Breaking news

কলেজ

কলেজ-শিক্ষক বনাম বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক : শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক নয়, শিক্ষার মানই হোক লক্ষ্য

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে সরকারি কলেজের শিক্ষক বনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এমন তুলনামূলক বিতর্ক মাঝেমধ্যে দৃশ্যমান হয়। সম্প্রতি একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এটি আবারও আলোচনায় এসেছে। উভয় পক্ষই বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন।   সরকারি কলেজের শিক্ষকদের মতে, তাঁরা কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত অনেকে মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো গবেষণা, প্রকাশনা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা। দুই পক্ষের যুক্তির মধ্যেই কিছু বাস্তবতা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই তুলনা কি সত্যিই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়?   আমার মনে হয়, ‘কে শ্রেষ্ঠ’—এ প্রশ্নের চেয়ে ‘কে তাঁর দায়িত্বে কতটা দক্ষ, নিবেদিত ও কার্যকর’—এ প্রশ্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই ধরনের প্রতিষ্ঠান নয়, তাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষাদান-পদ্ধতি, দায়িত্ব, একাডেমিক পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যও এক নয়। ফলে একটির মানদণ্ড দিয়ে অন্যটিকে বিচার করা সব সময় যৌক্তিক নয়। শিক্ষকতার মর্যাদা পদবিতে নয়, সক্ষমতায়। একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যথেষ্ট নয়। আবার শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ করাও একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয় না।   প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা একজন প্রার্থীর জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতায় সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু শিক্ষকতা একটি দীর্ঘমেয়াদি পেশা। শ্রেণিকক্ষে জটিল বিষয় সহজ করে বোঝানো, শিক্ষার্থীর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য বুঝতে পারা, মূল্যায়ন করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে উৎসাহিত করা এবং নিজের জ্ঞানকে নিয়মিত নবায়ন করা—এসব দক্ষতা নিয়োগ পরীক্ষার বাইরের বিষয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক গবেষণা, জ্ঞান সৃষ্টি, উচ্চতর একাডেমিক অনুসন্ধান ইত্যাদি শিক্ষাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অর্থাৎ ‘নিয়োগের যোগ্যতা’ এবং ‘পেশাগত উৎকর্ষ’—দুটি একই বিষয় নয়।   বাংলাদেশের সরকারি কলেজের শিক্ষকরা সাধারণত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে সীমিত অবকাঠামো, বড় শ্রেণি, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁদের অর্জন করতে হয়। প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশের বিষয়টি তাঁদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শক্তির জায়গা মূলত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান অনুসন্ধান, গবেষণা-পদ্ধতি, প্রকাশনা, একাডেমিক বিতর্ক, আন্তর্জাতিক জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে সংযোগ এবং নিজ ক্ষেত্রে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা ইত্যাদি। গবেষণাপত্রের সংখ্যার পাশাপাশি গবেষণার ফল শ্রেণিকক্ষে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি কতটা বিকশিত হচ্ছে এবং সমাজের সমস্যার সমাধানে গবেষণা কতটা ভূমিকা রাখছে—এসবও বিবেচনার ব্যাপার।   আমাদের সরকারি কলেজের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা অন্য যেকোনো স্তরের শিক্ষক—সবার ক্ষেত্রেই প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমি গত পাঁচ বছরে শিক্ষক হিসেবে কতটা শিখেছি? আমার শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? আমি গবেষণা বা পেশাগত জ্ঞানকে শ্রেণিকক্ষে কতটা ব্যবহার করছি? শিক্ষকতা এখন আর শুধু বক্তৃতার পেশা নয়। একুশ শতকের শিক্ষার্থীরা তথ্যের জন্য শুধু শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল নয়। তার হাতে ইন্টারনেট, ডিজিটাল লাইব্রেরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন কোর্স এবং বিশ্বের অসংখ্য জ্ঞানভাণ্ডার। তাই আজকের শিক্ষককে তথ্যের একমাত্র উৎস না হয়ে লার্নিং ডিজাইনার, মেন্টর, ফেসিলিটেটর ও ক্রিটিক্যাল থিংকার হতে হবে।   একজন শিক্ষক গবেষণা করলে তিনি নিজের বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে পারেন। তিনি শ্রেণিকক্ষে কাজ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার সমস্যা, ভুল ধারণা, মূল্যায়নের দুর্বলতা বা নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা করতে পারেন। অর্থাৎ গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সরকারি কলেজেও গবেষণা হতে পারে। আবার শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য গবেষণা নয়, প্রয়োজন গুণগত গবেষণা। গবেষণার ফল যদি শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রবেশ করে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে জ্ঞান সৃষ্টির পাশাপাশি জ্ঞান বিতরণেরও কেন্দ্র হয়ে ওঠে।   সরকারি কলেজের শিক্ষকদেরও আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। শুধু নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রবেশের সাফল্য আর পেশাগত উৎকর্ষ অর্জন হলো দীর্ঘ যাত্রা। একজন শিক্ষককে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে, আমি কি প্রযুক্তি ও এআইকে দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষায় ব্যবহার করি? আমি কি আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখি? আমার শিক্ষার্থীরা কি আমার ক্লাসের পর আরও জানতে আগ্রহী হয়? এসব আত্মজিজ্ঞাসাই শিক্ষককে এগিয়ে নিতে পারে।   আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা। শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্বমানের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা নিয়ে দেশ ও বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘সরকারি কলেজের শিক্ষক শ্রেষ্ঠ, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘আমাদের শিক্ষকরা কি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার্থী তৈরি করতে প্রস্তুত?’ আরও বড় প্রশ্ন, আমরা কি আমাদের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা-সুবিধা, একাডেমিক স্বাধীনতা ও পেশাগত পরিবেশ দিতে পারছি? প্রয়োজন একটি নতুন শিক্ষকতা সংস্কৃতি, যেখানে কেউ ছোট-বড় নন। শুধু নিয়োগ পরীক্ষা, ডিগ্রি, পদবি, গবেষণাপত্রের সংখ্যা কিংবা চাকরির বয়স—কোনো একটিকে শিক্ষকতার সামগ্রিক মানদণ্ড বানানো উচিত নয়। রাষ্ট্রকেও বুঝতে হবে—শিক্ষকের ওপর শুধু দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না, তাঁকে সময়, প্রশিক্ষণ, গবেষণা-সুযোগ, প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ দিতে হবে।   সরকারি কলেজের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক—দুই ধারাই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁদের দায়িত্বের প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু জাতীয় লক্ষ্য এক। একজন ভালো সরকারি কলেজ-শিক্ষক হয়তো অসংখ্য শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করেন। একজন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক তাঁদের মধ্য থেকে গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক ও জ্ঞানস্রষ্টা তৈরি করেন। এ দুই ভূমিকা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং একই শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিক অংশ। তাই ‘কে বড়’—এই বিতর্কে না যাওয়াই ভালো। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্মানের। গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জনও সম্মানের। কিন্তু তার চেয়েও বড় সম্মান হলো নিজের পেশাগত দায়িত্ব সততা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে পালন করা এবং শিক্ষার্থীর জীবনকে আলোকিত করা।   সুতরাং, সরকারি কলেজ বনাম বিশ্ববিদ্যালয় নয়—প্রতিযোগিতা হোক অজ্ঞতার সঙ্গে জ্ঞানের, অদক্ষতার সঙ্গে দক্ষতার, স্থবিরতার সঙ্গে উদ্ভাবনের, অসততার সঙ্গে নৈতিকতার, আর সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সম্ভাবনার। তবেই শিক্ষকসমাজের মর্যাদা বাড়বে, উচ্চশিক্ষার মান বাড়বে এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।     ড. মো: বিল্লাল হোসেন উপাধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ।    

সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0