একটি দেশের নাগরিক হিসেবে জনগণের কিছু মৌলিক অধিকার থাকে। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি। চিকিৎসা তার মধ্যে অন্যতম। মানুষকে সুস্থ সবলভাবে বাঁচতে হলে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার নানা জায়গায় সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। তবে কি শুধু হাসপাতাল নির্মাণেই জনগণ রোগ থেকে মুক্তি পাবে? না। জনগণকে তার প্রাপ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সরকারি হাসপাতালের সঠিক কার্য পরিচালনা। কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে জনগণের ভোগান্তি বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে টাকা খরচ করে নিজের চিকিৎসা করাতে পারে না। নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত লোকেদের রোগ হলে তাদের ভরসা কেবলই সরকারি হাসপাতালগুলো। তবে সরকারি হাসপাতালগুলো যেন অনিয়মের বেড়াজালে বন্দী। কেবল রোগীর আধিক্য বেশি, সেই অনুযায়ী ডাক্তার কম। রোগীকে পোহাতে হয় অসহ্য যন্ত্রণা অনিশ্চয়তার সাথে। কোনো সময় নেই সিট কিংবা নেই ডাক্তার। দিনের পর দিন রোগী ভর্তি থেকেও বড় ডাক্তারের দেখা নেই। পাশাপাশি চলছে সিট বাণিজ্য, এ যেন সিন্ডিকেটের লীলাখেলা। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও দালালের মাধ্যমে টাকা প্রদান করে একটি সিট পেতে হয়, নাহয় দিতে হয় কোনো রেফারেন্স। হাসপাতালের বারান্দায় কাটাতে হয় রাতের পর রাত। একটি তথ্য সংগ্রহ বা এক একটি টোকেন সংগ্রহ করতে রোগীকে দাঁড়াতে হয় ১০০, ২০০ জনের সিরিয়ালে। এ যেন রোগ ভালো করার বদলে আরও রোগী হওয়ার উপক্রম। কোনো জটিল রোগের টেস্ট করানোর জন্য দৌড়াতে হয় প্রাইভেট হাসপাতালের দোরগোড়ায়; গুনতে হয় হাজার হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালের টেস্টের অপেক্ষায় বসে থাকলে রোগীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি বিভাগে নেই জরুরি বা ইনস্ট্যান্ট সমাধান, নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, যেখানে বসে রোগী অপেক্ষা করবে, নেই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, যা খেয়ে রোগী বা তার স্বজন একটু পিপাসা মিটাবে, নেই স্বাস্থ্যকর কোনো পরিবেশ। হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর অবস্থান এবং যথাতথা অবাধ মানুষের যাতায়াত। এ কেমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ? নেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোনো ওয়াশরুম। হাসপাতালগুলোর ফ্রেশ রুমে ফ্রেশ হওয়ার বদলে যেতে হয় নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। নেই নিয়ম-নীতির বালাই। কোনো হাসপাতালে তো চলছে আরেকটি মরণ ফাঁদ। বহুতল হাসপাতালের ভবনের জন্য দেয়া হয়েছে লিফট, কিন্তু লিফটের ধারণক্ষমতার বাইরে রোগীরা উঠে যাচ্ছে। নেই জীবনের মায়া, দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতন হওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। ডাক্তারদের অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতির মাঝে ভুগতে হয় রোগীকে। বিশেষ করে, সদর উপজেলা পর্যায়ের গ্রাম অঞ্চলের হাসপাতালে রোগীরা সুচিকিৎসার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হাসপাতালে এসে একরাশ হতাশা আর ভোগান্তি নিয়ে ফিরে যায়। এর সমাধান সম্ভব কেবলই সরকারের সজাগ দৃষ্টি আর সঠিক ব্যবস্থাপনায়। রোগীর বিভিন্ন টোকেন সংগ্রহ পদ্ধতির কাজটা স্মার্টভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে, যেন রোগীকে ২, ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়। হাসপাতালগুলোর ওয়াশরুম ব্যবস্থা আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। বহুতল ভবনবিশিষ্ট হাসপাতালে লিফটব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। হাসপাতালে মানুষের যাতায়াতে নিয়ম-শৃঙ্খলাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। জুতা নিয়ে প্রবেশ, মাস্ক পরিধান ইত্যাদি বিষয়গুলোতে আরও বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। হাসপাতালে জটিল রোগ নির্ণয়ের টেস্ট করানোর ব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। সেই সাথে হাসপাতালে পর্যাপ্ত সরকারি ডাক্তার নিয়োগ করতে হবে, যাতে রোগীর চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়। জরুরি বিভাগগুলোর সেবা আরও উন্নত করতে হবে, যেন জরুরি রোগী সাথে সাথেই সেবা পেতে সক্ষম হয়।
দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও একজনের প্রাণহানি এবং নতুন করে ১৪০ জনের রোগটি শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ২৪৪ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন। অধিদপ্তর জানায়, মৃতদের মধ্যে ৯৫ জন নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি ৬৮৫ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এছাড়া আলোচিত সময়ে এক লাখেরও বেশি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিলেও, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের বড় অংশই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
ধূমপান, বায়ুদূষণ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ৪৫ শতাংশ ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বুধবার (১৮ জুলাই) এ সংক্রান্ত একটি হালনাগাদ নির্দেশিকা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর নতুন করে আরও এক কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ হলো ডিমেনশিয়া। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও ডব্লিউএইচও প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়িসুস জানিয়েছেন, এটি বার্ধক্যের কোনো অনিবার্য অংশ নয়; বরং সচেতনতার মাধ্যমে এর ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। ডিমেনশিয়ার কারণে মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এর সবচেয়ে সাধারণ রূপ হলো আলঝেইমার্স, যা মোট আক্রান্তের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, তামাক ও অ্যালকোহল সেবনের মতো অসংক্রামক ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে চললে এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায় বলে নতুন নির্দেশিকায় জোর দেওয়া হয়েছে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত এক সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এই তথ্য জানান। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল রোডম্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ই-হেলথ কার্ড হলো নাগরিকদের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্বের সব রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও ওষুধের বিবরণ মুহূর্তেই দেখতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে গত দুই বছর ধরে এই ডিজিটাল রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীমসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসা অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল মেডিকেল অক্সিজেন রোডম্যাপ (২০২৬–২০৩০)’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কর্মপরিকল্পনা তৈরির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে সভাপতি করে ২৭ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ ইমাম আলী রেজা। এতে স্বাস্থ্য ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বুয়েট এবং আইসিডিডিআর,বি-এর বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা যুক্ত আছেন। এই কমিটির প্রধান কাজ হলো চিকিৎসা অক্সিজেনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং একটি কার্যকর জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করা। এর মাধ্যমে দেশের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সহজলভ্যতা নিশ্চিতের পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।