পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং সংঘাত বন্ধে নিজেদের সুনির্দিষ্ট শর্ত স্পষ্ট করেছে ইরান। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালির নৌপথ নিরাপদ রাখতে ওমানের সঙ্গে একটি সফল সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে দেশটি। ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরে সম্প্রতি এক বক্তব্যে এ তথ্য জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই। ইসমাইল বাঘেই উল্লেখ করেন, বিরোধ নিরসনে ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাদের অবস্থান তুলে ধরছে এবং ওমানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ নৌপথের ভৌগোলিক সীমারেখা নির্ধারণে দুই দেশই একমত হয়েছে। এ-সংক্রান্ত যৌথ সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সামনে উত্থাপন করা হবে, সে বিষয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল পরিবহন রুট হওয়ায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই দ্রুতই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির মাঝখানে এমন একটি সরু জলপথ রয়েছে, যার ওপর নির্ভর করে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমানের ভূখণ্ড, মাঝখানে হরমুজ প্রণালি। ভৌগোলিক আয়তনের বিচারে এটি পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ক্ষুদ্র বিন্দুমাত্র। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর গুরুত্ব এতটাই বিস্তৃত যে, এই প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও তেলের বাজার, জাহাজ চলাচল, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঢেউ তুলতে পারে। ফলে হরমুজকে কেবল একটি সামুদ্রিক পথ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। এটি একই সঙ্গে একটি ভূরাজনৈতিক চোকপয়েন্ট, জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অন্যতম মঞ্চ। পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো রাষ্ট্রগুলো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সমুদ্রপথে রপ্তানি করে। তাদের তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে যেতে হলে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। বিশেষ করে, কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। অর্থাৎ হরমুজের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ অঞ্চল একটি নির্দিষ্ট সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই হরমুজকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একটি চোকপয়েন্ট বলা হয়। চোকপয়েন্ট হলো এমন একটি ভৌগোলিক স্থান, যার নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তা বৃহৎ পরিসরের বাণিজ্য ও যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। সুয়েজ খাল, বাবেল মান্দেব প্রণালি ও মালাক্কা প্রণালির মতো হরমুজও সেই ধরনের একটি স্থান। তবে এর বিশেষত্ব হলো, এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিশ্বের জ্বালানি বাজার। পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসা তেল ও গ্যাসের প্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। হরমুজের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয় ইরানের অবস্থান বিবেচনা করলে। প্রণালির উত্তরে ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং তার বিপরীতে ওমানের ভূখণ্ড। ফলে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এই জলপথের ওপর একটি বিশেষ কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংঘাতে রয়েছে এবং এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পারস্য উপসাগর। প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা ইরানের জন্য কঠিন। তাই ইরানের সামরিক কৌশলে অসম যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগামী নৌযান এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। হরমুজের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা ই ধরনের কৌশলকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। তবে হরমুজ বন্ধ করে দেয়া এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা এক বিষয় নয়। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণভাবে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ বন্ধ রাখা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য দিতে হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি দ্বিমুখী। হরমুজ দিয়ে অন্য দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় ঠিকই, কিন্তু ইরানের নিজের জ্বালানি রপ্তানিও সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করা ইরানের নিজের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু পূর্ণ অবরোধের প্রয়োজনও নেই। সামান্য সামরিক উত্তেজনা, জাহাজ আটকের ঘটনা, মাইন বিস্তারের আশঙ্কা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তাই আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর ও তার আশপাশের জলপথে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সামরিক উপস্থিতি তার চারপাশে মার্কিন শক্তির একটি স্থায়ী চাপ। ফলে একই জলপথ দুই পক্ষের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রশ্ন, আর ইরানের কাছে এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্ন। হরমুজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সিকিউরিটি ডিলেমা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো রাষ্ট্রগুলো একদিকে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধও তাদের জন্য বিপর্যয়কর। তাদের অর্থনীতি তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং সেই রপ্তানির জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথ অপরিহার্য। তাই তারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করে এবং নিজেদের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিসরও বাড়ানোর চেষ্টা করে। চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই বুঝতে পারছে যে, শুধু সামরিক জোটের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে চীনের উত্থানও সরাসরি যুক্ত। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস তার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হরমুজের নিরাপত্তা চীনের কাছে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ। চীনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি তাই ক্রমেই অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দিকে এগোচ্ছে। সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য এবং বৃহত্তর অবকাঠামোগত সংযোগের পরিকল্পনা এই পরিবর্তনের অংশ। এর ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্য এবং চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে একটি পরোক্ষ প্রতিযোগিতাও তৈরি হচ্ছে। হরমুজের গুরুত্ব শুধু তেল দিয়ে শেষ হয় না। বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোলেও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা রাতারাতি শেষ হচ্ছে না। পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পেট্রোকেমিক্যালসহ বহু খাত এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হবে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়বে, বিমা ব্যয় বাড়বে, জাহাজ পরিবহনের খরচ বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এরপর সেই অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও শিল্পপণ্যের বাজারে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের আমদানি ব্যয় সামলানোর সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা জ্বালানির সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারের দাম দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। হরমুজকে ঘিরে বড় কোনো সংকট হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব পড়তে পারে। অবশ্য হরমুজের বিকল্প তৈরির চেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত স্থলভিত্তিক পাইপলাইন ও বিকল্প বন্দর ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য হলো কোনো সংকটের সময় অন্তত কিছু পরিমাণ জ্বালানি হরমুজ এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো। কিন্তু এসব বিকল্প পথ হরমুজের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নয়। কারণ, পারস্য উপসাগরের বিপুল জ্বালানি রপ্তানি একসঙ্গে অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো অবকাঠামোগত সক্ষমতা এখনো নেই। ফলে হরমুজের গুরুত্ব কমানো সম্ভব হলেও এর প্রয়োজনীয়তা সহজে দূর করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক আইনও এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চলাচল-অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু শান্তিকালীন আইন এবং যুদ্ধকালীন বাস্তবতা এক নয়। কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, তখন আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, উপকূলীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং সামরিক প্রয়োজনের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে। ফলে হরমুজের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৈধতারও পরীক্ষা। হরমুজকে তাই ভবিষ্যতের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিশ্বের জ্বালানি বাজারের পারস্পরিক নির্ভরতা একই জায়গায় এসে মিলেছে। আগামী দিনে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমলেও হরমুজের গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূগোলের গুরুত্ব প্রযুক্তি যতই বাড়ুক, সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। বরং প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা ভূগোলের রাজনৈতিক মূল্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।
বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার কর্মী নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান। বুধবার ৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে ওমানের রাজপরিবারের এক প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রতিমন্ত্রী নিজেই এ তথ্য নিশ্চিত করেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, ওমানের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরকারের প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৫ হাজার কৃষি শ্রমিক এবং ৫ হাজার মৎস্যজীবী নেবে। প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করতে আগামী মাসে ওমানের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করবে। ওমানে দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা ভিসা চালুর বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, দক্ষ জনশক্তি প্রেরণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন খাতে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীরা যেন ওমানে নিয়মিত কাজের সুযোগ পান, সে লক্ষ্যে উভয় দেশই আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার ও শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রতিনিধিদলের নেতা আল সাইয়্যেদ ওমানের উন্নয়নে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদানের প্রশংসা করে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা। শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস। শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।
ভালোবাসা সত্যিই কী অদ্ভুত যে চায়, সে কি আদৌ পায় আমিও কি পাব তারে তুমি তো জবাব দিলে না! তোমার হৃদয়ে তো তুমি গ্রহণ করো সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা সেই অতিথি পাখিটিকে; নাহয় সেই দুর্লভ প্রজাপতিটিকে। তুমি কি গ্রহণ করবে আমায়? তুমি তো নগরীর দেবী আমি ছাড়া তোমার অনেক পূজারী আছে তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসব যেভাবে তোমায় ভালোবেসেছিলাম।
শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে। বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি। বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’। বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।” বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।” বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি... ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।” আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব। এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?” আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।” চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।” এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম। সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে। এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর। বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।” বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম। হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।