জীবন আসলে কোনো সরল পথের নাম নয়। তার বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে থাকে রৌদ্র, ছায়া, প্রাপ্তি আর হারানোর মৃদু পদধ্বনি। যে দিনটিকে আমরা দুহাত দিয়ে আঁকড়ে রাখতে চাই, সে-ই যেন সবার আগে দূরে সরে যায়। আবার যে বেদনা একদিন অসহনীয় মনে হয়, সময়ের গভীরে তারই ভেতর থেকে জন্ম নেয় নতুন কোনো বোধ, নতুন কোনো আলো। তাই জীবনের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি নয়—শুধু এতটুকু, চলার পথে হৃদয় যেন কঠিন না হয়ে যায়। মানুষ আসুক, মানুষ চলে যাক; সম্পর্ক বদলাক, সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে যাক—তবু ভালোবাসা থাকুক তার নিজস্ব আলোয়। শেষ প্রহরে ফিরে তাকিয়ে যেন বলতে পারি—সব পাইনি, সবকিছু আমার হয়ে থাকেনি; তবু যা পেয়েছি, তাকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছি। যে মানুষগুলো এসেছিল, তাদের ভালোবেসেছি; যে দিনগুলো চলে গেছে, তাদের স্মৃতিকে সযত্নে রেখেছি। আর যে জীবন আমাকে দেয়া হয়েছিল, তাকে কোনো অভিযোগের ভারে নয়—ভালোবাসার আলোয়, গভীর মমতায়, সত্যিকার অর্থেই ভালোবেসে বেঁচেছি।
অশীতিপর বৃদ্ধ ধনোপার্জনে ব্যস্ত। প্রশ্ন করলে সে বলবে, সে নিজের জন্য কিছুই করে না। সবই সন্তানের জন্য। আসল কথা, সে নিজেই সন্তান-সন্ততির ভেতর দিয়ে যুগ যুগ ধরে নিজের ভোগলিপ্সা চরিতার্থ করবে। সন্তান যে নিজেরই নব সংস্করণ। এই যে জীবন আমাদের নিকট এতো প্রিয় এবং অমূল্য, এটাও আমরা অকাতরে না, অতি আবেগের সাথে, অতি উল্লাসের সাথে সন্তানের মঙ্গলের জন্য বিলিয়ে দিচ্ছি। বিপন্ননের মাথায় কুঠারাঘাত করে, অনাথের অন্নভরা গ্রাসকে শূন্য করে, সমাজের বুকে পাথর বসিয়ে আমি সম্পদ, অর্থ, বৈভব সংগ্রহ করছি, তা কার জন্য? যার জন্য এত করেছি, সে আমার কে? অভিধান তাকে সন্তান নামে আখ্যায়িত করছে। কিন্তু আমি জানি, এক হিসাবে সে আমার কিছুই নয়। কোন অজানা দেশে সে ছিল, কোন প্রভাতে ঝরা ফুলটির মতো ভেসে এল, আবার কখন জীর্ণ পাতাটির মতো পৃথিবীর বুকে মিলে যাবে, তার সাথে আমার সম্বন্ধ কী? মূর্খ লোকে বলে আমি তার জনক, আমি তার পিতা। কিন্তু যদি তা-ই হবে, তার জীবনের ওপর আমার অধিকার নাই কেন? মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, বাঁচাই যে তার ধর্ম। সে মরণকে মরণ বলে মানতে পারে না। তাহলে যে তার বেঁচে থাকা, জীবনধারণ অসাধ্য হয়ে পড়ে। সে বলছে, আমি বাঁচব; অনন্তকাল ধরে আমি বাঁচব, আমার আত্মা অবিনশ্বর। জীবন যেমন অনন্ত মহাযাত্রায় ছুটে চলে, যুগান্তরের ভেতর দিয়ে নিজের পথ কেটে চলছে, আত্মাও তেমনই অনন্তকাল ধরে কোনো বিশ্বে বেঁচে থাকবে, লীলাভিনয় করবে, নিজের কাজের ফল ভোগ করবে। মৃত্যু সে তো ঘাঁট মাত্র; এখানে এসে আত্মা জীবনের নিকট বিদায় গ্রহণ করে আপনার দেশে চলে যায়, আর দেহ যাত্রীহীন শকটের ন্যায় ধুলায় পড়ে থাকে। মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা এক নয়; জীবন বা জৈবশক্তি প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, আত্মা নিত্য। মানুষ তো মৃতের দেশে বেঁচে থাকতে চায়, কিন্তু সেখানে তার বাসস্থান কোথায়? মানুষ স্বর্গের দেশে বিরাট অভ্রভেদী প্রাসাদ গড়ছে, প্রাসাদের ধারে উদ্যান, অদূরে সিন্ধু ধারা, তটিনী, সাহচর্যের জন্য লাখ লাখ হুর ও গেলমান। এসবের ব্যবস্থা মানুষ পূর্বেই সেখানে করে রেখেছে। যা-কিছু সুন্দর, যা-কিছু ভোগ্য, যা-কিছু ইপ্সিত বলে মনে করেছে, সে সমুদয় দিয়েই মৃত্যুর ওপারে নিজের প্রবাস ঘাঁটি গড়ে তুলছে; তারই সে নাম দিয়েছে বেহেশত বা স্বর্গ, মরণের পরও বেঁচে থাকার এই ধারণার নানা শাখা-প্রশাখায় প্রসারিত হয়ে কী বিরাট মায়াজগতের সৃষ্টি করেছে। নয়ন কখনো দেখেনি সে দেশের রূপ, শ্রবণ কখনো শোনেনি সেই পুরির ছন্দ; তবু সবাই সব আশা সব কামনাকে সেই অজানা আঁধার দেশের প্রাণে নিয়ন্ত্রিত করে পৃথিবীর দারুণ বেদনার ভার বুকে নিয়ে হাসছে। মানুষ সবাই মনে করে, ইহকালের দুঃখ বরণ করে নিলে পরকালে অন্তত সুখের অধিকার আপনি এসে ধরা দেবে। কাব্য কলায়, সাহিত্য-সংগীতে, আশা-উৎসাহে, আমোদ-উপভোগ সবখানেই সেই ভাবী আকাঙ্ক্ষিত রাজ্যের জন্য প্রবল অনুরাগ ঝংকার দিয়ে উঠছে। একই বিদ্যুৎ প্রবাহ যেমন নগরীর লাখো প্রদীপের ভেতর দিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করেছে, তেমনি একই মহাপ্রেরণা সমগ্র মানবগোষ্ঠীর ভেতর দিয়ে কোনো দূর লক্ষ্যের পানে ছুটে চলেছে। সেই প্রেরণা মানবের ভেতর দিয়ে আপনি বেঁচে থাকতে চায়, তাই মানুষের বাঁচতে এত সাধ। আত্মাও চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়। মরণ মানুষের দৈহিক জীবনে সমাপ্তি এনে দেয় না। কিন্তু আত্মা তার পরও বেঁচে থাকতে উৎসুক। তাই মৃত্যুর পরপার সম্পর্কে মানুষের এত জল্পনা-কল্পনা। সংসারের এ মায়া-বন্ধন, এই আশা-ভরসা, এই উদ্যম-সাধনা, সবই মরণের সঙ্গে সঙ্গে দারুণ ব্যর্থতায় মিশে যাবে। এই চিন্তা মানুষ সহ্য করতে পারে না। সোনার পুতুলি সন্তান জননীর কোল শূণ্য করে কালের নির্মোঘ আঘাতে খসে পড়ছে। সে কি কখনো আর মায়ের শূণ্য কোলে ফিরে আসবে না? আসবে! মরণের পরপারে আবার সে হাসতে হাসতে হাসতে মায়ের কোলে চড়ে বসবে। তা না হলে এই বিচ্ছেদ যদি শেষ হয়, তবে জীবন যে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে! মানুষ তো সে ধারণা সহ্য করতে পারে না। ওই যে সতি নারী তার আদরের পতিকে হারিয়ে নিশিদিন অশ্রুজলে বুক ভাসাচ্ছে। সে স্বামীর ধ্যান, স্বামীর স্মৃতি জীবনের শেষ অবলম্বন ভেবে বুকে আগলে রেখেছে, এটি কি শুধু তার ব্যর্থতার জন্য? সত্য থেকে বিচ্যুতির ফলেই মানুষের বিড়ম্বনা এবং সমাজের অশান্তির সূত্রপাত হয়। মানুষের বিশ্বাসের বিড়ম্বনা, যা মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, জীবনকে এমন স্থানে বসিয়ে দেয়, যেখান থেকে মানুষ পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় নতুন অর্থে বুঝতে বাধ্য হয়। কবি যে পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় দেখছেন, তাঁর চোখে পৃথিবীর প্রতিটি তরু-বীথিকা সুরবালাদের মনোরম আসন বলে মনে হয়। প্রতিটি পল্লবের মৃদু শিহরণ আপন মানসপটে আনন্দের হিল্লোল বয়ে দেয়। সেই পৃথিবী একজন নাস্তিকের চোখে বৃহৎ ধূলিকণার স্তূপ ভিন্ন অন্য কিছু বলে মনে হয় না। এই যে তাজমহল জগতের অষ্টম কীর্তি বলে বিশ্ববিশ্রুত, যাকে কেউ অশ্রুসৌধ, কেউ প্রেমের সমাধি বলে আখ্যাত করেছে, সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ মেজর শ্লিমানের স্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছেন, “হায়! আমি মরলে আমার সমাধির ওপর যদি কেউ এমন স্মৃতিসৌধ গড়ে দিত, তাহলে এই মুহূর্তে মরতে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ হতো না।। সেই তাজমহলের দিকে একবার অর্থনীতিবিদের চোখে দর্শন করো, দেখবে এটি অপব্যয় ও নির্বুদ্ধিতার একটি জীবন্ত নিদর্শন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। যে ন্যায়নিষ্ঠার ভাস্বর তার চোখে এই পৃথিবীর কোথাও নিয়মের ব্যতিক্রম চোখে পড়বে না। পক্ষান্তরে যেকোনো সুনির্দিষ্ট পন্থাকে আপনপ্রবৃত্তিসমূহের প্রতিকূল ভাবে, সে জগৎকে সর্বদা নিয়মের কঠিন নিগড়ে নিষ্পেষিত বলে দুঃখ প্রকাশ করবে। দরিদ্রের অন্ন জোটে না, তবু তার ক্ষুধা হয়, প্রকৃতির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনেককেই অভিযোগ করতে শোনা গেছে যে নিজে চুরির কাজে অভ্যস্ত, সে অন্যের অচুরিতে আস্থা রাখতে পারে না। ঠিক আমি যেমন, তেমনই করে আমি দুনিয়াটাকে দেখি। জীবন কী, জগৎ কী? মৃত্যুর পরে কী আছে? এসব প্রশ্ন মানুষকে সব সময় আলোড়িত করে। এ যে ভীষণ সমস্যা! জীবনে যত বিপদ আসে, সব বিপদেরই একটি সমাধান আছে, কিন্তু মরণ যে বিপদ, তার কাছে তো পরিত্রাণ নেই। এ পৃথিবী এমন করে হাসতে থাকবে, এ সংসারে কাজ-কর্ম এমন করে চলতে থাকবে, শুধু আমরা থাকব না। এ চিন্তা বড় অসহ্য। এ বন্ধুবান্ধব এমনই আমার জন্য প্রতিবছর উৎসব করতে থাকবে, কিন্তু আমি সেখানে থাকব না। কেউ হয়তো আফসোস করে দু-একবার বলবে, আহা, অমুক আজ নেই! কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। শিশুপুত্র-কন্যারা শরতের জোছনা ভরা আকাশের পানে চেয়ে ভাববে, বাবা ঐ চাঁদের দেশে আছে, হয়তো একদিন নেমে আসবে। বসন্তে যখন ফুলে ফুলে গন্ধের বন্যা বইবে, গ্রীষ্মে যখন পাকা ফলের ম-ম সুবাস চড়িয়ে পড়বে, তখন শিশুদের বাবার কথা মনে পড়বে, কিন্তু সে কয়দিন? অদূরে কল্লোলিনী এমনি করেই চিরদিন বইতে থাকবে। শৈশবের সংস্পর্শে, যৌবনের আলিঙ্গন কত না সে তার তরঙ্গ মাখিয়ে দিয়েছে! সে এমনই উদাস মনে নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দাম ক্রিয়া দেখতে দেখতে এভাবে প্রবাহিত হতে থাকে।’ মানুষ দুনিয়ার সুখ সুখ করে উন্মত্ত। এই সুখ যে ক্ষণস্থায়ী, তা মানুষ ভুলে একবারও ভাবে না। যতক্ষণ মানুষ ইন্দ্রিয়ের অনুসরণ করে, আত্মার বাণীকে শোনার জন্য কানকে উদগ্রীব না করে, ততক্ষণ মানুষ তা ভাবতেও পারে না। কিন্তু আত্মারও একটা ক্রিয়া আছে, একটা দৃষ্টি আছে। এটি পৃথিবীর ওই অধ্রুব রাশির ভেতরে সত্যের সন্ধান খুঁজে বেড়ায়। যেখানে একটু শুচিতার সৌন্দর্য বিকশিত হতে দেখে, যেখানে একটু দানের প্রতিদান দেখে, মহত্ত্বের বেদনাশ্রু দেখে, সেখানেই আত্মা আমাদের উন্মনা হয়ে ওঠে। কোথায় যেন সে এমনই দেখে এসেছে। কোথায় যেন এমনই নিঁখুত সুষমা, এমনই সৌম্য-সৌহার্দ্য ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহিমা দেখে এসেছে। লতিকার শ্যামাঞ্চলে ঢাকা কুসুমের হাসি - হাসিমুখ, জলদের নিবিড় কৃষ্ণতায় ঘেরা চপলার অসংবদ্ধরূপ সাগর-তরঙ্গের শীর্ষে শীর্ষে উচ্ছ্বসিত ফেনপুঞ্জের অনির্বচনীয় সুভ্রতা, সবই যেন কোন জন্মের সুখ্যাতি তার অন্তরের ভেতর জাগিয়ে দেয়। কোন যে সত্যের দেশ, জ্যোতির দেশ, সুষমার দেশ হতে সে কক্ষচ্যুত গ্রহের ন্যায় দুনিয়াতে খসে পড়েছে। এদের বর্ণে, ছন্দে, গন্ধে যেন সেই দেশের আভাস পাওয়া যায়। সেই দেশের বারতা দিয়ে এরা আত্মাকে উদাস করে তোলে, তাই আত্মা প্রতীয়মানকে ত্যাগ করে প্রচ্ছন্নকে পেতে চায়।
জীবনকে একেকজন একেকভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে। বয়স, লিঙ্গ, সময়, প্রতিবেশ ভেদে জীবনের সংজ্ঞা ভিন্ন হয়ে থাকে। একেবারে অশীতিপর বৃদ্ধাবস্থায় জরা-ব্যাধি যখন চতুর্দিক দিয়ে আক্রান্ত করে, যখন মুড়ি খাওয়ার মতো করে ওষুধ গিলতে হয়, হাসপাতাল আর ক্লিনিকে টানাহেঁচড়া করতে করতেই জান বের হওয়ার উপক্রম হয়, তীব্র শ্বাসকষ্টে অক্সিজেন মাস্ক বা সিলিন্ডারে মুখ গুঁজে রাখতে হয়, ডায়াবেটিসের প্রবল উৎপাতে কোনো চিকিৎসাই যখন স্বাভাবিকভাবে প্রয়োগ করা যায় না, তখন যাপিত জীবনের অর্থ আর যাই হোক তাতে মধুরতার লেশমাত্র থাকে না। তখন সেই জীবন ভারবাহী জীবন্ত লাশ হয়ে ওঠে, মনে হয় এ যাতনার অবসান হোক, মৃত্যু যেন এর চেয়ে অনেক বেশি প্রশান্তির। অথচ সুন্দর এ ভুবন ছেড়ে চলে যেতে কারও মন চায় না। একটা জীবন সময়ের সাথে সাথে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানসিক বিকাশের সাথে সাথে স্বপ্নের জাল বুনতে শেখায়। ছেলেবেলায় স্বপ্নেরা পুতুল খেলার মতো হরহামেশাই রঙিন প্রজাপতির মতো কেবলই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। তখন বাসের ড্রাইভারকে দেখে মনে হয় এটাই পৃথিবীর সেরা পেশা। আহা, আমি যদি হতে পারতাম! গাড়ি নিয়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতাম। আকাশ দিয়ে হাওয়াই জাহাজ উড়ে যেতে দেখলে মনে সাধ জাগত, আহা যদি পাইলট হতে পারতাম! মা-বাবা, পরিবার, সমাজ এসে তখনই ছবক দিয়ে বলত, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। সেটাকেই অভীষ্ট ধরে কত অধ্যবসায়, কত লেখাপড়া, কত কত পরীক্ষা! মাস্টার মশাইয়ের কানডলা খাওয়া, লজ্জার মাথা খেয়ে ক্লাসরুমে বা স্কুল বারান্দায় বা প্রচণ্ড রোদে স্কুলমাঠে প্রকাশ্যে নীলডাউন হয়ে বা দুই কান ধরে এক পা উঁচিয়ে অন্তহীন দাঁড়িয়ে থাকা ছিল যেন সুস্থ জীবনের প্রয়োজনে ‘স্বাভাবিক’। পারিবারিক শিক্ষা তো ছিল আরও কঠোর। সবকিছু ওই মানুষ হিসেবে জীবন গড়ার জন্য। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বপ্নের দ্রুত বাঁক পরিবর্তন হতে থাকে। পড়াশোনা শেষে বাস্তবের জগতে পা রেখেই জীবনের অর্থ কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি হয়। সেই থেকে স্বপ্নরা অধরা হতে শুরু করে। জীবনজীবিকায় কেউ সফলকাম হয়, কেউ মন্দের ভালো হিসেবে ‘যা পাওয়া যায় তা-ই সই’ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। সেখান থেকেই স্বপ্নের তেজস্বতা ম্রিয়মাণ হতে থাকে। সংসারে যারা কামিয়াব হতে পারে না, তাদের জন্য ওপরের আকাশ দেখা বারণ, তাদের জন্য পায়ের নিচের জমিন শক্ত কংক্রিটের মতো দুঃসহ হয়ে ওঠে। সংসারজীবনে প্রবেশের পর জীবনের ‘লাইফ লাইন’ লাইভ সাপোর্টে থাকা রোগীর মনিটরের কার্ভের মতো অস্থিরমতি হয়ে ওঠে। প্রেমে জীবনের অর্থ একরকম, সফলতায় এর পুলক ‘হ্যাপি টু দ্যা পাওয়ার ইনফিনিটি’। ব্যর্থতায় তা মাঝ আকাশে বিধ্বস্ত বিমানের মতো ছিন্নভিন্ন। পেশাগত জীবনে কেউ রতি সুখের মতো চরম পুলকিত, কেউ সো সো, আর কেউ জন্ম থেকেই জ্বলছিবৎ। কেউ সফল স্বামী, কেউ পয়মন্ত বউ। কেউ অথর্ব গাধা, কেউ অপয়া। কেউ যেন শূন্যতাকেই বয়ে বেড়ায়, কেউ অল্পকে সম্বল করেই ভালো আছি বলাতে ধাতস্থ। কারও আছে অঢেল, অগণিত। কারও থোরা থোরা আর কারও তা অধরা। সবই একজীবনে পাশাপাশি চলার চালচিত্র। একজীবনের জন্য আমাদের কত কিছুর আয়োজন! আমাদের বিদ্যা লাগে, ভালো সার্টিফিকেট লাগে। তার জন্য কত মেহনত, কত কিছুর জোগাড়পাতি লাগে। কারও চাকরি লাগে, কারও ব্যবসা। তা না হলে জীবন চলে না। তাই পরীক্ষা দিতে হয় পদে পদে। ঘাটে ঘাটে বিছানো প্রতিবন্ধকতা টপকাতে হয় জীবনব্যাপী। আমাদের সুখপাখি লাগে, তাই সুন্দরী বউ চাই। তার জন্য উপযুক্ততা লাগে। সে আরেক হিসাব। পরিবার লাগে। জেনেশুনে তার জোয়াল নিজ কাঁধে তুলে নিতে হয়। সেই জোয়াল আর কাঁধ থেকে নামানোর জো নেই। কেবলই সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে হয়। ফেরার পথ নেই, সেই পথ অনিশ্চিত, বড়ই কঠিন, চড়া মাশুলযুক্ত। তারাপদ রায়ের বিখ্যাত একটা কবিতার কয়েকটি চরণ স্মরণ না করে পারছি না : একটা জন্ম জোড়াতালির, ভাত-কাপড়ের তক্কে তক্কে একটা জীবন মাথা গোঁজার ফন্দি খোঁজে একটা জীবন বাক্স মাথায় ভুল শহরে ভুল ঠিকানায় ঘুরে ঘুরে একটা জন্ম এমনি এমনি কেটে গেল একটা জীবন দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে। জীবন সায়াহ্নে হিসাব কষতে গিয়ে অনেকেরই হয়তো এরূপ মনে হতে পারে। কেউ অল্পতে তুষ্ট, কেউ বড় বেশি কৃতজ্ঞ। কেউ জীবনের ডেবিট-ক্রেডিটের ব্যালান্স কষতে গিয়ে হতাশ। মৃত্যুর অমোঘ নিয়মে চলে যেতে হয়, চলে যেতে হবে - এই বোধ আমাদের আত্মস্থ হয়ে আছে ছোটবেলা থেকেই। এই দেহ যখন লাশের উপাধি প্রাপ্ত হয়, তখন তা দেখে সবাই আমরা বলে উঠি, আমরা তো আল্লাহর এবং নিশ্চয় আমরা তার দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। জীবনের এই অমোঘ সত্যকে মেনে নিয়ে মুহূর্তকাল থমকে দাঁড়াই। তারপরই বেগের তাড়নায়, পেছনে পড়ে থাকার ভয়ে দৌড়াতে থাকি ঊর্ধ্বশ্বাসে। এভাবেই আমরা একেকজন একেকভাবে জীবনকে টেনে নিয়ে যাই মৃত্যুর দিকে। কারও মধ্যে অনুশোচনা হয়, পাথেয়র পরিমাণ কম বলে পরপারের ট্রেনে ওঠায় অজানা ভীতি জাগে। আফসোস দানা বাঁধে। কাফফারা দিয়েও হয়তো তার ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়। আমরা এসবের সব জানি, কিন্তু রিপু আমাদের সার্বক্ষণিক সহযাত্রী হয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এদিক-সেদিক, দিগবিদিক। তখন বিবেকের ফ্যাকাল্টি মুমূর্ষু অবস্থায় থাকে। আবেগের পারদ টগবগে ঘোড়ার মতো দিগবিজয়ের নেশায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। যেন ফেরার পথ নেই, থামার কোনো নীতি নেই, বিরতি মানেই যেন পিছিয়ে পড়া। সমাজ এগিয়েছে। সমাজচিত্র বদলেছে। সময়ের বরকত কমে যাচ্ছে। তৃপ্তির ব্যারোমিটার উল্লম্ফন যাত্রায় পেরেশান। বিবেক-বিবেচনা বোধ পার্থিব লাভালাভের ওপর নির্ভরশীল। বিবেকের চেয়ে দলের কথা, দলের চেয়ে নেতার কথা শিরোধার্য। নীতির রীতি এখন সিলেবাসের সবচেয়ে কম জায়গাজুড়ে থাকে। স্বার্থের কানাকড়িতে টান পড়লে খুনোখুনি কোনো ব্যাপার না। অমুকের গাড়ি-বাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে দেশে-বিদেশে। তাই আমারও চাই। পড়শীর বিশাল ব্যাংক ব্যালান্স দেশে কিংবা বিদেশে। আমারও থাকা চাই। তার দৌড় সুইস ব্যাংক হলে আমার তো নিদেনপক্ষে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্ডিয়া, ব্যাংককে হওয়া চাই। টাকা কোথা থেকে আসে বা আসবে, তার নির্দিষ্ট কোনো খাত নেই, দৃশ্যমান কোনো সোর্স নেই। অফিসের পিওনের ক্যাশ শত কোটি, মহল্লার হেরোইনখোরের পুঁজি শত শত কোটি টাকা। তাদেরও বাড়ি আছে বিদেশে। তারাও ফি বছর হজ করে, একাধিক উমরাহ করে সপরিবার। টাকা এল কোত্থেকে তার তালাশ কেউ করে না। এমনকি স্ত্রী, পুত্র-কন্যা বা স্বজনরাও না। ভোগের টার্গেট ফিক্সড। তাই সাপ্লাইয়ের চ্যানেল চালু রাখতে সবাই পেরেশান। দান মেরে দান-খয়রাত হচ্ছে প্রচুর। ছওয়াব কামাইয়ের এ হেন খাত নেই, যাতে অবদান নেই। কি শিক্ষিত কি অর্ধশিক্ষিত, দান মারায় কেউই পিছিয়ে নেই। সিন্ডিকেট আছে, ফেডারেশন আছে, সলিড স্ট্রাকচার্ড অলিগার্ক আছে। তাই ভয় নেই। যাদের আছে বুদ্ধি অতিশয়, যারা বুদ্ধিজীবী নামধারী, তাদের আবার আভিজাত্য আছে, নীতিকথাও আছে, আবার ভাগ-বাটোয়ারা জ্ঞানও টনটনে আছে। রাজনীতিবিদদের কথার মাধুর্য অপরিসীম। ‘সুইট টকার’ হিসেবে তারা সমাজে পরম পূজনীয়। তাদের একই অঙ্গে একাধিক রূপ, এক মুখে শত কথা। তারা স্বপ্ন জাগানিয়া। পাবলিক জেনেশুনে বিষ পান করে। আশাহত হয়। দুয়ো ধ্বনি দেয়। আবার কাছে ভেড়ে, অপুষ্ট হাত উঁচিয়ে শ্লোগানে শামিল হয়। না হয়ে উপায় নেই। দলছুট মানেই হারিয়ে যাওয়া, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, আম-ছালা দুটোই হারানো। সকল শ্রেণি-পেশাতেই একই দশা। তাই বলে কি ভালো লোক নেই? আছে। তারা আছে গৃহকোণে, ব্যাকবেঞ্চে, বাইরের পরিত্যক্ত মাঠে, নদীর কিনারায়, সংসারের ঘানি টানতে জোয়াল কাঁধে। সেখানে নিয়ম মেনে সূর্য ওঠে, দিনের পালাবদলে সন্ধ্যা নামে। একটা জীবনে জন্য কত কি যে হচ্ছে, কত শত জারিজুরি যে করতে হচ্ছে তার হিসাব-কিতাব নেই। খেলারামরা খেলে যাচ্ছে। পাবলিক যে যেমন পারছে নিজের মতো করে খাচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা কিতাবে লেখা আছে। যার যখন প্রয়োজন, তা থেকে চয়ন করে ভাষণ দিচ্ছে, বয়ান তৈরি করছে। কেউ শুনছে, কেউ মানছে, কেউ হাসছে, কেউ প্রলাপ জ্ঞানে উড়িয়ে দিচ্ছে। আর চামে চামে ঘোড়েল কামেলিয়েরা কাম করে যাচ্ছে। আহা রে জীবন!
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।