আবৃত্তিতে যা-কিছু ঘটে, তা কখনো একা ঘটে না। একজন আবৃত্তিকার কবিতা বলেন, কিন্তু সেই কবিতার প্রকৃত জীবন শুরু হয় তখনই, যখন কেউ তা মন দিয়ে শোনে। শ্রোতা ও আবৃত্তিকার এ দুজনের মধ্যে একধরনের অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়। একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তিনি কেবল শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি তাঁর অনুভূতি, তার কণ্ঠের উষ্ণতা এবং তার মনের অবস্থা শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন। অন্যদিকে একজন শ্রোতা যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই কবিতা শোনেন, তখন সেই অনুভূতি তাঁর ভেতরে প্রবেশ করে। আদান-প্রদানের মধ্যেই আবৃত্তির আসল সৌন্দর্য। অনেক সময় দেখা যায়, একটি ভালো আবৃত্তির সময় পুরো ঘর নিঃশব্দ হয়ে যায়। কেউ কথা বলে না, কেউ নড়াচড়া করে না। সবাই যেন একধরনের শান্ত মনোযোগে ডুবে থাকে। এই অভিজ্ঞতা অনেকটা ধ্যানের মতো। ধ্যানের সময় যেমন মানুষ নিজের ভেতরে মনোযোগ দেয়, আবৃত্তির সময়ও তেমন একটি মনোযোগ তৈরি হয়। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে সেই মনোযোগের কেন্দ্র হয় কবিতার শব্দ। একজন আবৃত্তিকার যখন সত্যিই অনুভূতি নিয়ে কবিতা বলেন, তখন শ্রোতারাও ধীরে ধীরে সেই অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করেন। এ মুহূর্তে আবৃত্তি একটি সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। যেন সবাই একই তরঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। মঞ্চের নীরবতা আবৃত্তির মঞ্চে একটি বিশেষ ধরনের নীরবতা থাকে। নীরবতা সাধারণ নীরবতার মতো নয়, প্রত্যাশার নীরবতা। যখন একজন আবৃত্তিকার মঞ্চে ওঠেন, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য একটি নিস্তব্ধতা তৈরি হয়। সবাই অপেক্ষা করে কবিতার প্রথম শব্দ শোনার জন্য। অপেক্ষার মুহূর্তটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সচেতন আবৃত্তিকার এই মুহূর্তটিকে অনুভব করতে পারেন। তিনি যদি একটু চোখ বন্ধ করেন, অথবা কয়েক সেকেন্ড শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে তিনি অনুভব করতে পারবেন পুরো ঘরের মনোযোগ তাঁর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। মুহূর্তটি ধ্যানের মতো। কারণ, এখানে সবাই একই মুহূর্তে উপস্থিত। কেউ অতীতের কথা ভাবছে না, কেউ ভবিষ্যতের কথা ভাবছে না। সবাই শুধু অপেক্ষা করছে পরবর্তী শব্দের জন্য। নীরবতার মধ্যেই কবিতার জন্ম হয়। যখন প্রথম শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় যেন সেই নীরবতার ভেতর থেকেই শব্দটি উঠে এসেছে এবং কবিতা শেষ হলে আবার সেই শব্দগুলো নীরবতার মধ্যেই ফিরে যায়। এই আসা-যাওয়ার মাঝেই আবৃত্তির সৌন্দর্য। প্রতিধ্বনি ভালো একটি আবৃত্তি শেষ হওয়ার পর প্রায়ই দেখা যায়, কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না। শ্রোতারা চুপচাপ থাকে। নীরবতার মুহূর্তটি অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ, কবিতার শব্দগুলো তখনো বাতাসে ভাসছে। শ্রোতার মনে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি কাজ করছে। এই প্রতিধ্বনি অনেক সময় শব্দের থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়। কবিতা তখন আর কেবল কণ্ঠে থাকে না; এটি শ্রোতার অন্তরে স্থান করে নেয়। ধ্যানের ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা দেখা যায়। একটি গভীর ধ্যানের পরে মানুষ প্রায়ই কিছুক্ষণ নীরব থাকতে চায়, তখন মন খুব শান্ত থাকে। আবৃত্তির পরের নীরবতাও অনেকটা তেমন। নীরবতা আসলে কবিতার একটি অংশ। শব্দ যেখানে শেষ হয়, সেখানে অনুভূতি শুরু হয়। আবৃত্তি একটি অন্তরযাত্রা অনেকেই মনে করেন, আবৃত্তি মানে কেবল সুন্দরভাবে কবিতা বলা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আবৃত্তি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আবৃত্তি হতে পারে একটি অন্তরযাত্রা। যখন একজন আবৃত্তিকার একটি কবিতা গভীরভাবে অনুভব করেন, তখন সেই কবিতার ভাবনা তাঁর নিজের ভেতরেও আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি নিজেই নতুনভাবে অনুভব করতে শুরু করেন। একটি কবিতা কখনো কখনো মানুষের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। কখনো একটি লাইন আমাদের নিজের স্মৃতিকে স্পর্শ করে। কখনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের কোনো গোপন অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। এই মুহূর্তে আবৃত্তি শুধু শিল্প নয়; এটি হয়ে ওঠে আত্ম-অনুসন্ধানের একটি পথ। আমরা শব্দের ভেতর দিয়ে নিজের হৃদয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করি। ধ্যানের দরজা শব্দ, শ্বাস ও নীরবতা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আবৃত্তি এই তিনটি উপাদানকে একত্রে নিয়ে আসে। শব্দ আমাদের মনোযোগকে জাগিয়ে তোলে। শ্বাস আমাদের কণ্ঠকে ছন্দ দেয়। আর নীরবতা আমাদের অনুভূতিকে গভীর করে। এই তিনটি একত্রে একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, যা অনেক সময় ধ্যানের কাছাকাছি। যদি আমরা সচেতনভাবে আবৃত্তি করি, যদি আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, এবং যদি আমরা নীরবতার মূল্য বুঝতে শিখি, তাহলে কবিতা আমাদের মনকে শান্ত করার একটি পথ হয়ে উঠতে পারে। ১. কীভাবে আবৃত্তির ভেতরে ধ্যানের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়; ২. কীভাবে শ্বাস ও কণ্ঠকে প্রস্তুত করা যায়; এবং ৩. কীভাবে কবিতা আমাদের অন্তরের নীরবতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। কারণ, কখনো কখনো একটি কবিতার কয়েকটি শব্দই মানুষের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। আর সেই স্পর্শ থেকেই শুরু হতে পারে একটি নতুন যাত্রা — শব্দ থেকে নীরবতার দিকে, কণ্ঠ থেকে হৃদয়ের দিকে, এবং অনুভূতি থেকে ধ্যানের দিকে। শব্দ থেকে নীরবতার পথে মানুষের জীবনে শব্দের উপস্থিতি চিরন্তন। জন্মের মুহূর্ত থেকে আমরা শব্দের মধ্যে বাঁচতে শুরু করি। প্রথম কান্না, প্রথম ডাক, প্রথম উচ্চারণ — সবকিছুই শব্দের মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। শব্দ আমাদের অনুভূতির বাহন। আমরা আনন্দ প্রকাশ করি শব্দে, দুঃখ প্রকাশ করি শব্দে, ভালোবাসা জানাই শব্দে। কিন্তু শব্দের আরেকটি গভীর দিক আছে, যা আমরা সব সময় লক্ষ করি না। শব্দ আমাদের অন্তরের দরজাও খুলে দিতে পারে। কবিতা সেই দরজার একটি বিশেষ চাবি। কবিতা যখন আমরা পড়ি বা শুনি, তখন অনেক সময় এমন অনুভূতি জন্ম নেয়, যা সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একটি ছোট্ট পঙক্তি হঠাৎ আমাদের মনে অদ্ভুত শান্তি এনে দিতে পারে। আবার কোনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের গভীর স্মৃতিকে স্পর্শ করতে পারে। এ কারণেই কবিতা শুধু সাহিত্য নয়; এটি মানুষের অন্তরের একটি অভিজ্ঞতা। যখন সেই কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে উচ্চারিত হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। আবৃত্তি একটি বিশেষ শিল্প। এখানে শব্দ কেবল উচ্চারিত হয় না; শব্দ অনুভূত হয়, শ্বাসের সঙ্গে ছন্দ তৈরি করে, এবং নীরবতার সঙ্গে মিলেমিশে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তখন তিনি কেবল একটি লেখা পাঠ করেন না, তিনি সেই কবিতার অনুভূতিকে জীবন্ত করে তোলেন। এই জীবন্ত অভিজ্ঞতার ভেতরে আমরা কখনো কখনো এমন একধরনের শান্তি অনুভব করি, যা ধ্যানের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। ধ্যান বা মেডিটেশন সাধারণত আমরা ভাবি — চোখ বন্ধ করে বসে থাকা, মনকে শান্ত করার চেষ্টা করা, অথবা শ্বাসের দিকে মনোযোগ দেয়া। কিন্তু ধ্যানের মূল অর্থ আরও গভীর। ধ্যান হলো সচেতনতা। ধ্যান হলো বর্তমান মুহূর্তের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে থাকা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আবৃত্তিও একটি ধ্যানের পথ হতে পারে। যখন আমরা একটি কবিতা ধীরে ধীরে আবৃত্তি করি, যখন আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, যখন আমরা শব্দের মাঝখানের নীরবতাকেও গ্রহণ করি, তখন আমাদের মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। শব্দ তখন কেবল শব্দ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি যাত্রা। যাঁরা কবিতা ভালোবাসেন, যাঁরা শব্দের ভেতরে শান্তি খুঁজে পান, অথবা যাঁরা ধ্যানের নতুন একটি পথ খুঁজছেন। কারণ, কখনো কখনো ধ্যান শুরু হয় কোনো জটিল সাধনার মাধ্যমে নয়, বরং একটি সহজ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। একটি কবিতা শোনার মাধ্যমে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।