সন্ধ্যা নামছে চারদিকে। আঁধারির ছড়াছড়ি চোখে পড়ছে। সূর্য আর ওই দূর আকাশে দৃশ্যমান নেই। অনেক আগেই অস্তমিত হয়ে গেছে। রেখে গেছে তার স্মৃতিগাঁথা কিছু কিরণ চন্দ্র ও তারকারাজি। আসলে একটি রাত শুরু হয় কেবল আলো নেভানোর জন্য নয়, বরং আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখের কথা বলতে, জরাজীর্ণ অবস্থা আর দুর্দিনের কথা মনে করিয়ে দিতে। আমি একলা মনে বসে আছি। ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়া কিছুই আর কানে বাজছে না। হঠাৎ হারিয়ে গেলাম অজানা এক প্রান্তরে। নিজেকে আবিষ্কার করলাম বালুকাময় এক মরু প্রান্তরে। কিন্তু সবকিছুই যে অপরিচিত। এখানকার কেউই , কোন আগন্তুক আমাকে চেনে না। আমি অনারবি, আমার কথাও বোঝে না। বিশাল জটিলতায় পড়ে গেলাম।যদি ওরা লুটেরা হয় আর আমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দেয় তখন? শুনেছি, মরু অঞ্চলে দস্যুদের আনাগোনা অনেক। ওদের বোঝা মুশকিল। কারণ, আগন্তুক আর দস্যু সবাইকে এক মনে হয়। পোশাকে, সুরতে। এদিকে আমার সাথেও এমন কেউ নেই যে আমার সাহস জোগাবে কিংবা তাদের কথা বুঝবে। দীর্ঘ সময় একই স্থানে। অপরিচিত, ভয় ভয় লাগছে। হঠাৎ তাদের কেউ আমার অবস্থা লক্ষ্য করল। আমি কিছুটা নার্ভাস। আতঙ্কিত। কিছুটা চিন্তিত। সে আমাকে তার ভাষায় বলতে লাগল অনেক কিছু। আমি তাকিয়ে আছি। বোঝার চেষ্টা করছি। ধরতে পারছি আবার দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছি। তবে কিছুটা বুঝতে পারলাম, তাদের কাফেলার পরিচয় দিচ্ছে। তারা কোনো মরুদস্যু নয়। তারা সবাই ব্যবসায়ী। এটা বাণিজ্যিক কাফেলা। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিছুটা স্বস্তিবোধ করছি এখন। তবে অজানা আর অপরিচিতির ভয় এখনো কাটেনি। রাত গভীর হচ্ছে, তাদের আয়োজনও ভারী হচ্ছে। খাওয়াদাওয়া, অমোঘ ফুর্তি। আদিকালের রীতি বৈচিত্র্য। বড়লোকের ব্যাপারস্যাপার। আমি এখন নীরবে কিছুটা দূরে এক শামিয়ানায় বসে আছি। ভাবছি, দেখছি। ভালোও লাগছে, আবার ভয়ও করছে। হঠাৎ একজন সান্ত্রী আমাকে দস্তরখানে দাওয়াতের বার্তা নিয়ে এলো। বেশ খিদে পেয়েছে, তাই না করলাম না। তবে আমি জড়োসড়ো হয়ে আছি। ওরা অপরিচিত। আমি অনারবি। দস্তরখান বেশ সাজানো হয়েছে। বণিকরা খাওয়া শুরু করেছে। পানিও সাথে আছে! আমাকে দেখে তারা হয়তো সম্ভাষণ জানাল। আমি মাথা দিয়ে সায় দিলাম। আরও কিছু আমাকে বলছিল, তবে আমি তখন নিরুত্তর। হয়তো বুঝতে পারছে আমি যে অনারবি, তবে কোনো বেদুইন না। তাই আর কথা বাড়াল না। তাদের মতো করে খাওয়াদাওয়া শেষ করল। আমিও এই ফাঁকে কিছু মুখে দিয়ে পেটের খিদে মিটিয়ে নিলাম। রাত গভীর হচ্ছে। যাত্রা শুরু করবে এখন। বাইরে চন্দ্রালোকিত পুরো মরু প্রান্তর। সবকিছু গোছানো হচ্ছে। আমিও কাফেলার সাথে প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম। আবার শুরু হলো মরু প্রান্তরে অজানা সফর। আমি জানি না কোথায় যাব।তবে যোজন যোজন দূরত্ব পাড়ি দিচ্ছি এটুকু বুঝতে পারছি। আমার গন্তব্য অজানা, তবে ওই বণিক দলের গন্তব্য তো কোনো এক বাণিজ্যিক শহর। তো আমি কেন তাদের সাথে! এরপর কী করব। কী হবে? যাকগে ওই সব পরে চিন্তা করব। এখন তো কিছুটা নিশ্চিন্ত। ভয় কিছুটা কেটেও গেছে। তারা আমার সাথে কোনো সন্দেহপূর্ণ ব্যবহার তো করেনি। কিছুটা হলেও সমাদর করেছে। অতিথিপরায়ণও বটে। হঠাৎ কীসের আওয়াজে ঘোর কেটে গেল। সংবিৎ ফিরে পেলাম। তবে ভালো লেগেছে। আদি যুগের কল্পনায়। মেহমান হতে পেরেছি। বণিকদের আতিথেয়তা পেয়েছি। মরুদস্যুর ভয়ও উবে গেছে। যাবেই তো, এখন যে আমি মরু প্রান্তরে না। নিজ গৃহে বসে আছি।
কল্পনার আকাশ সীমাহীন। যেন এক মহাসমুদ্র। চিত্রকল্প এর ঐশ্বর্য। তীব্র অনুভূতির সৌন্দর্য। একটি নান্দনিক কবিতায় থাকে নানা রকম বৈচিত্র্যের সমাহার। থাকে গোধূলির মায়া। দিগন্তের হাতছানি। আকাশের নীল। সমুদ্রের গর্জন। শরতের মেঘ। বৃষ্টির শব্দ। হেমন্তের হাসি। বসন্তের প্রজাপতি। নিসর্গের মায়া। এসবই একজন কবির চিত্রকল্পের ক্যানভাস। চিত্রকল্প একেবারেই যে অনিবার্য তা হয়তো না। চিত্রকল্প ছাড়াও কবিতা জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু আধুনিক কবিতার দাবি ভিন্ন। চিত্রকল্প ছাড়া আধুনিক কবিতা অনেকটা অসম্পূর্ণ। চিত্রকল্পকে মনে করা হয় কবিতার প্রাণ। এটা কল্পনার রঙিন ছবি। শব্দের অপূর্ব বিন্যাস। কবির উপলব্ধি যখন মূর্ত হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় চিত্রকল্প। ইংরেজিতে বলে ইমেজ। বাংলায় শব্দের জাদু। চিত্রকল্প আত্মার সংকেত। একধরনের ইশারা। অলংকারের নিপুণ কারুকাজ। তুলনার ঊর্ধ্বে এর অবস্থান। উপমা শব্দের অংশ মাত্র। চিত্রকল্প বিষয়ের নির্যাস। এক চিত্র থেকে অন্য চিত্রে উত্তরণ ঘটে অনায়াসে। ভালো কবিতায় প্রেম-বিরহ, দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দ সবই চিত্রকল্পময় হয়ে ওঠে। এটি প্রত্যক্ষ ও পারোক্ষ হতে পারে। পরোক্ষ চিত্রকল্প পাঠক হৃদয় দিয়ে অনুভব করে। এটি সার্থক কবিতার শ্রেষ্ঠ গুণ। উপমার আড়ালে লুকানো ছবি। অব্যক্ত কথার আড়ালে গভীর কথা। মিথের অপূর্ব মেলবন্ধন। চিত্রকল্প যেন স্বপ্নের রাজ্য। সত্যের সাথে স্বপ্ন মিশে একাকার। কবি স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে ওঠেন। তিনি দেখেন অতীতের ধূসর ছায়া। দেখেন ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলো। তাঁর ভাবনায় উজ্জল হয়ে ওঠে অনাগত দিনের সুর। তিনি প্রচলিত ছক ভেঙে লেখেন। অজানার ডাকে ছুঁয়ে যান নতুন দিগন্ত। সত্যের জয়গান গাইতে হয় অমোঘ সুরে। আর তখনই কবিতার শক্তি হয় অমর, অজেয়। চিত্রকল্পের রূপান্তর ঘটে অবিরাম। সময় বদলে যায়। আঙ্গিক পাল্টে যায়। শব্দের ব্যবহার হয় আধুনিক। ছন্দের চলন হয় নতুন ছন্দে। এই বদল স্বাভাবিক। একে মেনে নিতে হয়। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি চিরকাল সবার প্রিয়। সময়কে জয় করাই শিল্পের চূড়ান্ত সাফল্য। কবিতা সেই ধ্রুবতারা, যা অন্ধকারে পথ দেখায়। জীবনের বাতিঘর। কবিতা শুধু শব্দের কারুকাজ নয়, এটি জীবন দর্শন। অমরত্বের স্বপ্ন। চিরন্তন সত্যের আলো, আর চিত্রকল্প এর আত্মা। বিচিত্র ভাবনার জগতে বাস করেন একজন কবি। তিনি তাঁর সময়কে উপেক্ষা করতে পারেন না। চারপাশের যন্ত্রণার দহন। শোষিতের আর্তনাদ। বেদনার অশ্রু। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। শাসকের অহংকার। পাহাড়ের মায়া। রাতের নির্জনতা। অমানবিকতার অন্ধকার - সবই তিনি দেখেন। অনুভব করেন। কবিতায় ধারণ করেন। চিত্রকল্পের অসীম প্রান্তরে কবির বিচরণ। কল্পনার এই অলৌকিক শক্তি জন্ম দেয় কালজয়ী কবিতা। চিত্রকল্প ছাড়া কবিতা প্রায় প্রাণহীন। কল্পনাই কবিতার শক্তি। শুধু চিত্রকল্পই না, কবিতার ভাষা ও বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রকল্পা ভাষা ও বিষয়ের অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত হয় এক নান্দনিক কবিতা। তা না হলে কবিতার সৌন্দর্য হারায়। ভালো কবিতার জন্য প্রয়োজন চিত্তের শুদ্ধতা। হৃদয়ের গভীরতা। অলংকারহীন কবিতা পাথরের মতো প্রাণহীন। আধুনিক পাঠক সচেতন। তাঁরা কবিতায় চিত্রকল্প দেখতে চান। চিত্রকল্প একটা কবিতাকে কাল থেকে কালান্তরে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে প্রয়োজন ছন্দ ও শব্দের ব্যঞ্জনা। ছন্দ মানেই গতি। অসীমের পথ। রবীন্দ্রনাথ গদ্য ছন্দের অমর স্রষ্টা। তাঁকে বলা হয় গদ্য কবিতার আলোর মশাল। তিনি অন্তমিলের শেকল ভাঙেন। কবিতায় আনেন মুক্তক ছন্দ। ছন্দ থেকে কবিতাকে মুক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেন গদ্যের নতুন জগৎ। মৃদু ঢেউয়ের মতো গদ্যের দোল থাকে। একেই বলে কবিতার প্রবহমানতা। এখানে অবাধ স্বাধীনতা। পাখির মতো উড়ে চলা। নীল আকাশের মতো আবেগের জোয়ার। ধ্বনি, পর্বের বন্ধন ও আলোর খেলা। কল্লোল যুগের কবিরা তো বরীন্দ্রনাথেরে বিরুদ্ধে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরাও রবীন্দ্রনাথের দেখানো পথে গদ্য কবিতা লেখেন। কবিরা হয়ে ওঠেন ভাষার সার্বভৌম রাজা। বাংলা কবিতা পেল ভিন্নমাত্রা। শুরু হলো গদ্য কবিতার জয়যাত্রা। কিন্তু গদ্য অথবা পদ্য, ছন্দ অথবা ছন্দহীন যে কবিতাই হোক না কেন, চিত্রকল্প এর এমন এক ঐশ্বর্য, যা কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। কবিতায় গুরুচণ্ডালী ভাব যেন না থাকে, সেদিকটায় সতর্ক থাকতে হয়। তবে কখনো কখনো সাধু-চলিতের মিশ্রণ হতে পারে, যদি তা ছন্দ ও কবিতার সৌন্দর্য রক্ষায় অপরিহার্য হয়। সাধারণত কবিতা হয় প্রতীকী। এখানে রূপকের গভীর ইশারা থেকে। গভীর অর্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেক অর্থ। কবির গভীরতম অনুভব চিরকাল সুন্দর, যা পৃথিবীকে করে আরও সুন্দর। মানুষকে করে আরও মানুষ। কবিতার এই জয়যাত্রা চলুক অনন্তকাল। কবি হোক শব্দের জাদুকর। কবির চিত্রকল্পের জাদুতে মোহিত হোক পৃথিবী।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।