ইদানীং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সরগরম রাজনৈতিক পাড়া থেকে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, যা কেবল একজন সাহিত্যিকের মূল্যায়নের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। কারণ, এ ধরনের আলোচনা, বিশ্লেষণ ও বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ইতিহাসবোধ, ধর্মীয় আবেগ, জাতীয়তাবাদ ও সমকালীন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক কিছুই। তাই বিষয়টিকে নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের জায়গা থেকে দেখাটা সঠিক নয় বলেই মনে করি। এমন বিষয়গুলোর গভীরে পৌঁছাতে গেলে প্রয়োজন ইতিহাসের প্রামাণ্য পাঠ, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং ভিন্নমতকে বোঝার মানসিকতা। আমার কাছে এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, আমরা সাহিত্যিককে তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের আলোকে বিচার করতে চাই, নাকি পূর্বনির্ধারিত পরিচয়ের ছাঁচে ফেলে তাঁর মূল্যায়ন করতে আগ্রহী? নিজেদের অবস্থান থেকে প্রথম এই জায়গায় চিন্তা স্পষ্ট করা জরুরি। আমি সাহিত্যপ্রেমী। তাই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনেরই অনুরাগী। কারণ, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ যদি সূর্য হিসেবে আবির্ভূত হন, নজরুল তাঁর সমার্থক প্রভাকর। এঁদের সৃষ্টি ব্যতিরেকে বাংলা সাহিত্যচর্চা অসম্পূর্ণ, অর্থহীন। তবে সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের ব্যাপ্তি এ দুই কবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপমহাদেশের অসংখ্য কবি, লেখক ও সাহিত্যিকের সৃষ্টি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যবিচরণের কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি হয় না। সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল তাঁদের সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে দুই বাংলাকে একসূত্রে গেঁথেছেন। তাঁদের সৃষ্টির আবেদন ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে স্পর্শ করেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই অভিন্ন উত্তরাধিকারকে কেবল ধর্মীয় কিংবা জাতীয় পরিচয়ের নিরিখে বিচার করলে তার ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য সংকুচিত করা হয়। সাহিত্য মানুষকে নিয়ে কথা বলে। আর মানুষের বিচরণ বহুমাত্রিক ধারায়। একই মানুষ সময়ের আবর্তে নানান ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাই তাঁর কাজ বা মানসিকতার মূল্যায়ন করতে সেই সময়কার প্রেক্ষাপট বিবেচনা ও অনুসন্ধান জরুরি। আর এখানেই গবেষণাকাজের প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়। মানুষের আবেগ, অনুরাগ, বিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সাহিত্যিকও তাঁর সময়, সমাজ ও পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নন। তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিতে সময়ের প্রভাব থাকবে, ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটবে, এমনকি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পাবে। অতএব, কোনো সাহিত্যিককে প্রশ্নাতীত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি তাঁর জীবনের একটি বিসংবাদিত দিকের ভিত্তিতে সমগ্র সাহিত্যকর্ম বাতিল করে দেওয়াও ন্যায়সংগত নয়। হোক রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা অন্য কেউ, কারও সৃষ্টিকেই কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের বলয়ে বন্দী করে পর্যালোচনা করাটা আমার বিবেচনায় যুক্তিনির্ভর সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চার পরিপন্থী। কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য বা ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবশ্যই যায়। কিন্তু তার উত্তর খুঁজতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি, প্রচলিত জনশ্রুতি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল প্রচারিত কোনো দাবিকে যাচাই ছাড়াই ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা অনুচিত। রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কি না, সম্প্রতি সেই পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর বাসসের এক প্রতিবেদনে ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানের বরাতে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর আগেও ২০১৮ সালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ ধরনের দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এ থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কোনো দাবি বারবার উচ্চারিত হলেই তা ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত হয় না। মূল দলিল, সমকালীন সংবাদপত্র, চিঠিপত্র, নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও ঘটনার প্রেক্ষাপট যাচাই করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। একই দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ উপমহাদেশের সব সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইতিহাসের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, প্রমাণই হওয়া উচিত মূল্যায়নের ভিত্তি। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ আর কবি রবীন্দ্রনাথ এক নয়। একইভাবে পৃথিবীর কোনো সাহিত্যিকই তাঁর কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে এক সুতোয় গাঁথতে পারেননি। কেননা, তা মানববৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। তাঁদের ব্যক্তিজীবন, সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক চিন্তা ও সাহিত্যকর্মের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও আছে। সাহিত্যিকদের জীবন ও সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান জরুরি, তবে কোনো একটি পরিচয় দিয়ে তাঁদের সমগ্র সত্তাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, সমাজভাবনা ও জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সমালোচনামূলক পাঠের সাথে নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শোষণবিরোধী অবস্থানের গভীর বিশ্লেষণ যেমন প্রয়োজন; একইভাবে উপমহাদেশের অন্যান্য সাহিত্যিকের চিন্তা, সৃষ্টি ও ব্যক্তিজীবনের জটিলতা নিয়েও গবেষণা আবশ্যক। আমরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ অনেক সাহিত্যিকের সাহিত্য ধারণ করেছি সেই সময় থেকে, যখন সাহিত্য বুঝতে শিখেছি। তাঁদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান ও অন্যান্য সৃষ্টি আমাদের সাংস্কৃতিক বোধের অংশ হয়ে উঠেছে বহু আগেই। তাঁদের সাহিত্যকে ভালোবাসার অর্থ, তাঁদের প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। আবার তাঁদের কোনো বক্তব্যের সমালোচনা করার অর্থও তাঁদের সৃষ্টির সামগ্রিক মূল্য অস্বীকার করা নয়। সাহিত্যপাঠের সৌন্দর্য এখানেই, পাঠক সৃষ্টির সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করবেন, প্রশ্ন করবেন, দ্বিমত পোষণ করবেন এবং নিজের উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করবেন। রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন জাতীয়তাবাদের ছিলেন বলে তাঁর সাহিত্য বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ হতে পারবে না, এমন যুক্তি অগ্রহণযোগ্য। আবার তাঁর সাহিত্যকে গ্রহণ করা মানেই নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়। কোনো সাহিত্যিক পরিচয়কে একটি গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করা হলো তাঁর সৃষ্টির বহুমাত্রিকতাকে অস্বীকার করা। সাহিত্যিক উত্তরাধিকার কোনো একক পরিচয়ের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। পাঠকসমাজের পাঠ, অনুরাগ ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা ক্রমাগত নতুন অর্থ লাভ করে। বাংলার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কেরও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এশিয়ান স্টাডিজে প্রকাশিত গবেষণায় পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচারে বিধিনিষেধ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশের পরিচয় নির্মাণে রবীন্দ্রসংগীতের ভূমিকা বিশ্লেষিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ অনুচ্ছেদেও ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম দশ চরণকে জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরে। তবে তাঁর সাহিত্যকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, তাঁর জীবন ও চিন্তার সমালোচনা করা যাবে না। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝেই তাঁর অবদান ও সীমাবদ্ধতা বিচার করা প্রয়োজন। বর্তমান বিতর্কে তাই দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। একটি হলো সাহিত্যিকের চিন্তা ও কর্মের সমালোচনা, অন্যটি হলো তাঁকে ঘিরে বিদ্বেষমূলক মনোভাব তৈরি করা। প্রথমটি সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ। তবে দ্বিতীয়টি ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিকে সংকীর্ণ করতে পারে। কোনো বক্তব্যের বিরোধিতা করতে তার বিপরীতে তথ্য ও যুক্তি হাজির করা প্রয়োজন। যা নতুন গবেষণার ভিত্তিতে পুরোনো ধারণা সংশোধন করতে সক্ষম। কিন্তু প্রতিকৃতি বিকৃত করা কিংবা পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো কোনো ঐতিহাসিক প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। আমার উদ্দেশ্য বিভেদ তৈরি করা নয়। সচেতনতা সৃষ্টি করা। রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা হোক, অন্যদেরও হোক। আর এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ জন্মের আগে আমরা অবিভক্ত ভারত থেকে পাকিস্তান আমল পার করে এই পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি। সুতরাং, আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আবহে মিশ্র ঐতিহ্য থাকবে, এটাই শাশ্বত। আমাদের ভূখণ্ডে কেবল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল নন, বরং উপমহাদেশের বর্ণিল সাহিত্যাঙ্গনের বহু কবি, লেখক ও সাহিত্যিকের কর্মকাণ্ড জড়িয়ে আছে, যা আমাদের প্রভাবিত করছে। এই প্রভাবের অর্থ যদি আমাদের একপাক্ষিক করে তোলে তবে তা হতাশাজনক। বরং এমন নানান চিন্তা-চেতনার আলোকপাতে সেকাল থেকে একালের পর্যায়ক্রমিক গবেষণা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা এক উদার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অংশ হতে পারি, যা জাতিগতভাবে আমাদের সমৃদ্ধ করবে। ভুললে চলবে না, সাহিত্য মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে, বিচ্ছিন্ন নয়। তাই প্রত্যেক সৃজনশীল মানুষের চিন্তার তুলনামূলক পাঠ হোক, তাঁদের সাহিত্য ও ব্যক্তিজীবনের জটিলতা নিয়ে গবেষণা হোক। কিন্তু আলোচনা যেন পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাস থেকে সুবিধামতো তথ্য বেছে নেয়ার অনুশীলনে পরিণত না হয়। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে নয়, মুক্ত ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার মধ্য দিয়েই আমাদের সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে। মুদ্রার যেমন দুটি পিঠ থাকে, ইতিহাসেও তেমনি আলো ও অন্ধকারের অধ্যায় রয়েছে। কেবল একটি দিকের ওপর আলোকপাত করে সমগ্র ইতিহাসের উপসংহার টানা অসম্ভব। ইতিবাচক দিকের স্বীকৃতির পাশাপাশি সমালোচনাও হোক, তবে তা হতে হবে তথ্যনির্ভর, প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিসংগত। ইতিহাসকে বুঝতে হলে তার বহুমাত্রিকতা স্বীকার করতে হবে, প্রমাণের মুখোমুখি হতে হবে এবং প্রয়োজনে নিজের পূর্বধারণাকেও প্রশ্ন করার মানসিকতা রাখতে হবে। কাউকে ছোট করে ইতিহাস বদলানো যায় না। ইতিহাসকে বুঝতে হলে আবেগের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক সততা প্রয়োজন। ব্যক্তি-অনুরাগ কিংবা ব্যক্তি-বিদ্বেষ কোনোটিই যেন প্রমাণের জায়গা দখল না করে। সাহিত্যিককে দেবতা বানানো যেমন সাহিত্যচর্চা নয়, তেমনি তাঁকে শত্রু বানানোও ইতিহাসচর্চা নয়। পরিশেষে বলব, সুন্দরের চর্চা হোক, সত্য উন্মোচিত হোক সুন্দরভাবে। বিভেদ নয়, সচেতনতা। বিদ্বেষ নয়, যুক্তি। অন্ধ অনুরাগ কিংবা অন্ধ বিরোধিতা নয়, ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ পাঠ হোক আমাদের প্রত্যাশা।
একটি জাতির সাহিত্য তার আত্মার আয়না। সেই আয়নায় শুধু কবিতা, গল্প, উপন্যাস কিংবা নাটকের মুখ দেখা যায় না; দেখা যায় একটি জাতি মানুষকে কতটা ভালোবাসে, দুর্বলকে কতটা সম্মান করে, ভিন্নমতকে কতটা সহ্য করে এবং অন্যের দুঃখে তার হৃদয় কতটা কেঁপে ওঠে। ইংল্যান্ডের সাহিত্য-ঐতিহ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়—শেকসপিয়র মানুষের ক্ষমতা, লোভ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে যে গভীরতায় দেখেছেন, তা আজও মানুষকে নিজের ভেতরের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ডিকেন্স দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে এনেছেন। জর্জ অরওয়েল ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বাধীনতার সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শেলি, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হার্ডি, ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা অসংখ্য ইংরেজ লেখক সাহিত্যকে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় করে রাখেননি; তাঁরা মানুষ, সমাজ ও বিবেকের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ককে গভীর করেছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যও কোনো অংশে দরিদ্র নয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন; নজরুল শিখিয়েছেন সাম্য ও প্রতিবাদ; শরৎচন্দ্র নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন; লালন মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে দেখতে চেয়েছেন; জীবনানন্দ আমাদের প্রকৃতি ও নিঃসঙ্গতার গভীরে নিয়ে গেছেন। আমাদের সাহিত্যে মানবিকতার যে বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এত সাহিত্য পড়েও আমরা কি সত্যিই আরও মানবিক হয়েছি? আমরা রবীন্দ্রনাথ পড়ি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম কতটা ধারণ করি? নজরুলের সাম্যের কবিতা আবৃত্তি করি, কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে কতটা শিখেছি? শরৎচন্দ্রের অসহায় মানুষের জন্য চোখ ভেজে, কিন্তু বাস্তবের অসহায় মানুষটি যখন আমাদের দরজায় দাঁড়ায়, তখন আমরা কতটা পাশে দাঁড়াই? সমস্যাটি সম্ভবত সাহিত্যের অভাবে নয়; সাহিত্যকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারার মধ্যে। আমাদের দেশে সাহিত্য অনেক সময় পরীক্ষার প্রশ্ন হয়ে ওঠে, চাকরির প্রস্তুতির উপকরণ হয়ে ওঠে, পুরস্কার ও পরিচিতির সিঁড়ি হয়ে ওঠে। আমরা কবিতার ব্যাখ্যা মুখস্থ করি, কিন্তু কবিতার মানবিক শিক্ষা ভুলে যাই। আমরা শেকসপিয়রের নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণ করি, কিন্তু নিজের চরিত্র বিশ্লেষণ করি না। আমরা গল্পের নায়ক-নায়িকার দুঃখে আবেগাপ্লুত হই, অথচ পাশের বাড়ির মানুষের দুঃখ আমাদের বিবেককে সবসময় স্পর্শ করে না। এখানেই হয়তো আমাদের বড় সংকট। একটি সমাজের উন্নতি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা শিক্ষার হার দিয়ে মাপা যায় না। মানুষ কতটা অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, কতটা দুর্বলকে রক্ষা করে, কতটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে এবং কতটা ভিন্ন মানুষকে সহ্য করতে পারে—তার মধ্যেও সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে। ইংল্যান্ডকে মানবিকতার আদর্শ সমাজ হিসেবে দেখারও কারণ নেই। সেখানেও বৈষম্য, অন্যায়, নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক সংকট আছে। কিন্তু দীর্ঘ সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য সেখানে সামাজিক আত্মসমালোচনার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি তৈরি করেছে—সাহিত্য অনেক সময় সমাজের আয়না হওয়ার পাশাপাশি সমাজকে প্রশ্ন করার অস্ত্রও হয়েছে। আমাদেরও সেই আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমাদের সংস্কৃতি মহান’। কিন্তু সংস্কৃতির মহত্ত্ব কেবল অতীতের গৌরবে নয়; তার প্রমাণ বর্তমানের আচরণে। আমরা যদি সাহিত্যসভায় মানবতার কথা বলি, কিন্তু বাস্তবে দুর্বলকে অপমান করি—তাহলে সাহিত্য আমাদের মুখস্থ হয়েছে, হৃদয়ে প্রবেশ করেনি। আমরা যদি সাম্যের কবিতা লিখি, কিন্তু মানুষকে ধর্ম, মত, অর্থ, পেশা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাগ করি—তাহলে আমাদের সাহিত্যচর্চা এখনো অসম্পূর্ণ। আমরা যদি স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি করি, কিন্তু অন্যের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করি—তাহলে আমরা কবিতার শব্দ শিখেছি, তার আত্মা শিখিনি। সাহিত্যের শেষ পরীক্ষা বইয়ের পাতায় নয়—মানুষের আচরণে। একজন মানুষ কত বড় সাহিত্যিক, কত ডিগ্রিধারী, কত বই পড়েছেন—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, তিনি একজন অসহায় মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন; একজন ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কেমন কথা বলেন; ক্ষমতা হাতে পেলে দুর্বল মানুষের প্রতি কেমন ব্যবহার করেন। তাই বাংলাদেশের সাহিত্যকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন বরং সাহিত্যের মানবিক শক্তিকে জীবনের ভেতরে ফিরিয়ে আনা। আমাদের এমন শিক্ষা দরকার, যেখানে রবীন্দ্রনাথ শুধু পরীক্ষার উত্তর নন—মানবতার শিক্ষক। নজরুল শুধু কবিতার কবি নন—সাম্যের কণ্ঠস্বর। শরৎচন্দ্র শুধু উপন্যাসের লেখক নন—বঞ্চিত মানুষের সহযাত্রী। শেকসপিয়ার শুধু নাটকের বিষয় নন—মানুষের অন্তর্জগতের অনুসন্ধানী। আর সাহিত্য শুধু পাঠ্যবই নয়—নিজেকে মানুষ করে তোলার একটি নিরন্তর সাধনা। কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি তখনই ঘটে, যখন তার জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিবেকও বড় হয়, শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সহমর্মিতা বাড়ে এবং সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা গভীর হয়। সাহিত্য আমাদের অনেক কিছু দিতে পারে। কিন্তু সাহিত্য পড়ার পরও যদি মানুষকে ভালোবাসতে না শিখি—তবে প্রশ্নটা সাহিত্যের নয়, আমাদের।
অ্যান কারসনকে শুধু কবি বললে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি অংশই ধরা পড়ে। তিনি একই সঙ্গে কবি, অনুবাদক, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের গবেষক, প্রাবন্ধিক এবং পরীক্ষামূলক লেখক। তাঁর সাহিত্য এমন এক সীমানাহীন পরিসর তৈরি করে যেখানে কবিতা, গদ্য, পুরাণ, দর্শন, অনুবাদ, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং একাডেমিক গবেষণা পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে কারসনের রচনাকে বুঝতে হলে কেবল ‘তিনি কী বলতে চেয়েছেন’ এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হয় তিনি কীভাবে অর্থ তৈরি করেন, কীভাবে অর্থকে ভেঙে দেন এবং কীভাবে পাঠককে অর্থের নির্মাণপ্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে যান। ৮ অক্টোবর ২০২৬-এ সুইডিশ একাডেমি তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার ঘোষণা করে। পুরস্কারের সরকারি ব্যাখ্যায় তাঁর ‘সাহসী ও অভিনব সাহিত্যকর্মের’ কথা বলা হয়েছে—যে সৃষ্টিকর্ম ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে এক সৃজনশীল ও খেলাচ্ছলে সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ নির্মাণ করেছে। কারসনের সাহিত্যজগতের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা—দূরত্ব। মানুষ যা চায়, তার সঙ্গে মানুষের একটি দূরত্ব থাকে; যে মানুষকে আমরা ভালোবাসি, সে সম্পূর্ণভাবে আমাদের অধিকারভুক্ত নয়; যে অতীতকে আমরা বুঝতে চাই, তা আমাদের কাছে কেবল ভগ্নাংশের মাধ্যমে উপস্থিত; আর যে শব্দের অর্থ আমরা ধরতে চাই, সেই অর্থও প্রসঙ্গ বদলালে পরিবর্তিত হয়। এই দূরত্বই কারসনের সাহিত্যকে চালিত করে। ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ : আকাঙ্ক্ষার ভেতরে দূরত্ব কারসনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’-এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার প্রশ্ন। কিন্তু এটি প্রচলিত প্রেমের কবিতা নয়; বরং প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, বিশেষত স্যাফো এবং অন্যান্য ধ্রুপদি লেখার আলোকে আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি নিয়ে একটি গভীর অনুসন্ধান। কারসনের একটি মৌলিক উপলব্ধি হলো, আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ উপস্থিতির মধ্যে জন্মায় না; আকাঙ্ক্ষার জন্য প্রয়োজন দূরত্ব। আমি যে মানুষটিকে চাই, সে আমার থেকে পৃথক। এই পৃথকতাই আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। যদি প্রিয় মানুষটি সম্পূর্ণভাবে আমার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, তাহলে আকাঙ্ক্ষার সেই টান আর থাকে না। এ ধারণা কেবল প্রেমের ক্ষেত্রে নয়, ভাষা ও অর্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি শব্দ তার অর্থের সঙ্গে কখনো সম্পূর্ণ এক হয়ে যায় না। শব্দ ও অর্থের মধ্যে একটি ব্যবধান থাকে। পাঠক সেই ব্যবধান অতিক্রম করতে চান, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করতে পারেন না। এখানেই কারসনের সাহিত্য ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিক হয়ে ওঠে। প্রেমে যেমন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় দূরত্ব থেকে, ভাষাতেও অর্থের অনুসন্ধান তৈরি হয় শব্দ ও অর্থের মধ্যবর্তী দূরত্ব থেকে। ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ : পুরাণের পুনর্জন্ম ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ কারসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। প্রাচীন গ্রিক কবি স্তেসিকোরাসের গেরিয়ন-পুরাণকে তিনি আধুনিক সময়ে পুনর্লিখেছেন। এখানে গেরিয়ন আর শুধু পুরাণের দানব নয়। সে একজন তরুণ, একজন প্রেমিক, একজন শিল্পীসুলভ মানুষ—যে নিজের শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও পরিচয়ের সঙ্গে লড়াই করে। কারসনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টিশীল কৌশল হলো তিনি পুরাণকে পুনর্নির্মাণ করেন, কিন্তু পুরাণের মূল কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করেন না। ফলে পুরোনো ও নতুন দুটি পাঠ একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে। এখানে আন্তঃপাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এক অর্থে নিজের পরিচয় আবিষ্কারের কাহিনি; অন্য অর্থে এটি অন্যের চোখে নিজের পরিচয় কীভাবে নির্মিত হয়, তার কাহিনি। ‘দ্য গ্লাস এসে’ : ব্যক্তিগত শোক ও সাহিত্যপাঠ ‘দ্য গ্লাস এসে’-তে কারসনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং এমিলি ব্রন্টির ‘ওয়াদারিং হাইটস’ একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে। এখানে একটি অসাধারণ সাহিত্যিক প্রক্রিয়া কাজ করে। একজন নারী নিজের ব্যর্থ প্রেমের দিকে তাকাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি ব্রন্টির উপন্যাস পড়ছেন। ফলে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সাহিত্যের অভিজ্ঞতা আলাদা থাকে না। তিনি যেন অন্য একটি বইয়ের ভেতর নিজের জীবনকে দেখতে পান। এখানে সাহিত্য হয়ে ওঠে একধরনের আয়না। কিন্তু আয়নাটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি দেয় না। বরং প্রতিফলনের সঙ্গে পরিবর্তনও ঘটে। ব্রন্টির চরিত্রদের প্রেমকে পড়তে পড়তে কারসনের বক্তা নিজের প্রেমকে নতুনভাবে বুঝতে শেখেন। এ কারণে ‘দ্য গ্লাস এসে’ শুধু বিচ্ছেদের কবিতা নয়। এটি প্রশ্ন করে, আমরা কি নিজের অভিজ্ঞতাকে সরাসরি জানতে পারি, নাকি অন্যের ভাষার মধ্য দিয়ে নিজেদের চিনতে হয়? প্রশ্নটি কারসনের সমগ্র সাহিত্যেই ফিরে আসে। ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ : বিবাহ, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয় ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’-এ বিবাহ ও বিচ্ছেদকে কারসন একটি জটিল ভাষিক ও নৈতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখান। এখানে স্বামী শুধু একজন ব্যক্তি নয়; সে বক্তার আত্মপরিচয়েরও একটি অংশ। ফলে সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যায় না—একটি পরিচয়ও ভেঙে যায়। এ গ্রন্থের আকারও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি একই সঙ্গে কবিতা, প্রবন্ধ, কাহিনি এবং নৃত্যের কাঠামো ব্যবহার করে। অর্থাৎ বিষয়বস্তুর বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে রচনার রূপের বিচ্ছিন্নতাও যুক্ত। এখানে কারসন দেখান যে ভাঙা সম্পর্ককে সব সময় একটি সরল, ধারাবাহিক কাহিনি দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। স্মৃতি যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে ফিরে আসে, তাঁর লেখার রূপও তেমন লাফিয়ে ওঠে। ‘ডিক্রিয়েশন’ : ‘আমি’-কে ভেঙে দেয়া ‘ডিক্রিয়েশন’ কারসনের সবচেয়ে দার্শনিক গ্রন্থগুলোর একটি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘আমি’। সাধারণ আত্মজীবনী বলে, ‘আমি কে?’ কারসন তাঁর বিপরীতে প্রশ্ন করেন, ‘আমি-কে কি ভেঙে দেওয়া সম্ভব?’ এখানে সিমোন ভেইলের চিন্তার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিসত্তা সবকিছুকে নিজের চারপাশে সংগঠিত করতে চায়। কিন্তু অন্য মানুষকে সত্যিই উপলব্ধি করতে হলে কখনো কখনো নিজের কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে সরে যেতে হয়। কারসনের ‘ডিক্রিয়েশন’ তাই আত্মবিলোপের সরল ধারণা নয়। এটি বরং আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক ও নান্দনিক অবস্থান। এ কারণেই তাঁর লেখায় ‘আমি’ কখনো স্থির নয়। ‘আমি’— একবার প্রেমিক একবার পাঠক একবার অনুবাদক একবার শোকাহত ব্যক্তি আবার একবার কেবল একটি কণ্ঠ। ‘নক্স’ : স্মৃতির ভগ্নাংশ ‘নক্স’ সম্ভবত কারসনের স্মৃতি ও শোকের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশগুরোর একটি। ভাইয়ের মৃত্যু তাঁকে এ কাজের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এখানে শোককে সরাসরি ধারাবাহিক গল্প হিসেবে বলা হয় না। বরং থাকে—ছবি, নোট, অনুবাদ, খণ্ডিত বাক্য, স্মৃতি, নীরবতা। এই ভাঙা কাঠামোটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শোক নিজেই ভাঙা। মৃত মানুষকে আমরা একটি সম্পূর্ণ গল্পের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারি না। আমাদের কাছে থাকে তাঁর কিছু ছবি, কিছু কথা, কিছু স্মৃতি, কিছু অনুপস্থিতি। অতএব ‘নক্স’-এর রূপ ও বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শোকের ভাষা খণ্ডিত—তাই শোকের বইও খণ্ডিত। কারসন এখানে দেখিয়ে দেন যে সাহিত্য শুধু বিষয়কে প্রকাশ করে না; কখনা কখনো বিষয়ের প্রকৃতি নিজেই সাহিত্যিক রূপকে নির্ধারণ করে। ‘ফ্লোট’ : বইয়ের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে ‘ফ্লোট’-এ কারসন বইকে একটি সরল, ধারাবাহিক বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেন না। বহু পৃথক ছোট রচনা একত্র হয়ে একটি গ্রন্থ তৈরি করে। এখানে পাঠের নির্দিষ্ট পথ নেই। ফলে পাঠককে লেখক সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেন না। পাঠক নিজেই একটি পথ তৈরি করেন। এটি আধুনিক পাঠতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যায়—পাঠের অর্থ শুধু লেখকের ইচ্ছায় নির্ধারিত হয় না; পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণেও অর্থ তৈরি হয়। কারসনের বই তাই শুধু পড়ার বস্তু নয়; পাঠকের জন্য একটি অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র। অনুবাদ : পুরনো ভাষার মধ্যে নতুন জীবন কারসনের সাহিত্য বোঝার জন্য তাঁর অনুবাদকে আলাদা করে দেখা যায় না। তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি ও নাট্যকারদের অনুবাদ করেছেন। কিন্তু তাঁর অনুবাদ নিছক শব্দের প্রতিস্থাপন নয়। একটি প্রাচীন শব্দের সঙ্গে তার সময়, সংস্কৃতি এবং আবেগ জড়িয়ে থাকে। সেই শব্দকে আধুনিক ভাষায় আনলে শুধু ভাষা বদলায় না—তার সাংস্কৃতিক অবস্থানও বদলে যায়। তাই অনুবাদ একটি পুনর্সৃষ্টি। এ কারণে কারসনের কাছে অনুবাদক ও কবির কাজের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দুজনই অন্য একটি ভাষা বা পাঠের সঙ্গে সংলাপ করেন। রূপ ও অর্থ : কারসনের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা কারসনের সাহিত্য নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। রূপ কি অর্থের বাহন, নাকি রূপ নিজেই অর্থ তৈরি করে? কারসনের রচনায় দ্বিতীয় উত্তরটি বেশি কার্যকর। খণ্ডিত বাক্য কেবল খণ্ডিত বাক্য নয়—তা ভাঙনের অনুভূতি তৈরি করে। শূন্যস্থান কেবল ফাঁকা জায়গা নয়—তা অনুপস্থিতিকে দৃশ্যমান করে। অনুবাদ কেবল ভাষান্তর নয়—তা দুই সময়ের দূরত্বকে প্রকাশ করে। পুরাণের পুনর্লিখন কেবল পুরোনো গল্পের নতুন সংস্করণ নয়—তা অতীত ও বর্তমানের সম্পর্ককে প্রশ্ন করে। অতএব কারসনের কাছে রূপ ও অর্থকে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায় না। রূপ অর্থকে ধারণ করে না শুধু; রূপ অর্থের জন্ম দেয়। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়—অর্থ কখনো সম্পূর্ণ স্থির নয়। পরিচয় কখনো সম্পূর্ণ একক নয়। স্মৃতি কখনো সম্পূর্ণ নয়। অনুবাদ কখনো সম্পূর্ণ সমাপ্ত নয়। আর সাহিত্যও কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়। এ কারণেই অ্যান কারসনের সাহিত্যকে শুধু কবিতা হিসেবে পড়লে তার একটি অংশ বোঝা যায়। তাঁকে পড়তে হয় একই সঙ্গে কবি, অনুবাদক, ধ্রুপদি গবেষক, দার্শনিক চিন্তক এবং পরীক্ষামূলক লেখক হিসেবে। কারসনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—তিনি আমাদের কোনো একটি অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন না। বরং তিনি আমাদের এমন একটি অবস্থায় নিয়ে যান, যেখানে আমরা নিজেরাই প্রশ্ন করতে বাধ্য হই : একটি শব্দের অর্থ কোথায় শেষ হয়? একটি স্মৃতি কোথায় শুরু হয়? একটি পুরাণ কখন বর্তমান হয়ে ওঠে? আর একটি ‘আমি’ কতটা সত্যিই ‘আমি’? এ প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। আর সম্ভবত সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই অ্যান কারসনের সাহিত্যের সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য নিহিত।
সূর্যদয়ের দেশ ও নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলে খ্যাত জাপানের রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে জাপানি জীবনধারা আকৃষ্ট করে আসছে বিশ্ববাসীকে। একটা জাতির সংস্কৃতি ও মানসের গভীরে যেতে হলে আগে জানতে হবে তার সাহিত্যভাণ্ডার সম্পর্কে; জাপানি সাহিত্যের উৎপত্তি ও বিকাশ বেশ চমকপ্রদ। সেই প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমানে পদার্পণের ইতিহাস চলুন জেনে নেয়া যাক। জাপানি সাহিত্যের শুরুটা ছিল চৈনিক ভাষা ও সংস্কৃতি দ্বারা ব্যাপক প্রভাবিত, নিজস্ব লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত মৌখিকভাবেই টিকে ছিল তাদের সাহিত্যচর্চা। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় লিপিবদ্ধ জাপানি সাহিত্যের। সেগুলো লেখা হয়েছিল চৈনিক লিপি ব্যবহার করে। ‘কোজিকি’ (৭১২) ও ‘নিহন শোকি’ (৭২০): তৎকালীন শাসকদের নির্দেশে বিভিন্ন দাপ্তরিক তথ্য, লোককাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও দেব-দেবীর কাহিনি সেগুলোতে বর্ণিত হয়। এ যুগ জাপানি ভাষা ও সাহিত্যের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ; জাপানি হরফ ‘কানা’ উদ্ভাবিত হয় এ যুগেই। নিজস্ব ভাষায় তারা আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহিত্যচর্চা করার সক্ষমতা লাভ করে। কিয়োটোর দরবার ধীরে ধীরে পরিণত হতে থাকে শিল্প ও সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে। নারীরা তখন খুব একটা স্বাধীন ছিলেন না; পর্দার আড়ালেই তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করতে হতো। নারীদের চৈনিক ভাষা শেখার ওপরও ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। তাই তারা ‘কানা’ ব্যবহার করে রচনা করতে শুরু করেন একের পর এক কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। ‘মুরাসাকি শিকিবু’ লিখেছিলেন বিশ্বের প্রথম উপন্যাস ‘গেঞ্জি মনোগাতারি’। এ ছাড়া ‘সেই শোনাগন’ রচনা করেন ‘মাকুরা নো শোশি’। এ যুগেই প্রচলন ঘটে দিনলিপির; নারীরাই মূলত সাহিত্যচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন হেইয়ান যুগে। মধ্যযুগীয় জাপান যুদ্ধ আর বিদ্রোহে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার আর সামুরাই শ্রেণির উত্থান জাতীয় থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বলা বাহুল্য, সাহিত্যেও তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। এ যুগের লেখকগণ ধর্মচিন্তা, মানবজীবনের স্বল্পতা, সরলতা আর আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বহু সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন। মধ্যযুগের সবচেয়ে আলোচিত সাহিত্যকর্ম হলো ‘হেইকি মনোগাতারি’, ১২ শতকে তাইরা এবং মিনামতো গোত্রের মধ্যে সংঘটিত ‘গেম্পেই যুদ্ধ’ এই দীর্ঘ কবিতা সংকলনের মুখ্য বিষয়। শোবোগেঞ্জো এই যুগে লিখিত প্রথম বৌদ্ধ ধর্মসংক্রান্ত গ্রন্থ। ‘রেঙ্গা’ নামক নতুন একধরনের কবিতারূপ প্রকাশ পায় এই যুগে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো সংযুক্ত স্তবক। একাধিক কবি ঐক্যবদ্ধভাবে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেন; প্রথম কবি ৫-৭-৫ অক্ষরের একটি স্তবক লেখেন, দ্বিতীয় কবি ৭-৭ অক্ষরের আরেকটি স্তবক সেটিতে যুক্ত করেন। এভাবেই পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে রচিত হয় একটি দীর্ঘ কবিতা। ‘নোহ নাট্য’ নামক সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের সমন্বয়ে একধরনের থিয়েটারও খুব জনপ্রিয়তা পায় মধ্যযুগে। সর্বোপরি জাপানিরা উৎসাহিত হয়ে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করে এ সময়ে। শেকিগাহার যুদ্ধে জয়ী হয়ে তকুগাওয়া লিয়াশু, জাপান সম্রাট গো-ইয়োজেই-এর কাছ থেকে গ্রহণ করেন ‘শোগান’ পদবি, আর এভাবেই সূচনা হয় এঁদো যুগের। জাপান দীর্ঘকাল পর শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে পায় এঁদো যুগে। বর্তমান টোকিও শহরের পূর্বনাম ছিল এঁদো। মানুষজন শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয় এবং সাহিত্য পৌঁছে যেতে থাকে সর্বসাধারণের হাতে। শিক্ষিত সমাজে পুরোদমে সাহিত্যসংক্রান্ত চিন্তাধারা বিকশিত হতে থাকে। ‘হাইকু’ একধরনের ছন্দহীন ক্ষুদ্র কাব্যরূপ, মোট তিনটি চরণে ১৭টি অক্ষরের সমন্বয়ে যা রচনা করা হয় (৫-৭-৫ অক্ষর বিন্যাসে)। মাতসুয়ো বাশো হাইকুকে সংস্কার করে আধুনিক রূপ দান করেন। তাঁর কবিতায় গভীর আবেগ ও অনুভূতি খুব সরলভাবে প্রকাশ পায়। এ যুগের রচনা বেশ প্রাণবন্ত এবং রসাত্মক। বিখ্যাত রচনার মধ্যে আছে কো শোকু ইচিদাই অতোকো, কো শোকু গেনিন অন্না, অকু নো হসোমিচি ইত্যাদি। জাপানে মেইজি সংস্কারকালকে আধুনিক যুগের গোড়াপত্তন হিসেবে গণ্য করা হয়। সম্রাট মেইজির নামে নামকরণ করা হয় সেই যুগকে। জাপানি সাহিত্য তত দিনের সীমান্ত পেরিয়ে আমদানি করেছিল নতুন নতুন উপাদান। বিশেষ করে পশ্চিমা সাহিত্যের ছোঁয়ায় নতুন করে উজ্জীবিত হয় জাপানি সাহিত্য। ইউরোপীয় নানান ধ্যান-ধারণা ও মতবাদ প্রকাশ পেতে থাকে সেই যুগের লেখকদের কলমে। কবিতা যে রকম নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছিল, তেমনি গদ্য সাহিত্যেও এসেছিল লক্ষণীয় পরিবর্তন। ১৯২০–৩০-এর দশকে প্রলেতারিয়েত সাহিত্য আন্দোলন গতি লাভ করে। তাকেজি কোবায়াশি ও ইউরিকো মিয়ামতো শ্রমিক শ্রেণি ও নারীদের নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছিলেন। বিশেষ করে এই যুগে নাতসুমে সসেকি আধুনিক জাপানি গদ্যের প্রচলন ঘটান। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে কোকোরো, বতচান, আই অ্যাম আ ক্যাট ইত্যাদি। এ ছাড়া মোরি ওগাই, আকুতাগাওয়া রিউনোসুকে প্রমুখ এই যুগে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেন। যুদ্ধোত্তর জাপানি সাহিত্য পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে যেতে শুরু করল। বহু রথী-মহারথী লেখকগণ আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করলেন। কবিতা বা পদ্যকে ছাড়িয়ে গদ্য তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে এই যুগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গভীরভাবে জাপানি জনজীবনের ছাপ রেখে গিয়েছিল; পৃথিবীর ইতিহাসে সেবারই প্রথম পারমাণবিক হামলা হয়েছিল কোনো দেশে। অগণিত লাশ আর ক্ষতবিক্ষত মানস নিয়ে যখন কলম ধরা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সব ক্ষত উঠে আসে লেখার মাধ্যমে। ওসামু দাজাই, কেনজাবুরো ওয়ে, ইউকিও মিশিমা, হারুকি মুরাকামি—তাঁদের রচনায় বহুবার এসব দুঃস্বপ্নের স্মৃতিচারণা করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনজন জাপানি নাগরিক সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, কেনজাবুরো ওয়ে ও কাজুয়ো ইশিগুরো। নোবেল পাওয়ার যোগ্য অনেক লেখক এখনো সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত আছেন, তার মধ্যে হারুকি মুরাকামির নাম বহুল চর্চিত। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে জাপানি সাহিত্যের বহুল আলোচিত সংযোজন হলো মাঙ্গা। পশ্চিমা কমিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সাদা-কালো একধরনের স্বতন্ত্র কমিক হলো মাঙ্গা—জাপানি প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কাছে যা সোনার খনি। পশ্চিমা কমিক থেকে ভিন্ন এই সাহিত্যরূপ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয়। কোনো কোনো মাঙ্গা ১০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে; ওয়ান পিস নামক একটি মাঙ্গা আজ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি কপি বিক্রি হয়েছে সারা বিশ্বে। অনেক সাহিত্যবিশারদ মাঙ্গাকে সাহিত্যের অংশ হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। উপসংহারে এটুকু বলা যায়, জাপানি সাহিত্যের ইতিহাস সত্যিই চমকপ্রদ। সেই প্রাচীন আমল থেকে বর্তমান যুগ, অনেক চড়াই-উতরাই পার করে টিকে আছে স্বগৌরবে। সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে সীমাবদ্ধ নয়; সকল সাহিত্যপ্রেমীর কাছে তা একান্তই আপন ও নিজস্ব। আজ সারা বিশ্বে জাপানি সাহিত্যের লাখ লাখ অনুরাগী রয়েছেন, তাঁদের মাধ্যমে চর্চিত, আলোচিত এবং প্রশংসিত হচ্ছে নিত্যদিন। এই সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার টিকে থাকুক সহস্র বছর, পৃথিবী আলোকিত হোক জ্ঞানের আলোয়।
কল্পনার আকাশ সীমাহীন। যেন এক মহাসমুদ্র। চিত্রকল্প এর ঐশ্বর্য। তীব্র অনুভূতির সৌন্দর্য। একটি নান্দনিক কবিতায় থাকে নানা রকম বৈচিত্র্যের সমাহার। থাকে গোধূলির মায়া। দিগন্তের হাতছানি। আকাশের নীল। সমুদ্রের গর্জন। শরতের মেঘ। বৃষ্টির শব্দ। হেমন্তের হাসি। বসন্তের প্রজাপতি। নিসর্গের মায়া। এসবই একজন কবির চিত্রকল্পের ক্যানভাস। চিত্রকল্প একেবারেই যে অনিবার্য তা হয়তো না। চিত্রকল্প ছাড়াও কবিতা জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু আধুনিক কবিতার দাবি ভিন্ন। চিত্রকল্প ছাড়া আধুনিক কবিতা অনেকটা অসম্পূর্ণ। চিত্রকল্পকে মনে করা হয় কবিতার প্রাণ। এটা কল্পনার রঙিন ছবি। শব্দের অপূর্ব বিন্যাস। কবির উপলব্ধি যখন মূর্ত হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় চিত্রকল্প। ইংরেজিতে বলে ইমেজ। বাংলায় শব্দের জাদু। চিত্রকল্প আত্মার সংকেত। একধরনের ইশারা। অলংকারের নিপুণ কারুকাজ। তুলনার ঊর্ধ্বে এর অবস্থান। উপমা শব্দের অংশ মাত্র। চিত্রকল্প বিষয়ের নির্যাস। এক চিত্র থেকে অন্য চিত্রে উত্তরণ ঘটে অনায়াসে। ভালো কবিতায় প্রেম-বিরহ, দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দ সবই চিত্রকল্পময় হয়ে ওঠে। এটি প্রত্যক্ষ ও পারোক্ষ হতে পারে। পরোক্ষ চিত্রকল্প পাঠক হৃদয় দিয়ে অনুভব করে। এটি সার্থক কবিতার শ্রেষ্ঠ গুণ। উপমার আড়ালে লুকানো ছবি। অব্যক্ত কথার আড়ালে গভীর কথা। মিথের অপূর্ব মেলবন্ধন। চিত্রকল্প যেন স্বপ্নের রাজ্য। সত্যের সাথে স্বপ্ন মিশে একাকার। কবি স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে ওঠেন। তিনি দেখেন অতীতের ধূসর ছায়া। দেখেন ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলো। তাঁর ভাবনায় উজ্জল হয়ে ওঠে অনাগত দিনের সুর। তিনি প্রচলিত ছক ভেঙে লেখেন। অজানার ডাকে ছুঁয়ে যান নতুন দিগন্ত। সত্যের জয়গান গাইতে হয় অমোঘ সুরে। আর তখনই কবিতার শক্তি হয় অমর, অজেয়। চিত্রকল্পের রূপান্তর ঘটে অবিরাম। সময় বদলে যায়। আঙ্গিক পাল্টে যায়। শব্দের ব্যবহার হয় আধুনিক। ছন্দের চলন হয় নতুন ছন্দে। এই বদল স্বাভাবিক। একে মেনে নিতে হয়। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি চিরকাল সবার প্রিয়। সময়কে জয় করাই শিল্পের চূড়ান্ত সাফল্য। কবিতা সেই ধ্রুবতারা, যা অন্ধকারে পথ দেখায়। জীবনের বাতিঘর। কবিতা শুধু শব্দের কারুকাজ নয়, এটি জীবন দর্শন। অমরত্বের স্বপ্ন। চিরন্তন সত্যের আলো, আর চিত্রকল্প এর আত্মা। বিচিত্র ভাবনার জগতে বাস করেন একজন কবি। তিনি তাঁর সময়কে উপেক্ষা করতে পারেন না। চারপাশের যন্ত্রণার দহন। শোষিতের আর্তনাদ। বেদনার অশ্রু। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। শাসকের অহংকার। পাহাড়ের মায়া। রাতের নির্জনতা। অমানবিকতার অন্ধকার - সবই তিনি দেখেন। অনুভব করেন। কবিতায় ধারণ করেন। চিত্রকল্পের অসীম প্রান্তরে কবির বিচরণ। কল্পনার এই অলৌকিক শক্তি জন্ম দেয় কালজয়ী কবিতা। চিত্রকল্প ছাড়া কবিতা প্রায় প্রাণহীন। কল্পনাই কবিতার শক্তি। শুধু চিত্রকল্পই না, কবিতার ভাষা ও বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রকল্পা ভাষা ও বিষয়ের অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত হয় এক নান্দনিক কবিতা। তা না হলে কবিতার সৌন্দর্য হারায়। ভালো কবিতার জন্য প্রয়োজন চিত্তের শুদ্ধতা। হৃদয়ের গভীরতা। অলংকারহীন কবিতা পাথরের মতো প্রাণহীন। আধুনিক পাঠক সচেতন। তাঁরা কবিতায় চিত্রকল্প দেখতে চান। চিত্রকল্প একটা কবিতাকে কাল থেকে কালান্তরে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে প্রয়োজন ছন্দ ও শব্দের ব্যঞ্জনা। ছন্দ মানেই গতি। অসীমের পথ। রবীন্দ্রনাথ গদ্য ছন্দের অমর স্রষ্টা। তাঁকে বলা হয় গদ্য কবিতার আলোর মশাল। তিনি অন্তমিলের শেকল ভাঙেন। কবিতায় আনেন মুক্তক ছন্দ। ছন্দ থেকে কবিতাকে মুক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেন গদ্যের নতুন জগৎ। মৃদু ঢেউয়ের মতো গদ্যের দোল থাকে। একেই বলে কবিতার প্রবহমানতা। এখানে অবাধ স্বাধীনতা। পাখির মতো উড়ে চলা। নীল আকাশের মতো আবেগের জোয়ার। ধ্বনি, পর্বের বন্ধন ও আলোর খেলা। কল্লোল যুগের কবিরা তো বরীন্দ্রনাথেরে বিরুদ্ধে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরাও রবীন্দ্রনাথের দেখানো পথে গদ্য কবিতা লেখেন। কবিরা হয়ে ওঠেন ভাষার সার্বভৌম রাজা। বাংলা কবিতা পেল ভিন্নমাত্রা। শুরু হলো গদ্য কবিতার জয়যাত্রা। কিন্তু গদ্য অথবা পদ্য, ছন্দ অথবা ছন্দহীন যে কবিতাই হোক না কেন, চিত্রকল্প এর এমন এক ঐশ্বর্য, যা কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। কবিতায় গুরুচণ্ডালী ভাব যেন না থাকে, সেদিকটায় সতর্ক থাকতে হয়। তবে কখনো কখনো সাধু-চলিতের মিশ্রণ হতে পারে, যদি তা ছন্দ ও কবিতার সৌন্দর্য রক্ষায় অপরিহার্য হয়। সাধারণত কবিতা হয় প্রতীকী। এখানে রূপকের গভীর ইশারা থেকে। গভীর অর্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেক অর্থ। কবির গভীরতম অনুভব চিরকাল সুন্দর, যা পৃথিবীকে করে আরও সুন্দর। মানুষকে করে আরও মানুষ। কবিতার এই জয়যাত্রা চলুক অনন্তকাল। কবি হোক শব্দের জাদুকর। কবির চিত্রকল্পের জাদুতে মোহিত হোক পৃথিবী।
‘মেঘদূত’ আনুমানিক ৩৫০ খ্রিস্টাব্দে মহাকবি কালিদাস রচিত একটি কাব্য। এটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হওয়ার কারণে অনেকের কাছেই এর পাঠ কিছুটা দুর্বোধ্য। তাই অসাধারণ এ সাহিত্যকর্মের অর্থ বিশ্লেষণ নিয়ে বিভ্রাট এড়াতে বিভিন্ন সাহিত্যিক এই কাব্যের অনুবাদ করেন। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু গুণী কবি-সাহিত্যিক বহুরূপে ‘মেঘদূত’ অনুবাদ করেছেন। এ কাব্যের প্রতিটি অনুবাদের রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্যময় আবেদন। এটি যে ভাষাতেই লেখা হোক না কেন, প্রাচীন সাহিত্যের কালজয়ী এই লেখাটির ভাবগাম্ভীর্য ও তাৎপর্য ছিল অনিন্দ্যসুন্দর। ঋতুবৈচিত্র্যে বর্ষা ফিরে আসে বারবার। নবরূপে জেগে ওঠে প্রকৃতি। গাছে থোকায় থোকায় কদম ফুল ফোটে। ঝুম বৃষ্টি কিংবা মেঘলা দিনে হঠাৎ করেই আমাদের মন কেমন যেন উদাস হয়ে ওঠে। আষাঢ়ের মেঘ-বৃষ্টি, প্রিয় মানুষটির কথা মনে করিয়ে দেয় বারবার। প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে এখন আমরা আমাদের প্রিয় মানুষের সাথে মুহূর্তেই মনের আবেগগুলো শেয়ার করতে পারি। হৃদয়ের কথা মুহূর্তে পৌঁছে যায় প্রিয় মানুষটির কাছে। কিন্তু ধরুন মুঠোফোন বা ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার যদি না থাকত, তাহলে কী করতেন? কী করে জানাতেন তখন এই পাগল করা আষাঢ়ের রূপ দেখে প্রিয় মানুষটিকে আপনার মনের কথা? বর্ষার বৃষ্টিস্নাত দিনগুলো প্রকৃতির সাথে সাথে মানুষের মনেও যোগ করে নতুন মাত্রা। তাই বর্ষাকে ঘিরে যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা রচনা করেছেন দারুণ সব কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাস। বহু বছর আগে আষাঢ়ের এমনই এক দিনে প্রেয়সীর কাছে বার্তা পাঠানোর আকুলতাকে ঘিরে মহাকবি কালিদাস রচনা করেছেন বর্ষাকাব্য ‘মেঘদূত’, যা সংস্কৃত সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বহু ভাষা, সাহিত্য ও মানুষের হৃদয় গহিনে জায়গা করে নিয়েছে। আর ‘মেঘদূত’-এ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে বর্ষায় মানব মনের গভীর আকুলতা। মূলত বিরহ, অপেক্ষা আর প্রেয়সীর কাছে মনের কথা বা বার্তা পাঠানোর আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে অসাধারণ এ কাব্য। 'মেঘদূত’ কাব্যের মূল চরিত্রে আছে যক্ষ এবং তার পত্নী। তাদের নিবাস অলকা নগরীতে। যক্ষ ছিল রাজা কুবেরের সেবায় নিয়োজিত এক সেবক। সে ধনপতি কুবেরের বাগান দেখাশোনা করত। কিন্তু একদিন যক্ষ বাগান অরক্ষিত রেখে তার স্ত্রীর কাছে গেলে হাতির পাল সেই বাগানে ঢুকে বাগান নষ্ট করে দেয়। আর এ কারণে যক্ষ তার প্রভু কুবেরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এক বছরের জন্য নির্বাসিত হয় রামগিরিতে। প্রিয়ার বিরহে যক্ষের নির্বাসিত সময় কাটতে থাকে রামগিরিতে। ঋতু পাল্টে আসে আষাঢ় মাস। আষাঢ়ের প্রথম দিবসে মেঘের আগমনে প্রকৃতির নিয়মেই যক্ষের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে তার প্রিয়ার জন্য। বিরহী যক্ষ তখন মেঘের কাছে অনুনয় জানায়, তার মনের গভীরে থাকা কথা অলকা নগরীতে তার প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। আর যক্ষ প্রিয়ার কাছে মেঘকে দূত করে বার্তা পাঠানোর কাহিনিকে উপজীব্য করেই রচিত হয়েছে মহাকবি কালিদাস রচিত সংস্কৃত সাহিত্যের বহুল সমাদৃত কাব্য ‘মেঘদূত’। বিশিষ্ট কবি কালিদাস ‘মেঘদূত’ কাব্য রচনা করেছেন ১১৮টি শ্লোকে এবং তা দুটি খণ্ডে ভাগ করেছেন; উত্তরমেঘ ও পূর্বমেঘ। পূর্বমেঘের প্রথম অংশে মেঘদূত কাব্যের ঘটনাপ্রবাহের শুরু, এই অংশেই দেখা মিলবে মেঘদূত কাব্যের নায়ক যক্ষের সাথে। এরপর পর্যায়ক্রমে এসেছে তার প্রেয়সী ও অলকা নগরীর কথা। সদ্য বিবাহিত যক্ষ আর তার পত্নীর নিবাস অলকা নগরীতে। এরপর কাহিনির মোড় নিতে আগমন হয়েছে যক্ষের প্রভু ধনদেবতা কুবেরের। ঘটনাপ্রবাহে যক্ষ নির্বাসিত হয় রামগিরিতে। আর এখান থেকেই গল্পের মূল অংশ। নির্বাসিত যক্ষ রামগিরি থেকে অলকা নগরীতে তার প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠানোর জন্য মেঘের কাছে জানায় আকুল আবেদন। এ ঘটনা প্রবাহের বিপরীতে পূর্বমেঘের মূল আকর্ষণ হচ্ছে রামগিরি থেকে অলকা নগরীর মেঘের যাত্রাপথের বর্ণনা। মেঘ যখন যক্ষের বার্তা নিয়ে অলকা নগরীর দিকে যাবে, সেই যাত্রাপথের সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে কাব্যের শ্লোক ১৬ থেকে ৬৪ পর্যন্ত। পূর্বমেঘের এই অংশে অলকা নগরীর যাত্রাপথের সৌন্দর্য বর্ণনা দিতে কবি ব্যবহার করেছেন অনিন্দ্যসুন্দর সব উপমা আর ফুটিয়ে তুলেছেন রামগিরি থেকে অলকা নগরী পর্যন্ত অখণ্ড ভারতের অসাধারণ রূপ। পূর্বমেঘ পড়তে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠবে অলকা নগরীর যাত্রাপথে উজ্জয়নী, অবন্তি অথবা বিদিশা নগরীর দৃশ্য; কিংবা কানে বেজে উঠবে রেবা, শিপ্রা ও বেত্রবতী নদীর বহমান জলধারার কলকল ধ্বনি এবং ভেসে আসবে নদীতীরের ভুঁইচাপা ফুলের সুবাস। আবার ‘পূর্বমেঘ’ পড়তে পড়তে সন্ধ্যা নামতে পারে বিন্ধ্য, কৈলাস কিংবা দেবগিরি পাহাড় চূড়ায়। আবার কখনো হারিয়ে যাওয়ার সাধ জাগে মেঘের যাত্রাপথের কেতকী বনে। পথিমধ্যে দেখা মিলবে আনন্দিত চাতকের দলের সাথে। আর বইয়ের পরতে পরতে মুগ্ধতা ছড়াবে বর্ষার স্নিগ্ধ সতেজ কদমগুচ্ছ ফুলের সৌরভ। এরপর উত্তর মেঘের বর্ণনায় বহু নগর, পাহাড়, নদী আর বন পেরিয়ে মেঘ পৌঁছায় অলকা নগরীতে। পূর্বমেঘজুড়ে অলকা নগরীর যাত্রাপথের বর্ণনা শেষ হওয়ার পর দেখা মেলে যক্ষপ্রিয়ার বাড়ির। উত্তর মেঘের বর্ণনায় পাঠকের মানসপটেও সেই বাড়িটি ভেসে উঠবে অবিকলভাবে। মেঘ যখন কুবেরের বাড়ি পৌঁছবে, তখন দেখা মিলবে বাড়ির পাশের উঠোনে থাকা মন্দার গাছটির। আর কিছুদূর পাশেই আছে পান্নাশোভিত চমৎকার একটি হ্রদ, যেখানে তখন ভেসে বেড়াবে হাঁসের দল আর নীলকান্তমণি শোভিত পদ্মের কাণ্ডে ছেয়ে থাকবে সেই পুরো হ্রদ। এভাবেই অলকাপুরী আর যক্ষের বাসগৃহের বর্ণনার পর দেখা মিলবে যক্ষপ্রিয়ার। হালকা গড়নের ঈষৎ শ্যামলা বর্ণ; এমনভাবেই তার রূপের বর্ণনা শুরু হয়েছে। এরপর বহু উপমা আর রূপে রঞ্জিত হয়েছে যক্ষপ্রিয়া। শুধু সৌন্দর্যের বর্ণনাই নয়, যক্ষের বিরহে বিনিদ্র রজনী পার করে যক্ষপ্রিয়ার মলিন দশাও বর্ণিত হয়েছে এক দারুণ ভঙিমায়। এরপর মেঘ পৌঁছে যায় যক্ষপ্রিয়ার কাছে এবং তাকে পৌঁছে দেয় বহু প্রতীক্ষিত যক্ষের বার্তা। এভাবেই প্রেয়সীর কাছে যক্ষের বার্তা পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই ‘মেঘদূত’ কাব্যটি তার নামের সার্থকতা পায়। প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল নিদর্শন অনবদ্য এক মনোমুগ্ধকর সৃষ্টি, মহাকবি কালিদাসের কালজয়ী এই মহাকাব্য ‘মেঘদূত’ যেমন সমাদৃত হয়েছে সাহিত্যাঙ্গনের সর্বক্ষেত্রে, তেমনি পাঠক হৃদয় জয় করেছে যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজ আর প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক যুগ ছাড়িয়ে উত্তর-আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে বেশ আগে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের পরিক্রমায়, মন-মননের চিন্তাভাবনা ধ্যানধারণায় বৈশ্বিক মেরুকরণের আবর্তনে বা বিবর্তনে সগৌরবে মর্যাদার আসনে আসীন। যেখানে পরিবর্তনই সময়ের ধর্ম, বিপর্যয়ও সেখানে মহিমান্বিত। হোক গদ্য কিংবা পদ্যের ভাষা; ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস সবিস্তর। শাসন-শোষণে ঔপনিবেশিক হিংস্রতার পরিমাণ অপরিমেয়। ধ্বংসযজ্ঞের করুণ পরিণতি সীমাহীন। বাঙালির রক্তে ভেজা মাটি সাত সমুদ্রের মতো। প্রবল বন্যায় সবকিছু যেমন ভাসিয়ে নেয় কিংবা ভূমিকম্পের তীব্রতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বস্তুগত-অবস্তুগত তথা প্রাণের বিপর্যয় ঘটে, অস্তিত্ব মুখথুবড়ে পড়ে, সেখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অক্ষত থাকার চিন্তা বাহুল্য। মূল কথা হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর কৃত্রিম দুর্যোগ বিপর্যয়ের চরম ধ্বংসাত্মক শক্তির দুই ভাই। এক ভাইয়ের আক্রমণে কিছু থাকে তো আরেক ভাইয়ের আক্রমণে স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার বারোটা বাজে। বাংলার সংস্কৃতি ও বাংলা গদ্যের বেলায়ও ঠিক তেমন। বিজাতি বা বিভাষী হলো দুর্যোগ, কিন্তু দুর্যোগেরও একটা উপকারী দিক থাকে। যেখানে উর্বরতা বাড়ে, সেখানে ফসল ফলানোও যায় ভালো। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিজাতীয় ভাষা বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিতে কী পরিমাণ অবদান রেখেছে, সেটা সাহিত্যের আদিমতম ইতিহাস বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। তাই দুর্যোগের পরও কিছু নতুনত্ব থাকে। এই রূপান্তরের বিবর্তন পর্যায়ক্রমে জ্ঞাত হওয়া যায় ভাষা ও সাহিত্যের আদি গ্রন্থগুলোর পণ্ডিতদের মতামত ও বিভেদের আলোচনা-সমালোচনা থেকে। বাংলা ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য বা গুণ সহজ-সরল, সাবলীল, প্রাঞ্জল, অসংযতহীন ও ধ্বনিমাধুর্য লক্ষ করা গেলেও পরবর্তী সময়ে বাংলা গদ্যে দুর্বোধ্যতা ও জটিলতা পরিলক্ষিত হয়; যার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পাশ্চাত্য প্রভাব আর বিজাতি ও বিভাষীয় ক্ষমতার প্রভাবে বাংলা ভাষার প্রাণস্পন্দন, শেকড় বা নাড়ির টানের ব্যবচ্ছেদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস চর্যাপদ থেকে ধরা হলেও শুভযাত্রা তারও অনেক পরে। মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও রামগতি ন্যায়রত্নের ‘বঙ্গ ভাষার ইতিহাস’ ও ‘বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থ দুটিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করলে কোনটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম আলোচিত গ্রন্থ, তা নিয়ে মতভেদ লক্ষ করা যায়। তবে সপ্তম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় লেখার শিরোপা বা মুকুট চর্যাপদের লেখক মীননাথকেই দিতে হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রথম উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ পদ্মনাভ ঘোষাল ও অবিনাশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘গৌড়ীয় ভাষাতত্ত্ব’ (১৮৭৫), রাজনারায়ণ বসুর ‘বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বক্তৃতা’ (১৮৭৮), হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বর্তমান শতাব্দীর বাঙ্গালা সাহিত্য’ (১৮৮১) এবং দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ (১৮৯৬) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থের আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে এবং নানা মতভেদের আলোকে বলা যায়, বাংলা গদ্য সাহিত্যের যাত্রা উনিশ শতক থেকে শুরু হয়েছিল। অনেকে বাংলা গদ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন ষোড়শ শতাব্দীতে ‘বাংলা সাহিত্য’ সূচনার মাধ্যমে। আবার কেউ কেউ বলেন বৈষ্ণব সাধনতত্ত্ব বিষয়ক গদ্যগ্রন্থকে। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসকে বাংলা গদ্যের আদি লেখক বলা হলেও মতভেদ রয়েছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী কালকে সজনীবাবু অন্ধকার যুগ বলেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অন্ধকার যুগে হয়তো তেমন কোনো সাহিত্যকর্মের নিদর্শন পাওয়া যায়নি বটে, কিন্তু তার পরও এই সময়ে প্রাপ্ত ও রচিত প্রধান সাহিত্য ও নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাক ও খনার বচন, প্রাকৃতপৈঙ্গল, শূন্যপুরাণ ও সেকশুভোদয়া। সজনীবাবু নবম শতাব্দী সময়কাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যের অভাববোধ করেছেন। যদিও পর্তুগালের লিসবনে প্রথম বাংলা গদ্যগ্রন্থ ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ (১৭৪৩) মুদ্রিত হয়। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা গদ্য সাহিত্য ভাব ও কাজের গদ্য নিদর্শন প্রতীয়মান। কারণ, এ সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুলতানি আমলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ষোড়শ ও সতেরো শতকে সুলতানি আমলে নবাবদের মৌঠুহর অঙ্কিত বাংলা লেখায় জয়পুত্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একই শতাব্দীতে আসাম, ত্রিপুরা ও কাছাড়ের মতো রাজ্য বা প্রদেশের সরকারি কাজকর্মের ভাষাও ছিল বাংলা, যা মহারাজ নারায়ণের পত্রেও দেখা গেছে। এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, প্রাচীন বাংলা গদ্য সাহিত্য আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যকে বিকশিত করেছে। বাংলা গদ্যের এই বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে মধ্যবিত্ত সমাজের আত্মবিকাশে এবং জীবন জিজ্ঞাসার তাড়নায়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য উচ্চশিক্ষিত তরুণদের যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাভাবনা, চেতনা, ভাবের গভীরতা ও ভাবের বাহনই ছিল গদ্য। গদ্য যুক্তি, তর্ক-বিতর্ক, তর্ক-বিবাদ, বিচার-বিশ্লেষণের ভাষা, আর পদ্য আবেগ, অনুভূতি, উচ্ছ্বাস ও কল্পনার ভাষা। বাংলা গদ্যের বিকাশে পয়ার ছন্দের একটা আধিপত্য ছিল। অন্যদিকে গদ্য-পদ্যরীতিতে সাম্যভাবমূলক মিলন দেখা যায়, যার মাধ্যমে আখ্যায়িকা বিবৃতি, প্রথাবদ্ধ দেবার্চনা বর্ণনা, বাদপ্রতিবাদ ও কথোপকথন প্রভৃতি কাব্যাঙ্গে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা কাব্যোৎকর্ষের মানদণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। এটা গুণগত দিক থেকে মানসম্মত না হলেও এর উপযোগিতা অসাধারণ ও অসামান্য।, যা কাব্যজগতের ত্রিশংকু কবিতার স্বর্গ এবং গদ্যের মর্ত্য বলেই বিবেচিত। রেনেসাঁসের আগে ইউরোপের কোথাও পুরোপুরি সাহিত্যিক গদ্যের বিকাশ ঘটেনি। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধের ইংরেজি সাহিত্যে সাহিত্যিক গদ্য ছিল না। ইংরেজি সাহিত্যে গদ্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটে সপ্তদশ শতাব্দীতে ড্রাইডেনের হাতে, তা-ও পদ্য সাহিত্য মারফতে। এর আগে শেকসপিয়ার ও বেকনের গদ্যটাও ছিল কাব্যগদ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে প্রসার ঘটতে থাকে মুদ্রাযন্ত্রের ইংল্যান্ডের হাত ধরেই। ফলে গদ্যের পথ প্রসারিত হতে থাকে। উন্মুক্ত হতে থাকে। প্রসার ছড়িতে পড়তে থাকে ইন্টারনেটের মতো বিশ্বব্যাপী। স্বাধীন বাংলাদেশের গদ্যের বিকাশও স্বাভাবিকভাবে এর আওতাধীন হয়ে পড়ে। মুদ্রণ ও পুস্তক ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। আলতুস, মানুটিয়াস, প্রথম ফ্রান্সিস নাভাবের রানি, মার্ঘারেটের মতো ব্যক্তিরা তখন খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁদের মধ্যে মার্গারেট ইতালির স্টাইলে রচনায় উদ্বুদ্ধ করতেন, যা পরে ফরাসিরা লুফে নেন। ফরাসি গদ্যের নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রসার লাভ করতে থাকে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।