খাদ্য ঘাটতির দেশে বাড়তি উৎপাদন কীভাবে সম্ভব হলো, সে গল্প কি আমরা জানি? খাদ্য নিরাপত্তা এ দেশে চালের নিরাপত্তার সমার্থক। দিনে দুই থেকে তিনবার যে জাতির পাতে ভাত ওঠে, তার ভাতের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের কাঁধে, সেটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি গত ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি ৫৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদীয় আইনে নতুন নাম পায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভদিনে ব্রির কয়েকটি যুগান্তকারী সাফল্যের গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরতে এই আয়োজন। গত সাড়ে পাঁচ দশকে ব্রির সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে চালের উৎপাদন চার গুণেরও বেশি উন্নীতকরণ। ব্রি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে মোট চালের উৎপাদন ছিল ৯.৭৭ মিলিয়ন টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০.৬৩ মিলিয়ন টনে, অর্থাৎ চালের উৎপাদন গত সাড়ে পাঁচ দশকে বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। এই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ, আবাদি জমি কমেছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির হাত ধরে। বর্তমানে মোট উৎপাদনের ৫৩ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, ৪০ শতাংশ আমন থেকে এবং ৭ শতাংশ আউশ থেকে। কৃষকের মাঠেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। ব্রির তথ্যমতে, আউশ মৌসুমে ব্রির জাতের গ্রহণযোগ্যতা ৭৩.৩১ শতাংশ, আমনে ৫৮.৪৩ শতাংশ এবং বোরোতে ৫৭.২৯ শতাংশ। ব্রির জাত চাষ করে কৃষকের ফলন ৪০ শতাংশ এবং আয় ৮৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। দেশি জাতের স্বল্প ফলন থেকে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী জাত বৈচিত্র্যে এসেছে এই কাঙিক্ষত সমাধান। ব্রি এ পর্যন্ত ১২৭টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে ১১৭টি ইনব্রিড ও ১০টি হাইব্রিড। এর মধ্যে জলবায়ুর ঘাতসহনশীল ৪০টি, পুষ্টিসমৃদ্ধ ৩০টি, সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের ১৪টি, জিংক সমৃদ্ধ ৭টি, স্বল্প গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের লো-জিআই চাল ৪টি এবং রোগ প্রতিরোধী ২টি। ব্রি উদ্ভাবিত ২৩টি জাত ১৪টি দেশে চাষ হচ্ছে, যা দেশের গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। ব্রি উদ্ভাবিত কয়েকটি জাত দেশের কৃষির চেহারা বদলে দিয়েছে। বিআর৩ ও বিআর১১, ৪৯, ৮৭, ১০৩ আমনে এবং ব্রি ধান২৮, ২৯, ৮৮, ৮৯, ৯২,১০২,১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৮ বোরোতে দশকের পর দশক ধরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা মোকাবেলায় আগাম পাকা ব্রি ধান৩৩ গরিব চাষির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন করলে এটি ১০০ দিনের মধ্যেই পাকে, যা মঙ্গা দূরীকরণে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক জাতগুলোতেও বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। ব্রি ধান১১৪ ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ব্রি ধান১১৫ ভিটামিন-ই ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। ব্রি ধান১১৬ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দেয়। লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান১১৭ উপকূলে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দিতে পারে এবং সম্পূর্ণ জীবনচক্রে ১০ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করে। হাওরাঞ্চলের জন্য ঠান্ডাসহিষ্ণু ও আগাম জাত ব্রি ধান১১৮ উদ্ভাবিত হয়েছে। এ বছর আগাম বন্যায় প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হাইব্রিডের মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান৮ হেক্টরপ্রতি ১০.৫ থেকে ১১ টন এবং লবণসহিষ্ণু ব্রি হাইব্রিড ধান১০ অনুকূল পরিবেশে ৯.৭ থেকে ১০.৭ টন ফলন দিতে সক্ষম। ব্রি এখন ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রজনন কর্মসূচিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ৩২টি টার্গেট প্রোডাক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়েছে এবং প্রজনন চক্র সাড়ে তিন থেকে চার বছর কমানো হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার জেনোটাইপের পূর্ণ জিনোম ফিঙ্গারপ্রিন্টিং সম্পন্ন হয়েছে। ৪ লাখেরও বেশি ফিক্সড লাইন উদ্ভাবিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ জাতের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে। সম্পদ সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষায়ও সরাসরি বপন পদ্ধতিতে (ডিএসআর) জলমগ্ন পদ্ধতির তুলনায় মিথেন নির্গমন ৩৪ শতাংশ হ্রাস করছে। যদিও ধান চাষে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের চেয়ে প্রশমন হয় বেশি। ব্রির দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রে ৩০-৩৫ শতাংশ সার সাশ্রয় হয়, ফলন ৫-১২ শতাংশ বাড়ে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে। সেচে সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় এডব্লিউডি ব্যবস্থা কৃষকের খরচ সাশ্রয় করছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্রি এ পর্যন্ত ৫৪টি যন্ত্র উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ বপন, রোপণ, আগাছা দমন ও মাড়াই যন্ত্র এবং কম্বাইন হারভেস্টার। বীজ বপনের পাওয়ার সিড সোয়ারের দাম প্রায় ৮০ হাজার টাকা এবং তা দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশীয় কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আমদানি নির্ভরতা কমেছে। যন্ত্র উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল সেবায়ও ব্রি এগিয়েছে অনেকখানি। মাঠের পোকামাকড় ও রোগ পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। রয়েছে ধানের জাতের স্মার্ট প্রোফাইলিং অ্যাপ ও বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংক। ব্রির এগ্রামেট সেবা ও কল সেন্টারে জুন-জুলাই ২০২৬ সময়ে মোট ১ হাজার ৬৫৭টি কল এসেছে, যার বেশির ভাগই সহায়তা ডেস্কসংক্রান্ত। সার ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়েও কৃষকেরা প্রশ্ন করেছেন। ভালো জাত মাঠে পৌঁছাতে চাই মানসম্পন্ন বীজ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রি ১৩০টি জাতের নিউক্লিয়াস বীজ সংরক্ষণ করেছে এবং ২৩২ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৫টি সিডনেট অংশীদারকে প্রায় ২০০ টন বীজ প্রতিবছরই বিতরণ করা হচ্ছে। ধান বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে গত পাঁচ বছরে ব্রি মোট ৫১ হাজার ৪২০ জন অংশীজনকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার মধ্যে কৃষক ৪২ হাজার ২০৪ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রি মোট ২৯টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণ) এবং ব্র্যাক ব্যাংক ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ডস। ব্রির অবদান অর্থনৈতিক বিচারেও লাভজনক। ধান গবেষণায় বিনিয়োগের প্রতিদান নিয়ে পাঁচটি গবেষণা হয়েছে। সেগুলোর হিসাবে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে ফেরত এসেছে ২৬ থেকে ৫৪ টাকা। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে ১.১২ শতাংশ হারে, আবাদি জমি কমছে ০.২৪ শতাংশ হারে, আর তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতি দশকে প্রায় ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্রির ভাষায়, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, একে টেকসই করতে নিরন্তর প্রচেষ্টা দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার তাগিদও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করার জন্য ব্রি কয়েকটি কৌশল হাতে নিয়েছে। কৃষকের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ টন ধরে দেশের চাহিদা মেটাতে অন্তত ৬.২৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমি রক্ষার কৌশল নিয়ে কাজ করছে ব্রি। ব্রির মতে, জেনেটিক গেইনের গতি বছরে অন্তত ৪৪ কেজি বা হেক্টর হারে বাড়ানো দরকার। ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৩৮ মিলিয়ন হেক্টর পতিত জমিতে ধান চাষ করে বাড়তি ১.০৬ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি ৪.৪৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উন্নত শস্যবিন্যাস চালু করে আরও ৪.০৪ মিলিয়ন টন বাড়তি ধান উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণার অগ্রাধিকারে রয়েছে স্পিড ব্রিডিং, জিনোমিক প্রেডিকশন ও হ্যাপলোটাইপভিত্তিক প্রজননের মতো আধুনিক কৌশল। এ ছাড়া রয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর জাত, জলবায়ু সহনশীলতা, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। চলমান গবেষণায় সি৪ রাইস, জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে লবণাক্ততা সহনশীলতা ও ব্লাস্ট প্রতিরোধ এবং টু-লাইন হাইব্রিড প্রজনন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। উচ্চ আয়ের জন্য মূল্য সংযোজিত ধানজাত পণ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাইস ভ্যালু চেইন গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। দিনে দিনে প্রতিষ্ঠানটির পরিধিও বাড়ছে। বর্তমানে ১৯টি গবেষণা বিভাগ এবং সদর দপ্তরের বাইরে ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে আরও ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬টি স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে । এতে স্থানভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের সমস্যার সমাধান আরও সহজ হবে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা না বললেই নয়। এর মধ্যে অপর্যাপ্ত জনবল, পদোন্নতি ও চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতা, এবং গবেষণা বরাদ্দের অপ্রতুলতা উল্লেখযোগ্য। ব্রির অনুমোদিত ৩১৮টি বিজ্ঞানী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৭১ জন। যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি টাকার বিনিয়োগ বহুগুণ হয়ে ফেরে, তার গবেষণা ও জনবলে বিনিয়োগ বাড়ানোই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ৫৬ বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান কয়েকজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা দেশের কোটি মানুষের পাতে ভাত পৌঁছানোর নেপথ্য শক্তি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্রির সব বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষককে অভিনন্দন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জমি সংকটের যুগে ব্রির ওপর প্রত্যাশা আরও বাড়বে, আর সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় সহায়তা। ড. এম আব্দুল মোমিন কৃষিবিদ ও কৃষি সাংবাদিক এবং ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গাজীপুর
ধান আমাদের প্রধান খাদ্য শস্য। বলা হয় কৃষকের প্রাণ, বাংলার ধান। বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা বলতে চালের নিরাপত্তাকেই বোঝায়। সুতরাং, আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি অনেকখানি ধাননির্ভর। সে কারণে দেশের প্রায় ৮০ ভাগ জমিতেই ধান আবাদ হয়। কিন্তু ধাননির্ভর এ দেশে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা প্রচলিত আছে। যেমন : ধানি জমি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে, বাংলাদেশের চালে আর্সেনিক আছে, ধান চাষে ভুগর্ভস্থ পানির অপচয় হয়, ভাত খেলে ডায়াবেটিস হয় অথবা ভাতের কারণে মানুষ মোটা হয়ে যায়। এই ভ্রান্ত ধারণাগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ধানি জমি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে। এটি হচ্ছে আধা সত্য, পুরো সত্যি হচ্ছে নিঃসরণের চেয়ে বেশি পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ করে ধান। আসুন জেনে নেয়া যাক এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ জমিতে ধান চাষ করা হয়। এ সমস্ত জমি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রাস অক্সাইড যেমন নিঃসরিত হয়, তেমনি ধানগাছ তার শারীরবৃত্ত্বীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড ফর্মে এসব গ্যাস শোষণ করছে। কিন্তু নেতিবাচক প্রচারণার সময় শুধু নিঃসরণের তথ্যটি খুব কৌশলে তুলে ধরা হয়, অথচ নিঃসরণের চেয়ে যে বেশি পরিমাণ শোষণ করা হয়, তা উল্লেখ না করে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা হয়। আজকের আলোচনা এই নিঃসরণ ও শোষণের হিসাব নিয়ে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ ২০১৩ সাল থেকে এর ওপর গবেষণা করে আসছে। যেখানে তারা দেখেছে ১ কেজি ধান উৎপাদন করতে ৬৬৬ গ্রাম কার্বন ড্রাই-অক্সাইড, ৫৩ গ্রাম মিথেন এবং ০.৫ গ্রাম নাইট্রাস অক্সাইড ধানখেত থেকে নিঃসরিত হয়। অন্যদিকে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ধানগাছ ২২০০ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড ফটোসিনথেটিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। এ ছাড়া মিথেন বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাস্পের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস ও হাইড্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত হয়, যা ধান ও অন্যান্য গাছ সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। একইভাবে নাইট্রাস অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়াম ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে এবং এই অ্যামোনিয়াম বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়ায় রূপান্তরিত হয় এবং বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে আসে, যা গাছ গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রেও ধানগাছের অ্যারেনকাইমা চ্যানেল দিয়ে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ধানগাছের শেকড়ের মাধ্যমে মাটিতে আসে। যেটি মিথেনের সাথে বিক্রিয়া করে মিথানোট্রফিক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে, যা গাছ গ্রহণ করে এবং এই প্রক্রিয়া বায়ুমণ্ডলে মিথেন নিঃসরণে বাধা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ধান চাষাবাদে ধানগাছ মাত্র ৫-১০% মিথেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, বাকি ৯০-৯৫% মিথেন মাটি থেকে আসে। জলাবদ্ধ জমিতে লেবাইল জৈব কার্বন ও মিথানোজেনিক ব্যাক্টেরিয়া মিথেন উৎপন্ন করে। অতএব দেখা যায়, ধান চাষের চেয়ে পতিত জমি মিথেন নিঃসরণের জন্য বেশি দায়ী। আসুন, একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মহারাজপুর বিল। বিলটিতে আবাদি জমির পরিমাণ দুই হাজার বিঘার বেশি। পাশেই পশ্চিম মহারাজপুর। সেখানে জমির পরিমাণ ছয় হাজার বিঘার মতো। লবণাক্তপ্রবণ ওই বিলসহ আশপাশের বিলে একসময় মাত্র একটি ফসল হতো। আর সেটি হলো বর্ষায় আমন ধান। এরপর পুরো বছরই জমি পতিত থাকত। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গরম বাতাস আর ধূলিঝড় ছিল ওই অঞ্চলের নিত্যকার ঘটনা। কিন্তু ২০১৭ সালে ব্রি বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো পূর্ব মহারাজপুর বিলে বোরো ধানের চাষ করেন স্থানীয় চাষিরা। বর্তমানে মহারাজপুর গ্রামে প্রায় প্রতিটি বিলেই ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯, ব্রি ধান১০২, বিনাধান-১০ সহ অন্যান্য ধান চাষাবাদ হচ্ছে, যেখানে আগে কখনো বোরো ধান আবাদই হতো না। ওই জমিতে কৃষক বিঘাপ্রতি ২২ থেকে ২৫ মণ ফলন পাচ্ছেন, উপরন্তু যেখানে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গরম বাতাস আর ধূলিঝড়ের কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারত না, মহিলারা দিনের বেলায় চুলা জ্বালাতে পারত না। আর এখন ধান চাষের কারণে ধূলিঝড় নেই, পরিবেশও আগের তুলনায় অনেক ঠান্ডা ও নির্মল হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ধান চাষই এ বিলের বায়ুমণ্ডলকে পরিছন্ন করেছে। এ ধরনের অনেক উদাহরণ খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালীর সূবর্ণচর এলাকায়ও রয়েছে। দ্বিতীয় গল্পটি রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের। সেখানে মরুকরণ ঠেকানোর জন্য কত পরিকল্পনা, কত প্রকল্প নেয়া হলো, কিন্তু যখন থেকে বোরো ধান চাষাবাদ শুরু হলো, তখন থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে আগের ধূলিও নেই, এত গরমও নেই, যা ধান আবাদেরই সুফল। অধিকন্তু এখন দেশের খাদ্য উৎপাদনের বিশাল একটি অংশ আসে বরেন্দ্র অঞ্চলের বোরো আবাদ থেকেই। বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো এই তিন মৌসুম মিলিয়ে পাঁচ কোটি টনের অধিক ধান উৎপাদন হয়। সেই হিসাবে মোট পাঁচ কোটি টন ধান উৎপাদনে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ ৩৩.৩ মিলিয়ন টন, মিথেন ২.৬৫ মিলিয়ন টন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ ০.০২৫ মিলিয়ন টন। গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল ফর্মুলা অনুযায়ী এই তিনটি গ্রিনহাউস গ্যাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণের পরিমাণ ১০৬.২ মিলিয়ন টন। অন্যদিকে সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ধানগাছ ২২০০ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অতএব মোট পাঁচ কোটি টন ধান উৎপাদনে প্রায় ১১০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে শোষিত হয়। উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী, ধান আবাদ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের তুলনায় ৩.৮ (১১০.০-১০৬.২) মিলিয়ন টন বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডল থেকে শোষণ করে। ফলে ধান চাষ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের চেয়ে অনেক বেশি শোষণ করে বরং বায়ুমণ্ডলকে পরিচ্ছন্ন করছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সমস্ত দেশে ধান চাষ, জলাভূমি ভরাট ও কয়লার মজুত জাতীয় কার্যক্রম রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীন, ভারতসহ আঞ্চলিক দেশগুলো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ধান চাষ করে। বাংলাদেশে যেখানে একটি কয়লা খনি আছে, সেখানে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রায় ১০০০ এবং চীনে প্রায় ২৫০০ কয়লা খনি আছে, যেগুলো মিথেনের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। সুতরাং, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য বাংলাদেশের তুলনায় ধান উৎপাদনকারী বড় দেশগুলোর দায় অনেক বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুরো সব সময় জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দোষারোপ করার চেষ্টা করে, এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বাংলাদেশের একমাত্র বড় শহর ঢাকা এবং এখানে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদন প্রতিবেশী দেশের বড় বড় শহরগুলোর তুলনায় অনেক কম। প্রসঙ্গেক্রমে এখানে বলে রাখা ভালো, যে বিষয়টি নিয়ে খুব জোর প্রচারণা, সেটি হচ্ছে বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল অনেকটাই নিমজ্জিত হবে। এর সাথে আমি একমত নই, কারণ এখানেও ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে হবে। বাংলাদেশ নামক ব-দ্বীপটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। যেখানে প্রতিনিয়ত দক্ষিণে নতুন নতুন চর জাগার মাধ্যমে বাংলাদেশের আয়তন বাড়ছে, সেখানে ডুবে যাওয়ার বিষয়টি আরও চিন্তা করে প্রচার করতে হবে। মূলকথা হলো, উত্তরে হিমালয় যতদিন আছে, ততদিন বাংলাদেশের আয়তন বাড়বে বৈ কমবে না। যে বিষয়টির প্রতি আমাদের সবচেয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন, তা হলো সবকিছু ঠিক রেখে কীভাবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং তা বাস্তবায়নে বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। যেমন : ব্রি এমন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কাজ করছে, যা বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। কারণ আমরা জানি, ধান একটি C3 উদ্ভিদ। বায়ুতে CO2 এর পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে সাথে ধান বেশি পরিমাণে CO2 শোষণ করে বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করে, ফলে ধানের ফলন বৃদ্ধি পায়। অধিক CO2 শোষণকারী জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ব্রি জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত জার্মপ্লাজম থেকে পরীক্ষণের মাধ্যমে এমন জাত শনাক্ত করেছে, যাদের CO2 এর প্রতি Responsiveness বেশি এবং অধিক উৎপাদনক্ষম। ভবিষ্যতে অধিক CO2 শোষণকারী এবং অধিক উৎপাদনক্ষম জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে এ জার্মপ্লাজমগুলো ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ধানচাষ থেকে আরো কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতি ব্যবহার, পরিমিত ও ব্যালেন্স সার ব্যবহার, ইউরিয়া সার ছিটিয়ে ব্যবহারের পরিবর্তে মাটির গভীরে প্রয়োগ এবং Good Agriculture Practices (GAP) ব্যবহারের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আমরা এখন ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এবং বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এর সাথে যুক্ত হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আশাতীত কমে যাবে বলে আমি মনে করি। কেননা এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রিসিশন এগ্রিকালচার প্র্যাক্টিস নিশ্চিত হবে। জেনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণকারী কাঙ্ক্ষিত জাত উদ্ভাবন এবং ন্যানো টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমেও নিঃসরণ কমানো যাবে। Artificial Intelligence ব্যবহারের মাধ্যমে Artificial rainfall ঘটানো সম্ভব হবে, De-Salinization প্রক্রিয়া সহজতর হবে এবং সোলার এনার্জির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং, আশাহত না হয়ে আশান্বিত হয়ে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করাই শ্রেয়। পরিশেষে বলতে চাই, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদন বা এর কোনো নেতিবাচক বিষয় নিয়ে লেখার আগে অবশ্যই সবাইকে এর পেছনে কী উদ্দেশ্য এবং সুদূরপ্রসারী কী কুফল, তা ভেবে দেখতে হবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ন্যায় যেকোনো নেতিবাচক বিষয় নিয়ে প্রচার-প্রচারণার আগে সেটি বিজ্ঞানসম্মত ও তথ্যনির্ভর কি না নিশ্চিত হতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জন্য প্রয়োজনে যাঁরা এ-সংক্রান্ত গবেষণা করেন, তাঁদের সাথে আলোচনা করে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করাই সমীচীন। ড. এম আব্দুল মোমিন ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ র্কমর্কতা বাংলাদশে ধান গবষেণা ইনস্টটিউিট (ব্রি) গাজীপুর।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।
শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে। বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি। বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’। বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।” বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।” বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি... ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।” আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব। এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?” আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।” চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।” এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম। সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে। এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর। বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।” বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম। হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।