শহরের সবচেয়ে পুরোনো ডাকঘরটা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একসময় এখানে প্রতিদিন শত শত চিঠি আসত—সুখের খবর, দুঃসংবাদ, চাকরির নিয়োগপত্র, প্রেমের কথা, অভিমানের ভাষা। এখন ডাকপিয়নের ব্যাগ প্রায়ই খালি থাকে। মোবাইল, ই-মেইল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে চিঠি যেন ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে গেছে। আব্দুল করিমেরও আজ শেষ কর্মদিবস। ছেষট্টি বছরের জীবনে টানা চল্লিশ বছর তিনি একই সাইকেলে চড়ে মানুষের কাছে চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ডাকপিয়ন শুধু কাগজ পৌঁছে দেয় না—কখনো কখনো এক মানুষের বুক থেকে আরেক মানুষের বুক পর্যন্ত একটি জীবন পৌঁছে দেয়। পুরোনো কাঠের আলমারি খালি করতে গিয়ে হঠাৎ একটি ধুলো জমা খাম মেঝেতে পড়ে গেল। খামের ওপর তারিখ—১৭ আগস্ট, ১৯৯৬। করিম সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। প্রাপক : মাহমুদুল হাসান গ্রাম : শালবন আর নিচে লেখা, ‘যদি কখনো এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, পুরোটা পড়বে। মাঝপথে থেমো না।’ পেছনে প্রেরকের নাম— সায়লা কবির। চিঠিটি কখনো পাঠানোই হয়নি। কীভাবে এত বছর ডাকঘরের এক কোণে পড়ে ছিল, তার কোনো উত্তর নেই। করিম সাহেব খামটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। চল্লিশ বছরের চাকরির শেষ দিনে তাঁর মনে হলো, হয়তো এটাই তাঁর শেষ দায়িত্ব। পরদিন সকালে পুরোনো সাইকেলটা নিয়ে তিনি রওনা হলেন শালবনের উদ্দেশে। কিন্তু শালবন আর আগের মতো নেই। কাঁচা রাস্তার জায়গায় পিচঢালা সড়ক, তালগাছের জায়গায় বহুতল ভবন। পুরোনো বাজারটাও নেই। অনেক খোঁজার পর এক বৃদ্ধ পথ দেখিয়ে বললেন, “মাহমুদুল? আছেন। তবে মানুষটা অনেক বদলে গেছেন।” বিকেলের শেষ আলোয় করিম সাহেব পৌঁছালেন একটি ছোট্ট বাড়ির সামনে। দরজা খুললেন সত্তরের কাছাকাছি এক বৃদ্ধ। আপনি কি মাহমুদুল হাসান? বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। করিম সাহেব কাঁপা হাতে খামটি এগিয়ে দিলেন। আপনার নামে এসেছিল। ত্রিশ বছর আগে। বৃদ্ধ খামের ওপরের নামটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন— সায়লা... একটি নাম উচ্চারণ করতেই যেন তাঁর মুখের ওপর ত্রিশ বছর আগের এক যুবক ফিরে এল। খাম খুলতে তাঁর হাত কাঁপছিল। অবশেষে চিঠিটি খুললেন। প্রথম লাইন— মাহমুদ, যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, তাহলে জেনে নিয়ো—আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি। আমাকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল। চিঠি এগিয়ে গেল— সেদিন স্টেশনে আমি আসিনি বলে হয়তো তুমি ভেবেছ, আমি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করেছি। সত্যিটা অন্য ছিল। বাবা আমাকে ঘরে আটকে রেখেছিলেন। পরদিনই আমার বিয়ে হয়ে যায়। তুমি যদি আমাকে ঘৃণা করে থাকো, সেই অধিকার তোমার আছে। কিন্তু বিশ্বাস কোরো, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি স্টেশনের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। আমার সংসার হবে, সন্তান হবে, জীবন এগিয়ে যাবে। তবু আমার এক টুকরো মন সেই প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে থাকবে—যেখানে তুমি হয়তো অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলে। মাহমুদের চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছিল। হঠাৎ তিনি ভেতরের ঘরে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একটি পুরোনো টিনের বাক্স হাতে নিয়ে ফিরে এলেন। বাক্স খুলে করিম সাহেব দেখলেন—ভেতরে যত্ন করে রাখা একটি ট্রেনের টিকেট। তারিখ ১৭ আগস্ট, ১৯৯৬। মাহমুদ মৃদুস্বরে বললেন— আমি সেদিন শেষ ট্রেন চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম। তারপর আর কোনো দিন স্টেশনে যাইনি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন— জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। স্ত্রী ছিল, সন্তান হয়েছে। তাদের প্রতি কোনো অবিচার করিনি। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর পাইনি—সায়লা কেন এল না? তিনি চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরলেন— আজ পেলাম। করিম সাহেবের বলার মতো কিছু ছিল না। সূর্য তখন ডুবে গেছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় মাহমুদ দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন— জানেন, ত্রিশ বছর আগে চিঠিটা পেলে হয়তো আমার জীবন অন্য রকম হতো। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, চিঠিটা দেরি করে আসেনি। করিম সাহেব ফিরে তাকালেন। মাহমুদ মৃদু হেসে বললেন— কিছু উত্তর মানুষ বেঁচে থাকতে একবার পেলেই যথেষ্ট। পরদিন পুরোনো ডাকঘরটি ভেঙে ফেলা হলো। করিম সাহেব আর কোনো দিন সেই ডাকঘরে ফিরলেন না। তবু তাঁর মনে থেকে গেল সেই চিঠি, সেই বৃদ্ধ মানুষ আর ত্রিশ বছর আগের একটি অপেক্ষা। তিনি বুঝেছিলেন—ডাকপিয়নের কাজ শুধু চিঠি পৌঁছে দেয়া নয়। কখনো কখনো তাকে পৌঁছে দিতে হয় এমন কিছু কথা, যেগুলো সময়ের কাছে হারিয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়। কিছু চিঠি ঠিকানায় পৌঁছাতে ত্রিশ বছর নেয়। আর কিছু উত্তর—একটি পুরো জীবন।
প্রিয় আকাশ কেমন আছ আকাশ? কেমন আছে তোমার দখিনের জানালা? বলাবাহুল্য, তবু জানতে চাইলাম। তুমি যে ভালো নেই, সে আমি খুব বুঝতে পারি। আমি জানি, তোমার বুকে মেঘ জমেছে খুব। জানো আকাশ, আমারও বড্ড বেড়েছে অসুখ। এমন কেন হয়! তোমার বুকে মেঘ জমলে আমার চোখে বৃষ্টি নামে কেন? গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, কামিনী, দোলনচাঁপা বৃষ্টির জল পেয়ে কেমন চনমনিয়ে উঠেছে দেখো। অথচ আমি বিষাদ পুষি আজও। হঠাৎ হঠাৎ অসুখ করে, দুচোখ এমন জলে ভরে, ঘুম উড়ে যায় কোথায় কোথায়, বুক ভেঙে যায় দারুণ ব্যথায়। এমন কেন হবে? আবার যখন মেঘ ভেসে যায়, জোছনা এসে উঠোন ভাসায়, আমি বসি ঘরের দাওয়ায়। নেই যে তুমি আমার পাশে, তাই তো জোছনা আগলে রাখি সবুজ ঘাসে। ছুঁয়ে থাকি, যেমন করে দূর থেকে তোমার বুকে গল্প আঁকি। তেমন করেই ছুঁয়ে থাকি। কখন যেন ভোর হয়ে যায়, উদিত কিরন পরাগ মাখায় চোখের পাতায়। আমি চমকে উঠি, চমকে উঠি ভীষণ। এই যে সারা রাত আগলে ছিলাম, ফুরিয়ে গেল! ফুরিয়ে গেলে তুমি? তাকিয়ে দেখি তোমার বক্ষজুড়ে আলোকধারা নামছে ভূপৃষ্ঠ চুমি। হাতের মুঠো শূন্য আমার ফুরিয়ে গেছে সব। ফুরিয়ে গেছে জোছনা রাতি, পাখির কলরব। তুমি বলেছিলে, বলছিলে একদিন আমরা একত্রে মেঘ জমিয়ে বৃষ্টি হব, ঝিলের জলে পদ্ম হব। আমাদের অনেক গল্প হবে, স্বপ্নগুলো জীবন পাবে। কিন্তু সেসব কিছু হয়নি আকাশ। অথচ দেখো, তোমার আকাশে আজও মেঘ করে বৃষ্টি নামে, কেবল আমি ছুঁতে পারি না। আজও তুমি জোছনা নামাও, অন্য কারও উঠোন ভাসাও। কেবল আমি, আমিই ভিজতে পারি না। আমাদের আর কোনো গল্প হয়নি। কেবল একটা সময় বুঝতে পারলাম, আমরা তুমি আর আমি হয়ে গেছি। ইতি ফুরিয়ে যাওয়া বসন্ত
চিঠি আসবেই জানি আসবেই—একদিন ডাকপিয়নের হাতে, ডাকঘরের সিলমোহর লাগানো খামে। চিঠি আসবেই। কারণ চিঠি শুধু কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়, চিঠি হলো হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা অনুভূতির নাম। একসময় চিঠির জন্য মানুষ দিনের পর দিন অপেক্ষা করত। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠত। দূরদেশে থাকা সন্তানের চিঠি ছিল মায়ের কাছে পরম শান্তি, প্রিয় মানুষের চিঠি ছিল নিঃসঙ্গ হৃদয়ের গোপন আনন্দ। একটি চিঠি হাতে পাওয়া মানেই যেন দূরের মানুষটিকে একটু কাছে পাওয়া। আজ ডিজিটাল যুগ। মুঠোফোনে মুহূর্তেই পৌঁছে যায় বার্তা, ভিডিও কলে দেখা যায় প্রিয় মুখ। অপেক্ষার সময় কমেছে, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা কি কমেছে? হয়তো চিঠির ব্যবহার কমেছে, কিন্তু চিঠি হারায়নি। কারণ, মানুষের কিছু অনুভূতি এখনো ‘সেন্ড’ বাটনে ধরা পড়ে না। পুরোনো চিঠির হলুদ পাতায় আজও লেগে থাকে হাতের স্পর্শ, ভালোবাসার গন্ধ আর হারানো দিনের স্মৃতি। কিছু চিঠি লেখা হয়, কিন্তু পাঠানো হয় না—থেকে যায় হৃদয়ের গোপন ডায়েরিতে। তাই বিশ্ব চিঠি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রযুক্তির ভিড়েও অনুভূতির এই প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখব। একদিন চিঠি আসবেই—যতদিন মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, অপেক্ষা আর না-বলা কথা থাকবে।
আমাদের গ্রামে এখন আর ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি শোনা যায় না। তবু শ্রাবণের প্রথম বৃষ্টি নামলেই মনে হয়, কেউ যেন অদৃশ্য হাতে একটি পুরোনো চিঠি এসে রেখে গেছে উঠোনে, যে চিঠি কোনো দিন লেখা হয়নি, তবু যার প্রতিটি শব্দ আমি মুখস্থ জানি। বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ত। দাদি তখন জানালার পাশে বসে দূরে তাকিয়ে নরম গলায় বলতেন, “আজ তোর দাদাজানের কথা খুব মনে পড়ছে।” তারপর গল্প খুলে বসতেন। এমনই এক বর্ষার বিকেলে দাদাজান নাকি প্রথম এসেছিলেন। ভিজে কাপড় থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, হাতে এক তোড়া কদম ফুল। দাদি লজ্জায় আঁচল টেনে মুখ ঢেকেছিলেন, কিন্তু চোখের কোণে ফুটে উঠেছিল এক নিঃশব্দ হাসি। সেই হাসির কথা বলতে বলতে দাদির মুখেও যেন আবার যৌবনের আলো ফিরে আসত। আমাদের মেঠোপথ তখন কাদায় থকথকে। স্কুল থেকে ফিরতে গিয়ে কতবার যে পিছলে পড়েছি! বই-খাতা ভিজে নরম হয়ে যেত, জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি। তবু সে ছিল অদ্ভুত আনন্দের সময়। আমরা বন্ধুরা কাগজের নৌকা বানিয়ে রাস্তার ধারের জমে থাকা পানিতে ভাসাতাম। কার নৌকা সবার আগে বাঁক পেরোবে, কারটা সবচেয়ে দূরে যাবে — এসব নিয়েই কত হাসি, কত হইচই! হাওরপাড়ের সেই গ্রামে বর্ষা ছিল যেন আরেকটি পৃথিবী। পানি বাড়তে বাড়তে উঠোন ছুঁয়ে ফেলত। দূরের তালগাছগুলোকে মনে হতো, তারা যেন জলের বুক থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। গভীর রাতে শুয়ে শুনতাম ঢেউয়ের ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ। মনে হতো, পুরো গ্রাম যেন জলের বুকে ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে অচেনা কোনো স্বপ্নের দিকে। সময় অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। দাদি নেই, দাদাজানও নেই। সেই কদমগাছটি আর আগের মতো ফুলে ভরে ওঠে না। মেঠোপথের জায়গায় পাকা রাস্তা এসেছে, আর কাগজের নৌকার জায়গা দখল করেছে মুঠোফোনের নীল আলো। তবু প্রথম বর্ষার বৃষ্টি নামলেই বুকের ভেতর কোথায় যেন একটি ভেজা খাম খুলে যায়। মনে হয় ভালোবাসা, অপেক্ষা আর ফেলে আসা শৈশবের নামে লেখা এক অলিখিত চিঠি আজও পৌঁছাতে দেরি করেনি। তাই আমার কাছে বর্ষা কেবল একটি ঋতুর নাম নয়। বর্ষা এক নীরব ডাকপিয়ন, যে প্রতিবছর ভিজে হাতে ফিরে আসে, স্মৃতির পুরোনো খামগুলো নিঃশব্দে খুলে দেয়, আর হৃদয়কে আবার পড়িয়ে যায় সেই সব চিঠি, যাদের কোনো ঠিকানা ছিল না, অথচ কোনো দিন হারিয়েও যায়নি।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।