Breaking news

দায়িত্ব

পথশিশু : ঠিকানাহীন শৈশবের অসমাপ্ত সমীকরণ

শহর প্রতিদিন বড় হয়। উঁচু হয় দালান, বাড়ে গাড়ির সংখ্যা, বদলে যায় রাস্তার চেহারা। কিন্তু এই একই শহরের কোনো এক ফুটপাতের কোণে, ব্যস্ত কোনো সিগন্যালের পাশে কিংবা রেললাইনের ধারে থমকে থাকে কিছু ছোট্ট জীবন। তাদের হাতে বই নেই, কাঁধে স্কুলব্যাগ নেই, নেই নিরাপদ ঘরে ফেরার তাড়া। আছে শুধু দিন পার করার তাগিদ। তারা পথশিশু। নামের আগে কিংবা পরে পরিচয়ের যত শব্দই বসানো হোক, তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তারা এমন এক শৈশবের সন্তান, যে শৈশব তার স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।   শৈশব মানেই হওয়ার কথা পরিবার, স্কুল,খেলাধুলা, বন্ধুত্ব, গল্প, স্বপ্ন আর নিশ্চিন্ত ঘুম। অথচ পথশিশুর কাছে শৈশবের অর্থ অনেক সময় একেবারেই ভিন্ন। সকাল শুরু হয় খাবারের সন্ধানে, দিন কাটে মানুষের দয়ার অপেক্ষায়, কখনো ভিক্ষায়, কখনো ছোটখাটো কাজে, কখনো রাস্তায় পড়ে থাকা কিছু কুড়িয়ে বিক্রি করে। রাত এলে ফুটপাত, স্টেশন কিংবা কোনো পরিত্যক্ত জায়গাই হয়ে ওঠে ঘর। যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা মা-বাবা, পরিবার ও বিদ্যালয়, সে বয়সেই কারও কারও পৃথিবী হয়ে ওঠে রাস্তা।   এই রাস্তারও নিজস্ব নিয়ম আছে। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়, আগামীকাল নিশ্চিত নয়, এমনকি পরের বেলার খাবারটুকুও নিশ্চিত নয়। রাত নামলে ফুটপাতের কোনো একটি কোণ হয়তো তার ঘুমানোর জায়গা। কিন্তু সেই ঘুমে নিশ্চিন্ততা থাকে না। কখন কে তাড়িয়ে দেবে, কখন কী বিপদ আসবে, সকালে উঠে খাবার জুটবে কি না — এসব প্রশ্নের উত্তর তার জানা থাকে না। তাই পথশিশুর জীবন যেন প্রতিদিন নতুন করে লেখা একটি অসমাপ্ত সমীকরণ। এই সমীকরণে অজানা রয়ে যায় খাবার, আশ্রয়, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ। হিসাব মেলাতে মেলাতে একসময় হয়তো শৈশবটাই হারিয়ে যায়।   পথশিশু হওয়ার পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, বাবা-মায়ের অসহায়ত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব, গ্রাম থেকে শহরে এসে টিকে থাকার সংগ্রাম, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা অভিভাবকহীনতা, বিভিন্ন বাস্তবতা একটি শিশুকে ধীরে ধীরে পথের দিকে ঠেলে দেয়। কেউ পরিবারসহ রাস্তায় থাকে, কেউ পরিবারের জন্য উপার্জন করতে বের হয় আবার কেউ পরিবার থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি পথশিশুর গল্প আলাদা। কেউ হয়তো জানে না আগামীকাল কোথায় থাকবে, কেউ জানে না আজ রাতে খাবার পাবে কি না। শহরের ব্যস্ত মানুষ তাদের প্রতিদিন দেখে কিন্তু তাদের জীবনের গল্প খুব কম মানুষই জানতে চায়।   সিগন্যালে লাল আলো জ্বলে উঠলেই শহরের ব্যস্ততার মাঝখানে কয়েকটি ছোট মুখ দেখা যায়। কেউ বোতলজাত পানি হাতে গাড়ির কাছে যায়, কেউ ফুলের মালা বা একগুচ্ছ ফুল এগিয়ে দেয়, কেউ বাদামের প্যাকেট বিক্রি করে, কেউ চকলেট কিংবা ছোটখাটো জিনিস নিয়ে দাঁড়ায়। আবার কোথাও কোথাও শিশুদের হাতে দেখা যায় সিগারেটের প্যাকেট ও পান, যা তারা গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করে। কেউ পণ্য বিক্রি করে, কেউ হাত বাড়িয়ে টাকা চায়, কেউ আবার গাড়ির কাচ পরিষ্কার করে কয়েকটি টাকা পাওয়ার চেষ্টা করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের এই ছোট্ট ব্যবসা শেষ হয়ে যায়। আলো সবুজ হলে গাড়িগুলো ছুটে যায়, তারাও ছুটে যায় পরের গাড়ির দিকে। আমাদের কাছে হয়তো এটি রাস্তার স্বাভাবিক দৃশ্য কিন্তু শিশুটির কাছে এই কয়েক সেকেন্ডই তার দিনের আয়ের একটি অংশ। যে বয়সে তাকে স্কুলের টিফিনের টাকা নিয়ে ভাবার কথা সেই বয়সেই তাকে ভাবতে হয় কীভাবে আজকের খাবারের টাকা জোগাড় করবে।   একটি শিশু যখন গাড়ির কাচে টোকা দিয়ে কিছু টাকা চায়, আমরা হয়তো বিরক্ত হই। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিই, কেউ জানালা তুলে দিই, কেউ আবার সামান্য টাকা দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করি। কিন্তু খুব কম সময়ই আমরা ভাবি, শিশুটি এখানে কেন? তার আজ স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল কি না, গত রাতে সে কোথায় ঘুমিয়েছে, আজ সে কী খাবে, অথবা বড় হয়ে সে কী হতে চায় — এসব প্রশ্ন আমাদের ব্যস্ত জীবনে খুব কমই জায়গা পায়। আমরা পথশিশুকে দেখি কিন্তু তার জীবন দেখি না। তার হাতে থাকা ফুল দেখি কিন্তু ফুল বিক্রি করার প্রয়োজনটা দেখি না। তার বাড়ানো হাত দেখি কিন্তু কেন সেই হাতটি বইয়ের বদলে সাহায্যের জন্য বাড়ানো হয়েছে, সেই প্রশ্ন করি না। তার ময়লা জামা দেখি কিন্তু কেন সে সেই জামা পরে আছে, তা জানতে চাই না। এখানেই সমাজের অবহেলার সবচেয়ে কঠিন চিত্রটি দেখা যায়। সহানুভূতি হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য আসে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চিন্তা কতটা আসে?   শিক্ষা থেকে দূরত্ব পথশিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। বিদ্যালয়ের দরজা হয়তো তাদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ নয় কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ তাদের জন্য অনেক কঠিন। কারণ, ক্ষুধার সঙ্গে শিক্ষার প্রতিযোগিতায় ক্ষুধাই আগে জিতে যায়। যে শিশুর কাছে আজকের খাবার অনিশ্চিত, তার কাছে আগামী দিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি বিলাসিতার মতো মনে হতে পারে। তাই বইয়ের জায়গা নেয় কাজ, খেলার জায়গা নেয় দায়িত্ব, আর স্বপ্নের জায়গা দখল করে বেঁচে থাকার তাগিদ। একটি শিশু যখন পানি, ফুল, বাদাম, চকলেট কিংবা অন্য কোনো পণ্য বিক্রি করে দিনের বড় একটি সময় কাটায়, তখন তার পড়াশোনার জন্য সময় ও সুযোগ দুটোই সংকুচিত হয়ে আসে। একটি শিশুর হাতে যদি বইয়ের বদলে প্রতিদিন জীবিকার বোঝা তুলে দেওয়া হয়, তবে তার কাছ থেকে নিখুঁত ভবিষ্যৎ আশা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?   শিক্ষা ও নিরাপত্তা থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা শিশুর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ছোটখাটো শ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তারা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করে, যেখানে ভুল মানুষ ও ভুল পথের প্রভাব সহজেই তাদের জীবনে ঢুকে যেতে পারে। এখানেই আসে আরেকটি আশঙ্কা, অপরাধের জগতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। অপরাধী হয়ে কেউ জন্মায় না। কিন্তু একটি অনিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সমাজের দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা একটি শিশুকে অপরাধপ্রবণ পরিবেশের কাছে অসহায় করে তুলতে পারে। রাস্তায় থাকা শিশুরা কখনো কখনো মাদক, চুরি, ছিনতাই, পাচার কিংবা বিভিন্ন অপরাধচক্রের প্রলোভন ও শোষণের শিকার হতে পারে। প্রথমে হয়তো সামান্য কিছু কাজ, পরে নির্ভরতা, তারপর ধীরে ধীরে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, এভাবেই একটি শিশুর সামনে থাকা সম্ভাবনার দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার, পথশিশু মানেই অপরাধী নয়। বরং অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা একটি শিশুকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সমাজের নিজের দায়ের দিকে তাকানো প্রয়োজন। যে শিশুকে আমরা স্কুলে পৌঁছে দিতে পারিনি, নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারিনি, পরিবারকে সহায়তা করতে পারিনি, তার জীবনে ভুল মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে পারিনি, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কতটা দায়িত্বশীল ছিলাম, সেই প্রশ্নও আমাদের নিজেদের করতে হবে।   পথশিশুদের নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক উদ্যোগ দেখা যায়। কেউ খাবার দেয়, কেউ পোশাক দেয়, কেউ একদিনের জন্য আনন্দের আয়োজন করে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যাটি কি সেখানে শেষ হয়ে যায়? একবেলার খাবার একটি দিনের ক্ষুধা কমাতে পারে, একটি নতুন জামা একটি দিনের আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু একটি শিশুকে সত্যিকার অর্থে পথ থেকে বের করে আনতে প্রয়োজন আরও অনেক কিছু। প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি, মানসিক সহায়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কারণ, ক্ষুধার্ত শিশুকে খাবার দেওয়া জরুরি কিন্তু কেন সে প্রতিদিন ক্ষুধার্ত থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি। রাস্তায় ঘুমানো শিশুকে কম্বল দেওয়া মানবিক কিন্তু কেন তার ঘর নেই, সেই সমস্যার সমাধান আরও জরুরি। দয়া একটি দিনের কষ্ট কমাতে পারে কিন্তু সুযোগ পারে একটি জীবন বদলে দিতে।   আমাদের শহরের ফুটপাতগুলো শুধু ইট-পাথরের জায়গা নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতার আয়না। একদিকে কাচের ভবন, অন্যদিকে প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে রাত কাটানো শিশু। একদিকে উন্নয়নের গতি, অন্যদিকে সেই উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকা শৈশব। এই বৈপরীত্য আমাদের সময়ের একটি কঠিন সত্য। তবে একটি পথশিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো শুধু দারিদ্র্য নয়, তার সবচেয়ে বড় সংকট হতে পারে সম্ভাবনার অপচয়। যে শিশুটি হয়তো ভালো শিক্ষক হতে পারত, চিকিৎসক হতে পারত, শিল্পী হতে পারত, কিংবা কেবল একজন সৎ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকারী মানুষ হতে পারত, তার সম্ভাবনা প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়। সমাজের চোখে সে হয়তো শুধু ফুটপাতের একটি শিশু, কিন্তু তার নিজের চোখে হয়তো এখনো একটি স্বপ্ন বেঁচে আছে। সেই স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়, শুধু সরকারের নয়, শুধু কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরও নয়। এটি সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ, একটি শিশুর ঠিকানা শুধু একটি ঘর নয়। তার ঠিকানা হওয়া উচিত নিরাপত্তা, শিক্ষা, পরিবার, মর্যাদা এবং স্বপ্নের ভেতর।    

অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
বাবা
বাবারা এমনই

পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে  একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0