয়েছে। ফ্রান্স, কানাডা, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ আছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ফরাসি গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাস, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, বিমান সংস্থা, পর্যটন, অনুবাদ, গণমাধ্যম এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ফরাসি জানা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পান। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়া ও সেবা খাতের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। ফরাসিভাষী দেশের ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবসায়িক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশে ফরাসি প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসার ভাষা। সেখানে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সহায়তায় কাজ করতে ফরাসি দক্ষতা কার্যকর। বিদেশি ভাষা শেখা শুধু শব্দ ও ব্যাকরণ শেখা নয়, এটি মানুষের আবেগ বোঝার ক্ষমতাও বাড়াতে পারে। আবেগিক বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের এবং অন্যের আবেগ শনাক্ত করা, বোঝা, প্রকাশ করা ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা। এর মধ্যে আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও সম্পর্ক পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত। বাংলায় ‘অভিমান’, ‘মায়া’, ‘লজ্জা’ বা ‘সম্মান’ যেভাবে প্রকাশ করা হয়, অন্য ভাষায় তা ভিন্ন হতে পারে। একই অনুভূতি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন শব্দ, ভিন্ন ভঙ্গি এবং ভিন্ন সামাজিক অর্থ বহন করে। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন যে অনুভূতি সর্বজনীন হলেও তার প্রকাশ সংস্কৃতিনির্ভর। এই উপলব্ধি আবেগ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সূক্ষ্ম করে। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় একজন মানুষ শব্দ নির্বাচন, কণ্ঠস্বর ও শ্রোতার প্রতিক্রিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। এই অনুশীলন আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতা বাড়াতে পারে। প্রকৃত আবেগিক বুদ্ধিমত্তা আবেগকে দমন করা নয়, বরং আবেগকে বুঝে যথাযথভাবে পরিচালনা করা এবং সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা হলো ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক ও কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা। ভাষা ও সংস্কৃতিকে আলাদা করা যায় না। একটি ভাষার সম্ভাষণ, সম্বোধন, রসিকতা, নীরবতা, ভদ্রতা ও মতবিরোধ প্রকাশের ধরন সেই সমাজের মূল্যবোধ বহন করে। কোনো সংস্কৃতিতে সরাসরি কথা বলা স্বাভাবিক। অন্য সংস্কৃতিতে পরোক্ষ ভাষা বেশি গ্রহণযোগ্য। কোথাও প্রথম নাম ধরে ডাকা স্বাভাবিক। কোথাও পদবি ও সম্মানসূচক শব্দ জরুরি। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী এসব পার্থক্য দেখতে পান। তিনি বুঝতে শেখেন যে নিজের সংস্কৃতির আচরণই একমাত্র স্বাভাবিক আচরণ নয়। এটি সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার ধারণা তৈরি করে। এর অর্থ সব আচরণকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা নয়। বরং কোনো আচরণ বিচার করার আগে তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা। এই দক্ষতা আন্তর্জাতিক শিক্ষা, কূটনীতি, ব্যবসা, উন্নয়নকর্ম, পর্যটন ও বহুজাতিক কর্মক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বুদ্ধিমত্তা হলো সামাজিক সংকেত বোঝা, সম্পর্ক তৈরি করা, পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ করা এবং বিরোধ সামলানোর সক্ষমতা। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় সঠিক শব্দ সব সময় মনে পড়ে না। তখন শিক্ষার্থীকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হয়। অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করতে হয়। শ্রোতার মুখভঙ্গি লক্ষ করতে হয়। প্রয়োজনে নিজের বক্তব্য নতুনভাবে সাজাতে হয়। এই প্রক্রিয়া যোগাযোগের নমনীয়তা বাড়ায়। এটি ধৈর্য শেখায়। মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখায়। ভুল স্বীকার করতে শেখায়। ফরাসিভাষী অঞ্চলে শুধু ইংরেজির ওপর নির্ভর করলে সামাজিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। স্থানীয় ভাষা জানলে বন্ধুত্ব গড়া সহজ হয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত হয়। কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। তাই ফরাসি শেখা শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিরও একটি কার্যকর মাধ্যম। বিদেশি ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয়। নতুন শব্দ মনে রাখতে হয়। ব্যাকরণ প্রয়োগ করতে হয়। উচ্চারণ শনাক্ত করতে হয়। মাতৃভাষার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আবার প্রয়োজনের সময় সঠিক ভাষাটি দ্রুত নির্বাচন করতে হয়। এই অনুশীলন মনোযোগ, কার্যকর স্মৃতি, ভাষাগত সচেতনতা ও মানসিক নমনীয়তার সঙ্গে যুক্ত। দুটি ভাষার গঠন তুলনা করতে করতে একজন শিক্ষার্থী ভাষা কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে শেখেন। একে ভাষা-সম্পর্কিত উচ্চতর সচেতনতা বলা হয়। মানুষের মস্তিষ্ক স্থির নয়। অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকর সংযোগ বদলাতে পারে। এই সক্ষমতাকে Neuroplasticity বলা হয়। বিদেশি ভাষা শেখা শ্রবণ, স্মৃতি, মনোযোগ, উচ্চারণ ও অর্থ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়বিক ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। Neuro-Linguistic Programming বা NLP ভাষা, চিন্তার ধরন ও আচরণগত অভ্যাসের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। এর প্রবক্তারা মনে করেন, ভাষা ও মানসিক কাঠামো পরিবর্তন করে যোগাযোগ ও আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব। ভাষা শিক্ষায় এর কিছু ধারণার ব্যবহার দেখা যায়। যেমন ইতিবাচক আত্মকথন। ভুলের ভয়কে নতুনভাবে দেখা। ফরাসি শেখার পথে বাংলা ভাষাভাষীদের কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভুল করার ভয়। এই ভয় আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ছোট কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। বিচ্ছিন্ন শব্দ মুখস্থ না করে পুরো বাক্য শিখতে হবে। শুনতে হবে। বলতে হবে। পড়তে হবে। লিখতে হবে। উচ্চারণ উন্নত করতে অডিও শুনে বক্তার সঙ্গে সঙ্গে বলতে হবে। এই পদ্ধতিকে Shadowing বলা হয়। নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করতে হবে। পুরোনো ও নতুন রেকর্ড তুলনা করতে হবে। এতে অগ্রগতি বোঝা যায়। মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ভিডিও, পডকাস্ট, ডিজিটাল অভিধান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যায়। AI-এর সঙ্গে কথোপকথন করা যায়। ভুল বাক্য সংশোধন করা যায়। অনুশীলন করা যায়। তবে প্রযুক্তি বাস্তব মানুষের বিকল্প নয়। শিক্ষক, বন্ধু বা ভাষাসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা জরুরি। কারণ আবেগ, নীরবতা, কণ্ঠস্বর ও সামাজিক আচরণ শুধু অ্যাপ দিয়ে পুরোপুরি শেখা যায় না। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। যত বেশি কথা বলা হবে, তত বেশি ভুল হবে। আবার তত দ্রুত উন্নতি হবে। বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা। এটি নতুনভাবে কথা বলতে শেখায়। একই সঙ্গে নতুনভাবে শুনতে, ভাবতে, অনুভব করতে ও মানুষকে বুঝতে শেখায়। ফরাসি ভাষা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দরজা খুলতে পারে। এটি আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানীয় বুদ্ধিমত্তার বিকাশেও সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন। বাস্তব যোগাযোগ। সাংস্কৃতিক কৌতূহল ও ভুল করার সাহস। পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে শুধু প্রযুক্তি জানাই যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রয়োজন যোগাযোগ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া। এ কারণে ফরাসি শেখা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি একটি বাস্তব বিনিয়োগ। এটি নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে সংযোগ তৈরির শক্তিশালী সেতু। সাবেক ও বর্তমান ফরাসি ভাষা শিক্ষক ঢাকা ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, DELF & Cambridge IGCSE পরীক্ষক, ইন্সট্রাক্টর-বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদর দপ্তর, জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা, বেস্ট সেলিং লেখক।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।