Breaking news
সাহিত্য

সাহিত্যালোচনা

মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা

ইলিয়াজ হোসেন রানা
ইলিয়াজ হোসেন রানা প্রভাষক, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
জুলাই ১৯, ২০২৬ • 0
মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা
মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা

 

অশীতিপর বৃদ্ধ ধনোপার্জনে ব্যস্ত। প্রশ্ন করলে সে বলবে, সে নিজের জন্য কিছুই করে না। সবই সন্তানের জন্য। আসল কথা, সে নিজেই সন্তান-সন্ততির ভেতর দিয়ে যুগ যুগ ধরে নিজের ভোগলিপ্সা চরিতার্থ করবে।

 

সন্তান যে নিজেরই নব সংস্করণ। এই যে জীবন আমাদের নিকট এতো প্রিয় এবং অমূল্য, এটাও আমরা অকাতরে না, অতি আবেগের সাথে, অতি উল্লাসের সাথে সন্তানের মঙ্গলের জন্য বিলিয়ে দিচ্ছি। বিপন্ননের মাথায় কুঠারাঘাত করে, অনাথের অন্নভরা গ্রাসকে শূন্য করে, সমাজের বুকে পাথর বসিয়ে আমি সম্পদ, অর্থ, বৈভব সংগ্রহ করছি, তা কার জন্য? যার জন্য এত করেছি, সে আমার কে?

 

অভিধান তাকে সন্তান নামে আখ্যায়িত করছে। কিন্তু আমি জানি, এক হিসাবে সে আমার কিছুই নয়। কোন অজানা দেশে সে ছিল, কোন প্রভাতে ঝরা ফুলটির মতো ভেসে এল, আবার কখন জীর্ণ পাতাটির মতো পৃথিবীর বুকে মিলে যাবে, তার সাথে আমার সম্বন্ধ কী? মূর্খ লোকে বলে আমি তার জনক, আমি তার পিতা। কিন্তু যদি তা-ই হবে, তার জীবনের ওপর আমার অধিকার নাই কেন?

 

মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, বাঁচাই যে তার ধর্ম। সে মরণকে মরণ বলে মানতে পারে না। তাহলে যে তার বেঁচে থাকা, জীবনধারণ অসাধ্য হয়ে পড়ে। সে বলছে, আমি বাঁচব; অনন্তকাল ধরে আমি বাঁচব, আমার আত্মা অবিনশ্বর। জীবন যেমন অনন্ত মহাযাত্রায় ছুটে চলে, যুগান্তরের ভেতর দিয়ে নিজের পথ কেটে চলছে, আত্মাও তেমনই অনন্তকাল ধরে কোনো বিশ্বে বেঁচে থাকবে, লীলাভিনয় করবে, নিজের কাজের ফল ভোগ করবে।

 

মৃত্যু সে তো ঘাঁট মাত্র; এখানে এসে আত্মা জীবনের নিকট বিদায় গ্রহণ করে আপনার দেশে চলে যায়, আর দেহ যাত্রীহীন শকটের ন্যায় ধুলায় পড়ে থাকে। মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা এক নয়; জীবন বা জৈবশক্তি প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, আত্মা নিত্য। মানুষ তো মৃতের দেশে বেঁচে থাকতে চায়, কিন্তু সেখানে তার বাসস্থান কোথায়?

 

মানুষ স্বর্গের দেশে বিরাট অভ্রভেদী প্রাসাদ গড়ছে, প্রাসাদের ধারে উদ্যান, অদূরে সিন্ধু ধারা, তটিনী, সাহচর্যের জন্য লাখ লাখ হুর ও গেলমান। এসবের ব্যবস্থা মানুষ পূর্বেই সেখানে করে রেখেছে। যা-কিছু সুন্দর, যা-কিছু ভোগ্য, যা-কিছু ইপ্সিত বলে মনে করেছে, সে সমুদয় দিয়েই মৃত্যুর ওপারে নিজের প্রবাস ঘাঁটি গড়ে তুলছে; তারই সে নাম দিয়েছে বেহেশত বা স্বর্গ, মরণের পরও বেঁচে থাকার এই ধারণার নানা শাখা-প্রশাখায় প্রসারিত হয়ে কী বিরাট মায়াজগতের সৃষ্টি করেছে।

 

নয়ন কখনো দেখেনি সে দেশের রূপ, শ্রবণ কখনো শোনেনি সেই পুরির ছন্দ; তবু সবাই সব আশা সব কামনাকে সেই অজানা আঁধার দেশের প্রাণে নিয়ন্ত্রিত করে পৃথিবীর দারুণ বেদনার ভার বুকে নিয়ে হাসছে।

 

মানুষ সবাই মনে করে, ইহকালের দুঃখ বরণ করে নিলে পরকালে অন্তত সুখের অধিকার আপনি এসে ধরা দেবে। কাব্য কলায়, সাহিত্য-সংগীতে, আশা-উৎসাহে, আমোদ-উপভোগ সবখানেই সেই ভাবী আকাঙ্ক্ষিত রাজ্যের জন্য প্রবল অনুরাগ ঝংকার দিয়ে উঠছে। একই বিদ্যুৎ প্রবাহ যেমন নগরীর লাখো প্রদীপের ভেতর দিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করেছে, তেমনি একই মহাপ্রেরণা সমগ্র মানবগোষ্ঠীর ভেতর দিয়ে কোনো দূর লক্ষ্যের পানে ছুটে চলেছে। সেই প্রেরণা মানবের ভেতর দিয়ে আপনি বেঁচে থাকতে চায়, তাই মানুষের বাঁচতে এত সাধ।

 

আত্মাও চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়। মরণ মানুষের দৈহিক জীবনে সমাপ্তি এনে দেয় না। কিন্তু আত্মা তার পরও বেঁচে থাকতে উৎসুক। তাই মৃত্যুর পরপার সম্পর্কে মানুষের এত জল্পনা-কল্পনা। সংসারের এ মায়া-বন্ধন, এই আশা-ভরসা, এই উদ্যম-সাধনা, সবই মরণের সঙ্গে সঙ্গে দারুণ ব্যর্থতায়  মিশে যাবে। এই চিন্তা মানুষ সহ্য করতে পারে না। সোনার পুতুলি সন্তান জননীর কোল শূণ্য করে কালের নির্মোঘ আঘাতে খসে পড়ছে। সে কি কখনো আর মায়ের শূণ্য কোলে ফিরে আসবে না? আসবে! মরণের পরপারে আবার সে হাসতে হাসতে হাসতে মায়ের কোলে চড়ে বসবে। তা না হলে এই বিচ্ছেদ যদি শেষ হয়, তবে জীবন যে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে!

 

মানুষ তো সে ধারণা সহ্য করতে পারে না। ওই যে সতি নারী তার আদরের পতিকে হারিয়ে নিশিদিন অশ্রুজলে বুক ভাসাচ্ছে। সে স্বামীর ধ্যান, স্বামীর স্মৃতি জীবনের শেষ অবলম্বন ভেবে বুকে আগলে রেখেছে, এটি কি শুধু তার ব্যর্থতার জন্য?

 

সত্য থেকে বিচ্যুতির ফলেই মানুষের বিড়ম্বনা এবং সমাজের অশান্তির সূত্রপাত হয়। মানুষের বিশ্বাসের বিড়ম্বনা, যা মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, জীবনকে এমন স্থানে বসিয়ে দেয়, যেখান থেকে মানুষ পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় নতুন অর্থে বুঝতে বাধ্য হয়। কবি যে পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় দেখছেন, তাঁর চোখে পৃথিবীর প্রতিটি তরু-বীথিকা সুরবালাদের মনোরম আসন বলে মনে হয়। প্রতিটি পল্লবের মৃদু শিহরণ আপন মানসপটে আনন্দের হিল্লোল বয়ে দেয়। সেই পৃথিবী একজন নাস্তিকের চোখে বৃহৎ ধূলিকণার স্তূপ ভিন্ন অন্য কিছু বলে মনে হয় না।

 

এই যে তাজমহল জগতের অষ্টম কীর্তি বলে বিশ্ববিশ্রুত, যাকে কেউ অশ্রুসৌধ, কেউ প্রেমের সমাধি বলে আখ্যাত করেছে, সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ মেজর শ্লিমানের স্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছেন, “হায়! আমি মরলে আমার সমাধির ওপর যদি কেউ এমন স্মৃতিসৌধ গড়ে দিত, তাহলে এই মুহূর্তে মরতে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ হতো না।। সেই তাজমহলের দিকে একবার অর্থনীতিবিদের চোখে দর্শন করো, দেখবে এটি অপব্যয় ও নির্বুদ্ধিতার একটি জীবন্ত নিদর্শন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। যে ন্যায়নিষ্ঠার ভাস্বর তার চোখে এই পৃথিবীর কোথাও নিয়মের ব্যতিক্রম চোখে পড়বে না।

 

পক্ষান্তরে যেকোনো সুনির্দিষ্ট পন্থাকে আপনপ্রবৃত্তিসমূহের প্রতিকূল ভাবে, সে জগৎকে সর্বদা নিয়মের কঠিন নিগড়ে নিষ্পেষিত বলে দুঃখ প্রকাশ করবে। দরিদ্রের  অন্ন জোটে না, তবু তার ক্ষুধা হয়, প্রকৃতির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনেককেই অভিযোগ করতে শোনা গেছে যে নিজে চুরির কাজে অভ্যস্ত, সে অন্যের অচুরিতে আস্থা রাখতে পারে না। ঠিক আমি যেমন, তেমনই করে আমি দুনিয়াটাকে দেখি।

 

জীবন কী, জগৎ কী? মৃত্যুর পরে কী আছে? এসব প্রশ্ন মানুষকে সব সময় আলোড়িত করে। এ যে ভীষণ সমস্যা! জীবনে যত বিপদ আসে, সব বিপদেরই একটি সমাধান আছে, কিন্তু মরণ যে বিপদ, তার কাছে তো পরিত্রাণ নেই। এ পৃথিবী এমন করে হাসতে থাকবে, এ সংসারে কাজ-কর্ম এমন করে চলতে থাকবে, শুধু আমরা থাকব না। এ চিন্তা  বড় অসহ্য। এ বন্ধুবান্ধব এমনই আমার জন্য প্রতিবছর উৎসব করতে থাকবে, কিন্তু আমি সেখানে থাকব না।

 

কেউ হয়তো আফসোস করে দু-একবার বলবে, আহা, অমুক আজ নেই! কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। শিশুপুত্র-কন্যারা শরতের জোছনা ভরা আকাশের পানে চেয়ে ভাববে, বাবা ঐ চাঁদের দেশে আছে, হয়তো একদিন নেমে আসবে। বসন্তে যখন ফুলে ফুলে গন্ধের বন্যা বইবে, গ্রীষ্মে যখন পাকা ফলের ম-ম সুবাস চড়িয়ে পড়বে, তখন শিশুদের বাবার কথা মনে পড়বে, কিন্তু সে কয়দিন? অদূরে কল্লোলিনী এমনি করেই চিরদিন বইতে থাকবে। শৈশবের সংস্পর্শে, যৌবনের আলিঙ্গন কত না সে তার তরঙ্গ মাখিয়ে দিয়েছে! সে এমনই উদাস মনে নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দাম ক্রিয়া দেখতে দেখতে এভাবে প্রবাহিত হতে থাকে।’

 

মানুষ দুনিয়ার সুখ সুখ করে উন্মত্ত। এই সুখ যে ক্ষণস্থায়ী, তা মানুষ ভুলে একবারও ভাবে না। যতক্ষণ মানুষ ইন্দ্রিয়ের অনুসরণ করে, আত্মার বাণীকে শোনার জন্য কানকে উদগ্রীব না করে, ততক্ষণ মানুষ তা ভাবতেও পারে না। কিন্তু আত্মারও একটা ক্রিয়া আছে, একটা দৃষ্টি আছে। এটি পৃথিবীর ওই অধ্রুব রাশির ভেতরে সত্যের সন্ধান খুঁজে বেড়ায়। যেখানে একটু শুচিতার সৌন্দর্য বিকশিত হতে দেখে, যেখানে একটু দানের প্রতিদান দেখে, মহত্ত্বের বেদনাশ্রু দেখে, সেখানেই আত্মা আমাদের উন্মনা হয়ে ওঠে। কোথায় যেন সে এমনই দেখে এসেছে। কোথায় যেন এমনই নিঁখুত সুষমা, এমনই সৌম্য-সৌহার্দ্য ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহিমা দেখে এসেছে।

 

লতিকার শ্যামাঞ্চলে ঢাকা কুসুমের হাসি - হাসিমুখ, জলদের নিবিড় কৃষ্ণতায় ঘেরা চপলার অসংবদ্ধরূপ সাগর-তরঙ্গের শীর্ষে শীর্ষে উচ্ছ্বসিত ফেনপুঞ্জের অনির্বচনীয় সুভ্রতা, সবই যেন কোন জন্মের সুখ্যাতি তার অন্তরের ভেতর জাগিয়ে দেয়। কোন যে সত্যের দেশ, জ্যোতির দেশ, সুষমার দেশ হতে সে কক্ষচ্যুত গ্রহের ন্যায় দুনিয়াতে খসে পড়েছে। এদের বর্ণে, ছন্দে, গন্ধে যেন সেই দেশের আভাস পাওয়া যায়। সেই দেশের বারতা দিয়ে এরা আত্মাকে উদাস করে তোলে, তাই আত্মা প্রতীয়মানকে ত্যাগ করে প্রচ্ছন্নকে পেতে চায়।

 

0 Comments

Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

সাহিত্য

View more
ফেরা

দিনটা শুরু হয়েছিল সূর্যের মিষ্টি রোদ দিয়ে। হালকা বাতাস, পাখিদের ডাক, প্রকৃতির ছোঁয়া—সব মিলিয়ে সুন্দর একটি পরিবেশ। প্রতিদিনের মতোই একটি মেয়ে সেজেগুজে বের হয়েছিল। কাজলবিহীন চোখ, আর চোখের পাশে একটি তিল—সেই তিলটাই তার অহংকার।   সারা দিনের ব্যস্ততার মাঝে আজকের দিনটা একটু অন্য রকম। কারণ, আজ সে একটা ফোন কলের অপেক্ষায় ছিল।ফোনটা আসবে সেই মানুষটার, যার জন্য সে এক কঠিন পরিস্থিতি একা লড়াই করে জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছিল। যে নতুন অধ্যায়ের নাম সে দিয়েছিল—অপেক্ষা।   ভালোবাসা প্রমাণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে অপেক্ষা। একটি ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য যুগ যুগ অপেক্ষা করা যায়—এটা বইতেই মানায়। কিন্তু আসল জীবনে সেটা সব প্রেমিকা পারে না। আর যারা পারে, তারাই ইতিহাস হয়ে যায়। এ গল্পে যে মেয়েটি অপেক্ষায় আছে, সে ইতিহাসের অপেক্ষায় নেই। সে ইতিহাস হতে চায় না। সে শুধু তার পূর্ণতাকে চায়। আর সেই পূর্ণতার জন্যই সে অপেক্ষা করে।    মেয়েটি অফিস যাচ্ছিল। প্রতিদিনের মতো লোকাল বাসে উঠল, জানালার পাশে একটা সিটও পেয়ে গেল। মেয়েটির পছন্দের গান ছিল, ‘আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি...’। গানটা সে সব সময় শুনত। বাসে বসে সেদিনও শুনছিল।শুনতে শুনতে তার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল। যে দিনগুলো সে পার করে আজকের এই দিনটার অপেক্ষা করছে। এই ফোন কলটার অপেক্ষা করছে।   সেই দিনটা ছিল এ রকম... আর পাঁচটা প্রেমকাহিনির মতোই আমার গল্পটাও। হঠাৎ করেই বাসা থেকে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলল। কেউ আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করল না, আমি বিয়ে করতে চাই কি চাই না। আমার কোনো কথাই কেউ শুনল না। তবে একটা বিষয় আলাদা ছিল। আলাদা ছিল কারণ, আমার মানুষটা আমাকে বিয়েটা করে নিতে বলেছিল।   সে তখন বেকার ছিল। তাই আমার পরিবারের সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহসটা তার ছিল না। আমাকে নিয়ে যাবে, এই কথাটা বলার সাহসটাও ছিল না। একসমুদ্র কষ্ট বুকে নিয়ে সে আমাকে বলেছিল, “বিয়েটা করে নাও।” কিন্তু আমার পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না।   আমার অনেক অভিমান হয়েছিল। কারণ তার কী আছে, কী নেই, সেটা জেনে তো আমি তার হাতটা ধরিনি। আমি হাত ধরেছি, মানে হাত ধরে থাকব। তার হাত শূন্য হোক বা ভরা, সেটা আমার কাছে কিছু যায় আসে না। হাত ধরেছি মানে, শেষ পর্যন্ত ধরে থাকব—সেটা যেমনই হোক।   সেই রাতটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের রাত ছিল। আমি সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার একটা অভ্যাস আছে—আমি রাগ করলে, কষ্ট পেলে খেতে পারি না। সেদিন রাতেও আমি খাইনি। আমি একটু কান্না করলেই আমার চোখ খুব ফুলে যায়। কিন্তু সেদিন চোখ ফেটে কান্না আসা সত্ত্বেও আমি কান্না করিনি। কারণ, পরদিন ছেলেপক্ষ আসবে।   আমি জানতাম না, আমি আর ফিরে আসতে পারবো কি না। তার পরদিন একটা গোল্ড আর গোলাপি রঙের শাড়ি, গয়না বের করা হলো। বের করে আমার সামনে রেখে বলল, “পছন্দ হয়েছে? না অন্যটা দেব?” আমি কিচ্ছু বলিনি। একটু হেসে মুখটা নিচু করে ফেললাম। তারা হয়তো এটাই ভেবেছিল, আমার পছন্দ হয়েছে। আমি খুশি। কিন্তু আমার ভেতরে কী চলছে, সেটা আমি ছাড়া কেউ জানে না।   সেদিন তার সাথে আমার আর কোনো কথা হয়নি। আমি যোগাযোগও করিনি। করতে চাইওনি। কারণ, আমার একটাই অভিমান তার সাথে—তাকে আমি আমার এই দিনে পাশে পাইনি।   আয়োজনটা বাসায় করা হয়নি। রেস্টুরেন্টে করা হয়েছিল। একটা রেস্টুরেন্ট বুক করা হলো। আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন গেল। ওনারা এলো। আমাকে যখন গাড়িতে তোলা হয়, আমি গাড়িতে উঠে বসে আল্লাহকে উদ্দেশ করে বললাম, হে আল্লাহ, সবকিছু তোমার হাতে। তুমি যদি না চাও তাহলে কখনোই কোনো কিছু হওয়া সম্ভব না। আবার তুমি যদি চাও, তুমি তো তাকদিরও পরিবর্তন করতে পারো।   এতটুকুই বলেছি শুধু। আমি আর কিচ্ছু ভাবিনি। ক হবে, না হবে—কিচ্ছু না। তার পরের প্রতিটি ঘটনা আমার একপলকে যেন শেষ হলো। আমি হয়তো সবকিছু ঝাপসা দেখছিলাম। কী হচ্ছে, না হচ্ছে—কিচ্ছু আমার খেয়াল নেই।   আমাকে ছেলের সাথে আলাদা কথা বলার জন্য বলা হলো। আমি বলতে চাইনি। কিন্তু ছেলে আগ্রহ করেছিল, তাই আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হলো। আমি যখন যাচ্ছি, তখনো আমার মনে হয়নি আমি ওনাকে কী বলব। আমার কোনো কথাই গোছানো ছিল না। আমি শুধু ওনাকে গিয়ে বলে দিয়েছি, আমি এই বিয়েতে রাজি না। উনি আর একটা কথাও আমাকে বলেননি। উনি শুধু বললেন, "ঠিক আছে।"   তারপর সবকিছু নরমাল ছিল। উনি ওনার পরিবারকে কিছু বুঝতে দেননি। আমাদের পরিবারকেও কিছু বুঝতে দেননি। তারপর আমরা চলে এলাম। তারপর কীভাবে সে ম্যানেজ করল, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি জানতেও চাইনি। আমি শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম—আমি ফিরেছি। আমি ফিরতে পেরেছি। আমি সেই মানুষটার জন্যই ফিরেছি, যে আমার হাত ছাড়তে রাজি হয়ে গিয়েছিল।   তারপর সে একদিন দেখা করতে চাইল। কিন্তু আমি জানি না দেখা করে কী হবে। সব কি আগের মতো হবে? সব কি ঠিক হয়ে যাবে? নাকি আমি তাকে ঠিক করে নেব? কিচ্ছু জানি না।   মনে অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে গিয়েছিলাম দেখা করতে। আমার ভেতরে তখনো সেই অভিমানটা ছিল। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, সে কি এখনো আমার হাতটা ধরতে চায়? সেদিন তার চোখে আমি আমার জন্য পানি দেখেছিলাম, যেটা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।   একটা পুরুষের চোখ দিয়ে সহজে পানি পড়ে না, এটা আমি জানি। আর যদি পড়ে, সেটা অনেক আঘাতের পরই পড়ে। সে অনেক চেষ্টা করেছে আমার থেকে পানিটা আড়াল করতে, কিন্তু পারেনি। এটা দেখার পর আমি আর কিছুই জিজ্ঞেস করিনি। ভাবিওনি, তার হাত আবার ধরতে হবে কি হবে না। আমি শুধু জানি, আমি যার জন্য ফিরেছি, তার কাছেই আমাকে থাকতে হবে—যেকোনো মূল্যে।   তারপর সেই গানটাও শেষ হয়ে গেল, ‘আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি.. ‘। আমি আমার অফিসেও পৌঁছে গেলাম। কিন্তু মনটা তখনো ওখানেই পড়ে আছে। বাসে, কানে হেডফোন, আর ওই গানটা—সবকিছু যেন এখনো কানে বাজছে।   আমি অপেক্ষা করছিলাম। শুধু একটা ফোন কলের অপেক্ষায়। আজকে তার স্বপ্নের চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। তার স্বপ্ন পূরণের চাকরি। গতকাল রাতে সে আমাকে বলেছিল, “যদি চাকরিটা পাই, তাহলে তোমাকে ওই গানটা গেয়ে বলব, “চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ, এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না...”   ওই গানটা গেয়েই সে আমাকে জানাবে বলেছিল। আমি আজ অনেক খুশি ছিলাম। সকাল থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম, যেন সে চাকরিটা পেয়ে যায়। যেন আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ হয়। আমি এখনো সেই ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করছি...   ফোনটা বেজে উঠলেই যেন আমার সব অপেক্ষার অবসান হবে। তারপর দুপুরের দিকে হঠাৎ সে আমাকে ফোন দিল। কলটা পেয়েই আমি ছুটে গেলাম ফোনটা ধরতে। ফোনটা ধরে সে আমার নাম ধরে ডাকল, আর তারপর চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, সে চাকরিটা পেয়ে গেছে।   সেদিন আমরা দুজন জীবনের সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলাম। আমার মনের মধ্যে আলাদা একটা সাহস চলে এলো। মনে হলো, এবার আর কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। আমাদের স্বপ্নগুলো এবার সত্যি হবে। তবে তার চাকরিটা এমন ছিল, যে আমরা চাইলেও এখন বিয়ে করতে পারব না। কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিছু বছর। এই বছরগুলো যেন আমার কাছে একেকটা পাহাড় মনে হচ্ছে।   আমি তো আমার সবকিছুর সাথে যুদ্ধ করে ফিরে এসেছিলাম তার কাছে। এবার তার পালা। দেখা যাক, সে ফেরে নাকি...

অক্টোবর ২০, ২০২৬ 0

শান্তি দেবীর পুকুর

ধোঁয়া, বই এবং বিদ্রোহ

বিশ্বাসের নৌকা

রাফিয়া জান্নাত

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২৩তম আবেদন আর ১১তম ভাইভা শেষে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে জজকোর্টে ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদের চাকরিটা হলো। অনেকেই হয়তো বলবে পিয়নের চাকরি! কেউ নাক সিঁটকাবে, কেউ করুণা দেখাবে। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেয়া একটি ছেলের কাছে এই চাকরিটাই যেন সোনার হরিণ।   কোর্টে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে। কেউ ন্যায়বিচারের আশায়, কেউ মুক্তির আশায়, কেউ শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে আইনজীবীর ফি দিতে। দুঃখ দেখতে দেখতে এখন অভ্যস্ত।   একদিন দুপুরে আদালতের বারান্দার বাইরের বেঞ্চে বসে থাকা দুজন মানুষের দিকে চোখ গেল। দুজনই নিশ্চুপ। মুখে ক্লান্তি, চোখে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অপেক্ষা। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। কথা বলতে বলতেই জানলাম, একজন রাফিয়া জান্নাতের ভাই, আরেকজন তার ছোট ছেলে। ছেলেটির বয়স মাত্র আট বছর।   রাফিয়া জান্নাত বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তার পর থেকেই তিনি একা, অসহায়, মানুষের অবহেলা আর সমাজের বিদ্রূপ বয়ে বেড়াতেন। পাঁচ মাস আগে খবর আসে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথাই লেখা হয়। দাফন-কাফন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু চার দিন পর একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসে।   ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে বাজারের নির্জন কোণে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এস আলম রাফিয়ার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছেন। এরপর তাঁকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে সাজিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়।   রাফিয়ার ভাই মামলা করেন। মাসের পর মাস আদালত, থানা, আইনজীবী, সাক্ষী—এক অনন্ত দৌড়ঝাঁপ পেরিয়ে অবশেষে শুনানির দিন আসে। কিন্তু আদালতে বলা হলো, ভিডিওটি নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথাই রয়েছে। এস আলম নির্দোষ প্রমাণিত হলেন।   সেদিন আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে রাফিয়ার ভাই শুধু একবার বলেছিলেন, ‘গরিবের সত্যের কোনো সাক্ষী থাকে না’। তাঁর কণ্ঠে রাগ ছিল না। ছিল শুধু ভাঙা মানুষের ক্লান্তি। সেই দীর্ঘশ্বাসটা সারা দিন কানে বাজছিল।   দুদিন পর শুনলাম, টানা আদালতের দৌড়ঝাঁপে অসুস্থ হয়ে এস আলম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্যালাইন চলছে। পরদিন সকালেই আরেকটি খবর ছড়িয়ে পড়ল। এস আলম মারা গেছেন। কেউ বলল, হৃদরোগে। কেউ বলল অতিরিক্ত মানসিক চাপ। আবার কেউ ফিসফিস করে বলল, আল্লাহর বিচার।   কে জানত, সেই রাতেই মুখে মাস্ক পরা এক যুবক এস আলমের কেবিনে ঢুকে স্যালাইনের নলে কী যেন পুশ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ছটফট করতে করতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। যুবকটি দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তাকে যে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে—সকালে জজকোর্টে ডিউটি আছে। সে যে সামান্য এক অফিস সহায়ক!  

অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0

কে তুমি

ভালোবাসা চোখের ছিল

রুক্ষ শহর

কাশফুলের চিঠি

কিছু সৌন্দর্য দূর থেকেই সুন্দর যেমন ডুবে যাওয়া সূর্য, হাওয়ায় দোলা কাশফুল। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, তবু ছুঁই না— তাই মুগ্ধতাটুকু হারিয়ে যায়।   সূর্য ডোবে, আকাশ রাঙে শেষ আলোয় কিছু বিষণ্ণতা লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার আড়ালে। সবকিছু ধরে রাখাই ভালোবাসা নয় কিছু ভালোবাসা দূরত্বেই বেঁচে রয়।   কিছু মানুষ আসে শরতের কাশফুল হয়ে কিছু স্মৃতি থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে। সময় চলে যায়, মানুষও হারিয়ে যায় শুধু কিছু অনুভূতি নীরবে থেকে যায়।   কাশফুল শেখায় কোমল হতে সূর্যাস্ত শেখায়—বিদায়েও সৌন্দর্য থাকে। কিছু দৃশ্য ছবিতে বন্দি হয় আর কিছু সারা জীবন হৃদয়েই রয়ে যায়।  

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0

কুসুম বনের জ্যোৎস্না

শরতের ছোঁয়া

আমার পৃথিবী