দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান জরুরি। কিন্তু একটি দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কতটা সফল, তা শুধু কতজন গ্রেপ্তার হলেন, কতটি মামলা হলো কিংবা কত টাকার সম্পদ জব্দ করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে দুর্নীতির সুযোগ কতটা কমেছে, সরকারি অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ হয়েছে এবং ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ কতটা সমান হয়েছে, তার ওপর। দুর্নীতির অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা ব্যবস্থার পরিবর্তন দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে; দ্বিতীয়টি ভবিষ্যতে অনিয়মের সুযোগ কমায়। তাই কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের জন্য অপরাধের তদন্ত ও শাস্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার কিংবা নতুন সংস্কার উদ্যোগের পরও নাগরিকেরা যদি সরকারি সেবা পেতে ঘুষ ও হয়রানির মুখোমুখি হন, তাহলে দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। সমস্যাটি শুধু ব্যক্তির অসততায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অস্বচ্ছতা, অভিযোগ নিষ্পত্তির দুর্বলতা এবং অনিয়মের প্রতিকার নিশ্চিত করতে না পারাও এর সঙ্গে যুক্ত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপের ফল প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ২৫ জুন। জরিপ অনুযায়ী, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। ঘুষ দিতে হয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারকে। জরিপে ২০২৩ সালের তুলনায় দুর্নীতির অভিজ্ঞতা এবং ঘুষের শিকার পরিবারের অনুপাত যথাক্রমে ১৫ দশমিক ১ ও ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। জরিপে ২০২৫ সালে ঘুষের মোট আনুমানিক পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি জরিপের আওতাভুক্ত সেবাখাতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা জাতীয় হিসাব, দেশের সব ধরনের দুর্নীতির মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাপ নয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার সরকারি অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা সম্পর্কে জানে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির শিকার হওয়ার পাশাপাশি প্রতিকার পাওয়ার পথ সম্পর্কেও নাগরিকদের বড় অংশের ধারণা সীমিত। এই বাস্তবতা দেখায়, শুধু আইন প্রণয়ন বা অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। নাগরিককে এমন একটি ব্যবস্থা দিতে হবে, যেখানে ঘুষ ছাড়াই সেবা পাওয়া সম্ভব, অভিযোগ জানানো নিরাপদ এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়। সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্প দুর্নীতি প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতার অভাব, পক্ষপাতমূলক শর্ত, স্বার্থের সংঘাত এবং কাজের মান যাচাইয়ে দুর্বলতা সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব সমস্যা মোকাবেলায় শুধু অনিয়মের পর তদন্তের ওপর নির্ভর না করে ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে সরকারি ক্রয়বিধি, ২০২৫ কার্যকর হয়েছে। এতে সরকারি ক্রয়ে ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক ব্যবহার, চুক্তির প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় প্রকাশ এবং প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিভিন্ন বিধান রয়েছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে বিধিমালা কার্যকর হওয়া আর তার সুফল বাস্তবে পাওয়া এক বিষয় নয়। দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ছে কি না, চুক্তির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে কি না এবং প্রকল্প নির্ধারিত ব্যয় ও মান অনুযায়ী সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। অনিয়ম শনাক্ত হলে দ্রুত প্রতিকার ও দায় নির্ধারণও নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু আইনগত ক্ষমতার ওপর নয়, সেই ক্ষমতা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগের সক্ষমতার ওপরও। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার নৈকট্য যেন তদন্তকে প্রভাবিত না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই আইনি মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হবে।একই সঙ্গে কমিশনের স্বাধীনতার অর্থ জবাবদিহির বাইরে থাকা নয়। তদন্ত হতে হবে প্রমাণনির্ভর, মামলা হতে হবে আইনসম্মত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য বিচারের অধিকার সুরক্ষিত থাকতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি এই ধারাবাহিকতাই দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদের বিবরণ দাখিলের ব্যবস্থাও দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বিবরণ জমা নেয়া যথেষ্ট নয়। ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য যাচাই, স্বার্থের সংঘাত শনাক্ত এবং অসংগতি পাওয়া গেলে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। একইভাবে, সরকারি নিরীক্ষায় অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর সুপারিশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তারও হিসাব রাখা জরুরি। নিরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের কার্যকর পদ্ধতি না থাকলে নিরীক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে। ২০২৫ সালের ২০ জুন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি উন্নত করার লক্ষ্যে ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। এর আওতায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয়, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং নিরীক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে। তবে অর্থায়ন অনুমোদনকে সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। বাস্তবায়নের অগ্রগতি, অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং নাগরিকের কাছে সুফল পৌঁছানোর ভিত্তিতেই এর সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারে চারটি অগ্রাধিকার বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রথমত, সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, চুক্তি এবং অগ্রগতির তথ্য জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণ ও স্বার্থের সংঘাত যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহির কাঠামো দিতে হবে। চতুর্থত, নাগরিকের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ সুযোগ, অভিযোগের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা এবং প্রতিকার না পেলে পুনর্বিবেচনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য নিয়মিত কিছু সূচকও প্রকাশ করা দরকার। যেমন কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মের কত অংশের প্রতিকার হয়েছে, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা কতটা বেড়েছে এবং সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের অভিজ্ঞতা কমছে কি না। এসব তথ্য প্রকাশিত হলে সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের পক্ষে সংস্কারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃঢ়তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই দৃঢ়তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর তার ওপর। ব্যক্তি ও সরকার পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু নিয়ম, তদারকি ও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল থাকলে একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু কতজন শাস্তি পেলেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, সরকারি অর্থের অপচয় কমেছে কি না, অভিযোগের প্রতিকার কার্যকর হয়েছে কি না এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে কি না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে; আর দুর্নীতির ব্যবস্থা বদলে দেয় সেই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর পথ। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন অভিযানের পাশাপাশি এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে অনিয়ম গোপন রাখা কঠিন, জবাবদিহি এড়ানো অসম্ভব এবং আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো অপরাধী শাস্তি পাবে, কিন্তু নিরপরাধ ব্যক্তি কোনোভাবেই হয়রানির শিকার হবে না। আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল দর্শনই হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেয়া। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি বিষয় হলো ‘অজ্ঞাত আসামি’ বা ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ অন্তর্ভুক্ত করে মামলা দায়েরের প্রচলন। আইনগতভাবে এর একটি যৌক্তিক ভিত্তি থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে এটি বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগ, ভোগান্তি এবং নাগরিক অধিকার হরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure)-এর আওতায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলে তদন্তের স্বার্থে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে। বিশেষত দাঙ্গা, সহিংস বিক্ষোভ, নাশকতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনায় এই বিধান তদন্তকারী সংস্থাকে অপরাধী শনাক্তকরণের একটি প্রয়োজনীয় সুযোগ প্রদান করে। কারণ, অনেক সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ করা তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয় না। তবে সমস্যার সূচনা হয় তখন, যখন এই ব্যতিক্রমধর্মী আইনি বিধানটি প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে একটি নিয়মিত প্রশাসনিক চর্চায় পরিণত হয়। রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন, জনসমাবেশ কিংবা সংঘর্ষের ঘটনার পর দায়ের হওয়া বহু মামলায় দেখা যায়, কয়েকজন নামীয় আসামির পাশাপাশি শত শত কিংবা হাজার হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ফলে মামলার প্রকৃত পরিধি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে এবং তদন্তের ক্ষমতা প্রায় সীমাহীনভাবে বিস্তৃত হয়ে যায়। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিক। কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কিংবা ঘটনাস্থলের আশপাশে উপস্থিত সাধারণ মানুষও অনেক সময় নিজেকে সম্ভাব্য আসামি হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য হন। মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও পরবর্তী সময়ে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার আশঙ্কা থেকে যায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নীরব ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জীবন রক্ষার সাংবিধানিক গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি জানেন না তিনি কোনো মামলার সম্ভাব্য আসামি কি না, কিংবা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তদন্তের আওতায় আসার ঝুঁকিতে থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে; তাঁর সাংবিধানিক নিরাপত্তা কতটুকু কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রয়েছে? অজ্ঞাত আসামির মামলার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা। মানবাধিকার কর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থ করা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলে তদন্তের নামে পরবর্তী সময়ে তাঁকে মামলার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথাকথিত ‘প্রসেস অ্যাজ পানিশমেন্ট’ বা ‘প্রক্রিয়াই শাস্তি’ তত্ত্ব। আধুনিক বিচারতত্ত্বে বহুল আলোচিত এই ধারণার অর্থ হলো, চূড়ান্ত বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও মামলা, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা, জামিনের প্রক্রিয়া, আদালতে বারবার হাজিরা, আর্থিক ব্যয় এবং সামাজিক মানহানির কারণে একজন ব্যক্তি যে দুর্ভোগের শিকার হন, সেটিই কার্যত একধরনের শাস্তিতে পরিণত হয়। ফলে বিচার পাওয়ার আগেই একজন নাগরিক মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বাস্তবে এ ধরনের মামলাকে ঘিরে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো সুযোগসন্ধানী ও অসাধু মহলের সক্রিয়তা। মামলার ভয় দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়, প্রভাব খাটানো, ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণের মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। ফলে আইন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অনেক সময় ভয়ের উপকরণে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (Universal Declaration of Human Rights) ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কাউকে খামখেয়ালিভাবে গ্রেপ্তার, আটক বা নির্বাসিত করা যাবে না। একইভাবে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (ICCPR)-এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশও এই নীতিগুলোর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে এটাও সত্য যে, অজ্ঞাত আসামির বিধান সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়। বৃহৎ সহিংসতা, সংঘবদ্ধ অপরাধ বা নাশকতার ঘটনায় অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। ফলে তদন্তের স্বার্থে এই বিধান বজায় রাখা প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন যেন কখনো নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার অজুহাতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, অজ্ঞাত আসামি অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ফরেনসিক, মোবাইল ডাটা অ্যানালাইসিস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তিসহ আধুনিক তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তৃতীয়ত, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে অসৎ উদ্দেশ্যে মামলায় জড়ানো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আদালতের প্রাথমিক তদারকি, তদন্তের গুণগত মান যাচাই এবং অভিযোগপত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বিচারিক নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন কখনো ভয়ের প্রতীক হতে পারে না; আইন হতে হবে ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল। অজ্ঞাত আসামির মামলা যদি অপরাধী শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হয়, তবে সেটি অবশ্যই সংবিধান, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যথায় এটি অপরাধ দমনের উপকরণ নয়, বরং নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্য এক গভীর সংকটে পরিণত হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করা নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরপরাধ মানুষকে ভয়মুক্ত রাখা। কারণ ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ কেবল অপরাধীর শাস্তি নয়, বরং নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আর সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের প্রকৃত সার্থকতা। অন্যথায় আইন জনগণের আশ্রয়স্থল না হয়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, আর ন্যায়বিচার তার নৈতিক ভিত্তি হারাবে। তাই সময়ের দাবি, অপরাধ দমনে কার্যকর রাষ্ট্র এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় দায়বদ্ধ রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সুস্থ ও টেকসই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন রাষ্ট্র অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিরপরাধের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন থাকে।
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ১৬০টি মামলা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। সোমবার (২০ জুলাই) ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রোববার (১৯ জুলাই) রাজধানীজুড়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ এই অভিযান পরিচালনা করে। ঢাকা মহানগর এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ডিএমপির এই ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, অভিযানকালে রাজধানীর ট্রাফিক রমনা বিভাগে ১৩৫টি, লালবাগ বিভাগে ১৭৭টি, মতিঝিল বিভাগে ৩১৮টি, ওয়ারী বিভাগে ২৫৬টি, তেজগাঁও বিভাগে ৩৩০টি, মিরপুর বিভাগে ৩৩১টি, উত্তরা বিভাগে ৩১১টি এবং গুলশান বিভাগে ৩০২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া অভিযানকালে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে মোট ৬৩৫টি গাড়ি ডাম্পিং এবং ৩১৩টি গাড়ি রেকার করা হয়েছে।
সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে নতুন আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ বিষয়ক এক জাতীয় অবহিতকরণ সভায় তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে পুলিশ, বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধীদের পরিবর্তনশীল কৌশলের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। সদ্য প্রণীত এই আইনটি মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোয় নতুন আইনটিকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে সরকার। সভায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে আইনটির বিধান ও প্রয়োগের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।