ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর সবচেয়ে বড় অপারমাণবিক বোমা ‘জিবিইউ-৪৩/বি’ বা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ (এমওএবি) নিক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে। মূলত ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের লক্ষ্যেই এই বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্ররা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তবে যেকোনো সময় এই হামলা হতে পারে। তবে বিশাল বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন এই বোমার কার্যকারিতা নিয়ে খোদ মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে, ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এটি কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা ছাড়া বৃহৎ পরিসরে এই বোমার ব্যবহার হলে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে আইএস-এর আস্তানা লক্ষ্য করে এই এমওএবি বোমা নিক্ষেপ করেছিল মার্কিন বাহিনী, যাতে ৯০ জনের বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছিল। তবে সম্ভাব্য এই সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে ট্রাম্প এখন আপাতত আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপরই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। কেননা ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জনপ্রিয়তা বেশ হ্রাস পেয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রুখতেই এই যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল, যদিও তেহরান শুরু থেকেই তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের লক্ষ্য থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক তৎপরতা স্থবির হয়ে পড়ায় বর্তমানে সামরিক অভিযান কমিয়ে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলেই এগোচ্ছে ওয়াশিংটন।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং সংঘাত বন্ধে নিজেদের সুনির্দিষ্ট শর্ত স্পষ্ট করেছে ইরান। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালির নৌপথ নিরাপদ রাখতে ওমানের সঙ্গে একটি সফল সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে দেশটি। ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরে সম্প্রতি এক বক্তব্যে এ তথ্য জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই। ইসমাইল বাঘেই উল্লেখ করেন, বিরোধ নিরসনে ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাদের অবস্থান তুলে ধরছে এবং ওমানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ নৌপথের ভৌগোলিক সীমারেখা নির্ধারণে দুই দেশই একমত হয়েছে। এ-সংক্রান্ত যৌথ সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সামনে উত্থাপন করা হবে, সে বিষয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল পরিবহন রুট হওয়ায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই দ্রুতই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত জলপথ থেকে পিছু হটেছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বহর। প্রণালির মুখ থেকে এসব যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৫০০ কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, সংঘাত শুরুর পর হরমুজ ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত ৩০ থেকে ৪০টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ টহল দিত। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ কিংবা বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটিতে তাদের কোনো যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নেই। আইআরজিসির মুখপাত্রের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই এবং তাদের বর্তমান হুমকিগুলো পরাজয় ঢাকার অপচেষ্টা মাত্র। বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হওয়া ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। এর আগে গত জুনে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সাময়িক উত্তেজনা কমলেও জুলাইয়ে চুক্তি থেকে ইরানের সরে আসার পর হরমুজে ফের অবরোধ জারি করা হয়। ওয়াশিংটন প্রণালিতে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও তেহরান তা নাকচ করে মার্কিন বহর পিছু হটার খবর জানাল।
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির মাঝখানে এমন একটি সরু জলপথ রয়েছে, যার ওপর নির্ভর করে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমানের ভূখণ্ড, মাঝখানে হরমুজ প্রণালি। ভৌগোলিক আয়তনের বিচারে এটি পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ক্ষুদ্র বিন্দুমাত্র। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর গুরুত্ব এতটাই বিস্তৃত যে, এই প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও তেলের বাজার, জাহাজ চলাচল, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঢেউ তুলতে পারে। ফলে হরমুজকে কেবল একটি সামুদ্রিক পথ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। এটি একই সঙ্গে একটি ভূরাজনৈতিক চোকপয়েন্ট, জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অন্যতম মঞ্চ। পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো রাষ্ট্রগুলো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সমুদ্রপথে রপ্তানি করে। তাদের তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে যেতে হলে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। বিশেষ করে, কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। অর্থাৎ হরমুজের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ অঞ্চল একটি নির্দিষ্ট সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই হরমুজকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একটি চোকপয়েন্ট বলা হয়। চোকপয়েন্ট হলো এমন একটি ভৌগোলিক স্থান, যার নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তা বৃহৎ পরিসরের বাণিজ্য ও যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। সুয়েজ খাল, বাবেল মান্দেব প্রণালি ও মালাক্কা প্রণালির মতো হরমুজও সেই ধরনের একটি স্থান। তবে এর বিশেষত্ব হলো, এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিশ্বের জ্বালানি বাজার। পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসা তেল ও গ্যাসের প্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। হরমুজের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয় ইরানের অবস্থান বিবেচনা করলে। প্রণালির উত্তরে ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং তার বিপরীতে ওমানের ভূখণ্ড। ফলে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এই জলপথের ওপর একটি বিশেষ কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংঘাতে রয়েছে এবং এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পারস্য উপসাগর। প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা ইরানের জন্য কঠিন। তাই ইরানের সামরিক কৌশলে অসম যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগামী নৌযান এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। হরমুজের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা ই ধরনের কৌশলকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। তবে হরমুজ বন্ধ করে দেয়া এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা এক বিষয় নয়। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণভাবে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ বন্ধ রাখা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য দিতে হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি দ্বিমুখী। হরমুজ দিয়ে অন্য দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় ঠিকই, কিন্তু ইরানের নিজের জ্বালানি রপ্তানিও সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করা ইরানের নিজের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু পূর্ণ অবরোধের প্রয়োজনও নেই। সামান্য সামরিক উত্তেজনা, জাহাজ আটকের ঘটনা, মাইন বিস্তারের আশঙ্কা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তাই আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর ও তার আশপাশের জলপথে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সামরিক উপস্থিতি তার চারপাশে মার্কিন শক্তির একটি স্থায়ী চাপ। ফলে একই জলপথ দুই পক্ষের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রশ্ন, আর ইরানের কাছে এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্ন। হরমুজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সিকিউরিটি ডিলেমা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো রাষ্ট্রগুলো একদিকে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধও তাদের জন্য বিপর্যয়কর। তাদের অর্থনীতি তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং সেই রপ্তানির জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথ অপরিহার্য। তাই তারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করে এবং নিজেদের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিসরও বাড়ানোর চেষ্টা করে। চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই বুঝতে পারছে যে, শুধু সামরিক জোটের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে চীনের উত্থানও সরাসরি যুক্ত। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস তার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হরমুজের নিরাপত্তা চীনের কাছে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ। চীনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি তাই ক্রমেই অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দিকে এগোচ্ছে। সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য এবং বৃহত্তর অবকাঠামোগত সংযোগের পরিকল্পনা এই পরিবর্তনের অংশ। এর ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্য এবং চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে একটি পরোক্ষ প্রতিযোগিতাও তৈরি হচ্ছে। হরমুজের গুরুত্ব শুধু তেল দিয়ে শেষ হয় না। বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোলেও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা রাতারাতি শেষ হচ্ছে না। পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পেট্রোকেমিক্যালসহ বহু খাত এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হবে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়বে, বিমা ব্যয় বাড়বে, জাহাজ পরিবহনের খরচ বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এরপর সেই অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও শিল্পপণ্যের বাজারে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের আমদানি ব্যয় সামলানোর সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা জ্বালানির সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারের দাম দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। হরমুজকে ঘিরে বড় কোনো সংকট হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব পড়তে পারে। অবশ্য হরমুজের বিকল্প তৈরির চেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত স্থলভিত্তিক পাইপলাইন ও বিকল্প বন্দর ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য হলো কোনো সংকটের সময় অন্তত কিছু পরিমাণ জ্বালানি হরমুজ এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো। কিন্তু এসব বিকল্প পথ হরমুজের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নয়। কারণ, পারস্য উপসাগরের বিপুল জ্বালানি রপ্তানি একসঙ্গে অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো অবকাঠামোগত সক্ষমতা এখনো নেই। ফলে হরমুজের গুরুত্ব কমানো সম্ভব হলেও এর প্রয়োজনীয়তা সহজে দূর করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক আইনও এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চলাচল-অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু শান্তিকালীন আইন এবং যুদ্ধকালীন বাস্তবতা এক নয়। কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, তখন আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, উপকূলীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং সামরিক প্রয়োজনের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে। ফলে হরমুজের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৈধতারও পরীক্ষা। হরমুজকে তাই ভবিষ্যতের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিশ্বের জ্বালানি বাজারের পারস্পরিক নির্ভরতা একই জায়গায় এসে মিলেছে। আগামী দিনে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমলেও হরমুজের গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূগোলের গুরুত্ব প্রযুক্তি যতই বাড়ুক, সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। বরং প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা ভূগোলের রাজনৈতিক মূল্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিশেষ অনুরোধে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে হামলার প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত ধাপে, ঠিক তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে অভিযানটি বাতিল করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ঠেকাতে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চাইছিল রিয়াদ। শুরুতে ট্রাম্প হামলার বিপক্ষে থাকলেও যুবরাজের সঙ্গে ফোনালাপের পর পেন্টাগনকে আঘাত হানার নির্দেশ দেন। পরিস্থিতি এতটাই অগ্রসর হয়েছিল যে লক্ষ্যবস্তু চূড়ান্ত করে যুদ্ধবিমানে বোমা লোড করা সম্পন্ন হলেও রোববার দুপুরে হঠাৎ করেই পুরো প্রক্রিয়া থামিয়ে দেন ট্রাম্প। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও সৌদি আরবের অনুরোধে ওয়াশিংটনের হামলা বিবেচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও হোয়াইট হাউস। কেবল প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন সবসময় মিত্রদের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রশাসনের ঘনিষ্ঠদের বড় অংশই সৌদি-হুথি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিপক্ষে ছিলেন। দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ফলে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মাঝে মার্কিন বাহিনীর ওপর বাড়তি সামরিক চাপ পড়ার আশঙ্কা ছিল তাদের। একই সঙ্গে মে মাসে কৌশলগত কারণে রিয়াদ আকাশসীমা ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের নজির থাকায়, পুরো আঞ্চলিক ভূরাজনীতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে ওয়াশিংটন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজ দেশের নাগরিকদের অবিলম্বে ইরান ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সব ধরনের ইরান ভ্রমণ পুরোপুরি এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে এক নিরাপত্তা বার্তায় জরুরি সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চ্যুয়াল দূতাবাস জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ও সাম্প্রতিক হামলার জেরে চলমান সংঘাত যেকোনো সময় বড় আকার ধারণ করতে পারে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে সামনে ‘খুব বড় কিছু’ ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন। এদিকে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলার মুখে তেহরানও পাল্টা সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। কোনো ধরণের আঘাত এলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থ, সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদের নিশানা করে কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক কমান্ড। উত্তেজনার জেরে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ওয়াশিংটন নৌ অবরোধ জোরদার করলেও কৌশলগত এই জলসীমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে ইরান। সার্বিক পরিস্থিতিতে অঞ্চলটিতে যেকোনো মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাতটি শর্ত পাঠিয়েছে ইরান। তবে ওয়াশিংটন এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’ শুরু করারও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, কাতারি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পাঠানো এসব শর্তের বিষয়ে এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান। সামাজিক মাধ্যম ও সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাই জানান, আলোচনার পথ উন্মুক্ত করতে ওয়াশিংটনের সামনে তাঁদের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি উল্লেখ করেন, অবিলম্বে সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, অবরুদ্ধ ইরানি অর্থ ছাড় দেয়া এবং নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা তেহরানের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে। রেজাই সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্পের হুমকিতে কোনো ফল আসবে না এবং নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য ইরান শতভাগ প্রস্তুত। ওয়াশিংটন যদি নিজেদের তৈরি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তবে ইরানের ন্যায্য শর্তগুলো মেনে নেয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা ফিরিয়ে আনতে কাতার ও পাকিস্তান জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সামরিক প্রস্তুতি তুলে ধরে ইরানি নিরাপত্তাপ্রধান জানান, পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও আরব সাগরে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং রণতরীগুলোকে কেন্দ্র করে তাঁদের নতুন কৌশল সাজানো হয়েছে। পুনরায় মার্কিন আগ্রাসন চালানো হলে শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও মার্কিন কোম্পানিগুলোতেও সরাসরি বিধ্বংসী আঘাত হানা হবে। পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান এখনো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসেনি। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ফতোয়া বা নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী পদক্ষেপ তেহরানকে নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও লোহিত সাগর উপকূলের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য নিশ্চিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা একটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং এতে নতুন কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। হামলার জেরে সৌদি রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছের একটি জ্বালানি ট্যাংক থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায় এবং সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বিঘ্নিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় শনিবার প্রথমবারের মতো রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, রিয়াদ ছাড়াও বিশ, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবু শহরে বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো একাধিক আক্রমণ তারা প্রতিহত করেছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল-সারিয়া দাবি করেন, ইয়ানবুতে আরামকোর তেল স্থাপনাসহ একাধিক স্থানে বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সাহায্যে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। সানায় সৌদি জোটের আগ্রাসন এবং গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনজুড়ে ৩০০টি হামলার জবাবেই এই পাল্টা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথিদের এই সংঘাত চলছে। এদিকে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা নিজেদের নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। ফ্লাইট বাতিল কিংবা ভ্রমণ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে অঞ্চলটিতে মার্কিন নাগরিকদের যাতায়াতের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটন।
জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগত জলপথ বাব এল-মান্দেব নিয়ে আলোচনার জন্য জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা প্রণালিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কে এ বৈঠক ডাকা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের চলতি মাসের সভাপতি ফ্রান্সের অনুরোধে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। লোহিত সাগরের মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপকে যুক্ত করা জলপথটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়েছে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় এশিয়ার শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইয়েমেন উপকূলের এই রুট সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ সংকট মোকাবেলায় মঙ্গলবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলে জানা গেছে। এদিকে জলপথটির নিয়ন্ত্রণ হারানোয় সৌদি আরব চরম সংকটে পড়েছে এবং রিয়াদ নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হুতিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। জানা গেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে সহায়তার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন সৌদি যুবরাজ, তবে মার্কিন প্রশাসন তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদ। মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর এক ভার্চুয়াল অধিবেশনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে আঘাত হানা ঘটনাটি মার্কিন সামরিক সক্ষমতার চরম ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেন তিনি। নিকজাদের দাবি, অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ৩০০ মিটার পথ বিচ্যুত হয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে আঘাত করা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের উচিত আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা বাদ দিয়ে নিজেদের এই লজ্জাজনক পরাজয় কীভাবে সামাল দেয়া যায়, সেদিকে নজর দেয়া। ইরান সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিচালনা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, তেহরান এখনো তার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেনি। অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও কমান্ড পোস্টে হামলার ঘটনা ইরানের নিয়মিত হালনাগাদ করা সামরিক শক্তির একটি ছোট্ট ঝলক মাত্র। বাকি সম্মানটুকু হারানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চল ছাড়ার পরামর্শ দেন নিকজাদ। মেহের নিউজের বরাত দিয়ে তিনি আরও দাবি করেন, কমান্ড সেন্টারে হামলার পর মার্কিন কমান্ডাররা হোটেলে পালাতে বাধ্য হয়েছেন এবং হতাশ মার্কিন সেনারা থাইল্যান্ডের উপকূলে গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সামরিক শক্তির ভারসাম্য বদলাতে রাশিয়ার হাত ধরে শব্দের চেয়ে বহুগুণ দ্রুতগতির ‘সুপারসনিক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে জোরকদম এগোচ্ছে ইরান। মস্কোর প্রত্যক্ষ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় তেহরানের এই উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। টাইমস অব ইসরায়েল এ তথ্য জানিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইনান্সিয়াল টাইমসের একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য আবশ্যক ‘র্যামজেট’ ইঞ্জিন তৈরিতে নিয়মিত কাজ করছেন রুশ প্রকৌশলীরা। এই প্রজেক্টের কার্যক্রম সফল হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসবে; কারণ তেহরান তখন অনায়াসেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় অবস্থানরত মার্কিন রণতরী ও যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে। দুই দেশের অভ্যন্তরীণ সামরিক চুক্তি ও গোপন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ‘C430L’ সাংকেতিক নামের এই যৌথ প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর ধরে সমান তালে চলেছে। এমনকি ইরান একাধিক সংঘাত ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও কোনো পর্যায়ের কাজ থেমে থাকেনি, যা মস্কো-তেহরান অক্ষের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমঝোতারই বহিঃপ্রকাশ। বিশ্লেষকদের মতে, এ-জাতীয় সংবেদনশীল ও মারাত্মক অস্ত্রপ্রযুক্তি স্থানান্তরে নিশ্চয়ই ক্রেমলিনের উচ্চপর্যায়ের পূর্ণ সবুজসংকেত ছিল। ইউক্রেন সংকটের পর থেকে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ব্যাপক গতি এসেছে—যেখানে একসময় তেহরান মস্কোকে সামরিক ড্রোন দিয়ে সাহায্য করছিল, সেখানে আজ রাশিয়া প্রযুক্তিগত সহায়তা ফেরত দিয়ে সেই ঋণের ভারসাম্য রক্ষা করছে।
সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে নিজেদের তৈরি আকাশপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে শত্রুদেশের ২০০টিরও বেশি বিমান ধ্বংস করেছে ইরান। মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর দেশটির ‘বিমান প্রতিরক্ষা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শীর্ষ সেনা কমান্ডাররা এই দাবি করেছেন। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা এলহামি বলেছেন, সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তির এই অস্ত্রগুলো এতটাই অত্যাধুনিক ও গোপনীয় ছিল যে, হামলাকারীরা টেরই পায়নি কোথা থেকে তাদের বিমানে আঘাত হানা হচ্ছে। দেশের আকাশসীমা নিশ্ছিদ্র রাখতে বর্তমানে মরুভূমি, উপকূল ও পাহাড়সহ প্রায় ৩,৮০০টির বেশি দুর্গম স্থানে এসব শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সতর্ক অবস্থায় মোতায়েন রাখা হয়েছে। আকাশপথে যেকোনো শত্রুবিমান বা ড্রোন শনাক্ত হওয়ামাত্রই তা নিমেষে ধ্বংস করতে সক্ষম ইরানের এই ইউনিটগুলো। মাতৃভূমি রক্ষায় নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়ে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, প্রয়োজনে আগামী ২০ প্রজন্ম ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতেও প্রস্তুত রয়েছে আপামর ইরানি জনগণ। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। ওই ঘটনার পরপরই প্রতিশোধ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের ওপর পাল্টা ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল তেহরান।
জিও নিউজের খবর অনুযায়ী, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ‘রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। জাতিসংঘ মহাসচিব, নিরাপত্তা পরিষদ ও সদস্য দেশগুলোকে দেয়া এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সঙ্গে অন্যান্য দেশের বৈধ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে চাপ প্রয়োগ করছে। আরাগচি অভিযোগ করেন, এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সদস্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘একতরফা চাপমূলক ব্যবস্থা’ ও নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি তা কার্যকর বা স্বীকৃতি না দেয়ার আহ্বান জানান। আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইরানের বৈধ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের এই অন্যায় চাপ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা চালালে তেহরানও সমান শক্তিতে পাল্টা জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির সদস্য ফাদা হোসেন মালেকি। ১৯ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভুল পদক্ষেপের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া না গেলেও বিশ্বযুদ্ধের ভয়ে তিনি এমন সাহস দেখাবেন না। সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি মালেকি জানান, যে ধরনের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হবে, তেহরান ঠিক একই মাত্রায় জবাব দেবে। নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও তিনি উল্লেখ করেন, ইরান এখন আত্মরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সরে ‘আক্রমণাত্মক প্রতিরোধের’ নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের হাতে গোপন সামরিক বিকল্পও রয়েছে। চলমান আলোচনা স্থগিত প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন আগের প্রতিশ্রুতি ও সমঝোতা না মানায় ইরান আর কোনো আলোচনায় বসবে না। এতে হরমুজ প্রণালিসহ আঞ্চলিক সংকটগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। এ ছাড়া ওমানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনাতেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ নাকচ করেছে ইরান। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই মূলত দুই পক্ষের মধ্যে এই চরম উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও নড়বে না ইরান। যেকোনো ধরনের বৈরী পরিস্থিতিতে এই নৌপথের ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌম অধিকার বজায় রাখতে কড়া বার্তা দিয়েছে দেশটি। ইরানের এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের প্রধান এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি আয়াতুল্লাহ আমোলি লারিজানি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে দেয়া এক বক্তব্যে এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। লারিজানি তাঁর বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, আন্তর্জাতিক শত্রুরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তবে ইরান কোনোভাবেই এই ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর ইরানের নিরঙ্কুশ অধিকার রয়েছে এবং কোনো চাপ বা পরিস্থিতিতেই তেহরান এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পিছু হটবে না বা কোনো ছাড় দেবে না। সামরিক এই হুঁশিয়ারির পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি নিয়েও নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা প্রমাণের লক্ষ্যেই ইরান সরকার বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে।
ছবির উৎস,etty Images মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজকে লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালালে তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অবকাঠামোগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, “এখন থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন বা অন্য যেকোনো উপায়ে কিংবা অস্ত্র দিয়ে হামলা চালালে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করবে।” ট্রাম্প সম্ভাব্য এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান সম্পর্কে আরও লিখেছেন, “এগুলোর মধ্যে রাজধানী তেহরানের কাছাকাছি বা তেহরানের ভেতরে অবস্থিত স্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।” উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেও ট্রাম্প ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকন্দ্রে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে ইরান এরই মধ্যে অভিযোগ করেছে, তাদের সেতু, রেল সংযোগ, পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র, বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র বহু হামলা চালিয়ে যাচ্ছে; যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশের সাথে ইরানের অসম এই লড়াইয়ে দেশটি একাই তটস্থ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করতে ইসরায়েল গোপনে একটি প্রচারণায় অর্থায়ন করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। গত বুধবার জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘দ্য জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিস্ফোরক দাবি করেন। ট্রাম্পের সাবেক প্রচার ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেলের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান এই প্রচারণার মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি। ভ্যান্সের দাবি, ট্রাম্পের ইরাননীতির পক্ষে কাজ করায় এই প্রচারণার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করছে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, 'ক্লক টাওয়ার এক্স' নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি মূলত তরুণ রক্ষণশীলদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব ঠেকাতে কাজ শুরু করেছিল। তবে সম্প্রতি ইরান চুক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সমন্বিত অপপ্রচার নজরে আসে। যদিও পারস্কেল দাবি করেছেন, মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা তাদের লক্ষ্য নয়। এ বিষয়ে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।