পুরোনো জিনিসের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। ফেলে রাখলেও তারা মানুষকে ফেলে রাখে না। আলমারির নিচে ধুলো জমা একটি ফোন পেলাম। অনেক বছর আগে শেষবার চালু করেছিলাম। চার্জ দেয়ার পর পর্দায় একে একে জেগে উঠল পুরোনো দিনগুলো। ছবিগুলো নেই, বার্তাগুলো মুছে গেছে। শুধু একটি নম্বর রয়ে গেছে। কোনো নাম নেই। কী ভেবে যেন কল দিলাম। ওপাশে পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল- হ্যালো... আমি কিছু বললাম না। সে একটু থেমে মৃদু হেসে বলল- চুপ করে আছিস কেন? চিনেছি তো। মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল সেই বিকেলগুলো। এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়া, বৃষ্টিতে অকারণ ভিজে যাওয়া, কোনো কারণ ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা। তখন সময়ের কোনো তাড়া ছিল না। মনে হতো, বন্ধুত্বেরও বুঝি কোনো শেষ নেই। আমি ধীরে বললাম- সবাই কেমন যেন হারিয়ে গেল। ওপাশ থেকে উত্তর এল- সবাই হারায়। যারা মনে থাকে, তারা হারায় না। আর কোনো কথা হলো না। কল কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম। পর্দায় তখনো সেই নামহীন নম্বরটি জ্বলছিল। হঠাৎ মনে হলো, কিছু সম্পর্কের পরিচয় শব্দে লেখা যায় না। তারা পুরোনো ফোনে নয়, মানুষের ভেতরে জমে থাকা বিকেলগুলোর মধ্যে বেঁচে থাকে। সময় তাদের দূরে নিয়ে যায়, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না। হয়তো সেসব মানুষ আজও আছে, স্মৃতির ওপারে। সেখানে দূরত্বের কোনো মানচিত্র নেই, সময়েরও কোনো কর্তৃত্ব নেই। শুধু কিছু বিকেল, কিছু নীরবতা, আর একটি নামহীন নম্বর আজও নীরবে বেজে ওঠে।
হঠাৎ চোখ আটকে গেছে। অন্ধকারে মধ্যেই বাইরের আলো এসে পড়ল আমার সাংবাদিকতা জীবনের গল্প তৈরির এক অংশের ওপর। আলমারির এক কোণে নিঃশব্দে শুয়ে আছে পুরোনো ইয়াশিকা ক্যামেরাটি। তার গায়ে সময়ের ধুলো জমেছে, কিন্তু স্মৃতির ওপর কখনো ধুলো পড়ে না। তাকে হাতে নিয়েই মনে হচ্ছে, সময় যেন হঠাৎ উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। আনাড়ি হাতে ছবি তুলি। ফিচার লিখি। একটি ইয়াশিকা ফিল্ম ক্যামেরা। এটি এক সময়ের প্রিয় স্মৃতি বন্দী করার সঙ্গী। এমন ক্যামেরার প্রতিটি ক্লিকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষা, উত্তেজনা আর অমূল্য মুহূর্তের গল্প। ধুলো জমে থাকা ক্যামেরাটি যেন নিছক একটি যন্ত্র নয়, এটা এক সময়ের দরজা। ক্যামেরাটি যেন একটি নির্বাক ইতিহাস। সে কথা বলতে পারে না, তবু তার প্রতিটি আঁচড়, প্রতিটি ক্ষয়, প্রতিটি বোতাম বলে যায় অসংখ্য অপ্রকাশিত গল্প আমার জীবনের ফেলে আসার সেই দিনের। আজকের মতো রিল নয়, মুঠোফোন বা ডিএসএলআরে হাজার ছবি নয়, তখন প্রতিটি ফ্রেম ছিল অমূল্য। শাটার চাপার আগে ভাবতে হতো, মুহূর্তটিকে হৃদয়ে মেপে নিতে হতো। তারপর অপেক্ষা—ফিল্ম ধোয়ার, ছবির জন্ম দেখার। অপেক্ষা। একদিন এই ক্যামেরার প্রতিটি ক্লিক ছিল উৎসব। একটি ছবি তুলতে কত ভাবনা, কত যত্ন! কারণ প্রতিটি ফ্রেমের ছিল মূল্য, প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনন্য। তখন ছবি তোলা মানে শুধু মুখ বন্দী করা নয়, একটি সময়কে, একটি অনুভূতিকে, একটি সম্পর্ককে চিরদিনের জন্য আটকে রাখা। আজকের ডিজিটাল যুগে হাজারও ছবি তুলি, কিন্তু সেসব ছবির বেশির ভাগই হারিয়ে যায় ফোনের মেমোরিতে। অথচ এই পুরোনো ক্যামেরা আমাদের শিখিয়েছিল—ছবি সংখ্যায় নয়, অনুভবে বড়। কখনো কখনো মনে হয়, মানুষ বুড়ো হয়, সময় বদলে যায়, প্রযুক্তি পাল্টায়; কিন্তু কিছু জিনিস থেকে যায় চিরসবুজ। সেই পুরোনো ক্যামেরার মতো, যে আজও মনে করিয়ে দেয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলো কেবল অ্যালবামে নয়, হৃদয়ের গভীরতম ক্যানভাসে আঁকা থাকে। স্মৃতি কখনো ফিকে হয় না। ফিকে হয় শুধু সময়ের রং; আর সেই রঙের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে একটি পুরোনো ক্যামেরা—নীরব, অথচ হাজারও গল্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাক্ষী। আজ ক্যামেরাটি নীরব। তবু তার নীরবতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে আমার যৌবন, প্রিয় মুখ, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, আর ফেলে আসা দিনের আলো-ছায়া। আমার ভালোবাসা।
(প্রথম পর্ব) একদিন সম্পর্কের বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারটা অদ্ভুত! সেখানে আলু-পেঁয়াজ, কাপড়-চোপড়, সোনা-রুপা কিছুই বিক্রি হয় না। শুধু সর্ম্পক। ছোট ছোট দোকানে সাজানো আছে মানবতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ব, আত্মীয়তা, স্বার্থ, ক্ষমতা, যেন মানুষের জীবনকে টুকরো টুকরো করে তুলে রাখা হয়েছে। একজন দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মাথা তুলে তাকাল— কী চাই? আমি বললাম— একটু সর্ম্পক। সে হেসে বলল— কোনটা? মানবতার, না ভালোবাসার? বিশ্বাসের, না ব্যবসার? আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম— বন্ধুত্বের। লোকটা তখন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল। যেন বহুদিন পরে কোনো বিলুপ্ত শব্দ শুনেছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল— জনাব, পৃথিবী এখনো যে কটা কারণে টিকে আছে, বন্ধুত্ব তার মধ্যে একটা। কিন্তু দুঃখিত, এই জিনিসি বিক্রির জন্য নয়। সেদিন দোকান থেকে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। মনে হচ্ছিল, লোকটা বোধহয় সত্যি কথা বলেছে। চারপাশে কত মানুষ! বিমানবন্দরে মানুষ, রেলস্টেশনে মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ, অফিসে মানুষ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ। মানুষ আর মানুষ। কিন্তু বন্ধু? বন্ধু যেন বর্ষার দিনে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একা কদমগাছ। আছে কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না। প্রবাসে এসে এই অভাবটা আরও বেশি টের পাই। একেক দিন শরীর ভালো থাকে না; একেক দিন মন। আবার কোনো কোনো দিন দুটোই ভালো থাকে না। সেই দিনগুলোতে খুব ইচ্ছে করে পাশে বসে কেউ নির্বিকার মুখে এক কাপ চা খেতে খেতে বলুক— তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর শেষ দিন আজ। তারপর দুজন মিলে হাসতে হাসতে পৃথিবীর শেষ দিনটাও পার করে দেয়া যেত। এখানে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একসঙ্গে খয়েছি, গল্প করেছি, লং ড্রাইভে গিয়েছি, ইউরোপের পুরোনো শহরে হাঁটাহাঁটি করেছি, আমেরিকার সরল রেখার মতো দীর্ঘ মহাসড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে সূর্যাস্ত দেখেছি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পরিচয় হয়েছে অনেক, বন্ধুত্ব হয়নি তেমন। আজকাল সর্ম্পকগুলো কেমন যেন মোবাইল ফোনের অ্যাপের মতো। ডাউনলোড করা যায় সহজে, আবার ডিলিট করাও সহজ। একটি অপছন্দের মন্তব্য। একটি ভিন্ন মত। একটি না-পছন্দ সিদ্ধান্ত। ব্যস, সম্পর্কের সমাপ্তি। তখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে। তারা ছিল অন্য রকম। আমাদের কাছে তখন পৃথিবী ছিল ছোট। কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল বিশাল। আমাদের জাতিসংঘ ছিল না, ছিল বন্ধুসংঘ। আমাদের পাখা ছিল না, কিন্তু উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। ঘাসফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ানোর সময় ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় ছিল। বৃষ্টির শব্দ শোনার সময় ছিল। কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্না গুনে গুনে ভোর করে দেয়ার সময় ছিল। আমরা তখন জানতাম না পৃথিবী কত জটিল! জানতাম না মানুষ একদিন এত ব্যস্ত হয়ে যাবে। শুধু জানতাম, বিকেলে মাঠে দেখা হবে। এই জানাটুকুই যথেষ্ট ছিল। আজ বুঝি, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিস নয়, সময় হারায়। আমি বাংলাদেশকে যতটা মিস করি, তার চেয়েও বেশি মিস করি বাংলাদেশের কিছু সময়কে। ঝুমবৃষ্টির দুপুর। বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। শীতের সকাল। ডিমভরা পুঁটি মাছ ভাজা ঘ্রাণ। ধানখেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া বিকেল। আর মিস করি সেই সব মানুষকে যাদের সঙ্গে কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যেত। একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল— বাংলাদেশে যাচ্ছি, তোর জন্য কী আনব? আমি বলছেলিাম— যদি পারিস, চৈত্রদিনের একটা ঘুঘু-ডাকা দুপুর নিয়ে আয়। সে ভেবেছিল আমি মজা করছি। আসলে করিনি। মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন সে বস্তু নয়, মুহূর্ত সংগ্রহ করতে চায়। আমাদেরও মনে হয় সেই সময় এসেছে। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতেও কোনো ঘড়ি ছিল না। আম্মা শুকতারা দেখে ভোরের সময় আন্দাজ করতেন। তারপর আমাকে ডাকতেন। আমি আধোঘুমে চোখ খুলে বলতাম— এখনো তো অন্ধকার। আম্মা বলতেন— আগে শুরু কর বাবা। পড়তে পড়তে সব আলো হয়ে যাবে। বহু বছর কেটে গেছে। আমি এখনো পড়ছি। কতটুকু আলো হলো জানি না। তবে এটুকু বুঝেছি, মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আলোগুলো বই থেকে আসে না। আসে মানুষ থেকে। বন্ধু থেকে। ভালোবাসা থেকে। স্মৃতি থেকে। এই যে আজ এত দূরে বসে আছি, হাজার হাজার মাইল দূরে, তবু কোনো কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে হয়, ক্যাম্পাসের কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। বন্ধুরা পাশে আছে। কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে। কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিচ্ছে। কেউ আবার অবলীলায় পকেট থেকে শেষ দশ টাকা বের করে সবাইকে চা খাওয়াচ্ছে। সেই সব বিকেল কোথায় গেল? কোথায় গেল সেই মানুষগুলো? আমরা কি সত্যিই বড় হয়ে গেছি? নাকি শুধু দূরে সরে গেছি? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় বুঝেছি। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ সম্পর্কগুলো অনেক সময় নিয়মিত যোগাযোগে বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে বিশ্বাসে। কোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে বছরের পর বছর কথা হয় না। তার পরও গভীর রাতে ফোন করলে সে বলবে— বল, কী হয়েছে? এবং এই একটি প্রশ্নই যথেষ্ট। কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্বের অভিধানে ‘কেন’ শব্দটা খুব কম থাকে। সেখানে থাকে শুধু— ‘আমি আছি।’ [চলবে]
এক দিন দুদিন করে বাবার বুকেই কেটে যায় শৈশবের কয়েকটি বছর। আজ যেভাবে আমরা সন্তানকে রাতে বুকের ওপর শুইয়ে রাখি, এক দিন আমার বাবাও তার বুকের ওপর আমাকে ঘুমিয়ে রাখত। বাবারা এভাবেই সব সহ্য করে। বুকে সন্তান আর মাথায় সংসারের বোঝা বহন করে বাবা। কোনো দিন সন্তান বোঝা না হলেও ঠিকই অনেক বাবা একদিন সন্তানের কাছে বোঝা হয়! কেউ কেউ তাদের ছুড়ে ফেলে রাস্তায়। আমার বাবাকে আমি বহুভাবে দেখেছি। আমার শিশুবেলায় বাবার কাঁধে চড়ে যখন পৃথিবীটাকে দেখতাম, তখন বাবা ছিল এক রকম। বুঝতাম, বাবাদের কাঁধ আমার আশ্রয়। বিকেল হলেই কাঁধে চড়ে মাঠে যেতাম। যখন শিশুকাল পেরিয়ে আমি মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াই কৈশরের রঙিন জগতে, বাবা তখন আমার হিরো। আমি বাবাকেই অনুসরণ করতাম, আর আমার বড় হওয়ার সাথে সাথে বুঝলাম বাবা এক বটবৃক্ষ। শুধু বটবৃক্ষ নন, বাবা এক মেশিন। টাকা দরকার, পাচ্ছি, খাবার দরকার, বাবা বাজার থেকে আনছেন। সত্যি বলতে কি জীবনে যে নিশ্চিন্ত কয়েকটি বছর, তা কেবল মা-বাবা জীবিত থাকাকালীন শৈশব আর কৈশরের দিনগুলোই। তার পর থেকে সব ফ্যাকাশে হতে থাকে। সংসারে বাবাকে আমি বেশি অনুভব করেছি আমি নিজে বাবা হওয়ার পর থেকে। বাবাকে নিয়ে যেসব প্রশ্নের উত্তর আমি যৌবনে পাইনি, সেসবের উত্তর পেয়েছি আমি বাবা হওয়ার পর। বাবা যে সংসারের একটি বটগাছ, তখন আমি আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করি। আমাদের সমাজে যখন মাতৃত্বের জয়গান, সেখানে কমই বন্দনা হয় পিতৃত্বের, এ দোষ সমাজের নয়। আমাদের দৃষ্টিতে এই দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত সংসারেই। পরিশ্রান্ত সংসারের বাবার সাথে তার আদরের সন্তানদের দেখা হয় কমই। আহারের জোগান দিতেই কেটে যায় দিন-রাত। কোনোমতে টানা একটি সংসার সন্তান নিয়ে মা যখন কষ্ট করে, তখন সেটা চোখে পড়ে কিন্তু পেছন থেকে পুরো পরিবারের জন্য অবিশ্রান্ত খেটে যায় সেই সংসারের বাবা। আমার শৈশবের দেখা বাবা তখন বদলে যায়। আমি তখন বাবাকে বুঝতে শিখি। আমি বুঝতে পারি কেন বাবার কাছে চাইলেই কোনো জিনিস সহজে পাই না। একসময় ভাবতাম, হয়তো বাবা ইচ্ছে করেই আনে না। পরে বুঝলাম, এর জন্যও বাবার চোখের জল ঝরে। এই বাবার হাত ধরেই আমার স্কুলজীবনের সাথে পরিচয়, আমার প্রথম বাইরের জগতে পা রাখা। যখন আমি আমার সন্তানের চাহিদার জোগান দিতে পারতাম না, তখন বাবার মুখটা মনে পড়ত। বাবাও হয়তো দিতে না পারার কষ্টে বিঁধত। আমি ভাবতাম, বাবা চাইলেই পারে। বাবার ঘামে ভেজা শার্টের প্রতি বিরক্ত ছিলাম। বছর কেটে যেত এক জোড়া শার্ট আর প্যান্ট দিয়ে। জুতো জোড়া কেটে যেত বছরের পর বছর। কোনো দিন দেখিনি একটু বিলাসিতা করে সময় কাটানো। ভাবতাম, বাবারা মনে হয় এতটাই ব্যস্ত হয়। কিন্তু বুঝতাম না সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেন বাবা ব্যস্ত থাকে? আজ জানি, মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবারা কোনো দিনই অবকাশ পায় না। পরিবারের সদস্যদের চিন্তা করতে করতেই দিন-রাত এক হয়ে যায়। এই যে আজ কত বাবাকে দেখা পাওয়া যায় দেশের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে, এসব কেন হয়েছে? আইন করে মা-বাবাকে সন্তানদের কাছে রাখতে বাধ্য করতে হবে। যখন দেখি সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে বাবার লাশটা পর্যন্ত কবর দিতে আটকে রাখা হয়েছে, তখন মনে হয় বাবার ছোট্ট ওই বুকটা যে বড় জমিন ছিল, সেখানে তো সবার ঠাঁই ছিল। আজ তবে কেন এই পরিহাস! একবার অবশ্য অবসরের সময় পায়। আমার বাবাও পেয়েছিল। যেদিন আমার বাবার দেহটা নিথর নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সেদিন আর বাবার কোনো ব্যস্ততা দেখলাম না। দেখলাম, আমার মধ্যবিত্ত বাবার তখন আর কোনো তাড়া নেই। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। সংসারের সব ভার তখন ছেড়ে দিয়েছে আমার ওপর। মধ্যবিত্ত মার্কা সংসার আমাকে স্পর্শ করেনি। অথচ মানুষটাকে আমি কোনো দিন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পর্যন্ত দেখিনি। ঘুমের ভেতরেই কী যেন ভাবত! আমি জানি, বাবা সংসারের কথা ভাবত। পরদিন কী দিয়ে চলবে, সেই কথা ভাবত। মধ্যবিত্ত বাবাদের এ কথা ভাবতে হয়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আমি বাবাকে সংগ্রাম করতে দেখেছি। আমি নিজেও এখন বাবার মতো হয়ে গেছি। এক শার্ট গায়েই মাসের পর মাস কেটে যায়। আর নতুন জুতো তো কয়েক বছর। আমিও পরের দিনের কথা ভাবি। আর রাত একটু গভীর হলে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরি। এভাবে বহু বাবা রাতে ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে, সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে না পারায় নীরব থাকে। রাতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কোটি কোটি নক্ষত্রের মাঝে বাবাকে খুঁজি। বাবাকে কিছু কথা বলতে চাই। বলতে চাই, বাবা আমি ধীরে ধীরে তোমার মতো হয়ে গেছি। একদিন ঠিক তোমার কাছেই চলে আসব। বাবাকে এখন সবচেয়ে বেশি মিস করি। তখন বাবার সম্পর্কে যে ধারণাগুলো ছিল, এখন তা পাল্টেছে। জানি, একদিন আমিও বাবার মতো থেমে যাব। সব বাবাকেই থেমে যেতে হয়। আবার সব বাবাই বেঁচে থাকে সন্তানের বুকে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।