Breaking news

সিডও

সিডও সনদ : নারী-পুরুষ বৈষম্যের কাঁটাতার ভাঙবে কবে

নারী-পুরুষ বৈষম্য আজন্মকাল। এ বৈষম্য আমাদের রন্ধ্রজাত। শিরায়-উপশিরায় আমি পুুরুষ, তুমি নারী এই হেতু আমি এগিয়ে। দক্ষতা মাপার দরকার নেই, এই চিন্তা-চেতনা লালন করতে করতেই এই প্রজন্ম বড় হয়ে উঠছে। বৈষম্য ভাঙার বহু চেষ্টা করা হয়, ভাঙে না। ইচ্ছে করেই বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতে পারি না।   বৈষম্য শব্দটি দ্বারা কারো অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা তার প্রাপ্য থেকে দূরে রাখা বোঝায়। ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত করার মনোভাব বৈষম্যের তৈরি করে। আমাদের সমাজে এ ধরনের বহু বৈষম্য চোখে পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য, যা আমাদের মনের ভেতর লালিত হয়ে উঠছে, তা হলো নারী-পুরুষ বৈষম্য। নারীদের আড়ালে রেখে পুরুষের সামনে এগিয়ে চলার মনোভাব আদিকাল থেকেই চলছে। একসময় যখন নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখনো নারীদের নানাভাবে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। নারী-পুরুষের এই ভেদাভেদ দূর করার চেষ্টাও করেছেন অনেকে।   কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় বলেছেন, “আমি সাম্যের গান গাই/ আমার চোখে পুরুষ রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।” সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে নারী-পুরুষ নিজ কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখলেও বৈষম্য নারীর পিছু ছাড়েনি। সময়ের সাথে সাথে সেই বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে এখন সমতার কথা বলা হয়, তখনো সেই বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে বের হতে পারছি না আমরা।   নারীদের সমস্যা বহুমুখী। সমান অধিকার প্রদানের সাথে সাথে এসব সামাজিক সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতারও ইতি টানা আবশ্যক। কারণ, নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়। এ ধরনের বৈষম্য রোধ করতে সিডও সনদ স্বাক্ষরিত হয়। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ সিডও নিয়ে ১৯৭৯ সালে ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮০ সাল থেকে স্বাক্ষর শুরু হয়। বাংলাদেশ সনদটি অনুমোদন করে স্বাক্ষর করে ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর। এখন পর্যন্ত শতাধিক দেশ (১২৫টি) এই সনদ অনুমোদন দিয়েছে। এই পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য রোধ এবং সমান অধিকার অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সনদটি কার্যকর হতে থাকে। এই সনদে ৩০টি ধারা রয়েছে। প্রথম ১৬টি ধারা নারীর প্রতি কত প্রকার বৈষম্য আছে তা নিশ্চিত করে। নারীর প্রতি বৈষম্যের সূত্রপাত হয় পরিবার থেকে। এরপর সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রে। যদিও তা কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।   মেয়েদের বাল্যবিয়ের মাধ্যমে তার লেখাপড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যেখানে একজন ছেলে সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার লক্ষ্যেই বড় করা হয়, সেখানে এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে আঠারো বছরের আগেই বিয়ের খবর আসে। এই সনদের মাধ্যমে আসলে নারীর প্রতি যেসব বৈষম্য এখনো বিদ্যমান, সেসব দূর করতে এবং নারীর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা। যেখানে বহু বছর ধরেই নারী-পুরুষ সমতার জন্য নারী ও একতায় বিশ্বাসী পুরুষও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।   বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি ধারায় সংরক্ষণ রেখে সনদে সই করেছিল। সেগুলো হলো ধারা দুই, তেরো (ক), ষোলো এক (গ) ও (চ)। ১৯৯৭ সালে সরকার তেরো ক এবং ষোলো এক (চ) থেকে সংরক্ষণ তুলে নেয়। ওই বছরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল। এই উন্নয়নের সাথী হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়ই অবদান রাখছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজও নারীর অবদান অস্বীকার করতে ব্যস্ত একশ্রেণির মানুষ।   নারী প্রতিদিন যে সংসারে অর্থনৈতিক ও শারীরিক শ্রমে অবদান রাখে, সে কথা সত্যি হলেও তার কোনো মূল্যায়ন নেই। অথচ আর্থিক হিসাবে নারীর সেই শ্রমের মূল্য রয়েছে। কাউকে তার ন্যায্য প্রাপ্তি বা অধিকার থেকে বঞ্চিত করা অন্যায়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এ জন্য আমাদের রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা। এই বিশাল জনসংখ্যার অংশ হলো নারী ও পুরুষ। যে দেশগুলো বিশ্বে উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়াতে পেরেছে, সেই সব দেশই নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম করেছে।   নারী ও পুরুষের পাশাপাশি অবদানেই এগিয়ে চলেছে বিশ্ব। আমাদের দেশেও সেটাই হচ্ছে। তবে প্রতিবন্ধকতা আজও তাদের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংসার পরিচালনার সাথে সাথে তারা চাকরি, ব্যবসা করছে। গ্রামে প্রায়ই ছোটখাটো দোকান চালাতে দেখা যায় নারীদের। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তারা হয়রানির শিকারও হচ্ছে। সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধের শিকার যারা হচ্ছে, তাদের বড় অংশই হলো নারী। অর্থাৎ নারীর কর্মপরিধি বিস্তৃত হচ্ছে এবং সেই সাথে নারীর প্রতি বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ হওয়া উচিত ছিল উল্টো। মানুষ তার মননেও আধুনিক হচ্ছে। সেই আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া উচিত ছিল সবারই। সেই কঠোর পর্দাপ্রথা থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সভ্যতা পর্যন্ত নারীদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা করতে হয়েছে। আজও তা করতে হচ্ছে।   সিডও সনদের মূল কথা হলো, সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশে যুগ যুগ ধরে নারী যে ভূমিকা পালন করছে তার স্বীকৃতি প্রদান। সিডও সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার এত দশক পরও আমরা নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে পারিনি। নারী ও পুরুষের সমমর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় থাকার পাশাপাশি সমাজের দায়িত্বও রয়েছে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মানসিকতার পরিবর্তন না হলে পরিধি বাড়ার সাথে সাথে হয়রানিও বাড়তে থাকবে।   অগ্রাধিকার নয় সমাধিকার প্রয়োজন।পৃথিবীতে আজ আমরা যে অধিকারের কথা বলে চিৎকার করি, তা আদায়ের শুরুটা পৃথিবীর আলো দেখিয়ে একজন নারীই করেছে। দিন বদলের সাথে সাথে নারীদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করে নিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। নারীর কাজ যে শুধু সন্তান জন্মদান নয়, তা বোঝাতেই কেটে গেছে অনেক বছর। নারীদের কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। ঘরের কোণ থেকে বের হয়ে আজ মহাশূন্য পর্যন্ত তাদের পদচিহ্ন রাখছে সফলতার সাথে। তবে কাজের ক্ষেত্র বাড়লেও কমেনি নারীর ওপর সহিংসতার হার। বরং দিন দিন সহিংসতার নতুন নতুন ঘৃণ্য রূপ সমাজকে প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। যে সহিংসতা থেকে বাদ পড়ছে না তিন থেকে ত্রিশ বা তদূর্ধ্ব বয়সী নারীরা। তাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখা হচ্ছে, বাসে-ট্রামে গণধর্ষণ শেষে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এতসব করেও নারীরা আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সমান অংশীদার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অর্ধেক শক্তি।   নারীশক্তি বাদ দিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা অসম্ভব। অধিকারের দৃষ্টিতে দেখার অভ্যাস করতে হবে নারীদের। সেই অভ্যাসটা পরিবার থেকেই তৈরি করতে হবে। পরিবারেই যদি মেয়েদের নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় বা কোনো পুরুষ সদস্যের সাথে তুলনায় খাটো করা হয়, তাহলে সমাজেও তার প্রভাব পড়ে। বাসে, অফিসে, রাস্তায় সব সময় যদি নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং তাদের নিরাপত্তা পেতে আলাদা কোনো সাহায্য প্রয়োজন হয়, তাহলে এই পার্থক্য সুস্পষ্টই থেকে যাবে।   নারীর মেধা ও পারদর্শিতার স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করা ব্যক্তির এ সমাজে অভাব নেই। সমস্যা মূলত মানসিকতার। মানসিকভাবে বৈষম্যের মনোভাব দূর না করলে কোনো দিনই নারীর প্রতি বৈষম্য রোধ করা সম্ভব হবে না। অধিকার ফলানোতেই যেন তাদের আনন্দ সীমাবদ্ধ। বাল্যবিয়ে, যৌতুক, ধর্ষণ, রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানি, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিগ্রহ, পরিবারে অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রই যেন নারীদের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এই জায়গা থেকে বের হতে হলে সিডও সনদ বাস্তবায়নের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।   নারী অধিকার ও নারী বৈষম্য দুটি শব্দ একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধা। অধিকার শব্দটির ভেতর নারীর বলা, চলা, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র সমতা, মজুরি বৈষম্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীকে তার পূর্ণ অধিকার দেওয়া। নারীকে তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কেন সংগ্রাম করতে হয় বা হচ্ছে? কেন নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়? এর জন্য দায়ী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসিকতা। যে সমাজ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে এই সভ্যতাকে গ্রাস করেছে। সেখানে থেকে মুক্তি পেতে একটু দেরি হবে। কিন্তু একদিন ঠিক নারীর প্রতি সব বৈষম্য দূর হবেই।  

সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0