কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) আজ বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি। চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, গবেষণা, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষা ক্ষেত্রেও এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এখন শিক্ষার্থীরা কয়েক সেকেন্ডেই জটিল প্রশ্নের উত্তর, রচনা, গণিতের সমাধান, ভাষান্তর, প্রোগ্রামিং কোড, এমনকি ব্যক্তিগত শেখার পরিকল্পনাও এর মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, এআই কি ভবিষ্যতে শিক্ষকের বিকল্প হয়ে উঠবে, নাকি শিক্ষকের সবচেয়ে শক্তিশালী সহযোগী হবে? এ প্রশ্নের উত্তরটি সরল নয়, তবে গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এআই শিক্ষকের কিছু কাজের বিকল্প হতে পারলেও একজন প্রকৃত শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হওয়া সম্ভব নয়। বরং দক্ষ শিক্ষক এআইকে ব্যবহার করে আরও কার্যকর, আধুনিক ও ফলপ্রসূ শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন। এআইকে শিক্ষকের বিকল্প মনে হওয়ার কারণ হলো এর কিছু অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকের কাজকে সহজেই সম্পন্ন করতে পারে। যেমন ১. দ্রুত তথ্য প্রদান : এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজারো বই, গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে উত্তর দিতে পারে। একজন শিক্ষক যেখানে প্রস্তুতি নিতে সময় নেন, এআই তা মুহূর্তেই করে ফেলতে পারে। ২. চব্বিশ ঘণ্টা শিক্ষাসেবা : এআইয়ের কোনো অফিস সময় নেই। শিক্ষার্থী গভীর রাতে প্রশ্ন করলেও উত্তর পেতে পারে। ফলে শেখার সুযোগ সময়ের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না। ৩. ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা : প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার গতি এক নয়। এআই শিক্ষার্থীর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে আলাদা অনুশীলন, ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। ৪. প্রশাসনিক কাজ কমানো : প্রশ্নপত্র তৈরি, উত্তর মূল্যায়নের প্রাথমিক ধাপ, উপস্থিতি বিশ্লেষণ, রিপোর্ট প্রস্তুত, পাঠ পরিকল্পনা ইত্যাদি কাজে এআই শিক্ষকদের সময় ও শ্রম কমাতে পারে। এসব কারণেই অনেকে মনে করেন, ভবিষ্যতে এআই শিক্ষকের জায়গা দখল করবে। এআই কেন শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারবে না, তার ব্যাখ্যা এমন হতে পারে, যেমন (ক) শিক্ষা শুধু তথ্য দেয়া নয় : তথ্য দেয়া আর শিক্ষা দেয়া এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগান, মূল্যবোধ গড়ে তোলেন, ভুল সংশোধন করেন, চরিত্র নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। এআই তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানুষ গড়ার দায়িত্ব পালন করতে পারে না। (খ) আবেগ ও মানবিকতা : শিক্ষার্থীর ভয়, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা মানসিক সংকট একজন শিক্ষক মুখের অভিব্যক্তি, আচরণ ও পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারেন। এআই উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সহানুভূতি, স্নেহ, অনুপ্রেরণা ও মানবিক স্পর্শ দিতে পারে না। (গ) নৈতিক শিক্ষা : একজন ভালো শিক্ষক শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি দেন না, তিনি সততা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও সামাজিক মূল্যবোধ শেখান। এআই নৈতিকতা সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে, কিন্তু নিজে নৈতিক আদর্শ হয়ে উঠতে পারে না। (ঘ) বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত : একই শ্রেণিতে ৫০ জন শিক্ষার্থীর আচরণ, পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক পরিবেশ ও শেখার পার্থক্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া মানুষের কাজ। এআই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু মানবিক বিচারবোধের সমতুল্য নয়। এআইয়ের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন (ক) প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতির গুরুত্ব কমবে : যেসব শিক্ষক শুধু বই পড়ে শোনান বা মুখস্থনির্ভর শিক্ষা দেন, তাঁদের ভূমিকা কমে যেতে পারে। কারণ, একই তথ্য এআই আরও দ্রুত ও আকর্ষণীয়ভাবে দিতে পারে। (খ) দক্ষতার বৈষম্য : এআই ব্যবহার জানেন এমন শিক্ষক এবং যাঁরা জানেন না, তাঁদের মধ্যে দক্ষতার ব্যবধান তৈরি হবে। (গ) কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হবে : পরীক্ষার প্রাথমিক মূল্যায়ন, রুটিন তৈরি, প্রশ্ন প্রস্তুতি, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি ইত্যাদি কাজ এআই করে দিতে পারবে। ফলে এসব ক্ষেত্রে মানুষের শ্রমের প্রয়োজন কমবে। (ঘ) শিক্ষার্থীর অতিনির্ভরশীলতা : যদি শিক্ষার্থী সব উত্তর এআই থেকে নেয়, তবে চিন্তা, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন শিক্ষককে নতুনভাবে শেখানোর কৌশল তৈরি করতে হবে। এআই বিভিন্নভাবে শিক্ষকদের আরও শক্তিশালী সহযোগী হতে পারে। যেমন : এআই বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক পাঠ পরিকল্পনা, কার্যক্রম ও মূল্যায়ন তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। যেসব কাজে আগে কয়েক ঘণ্টা লাগত, এআইয়ের সাহায্যে তা কয়েক মিনিটে করা সম্ভব। ফলে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আরও বেশি সময় ব্যয় করতে পারবেন। গবেষণাপত্রের খসড়া, সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য সংগঠন, ভাষাগত সম্পাদনা ও ধারণা বিন্যাসে এআই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হতে পারে। এআই সহজেই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ, ব্যাখ্যা ও উদাহরণ দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে সহায়ক। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী কনটেন্ট, ভিন্ন মাত্রার ব্যাখ্যা এবং বিকল্প শেখার উপকরণ তৈরিতে এআই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতের শিক্ষক শুধু জ্ঞানের উৎস হবেন না, তিনি হবেন শেখার নকশাকার, দক্ষ পরামর্শদাতা, মূল্যবোধের নির্মাতা, প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহারকারী, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশকারী, গবেষক ও উদ্ভাবক অর্থাৎ, তথ্য পরিবেশকের ভূমিকা কমে গিয়ে শেখার পথপ্রদর্শকের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। তাই এআইয়ের যুগে টিকে থাকতে আরও এগিয়ে থাকতে হবে শিক্ষকদের। এআই টুল ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। সমালোচনামূলক চিন্তা ও সৃজনশীল শিক্ষাদান বাড়াতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক ও সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে। গবেষণামুখী হতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও এআইয়ের নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখাতে হবে। প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। এআইয়ের যুগে ভবিষ্যতে সবচেয়ে নিরাপদ থাকবেন সেই শিক্ষক, যিনি নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন করেন। প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীর চরিত্র, মূল্যবোধ ও নেতৃত্বগুণ বিকাশে কাজ করেন। গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতায় অগ্রণী থাকেন। অন্যদিকে যিনি কেবল পাঠ্যবই পড়ে শোনান, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে অনাগ্রহী এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চান না, তাঁর পেশাগত চ্যালেঞ্জ বাড়বে। এআই শিক্ষা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এটি শিক্ষকের অনেক নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সহজ করে দেবে, কিন্তু মানুষ গড়ার শিল্পকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। একজন দক্ষ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনে স্বপ্ন জাগান, মূল্যবোধ গড়ে তোলেন, নৈতিক সাহস দেন, ব্যর্থতার সময়ে পাশে দাঁড়ান এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করেন—এসব মানবিক গুণ কোনো অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। যে শিক্ষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজের দক্ষতার সম্প্রসারণ হিসেবে গ্রহণ করবেন, তিনি আরও কার্যকর, গবেষণামুখী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠবেন। আর যিনি পরিবর্তনকে অস্বীকার করবেন, তাঁর পেশাগত গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সুতরাং, এআই শিক্ষকের বিকল্প নয় বরং দক্ষ, দূরদর্শী ও মানবিক শিক্ষকের সবচেয়ে শক্তিশালী সহযোগী। ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে মানবিক শিক্ষকের প্রজ্ঞা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতার সৃজনশীল সমন্বয়।
মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর আইনি লড়াইয়ের উত্তাপের মধ্যেই বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) স্মার্টফোন বাজারে আনার ঘোষণা দিল চীন। সোমবার সাংহাইতে আয়োজিত এক ইভেন্টে 'স্টেপফান' নামের একটি স্টার্টআপ তাদের নতুন ‘স্টেপএক্স নিও’ ফোনটি সবার সামনে নিয়ে এসেছে। নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘স্টেপ এওএস’ এবং ‘স্টেপ আমু’ এআই এজেন্টের সমন্বয়ে তৈরি এই ফোনটি ব্যবহারকারীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ পরিচালনা করতে সক্ষম। মাইক্রোসফটের প্রাক্তন কর্মীদের তৈরি এই এআই স্টার্টআপের দাবি, সাধারণ স্মার্টফোনের মতো এই ফোনে আলাদা করে অ্যাপ খোলার প্রয়োজন নেই। ‘স্টেপ আমু’ নামের এআই এজেন্টটি ভয়েস বা সাধারণ টেক্সট কমান্ডের মাধ্যমেই আর্থিক লেনদেন, ভ্রমণ ও অন্যান্য জটিল কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও কাজ করতে সক্ষম এই এআই মডেলটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের ভিত্তিতে তৈরি। বর্তমানে মার্কিন প্রযুক্তি বাজারে যখন অ্যাপল ও ওপেনএআই-এর মতো কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক গোপনীয়তা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন চীনের এই সাফল্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই স্মার্টফোনের দাম বা বাজারে আসার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নিয়ে এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্টেপফান।
চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন (ডব্লিউএআইসি) ২০২৬’-এ যোগ দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। শুক্রবার (১৭ জুলাই) চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এই চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ, উদীয়মান প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তিবিদেরা আলোচনা করছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানসহ জাতিসংঘের মহাসচিব বক্তব্য রাখেন। তারা এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল উন্নয়ন এবং এ খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। এই আয়োজনে ডিজিটাল রূপান্তর ও স্মার্ট সুশাসন নিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরতে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম একাধিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে সরকারের সদিচ্ছা বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে প্রতিফলিত হবে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।