বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, মফস্বল কিংবা ছোট শহরের মাঠে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু-কিশোর খেলাধুলা করে। কারও পায়ে থাকে ফুটবলের জাদু, কেউ দৌড়ে অন্যদের ছাড়িয়ে যায়, কেউ ব্যাট-বল হাতে দেখায় অসাধারণ সম্ভাবনা। কিন্তু প্রতিভা থাকলেও সবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয় না। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, সুযোগ-সুবিধার সংকট কিংবা সঠিক সময়ে প্রতিভা শনাক্ত না হওয়ার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হারিয়ে যায়। এই বাস্তবতায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তৃণমূল পর্যায় থেকে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের ধাপে ধাপে উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ক্রীড়া পরিদপ্তর কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে। ‘নতুন কুঁড়ি’ নামটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিভা অন্বেষণের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। সেই ভাবনাকে ক্রীড়াঙ্গনে নিয়ে এসে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’। ২০২৬ সালের প্রথম আসরে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি ইভেন্টের মাধ্যমে প্রতিভা যাচাই করা হয়। দ্বিতীয় আসরে আরও দুটি ইভেন্ট যুক্ত হয়েছে ভলিবল ও টেবিল টেনিস; এখন মোট ১০টি ইভেন্ট নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে। শুধু বড় শহর নয়, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে খেলোয়াড় বাছাইয়ের কাঠামো তৈরি হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবানদের সামনে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই; বরং অনেক সময় প্রতিভা খুঁজে বের করার যথাযথ ব্যবস্থা থাকে না। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই—এটি প্রতিভাকে মাঠ থেকে তুলে এনে একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। একজন শিশু হয়তো পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে ঢাকায় গিয়ে কোনো একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে পারে না। কিন্তু তার গ্রামের মাঠেই যদি প্রতিভা শনাক্ত করা হয়, তাহলে তার সামনে জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার দরজা খুলে যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ কেবল খেলোয়াড় তৈরি করে না; বরং একটি দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। ভবিষ্যতে জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য খেলোয়াড় তৈরির ভিত গড়ে উঠতে পারে এখান থেকেই। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলার সবচেয়ে বড় সুফল হলো শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। নিয়মিত খেলাধুলা শরীরকে সক্রিয় রাখে, সহনশীলতা বাড়ায় এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। তবে খেলাধুলার উপকারিতা শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠে একজন শিশু শেখে সময় মেনে চলতে, নিয়ম ও শৃঙ্খলা মানতে, জয়-পরাজয় মেনে নিতে, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে, নেতৃত্ব দিতে, প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে এবং ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে। ফলে একজন ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোন, গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটায়। এর ফলে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাঠকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগও কমছে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ মাঠকে আবার শিশু-কিশোরদের মিলনস্থলে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই এলাকার বিভিন্ন পরিবারের সন্তান একসঙ্গে খেলবে, প্রতিযোগিতা করবে এবং বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রীড়া সংগঠক, কোচ, রেফারি ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। আমি নিজে একজন খেলোয়ার ছিলাম। সেখান থেকে ভলিবল রেফারি, কোচ, ক্রীড়া সংগঠক হয়েছি। আমি বিভিন্ন জায়গায় ভলিবল নিয়ে কাজ করার সময় লক্ষ করেছি, গ্রামের খেলোয়াররা শহরের খেলোয়াদের থেকে বেশি চাপ নিতে পারে এবং এদের মধ্যে প্রতিভা আছে। সেটিকে বিকাশিত করতে দরকার ভালো পরামর্শ ও সুযোগ। যেটি তৈরি করে দিচ্ছে নতুন কুড়ি স্পোর্টস। আমাদের আশপাশের অনেক খেলোয়ার আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, এটি একটি প্রতিবন্ধকতা। আমার তত্ত্বাবধানে একজন খেলোয়ার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, সে লেখাপড়ার পাশাপাশি তার বাবার হোটেলে কাজ করছে। ফলে তার নিয়মিত প্র্যাকটিসে কিন্তু একটা প্রভাব পড়ছে এবং তার শারীরিক ও মানসিকভাবে একটা চাপ পড়ছে। অথচ সে কিন্তু একজন প্রতিভাবান খেলোয়ার। গত সিজনে সে খুলনা বিভাগীয় পর্যায় মার্শাল আর্ট (উশু) ৪৫+ ওজনে তৃতীয় হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস একটি নতুন সম্ভাবনার নাম। আজকের যে শিশু উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের একটি মাঠে দৌড়াচ্ছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হয়তো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে। হয়তো কোনো একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, স্বচ্ছ বাছাই এবং নিয়মিত পরিচর্যা। একটি কুঁড়িকে শুধু চিহ্নিত করলেই ফুল ফোটে না—তার জন্য প্রয়োজন মাটি, পানি, আলো ও পরিচর্যা। ঠিক তেমনি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ যে প্রতিভাগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তাদের যথাযথ পরিচর্যা করতে পারলেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ফুটতে পারে নতুন নতুন সম্ভাবনার ফুল। ‘নতুন কুঁড়ি’ তাই শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম নয়—এটি হতে পারে আগামীর চ্যাম্পিয়ন তৈরির একটি স্বপ্নযাত্রা।
আগামী বছর থেকে দেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নতুন এই শিক্ষাক্রমে শুধু তাত্ত্বিক পড়াশোনাই নয়, বরং লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মাঠে ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর রূপনগর আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষাকে আনন্দময় করতে কাজ করছে। শুধু বইভিত্তিক পড়াশোনার পরিবর্তে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে পড়াশোনা শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ের নয়, বরং আনন্দের বিষয় হয়ে উঠবে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলার ওপর লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মাঠে ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকবে। এছাড়া বিতর্ক, কোরআন তেলাওয়াত, সংগীত এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাকেও শিক্ষার অংশ করা হবে। শিশু-কিশোরদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। খেলার মাঠের সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় খালি সরকারি জমিতে শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিদিন পাঠদানের শুরুতে অন্তত ৫ মিনিট নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং সততা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলা। অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলিসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।