আনন্দের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। এর জন্য বিশেষ স্থান, কাল কিংবা পাত্রের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি সুন্দর মন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনের বাস্তবতাকে সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা। অথচ আমাদের সমাজে এই উদার দৃষ্টিভঙ্গির অভাবই অনেক সময় চোখে পড়ে। ফলে আমরা নিজের প্রাপ্তির আনন্দ উপভোগ না করে অন্যের প্রাপ্তি দেখে আক্ষেপ করি। এটি হয়তো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু যারা এই সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন, তারাই প্রকৃত অর্থে প্রশান্ত, পরিতৃপ্ত ও সুখী জীবন যাপন করেন। উন্নত দেশগুলোর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্ক, সৃজনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই উদ্দেশ্যে স্কুলগুলোতে নিয়মিত নানা আয়োজন করা হয়—কখনো শিক্ষার্থীদের জন্য, কখনো অভিভাবকদের অংশগ্রহণে। আমাদের সন্তানের স্কুলেও বিভিন্ন সময় এমন ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সুযোগ পেলেই আমরা সেসব অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করি। এতে শিশুদের যেমন আনন্দ হয়, তেমনি অভিভাবকদের মধ্যেও পারস্পরিক পরিচয়, মতবিনিময় ও সৌহার্দ্যের একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে আমাদের সন্তানের স্কুলে ‘Parents Mingle’ নামে এমনই একটি আয়োজন হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে স্কুলে পৌঁছে দেখি, প্রতিটি আসনের সামনে রঙিন কাগজে মোড়ানো একটি করে উপহারের বাক্স রাখা আছে। নিয়ম ছিল—যিনি যে আসনে বসবেন, সেই বাক্সটিই হবে তাঁর। আমি ও আমার স্ত্রী পাশাপাশি বসেছিলাম। বাক্স খুলতেই ভেতরে পেলাম একটি করে ফ্রেমে আঁকা ছবি এবং রং করার প্রয়োজনীয় উপকরণ। প্রত্যেকের জন্যই ছিল ভিন্ন ভিন্ন ছবি। আমার ভাগ্যে এলো একটি সুন্দর চিত্র, আর আমার স্ত্রীর ছবিটি ছিল আলাদা। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, সব অভিভাবকই শিশুর মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে নিজেদের ছবিতে রঙের ছোঁয়া দিচ্ছেন। কেউ গল্প করছেন, কেউ মিটিমিটি হাসছেন, আবার কেউ গভীর মনোযোগে রঙের পর রং বসিয়ে ছবিকে প্রাণবন্ত করে তুলছেন। আয়োজকেরা মাঝেমধ্যে এসে উৎসাহ দিচ্ছিলেন, স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করছিলেন এবং স্ন্যাকস পরিবেশন করছিলেন। প্রাণচঞ্চল সেই পরিবেশে সময় যেন ডানা মেলে উড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ঘোষণা এলো—যিনি যে ছবিতে রং করেছেন, সেই ছবিটিই তাঁর। অর্থাৎ সবাই নিজেদের রঙে সাজানো চিত্রটি স্মারক হিসেবে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন। ঘোষণাটি শুনে মনের অজান্তেই বলে উঠলাম, ওয়াও! মুহূর্তেই উপলব্ধি করলাম, আনন্দ সৃষ্টি করতে খুব বড় কিছুর প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু সুন্দর একটি ভাবনা। সেখানে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল না জয়-পরাজয়ের কোনো হিসাব। কেউ পরাজিত হননি, সবাই ছিলেন বিজয়ী। প্রত্যেকের হাতে ছিল নিজের সৃষ্টির আনন্দ, নিজের শ্রমের স্মৃতি এবং নিজের অর্জনের গর্ব। আয়োজকদের এই অনন্য চিন্তাভাবনা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে গেল। এই ছোট্ট আয়োজন আমাকে নতুন একটি শিক্ষা দিয়েছে, নতুন প্রেরণাও জুগিয়েছে। আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেয়া যায়। একটি সাধারণ রঙতুলিও মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে, নতুন সম্পর্কের সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে পারে এবং জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু নির্মল মুহূর্ত উপহার দিতে পারে। এটি ছিল আমার জীবনের এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। আগে কখনো এভাবে বসে ছবি আঁকার সুযোগ হয়নি। রঙের পরতে পরতে যেন নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করলাম। সেদিন উপলব্ধি করলাম, শিল্পী হওয়ার জন্য নিখুঁতভাবে আঁকতে জানতে হয় না; প্রয়োজন শুধু আনন্দ নিয়ে রঙ ছড়িয়ে দেওয়ার সাহস। হয়তো সেদিনই নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক নতুন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। সেই রঙিন সময় আজও মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলো অনেক সময় রঙে নয়, আনন্দে আঁকা হয়।
আমি ছোটবেলায় একটা গল্প শুনতাম, মহাভারতের গল্প। দ্রৌপদীর অক্ষয় পাত্রের গল্প। যত মানুষই আসুক, যত ক্ষুধার্তই হোক, সেই পাত্র থেকে অন্ন ফুরিয়ে যেত না। তখন মনে হতো, কী আশ্চর্য এক কাহিনি! পরে বড় হয়ে বুঝলাম, আসল আশ্চর্য পাত্রে ছিল না। আশ্চর্য ছিল সেই সমাজে, যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ানোকে অলৌকিকতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। কারণ মানুষ খুব আগেই বুঝেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর যন্ত্রণা মৃত্যু নয়, ক্ষুধা। কিন্তু আজকের সমাজে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা সেই প্রাচীন শিক্ষাটুকু হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ক্ষুধাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখেছি। রাস্তার পাশে একটি শিশু না খেয়ে বসে আছে, এটি আর আমাদের বিস্মিত করে না। একজন বৃদ্ধ মানুষ ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছে, এটি আর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না। দিনমজুরের সন্তান স্কুলে না গিয়ে হোটেলে থালা ধুচ্ছে, এটিও আমাদের কাছে এখন সাধারণ দৃশ্য। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা এসবকে সমস্যা হিসেবেও দেখি না। আমরা মনে করি এটাই বাস্তবতা। এটাই নিয়তি। আমার প্রশ্ন হলো, নিয়তি কার? যে শিশুটি জন্মের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, তার? যে বৃদ্ধ মানুষটি সারা জীবন শ্রম দিয়েছে, তার? নাকি সেই সমাজের, যে সমাজ সম্পদের পাহাড় গড়তে গড়তে মানুষের মৌলিক অধিকারকে বিসর্জন দিয়েছে? আমরা প্রায়ই ব্যক্তির ব্যর্থতার গল্প শুনি। বলা হয়, মানুষ পরিশ্রম করলে সফল হবেই। কিন্তু আমরা খুব কমই শুনি কাঠামোগত বৈষম্যের গল্প। আমরা শুনি না সেই শিশুটির কথা, যে জন্মের প্রথম দিন থেকেই অন্য একটি শিশুর চেয়ে কয়েক হাজার ধাপ পিছিয়ে জন্মায়। একটি শিশুর জন্য জন্মদিনে বই, কম্পিউটার, ব্যক্তিগত শিক্ষক অপেক্ষা করে। আরেকজনের জন্য অপেক্ষা করে অপুষ্টি, অশিক্ষা আর অনিশ্চয়তা। তারপর একদিন আমরা দুজনকে একই দৌড়ের মাঠে দাঁড় করিয়ে বলি, যার যোগ্যতা বেশি সে জিতবে। এই ভণ্ডামিকে আমরা মেধার প্রতিযোগিতা বলি। ধর্মগ্রন্থে বারবার দানের কথা বলা হয়েছে। অন্নদানকে শ্রেষ্ঠ দান বলা হয়েছে। উপনিষদে ‘অন্নং ব্রহ্ম’ অর্থাৎ অন্নই ব্রহ্ম বলা হয়েছে। বহু শাস্ত্রে ক্ষুধার্তকে অন্ন না দেয়াকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ প্রাচীন মানুষ জানত, ক্ষুধার সামনে ধর্ম, দর্শন, নীতি, আদর্শ সবকিছুই দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে যত দূরে সরে গেছি, ধর্মের প্রদর্শনী থেকে ঠিক ততটা দূরে যাইনি। মন্দিরে সোনার ঘণ্টা ঝুলছে, কিন্তু মন্দিরের বাইরের মানুষটি না খেয়ে আছে। পুজোর সময় আমরা বিশাল আয়োজন করি, কিন্তু আশপাশের ক্ষুধাকে দেখতে পাই না। আমরা পুণ্যের হিসাব রাখি, কিন্তু মানুষের হিসাব রাখি না। সমাজের সবচেয়ে বড় পাপ হয়তো চুরি নয়, ডাকাতি নয়, এমনকি দুর্নীতিও নয়। সমাজের সবচেয়ে বড় পাপ হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের মর্যাদা আর ক্ষুধার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়। যেখানে একজন মা নিজের সন্তানকে না খাইয়ে ঘুম পাড়ায়। যেখানে একজন বাবা সারা দিন শ্রম দিয়েও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারে না। তখন ক্ষুধার্ত মানুষটি শুধু খাবার হারায় না। সে ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্ন হারায়, আত্মসম্মান হারায়, ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস হারায়। আর যে সমাজ মানুষের কাছ থেকে এই জিনিসগুলো কেড়ে নেয়, সে সমাজ যত উন্নয়নের গল্পই বলুক, তার সভ্যতার দাবি সব সময়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ইতিহাসে অনেক পাপের বিচার হয়েছে। অনেক অত্যাচারীর নাম লেখা আছে কালো অক্ষরে। কিন্তু আমার মনে হয়, ভবিষ্যতের ইতিহাস যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তাহলে সে আমাদেরও একদিন প্রশ্ন করবে, যখন খাদ্যের অপচয় পাহাড়ের মতো জমছিল, তখন কেন মানুষ ক্ষুধায় ঘুমাত? আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হয়তো আমরা বুঝব, ক্ষুধার্ত মানুষের খালি থালা তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতীক ছিল না। সেটি ছিল পুরো সমাজের বিবেকের বিরুদ্ধে দাখিল করা একটি নীরব অভিযোগপত্র।
একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা নিরাপদ, আনন্দময় ও সম্ভাবনাময়। তার হাতে থাকার কথা বই, খেলনা ও স্বপ্ন—শ্রমের বোঝা নয়। বিদ্যালয়ের পথে থাকার কথা তার পা—ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে নয়। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু শিশুর শৈশব এখনো দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও সহিংসতার মতো সংকটে আটকে আছে। এ সংকট কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; দেশের শিশুদের জীবনমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রকাশিত পরিসংখ্যানও তা স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জনশুমারির ভিত্তিতে দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮৭ লাখ—মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো প্রান্তিক সামাজিক উদ্যোগ নয়; এটি দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় দায়িত্ব। শিশুর অধিকার কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের বেঁচে থাকা, বিকাশ, সুরক্ষা ও অংশগ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু আইনে অধিকার স্বীকৃত হওয়া আর বাস্তবে সেই অধিকার ভোগ করতে পারা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রতিটি শিশুর কাছে এই অধিকারগুলো কতটা পৌঁছাচ্ছে? দারিদ্র্য শিশুর জীবনে শুধু অভাব তৈরি করে না; অনেক সময় তার শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের স্বাধীনতাও সংকুচিত করে। পরিবারের আয় কমে গেলে কোনো শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যায়, কেউ দীর্ঘ সময় শ্রম দেয়, আবার কোনো মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে পরিবারের সংকটের সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিবিএস ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক অগ্রগতির পাশাপাশি শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে। ইউনিসেফে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের জরিপের তুলনায় শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ বেড়েছে। এ সংখ্যা কেবল শ্রমে যুক্ত শিশুর হিসাব নয়; এর পেছনে রয়েছে হারানো পড়াশোনা, সীমিত অবসর, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংকুচিত সুযোগ। তাই শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, পরিবারের আয় বৃদ্ধির সুযোগ এবং মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সময়টি তার শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। অথচ বাল্যবিবাহ অনেক মেয়েশিশুকে সেই সময়ের আগেই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দায়িত্বে ঠেলে দেয়। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণেও দীর্ঘমেয়াদি বাধা তৈরি করতে পারে। MICS ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছিল। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। অর্থাৎ কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু প্রায় অর্ধেক তরুণীর বাল্যবিবাহের অভিজ্ঞতা এখনো বাস্তবতার একটি বড় অংশ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু আইন বা সচেতনতামূলক প্রচার যথেষ্ট নয়। মেয়েশিশুর বিদ্যালয়ে থাকা, নিরাপদ পরিবেশ, পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। শিক্ষা শিশুর অধিকার; কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই শিক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। শিশু সেখানে থাকছে কি না, কী শিখছে এবং তার শেখার পরিবেশ কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফের MICS ২০২৫-ভিত্তিক বাংলাদেশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে। একই তথ্যসূত্রে প্রাথমিক স্তরের সমাপনী হার ৮৩.৭ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ৬৯.৩ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৪৩.৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। সব শিশু বিদ্যালয়ে গেলেও প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করছে না, আর শিক্ষার উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর পথে অনেকেই পিছিয়ে পড়ছে। তাই শিক্ষানীতির লক্ষ্য শুধু ভর্তি বাড়ানো নয়; শেখার মান উন্নত করা, ঝরে পড়া কমানো এবং মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করাও হতে হবে। শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব। কিন্তু ঘরকেও সব সময় শিশুর জন্য নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। MICS ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ জরিপের আগের এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৮৮.৮ শতাংশ। হার কিছুটা কমলেও বিপুলসংখ্যক শিশুর জীবনে সহিংস শাসন এখনো উদ্বেগজনক বাস্তবতা। শারীরিক শাস্তি, নির্যাতন, বুলিং ও অনলাইন হয়রানি শিশুর আত্মবিশ্বাস, মানসিক সুস্থতা এবং অন্যের ওপর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনেক শিশু ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশও করতে পারে না। তাই শিশুকে শুধু অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে তার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হবে, গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে এবং অভিযোগের কারণে তাকে দোষারোপ বা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে না। একটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম ধাপগুলোর একটি হলো তার আইনগত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। জন্মনিবন্ধন শুধু একটি সনদ নয়; এটি পরিচয়ের প্রমাণ এবং বিভিন্ন সেবা ও অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। MICS ২০২৫ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫৯.২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন রয়েছে। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর জন্ম এখনো সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। এই ব্যবধান কমাতে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ, সহজলভ্য এবং প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের মতামত শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। বয়স কম বলে কোনো শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্বহীন মনে করা উচিত নয়। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে বয়স ও পরিপক্বতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মতামত প্রকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। শিশু শুধু সুরক্ষার প্রয়োজনীয় একজন মানুষ নয়; সে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও প্রত্যেক নাগরিকের। সরকারকে আইন ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা এবং মানসম্মত জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়কে হতে হবে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। গণমাধ্যমকে শিশুকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তার মর্যাদা, গোপনীয়তা ও সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল জগতেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ইন্টারনেট শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে সাইবার বুলিং, প্রতারণা, হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। তাই শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের শিশুদের বিষয়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যান একদিকে অগ্রগতির চিহ্ন দেখায়, অন্যদিকে স্পষ্ট করে যে কাজ এখনো অনেক বাকি। বাল্যবিবাহের হার কমেছে, কিন্তু এখনো প্রায় অর্ধেক তরুণীর বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। একই সময়ে শিশুশ্রমের হার বেড়েছে এবং ঘরে সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতা এখনো ব্যাপক। এই পরিসংখ্যানগুলোকে কেবল প্রতিবেদনের সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর জীবন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুস্থ, কতটা শিখছে এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে—তাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমাদের প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান, পরিবারের আয়, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে সীমাবদ্ধ হবে না। শিশুর অধিকার রক্ষা কোনো একক প্রকল্পের লক্ষ্য নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত। প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়—একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে রক্ষা করা।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, মফস্বল কিংবা ছোট শহরের মাঠে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু-কিশোর খেলাধুলা করে। কারও পায়ে থাকে ফুটবলের জাদু, কেউ দৌড়ে অন্যদের ছাড়িয়ে যায়, কেউ ব্যাট-বল হাতে দেখায় অসাধারণ সম্ভাবনা। কিন্তু প্রতিভা থাকলেও সবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয় না। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, সুযোগ-সুবিধার সংকট কিংবা সঠিক সময়ে প্রতিভা শনাক্ত না হওয়ার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হারিয়ে যায়। এই বাস্তবতায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তৃণমূল পর্যায় থেকে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের ধাপে ধাপে উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ক্রীড়া পরিদপ্তর কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে। ‘নতুন কুঁড়ি’ নামটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিভা অন্বেষণের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। সেই ভাবনাকে ক্রীড়াঙ্গনে নিয়ে এসে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’। ২০২৬ সালের প্রথম আসরে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি ইভেন্টের মাধ্যমে প্রতিভা যাচাই করা হয়। দ্বিতীয় আসরে আরও দুটি ইভেন্ট যুক্ত হয়েছে ভলিবল ও টেবিল টেনিস; এখন মোট ১০টি ইভেন্ট নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে। শুধু বড় শহর নয়, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে খেলোয়াড় বাছাইয়ের কাঠামো তৈরি হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবানদের সামনে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই; বরং অনেক সময় প্রতিভা খুঁজে বের করার যথাযথ ব্যবস্থা থাকে না। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই—এটি প্রতিভাকে মাঠ থেকে তুলে এনে একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। একজন শিশু হয়তো পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে ঢাকায় গিয়ে কোনো একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে পারে না। কিন্তু তার গ্রামের মাঠেই যদি প্রতিভা শনাক্ত করা হয়, তাহলে তার সামনে জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার দরজা খুলে যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ কেবল খেলোয়াড় তৈরি করে না; বরং একটি দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। ভবিষ্যতে জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য খেলোয়াড় তৈরির ভিত গড়ে উঠতে পারে এখান থেকেই। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলার সবচেয়ে বড় সুফল হলো শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। নিয়মিত খেলাধুলা শরীরকে সক্রিয় রাখে, সহনশীলতা বাড়ায় এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। তবে খেলাধুলার উপকারিতা শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠে একজন শিশু শেখে সময় মেনে চলতে, নিয়ম ও শৃঙ্খলা মানতে, জয়-পরাজয় মেনে নিতে, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে, নেতৃত্ব দিতে, প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে এবং ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে। ফলে একজন ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোন, গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটায়। এর ফলে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাঠকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগও কমছে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ মাঠকে আবার শিশু-কিশোরদের মিলনস্থলে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই এলাকার বিভিন্ন পরিবারের সন্তান একসঙ্গে খেলবে, প্রতিযোগিতা করবে এবং বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রীড়া সংগঠক, কোচ, রেফারি ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। আমি নিজে একজন খেলোয়ার ছিলাম। সেখান থেকে ভলিবল রেফারি, কোচ, ক্রীড়া সংগঠক হয়েছি। আমি বিভিন্ন জায়গায় ভলিবল নিয়ে কাজ করার সময় লক্ষ করেছি, গ্রামের খেলোয়াররা শহরের খেলোয়াদের থেকে বেশি চাপ নিতে পারে এবং এদের মধ্যে প্রতিভা আছে। সেটিকে বিকাশিত করতে দরকার ভালো পরামর্শ ও সুযোগ। যেটি তৈরি করে দিচ্ছে নতুন কুড়ি স্পোর্টস। আমাদের আশপাশের অনেক খেলোয়ার আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, এটি একটি প্রতিবন্ধকতা। আমার তত্ত্বাবধানে একজন খেলোয়ার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, সে লেখাপড়ার পাশাপাশি তার বাবার হোটেলে কাজ করছে। ফলে তার নিয়মিত প্র্যাকটিসে কিন্তু একটা প্রভাব পড়ছে এবং তার শারীরিক ও মানসিকভাবে একটা চাপ পড়ছে। অথচ সে কিন্তু একজন প্রতিভাবান খেলোয়ার। গত সিজনে সে খুলনা বিভাগীয় পর্যায় মার্শাল আর্ট (উশু) ৪৫+ ওজনে তৃতীয় হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস একটি নতুন সম্ভাবনার নাম। আজকের যে শিশু উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের একটি মাঠে দৌড়াচ্ছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হয়তো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে। হয়তো কোনো একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, স্বচ্ছ বাছাই এবং নিয়মিত পরিচর্যা। একটি কুঁড়িকে শুধু চিহ্নিত করলেই ফুল ফোটে না—তার জন্য প্রয়োজন মাটি, পানি, আলো ও পরিচর্যা। ঠিক তেমনি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ যে প্রতিভাগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তাদের যথাযথ পরিচর্যা করতে পারলেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ফুটতে পারে নতুন নতুন সম্ভাবনার ফুল। ‘নতুন কুঁড়ি’ তাই শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম নয়—এটি হতে পারে আগামীর চ্যাম্পিয়ন তৈরির একটি স্বপ্নযাত্রা।
বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে অন্যতম। কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুতর, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যা উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের শিশুদের সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একটি মারাত্মকভাবে জলবায়ুঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০ লাখ শিশুর বয়স পাঁচ বছরের কম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়া, বন্যা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যান্য অভিঘাতের শিকার হচ্ছে শিশুরা। এদের মধ্যে অনেক শিশু শহরের বস্তিগুলোতে চলে যাচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। ফলে তারা শোষণমূলক শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং পাচারের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে দুর্যোগপ্রবণ জেলাগুলোতে বসবাস করছে ১ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি শিশু। তারা ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকিতে রয়েছে। নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগের কারণে পরিবারগুলো স্থানান্তরিত হলে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা হারায়। শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১ কোটি ৯৪ লাখ শিশুর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ শিশু নদীভাঙনের এলাকা কিংবা এর কাছাকাছি থাকে। ৪৫ লাখ শিশুর বসবাস উপকূলীয় এলাকায়, সেখানে ঘূর্ণিঝড়ের হুমকিতে থাকতে হয় তাদের। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে যে শুধু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে তাই নয়, এর কারণে উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে। ইউনিসেফ বলছে, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য হুমকি থেকে দরিদ্র মানুষকে বাঁচাতে এরই মধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের হুমকিতে থাকা শিশুদের সুনির্দিষ্ট চাহিদার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। বন্যাপ্রবণ এলাকার স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের ওপর যেন কোনো শোষণ-নিপীড়ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। জলবায়ু দুর্যোগে একটি পরিবারের আয় কমে গেলে কিছু শিশু শ্রমে যুক্ত হতে পারে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশ্বে বাল্যবিবাহপ্রবণ শীর্ষ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। ২০২০ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনমতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে শীর্ষে। ২০১৮ সালে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৫৯ শতাংশ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। একের পর এক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত উপকূলের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা যেন আরও খারাপ হচ্ছে। ফলে অভিভাবকরা কিশোরী মেয়েটাকে আর ঘরে রাখতে চাচ্ছেন না। দ্রুত বিয়ে দেয়াটাই তাঁদের জন্য যেন অনেক বেশি নিরাপদ মনে করছেন। তাই অনেক পরিবার উপকূল ছেড়ে শহরে এসে কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করার ফলে বাল্যবিবাহের শিকার নারীদের জরায়ু সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবার আলাদা করে শিশুর জন্য কখনো ভাবে না। এর মধ্যে নতুন বিপদ মূল্যস্ফীতি। ফলে উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে দারিদ্র্যের সংখ্যা বাড়ছে। উপকূলের বহু দরিদ্র পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ঠাঁই নিচ্ছে শহরের বস্তি, নদীর তীরে বেড়িবাঁধ কিংবা রেললাইনের পাশে। নিজেরাই যেখানে জীবন ও খাদ্যের সংগ্রামে ক্লান্ত, সেখানে শিশুর পুষ্টির চিন্তা তাদের জন্য দুষ্কর। অপুষ্টির প্রধান কারণ দারিদ্র্য। উপকূলবর্তী জেলাসমূহে দারিদ্র্য বেশি, তাই উপকূলের শিশুরা অপুষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেও বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সদ্যপ্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে দেশের হাসপাতালগুলোয় তীব্রতম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা খারাপ হচ্ছে দিন দিন। কাজের ক্ষেত্র যেমন কমে যাচ্ছে, বিপরীতে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। কাজ হারিয়ে অনেক পরিবার চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বহু পরিবার শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। শহরে এসেও উদ্বাস্তু শিশুরা যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়ছে শিশুশ্রম। বাংলাদেশে জলবায়ু চরমতা ও দুর্যোগের কারণে ৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে স্কুল ছুটি দেয়া, ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র বন্যার মতো দুর্যোগ এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত গরম, পানিশূন্যতা এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকির কারণে বিদ্যালয়গুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে স্কুল ভবন পানিতে ডুবে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার কারণে স্বাভাবিক পাঠদান দীর্ঘকাল বন্ধ থাকে। এতে শিশুদের পড়াশোনায় স্থায়ী ছেদ পড়ে এবং তারা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনা ও স্থানান্তরের কারণে উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আয়ের উৎস নষ্ট হয়। ফলে দরিদ্র পরিবারের পক্ষে শিশুদের পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আর শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকে অনেক এলাকা। বিশেষ করে হাওর, উপকূল, পার্বত্য ও নদীভাঙন অঞ্চল। এ চারটি জোনে শিশুরা দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আমাদের শিশুদের কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। যেমন পাহাড়ে আবাসিক স্কুল, হাওরে ভাসমান স্কুল, উপকূলে পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে তারা দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবে এবং তাদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হবে না অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে নবজাতক, সদ্যোজাত ও অল্পবয়সী শিশুদের জন্য। হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতাজনিত ডায়রিয়ার মতো উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে সৃষ্ট অসুস্থতায় এই বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় পরিবেশের তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাদের ছোট শরীর পরিবেশ থেকে দ্রুত তাপ শোষণ করে কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ঘামের মাধ্যমে সেই তাপ সহজে বের করতে পারে না। অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং সূর্যের আলোর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন গ্যাস বৃদ্ধি পায়। এটি শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুদূষণ শিশুদের স্বাস্থ্যে নানা সমস্যা তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে হাঁপানি, অ্যালার্জি, গর্ভকালীন জটিলতা, খাদ্যসংকট, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং বিকাশগত বিলম্ব। ২০২৩ সালের ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে শিশুদের হাঁপানির হার ৪-১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং অ্যালার্জিজনিত কারণে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনও বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে রোগবাহী পোকামাকড়ের বিস্তারও বাড়ছে। ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও জিকার মতো রোগ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বন্যার কারণে ডায়রিয়াজনিত রোগ বাড়ছে, যা ছোট শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। পাশাপাশি বন্যার পর বাড়িতে জমে থাকা আর্দ্রতা থেকে ছত্রাক জন্মায়, যা অ্যালার্জি বাড়াতে পারে। বায়ুদূষণও শিশুদের জন্য বড় হুমকি। এটি বিশ্বব্যাপী নবজাতকের প্রায় ২০ শতাংশ মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট দূষণ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং গাছপালায় পরাগ উৎপাদন বাড়িয়ে অ্যালার্জির প্রবণতা বাড়ায়। তা ছাড়া গরমে ওজোন গ্যাসের মাত্রা বাড়ে, যা শিশুদের হাঁপানির ঝুঁকি বাড়ায়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা অতিরিক্ত গরমের মতো আকস্মিক ও তীব্র দুর্যোগ মানুষের জীবন ও সম্পত্তিতে মারাত্মক আঘাত হানে, যার ফলে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার , তীব্র উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা দেখা দেয়। নদীভাঙন, লোনা পানির আগ্রাসন বা কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার কারণে মানুষের জীবনজীবিকা ব্যাহত হয়, যা তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও মানসিক অবসাদ সৃষ্টি করে। পরিবেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের মাঝে একধরনের নিরাশা ও অতিরিক্ত ভয়ের সৃষ্টি হচ্ছে, যা তাদের মানসিক সুস্থতাকে ব্যাহত করছে। বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উষ্ণতা বৃদ্ধি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আগুনে পুড়ে যাওয়া, দুর্যোগ—এসব ঘটনা মানুষের মধ্যে গভীর মানসিক চাপ ও ট্রমা সৃষ্টি করছে।পরিবেশগত অবনতির দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও অনিশ্চয়তা মানুষের মনোবল ধ্বংস করছে। এই সংকট মোকাবেলায় শুধু পরিবেশগত পদক্ষেপ নয়, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সুরক্ষাও জরুরি হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর বন্যা, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশুর জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিশ্চিতভাবেই শিশুদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বেশি দেরি হওয়ার আগেই শিশুদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরিভাবে কাজ করার এবং তাদের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো প্রশমিত করার জন্য সমন্বিত দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই-বা কার? সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯টি শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮টি শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না। সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা একধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর। ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। শিশুরা নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সব সময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে। জিডি নেয়াই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন। সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক। প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেউ তাঁদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে, তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি। একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে। ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে। হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে। এটি শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ—বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও। শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম—সবারই ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়। এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয়—সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে। শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে। শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়, ‘শিশুটি কোথায়?’ আরও জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?’ আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। এখন কর্তব্য অবহেলাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া বা তার পক্ষে সাফাই গেয়ে তাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে সেটি নেহাতই অপপ্রয়াস। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের সামনে দাঁড়ানো সেই আয়না, যা আমাদের সিস্টেমের নগ্নতাকে রূঢ়ভাবে প্রকাশ করে। এ সত্যের দর্পণে আমরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসার মান, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও দেখতে পাই। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর এক নামি-দামি হাসপাতালে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের করুণ মৃত্যু চিকিৎসাব্যবস্থায় কথিত অবহেলা নিয়ে জনমনে আবারও একটি ভয়ংকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের এই তথাকথিত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটুকু নিরাপদ? আভানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুরোনো শঙ্কাকে নতুন করে সামনে আনলেও এর সিলসিলা বহুকাল ধরে জারি রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর প্রসবব্যবস্থা, শিশুর অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং এ সম্পর্কে উদাসীনতা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। সিস্টেমের নগ্ন মারপ্যাঁচের খেসারত ইতোমধ্যে হামের মহামারির মধ্য দিয়ে দেশের অগণিত শিশু জীবন দিয়ে চুকিয়েছে। সেই রেশ মিটতে না মিটতেই আভানের ঘটনা জনমনে ভয়ংকর ধাক্কা দিয়েছে। শিশুটির পরিবারের পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রয়োগে গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার নেগেটিভ ফল আসার পরও কেন শিশুটিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হলো, কেন তার শারীরিক অবস্থার প্রকৃত হালচাল পরিবারের কাছে গোপন করা হলো, এসব প্রশ্ন কেবল আভানের পরিবার নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারকেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া, মনে আতঙ্কের ঢেউ। আভানের মৃত্যুর নেপথ্যে আসল কোন সত্য লুকিয়ে আছে, চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল কি না, শিশুটিকে দেয়া চিকিৎসা সিদ্ধান্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, এসবের জবাব কেবল সঠিক তদন্তেই উদঘাটন সম্ভব। তাই অভিযোগ সত্য ধরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও অন্যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য উদঘাটনের অধিকার। আর এই অধিকার জনগণের। জনগণের এই যৌক্তিক দাবিকে মাথা পেতে নিয়ে সঠিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করাই একটি দক্ষ রাষ্ট্র প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। একজন রোগীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারের প্রথম স্বাভাবিক কৌতূহল হবে, ‘কেন?’ অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ‘কেন’র জবাব খুঁজে পাওয়ার পথ মোটেও স্বচ্ছ ও সরল নয়, বরং অস্বচ্ছতায় ভরা এক প্যাঁচালো গোলকধাঁধা। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, হাসপাতালের আইসিইউসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যক্তিদের মুনাফালিপ্সার মতো অভিযোগও আলোচনায় আসে। প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক, চিকিৎসা কি কেবল সেবা, নাকি অধিকার? বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৬.৫, যা ২০২৪ সালে হ্রাস পেয়ে ৩০.৫ এ দাঁড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এই অগ্রগতি একই সঙ্গে আমাদের সামনে নতুন দায়িত্বের ভিত তৈরি করেছে। শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারা যদি প্রথম সাফল্য হয়, তবে তার পরের সাফল্য হবে নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে প্রায় ২২। অর্থাৎ শিশুমৃত্যু কমলেও ঝুঁকি আজও রয়ে গেছে। তবে এই ঝুঁকি কেবল রোগের নয়, ব্যবস্থারও। ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অদক্ষতা, ওষুধের ভুল প্রয়োগ, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবারের কাছে গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক মানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্বাস্থ্যসেবা বলতে কেবল হাসপাতাল তৈরি করে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরে তোলাকে বোঝায় না। কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল বিষয় হলো সঠিক রোগ নির্ণয়, দক্ষ জনবল, যথাযথ চিকিৎসা প্রোটোকল, পর্যবেক্ষণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভুল হলে তার সঠিক জবাবদিহি। চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানও আমাদের দেশের অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। ২০২৫ সালের ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫৪/১০০ এবং প্রায় ৪১.৭ শতাংশ মানুষ নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর আরেকটি বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রকাশনায় দেখা যায়, দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজেকেই বহন করতে হয়। অতএব, মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সময় কেবল অসুস্থতার ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকির এক অদৃশ্য মানসিক বোঝাও বহন করে। একটি শিশুর চিকিৎসা ব্যর্থ হলে পরিবার কেবল সন্তানকে হারায় না, অনেক পরিবার একই সঙ্গে হারায় সঞ্চয়, ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়, এমনকি জীবনের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর্থিক বিনিময়ে যে চিকিৎসাসেবা আমরা পাই, তার সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, আস্থা ও মৌলিক অধিকার। পৃথিবীর কোনো দেশেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে গরমিল একেবারেই নেই, এমন নয়। একজন চিকিৎসকও রক্তমাংসে গড়া মানুষ। রোগ নির্ণয়ে জটিলতা থাকতেই পারে। চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাও বলে, চিকিৎসাজনিত জটিলতা ও অবহেলা এক নয়। সুতরাং এগুলোকে ‘লেজে গোবরে মেখে’ এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো রোগী মারা গেলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসককে দায়ী করাও ভুল, আবার ভুল চিকিৎসা বা কর্তব্য অবহেলার অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও অগ্রহণযোগ্য। এই ধোঁয়াশা দূর করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো। ২০২৬ সালের প্রকাশিত এক আইনবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে রোগীর পরিবারের কাছে তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চিকিৎসাজনিত অ্যাডভার্স ইভেন্ট প্রকাশের জন্য বর্তমানে সুস্পষ্ট স্ট্যাটুটরি ডিউটি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। এখানেই এখন বিশেষভাবে ভাবতে হবে। রোগীর স্বজন তাদের সন্তান বা স্বজনের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে তার সঠিক জবাব পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ‘এটা জটিলতা ছিল’ অথবা ‘আমরা সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী করেছি’ বলে দায়সারা জবাব দিয়ে দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। রোগীর পরিবারের সংশয় কাটাতে চিকিৎসার নথি, ওষুধের তালিকা, পরীক্ষার ফল, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা ও নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক অভিযোগ দাখিল করার পর কতটা সহজে, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিকার পাবেন? শুধু অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়। গুরুতর চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নথি সংরক্ষণ এবং পরিবারের কাছে তা প্রদানের নিশ্চয়তা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, হাসপাতাল ও চিকিৎসকের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ, অবহেলা প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি মানে চিকিৎসকদের ভয় দেখানো নয়, বরং ভুলের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসার পরিবেশ তৈরি করা। আমাদের মাঝে সামাজিক স্মৃতির এক অদ্ভুত সমস্যা বিরাজমান। একটি শিশু মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম নেয় ক্ষোভ। মানুষ বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। কয়েক দিন কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়। অতঃপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে ভুলিয়ে দেয়। হিসাবের খাতায় যোগ হয় কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু ওই সংখ্যার নেপথ্যে থাকে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। আভান হয়তো কোনো পরিসংখ্যানের একটি অংশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরিবারের কাছে সে নিছক কোনো সংখ্যা নয়। সে ছিল একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী। এই আবেগটাকেই রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। হতে হবে সংবেদনশীল। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য বলতে কয়টি হাসপাতাল মাথা তুলেছে, কতটি অত্যাধুনিক আইসিইউ আছে, কতজন দক্ষ চিকিৎসক আছেন, শুধু তা দিয়ে সাফল্য বিচার করলে গোটা গণিতটাই ভুল হবে। এই সাফল্য পরিমাপ করতে হবে একজন সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা অকপটে বলতে পারছেন কি না এবং সত্য জানতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে কি না, তার ওপর। একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে রোগীকে শুধু রোগী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হয়। আমরা চাইব, আভানের মৃত্যুর এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায় দ্রুত নির্ধারিত হোক। অভিযোগে অসততা থাকলে সেটিও সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠুক। তবে কোনো অবস্থাতেই সত্যকে যেন আরেকটি শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কবরের আঁধারে দাফন হতে না হয়। কারণ, আজকের প্রশ্নটি শুধু আভানের জন্য নয়, আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্য। ‘হাসপাতালের ফটক পেরুলে একজন নাগরিক কি কেবলই চিকিৎসাটুকুই পাবেন, নাকি তার সঙ্গে নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারেরও ন্যায্য ভাগীদার হবেন?’ এ প্রশ্নের জবাব না মিললে অঢেল উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার মাঝেও প্রশ্নটি আমাদের উত্ত্যক্ত করেই চলবে, ‘আমরা কি তবে সব সময়ই শেষ অবধি কেবল হিসাবের খাতার এক মামুলি সংখ্যাই রয়ে যাব?’
সন্ধ্যা ছয়টার ডাক্তার এখনো আসেনি। ঘড়িতে সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। হাসপাতালের করিডরে বসে আছি চেম্বারের ঠিক পাশে। সামনে লম্বা বেঞ্চ। বেঞ্চভরতি মুখ। প্রতিটি মুখ একটা গল্প। কেউ পড়ছে না, তবু পড়া যায়। বাম দিকে বৃদ্ধ লোকটা। হাতে পুরোনো একটা পলিথিন। ভেতরে রিপোর্ট। চোখ দুটো ফোলা। রাত জেগেছে বোধহয়। ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড় হয়েছে কি না, সেই হিসাব কষছে মনে মনে। ডাক্তার যখন বলবে ‘তিন লাখ লাগবে’, তখন মুখটা কেমন হবে, আমি আগেই দেখে নিচ্ছি। ডান দিকে একটা মেয়ে। বয়স কুড়ি হবে। কোলে ছয় মাসের শিশু। শিশুটা কাঁদছে না, চুপ। চুপ করে থাকাটাই ভয়ের। মেয়েটা বারবার ওড়নার আঁচলে মিশুর কপাল মুছছে। ঘাম নাকি জ্বর, বোঝা যায় না। মাঝখানে একটা লোক। হাতে মোবাইল। বারবার কাউকে ফোন দিচ্ছে, “ভাই, দুই হাজার ম্যানেজ করতে পারবা? ডাক্তার বলছে আজকের ভেতর জমা দিতে হবে।” ফোনের ওপাশে কী উত্তর আসে জানি না। লোকটার মুখটা আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে। আমি মানুষের মুখ পড়ি। এটাই আমার অভ্যাস। হাসপাতালে এলে বোঝা যায়, কষ্টের হাজার রকম রং আছে। সাদা বেডশিটের নিচে লুকানো থাকে লাল রক্ত, কালো দেনা, ধূসর অপেক্ষা। হঠাৎ করিডরে একটা নড়াচড়া। ডাক্তার এসেছেন। সাদা অ্যাপ্রোন, মুখে ক্লান্তি। রোগীর ঢল তাঁকে গিলে নেয়। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। আমার পালা আসবে। আমাকে বসিয়ে রেখে আমার স্বামী গেছে ওষুধ কিনতে। আমি মোবাইলের নোটপ্যাড খুলি। লিখতে চাই, কিন্তু চোখ আটকে যায় সামনের দৃশ্যে। হঠাৎ একটা আর্তনাদ। গগন বিদারি। ‘ও আমার সোনা! কথা ক সোনা! চোখ মেলা তাকা!’ হাসপাতালের ফ্লোর, দেয়াল, বাতাস, সব কেঁপে ওঠে। একজন মা। কোলে দুই-আড়াই বছরের শিশু। নিথর। চোখ বোজা। গায়ে লাল লাল গুটি। হামের গুটি। মায়ের চুল এলোমেলো, জামা ভেজা ঘামে। পাশে সম্ভবত বাবা। চোখ শুকনা। বাবারা কেঁদে ফেলতে পারে না, তাই তাদের কষ্টটাই সবচেয়ে ভারী হয়। মা বুক চাপড়াচ্ছে, ‘ও আমার জাদু, চোখ খোল বাবা। একবার মা বল। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শুধু তুই কথা ক।’ চারপাশে জমে যায় মানুষ। কেউ সান্ত্বনা দেয়, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয় কষ্টে।। সান্ত্বনার ভাষা ফুরিয়ে গেছে। আমি উঠে যাই। শুনি। কয়দিন ধরে জ্বর। সারা শরীর গোটায় ভরে গেছে। গ্রামের হাসপাতালে নিয়ে গেছে। বলেছে, ‘হাম’ হয়েছে, ওষুধ নাই। রেফার করে দিয়েছে শহরে। শহরের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। অক্সিজেন নাই, বেড নাই, ডাক্তার নাই, টিকা নাই — এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে মা-বাবার পা ক্ষয়ে গেছে। শেষে এই হাসপাতালে। ডাক্তার এসে নেড়ে দেখলেন। স্টেথোস্কোপ রাখলেন। মাথা নাড়লেন, “সরি। অনেক দেরি হয়ে গেছে, মৃত।” মা আবার চিৎকার করে ওঠে, “দেরি? কার দেরি? আমার পোলা তিন দিন ধইরা জ্বরে পুড়তেছে! তোমরা কী করছ? তিন দিন ধইরা এ হাসপাতাল, সে হাসপাতাল করতেছি। আজ কন সরি। বড় বড় হাসপাতাল সাজাইছেন, টিকা নাই, ওষুধ নাই? ও আল্লাহ আমার জাদুরে ফিরাইয়া দাও।” মায়ের কান্না কলিজা কামড়ে ধরছে। কেউ উত্তর দেয় না। আমি ফিরে আসি আমার বেঞ্চে। হাত কাঁপে। মোবাইলটা পড়ে যেতে নেয়। মনে পড়ে কাগজের খবর। সরকারি হিসাবেই ৪০০ শিশু মারা গেছে হামের টিকার অভাবে। ৪০০। সংখ্যাটা শুনতে ছোট লাগে, কিন্তু একটা মা যখন ‘ও আমার সোনা, জাদু বলে বুক চাপড়ায়’, তখন বোঝা যায়, ৪০০ মানে ৪০০টি করিডর, ৪০০টি আর্তনাদ, ৪০০টি মৃত ঘর। আরও শিশু মৃত্যুর পথে। আমার সামনের বেঞ্চে বসা বৃদ্ধ লোকটা এখনো পলিথিন চেপে ধরে আছে। তার ছেলের অপারেশন হবে। তিন লাখ টাকা। টাকা জোগাড় না হলে তার ছেলেও হয়তো এই করিডরেই নিথর হয়ে যাবে। ডান দিকের মেয়েটার শিশু সন্তানটি এখনো চুপ। মেয়েটা ফিসফিস করে দোয়া পড়ছে। মাঝের লোকটা ফোন কেটে দিয়েছে। মুখে হাসির মতো কিছু একটা টানছে। হয়তো ধার পেয়েছে। আমি বুঝি, হাসপাতাল শুধু রোগ সারায় না। এখানে মানুষের মুখ, মন প্রকাশ হয়ে যায়। অপারেশনের ভয়ে কাঁপা বাবা। ওষুধের টাকার অভাবে কুঁকড়ে যাওয়া মা। টিকার অভাবে মরে যাওয়া শিশু। দুঃখ-কষ্টের ব্যথায় নীল মা, বাবার ক্লান্ত মুখ। আর আমি, যে শুধু দেখছি, লিখছি অথচ কিছুই করতে পারছি না। ডাক্তার ডাকেন আমার নাম ধরে। আমি উঠি। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকাই। মা এখনো শিশুটাকে বুকে চেপে ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। বাবা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। আত্মীয়রা মাথা নিচু করে আছে। করিডরের বাতাস ভারী। অক্সিজেনের চেয়েও ভারী মানুষের নিশ্বাস। আমি চেম্বারে ঢুকি। ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন, কী সমস্যা? আমি বলতে পারি না। গলা আটকে আসে। আমার কেন আসা আমি ভুলে যাই। এই মুহূর্তে আমার সমস্যা তো আমার শরীরে না। আমার সমস্যা এই করিডরে। এই মুখগুলোতে। আমি শুধু বলি, ডাক্তার, মানুষ বাঁচান। ডাক্তার চশমা ঠিক করেন। ক্লান্ত হাসি দেন, “চেষ্টা করছি। আপনিও দোয়া করেন। মালিক আল্লাহ, আমরা নিমিত্ত মাত্র।” বাইরে বেরিয়ে দেখি, মা এখনো বসে আছে। শিশুটার ঠান্ডা হাত ধরে। আমি আর লিখতে পারি না। শুধু মনে মনে বলি, হে সিস্টেম, একটা টিকা কি খুব দামি ছিল? একটা শিশুর জীবনের চেয়েও? ৪০০/৫০০/১০০০ টিকার দামের চেয়ে?কোটি কোটি টাকা নাকি একটা জীবন? সবকিছু ‘নিমিত্ত’ বললেই শেষ হয়ে যায়! ‘সিস্টেম’-এর কোনো দায় নেই? এই অকালে ঝরে যাওয়া শিশুরাই তো ছিল ভবিষ্যৎ। সিস্টেমের বলি এই শিশুরাই ছিল আগামী। এদের হাত ধরেই তো আগামী বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখত। হায় সিস্টেম!
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়। কিন্তু সেই মানুষগুলো নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালেই রাখে। কারণটা হলো পারিবারিক সমস্যা। যেসব শিশু একটি বিশৃঙ্খল পরিবারে বড় হয়, তারা নিজেদের মধ্যে শুধু ভয় খুঁজে পায়। সেই ভয় শিশুর মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। পারিবারিক সমস্যা, বাবা-মায়ের ঝগড়া শিশুর নিজসত্তাকে বোঝার ও উপলব্ধি করার শক্তি নষ্ট করে দেয়। সেই শিশু যখন স্কুলে যায়, বাইরের পরিবেশে মেশে, তখন তার কাছে সেই জগৎ ভিন্ন মনে হয়। সে সবকিছুতেই ভয় খুঁজে পায়। তার মনে হয়, সকলে তার শুধু ক্ষতিই করবে। এ চিন্তা নিয়েই সে বড় হয়। পারিবারিক সমস্যার ফলে একটি ছয়-সাত বছরের শিশু জীবনকে অভিশাপ মনে করে। সেই কোমল মনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যায়। সেই ছয়-সাত বছরের শিশু কোনো বন্ধু বানাতে পারে না। কারণটা হলো—তার মনে হয়, এই পৃথিবীটা যেন একটি ভয়ংকর জঙ্গল, যেখানে শুধু হিংস্র জন্তুরা থাকে। আর সেই হিংস্র জন্তুরা হচ্ছে ‘মানুষ’। শিশুর কোমল মনে এটি একটি ভয়ের কারণ। পারিবারিক সমস্যায় বেড়ে ওঠা শিশুটি যখন বড় হয়, কিশোর-কিশোরী হয়, তখনো তার মনের মধ্যে এ ভয় স্থান পেতে থাকে। এ ভয় তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়... তখনো তার চারপাশের ব্যস্ত পৃথিবীকে তার অচেনা লাগে। সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চায়, তবে প্রতিবারই সে নিরাশ হয়। পারিবারিক সমস্যা, বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ, ঝগড়া, এমনকি মারপিটও শিশুর মনে একধরনের ভয় সৃষ্টি করে, যা তার মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। সেই পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুটি প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠে। এর ফলে জন্ম নেয় দুর্বল মানসিকতা, দুশ্চিন্তা, ভয়, হতাশা, আত্মসন্দেহের মতো বড় বড় মানসিক সমস্যা। যার ফলে তারা বড় হলেও নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না, একাকিত্বের মাঝে জীবনযাপন করে। প্রতিবারই নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে, তবুও খুঁজে পায় না। সুশৃঙ্খল পরিবারের মধ্যে শিশু বেড়ে উঠলে ভবিষ্যতে সে একজন শিক্ষিত, স্বাভাবিক ও সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। একটি আদর্শ শিক্ষিত রাষ্ট্রের জন্য একটি শিশুকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে একটি স্বাধীন ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য শিশু কীভাবে বেড়ে উঠছে, সেদিকে লক্ষ করা উচিত। সবশেষে বলতে পারি, শিশুরা নিষ্পাপ ও সুন্দর। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে, ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলতে হবে এবং মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্য, শিল্প ও সংগীতের মতো সৃজনশীল চর্চাও শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে সংগীত এমন একটি মাধ্যম, যা আনন্দের সঙ্গে শিশুর মনন, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বিকাশে সহায়তা করতে পারে। সংগীত শেখার মাধ্যমে শিশুর মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির চর্চা হয়। একটি গান শেখার সময় তাকে কথা, সুর ও তাল মনে রাখতে হয়। নিয়মিত অনুশীলনের ফলে মনোযোগ দিয়ে কোনো বিষয় আয়ত্ত করার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গান শেখার মাধ্যমে শব্দের সঠিক উচ্চারণ ও ভাষার ব্যবহারেও শিশুর অনুশীলন হয়। সংগীত শিশুর আবেগ প্রকাশের একটি সুন্দর মাধ্যম। অনেক শিশু নিজের অনুভূতি সহজে কথায় প্রকাশ করতে পারে না। গান বা সুরের মাধ্যমে তারা আনন্দ, ভালো লাগা কিংবা মনের নানা অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পায়। ফলে সংগীত শিশুর মানসিক জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। অন্যদের সামনে গান পরিবেশন করাও শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। শুরুতে অনেক শিশু মানুষের সামনে কথা বলতে বা গান গাইতে সংকোচ বোধ করে। ধীরে ধীরে অনুশীলন ও পরিবেশনের সুযোগ পেলে সেই সংকোচ কমতে পারে। নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ শিশুকে আত্মবিশ্বাসী হতে উৎসাহিত করে। সংগীতচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধৈর্য ও নিয়মিত অনুশীলনের অভ্যাস। একটি গান এক দিনে ভালোভাবে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। বারবার অনুশীলন করতে হয়, ভুল থেকে শিখতে হয় এবং ধীরে ধীরে উন্নতি করতে হয়। এই অভ্যাস শিশুর জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দলবদ্ধভাবে গান শেখা ও পরিবেশনের মাধ্যমে শিশুর মধ্যে সহযোগিতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানের মানসিকতা তৈরি হতে পারে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের তাল মিলিয়ে গান করতে গিয়ে শিশু বুঝতে শেখে—একসঙ্গে কাজ করতে হলে অন্যের কথা শুনতে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সংগীতের মাধ্যমে শিশুর নিজের দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচয় ঘটে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, পল্লিগীতি, লোকসংগীতসহ বিভিন্ন ধরনের বাংলা গান আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছোটবেলা থেকেই এসব গানের সঙ্গে পরিচিত হলে শিশুর মধ্যে নিজের সাংস্কৃতিক শেকড় সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তবে শিশুদের সংগীতের শেখানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আনন্দময় পরিবেশ। শিশুর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে তার বয়স, আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী শেখানোর সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। প্রতিযোগিতার চেয়ে শেখার আনন্দ ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেয়া হলে সংগীতচর্চা শিশুর জন্য আরও উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নির্ধারিত হয় না। তার চিন্তা, অনুভূতি, সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধও ভবিষ্যৎ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা পরিবার ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সংগীত শুধু গান শেখায় না—এটি শিশুকে শুনতে, অনুভব করতে, অনুশীলন করতে, প্রকাশ করতে এবং নিজের ভেতরের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে শেখায়।
শৈশব মানুষের এক আজন্মলালিত স্বপ্ন। শৈশবের দুরন্তপনা, লুটোপুটি—সবই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়। কিন্তু শৈশবের এই দুরন্তপনার জায়গা দখল করেছে ভয়াবহতম স্ক্রিন আসক্তি। শিশু-কিশোররা এখন মাঠে খেলাধুলা না করে বরং মোবাইল কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে নষ্ট করছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যাদের থাকার কথা মাঠের দুরন্তপনায় মাতোয়ারা, তারাই আজ স্ক্রিনের সামনে নস্যাৎ করছে তাদের মূল্যবান সময়। বাংলাদেশে শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং এর আসক্তি নিয়ে সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ৮৩ শতংশ শিশু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপদ সীমার (দৈনিক ২ ঘণ্টা) চেয়ে বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। রাজধানীতে এই হার আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকায় বসবাসকারী ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী স্কুলগামী শিশুরা গড়ে দৈনিক প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা (প্রায় ৫ ঘণ্টা) মোবাইল, টেলিভিশন, কম্পিউটার বা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে ব্যয় করছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্তির ফলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একজন শিশুর শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি ও বিকাশে খেলাধুলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহারের ফলে চোখের সমস্যা, যেমন চোখ শুষ্ক হওয়া, চোখে জ্বালা, এমনকি মায়োপিয়া (কাছের জিনিস দেখার অস্পষ্টতা) এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাসও পেতে পারে। তা ছাড়া স্ক্রিন থেকে নিঃসৃত নীল আলো মেলাটোনিন হরমোন নষ্ট করে। যার ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। তা ছাড়া মেদবহুলতা এবং ঘাড় ও পিঠে ব্যথার অন্যতম কারণ এই স্ক্রিন আসক্তি। শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রেও স্ক্রিন আসক্তি এক মারণঘাতী রূপে আবির্ভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ৫ জন শিশুর মধ্যে ২ জন শিশু কোনো না কোনোভাবে স্ক্রিন আসক্তির ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। মনোবিজ্ঞানীদের মতানুযায়ী, শিশুরা চারপাশের পরিবেশ স্পর্শ করে, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি দেখে এবং বাস্তব যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষা ও আবেগ শেখে। স্ক্রিন কখনো মানুষের এই বাস্তব মিথস্ক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। ফলে একটা শিশুর স্বাভাবিক মনোজগৎ তৈরি না হয়ে এক স্ক্রিননির্ভর জগৎ তৈরি হয়। তা ছাড়া বর্তমানে দ্রুতগতির শর্ট ভিডিও বা রিলস শিশুদের মনোযোগ সুপ্ত অবস্থাতেই নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে তারা শিক্ষকের কথা শোনা, কোনো কিছু নতুন করে শেখার ব্যাপারে চরম অধৈর্যের পরিচয় দেয়। স্ক্রিন আসক্তির ফলে মনোযোগ কমে যাওয়া এবং চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্ত শিশুরা খুব দ্রুত হাইপার-অ্যাক্টিভ এবং খিটখিটে হয়ে যায়। যেকোনো ইচ্ছা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ না হলে তারা তীব্র ক্ষোভ বা জেদ প্রকাশ করে। বাস্তব জগতের ছোটখাটো মানসিক চাপ বা ব্যর্থতা নেয়ার মতো মানসিক সহনশীলতা তাদের তৈরি হয় না। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা তার জীবনকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করতে পারে পরবর্তী জীবনে, যা সম্পর্কে এখনই সচেতন হতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মই। স্ক্রিন আসক্তির ফলে শৈশবের খেলাধুলা কিংবা গল্প শোনার মতো কাজে শিশুরা আর আনন্দ পায় না। ডোপামিন হলো আনন্দ-অনুভূতি সৃষ্টির হরমোন, যা শিশুদের আসক্তির ফলে বেশি নিঃসৃত হচ্ছে। আর যেহেতু শিশুরা এখন গল্প শোনা কিংবা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে ঐভাবে পারদর্শী নয়, ফলে পরবর্তী সময়ে একাকিত্ব কিংবা অ্যাংজাইটির মতো সমস্যাগুলো জীবনের স্বাভাবিক পথে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিশুর এই আসক্ত জীবন পরবর্তীকালে শিশুর মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে। শিশুর স্ক্রিন আসক্তি ও মানসিক বিকাশ নিয়ে তথ্যগুলো সত্যিই চিন্তার বিষয়। এই পরিস্থিতি থেকে শিশুদের ফিরিয়ে আনা এখনকার সময়ে বাবা-মা এবং অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তবে অভিভাবকদের সচেতনতাই এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। অভিভাবকরা কঠোরভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ক্রিন টাইম মেনে ফোন, ল্যাপটপ বা টিভি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই কার্যকর উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন দেয়া যাবে না এবং ২–৫ বছরের শিশুদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা। এই টাইমলাইন কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য অভিভাবকদের খাবার ঘর এবং শোবার ঘরে কোনো রকম স্ক্রিন, যেমন ফোন, ল্যাপটপ বা টিভি ব্যবহার না করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখানো হতে পারে কার্যকর উপায়। তা ছাড়া শিশুদের আকর্ষণীয় বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন : বই পড়া, মাঠে খেলাধুলার সুন্দর সুযোগ তৈরি হতে পারে স্ক্রিন আসক্তি থেকে মুক্তির কার্যকর উপায়। একজন অভিভাবক নিজে ফোনে ডুবে থেকে কখনো তাঁর সন্তানকে স্ক্রিন আসক্তিমুক্ত করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনতে হবে। একজন সচেতন অভিভাবকের ভূমিকা পালন এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিন টাইম কমিয়ে পরিবারের সন্তানদের সময় দিন। এতে একদিকে যেমন কোয়ালিটি টাইম পাবে সন্তান, তেমনি স্ক্রিন আসক্তি থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে সন্তানকে। এ ছাড়া শিশুদের ডিভাইসে বিভিন্ন রকম কাস্টমাইজড শিশু-উপযোগী অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। ইউটিউব কিডস, গুগল ফ্যামিলি লিংকের মতো প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ ব্যবহার করা হতে পারে সমাধান। তা ছাড়া স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিন টাইম সেট করে দিলে শিশুদের ডিভাইস নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে একদিকে মা-বাবার দেখভাল করার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে, অন্যদিকে শিশুও স্বাভাবিকভাবে নির্দিষ্ট সময় ফোন কিংবা ডিভাইস ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে। শিশুরা সাধারণত অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে। শিশুদের সামনে তাই ডিভাইস যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করে বই পড়ার মতো অনুসরণীয় কার্যক্রম করলে শিশুও বই পড়া কিংবা খেলাধুলা করতে শিখবে। তা ছাড়া খাওয়া ও শোয়ার সময় ডিভাইস ব্যবহার একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে ঘরের মধ্যে ডিভাইস-ফ্রি জোন করা যেতে পারে। ফলে শিশুরাও কঠোরভাবে ওই জিনিসগুলো অনুকরণ করে স্ক্রিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে। তবে কখনো জোর করে ডিভাইস শিশুদের থেকে কেড়ে নেয়া উচিত নয়। এতে তারা জেদি হয়ে উঠতে পারে। তাই অভিভাবকদের ধৈর্য নিয়ে স্ক্রিন টাইম ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। একটি স্ক্রিন আসক্ত শিশুকে সুষ্ঠু, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকদের ভূমিকাই মুখ্য। তা ছাড়া নিয়মিত শিশুর দেখভাল করা, পর্যাপ্ত সময় প্রদান এবং শিশুদের মধ্যে আত্ম-উপলব্ধি জাগ্রত করার মাধ্যমে সম্ভব শিশুকে স্ক্রিনের আসক্তি থেকে মুক্ত রাখা। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এ যুগে স্ক্রিন আসক্তি যেন এক কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শৈশবের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো চঞ্চলতা। কিন্তু আজ মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা টেলিভিশনের করাল গ্রাসে যেন হারিয়ে যেতে বসেছে এই স্বাভাবিক শৈশবের দুরন্তপনা কিংবা চাঞ্চল্য। আগামী প্রজন্মের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে স্ক্রিনের আলোর অন্ধকারে। তাই এখনই প্রয়োজন সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে স্ক্রিনের আলোয় নিভে যেতে না পারে আমাদের শৈশবের স্বাভাবিকতা। মো. মেহরাব হোসেন শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।
শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে। বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি। বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’। বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।” বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।” বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি... ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।” আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব। এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?” আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।” চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।” এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম। সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে। এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর। বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।” বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম। হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।