জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারের অঙ্গীকার ও বৈশ্বিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। দীর্ঘ ব্যবধানে জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের এই উপস্থিতি বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসকে নতুন রূপ দিয়েছে। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেয়া বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, চার দিনের এই ব্যস্ত সফরে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পরিসরে সার্বিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি কার্যকর ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে অংশ নেন; যার মধ্যে সাধারণ পরিষদে মূল ভাষণ দেয়ার পাশাপাশি ছিল ৭টি উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য প্রদান। এ ছাড়া তুরস্ক ও ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ ১১টি দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এম ফরহাদুল ইসলাম ও অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব এ কে এম শহীদুল করিম উপস্থিত ছিলেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শেষে পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর সমাপ্ত করে ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ২১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো ভাষণ প্রদানসহ নানা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে গত ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন। নিউইয়র্কে চার দিনের ব্যস্ত সূচিতে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি সরকারি কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, তিনি আটটি ইউএনজিএ কর্মসূচি, সাইডলাইনের চারটি অনুষ্ঠান এবং ১১টি দেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সম্পন্ন করেন। এসব আলোচনায় জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। এদিকে সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উইমেন লিডার্স প্ল্যাটফর্ম ও ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগসহ আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে যোগ দেন এবং চারটিতে বক্তব্য রাখেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবেলায় আরও জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট এ সংকট নিচু দ্বীপদেশগুলোর অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রের পানির স্তর এক মিটার বা তারও বেশি বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। জাতিসংঘের এই পদক্ষেপে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিতে জরুরি অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো দেশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও তার সামুদ্রিক সীমানা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়ের সমাধান এসেছে এ ঘোষণায়। সংকট তুলে ধরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সামান্য মিলিমিটারে মাপা হলেও এর প্রকৃত ক্ষতি লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জনপদ উচ্ছেদের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেয়া যায় না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। ছোট দ্বীপদেশগুলোর জোট ‘অ্যালায়েন্স অব স্মল আইল্যান্ড স্টেটস’-এর পক্ষ থেকে পালাউয়ের প্রেসিডেন্ট সুরাঙ্গেল হুইপস জুনিয়র এই ঘোষণাকে একটি ‘সত্যিকারের অর্জন’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৮৯ সালের ‘মালে ঘোষণা’র পর থেকেই ছোট দ্বীপদেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে আসছে। তথ্যসূত্র : বাসস
আজ ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ভাষণ দিয়েছেন, তা হুবহু তুলে ধরা হলো। তথ্যসূত্র : বাসস বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম মাননীয় সভাপতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমরা আপনাকে পূর্ণ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। একই সঙ্গে আমি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবককেও তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শুরুতেই আমি বাংলাদেশের সকল শহিদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের অবদানকে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণ-অভুত্থানে শহিদ ও আহতদের প্রতিও আমি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই। ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। মাননীয় সভাপতি জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এ মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ ও জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি। গ্লোবালাইজেশনের এ সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানবসৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবাদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির অন্তরায়। শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্ব মানবতা এবং বিশ্ব শান্তির প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন আমি আজ আবারও পুনর্ব্যক্ত করছি। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে। মাননীয় সভাপতি চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation : A United Nations that Delivers for All’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল। ‘পিসবিল্ডিং কমিশনের’ ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে। অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীগণ তাঁদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ, উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে। মাননীয় সভাপতি, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্যও আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি এক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। মাননীয় সভাপতি, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবেলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। সুতরাং, ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ COP-31 এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে। বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে। ক্লিন এনার্জি ও সোলার এনার্জি ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। দেশকে বন্যা-খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। বাংলাদেশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ‘সুন্দরবনে’ মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষনের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের ‘ওয়াটার কনভেনশন’ স্বাক্ষর করেছে। মাননীয় সভাপতি দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে। ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার Recovery, Restoration এবং Reconstruction অর্থাৎ 3-R কৌশল অনুসরণ করছে। বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে 'ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তাঁর উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে। মাননীয় সভাপতি, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারীশিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে। শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে। সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। প্রতিটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ডকে’ সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। মাননীয় সভাপতি, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির ‘Leave No One Behind’ এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে। সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর ও গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একই সঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্পোর্টসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ ও পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার দেয়া হচ্ছে। সরকার আশা করে, এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর হার এবং স্কুলে শিক্ষার মান বাড়বে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে প্রথমবারের মতো স্পোর্টসকেও একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত জুন মাসে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারা দেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে ২ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। মাননীয় সভাপতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়বে আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো-টেকনোলোজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে। আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। মাননীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সব দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি। কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে, বিশ্ব সমাজকে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা-সামগ্রী ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়। মাননীয় সভাপতি, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ স্বনির্ভর কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যে রাষ্ট্রে দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকলেই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে। মাননীয় সভাপতি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশবান্ধব একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে চলছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারত্ব উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সমস্ত সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে, সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এ জন্যই আমরা বলি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি পুনরায় বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে আমার বক্তব্য শেষ করছি। মাননীয় সভাপতি আপনাকে ধন্যবাদ আল্লাহ হাফেজ বাংলাদেশ জিন্দাবাদ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যায় জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবস্থানস্থল হোটেল হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্কে পৌঁছান। এ সময় সেখানে সমবেত দলীয় নেতা-কর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা প্ল্যাকার্ড-ব্যানার হাতে স্লোগান দিয়ে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিনিধিদলে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকেরা। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো উঠে আসবে। সফরসূচি অনুযায়ী, অধিবেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকালে অধিবেশনের ফাঁকে তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এ ছাড়া নিউইয়র্কে অবস্থানকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত নৈশভোজেও অংশ নেয়ার কথা রয়েছে তাঁর। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তালিকায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ আল-খালিদ আল-সাবাহ এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল রয়েছেন। পাশাপাশি ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেঙ্কোভিচ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গেও আলোচনায় বসবেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক ও শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ। একই সঙ্গে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডান নেলসনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সফর শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন ও কার্যকারিতা বাড়াতে এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর বহর তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট রাখা হয়েছে।
জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগত জলপথ বাব এল-মান্দেব নিয়ে আলোচনার জন্য জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা প্রণালিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কে এ বৈঠক ডাকা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের চলতি মাসের সভাপতি ফ্রান্সের অনুরোধে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। লোহিত সাগরের মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপকে যুক্ত করা জলপথটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়েছে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় এশিয়ার শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইয়েমেন উপকূলের এই রুট সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ সংকট মোকাবেলায় মঙ্গলবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলে জানা গেছে। এদিকে জলপথটির নিয়ন্ত্রণ হারানোয় সৌদি আরব চরম সংকটে পড়েছে এবং রিয়াদ নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হুতিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। জানা গেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে সহায়তার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন সৌদি যুবরাজ, তবে মার্কিন প্রশাসন তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর। ভাবা গিয়েছিল, এ সংস্থা আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার্থে বৃহৎ ভূমিকা নেবে। মানবাধিকার রক্ষা করবে। সেই সাথে বিশ্বব্যাপী আর্থ- সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রেও মুখ্য একটা চালিকাশক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহায়তা, যুদ্ধ প্রতিরোধ, নিরস্ত্রীকরণ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে জাতিসংঘ। সোজা কথায় বলা যায়, বিশ্বাস ও আস্থার দূত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। জাতিসংঘের বিচার বিভাগীয় অঙ্গ, যা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস রূপে পরিচিত, তা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আইনি বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করবে। আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব। ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সার্বিক বিরোধিতা এবং পরাধীন জাতির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের বিষয়টিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ এক অনুঘটক। মানুষের শাশ্বত মর্যাদা রক্ষার শপথ গ্রহণ করেছিল জাতিসংঘ। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রী এলিনর রুজভেল্টের সভাপতিত্বে একটা মানবাধিকার কমিশন গঠন করে। মানবাধিকার নিয়ে বহু আলোচনা, বহু সভা, বহু মতামত - সবাই ইতিবাচকতার পক্ষে। কিন্তু এখানেই আবার একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। লিখিত খসড়া আর বাস্তবতায় অনেক পার্থক্যের অবলোকন। সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে সত্যিই কি জাতিসংঘের নিজস্ব সিস্টেম বা ব্যবস্থা আছে? মনে হয় কারও মুখাপেক্ষী! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করল। মানবাধিকার ও সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি আঘাত। মানবাধিকারের জনক জাতিসংঘ নীরব। উদাহরণ এখানেই থেমে যায় না। আজকের উদ্ভূত পরিস্থিতি ভীষণ জটিল ও সংকটময়। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণ। ইসরায়েলের সিরিয়া, ইরান, লেবানন আক্রমণ। তারও অনেক আগে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধ। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। কখনো সামনাসামনি আবার কখনো ছায়াযুদ্ধ। এই তো কদিন আগেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজক পরিস্থিতি এবং ভয়ংকর যুদ্ধের সূচনা। আফ্রিকার ছোট ছোট দেশগুলো হয় গৃহযুদ্ধ নয়তো বহিঃশত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে বিপর্যস্তপ্রায়। তাহলে জাতিসংঘের ভূমিকা কী? দোষ-ত্রুটির কথা আলোচনার টেবিলে আসুক। যুদ্ধ সমাধান হতে পারে না। জাতিসংঘের যে উদ্দেশ্যে স্থাপনা, সেই উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে কি? কার্যপদ্ধতির মধ্য দিয়েই বিভিন্ন দেশের মানুষের আস্থা-ভরসা অর্জন করার ক্ষেত্রে একটা ফাঁক রয়ে যাচ্ছে মনে হয়। ‘পিস কিপিং অপারেশন’ বড় একটা কার্যক্রম জাতিসংঘের। সনদের ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, শান্তিরক্ষার প্রয়োজনে জাতিসংঘ বিবদমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা পর্যন্ত নিতে পারে। শান্তিরক্ষক হিসেবে কঠোর হতে পারে। ১৯৯১-৯২ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবং পঞ্চাশের দশকে কোরিয়ায় যৌথ সামরিক অভিযান হয়েছে। আজ যে দেশেই হোক, যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশু, নারী, অসহায় সাধারণ মানুষ। আগ্রাসন আক্রমণ কখনো কাম্য নয়। গাজা, ফিলিস্তিনের বিধ্বস্ত চিত্র প্রতিনিয়ত দেখছি। আতঙ্কে শিউরে উঠছি। খাবার নেই। জল নেই। রাস্তাঘাট চূর্ণ। তিল তিল করে গড়ে তোলা সুন্দর গ্রাম, শহর, নগর, কলকারখানা, বন্দর ধ্বংস হয়ে গেছে। হাহাকারের চিহ্ন বুকে নিয়ে কান্নারত আক্রান্ত দেশ। ক্ষতি তো সবার। আক্রমণকারীও কি ভালো থাকে? ব্যুমেরাং হয়ে বুকে বাজে অভিশাপ তারও। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়া। একটা যুদ্ধ যখন দুটি দেশের মধ্যে হয়, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য সব দেশেও। এখানেই চরম দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে হবে জাতিসংঘকে। শান্তিবিঘ্নকারীর প্রতি কঠোরতার অবলম্বন চাই। ই বি টমকিনস তাঁর ‘The UN in Perspective’ বইয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বজোড়া বিপর্যয় এড়াতে বা রাষ্ট্রসমূহকে সমূহ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, তা শান্তিরক্ষামূলক কর্মপদ্ধতি।’ রোসালিন হিগিনসের মন্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক, ‘জাতিসংঘের শান্তিরক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত এবং নির্দেশিত তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বা কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিরোধ, সংকোচন, তীব্রতা হ্রাস বা অবসান।’ যুক্তি দেখাতে পারেন অনেকে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতি, আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন, সব পক্ষেরই সহযোগিতা ইত্যাদির প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্বের জায়গায় তো আসতেই হবে জাতিসংঘকে। বলপ্রয়োগমূলক কিছু ব্যবস্থা সব সময় নিতে হবে তা নয়। ড. রাধারমণ চক্রবর্তীর কথায়, ‘বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা এবং হাল্কা কূটনৈতিক ব্যবস্থা - দুইয়ের মাঝামাঝি।’ আজকের এই পরিবর্তিত বিশ্বে উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘকে আরও গণতান্ত্রিক, কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক বিষয়ের সফল সমাধান ঘটছে না। বিশ্বকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নিতেই হবে। লাশের স্তূপের ওপর বসে পিশাচের উল্লাস আর দেখতে চাই না। আগামী প্রজন্মের কাছে একটা সুন্দর পৃথিবী থাক মানবতায় গড়া। জাতিসংঘের শুভ উদ্যোগ এবং সার্থক প্রয়াস হোক দিশারি।
অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বহুমুখী সংকটে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটালে চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সরকারি এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধা হারানো, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের মতো বিষয়গুলো এই চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পেছানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছে। আসন্ন জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) বৈঠক সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর স্থগিত করার সুপারিশ করেছে, যা এখন সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া মেধাস্বত্ব সুবিধা বাতিল হলে দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকে শ্রম অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তদন্তের কারণে দেশটির বাজারেও শুল্ক জটিলতা তৈরি হতে পারে। দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতিও বেশ চাপে রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তেলের আমদানি ব্যয় ৭২ শতাংশ ও সারের ব্যয় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভে টান পড়েছে। বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ এবং রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এই অস্থিতিশীল অর্থনীতিকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনতে এবং একটি মসৃণ এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে অন্তত আরও কয়েক বছর প্রস্তুতির সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।